ধন্যি মেয়ে -


      ১৯৭১। জয়শ্রীতে দেখতে গেছিলাম ধন্যি মেয়ে  যতদূর মনে পড়ে নিঃসন্দেহে দিনটা ছিল শনিবার। জাষ্ট আগের দিনই রিলিজ করেছে গুরুর এই বই-টা। বই শুনে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা একটু হেঁচকি তুলতেই পারে। এখন এরা বলে মুভি। আমরা তখন সিনেমাকে বই বলতেই অভ্যস্ত ছিলাম। জয়শ্রীতে সাধারণত শোটাইম ছিল ২টো, ৫টা আর ৮টা। ম্যাটিনি, ইভিনিং আর নাইট। নিউ তরুনে'ও মনে হচ্ছে তাই-ই ছিল। যাই হোক গুরু মানে উত্তমকুমারের নতুন বই দেখার জন্য উৎসাহ ছিল তুঙ্গে।

জয়শ্রী সিনেমা হলটা এক্কেবার আমাদের স্কুলের প্রায় উলটো পারেই। সুতরাং কবে কখন কি সিনেমা চলছে তা দু-বেলাই স্কুল-যাতায়াতের পথে চোখে পড়তোই। আর তাই আগেই টিকিট কেটে রাখা ছিল। ধন্যি মেয়ের পোষ্টার পড়ে গেছে দেওয়ালে দেওয়ালে। কি দারুণ কাস্টিং !

সাহিত্যিক বনফুল’—এর ভাই শ্রী অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের একটা মিষ্টি বই। জমিদার গোবর্ধন চৌধুরীর ভূমিকায় জহর রায়। মূল নায়ক নায়িকা পার্থ চ্যাটার্জি আর জয়া ভাদুড়ি হলে কি হবে ? আসল তো উত্তমসাবিত্রী জুটি। বগলার দাদা বৌদি। ফুটবল নিয়ে একটা জমজমাটি বাংলা ছবি। কলকাতার কাছাকাছি জগৎবল্লভপুরে তোলা হয়েছিল এই সিনেমার প্রায় অধিকাংশই বহির্দৃশ্য। হারিয়ে যাওয়া হাওড়ার মার্টিন রেল কে এখনো জ্যান্ত দেখা যায় এই সিনেমাটা দেখলে পরে। 

ছবি শুরু গ্রামের একমাত্তর কমেন্টেটর তিন-তিনবার বি.এ. ফেল করা নেড়া। আসলে এই হাড়ভাঙা গ্রামের মানুষ ফুটবল পাগল। তাই আনুসাঙ্গিক সমস্তকিছুরই ব্যবস্থা এ গ্রামে আছে। নেড়ার স্বভাব হল যখন তখন রিলে করা। সবকিছুরই। শুরুতেই সে জানায় যে আগামী ৫-ই সেপ্টেম্বর শীল্ড ফাইনাল খেলা। তাই নেড়া এখন জমিদার গোবর্ধন চৌধুরীর বাড়ির দিকে যেতে যেতে চারদিকের বিবরণ দিতে থাকে। দূরে স্কুলবাড়িযেখানে কলকাতা থেকে আসা ফুটবল টিম-এর থাকার ব্যবস্থা। গ্রামের একমাত্র শিবমন্দির থেকে বেরোচ্ছেন গাঁয়ের একমাত্র পুরুত ভট্টাচাজ্জি মশাই। তিনি চলেছেন চরণামৃত নিয়ে জমিদার বাড়ি। পুরুত মশাই-এর সবকিছু জমিদারের কাছে বাঁধা তাই না গিয়েও উপায় নেই। রিলে চলছে নেড়া ‘……তোতলা ভট্‌চাজ চলেছে্ন। রাস্তা দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ভট্‌চাজ এখন ডান দিকের রাস্তা ধরেছেন। দূরে তালগাছ। নীল আকাশে মেঘ ভাসছে। সামনের মেঠো পথ ধরে চন্নামেত্রের ঘটি হাতে ধরে চলেছেন তোতলা ভট্‌চাজ। সামনে বিরাট অশ্বথ গাছ দৈত্যের মতো দঁড়িয়ে আছে। তোতলা ভট্‌চাজ তার তলা দিয়ে চন্নামেত্রের ঘটি হাতে চলেছেন। গাঁয়ের গেছো মেয়ে মনসা দোল্‌নায় দুলছে। জানেন, গোটা হাড়ভাঙা গ্রামটাই ওর কাছে একটা দোল্‌না। মা বাবা তো কেউ নেই ! মামার বাড়িতে হেলাফেলায় মানুষ। তাই কিরকম জংলী হয়ে গেছে। …”    

       মনসাই এ ছবির আদ্যোপান্তো। গোটা হাড়ভাঙা গাঁ আইবুড়ো মনসার অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। মনসার বাবা মনসার বিয়ের জন্য অনেক টাকা গোবর্দ্ধনের কাছে রেখে গেছিলেন।  শ্বশুরের সেই সব টাকা এখন গোবর্ধন চৌধুরীর কালোবাজারী ব্যবসায় খাটে। ভাগ্নী মনসা অনাদরেই মানুষ। মামা বেশি বেগড়বাই করলে মনসা হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেবার ভয় দেখায় মামাকে। মামা তখন চুপ করে যায়। ছবি এগিয়ে চলে একেবারে কপ্যাক্ট গতিতে।

