স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা – (৬)
দু’হাজার সাত সাল। আমার এক কলীগ দুম করে অনলাইনে একটা তিন—তারা টাটা গ্রুপের হোটেল সস্তা দেখে বুক করে ফেললেন। এমেরিকান সিস্টেম। মানে ওই ভাড়ায় ব্রেকফাস্ট ফ্রি। সকাল বেলা বেশ গুছিয়ে ব্রেকফাস্ট করে নিলে লাঞ্চটা একটু পকোড়া—ভাজি এই সব খেয়ে কাটিয়ে দিলেই পকেট হাল্কা কম হবে – এই প্ল্যান আর কি ! তাই রাজি না হয়ে আর উপায় কি ! একে গন্তব্য আগরতলা, দ্বিতীয়ত হোটেল জিঞ্জার। টিকিট কেটে ফেলা গেল ইণ্ডিগো’র। সেখানেও বেশ সস্তা। শুনেছি আগরতলা’র বিমান ভাড়ার টিকিটে নাকি কিছু সরকারী সাহায্যও থাকে। সে যাই হোক, আমরা তো সস্তায় পেলাম।
আগরতলা !!! মানে আমার সেই ছোটোবেলায় পড়া স্বপ্নের জায়গা। সেই গোমতীর তীর। সেই... রবীন্দ্রনাথ............সেই পাথরের মন্দির.........
“রাজনারায়ণবাবু ছিলেন দেওঘরে। তাঁকে দেখতে যাব বলে
বেরনো গেল। রাত্রে গাড়ির আলোটা বিশ্রামের ব্যাঘাত করবে বলে তার নিচেকার আবরণটা টেনে
দিলুম। অ্যাংলোইণ্ডিয়ান সহযাত্রীর মন তাতে প্রসন্ন হল না,ঢাকা খুলে দিলেন। জাগা অনিবার্য
ভেবে একটা গল্পের প্লট মনে আনতে চেষ্টা করলুম। ঘুম এসে গেল। স্বপ্নে দেখলুম-- একটা
পাথরের মন্দির। ছোটো মেয়েকে নিয়ে বাপ এসেছেন পুজো দিতে। সাদাপাথরের সিঁড়ির উপর দিয়ে
বলির রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। দেখে মেয়েটির মুখে কী ভয় ! কী বেদনা ! বাপকে সে বার বার করুণস্বরে
বলতে লাগল, বাবা, এত রক্ত কেন! বাপ কোনোমতে মেয়ের মুখ চাপা দিতে চায়, মেয়ে তখন নিজের
আঁচল দিয়ে রক্ত মুছতে লাগল। জেগে উঠেই বললুম, গল্প পাওয়া গেল। ” - রাজর্ষি
আগরতলা’র রাজবাড়ি (উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ) কে ডান হাতে রেখে একটু এগিয়েই চোখে পড়লো মা আনন্দময়ী আশ্রম ও তৎসংলগ্ন মন্দির। ঘড়িতে দেড়টা বেজে গেছে তখন। যা থাকে কপালে বলে ঢুকে পড়া গেল আশ্রমে। আর আশ্রমের অফিসে কথা বলেই পেয়ে গেলাম লাঞ্চের কুপন। তারপরে ওই আশ্রমের পেছন দিকে খাওয়ার জায়গায় দুজনে বসলাম। কলাপাতায় সেদিনের সেই নিরামিষ লাঞ্চ আর তার যত্নের পরিবেশনে আমাদের মন এক্কেবারে দিলখুশ। ডাল, ভাজা, দু-তিন রকমের তরকারি তো ছিলই, আর ছিল শেষ পাতে চাটনি, পায়েস আর রসগোল্লা। সারা বিকেল আগরতলা শহর দেখে তারপরে ডিনার করে জিঞ্জারে ফেরা।
পরের দিনের গন্তব্য
আমার আগে থেকেই নির্দিষ্ট করা ছিল। ছোটবেলায় যবে থেকে রাজর্ষি পড়েছি তবে থেকেই কেন
জানিনা, ওই গোমতী নদী আর ওই মন্দিরখানা আমায় খুব টানতো। এর পরে যখন ‘বিসর্জন’ অভিনয় করি তখন থেকে তো মাথার
মধ্যে ঘুরপাক খেতো ওই মন্দির আর চারপাশের অঞ্চল।
এ নাটকে জয়সিংহ-র চরিত্র মুখস্থ করতে করতে কখনো কখনো চলেই যেতাম মনে মনে আজকের
উদয়পুরের সেই ভুবনেশ্বরী মন্দিরের চাতালে। জয়সিংহ রূপী আমার প্রথম দৃশ্যে - সেই বালিকা
অপর্ণা-র হাহাকার...
