স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা - (১)
‘দেখুন কেমন কুঁড়ি এসেছে।’
কি বলবো আপনাদের ! হঠাৎ করে সেদিন দেখা পেলাম যুগলপ্রসাদ-এর।
যুগলপ্রসাদ’কে আপনারা চেনেন তো ? সেই ছোট্টবেলাকার থেকে আমার একজন
স্বপ্নের মানুষ। একটা উজ্জ্বল চরিত্র !
বাঙলা উপন্যাস পড়ার সুবাদে আমার প্রিয় চরিত্রগুলোর মধ্যে বেষ্ট অফ বেষ্ট
মাত্র তিনখানা চরিত্র। নাম্বার ওয়ানে “যুগলপ্রসাদ”। বাকি দুটো হ’ল “অন্নদা’দিদি” আর “ইন্দ্রনাথ”।
খুব সম্ভবতঃ ক্লাস এইটে আমার পরিচয় তার সাথে। তাঁর কথা শুরু করতে আমার বিদ্যেতে কুলোবে না,তাই উপন্যাসের সেই অংশটাই তুলে ধরি আপনাদের জন্য :
“এই সরস্বতী কুণ্ডীর ধারে একদিন দুপুরে এক অদ্ভুত লোকের সন্ধান পাইলাম।
সার্ভে-ক্যাম্প হইতে ফিরিবার পথে একদিন হ্রদের তীরের বনপথ দিয়া আস্তে আস্তে আসিতেছি,বনের মধ্যে দেখি একটি লোক মাটি খুঁড়িয়া কি যেন করিতেছে। প্রথমে ভাবিলাম লোকটা ভুঁই-কুমড়া তুলিতে আসিয়াছে। ভুঁই-কুমড়া লতাজাতীয় উদ্ভিদ,মাটির মধ্যে লতার নিচে চালকুমড়ার আকারের প্রকাণ্ড কন্দ জন্মায়- উপর হইতে বোঝা যায় না। কবিরাজী ঔষধে লাগে বলিয়া বেশ দামে বিক্রয় হয়। কৌতূহলবশত ঘোড়া হইতে নামিয়া কাছে গেলাম,দেখি ভুঁই-কুমড়া নয়,কিছু নয়,লোকটা কিসের যেন বীজ পুঁতিয়া দিতেছে।
আমায় দেখিয়া সে থতমত খাইয়া অপ্রতিভ দৃষ্টিতে আমার দিকে চাহিল। বয়স হইয়াছে,মাথায় কাঁচা-পাকা চুল। সঙ্গে একটা চটের থলে,তার ভিতর হইতে ছোট একখানা কোদালের আগাটুকু দেখা যাইতেছে,একটা শাবল পাশে পড়িয়া,ইতস্তত কতকগুলি কাগজের মোড়ক ছড়ানো।
বলিলাম - তুমি কে ? এখানে কি করছ ?
সে বলিল - হুজুর কি ম্যানেজারবাবু ?
হ্যাঁ। তুমি কে ?
নমস্কার। আমার নাম যুগলপ্রসাদ। আমি আপনাদের লবটুলিয়ার পাটোয়ারী বনোয়ারীলালের চাচাতো ভাই।
তখন আমার মনে পড়িল, বনোয়ারী পাটোয়ারী একবার কথায় কথায় তাহার চাচাতো ভাইয়ের কথা তুলিয়াছিল। উঠাইবার কারণ,আজমাবাদের সদর কাছারিতে-অর্থাৎ আমি যেখানে থাকি-সেখানে একজন মুহুরীর পদ খালি ছিল। বলিয়াছিলাম একটা ভালো লোক দেখিয়া দিতে। বনোয়ারী দুঃখ করিয়া বলিয়াছিল,লোক তো তাহার সাক্ষাৎ চাচাতো ভাই-ই ছিল,কিন্তু লোকটা অদ্ভুত মেজাজের,এক রকম খামখেয়ালি উদাসীন ধরনের। নইলে কায়েথী হিন্দিতে অমন হস্তাক্ষর, অমন পড়ালেখার এলেম্ এ-অঞ্চলের বেশি লোকের নাই।
জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম,কেন,সে কি করে?
বনোয়ারী বলিয়াছিল-তার নানা বাতিক হুজুর,এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ানো এক বাতিক। কিছু করে না,বিয়ে-সাদি করেছে,সংসার দেখে না,বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়,অথচ সাধু-সন্নিসিও নয়,ঐ এক ধরনের মানুষ।
এই তাহা হইলে বনোয়ারীলালের সেই চাচাতো ভাই ?
কৌতূহল বাড়িল, বলিলাম - ও কি পুঁতছ ওখানে ?