হাড়ভাঙা গ্রামের আসন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতার ফাইনাল ম্যাচের আগে গ্রামের ধারাবিবরণী-বিশেষজ্ঞ নেড়া, তোতলা পুরোহিত ভট্টাচার্য ও খেলোয়াড় ভোম্বল কলকাতায় আসে ফুটবল, ট্রফি, মন্ত্রের গ্রামাফোন রেকর্ড আর মাইক কিনতে। এদের নিয়ে নেড়া পৌঁছয় কলকাতায়, কামাখ্যা-মামার মাইকের দোকানে। কলকাতায় এসে তারা বুঝতে পারে যে এ শহরে বোধহয় কেউ বাংলায় কথা বলেই না। ভট্‌চাজ মশাই এমনিতেই নার্ভাস মানুষ। এইসব দেখে শুনে বারবার হাড়ভাঙায় ফিরে যেতে চান। হিন্দির আধিপত্য তিনজনকে এতটাই বিভ্রান্ত করে, যে মাইকের দোকানে গিয়ে তারা নিজেরাই প্রথমে হিন্দি ও ইংরাজিতে কথা বলতে শুরু করে। মাইক বিক্রেতা নন্দ-র আ মোলো যা, বলি বাংলায় কথা বলতে কি জিভ খসে যায় ?-এর পর অবশেষে কলকাতায় প্রথম বাংলা-বলা লোক খুঁজে পায় তারা। তাও যেন ভট্‌চাজ মশাইয়ের ধন্দ কাটে না। সরল মনে তিনি বলে বসেন এখানে তো কেউ বাংলায় কথা বলেই না।

এরপরে সর্বমঙ্গলা ক্লাবের ছেলের দল হৈ হৈ করে ট্রেনে চেপে হাড়ভাঙা যেতে থাকে। মান্না দের সেই বিখ্যাত গান সব খেলার সেরা বাঙালির এই ফুটবল গাইতে গাইতে। যাঁরা দেখেছেন বা দেখবেন এ সিনেমা তাঁরা আমাদের কলকাতার মার্টিন বার্ন কোম্পানী বিখ্যাত মার্টিন রেলকে প্রত্যক্ষ করতে পারবেন। এক সময় কলকাতার সন্নিহিত গ্রামের সাথে এক ন্যারো গেজ রেলপথ চালু করেছিলেন স্যার বীরেন মুখোপাধ্যায়। হাওড়া থেকে আমতার মধ্যে ছোট লাইনের সেই ট্রেন পরিচিত ছিল মার্টিন রেল নামে। শুধু আমতা নয়, হাওড়াবাসীর কাছে এই ট্রেন ছিল আপনজনের মতো। কারও বাড়ির উঠোন, কারও বাগানের ভিতর দিয়ে ইঞ্জিনের কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে এগিয়ে যেত সেই রেলগাড়ি। এই রেলগাড়ি নিয়ে অনেক গল্পও চালু রয়েছে। যার একটি হল, আত্মঘাতী হওয়ার জন্য কেউ এই রেলপথে শুয়ে পড়লে চালক ট্রেন থামিয়ে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতেন। কিন্তু ১৯৭০ সালে পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যায় মার্টিন রেল।

সিনেমায় ফিরি। এর মধ্যে নানান টুকরো টুকরো ঘটনা ঘিরে একেবারে আবিষ্ট করে রাখেন পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। জমিদার গোবর্ধন চৌধুরীর পিতা জমিদার ন্যাংটেশ্বর চৌধুরী শীল্ড এর খেলা শুরু হবার আগে খোঁজ পড়ে রেফারি বরেন-এর। জমিদার গোবর্ধন মাঠে যাবার আগে যখন এসব নিয়ে চিন্তায় তখন দেখা গেল রেফারি বরেন মদের নেশায় চুর হয়ে দুজনের কাঁধে চেপে এগিয়ে আসছে। আর কাউকে না পেয়ে অগত্যা পুরুত ভট্‌চাজ কে রেফারি সাজিয়ে মাঠে নামিয়ে দেন জমিদার গোবর্ধন চৌধুরী। গোটা ফুটবল খেলাটা দারুন এক উত্তেজনায় ভরে ওঠে। প্রথমেই এক গোল করে হাড়ভাঙা এগিয়ে থাকে হাফ-টাইম অব্দি। এর মধ্যে মনসার থেকে এগারো জন প্লেয়ারের জন্য এগারো খানা ঘুঁটের মালা পেয়ে জ্বলে ওঠে বগলা। দ্বিতীয়ার্দ্ধে মাঠে নেমে একের পর এক গোল দিতে থাকে বগলা। খেলা দেখতে দেখতে জমিদার গোবর্ধন উত্তেজনায় এমন করতে থাকেন যে, নিজের দল গো-হারান হারছে দেখে প্রতিপক্ষ ক্যাপ্টেন বগলার পায়ে লাঠির খোঁচা মারছেন, সাইডলাইন থেকে নিজের ক্লাবের খেলোয়াড়কে নির্দেশ দিচ্ছেন ক্যাপ্টেনের পায়ে ল্যাং মেরে তাকে আহত করে দিতে, রেফারি করে নামানো তোতলা পুরোহিত লম্বোদর ভটচাযের ফূর্তি দেখে তার উদ্দেশ্যে অসহায় রাগ দেখিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় চেঁচাচ্ছেন পুররর্‌, দাঁড়াও তোমার পুররর্‌ করা আমি বের করছি ! ...রাস্কেল রেফারি হয়েছে! একটা পেনাল্টি দিতে জানে না, রেফারি হয়েছে, স্টুপিড কোথাকার! খেলা ভাঙুক, তারপর তোমার আমি ঠ্যাং ভাঙব ! গোবর্ধন একজনকে বগলাকে ল্যাং মেরে ঠ্যাং ভেঙে দিতে বললে এক প্লেয়ার তাই করে। বগলা ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে খেলতে থাকে। বারো গোল খাবার পর খেলা যখন আর দুমিনিট বাকি তখন প্রবল উত্তেজনায় জমিদার ইচ্ছে করে খেলা পণ্ড করে দেয় মাঠের মধ্যে লোক ঢুকিয়ে দিয়ে।

