সাড়ে চুয়াত্তর (৭৪৷৷৹)
প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক এই সাড়ে চুয়াত্তর বা সংক্ষেপে “‘৭৪৷৷৹” এই চিহ্ন’টার অর্থ কি ! বহুকাল
আগে ব্যাক্তিগত চিঠি বা কোনও গোপনীয় কাগজ, বিশেষ করে প্রেমপত্রের উপর ৭৪৷৷৹ চিহ্নটি
ব্যবহার করা হতো। এটা আসলে একটা ‘দিব্যি’ দেওয়া। চিঠি লিখে খামের পিছনে সাড়ে চুয়াত্তর
লেখা হয় কেননা যাতে করে খামটা কেহ না খোলে । যদি খোলে পাপের ভাগী হবে। গল্পটা ইতিহাসের।
পাপ টা কি ?
চিতোরের রাণী পদ্মাবতী ছিলেন অপরূপা সুন্দরী, যাঁকে জলের
প্রতিচিহ্নে দেখে আলাউদ্দিন খাঁ চিতোর এর দুর্গ আক্রমণ করেন ১৩০৩ খ্রীষ্টাব্দে। সেই
যুদ্ধে চিতোরের সমস্ত পুরুষ মৃত্যুবরণ করেছিলেন রাণী’কে বাঁচাতে। রাণীও উপায়ান্তর না
দেখতে পেয়ে চিতোর গড়ের সমস্ত রাজপুত রমণীদের নিয়ে পালন করেছিলেন জহরব্রত। এ কাহিনী
আমরা জানি অল্পবিস্তর। চিতোরের জনহীন গড়ে এখনো কান পেতে শুনলে ইতিহাস কথা বলে। সেই
যুদ্ধে যত সৈনিক মারা গিয়েছিল তাঁদের উপবীত বা পৈতে’র সম্মিলিত ওজন ছিল সাড়ে চুয়াত্তর
মন। সে সময় এক মন মানে চার সের।
এই বীরগাথা বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে এই ঘটনার প্রায় আড়াইশ বছর পরে। সুফি কবি মালিক মহম্মদ জয়সীর “মাধুরী”, “পদুমাবৎ” বা “পদ্মাবৎ” কাব্যের সূত্রে। সেই সাড়ে চুয়াত্তর মন উপবীতের মৃত সৈনিকদের নামে দিব্যি দিলে সে দিব্যি’র কার্য্যকারিতা অচ্ছেদ্য। তাই গোপনীয় চিঠির উপর ৭৪৷৷৹ লিখে দেওয়া
“এটা যদি বয়স্ক লোকদের বোর্ডিং হতো, আমার কোনও আপত্তি ছিল না। এখানে প্রায় সবই অবিবাহিত ছেলে-ছোকরাদের কারবার। কাজেই আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে বোর্ডিং-এর শান্তিভঙ্গ হবে।”
১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত নির্মল দে পরিচালিত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির এই হলো মূল গল্প। উত্তর কলকাতার এক ছেলেদের মেসবাড়িতে হঠাৎই এক পরিবারের আগমন, যে পরিবারে কর্তা গিন্নির সাথে রয়েছে এক সুন্দরী যুবতী। এই নিয়ে নির্বিশেষে অন্নপূর্ণা বোর্ডিং-এর পুরুষকূলে চিত্তচাঞ্চল্য। তাই নিয়ে অনেক ঘটনা, ঘটনার ঘনঘটা, মায় ষাটোর্দ্ধ মেসমালিক রজনীবাবুর ইজ্জৎ নিয়ে টানাটানি। অনাবিল হাস্যরসে সমৃদ্ধ এই ছবি ৬৫ বছর পেরিয়ে আজও সমান জনপ্রিয়।
আমাদের যৌবনে যখন আমরা রীতিমত সিনেমা দেখতে শুরু করেছি সেসময় সেই সিনেমার পরিবেশক ছাপতেন একটা করে প্রচার-পুস্তিকা। চার-পাঁচ পৃষ্ঠা থেকে নয়-দশ পাতা অব্দি হ’ত এই পুস্তিকার আকার। তাতে মূলতঃ বেশ কিছু স্টিল ছবি ছাড়াও থাকতো সেই সিনেমার সংক্ষিপ্ত গল্প, অভিনেতা অভিনেত্রী কলা-কুশলীসহ সবার নাম, আর প্রতিটা গান সম্পূর্ণ ভাবেই। আমি যখন কিনতাম তখন এর দাম ছিল পঁচিশ কি ত্রিশ পয়সা। বাঙালির অনেক কিছু হারানোর যন্ত্রণার মধ্যে এগুলোকেও ধরা যায়।
আজ সেই “সাড়ে চুয়াত্তর” এর প্রচার পুস্তিকা থেকেই তুলে দিচ্ছি ছাপানো কাহিনীখানা। এযুগের ছেলেমেয়েরা জানুক তারা কি কি হারিয়েছে এই কলকাতায় !