লোকটা বোধ হয় গোপনে কাজটা করিতেছিল,যেন ধরা পড়িয়া লজ্জিত ও অপ্রতিভ হইয়া গিয়াছে এমন সুরে বলিল- কিছু না, এই - একটা গাছের বীজ-
আমি আশ্চর্য হইলাম। কি গাছের বীজ?ওর নিজের জমি নয়,এই ঘোর জঙ্গল,ইহার মাটিতে কি গাছের বীজ ছড়াইতেছে- তাহার সার্থকতাই বা কি?কথাটা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম।
বলিল- অনেক রকম বীজ আছে হুজুর,পূর্ণিয়ায় দেখেছিলাম একটা সাহেবের বাগানে ভারি চমৎকার বিলিতি লতা- বেশ রাঙা রাঙা ফুল! তারই বীজ,আরো অনেক রকম বনের ফুলের বীজ আছে,দূর দূর থেকে সংগ্রহ করে এনেছি,এখানকার জঙ্গলে ও-সব লতাফুল নেই। তাই পুঁতে দিচ্ছি,গাছ হয়ে দু-বছরের মধ্যে ঝাড় বেঁধে যাবে, বেশ দেখাবে।
লোকটার উদ্দেশ্য বুঝিয়া তাহার উপর আমার শ্রদ্ধা হইল। লোকটা সম্পূর্ণ বিনা-স্বার্থে একটা বিস্তৃত বন্যভূমির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিবার জন্য নিজের পয়সা ও সময় ব্যয় করিতেছে,যে বনে তাহার নিজের ভূস্বত্ব কিছুই নাই- কি অদ্ভুত লোকটা!
যুগলপ্রসাদকে ডাকিয়া এক গাছের তলায় দুজনে বসিলাম। সে বলিল- আমি এর আগেও এ কাজ করেছি হুজুর,লবটুলিয়াতে যত বনের ফুল দেখেন,ফুলের লতা দেখেন,ওসব আমি আজ দশ-বারো বছর আগে কতক পূর্ণিয়ার বন থেকে,কতক দক্ষিণ ভাগলপুরের লছমীপুর স্টেটের পাহাড়ি জঙ্গল থেকে এনে লাগিয়েছিলাম। এখন একেবারে ও-সব ফুলের জঙ্গল বেঁধে গিয়েছে।
- তোমার কি এ কাজ খুব ভালো লাগে ?
- লবটুলিয়া বইহারের জঙ্গলটা ভারি চমৎকার জায়গা - ওইসব ছোটখাটো পাহাড়ের গায়ে কি এখানকার বনে-ঝোপে নতুন নতুন ফুল ফোটাব, এ আমার বহুদিনের শখ।
- কি ফুল নিয়ে আসতে?
- কি করে আমার এদিকে মন গেল, তা একটু আগে হুজুরকে বলি। আমার বাড়ি ধরমপুর অঞ্চলে। আমাদের দেশে বুনো ভাণ্ডীর ফুল একেবারেই ছিল না। আমি মহিষ চরিয়ে বেড়াতাম ছেলেবেলায় কুশীনদীর ধারে ধারে, আমার গাঁ থেকে দশ-পনেরো ক্রোশ দূরে। সেখান থেকে বীজ নিয়ে গিয়ে দেশে লাগাই, এখন আমাদের অঞ্চলের পথের ধারে বনঝোপ কি লোকের বাড়ির পেছনে পোড়ো জমিতে ভাণ্ডীর ফুলের একেবারে জঙ্গল। সেই থেকে আমার এই দিকে মাথা গেল। যেখানে যে ফুল নেই,সেখানে সেই ফুল,গাছ,লতা নিয়ে পুঁতব,এই আমার শখ। সারাজীবন ওই করে ঘুরেছি। এখন আমি ও-কাজে ঘুণ হয়ে গেছি।
যুগলপ্রসাদ দেখিলাম এদেশের বহু ফুল ও সুদৃশ্য বৃক্ষলতার খবর রাখে। এ বিষয়ে সে যে একজন বিশেষজ্ঞ,তাহাতে আমার সন্দেহ রহিল না। বলিলাম - তুমি এরিস্টলোকিয়া লতা চেন ?