“*।অপর্ণা।*
এই-যে সোপান বেয়ে রক্তচিহ্ন দেখি
এ কি তারি রক্ত? ওরে বাছনি আমার !
মরি মরি, মোরে ডেকে কেঁদেছিল কত,
চেয়েছিল চারি দিকে ব্যাকুল নয়নে,
কম্পিত কাতর বক্ষে, মোর প্রাণ কেন
যেথা ছিল সেথা হতে ছুটিয়া এল না ?
[প্রতিমার প্রতি]
*।জয়সিংহ।*
আজন্ম পূজিনু তোরে, তবু তোর মায়া
বুঝিতে পারি নে। করুণায় কাঁদে প্রাণ
মানবের, দয়া নাই বিশ্বজননীর !
নাটকের কথা বলার আগে একটু অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা করি।
কেন এই নাটকের সাথে সুদূর ওই আগরতলার ভুবনেশ্বরী মন্দিরের যোগাযোগ ? নাটকের স্টোরি লাইনের পেছনে কেন বারে বারে উঁকি দিয়ে যায় এই ত্রিপুরা—আগরতলা—গোমতী নদী !
১১ আগস্ট, ২০১২ – গণশক্তি পত্রিকা’য় প্রকাশিত শ্রী জলধর মল্লিক মহাশয়ের লেখা “কগবরক, রবীন্দ্রনাথ” প্রবন্ধটি থেকে তুলে দিই ......
“ ১৮৮১ সালে তরুণ রবীন্দ্রনাথের নাট্যকারে লেখা বড় গীতিকাব্য ‘ভগ্নহৃদয়’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ তখন ২০বছর বয়সী এক তরুণ মাত্র। সেই সময় এই কাব্য প্রকাশ উপলক্ষে কবি এক অযাচিত, অভাবিতও বটে, সম্মান লাভ করলেন কলকাতা কিংবা অবিভক্ত বাংলার কারো কাছ থেকে নয়, লাভ করলেন ত্রিপুরার মহারাজের কাছ থেকে। রবীন্দ্রনাথের জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি বর্ণনা করে লিখলেন — ‘‘একদিন সুদূর ত্রিপুরা-রাজধানী আগরতলা থেকে এসে মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের খাস মুনশি রাধারমণ ঘোষ তরুণ কবির সঙ্গে দেখা করে বললেন যে, মহারাজ ‘ভগ্নহৃদয়’ পড়ে প্রীত হয়েছেন, আর তার নির্দেশে এই কথাটি কবিকে জানাতেই তিনি জোড়াসাঁকোয় এসেছেন।’’ তরুণ কবির পক্ষে এটা ছিল এক আশাতীত, অভাবিত পুরস্কার। ত্রিপুরার প্রথমা মহিষী মহারানী ভানুমতী প্রয়াত হওয়ায় মহারাজ বীরচন্দ্র তখন অত্যন্ত শোকাকুল। সেই সময় কবির ‘ভগ্নহৃদয়’ কাব্যখানি মহারাজের ভগ্ন হৃদয়ে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। আর তারই ফলশ্রুতিতে খাস মুনশিকে কলকাতায় পাঠিয়ে তরুণ রবীন্দ্রনাথকে শ্রেষ্ঠ কবির সম্মান জানানোর ঘটনাটি ঘটে। পরবর্তীকালে আগরতলা থেকে প্রকাশিত ‘রবি’ নামের এক ত্রৈমাসিকে রবীন্দ্রনাথ লেখেন — ‘‘তিনি আমার অপরিণত আরম্ভের মধ্যে ভবিষ্যতের ছবি তাঁর বিচক্ষণ দৃষ্টি দ্বারা দেখতে পেয়েই তখনি আমাকে কবি সম্বোধনে সম্মানিত করেছিলেন।... আমার মধ্যে অস্পষ্টকে স্পষ্ট দেখেছিলেন।’’ এরপর কবির সঙ্গে মহারাজের সম্পর্ক অচিরেই অন্তরঙ্গ হয়ে উঠল। সেই অন্তরঙ্গতা মহারাজের পুত্র মহারাজ রাধাকিশোর মাণিক্য, তার পুত্র মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য এবং তার পুত্র মহারাজ বীরবিক্রমকিশোর মাণিক্যের রাজত্বকালেও বজায় ছিল। কবির আমৃত্যু এই সম্পর্ক বজায় থাকাটা নানা ঐতিহাসিক ঘনঘটায় ভরা তো বটেই, নানা কবিতা, গান, চিঠিপত্র রচনায়ও সমৃদ্ধ। ছয় দশকব্যাপী এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই রচিত হয় নানা কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, চিত্র, প্রবন্ধ। রাজ্যপরিচালনার বিষয়ে রাজকুমারদের ও প্রজাদের শিক্ষাদীক্ষার বিষয়ে এবং অন্যান্য নানা ব্যাপারে অজস্র চিঠিপত্রে খুঁজে পাওয়া যায় অন্য এক রবীন্দ্রনাথকে।
মহারাজ বীরচন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের কয়েক বছর বাদেই ত্রিপুরা রাজবংশের ইতিহাস অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথের লেখা ছোট্ট উপন্যাস হিসাবে ‘মুকুট’ প্রকাশিত হয় ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত ‘বালক’ পত্রিকায় ১৮৮৬ সালে (১২১২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ)। পরে এটির নাট্যরূপ দেন রবীন্দ্রনাথ। ত্রিপুরা রাজবংশের ইতিহাস নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে। এই রচনা দু’টি সম্পর্কে মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য একটি চিঠি দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে জানান ‘‘...আপনি যে ত্রিপুরার ইতিহাস অবলম্বন করিয়া নবন্যাস লিখিতে যত্ন করিতেছেন, ইহাতে আমি চিরকৃতজ্ঞ রইলাম।’’ এই ‘রাজর্ষি’ উপন্যাসের কাহিনী থেকেই পরে ‘বিসর্জন’ নাটকটি লেখেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সময় ত্রিপুরার রাজবংশের কাহিনীগত ঐতিহাসিক উপাদান জুগিয়ে বিশেষভাবে সাহায্য করেন মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য। বই হিসেবে এটি প্রকাশিত হয় ১৮৯০ সালের ১৫ই মে। এর কিছুদিন পরেই ঐ বছরেই মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য কলকাতায় যান। সেই সময় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ‘বিসর্জন’ নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ করা হয় ত্রিপুরার মহারাজাকে সেটি দেখানোর জন্যে। এই নাটকটি যখন হচ্ছে তখন একটা মজার ব্যাপার ঘটে মঞ্চে। সেই মজার বিষয়টি জানা যায় রবীন্দ্রনাথের ভাইপো প্রাচ্য ঘরানার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও সাহিত্যিক অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিচারণা থেকে। এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অবনীন্দ্রনাথ রানী চন্দকে বলছেন —
‘‘ তারপর এই বাড়িতেই ত্রিপুরার রাজা বীরচন্দ্র মাণিক্যকে বিসর্জন নাটক দেখানো হয়, পুরনো সিন তৈরি ছিল সেইসব খাটিয়েই। রবিকাকা পাট নিয়েছিলেন রঘুপতির, অরুদা জয়সিংহের, দাদা রাজার, অপর্ণরা এ বাড়িরই কোনো মেয়ে মনে নেই ঠিক। বালক, বালিকা, তাতা আর হাসি, বোধহয় বিবি না সুরেন, তাও ঠিক মনে পড়ছে না।