স্কুলে ফিরে এসে বগলা ছাড়া বাকি সবাই যায় চা খেতে। মনসা কেষ্টদাদার চায়ের দোকানে চূন-হলুদ গরম করতে থাকে একজনের পায়ে লাগানোর জন্যে। এই চায়ের দোকানদার, কেষ্টদা এক অদ্ভুত চরিত্র। এমন চরিত্র সত্যিই আমাদের গাঁ-গঞ্জে দেখা যেত একসময়। সারাদিনে পাঁচ-টাকা বিক্রি হলেই কেষ্টদা দোকান বন্ধ করে দিত, কারণ তার রোজের খরচা ছিল ওই পাঁচ টাকাই। সত্যিই সেসময় বাঙালি খুব অল্পেই সন্তুষ্ট ছিল। পরিচালক সেটা ব্যবহার করেছেন নির্দ্ধিধায়। মনসা চূন-হলুদের বাটি নিয়ে যায় স্কুলে। সেখানে তখন বগলা একলা।

ওদিকে জমিদার গোবর্ধন বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছটফট করতে থাকে। পুরুত ভট্‌চাজ্জের সব কিছু ক্রোক করার আদেশ দেয় জমিদার। এর মধ্যে মনসা ঢোকে বারোখানা ঘুঁটের মালা হাতে। জমিদারের গলায় পরিয়ে দেয় মনসা। বলে সর্বমঙ্গলা ক্লাবের ক্যাপ্টেন পাঠিয়ে দিয়েছে তোমায় পরাতে। জমে ওঠে সিনেমা। গোবর্ধনের মোসাহেব চাটুজ্জ্যের মাথায় হঠাৎ করেই এক প্ল্যান আসে। চাটুজ্জ্যে আর গোবর্ধন বৈঠকখানা ছেড়ে পাশের ঘরে যায় আলোচনা করতে।

এদিকে স্কুলের মধ্যে থাকা সর্বমঙ্গলা ক্লাবের ছেলেদের কাছ থেকে বগলা আর ঘন্টাকে (বগলার দাদার শালা) জোর করে ধরে নিয়ে আসে হাড়ভাঙা গাঁয়ের মস্তান বাহিনী। তাদের নাকি জমিদারের খুব প্রয়োজন। আর বাকি প্লেয়ারদের জন্য আয়োজন হয় রসগোল্লা আর সিদ্ধির শরবত। যা খেয়ে সবকটা প্লেয়ারই অচিরেই গড়াগড়ি দিতে থাকে স্কুলের ঘরে। আর ওদিকে জমিদার বাড়িতে দেখা যায় জমিদার গোবর্ধন চৌধুরীর বন্দুক নল বগলার কপালে। সামনে ধরা পিঁড়িতে বধূবেশী মনসা। বন্দুকের গুঁতোয় সম্পন্ন হয় শুভদৃষ্টি আর মালাবদল।

খবর আসে কলকাতায়। আর তারপরেই ট্যাক্সি চেপে বর-বউ আর ঘন্টেশ্বর এসে পৌঁছয় কলকাতায় কালীগতির বাড়ি। কালীগতি কিছুতেই রাজি নয় এ বিয়ে মেনে নিতে। বগলাকে যখন দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে কালীগতি সে সময় আমরা দেখি মনসার রুদ্ররূপ। জোর করে ছোটদাদাবাবুর ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেয় মনসা। আর বগলা যায় কালীগতির শ্বশুরবাড়ি।

এরপরে নানান মজার দৃশ্যে এগোতে থাকে সিনেমা। কালী, উকিল ফিট করে, বগলার বউ কে তাড়ানোর জন্যে। বগলার বৌদি এর মধ্যেই মনসাকে নিজের বোনের মতোই ভালবেসে ফেলে। বৌদি এই অফসাইড গোল মেনে নিতে গেলে কালীর সাথে সংঘাত শুরু হয়। মনসা নীরবে সই করে দেয় ডিভোর্স পেপারে। কালীকে বলে যে ন্যাংটেশ্বর শীল্ড কালীর কাছে হাড়ভাঙা পৌঁছেই মনসা পাঠিয়ে দেবেকারণ কালীগতির কাছে ভাইয়ের বৌ-এর চেয়ে শীল্ডই বড় যখন ! মনসা ফেরৎ আসে হাড়ভাঙায়। কেষ্টদা গান গাইতে থাকে—‘রাধে মনটারে রেখে এলি বল কোন মথুরায় ?