“সাড়ে চুয়াত্তরের অবিসম্বাদী আইনের আশ্রয়ে প্রেমের গতি। তাই 'সাড়ে চুয়াত্তর’ প্রেমের কাহিনী। তবে একটি নয় -এক জোড়া প্রেমের । একটি নবীন প্রেম, আরেকটি প্রবীণ। বিধির অপূর্ব বিধানে একদা ফকিরপুকুর লেনের অন্নপূর্ণা বোর্ডিং-এ একদিন এই দুই প্রেমের যে চরম বিকাশ ঘটেছিল –“সাড়ে চুয়াত্তর’ তারই এক বিচিত্র কাহিনী।
রজনী চাটুজ্যে এই বোডিং-এর মালিক, স্ত্রীর নামে বোডিং-এর নাম রেখেছিলেন। তার জীবনে দুটি বড়ো দুঃখ ছিল। অনেক করেও তিনি বোডিং-এর মেম্বারদের আর বাড়ীতে স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবীর মন পান না। বোডিং-এর মেম্বাররা বলেন তিনি নাকী তাদের আধপেটা খাইয়ে পুরো দাম নেন। রজনীবাবু শুনে বলেন –বেইমান সব। বাড়ীর ব্যাপারটা অবশ্য একটু অন্য রকম। রজনীবাবুর বয়েস একটু ওদিকে গড়িয়ে গেলেও মনটি ছিল তার কাঁচা। তাই তিনি প্রথম বয়সের সাড়ে চুয়াত্তর মার্কা চিঠির দিনগুলির জের এখনো টানতে চান অন্নপুর্ণা দেবীর সঙ্গে। যেমন একটু গা ঘেঁসে একসঙ্গে বসা, এক থালা থেকে খাওয়া, একসঙ্গে একট চাঁদের আলো দেখা এই আর কী। কিন্তু অন্নপূর্ণা দেবী সে ব্যাপারে তাকে মোটেই প্রশ্রয় দিতে চান না। মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন—আমার প্রাণে অত সখ নেই ছেলেমেয়েরা বাড়ন্ত হচ্ছে না !