এইখানে একটা ঘটনা আছে। রবিকাকাকে ওরকম উত্তেজিত হতে কখনো দেখিনি। এখন, রবিকাকা রঘুপতি সেজেছেন, জয়সিংহ তো বুকে ছোরা মেরে মরে গেল। স্টেজের এক পাশে ছিল কালীমূর্তি বেশ বড়ো, মাটি দিয়ে গড়া। কথা ছিল রঘুপতি দূর দূর বলে কালীর মূর্তিকে ধাক্কা দিতেই, কালীর গায়ে দড়াদড়ি বাঁধা ছিল, আমরা নেপথ্য থেকে টেনে মূর্তি সরিয়ে নেব। কিন্তু রবিকাকা করলেন কী, উত্তেজনার মুখে দূর দূর বলে কালীর মূর্তিকে নিলেন একেবারে দু’হাতে তুলে। অত বড়ো মাটির মূর্তি দু’হাতে উপরে তুলে ধরে স্টেজের এক পাশ থেকে আর এক পাশে হাঁটতে হাঁটতে একবার মাঝখানে এসে থেমে গেলেন। হাতে মূর্তি তখন কাঁপছে, আমরা ভাবি কী হলো রবিকাকার, এইবারে বুঝি পড়ে যান মূর্তিসমেত। তার পর উইংসের পাশে এসে মূর্তি আস্তে আস্তে নামিয়ে রাখলেন। তখনও রবিকাকার উত্তেজিত অবস্থা। ... অভিনয়ে কীরকম এক এক সময়ে উত্তেজনা হয় তাঁর। আমরা জিজ্ঞেস করলুম, কী হলো রবিকাকা তোমার ? ওই অতবড় কালী মূর্তি দু’হাতে একেবারে তুলে নিলে ?
উনি বললেন, কী জানি
কী হলো, ভাবলুম মূর্তিটাকে তুলে একেবারে উইংসের ভিতর ছুঁড়ে ফেলে দেব। উত্তেজনার মুখে
মূর্তি তো তুলে নিলুম, ছুঁড়তে গিয়ে দেখি ও পাশে বিবি না কে যেন হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে,
এই মাটির মূর্তি চাপা পড়লে আর রক্ষে নেই —
হঠাৎ সামলে তো নিলুম, কিন্তু কোমর ধরে গেল। তারপর অতি কষ্টে এ পাশে এসে রবিকাকা কোনোরকম
করে মূর্তি নামান। সেই কোমরের ব্যথায় মাসাবধি
কাল ভুগেছিলেন।’’
......
“ ১৯০০ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে (বর্তমানে মাদার টেরিজা সরণি) ভারত সঙ্গীত সমাজের পক্ষ থেকে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে এক সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন এই ধরনের সভার আয়োজনকে উপলক্ষ করে মহারাজকে কলকাতার সুধীসমাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে। উদ্বোধন সঙ্গীতটি রচনা করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আর এই সভাতেই বিসর্জন নাটকটি অভিনীত হয় আবার। রঘুপতির ভূমিকায় যথারীতি আবারও অভিনয় করেন নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং। না বললেও চলে, ত্রিপুরার সঙ্গে কবিগুরুর সম্পর্ক বজায় ছিল আজীবন। মহারাজ রাধাকিশোরের পুত্র মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য, মহারাজ বীরেন্দ্রকিশোরের পুত্র মহারাজ বীরবিক্রমকিশোরের সময়কাল পর্যন্ত কবিগুরুর প্রীতির সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। মহারাজা রাধাকিশোরের আমলেই প্রথম রবীন্দ্রনাথ ত্রিপুরার আগরতলায় আসেন এবং তারপর তো বিভিন্ন সময়ে আরো ছ’বার এসেছেন।” - জলধর মল্লিক