কালীগতি তার সর্বমঙ্গলা ক্লাবের সাথে এসে পৌঁছয় হাড়ভাঙায়। শীল্ড এর ফাইনাল খেলতে। কলকাতা থেকে বাঘা বাঘা ছ-জন প্লেয়ার আনানোর ব্যবস্থা করে জমিদার গোবর্ধন চৌধুরী। এই সব শুনে মনসা পুরুত ভট্‌চাজ্জের কাছে গিয়ে তার সাহায্য চায়। যাতে সর্বমঙ্গলা জিতে শীল্ড নিয়ে ফিরতে পারে খেলায় জিতে। গাঁয়ের খেলার মাঠে দেখা হয় বগলা আর মনসার। মনসা, বগলাকে অনুরোধ করে একটার বেশি গোল না দিতে।

ফাইনাল খেলা আরম্ভ হয়। জমিদার গোবর্ধন মাঠে না গিয়ে বসে থাকে বৈঠকখানায়। হাফটাইম অব্দি গোলশূন্য থাকার পরে খেলা শুরু হলে পেনাল্টি পায় সর্বমঙ্গলা ক্লাব। কিন্তু কালীর আদেশে বগলা গোলপোস্টের বাইরে শট মারে। শেষ অব্দি এক গোলে জিতে যায় সর্বমঙ্গলা ক্লাব।

ছবির শেষে দেখা যায় যে, শিল্ডটা যখন গোবর চৌধুরিকে দান করে দিয়ে চলে যাচ্ছে কালীগতি দত্ত,  বদলে তার বাড়িতে অত্যাচারিত চিরদুঃখী ভাগ্নি মনসাকে ভ্রাতৃবধূ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন নিজের দুর্বলতা, অন্যায়, পরাজয় সব ঢাকতে ভাঙব তবু মচকাব না-মার্কা সেই অবিস্মরণীয় ডায়লগটা, হেঁ হেঁ, বলিনি, শিল্ড আমি গাঁয়ের বাইরে যেতে দোব ন্না?

নেড়ার রিলে চলতে থাকে। কালীগতি নেড়ার হাত থেকে মাইক কেড়ে নিয়ে হাড়ভাঙা গাঁয়ের সব্বাইকে কলকাতায় যাবার নেমন্তন্ন করেন বগলা আর মনসার বিয়েতে।

*

উত্তমকুমার যখন ধন্যি মেয়ে ছবি করেন তখন তাঁর বয়স পয়ঁতাল্লিশ কি ছেচল্লিশ। টানা নায়কের রোল থেকে আস্তে আস্তে সরে আসছেন তখন বিভিন্ন পার্শ্বচরিত্রে। তবুও সে সব সিনেমা দর্শক টানত শুধুই ওই মানুষটার নামেই। এ ছবির কালীগতি উত্তমকুমারের এক অবিস্মরনীয় সৃষ্টি। একটা অদ্ভুত টিপিক্যাল স্টাইলের চরিত্র। সংলাপের সুর সর্বদাই এক উঁচু পর্দায় বাঁধা যেখান থেকে নিমেষের জন্যেও বিচ্যুতি খুঁজে পাওয়া দায়। এই সময় থেকেই ধারাবাহিক ভাবেই ঝুঁকে পরেন বিভিন্ন স্বাদের চরিত্রায়নে। যা আমাদের বাংলা সিনেমার অভিনয় ধারাকে আরোই সমৃদ্ধ করেছিল সেসময়। 

এখনো যদি ধন্যি মেয়ে টিভি'তে হঠাৎ চোখে পড়ে যায় তাহলে রিমোট হাত থেকে ফেলে দিতে হবে এমনই আকর্ষণ এই সিনেমাটার। এ ছবিতে উত্তম ছাড়াও সব্বাই যেন মারকাটারি ! গুরু'র সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে সাবিত্রী। অবশ্য কেউই কম যান না এ ছবিতে। গ্রামের পুরোহিত ভট্‌চাজ এর সেই টিকি মাথা চরিত্র যখন ফুটবল ম্যাচের রেফারি হয়ে যান জমিদার গোবর্ধন চৌধুরীর আদেশে, তার ব্যথাবেদনাআনন্দ সব কিছু মিলিয়ে এক অসাধারন সৃষ্টি রবি ঘোষের এই চরিত্রটি। জয়া ভাদুড়িকে আমি প্রথম দেখি বাংলা সিনেমায় এই ছবিতে মনসা চরিত্রে। বাপমা হারা গ্রামের এই প্রানোচ্ছল মেয়েটি জমিদার মামার কাছে মানুষ হলে কি হবে, মেজাজ মার্জিতে এক্কেরে ঝাঁসির রানী ! কি সব অভিনেতা অভিনেত্রী ছিলেন আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রে ! আমরা খুব ভাগ্যবান যে বাংলা সিনেমার সুবর্ণ যুগের অভিনয় আমরা প্রাণ ভরে দেখতে পেয়েছি। এই ছবিতে একটা ছোট্ট রোল মনি শ্রীমানিকামাখ্যা। একটা কানে কম শোনা মানুষ যিনি আবার কিনা মাইক ইত্যাদির দোকানদার। কি অসামান্য অভিব্যক্তি ঐটুকু ছোট্ট সময়ের অভিনয়ে !

ধন্যি মেয়ে ছবিতে মনসার রোলটার জন্য প্রথমে নাকি মৌসুমী চ্যাটার্জির কথাই ভাবা হয়েছিল৷ কিন্তু মৌসুমী ডেট দিতে পারছিলেন না৷ তখন নতুন কারও খোঁজ শুরু করেন অরবিন্দবাবু৷ দাদা বনফুল এবং তিনি নিজে দীর্ঘ দিন বিহারের ভাগলপু্রে ছিলেন৷ তাঁদের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ছিল অপর প্রবাসী বাঙালি তরুণ ভাদুড়ির৷ তিনি মধ্যপ্রদেশে থাকতেন৷ তরুণবাবুর মেয়ে জয়া তত দিনে পুণে থেকে অভিনয়ে পাশ করে গিয়েছেন৷ সত্যজিত্ রায়ের মহানগর ছবিতে অনিল চ্যাটার্জির বোনের ভূমিকায় অভিনয়ও করেছেন৷ তাঁকেই নায়িকা করতে চাইলেন অরবিন্দবাবু৷ অনেকেই বললেন, জয়া ঠিক নায়িকার মতো নয়৷ কিন্তু ছবিতে বঁটি হাতে চিন্ময়কে তাড়া করার দৃশ্য দেখে সকলেই বলেন, ঢুলুদা ঠিক মেয়েকেই বেছেছেন৷