কিন্তু তা বলে কেউ যেন ভাববেন না রজনীবাবুর মতো—বয়েস হ’তে অন্নপূর্ণার প্রেমে ভাটা পড়েছে বা রজনীবাবুর প্রতি তার টান কমেছে। সে টান অন্তঃসলিলা হয়ে খরবেগেই বইছিলো। তার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া গেলো যেদিন রজনীবাবুর বুক পকেটে তিনি এক পরকীয়ার চিঠি আবিষ্কার করলেন। সেদিন রজনীবাবুর প্রতি তিনি যে টানের পরিচয় দিলেন—তার রস আদি না অন্ত, পর্দ্দার ইতিহাসে দুর্লভ এক অধ্যায়ে তা আপনাদেরই উপভোগ্য।
আমাদের কাহিনীতে নবীন প্রেমের সুত্রপাত হলো যেদিন রমলারা (কলেজে-পড়া সুন্দরী আধুনিকা রমলা আর তার মা-বাবা) কলকাতা সহরে সহসা গৃহহারা হয়ে আত্মীয় রজনী চাটুজ্যের অন্নপূর্ণা বোডিং-এ আশ্রয় নিলে। পুরুষদের মেস। বহু বিচিত্র চরিত্রের সমাবেশ। স্ত্রী-পরায়ণ মালিক রজনী চাটুজ্যে থেকে আরম্ভ করে বাবুদের মেস-তরীর কাণ্ডারী মদন চাকরটি পৰ্য্যন্ত। অশেষ গুণের নিধি এই মদন। গুণে গুণে সে সিড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করে, বাবুদের পেটের আর মনের দু’খবরই রাখে, অবসরে মেসের সৌদামিনী ঝি’র মনোরঞ্জন করে আর রমলার বিপদে তাকে অভয় দিয়ে বলে—আপনি ভাববেন না দিদিমুনি, আপনার হনুমান মদন আছে। বাবুদের আবার কেউ হঠযোগী, কেউ ব্যায়ামবিদ, কেউ সাধক, কেউ গায়ক, কেউ বাদক। চলচ্চিত্রে অনন্য কতকগুলি কমেডি-টাইপ--একবার পরিচয় পেলে তাদের সহজে ভুলতে পারবেন না। তার সঙ্গে আছে সুমধুর সুরের পরিবেশন।
রমলাকে কেন্দ্র করে এদের মধ্যে লাগলো তুমূল চাঞ্চল্য। কেউ হয়ে পড়লেন উৎসাহী, কেউ সন্দিগ্ধ--কেউ ভালোমানুষ সেজে পেছন থেকে ওস্কাতে লাগলেন। একগুঁয়ে রামপ্রীতি তাদের নির্ব্বাচিত মুখপাত্র। তার সঙ্গে লাগলো অভিমানিনী রমলার বিরোধ। সহানুভূতির দাবীতে উৎসাহীরা সেই সুযোগে লাগলেন রমলার অনুৎসুক দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায়। বিচিত্র তাঁদের পন্থা, বিচিত্রতর তাঁদের ভাবভঙ্গী, সংলাপ। নানা উপভোগ্য সিচুয়েশনে রসবন্ত ও চমকপ্রদ সেই প্রতিযোগিতায় কখনো দেখা যায় পূর্ববঙ্গ কুলতিলক গৌরীকেদারকে রমলার হাতে মিষ্টি খেতে, কখনো রামপ্রীতিকে দেখা যায় পথে তার সঙ্গে গোপন মিলনে—কখনো বা অতি উৎসাহী কামাখ্যাকে রাস্তায় হোঁচট খেতে, কখনো প্রাণকেষ্টকে বিচিত্র ভাষায় ও ভঙ্গীতে উচ্ছাস প্রকাশ করতে। মদনের সুপটু দৌত্যে আর সাড়ে চুয়াত্তরের আশ্রয়ে রমলার রোমান্স শশিকলার মতো বাড়তে থাকে – এদেরই কারো সঙ্গে। পাশাপাশিই বাড়তে থাকে—রজনীবাবু আর অন্নপূর্ণা দেবীর প্রবীণ রোমান্সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। তার দৃশ্যগুলি সম্বন্ধে এইটুকু আশ্বাস দেওয়া যায় যে তারা শুধু সরসতায় অনন্য নয়-- তাদের স্মৃতিও অনেক দুঃখের দিনে আপনার মন হাল্কা রাখবে।
এবং একদিন এই দুই রোমান্সের চরম পরিণতি ঘটলো ফকিরপুকুর লেনের অন্নপূর্ণা বোডিং-এ। নবীন পেলো নবীনাকে—প্রবীণ ফিরে পেলো তার প্রবীণাকে।