তাহাকে ফুলের গড়ন বলিতেই সে বলিল,হংসলতা?হাঁসের-মতো-চেহারা ফুল হয় তো?ও তো এ দেশের গাছ নয়। পাটনায় দেখেছি বাবুদের বাগানে।
তাহার জ্ঞান দেখিয়া আশ্চর্য হইতে হয়। নিছক সৌন্দর্যের এমন পূজারীই বা ক’টা দেখিয়াছি?বনে বনে ভালো ফুল ও লতার বীজ ছড়াইয়া তাহার কোনো স্বার্থ নাই, এক পয়সা আয় নাই,নিজে সে নিতান্তই গরিব,অথচ শুধু বনের সৌন্দর্য-সম্পদ বাড়াইবার চেষ্টায় তার এ অক্লান্ত পরিশ্রম ও উদ্বেগ।
আমায় বলিল-সরস্বতী কুণ্ডীর মতো চমৎকার বন এ অঞ্চলে কোথাও নেই বাবুজী। কত গাছপালা যে আছে,আর কি দেখেছেন জলের শোভা! আচ্ছা,আপনি কি বিবেচনা করেন এতে পদ্ম হবে পুঁতে দিলে ?ধরমপুরের পাড়াগাঁ অঞ্চলে পদ্ম আছে অনেক পুকুরে। ভাবছিলাম গেঁড় এনে পুঁতে দেব।
আমি তাহাকে সাহায্য করিতে মনে মনে সঙ্কল্প করিলাম। দুজনে মিলিয়া এ বনকে নতুন বনের ফুলে,লতায়,গাছে সাজাইব,সেদিন হইতে ইহা আমাকে যেন একটা নেশার মতো পাইয়া বসিল। যুগলপ্রসাদ খাইতে পায় না,সংসারে বড় কষ্ট,ইহা আমি জানিতাম। সদরে লিখিয়া তাহাকে দশ টাকা বেতনে একটা মুহুরীর চাকুরি দিলাম আজমাবাদ কাছারিতে।
সেই বছরে আমি কলিকাতা হইতে সাটনের বিদেশী বন্য পুষ্পের বীজ আনিয়া ও ডুয়ার্সের পাহাড় হইতে বন্য জুঁইয়ের লতার কাটিং আনিয়া যথেষ্ট পরিমাণে রোপণ করিলাম সরস্বতী হ্রদের বনভূমিতে। কি আহ্লাদ ও উৎসাহ যুগলপ্রসাদের! আমি তাহাকে শিখাইয়া দিলাম এ উৎসাহ ও আনন্দ যেন সে কাছারির লোকের কাছে প্রকাশ না করে। তাহাকে তো লোকে পাগল ভাবিবেই, সেইসঙ্গে আমাকেও বাদ দিবে না। পর বৎসর বর্ষার জলে আমাদের রোপিত গাছ ও লতার ঝাড় অদ্ভুতভাবে বাড়িয়া উঠিতে লাগিল। হ্রদের তীরের জমি অত্যন্ত উর্বর,গাছপালাগুলিও যাহা পুঁতিয়াছিলাম,এদেশের আবহাওয়ার উপযোগী। কেবল সাটনের বীজের প্যাকেট লইয়া গোলমাল বাধিয়াছিল। প্রত্যেক প্যাকেটের উপর তাহারা ফুলের নাম ও কোনো কোনো স্থলে এক লাইনে ফুলের সংক্ষিপ্ত বর্ণনাও দিয়াছিল। ভালো রং ও চেহারা বাছিয়া বাছিয়া যে বীজগুলি লাগাইলাম, তাহার মধ্যে ‘হোয়াইট বিম’ ও ‘রেডক্যাম্পিয়ন্’ এবং ‘স্ট্রিচওয়ার্ট’ অসাধারণ উন্নতি দেখাইল। ‘ফক্সগ্লাভ’ ও ‘উড-অ্যানিমোন্’ মন্দ হইল না। কিন্তু অনেক চেষ্টা করিয়াও ‘ডগ রোজ’ বা ‘হনিসাক্ল্’-এর চারা বাঁচাইতে পারা গেল না।
হলদে ধুতুরা-জাতীয় এক প্রকার গাছ হ্রদের ধারে ধারে পুঁতিয়াছিলাম। খুব শীঘ্রই তাহার ফুল ফুটিল। যুগলপ্রসাদ পূর্ণিয়ার জঙ্গল হইতে বন্য বয়ড়া লতার বীজ আনিয়াছিল,চারা বাহির হইবার সাত মাসের মধ্যেই দেখি কাছাকাছি অনেক ঝোপের মাথা বয়ড়া লতায় ছাইয়া যাইতেছে। বয়ড়া লতার ফুল যেমন সুদৃশ্য, তেমনি তাহার মৃদু সুবাস।
হেমন্তের প্রথমে একদিন দেখিলাম বয়ড়া লতায় অজস্র কুঁড়ি ধরিয়াছে।
যুগলপ্রসাদকে খবরটা দিতেই সে কলম ফেলিয়া আজমাবাদ কাছারি হইতে সাত মাইল দূরবর্তী সরস্বতী হ্রদের তীরে প্রায় দৌড়িতে দৌড়িতেই আসিল।
আমায় বলিল- লোকে বলেছিল হুজুর,বয়ড়া লতা জন্মাবে,বাড়বেও বটে,কিন্তু ওর ফুল ধরবে না। সব লতায় নাকি ফুল ধরে না। দেখুন কেমন কুঁড়ি এসেছে।
হ্রদের জলে ‘ওয়াটার ক্রোফ্ট’ বলিয়া এক প্রকার জলজ ফুলের গেঁড় পুঁতিয়াছিলাম। সে গাছ হু-হু করিয়া এত বাড়িতে লাগিল যে,যুগলপ্রসাদের ভয় হইল জলে পদ্মের স্থান বুঝি ইহারা বেদখল করিয়া ফেলে।
বোগেনভিলিয়া লতা লাগাইবার ইচ্ছা ছিল,কিন্তু শহরের শৌখিন পার্ক বা উদ্যানের সঙ্গে এতই ওর সম্পর্কটা জড়ানো যে আমার ভয় হইল স্বরস্বতী কুণ্ডীর বনে ফুলে-ভরা বোগেনভিলিয়ার ঝোপ উহার বন্য আকৃতি নষ্ট করিয়া ফেলিবে। যুগলপ্রসাদেরও এসব বিষয়ে মত আমার ধরনের। সেও বারণ করিল।