দেবাংশু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনী নিয়ে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। এ ছবির সুর সংযোজনে চির পরিচিত নচিকেতা ঘোষ। গান লিখেছেন প্রণব রায় ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।

অভিনয়ে

উত্তম কুমার - কালীগতি দত্ত।
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় - কালীগতির স্ত্রী।
জহর রায় – জমিদার গোবর্ধন চৌধুরী।
অনুভা ঘোষ - গোবর্ধন চৌধুরী’র স্ত্রী। 
রবি ঘোষ – পুরুত ভট্‌চাজ।
জয়া ভাদুড়ী – মনসা।
তপেন চট্টোপাধ্যায় - ঘণ্টেশ্বর।
শিবানী বসু – ঘণ্টেশ্বরের স্ত্রী। 
পার্থ মুখোপাধ্যায় – বগলা।
সুখেন দাস - রিলে মাষ্টার নেড়া। 
তরুনকুমার – কালীগতির হাউস ফিজিশিয়ান। 
চিন্ময় রায় – কালীগতির উকিল। 
হরিধন মুখোপাধ্যায় – মোসাহেব চাটুজ্জ্যে। 
শ্যাম লাহা – নফর ঘোষ।
সুনীল দাশগুপ্ত – বৈরাগী। 
নৃপতি চট্টোপাধ্যায় | শ্যাম লাহা  প্রভৃতি |  

পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুন।  পিতা ডাঃ সত্যচরণ মুখোপাধ্যায়ের কর্মক্ষেত্র ও স্থায়ী বাসস্থান বিহারের পূর্ণিয়া বিভাগের কাটিহার জেলার মণিহারীতে। মাতা মৃণালিনী দেবী। এঁদের আদি পৈতৃক  নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার শিয়াখালায়। অরবিন্দের পড়াশোনা কাটিহারে। স্থানীয় স্কুল থেকে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে  ম্যাট্রিক পাশ করার পর চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। সেই সময় কলাভবনে তাঁর সহপাঠী ছিলেন সত্যজিৎ রায়। বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন তিনি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শ মতো সাহিত্য পাঠ করতেন। নাটক গল্প ইত্যাদিতে তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। শান্তিনিকেতনে বিজ্ঞান-পাঠ শেষ করে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে বাঁকুড়া মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন। কিন্তু মন পড়ে থাকে নাটক, গল্প সিনেমায়। তৃতীয় বর্ষে কলেজের ভিতরেই তাঁর পরিচালিত নাটক দেখে অন্নদাশঙ্কর রায় বলেন -

    " ঢুলু, তোমার আর্টের লাইনে যাওয়াই ভালো। ওটাই তোমার ঠিক জায়গা।"

প্রসঙ্গত 'ঢুলু' ছিল অরবিন্দের ডাক নাম। পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র জগতে তিনি 'ঢুলুদা' বা 'ঢুলুবাবু' নামেই পরিচিত হন। কলকাতা'য় ডাক্তারি পরীক্ষা দিতে এসে বিমল রায়ের "উদয়ের পথে সিনেমা দেখে আরো বেশি উৎসাহিত হন। সাহিত্যিক বনফুল (বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায়) এর ছোট ভাই এই মানুষটি যেকটি সিনেমা, আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন তার সবকটাই এক একেকটা ঝক্‌ঝকে্‌ রত্ন বলা যায়। 

শেষপর্যন্ত চতুর্থ বর্ষের  ডাক্তারি পড়ায় ইতি টেনে চলে এলেন চলচ্চিত্র জগতে। প্রথমে অর্ধেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সহকারী হিসাবে কাজ শুরু  করেন।  পরে কলকাতার বীরেন সরকারের নিউ থিয়েটার্সে যোগ দেন বিমল রায়ের অ্যাসিস্টান্ট হিসাবে। সেখানে হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় তাঁর সহকর্মী ছিলেন। পরে নিজেই বড়দা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের (বনফুল) গল্প নিয়ে 'কিছুক্ষণ' ছবিটি করেন। প্রথম ছবির পরিচালনাতেই মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছিলেন। ছবিটি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়। এরপর একের পর এক ছবি করেছেন তিনি। আহ্বান, নতুন জীবন, পিতাপুত্র, নায়িকার ভূমিকায়, ধন্যি মেয়ে, নিশিপদ্ম, মৌচাক অগ্নীশ্বর-এর মতো ছবি আজও তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। তিনি মোট ২৬ টি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি, তিনটি টেলিফিল্ম ও একটি ধারাবাহিকের পরিচালনা করেন। বাংলার 'নিশিপদ্ম' ছবিটি হিন্দিতে 'অমর প্রেম'র চিত্রনাট্য তিনি রচনা করেন এবং ফিল্মফেয়ার এডওয়ার্ড পান।

অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত কিছু বিখ্যাত চলচ্চিত্র- 

কিছুক্ষণ (১৯৫৯) / আহ্বান (১৯৬১) / বর্ণচোরা (১৯৬৩) / নতুন জীবন (১৯৬৬) / পিতাপুত্র (১৯৬৯) / নায়িকার ভূমিকায় (১৯৬৮) / নিশিপদ্ম (১৯৭০) / ধন্যি মেয়ে (১৯৭১) / মৌচাক (১৯৭৪) / অগ্নীশ্বর (১৯৭৫) / অজস্র ধন্যবাদ (১৯৭৬) / মন্ত্রমুগ্ধ (১৯৭৭) / পাকা দেখা (১৯৮০) / শহরের ইতিকথা (১৯৮৩) / নদী থেকে সাগরে (১৯৭৮) ইত্যাদি।