ত্রিপুরার প্রাচীন রাজধানী ছিল উদয়পুর। ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে মহারাজ কৃষ্ণ মাণিক্য রাজধানী স্থানান্তর করেন পুরনো আগরতলায়। ১৮৪০ সালে রাজধানী সরানো হয় বর্তমান আগরতলায়। এই উদয়পুরেই, গোমতীর দক্ষিণ তীরে টিলার ওপরে মহারাজা গোবিন্দ মানিক্যের (১৬৬০ থেকে ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দ) গড়া রাজপ্রাসাদ। প্রাসাদের কাছেই ভুবনেশ্বরী মন্দির। উঁচু প্লাটফর্মের ওপরে নির্মিত মন্দিরটি। তবে চৌচালা ছাদের ওপরে মুকুটের বদলে আছে উল্টানো কলসী। গোমতীর দক্ষিণ পাড়ে ভুবনেশ্বরী আর উত্তর পাড়ে গূণাবতী মন্দির।
( ২ )
সক্কাল সক্কাল উঠেই
রেডি হয়ে সোজা নেমে আসি হোটেল জিঞ্জারের রেস্তোঁরায়। ফ্রি খাওয়া মানে ওই ব্রেকফাস্ট
ফ্রি আর কি ! গোগ্রাসে খেয়ে নিই যা পারি। কতোরকম ফলের জুস, টুকরো করে কাটা কত রকমারী
ফল ! তারপরে ধোসা—ওমলেট—স্যান্ডুইচ—সাম্বারবড়া—আরো কতো কতো কি খেয়ে দেয়ে রেডি
হই। ও বলতে ভুলেছি, দু—কাপ
সুন্দর চা অবশেষে তৃপ্তি করে খেয়ে একটা অটো নিয়ে রওয়ানা হই আমার স্বপ্নের সেই মন্দির
চাতালের দিকে। প্রায় কুড়ি কিমি হবে বোধহয়।
একটা পাহাড়ের ওপরেই
মন্দির। পরিত্যক্ত। পুরাতত্ব বিভাগের সেই পরিচিত নীল—সাদা আয়তকার সাইনবোর্ড। আসার পথে একটা ব্রীজ পেরোলাম।
নীচে গোমতী নদী। তবে মন্দির চত্বর থেকে এখন গোমতী অনেক দূরে। দৃষ্টিপথের বাইরে।
অপর্ণা আর জয়সিংহ-র
কথোপকথন আড়াল থেকে শুনেছিলেন রাজা গোবিন্দমাণিক্য। নাটকে তেমনই বলা আছে। ‘জনান্তিক হইতে’। পরের দৃশ্যে রাজসভা। রাজপুরোহিত
রঘুপতি এসেছেন রাজসভায়।
*।রঘুপতি।*
রাজার ভাণ্ডারে
এসেছি বলির পশু সংগ্রহ করিতে।
*।গোবিন্দমাণিক্য।*
মন্দিরেতে জীববলি এ বৎসর হতে
হইল নিষেধ।
*।নয়নরায়।*
বলি নিষেধ!
*।মন্ত্রী।*
নিষেধ!
*।নক্ষত্ররায়।*
তাই তো ! বলি নিষেধ !
*।রঘুপতি।*
এ কি স্বপ্নে শুনি?
*।গোবিন্দমাণিক্য।*
স্বপ্ন নহে প্রভু! এতদিন স্বপ্নে ছিনু,
আজ জাগরণ। বালিকার মূর্তি ধ’রে
স্বয়ং জননী মোরে বলে গিয়েছেন,
জীবরক্ত সহে না তাঁহার।
*।রঘুপতি।*
এতদিন
সহিল কী করে ? সহস্র বৎসর ধ’রে
রক্ত করেছেন পান, আজি এ অরুচি !
*।গোবিন্দমাণিক্য।*
করেন নি পান। মুখ ফিরাতেন দেবী
করিতে শোণিতপাত তোমরা যখন।
*।রঘুপতি।*
মহারাজ, কী করিছ ভালো করে ভেবে
দেখো। শাস্ত্রবিধি তোমার অধীন নহে।
*।গোবিন্দমাণিক্য।*
সকল শাস্ত্রের বড়ো দেবীর আদেশ।
*।রঘুপতি।*
একে ভ্রান্তি, তাহে অহংকার ! অজ্ঞ নর,
তুমি শুধু শুনিয়াছ দেবীর আদেশ,
আমি শুনি নাই ?