অর্থব্যয়ও কম করি নাই। একদিন গনোরী তেওয়ারীর মুখে শুনিলাম,কারো নদীর ওপারে জয়ন্তী পাহাড়ের জঙ্গলে একপ্রকার অদ্ভুত ধরনের বনপুষ্প হয়- ওদেশে তার নাম দুধিয়া ফুল। হলুদ গাছের মতো পাতা,অত বড়ই গাছ- খুব লম্বা একটা ডাঁটা ঠেলিয়া উঁচুদিকে তিন-চার হাত ওঠে। একটা গাছে চার-পাঁচটা ডাঁটা হয়,প্রত্যেক ডাঁটায় চারটি করিয়া হলদে রঙের ফুল ধরে-দেখিতে খুব ভালো তো বটেই,ভারি সুন্দর তার সুবাস! রাত্রে অনেক দূর পর্যন্ত সুগন্ধ ছড়ায়। সে ফুলের একটা গাছ যেখানে একবার জন্মায় দেখিতে দেখিতে এত হু-হু করিয়া বংশ বৃদ্ধি হয় যে,দু-তিন বছরে রীতিমতো জঙ্গল বাঁধিয়া যায়।
শুনিয়া পর্যন্ত আমার মনের শান্তি নষ্ট হইল। ঐ ফুল আনিতেই হইবে। গনোরী বলিল,বর্ষাকাল ভিন্ন হইবে না;গাছের গেঁড় আনিয়া পুঁতিতে হয়-জল না পাইলে মরিয়া যাইবে।
পয়সা-কড়ি দিয়া যুগলপ্রসাদকে পাঠাইলাম। সে বহু অনুসন্ধানে জয়ন্তী পাহাড়ের দুর্গম জঙ্গল হইতে দশ-বারো গণ্ডা গেঁড় যোগাড় করিয়া আনিল।” - (অষ্টম পরিচ্ছেদ,৪র্থ অধ্যায়,আরণ্যক)
একটু বড় হয়ে গেল কোট-আনকোট। কিন্তু আশা করি যুগলপ্রসাদের খানিক পরিচয় দিতে পারলাম। এই সেই লেখাপড়া জানা একজন মানুষ যিনি লবটুলিয়া বইহারের জঙ্গলে সরস্বতী কুণ্ডের চতুর্দিক সাজিয়ে তোলেন নানান ফুলে। আজকালকার এই স্বার্থমাখা সময়েও এমন চরিত্র হয়ত আশা করাও অন্যায় তবুও আমি সেদিন আরেক যুগলপ্রসাদ’কে মন দিয়ে চিনে নিলাম,হয়তো বা পেয়েই গেলাম কলকাতার অবনীন্দ্র সভাগৃহে। “এপার ওপার ইছামতী” পত্রিকা প্রকাশের মাহেন্দ্রক্ষণে।
আধুনিক এই জলজ্যান্ত এক ‘যুগলপ্রসাদ’ হলেন শ্রী কমল চক্রবর্তী মহাশয়। সতেজ, ঋজু, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সত্তোরোর্ধ এক যুবক। যিনি টিসকো’র মত বিখ্যাত কোম্পানীর চাকরী অবহেলায় ছেড়ে দিয়ে গড়ে তুললেন এক অরণ্য শুষ্ক পুরুলিয়ার টাঁড় প্রান্তরে। আমার যুগলপ্রসাদ তো শুধুমাত্র জঙ্গলে ফুল ফোটাতো। আর এই আধুনিক যুগলপ্রসাদ জঙ্গল বানিয়ে ফোটালেন ফুল। আনলেন হাজার হাজার পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি, পোকামাকড় আর জন্তুজানোয়ারদের। এই গড়ে ওঠা অরণ্যে’র নাম রাখলেন “ভালোপাহাড়”। সেখানকার আদিবাসীদের চেনালেন বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথকে। হিমালয়ের পাহাড়ে ব্রহ্মকমল ফোটে জানি, দেখি নি এখনো। কিন্তু আমি স্বর্ণকমলকে দেখলাম সেদিন কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। এই “ভালোপাহাড়” তৈরীর গোড়ার দিকের কথা একটু জেনে নিই ওনাদের গ্রুপের আর একজন শ্রী বারিন ঘোষালের লেখা থেকে...।
“আজকের ভালোপাহাড় তো আর একদিনে হয়নি, এটা কোন ধনী মানুষের ব্যক্তিগত
রিসর্টও নয়। যারা এসেছেন, ভালবেসেছেন, সবাই তাদের স্বপ্ন দিয়ে গেছেন এখানে। সেই সব স্বপ্ন জমে আছে আমাদের
স্বপ্নের ওপর। মানুষের অনুদানে, মানুষের পরিশ্রমে তিল তিল
করে গড়ে উঠেছে গত ৪৭ বছর ধরে।
৪৭ বছর ? একটু বিশদ বলা যাক। একটা কবিতা লেখার মতো। কি লিখব জানা নেই। শুরু করে দিলে পরতে পরতে গড়ে ওঠে যেমন খুশি। এই খুশিটাই আসল। তোমার যা মন চায় করতে পারো। কেবল পজিটিভ চিন্তা থাকলেই হল। এখানে যারা থাকে তাদের মধ্যে সদস্যদের খুশিমতো কাজ করার কোন বাধা নেই। শুরুয়াতটা ছিল কষ্টের। এখন গড়গড়িয়ে চলছে। কে জানে এর শেষ কোথায় !