১৯৩৯ সালে শান্তিনিকেতনে ভর্তি হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ডেকে পাঠালেন। আসলে, অরবিন্দের অগ্রজ বনফুল বা বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় গুরুদেবের স্নেহধন্য ছিলেন। ফলে রবীন্দ্রনাথ একটু কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলেন এই কিশোর সম্পর্কে। তখন অনিল চন্দ রবীন্দ্রনাথের সচিব হিসেবে কাজ করতেন। তিনি অরবিন্দকে পরামর্শ দেন যে বার্ধক্যে কবির শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়ায় অরবিন্দ যেন একটু জোরে কথা বলেন। প্রণাম করার পরই গুরুদেবের জিজ্ঞাসা, ‘‘তুমি বলাইয়ের ভাই কানাই নাকি ?’’ অরবিন্দ স্বর উচ্চগ্রামে তুলে উত্তর দিলেন, ‘‘না, আমি অরবিন্দ।’’ গলার জোর শুনে রবীন্দ্রনাথের সহাস্য মন্তব্য, ‘‘না, তুমি কানাই নও সানাই’’

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় লিখছেন আসলে একদা নিউ থিয়েটার্স স্টুডিও ও বি এন সরকার মশাই বুঝেছিলেন যে বাঙালি সিনেমা বলতে কথায় ও ছবিতে চলমান চিত্রমালা বোঝে। আমাদের সবাক চিত্র ত্রিশের দশক থেকেই বই হয়ে যায়। অরবিন্দবাবু সর্বতোভাবে এই কথকতার ধারাটিকে অনুসরণ করে এসেছেন। নিউ থিয়েটার্স ঘরানার অন্তিম প্রতিনিধি অরবিন্দবাবুকে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে তাই হৃদয়ে একটি আক্ষেপের সুরও বেজে ওঠে। সিনেমার এমন নিটোল গল্প শোনার দিনগুলি কেন যে হারিয়ে গেল!

অরবিন্দবাবুর ধন্যি মেয়ে একটি উদাহরণ। সেলুলয়েডের এমন অজস্র প্রিয় চরিত্র, দৃশ্য, গানের মুহূর্ত, সরস ডায়ালগে আমবাঙালির মনের পেনাল্টি-বক্স বার বার টপকে গিয়েছেন তিনি। বর্ণচোরা, নতুন জীবন, পিতাপুত্র, নায়িকার ভূমিকায়, নিশিপদ্ম, ধন্যি মেয়ে, অগ্নীশ্বর, অজস্র ধন্যবাদ থেকে হুলুস্থূল,  সিনেমাখোর দর্শক সেই গোল ফেরাতে চায়নি। ধন্যি মেয়ে-র মনসা (জয়া) কিন্তু মেয়ের বিয়েতে মুম্বইয়ে নেমন্তন্ন করেন অরবিন্দকাকাকে। তিনি যেতে না-পারলেও কবিতা লিখে জবাব দিয়েছিলেন। আর উত্তমকুমারের অগ্নীশ্বর দেখে অমিতাভ বচ্চনও চেয়েছিলেন হিন্দিতে চরিত্রটি করতে। অরবিন্দবাবুকে দিয়ে চিত্রনাট্য তৈরির কথা হলেও কাজটা বাস্তবায়িত হয়নি। সমরেশ বসুর নাটের গুরু অবলম্বনে অরবিন্দবাবুর ছবিতে অভিনয়ের কথা ছিল উত্তম-সুচিত্রার। উত্তমের মৃত্যুর পরে সুচিত্রা সঞ্জীব কুমারকে নিয়ে ছবিটি করানোর তোড়জোড় করেন। তবে সেই কাজটিও হয়নি।

মৌচাক, ধন্যি মেয়ে, নিশিপদ্ম-র অন্যতম প্রধান চরিত্র সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। বললেন, ঢুলুদা আমার  কাছে ঈশ্বরের মতো! কত বিষয়ে কথা বলতেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত! নিজে অভিনয় করলেও দারুণ করতেন। আর জানতেন অ্যাক্টরদের সেরাটা বার করে আনতে। আহ্বান, বর্ণচোরা, নতুন জীবন-এর সন্ধ্যা রায় বলেন, উনি আমার একজন অভিভাবক!

অগ্নীশ্বর নিয়ে বেশ টেনশনে উত্তমকুমার। রোমান্টিক ইমেজ থেকে অনেকটা সরে এসে অভিনয় করতে হয়েছে রাশভারী ডাক্তারের চরিত্রে। বনফুলের লেখা উপন্যাসকে সিনেমার চিত্রনাট্যে বুনেছেন পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। এই সিনেমায় উত্তমকুমারের লুক নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। একজন গম্ভীর ডাক্তার, অথচ তাঁর রসবোধও তীক্ষ্ণ। মুহূর্তের মধ্যে অপ্রিয় কথাও বলে দিতে পারেন মুখের ওপর। সেই ব্যক্তিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে হবে অভিনয়ে। একটা ম্যানারিজম যোগ করলে ভালো। অনেক ভাবনা-চিন্তার পর ঠিক হল চশমার ওপর দিয়ে তাকানোর ভঙ্গিটি। কিন্তু উত্তমকুমার টেনশনে। তাঁর এমন অভিনয় যদি গ্রহণ না করেন দর্শকরা।