কোন প্রেমের আবেদন মধুরতর পর্দ্দায় পাবেন তার কদাচিৎ উপভোগ্য পরিচয়।”
এই হ’ল সেই প্রচার-পুস্তিকাটিতে লেখা সাড়ে চুয়াত্তর সিনেমার নির্যাস।
এই লেখা লিখতে গিয়ে অ্যাঁর একটি দারুন তথ্য হাতে এল। বঙ্গদর্শন ওয়েব সাইটে একটা লেখায় পেলাম – “শোনা যায়, সুচিত্রা সেন নন, প্রথমে ঠিক ছিল ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এর জন্য উত্তমের বিপরীতে অভিনয় করবেন মালা সিংহ। পরিচালক নির্মল দে’র তেমনই ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সেইসময় মালা সিংহ’র কোনো ডেট ফাঁকা পাওয়া যাচ্ছিল না। তারপরেই এই ছবিতে নেওয়া হয় সুচিত্রা সেনকে। সুচিত্রার প্রথম বক্সঅফিস সাফল্য সেখানেই। ১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ থেকে জুটি বাঁধা শুরু করলেন উত্তমকুমারের সঙ্গে। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি একটিবারের জন্যেও।”
এ
ছবির রূপায়ণে :
মলিনা দেবী / পদ্মা দেবী / রেবা দেবী / সুচিত্রা সেন (এস-এম-এর
সৌজন্যে) /
আরতি মৈত্র / রাজেশ্বরী সিং / মঞ্জুলা ব্যানার্জী
তুলসী চক্রবর্তী / উত্তমকুমার /
ভানু বন্দ্যোঃ (এঃ) / নবদ্বীপ / জহর রায় / শ্যাম লাহা / অজিত চট্টোঃ / রঞ্জিত রায় / হরিধন মুখোঃ (এঃ) / গুরুদাস বন্দোঃ / পঞ্চানন ভট্টাচার্য্য / গোকুল মুখোঃ / দেবেন বন্দ্যোঃ / বিভূতি গুপ্ত (এঃ) / সলিল দত্ত / আদিত্য ঘোষ / পারিজাত বসু / সনু বসু / শান্তি দাস / শ্যাম সিংহ / অশোক চট্টোঃ / নিশীথ সরকার / মাষ্টার চিন্ময় / মাষ্টার লেটো / এবং শ্যামল মিত্র, মানব মুখোঃ ও সনৎ সিংহ।
চিত্রনাট্য
পরিচালনা – নির্ম্মল দে।
কাহিনী
– বিজন ভট্টাচার্য্য।
গীত-রচনা
– শৈলেন রায়।
সঙ্গীত
পরিচালনা – কালিপদ সেন।
শেষ
করি এ সিনেমার একটা মজার গান দিয়েই -
আমার
এ যৌবন চম্পা চামেলী বনে
অকারণ উচ্ছল দিন গো—
আচল
দোলায়ে হায়
কে
গো আসে কে গো যায়।
সুরে সুরে বেজে ওঠে জীবনের বীণ গো
!
কেবা
সেই ললনা
ছন্দের
ঝরণা—
ভালবাসা
যদি পাও
ভালবেসে
মর না !
তার কালো চোখে হায়
আলো ছায়া খেলে যায়—
সে হিয়ায় হ’তে চায়
হিয়া যেন লীন গো।
বিদ্যুৎ
বরণা সে চম্পক বরণী—
তিয়াসার
তীরে বাসা বাঁধে মন-হরণী ?
কেবা
এই বিনোদিনী
রিনিক
ঝিনিকি ঝিনি !
নুপুরের
তালে বাজে
কাঁকনের
রিণি ঠিনি ?
ভাবি বেলা অবেলায়
যে চাহনি ফেলে যায়—
তারি
জালে জড়ায়েছি
আমি উদাসীন গো॥
গেয়েছিলেন
- সমবেত কণ্ঠে (শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয়
ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য ও সনৎ সিংহ)
(সমাপ্ত)
#
©গৌতমদত্ত
২৯
জুলাই ২০২০
#
কৃতজ্ঞতা
:-
১। উইকিপিডিয়া
২। রেডিওবাংলানেট ডট কম।
৩। বঙ্গদর্শন ইনফরমেশন ডেস্ক – বঙ্গদর্শন ডট কম।
৪।
ফায়েজুর রহমান সৈকত – বাঁধ ভাঙার আওয়াজ
– সামহোয়্যারইন ব্লগ।
৫। সাড়ে চুয়াত্তর প্রচার পুস্তিকা – এম. পি. প্রোডাকশন
লিমিটেড।
৬। এবং গুগুল তো অবশ্যই।