১৯৬৮ সালে জামশেদপুরে এক বর্ষায় আমরা ৫ জন একত্র হয়েছিলাম আড্ডা, কবিতা, গল্প, নাটক, পাঠচক্র, গান, ভ্রমণ, প্রেম, পত্রিকা, বিখ্যাত সাহিত্যিকদের নিয়ে অনুষ্ঠান ইত্যাদি করার জন্য। সবাই তখন বেকার। আমি, কমল চক্রবর্তী, সুভাষ ভট্টাচার্য, অরুণ আইন, শক্তিপদ হালদার আমাদের এই পাঁচজনকে বলা হত পঞ্চপান্ডব। কমলের লেখা একটা নাটক করতে গিয়ে দলের নাম দেবার কথা উঠলে কমলই নাম দিলো পঞ্চপান্ডবের উল্টো, কৌরব। দেবজ্যোতি দত্ত জয়েন করল। বাংলার পুরুলিয়া থেকে বনগাঁ, ডায়মন্ডহারবার থেকে দার্জিলিং চষে বেড়াতাম কবিসঙ্গ করতে, প্রকৃতির কোলে গড়াগড়ি খেতে। শান্তিনিকেতন আর পান্নালাল দাশগুপ্তর টেগোর সোসাইটি আমাদের মন কেড়েছিল। ১৯৭১-এ কৌরব পত্রিকা বেরলো, সেই থেকে আজও চলছে। পাহাড় জঙ্গল সমুদ্রতীরে গিয়ে কৌরবের কবিতার ক্যাম্পে সবাই দু-তিনদিন সংসার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, কেবল কবিরা মিলে একসাথে সহযাপন করতাম। ক্রমে বহিরাগত কবিরাও যোগ দিতো ক্যাম্পে। সে থেকে একটু একটু করে জমা হতে থাকল স্বপ্নেরা আর সেই স্বপ্নপূরণের ইচ্ছেরা। জমে জমে তা পাহাড় হয়ে গেছে। ভাবতাম পরিবেশ, জলবায়ু, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভৃতির দূষণমুক্ত কোন অমল স্বর্গে আমরা থাকব। অনেক জায়গা চষে বেড়ালাম তার খোঁজে। ধীরে ধীরে হৃদয়ঙ্গম হল যে আমাদের চারপাশের পৃথিবীতে দূষণমুক্ত জায়গা পাওয়া অসম্ভব। ফলে স্থির করা হল একটা নতুন জায়গা তৈরি করে নিতে হবে, নতুন পৃথিবী। যা আগে কেউ দ্যাখেনি, ভাবেনি। যেমন আমরা কৌরব পত্রিকা করেছিলাম যার কোন উদাহরণ ছিল না,আজও নেই। জামশেদপুরে কোন পত্রিকাই ছিল না। আমরা শুরু করেছিলাম স্ক্র্যাচ থেকে, করে তুলেছিলাম বাংলার শ্রেষ্ঠ। তেমনি আবার আমরা শুরু করব শূন্য থেকে। সেজন্য আমাদের চাই টাঁড় জমি, একলপ্তে অনেকটা, যেখানে গাছ দূরের কথা, এক চিলতে ঘাসও চাই না, গরু ছাগল চরে না, সাপ খোপ নেই, পাখি নেই। সব আমরাই গড়ে তুলব। অবশেষে আমাদের স্বপ্নের পাহাড় একদিন প্রাণ পেলো। নতুন স্বপ্নের জন্ম হল। একটাই স্বপ্ন এতজন দ্যাখে কী করে, পোষে কী করে জানি না। তবে একদিন তা অবয়ব পেতে শুরু করল।”
“শচীন দত্ত,আমাদের পরিচিত এক গ্রামীন কবি, গাড়িগ্রামের, জামশেদপুর থেকে ৬০ কিমি দূরে বান্দোয়ানের কাছে তার ৪০ বিঘা অনাবাদী জমি বিক্রি করতে চায়। আমরা খুঁজছি শুনে খবর দিলো। এসে দেখি ডাঙরজুরি গ্রামের কাছে বড় রাস্তার ধারে এই ঢালু জমি,নিচে একটা তিরতিরে নদী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য,যেখানে গাছ নেই, ঘাস নেই, জল নেই, যেন কোনকালে চাষ হয়নি। কমলকে বললাম, কোন কথা হবে না, আগে কিনে ফ্যাল। আমার বাড়িতে সাতজন একত্র বসে আলোচনা করে আমাদের ব্যক্তিগত টাকা জড়ো করে দাদন দেয়া হল জমির। তখন ১৯৯৬ সাল, এপ্রিল। কাছের টেগোর সোসাইটিকে গিয়ে বললাম --- গাছ লাগাবো, চারা দিন। তারা ৫০টা চারা দিলেন আর চারা পিছু পোঁতার খরচ ৫০ পয়সা। সেই শালের চারা লাগানো হল মাঠে লাইন করে, নিচের নদী থেকে জল টেনে। তখন আমরা অফিস করি। রবিবার আর ছুটির দিন আসা যেত। পরের সপ্তাহে গিয়ে দেখি অর্ধেক ছাগল খেয়েছে, অর্ধেক জলাভাবে শুকিয়ে। এখান থেকে ৫ কিমি দূরে দুয়ারসিনিতে হেঁটে যেতাম লাঞ্চ করতে, ডাল আর মুড়ি। তাই পাওয়া যেত তখন।