ছবি রিলিজ হল। প্রথম দিন থেকেই ধন্য ধন্য শুরু করলেন দর্শকরা। সিনেমার শেষে অনেকেরই চোখে জল। নানা সূত্রে সুসংবাদ আসছিল অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাছে। তারপর রাতে এল স্বয়ং নায়কের ফোন। সিনেমা সুপার হিট হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত পেতেই তাঁকে ফোন করলেন উত্তমকুমার। বললেন, আপনি আমার অভিনয় জীবনকে দীর্ঘায়ু করলেন। কথাটি মিথ্যে নয়। এখনো উত্তমকুমার অভিনীত শ্রেষ্ঠ চরিত্রগুলির নাম বললে অগ্নীশ্বরের নাম মনে আসে অনেকেরই। পরে অগ্নীশ্বর দেখে সিনেমাটি হিন্দিতেও করতে চেয়েছিলেন স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন। চিত্রনাট্য লেখার কথা ছিল অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়েরই। কিন্তু, নানা কারণে সেটি বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলা ছবিও অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের কাছে নানাভাবে ঋণী। শান্তিনিকেতনের ছাত্র। সত্যজিৎ রায়ের সহপাঠী। দুজনে মিলে একসঙ্গে ম্যাগাজিনও বের করেছেন। সেখানে সম্পাদকের জায়গায় লেখা থাকত আমি আর প্রকাশকের জায়গায় তুমি। সত্যজিতের সঙ্গে এই সুসম্পর্ক শেষদিন অবধি বজায় ছিল রসিক অরবিন্দবাবুর।

এই হলেন ঢুলুদা। পুরস্কার নয়, দর্শকের ভালোবাসাই ছিল তাঁর আসল পুরস্কারআলোচনার ইতি টানি এবারে শুভদীপ ব্যানার্জীর একটা লেখার খণ্ডাংশ দিয়েই

দোকানে চাল কিনতে গিয়েছেন ঢুলুদা। দুহাতে পাঁচ কেজি, পাঁচ কেজি দশ কেজির দুটো থলে। দোকান থেকে রিক্সায় উঠেছেন ঢুলুদা,যথাসময়ে বাড়িও পৌঁছলেন। রিক্সা থেকে নেমে তিনি চালককে টাকা দিতে যাবেন, তখন চালক হঠাৎ বলে উঠলেন, আমি আজ আপনার থেকে টাকা নিতে পারব না বাবু। অরবিন্দ বাবু বুঝে উঠতে পারলেন না কারন। বেশ অবাক এই কথায়। তাও একজন রিক্সাওয়ালা বলছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কেন? তখন রিক্সাচালক বললেন, বাবু, আমি জানি আপনি কে ? আপনি অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। আপনার পরিচালিত অগ্নীশ্বর কাল আমি দেখেছি। উত্তম কুমারের বিশাল ভক্ত আমি। কিন্তু ওই মানুষটার এমন রূপ আগে কখনও দেখিনি। আপনার জন্যই তা সম্ভব হল। কাল অগ্নীশ্বর দেখতে বসে খুব কেঁদেছি। আজ কিছুতেই আপনার থেকে টাকা নিতে পারব না। একথা শুনে অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ওই ভদ্রলোককে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। অরবিন্দ বাবু বুঝেছিলেন তিনি তাঁর আসল পুরস্কার পেয়ে গিয়েছেন। একজন রিক্সাওয়ালার ভালোবাসা কিন্তু সেদিন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ফেলে দেননি তিনি, বড় মঞ্চের পুরস্কারের হাতছানিতে। এটাই হলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। দর্শক কে অনাবিল আনন্দ দিতেই ছবি বানাতেন তিনি। কোনো আঁতলামো নয় কোনো পুরস্কারের জন্যই ছবি বানানো নয়। ঠিক যেমন বলিউডের হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়।

রইল ধন্যি মেয়ে গানগুলো।।

গান

(১)

যা যা বেহায়া পাখি যানা অন্য কোথা যা না –
কেউ করেনি মানা অন্য কোথা যা না ।
বউ নই তবু বউ কথা কউ বলে কেন পাখি ডাকে ?
এমন দস্যি মেয়ে কারও হয় নাকি বউ ?
ঘোমটা পরে কে থাকে ?
কিছুতেই সইবনা শাশুড়ির গঞ্জনা
তাই বলি -আমি তাই বলি
পাখি তুই যানা যানা যানা যাযা যা যাযা যা –
যা যা বেহায়া পাখি যানা অন্য কোথা যানা –
কেউ করেনি মানা অন্য কোথা যানা ।
তবু কোনদিন সব জেনে ওগো কেউ যদি বউ করে –
আমায় পায়ে ধরে যদি সেধে নিয়ে যায় কখন কারও ঘরে ।
তখনই ডাকলে পড়ে  সারা নাই দেব তরে
বলবনা আমি বলবনা আর বলবনা –
পাখি তুই যানা যানা যানা যাযা যা যাযা যা –
এখন যা যা বেহায়া পাখি যানা অন্য কোথা যা না –
কেউ করেনি মানা অন্য কোথা যা না ।
যা যা বেহায়া পাখি যানা অন্য কোথা যা না –
কেউ করেনি মানা অন্য কোথা যা না ।
[শিল্পী – আরতি মুখোপাধ্যায়।]

(২)