পরের বার ৫০০ চারা সংগ্রহ করলাম। কাছের গ্রাম থেকে দুজন লোক রাখা হল গাছ লাগানো আর রোজ দিনের বেলা জল আর পাহারা দেবার জন্য। গরু-ছাগলরা সময় বদলালো। সন্ধের মুখে তারা আর রাতের বেলা গাছচোর। মাঠ পরিষ্কার প্রায়। বর্ষাকাল আগত। জল জমাবার জন্য পুকুর খোঁড়া হল। সেই মাটি দিয়ে ঘর বানিয়ে ছাউনি দিয়ে আমাদের লোকেরা সেখানে দিনরাত। আমরা গেলে খিচুড়ি রেঁধে দিতো। গাছ লাগানো আর তাকে বাঁচিয়ে রাখাও শেখার ব্যাপার। সেই প্রথম আমাদের ঘর হল। এখন সেটি নেই। পুকুরটা আছে। প্রথম বাগান শিশু, শাল, সেগুন, মেহগনি, সোনাঝুরির।
ক্রমে গাছের সংখ্যা বেড়ে হল প্রায় দু-লক্ষ। জমি ৭০ একর।
বাড়ি গাড়ি সব হল। লেগে থাকলাম সমানে। ভালোপাহাড়ে সময় দেবার জন্য চাকরি ছেড়ে দিলাম
আমি,কমল আর দেবজ্যোতি। ২০০০ সাল।...”
“......এই যে কমলকে দেখছেন। সংসার নেই,পরিবার নেই,সারা দিনরাত বছরের পর বছর এখানে থাকছে শুধু যা খুশি করবে বলে। কেউ বিশ্বাস করবেন ও বঙ্কিম পুরস্কার পেয়েছে ?দেখুন ওকে,কেমন ভাবে দাড়িতে আঙুল চলছে আর স্বপ্নের ঘোরে কথা বলে চলেছে ,মাঝে মাঝে বলছে --- জয় বৃক্ষনাথ,জয় বৃক্ষনাথ ... জয়”
আমার মন প্রাণ সার্থক হল সেদিন। প্রায় পঞ্চাশ বছরের এক স্বপ্নকে আবিষ্কার করতে পেরে। বাকি রইল “ভালোপাহাড়” যাওয়া। আশা করি তাও সার্থক হয়ে যাবে কমল’দার সাহচর্য্যে।
( ২ )
এ গল্প আরেক “যুগলপ্রসাদ”-এর। দেখা হল পরশুদিন।
অবসর নেবার পর থেকেই আমার সক্কালবেলার কিছুটা সময় কাটে
আমাদের পাড়া’র গোপাল’দার চা-এর দোকানে। গোপাল’দা দোকান খোলেন রোজই ভোর চারটেয়। সামনেই
বি. টি. রোড। ঘন্টায় ঘন্টায় বিভিন্ন পেশার মানুষজনের অতি প্রিয় এই চা-এর দোকান।
ভোরবেলায় যাঁরা শিয়ালদা কিংবা পাতিপুকুরের বাজারে যান জিনিষ কিনতে তাঁদের দিয়েই
শুরু হয় গোপাল’দার দৈনন্দিন চা ব্যবসা। এইভাবে ঠিক নির্দিষ্ট সময় অন্তর খদ্দের
পালটে পালটে যায় নিয়মমাফিক যেন। আমি যাই বেশ বেলায়। তখন আবার নতুন ব্যাচ। কে নেই
সেখানে ! আমাদের অঞ্চলকে হাতের তালুর মত
চিনে নেওয়া যায় এখানে এসে কিছুক্ষন বসলেই। আর পাওয়া যায় একেবারে টাটকা তাজা খবর
সব। সকালের বাজারের ফ্রেশ তরি-তরকারীর মতোই।
এখানে বসেই আমি আড্ডা মারি সেই অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত মশাই-এর সেই “ছন্নছাড়া”-দের সাথে। এর সাথেই এসে চা খেয়ে যায় আমাদের উল্টোদিকের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিট্যুইটে’র সব ছাত্র-ছাত্রীরা। ওদের আলোচনার সূত্র যখনই বেরিয়ে যায় মাথার ওপর দিয়ে তখন বুঝতে পারি, অল্প হলেও আমরা এই সব আইনস্টাইনে’র শিষ্যদের সাথে একই ভাঙা বেঞ্চিতে বসে নিত্যিদিন গোপাল’দার গরম অমৃত পান করে চলি। এরই মাঝে কারো কারো সাথে অন্তরঙ্গতা তৈরি হয়। আর এই ইন্সটিট্যুইটে’র মাষ্টারমশাইরা যখন এসে বসেন, আড্ডা মারেন আমাদের সাথে তখন সত্যি সত্যিই মনে হয় যে, হয়তো এমনই ছিল সেই “আগন্তুক” সিনেমায় দেখা ছোটমামার মুখের বর্ণনা। আজ থেক আড়াই হাজার বছর আগে এথেন্সের জিমন্যাসিয়াম বা আখড়ায় বসতো আলোচনা বা আড্ডা’র আসর। সক্রেটিস, প্লুটো ইত্যাদি সব বিদ্বান মানুষজন আলোচনা করতেন দর্শন, অঙ্ক, রাজনীতি, সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে। সেখানে মন আর শরীর এই দুই এরই চর্চা হ’ত এই সব আখড়ায়। আমাদের গোপালদা’র চা-এর দোকানে মাঝে মাঝে এমন কথা মনে পড়লে সত্যিই আনমনা হয়ে যাই। অর্জুন নামের যে ছেলেটি রিক্সা চালায় অথচ সাবলীল ভাবে আমাদের পাশে বসেই চা খায় তখন বুঝতে পারি যে, কিছুটা হলেও সাম্যবাদ এসেছে এ পোড়া দেশে !