রাধে … রাধে…
রাধে মনটা রেখে এলি বল কোন মথুরায় ?
একবার মন দিলে হায় রে –
আর কি ফেরানো যায় !
রাধে মনটা রেখে এলি বল কোন মথুরায় ?।
যে ডোরের ওই বাঁধা এ মন –
সে যে বড়ই মজার বাঁধন
বাহিরে আলগা হলে ভিতরে জড়ায় –
তারে একবার মন দিলে হায় রে –
আর কি ফেরানো যায় !
রাধে মনটা রেখে এলি বল কোন মথুরায় ?।
রাধে প্রেম কি কাঁচের চুড়ি ?
রাধে প্রেমতো ঠুনকো নয় ।
যদি আঘাত লাগে –
ভাঙবার নেইকো ভয় ।
নাইবা রইল কাছে কাছে
তোরই বধু তোরই আছে ।
কালা যে লুকিয়ে আছে নয়ন তারায় ।
তারে একবার মন দিলে হায় রে –
তারে একবার মন দিলে হায় রে –
আর কি ফেরানো যায় !
রাধে মনটা রেখে এলি বল কোন মথুরায় ?।
রাধে … রাধে…
[শিল্পী – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।]

(৩)

এ ব্যাথা কি যে ব্যাথা বোঝে কি আনজনে ?
এ ব্যাথা কি যে ব্যাথা বোঝে কি আনজনে –
সজনী আমি বুঝি মরেছি মনে মনে ।
একে তো ফাগুন মাস দারুন এ সময় –
লেগেছে ভীষণ চোট কি জানি কি হয় !
এ ব্যাথা কি যে ব্যাথা বোঝে কি আনজনে ?
এ ব্যাথা কি যে ব্যাথা বোঝে কি আনজনে –
সজনী আমি বুঝি মরেছি মনে মনে ।
একে তো ফাগুন মাস দারুন এ সময় –
অঙ্গে চোট পেলে- সে ব্যাথা সারাবার
হাজার রকমের ঔষধি আছে তার ।
অঙ্গে চোট পেলে- সে ব্যাথা সারাবার
হাজার রকমের ঔষধি আছে তার ।
মরমে চোট পেলে সারেনা এ জীবনে-
সজনী আমি বুঝি মরেছি মনে মনে ।
একে তো ফাগুন মাস দারুন এ সময় –
লেগেছে ভীষণ চোট কি জানি কি হয় !
বাতাসে বাঁশি বাজে কেবলই ডাকে হায়
শিকলে কাটা মন লুকিয়ে যেতে চায় ।
বাতাসে বাঁশি বাজে কেবলই ডাকে হায়
শিকলে কাটা মন লুকিয়ে যেতে চায় ।
এ চোট পেয়ে রাঁধা মরেছে বৃন্দাবনে
সজনী আমি বুঝি মরেছি মনে মনে ।
একে তো ফাগুন মাস দারুন এ সময় –
লেগেছে ভীষণ চোট কি জানি কি হয় !
কি জানি কি হয় … কি জানি কি হয় …
[শিল্পী – হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।]

(৪)

লাঠিবাজি হকি নয়। 
গুঁতোগুঁতি হকি নয়।
তাস বিড়ি খেয়ে সময় কাটানো নয়—
এ খেলায় নেই গ্যাঁড়াকল।
সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল ~
আহা কী মধু আছে ওই তোমার নামেতে বাওয়া ফুটবল। 
লা লা লা লা লা লা…
তোমাকে লাথায় রোজ বুট পরা কতো পা,
এত লাথি খাও তবু মুখে কিছু বলো না,
পুড়ে মরো রোদ্দুরে, কাদা মাখো বরষায়,
তবু ফুলে ফেঁপে থাকো অবিচল,
সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল,
জীবনে মরণে পায়ে পায়ে আছো ফুটবল।
আড়াইশ বছরের জমিদারী ঘুচে গিয়ে
দেশ ছেড়ে পালিয়েছে ইংরেজ,
নখ দাঁত ভাঙা এক বৃদ্ধ সিংহ সে যে
নেই তার জারিজুরি নেই তে ;
তবু মানতে তো বাধা নেই   সেইতো শেখালো এই ফুটবল। 
তারই দৌলতে ভাই অমর হয়েছে নাম মোহনবাগান ইষ্টবেঙ্গল।
আহা কী মধু আছে ওই তোমার নামেতে আহা ফুটবল।
যার গোলে যাও তুমি তার বুকে পড়ে বাজ,
যার হ’ইয়ে গোল করো সে যে হয় মহারাজ। 
রকে রকে ঝগড়া  ঘরে ঘরে ডাইভোর্স
ইলিশে ঘটিতে রসাতল।
সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল
[শিল্পী – মান্না দে।]

(সমাপ্ত)

#

©গৌতমদত্ত
১১ আগস্ট ২০২০

কৃতজ্ঞতা-

১) উইকিপিডিয়া।
২) সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় –‘বোদ্ধাদের জন্য নয়, ফিল্মে নিটোল গল্প শোনাতেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়’ - 
        আনন্দবাজার ডট কম। 
৩) ঋজু বসু – ‘টালিগঞ্জের প্রবীণতম পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়’ – আনন্দবাজার ডট কম। 
৪) অনিতেশ চক্রবর্তী – ‘উত্তমকুমারের অভিনয়-জীবনকে দীর্ঘায়ু করলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়’ - 
        বঙ্গদর্শন ডট কম।
৫) শুভদীপ ব্যানার্জী – ‘রিক্সাওয়ালা বললেন, “বাবু, আমি জানি আপনি কে ? আপনি অরবিন্দ
        মুখোপাধ্যায়’ – গুগুল ডট কম।
৬) ‘আবিষ্কারক’ – এইসময় ডট ইণ্ডিয়াটাইমস ডট কম।
৭) এবং অবশ্যই গুগুল।
##