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে যে দ্বন্দমূলক বস্তুবাদের
আলোছায়ায় ‘যুগলপ্রসাদ’-দের কোন শ্রেণীতে ফেলবো ?
পৃথিবীটা যদি সাম্যবাদী হয়ে যায় সুদূর কোনো এক দিনে – যুগলপ্রসাদেরা সেদিন
কি আপন আনন্দে অরণ্যে ফুল ফোটাবে তো ?
“রাত কত হল?
উত্তর মেলে না।
কেননা, অন্ধ
কাল যুগ-যুগান্তরের গোলকধাঁধায় ঘোরে, পথ অজানা,
পথের শেষ কোথায় খেয়াল নেই।
...
...
...
পথ যেন নিজের অর্থ নিজে জানে,
পায়ের তলার ধূলিও যেন নীরব
স্পর্শে দিক চিনিয়ে দেয়।
স্বর্গপথযাত্রী নক্ষত্রের দল
মূক সংগীতে বলে, সাথি, অগ্রসর হও।
অধিনেতার আকাশবাণী কানে আসে-- আর বিলম্ব নেই।” - ( শিশুতীর্থ – রবীন্দ্রনাথ )
বড় গম্ভীর হয়ে গেল যেন লেখার অভিমুখ ! গল্পে ফিরি আবার !
এই তো সেদিন, জমিয়ে মুখে মারিতং জগৎ পুরো মাত্রায়, পরনিন্দা পরচর্চা ফোটা পদ্মের মতো সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়। এ হাত থেকে ও হাতে ঘুরছে সংবাদপত্রের এক-একটি পাতা। ধর্ষণ, রাহাজানি, মিটিং, মিছিল আর অগুন্তি মশলাদার চানাচুরে সব্বারই দাঁতগুলো ঠকঠক করছে কথার স্রোতে। সবে শেষ চা-এর ভাঁড়ে চুমুক দিয়েছি কি দিইনি, হঠাৎ দেখি এক প্যান্ট-শার্ট পরা বৃদ্ধ মানুষের এক মাথা পাকা চুলটা নেমে এল আমার হাঁটুর কাছাকাছি ! একটু চমকে গিয়েই দেখলাম, আমাদের পায়ের কাছে পড়ে থাকা অবশিষ্ট সিগারেট-এর ফিল্টার আর বিড়ির অংশগুলো পরম মমতায় এক এক করে তুলে বাঁ-হাতে রাখা একটা ঠোঙায় ভরে ফেললেন। আমাদের অঞ্চলে প্রচুর এমন মানুষ আছেন যাদের খুব সহজেই আমরা ‘পাগলা’ বলে ডেকে থাকি – আমি ভাবলাম ইনিও সেই গোত্রের হবেন। কারণ আমি দেখেছি রাস্তায় পড়ে থাকা বিড়ি বা সিগারেটের টুকরো কুড়িয়ে এমন অনেক মানুষকেই খেতে। কিন্তু এবারে অবাক হওয়ার পালা আমার !
গোপাল’দার দিকে মুখ ফেরাতেই গোপাল’দা বলে উঠলেন – আরে কিছু না। দেখুন, উনি এসব কুড়িয়ে ঐ সামনের নর্দমায় ফেলে দেবেন !
আর হল’ও তাই ! রাস্তার মোড়ে’র নর্দমার একটা খোলা অংশে’র কাছে গিয়ে সেই কাগজটার থেকে সব টুকরোগুলো ফেলে দিলেন সেখানে। আমাদের এখানে সরকারি ডাস্টবিন নেই। থাকলে হয়তো সেখানেই ফেলতেন – মনে হল !
বিদ্যুতচমক খেলে গেল সারা শরীর জুড়ে ! এ কাকে দেখলাম ! এভাবে একটা অসুস্থ নেশা’র যে এইভাবে প্রতিবাদ করা যায় এমন ভাবনা তো মনেই আসেনি কখনো আমার। বেছে বেছে শুধু সিগারেট এর অবশিষ্ট ফিল্টার আর বিড়ি’র টুকরো গুলোই শুধু কুড়িয়ে এ পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে যেতে চাইছেন এই বৃদ্ধ একজন। লজ্জায় সত্যি ঢোঁক গিলে হাতে ধরা সিগারেটটা কোথায় ফেলব এই কথা ভাবতে ভাবতেই আবারই জুতো চেপে সি্গারেট নেভালাম। পরেরদিন আবার এগুলো ঐ বৃদ্ধ মানুষটি পরিষ্কার করবেন বলে ? উত্তর নেই আমার !
গোপাল’দা বললেন উনি রোজ সকালে এসে আমার কাছে চা খান। বুঝলাম পাগল নন !
মনে পড়ল ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের আরেকজনের কথা –
“ধাওতাল সাহু মহাজনের কাছে
আমাকে একবার হাত পাতিতে হইল। আদায় সেবার হইল কম, অথচ দশ হাজার টাকা রেভিনিউ
দাখিল করিতেই হইবে। তহসিলদার বনোয়ারীলাল পরামর্শ দিল, বাকি টাকাটা ধাওতাল সাহুর কাছে
কর্জ করুন। আপনাকে সে নিশ্চয়ই দিতে আপত্তি করিবে না।
...
...
মরিয়া হইয়াই কথাটা বলিয়া ফেলিলাম, বলিতেই যখন হইবে।
ধাওতাল সাহু কিছুমাত্র না ভাবিয়া বলিল-তার জন্যে আর ভাবনা কি হুজুর ? সে হয়ে যাবে এখন, তবে তার জন্যে কষ্ট করে আপনার আসবার দরকার কি ছিল ? একখানা চিরকুট লিখে তহসিলদার সাহেবের হাতে পাঠিয়ে দিলেই আপনার হুকুম তামিল হত।
- সাহুজী, লেখাপড়াটা কিন্তু আমার নামেই করতে হবে। জমিদারের নামে হবে না।
ধাওতাল সাহু আশ্চর্য হইবার সুরে বলিল - লেখাপড়া কিসের ? আপনি আমার বাড়ি বয়ে এসেছেন, সামান্য টাকার অভাব পড়েছে তাই নিতে। এ তো আসবার দরকারই ছিল না, হুকুম করে পাঠালেই টাকা দিতাম। তারপর যখন এসেছেনই- তখন লেখাপড়া কিসের ? আপনি স্বচ্ছন্দে নিয়ে যান, যখন কাছারিতে আদায় হবে, আমায় পাঠিয়ে দিলেই হবে।
বলিলাম - আমি হ্যাণ্ডনোট দিচ্ছি, টিকিট সঙ্গে করে এনেছি। কিংবা তোমার পাকা খাতা বার কর, সই করে দিয়ে যাই।
ধাওতাল সাহু হাত জোড় করিয়া
বলিল - মাপ করুন হুজুর। ও কথাই তুলবেন না। মনে বড় কষ্ট পাব। কোনো লেখাপড়ার দরকার
নেই, টাকা আপনি নিয়ে
যান।
...
...
...
সেদিন যে-টাকা ধাওতাল সাহুর নিকট হইতে আনিয়াছিলাম, তাহা শোধ দিতে প্রায় ছ’মাস দেরি হইয়া গেল- এই ছ’মাসের মধ্যে ধাওতাল সাহু আমাদের ইসমাইলপুর মহালের ত্রিসীমানা দিয়া হাঁটে নাই,পাছে আমি মনে করি যে সে টাকার তাগাদা করিতে আসিয়াছে। ভদ্রলোক আর কাহাকে বলে ! ” -- (পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ, ১ম অধ্যায়, আরণ্যক)
আমরা সভ্য হচ্ছি !
“পাখি নয় যে পড়বে, গরু নয় যে
দুধ দেবে
এ যে আত্মামশায়, পয়ঁত্রিশ
ফর্মুলার মিক্সচার
ব্যবহারের আগে ঝাঁকিয়ে নেবেন, হে-হে
আত্মা
ফিটফাট শার্টের মধ্যে
সাবান-কাচা আত্মা আমার
হ্যাঙ্গারে ঝুলছে, নিখুঁত
কামানো, ইস্ত্রি করা। ” - (আত্মামশায়
– তুষার রায়)
©গৌতম দত্ত
১৩ই জুন, ২০১৭
কলকাতা।
#
কৃতজ্ঞতা :-
১। ঐহিক ওয়েব - স্বপ্নের পাহাড়,ভালোপাহাড় - বারীন ঘোষাল
২। আরণ্যক - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
৩। তুষার রায়ের কাব্যসংগ্রহ
#
http://www.aihik.in/aihik/Article/466/বারীন ঘোষাল স্বপ্নের পাহাড়, ভালোপাহাড়.html
http://jaydiperlekhagalpo.blogspot.in/2013/04/blog-post_29.html
https://sonartoree.wordpress.com/2012/04/10/ek-meshpaloker-rupkatha/