*।নক্ষত্ররায়।*
তাই তো, কী বলো মন্ত্রী,–
এ বড়ো আশ্চর্য! ঠাকুর শোনেন নাই ?
*।গোবিন্দমাণিক্য।*
দেবী-আজ্ঞা নিত্যকাল ধ্বনিছে জগতে।
সেই তো বধিরতম যেজন সে বাণী
শুনেও শুনে না।
*।রঘুপতি।*
পাষণ্ড, নাস্তিক তুমি!
*।গোবিন্দমাণিক্য।*
ঠাকুর, সময় নষ্ট হয়। যাও এবে
মন্দিরের কাজে। প্রচার করিয়া দিয়ো
পথে যেতে যেতে, আমার ত্রিপুররাজ্যে
যে করিবে জীবহত্যা জীবজননীর
পূজাচ্ছলে, তারে দিব নির্বাসন-দণ্ড।
*।রঘুপতি।*
এই কি হইল স্থির?
*।গোবিন্দমাণিক্য।*
স্থির এই। [উঠিয়া]
*।রঘুপতি।*
তবে
উচ্ছন্ন ! উচ্ছন্ন যাও !
এইখান থেকে শুরু হয় রাজা’র সাথে রাজপুরোহিত অর্থাৎ শাসনক্ষমতার সাথে ধর্মের রীতিনীতি’র সংঘাত। নক্ষত্ররায় রাজার ভাই। নয়নরায় হচ্ছেন সেনাপতি। নাটক এগিয়ে চলে দুর্বার গতিতে।
১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ বিসর্জন লিখছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখনো শুরুই হয়নি। সিনেমা আবিষ্কার হয়ে গেছে। লণ্ডন শহরে পাতালরেলের চলছে। অস্কার ওয়াইল্ড এর ‘দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে’ প্রকাশিত হয়েছে। এ বছরের ২৭শে জুলাই মারা গেছেন ভিনসেন্ট ভ্যান গগ্। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের ছত্রছায়ায়। উমেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এবং তদানীন্তন আই.সি.এস. Allan Octavian Hume এর উদ্যোগে তৈরি হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস।
“ ভুবনেশ্বরী-দেবী-মন্দিরের ভৃত্য জয়সিংহ জাতিতে রাজপুত, ক্ষত্রিয়। তাঁহার বাপ সুচেতসিংহ ত্রিপুরায় রাজবাটীর একজন পুরাতন ভৃত্য ছিলেন। সুচেতসিংহের মৃত্যুকালে জয়সিংহ নিতান্ত বালক ছিলেন। এই অনাথ বালককে রাজা মন্দিরের কাজে নিযুক্ত করেন। জয়সিংহ মন্দিরের পুরোহিত রঘুপতির দ্বারাই পালিত ও শিক্ষিত হইয়াছেন। ছেলেবেলা হইতে মন্দিরে পালিত হইয়া জয়সিংহ মন্দিরকে গৃহের মতো ভালোবাসিতেন, মন্দিরের প্রত্যেক সোপান প্রত্যেক প্রস্তরখণ্ডের সহিত তাঁহার পরিচয় ছিল। তাঁহার মা ছিলেন না, ভুবনেশ্বরী প্রতিমাকেই তিনি মায়ের মতো দেখিতেন, প্রতিমার সম্মুখে বসিয়া তিনি কথা কহিতেন, তাঁহার একলা বোধ হইত না। তাঁহার আরও সঙ্গী ছিল। মন্দিরের বাগানের অনেকগুলি গাছকে তিনি নিজের হাতে মানুষ করিয়াছেন। তাঁহার চারি দিকে প্রতিদিন তাঁহার গাছগুলি বাড়িতেছে, লতাগুলি জড়াইতেছে শাখা পুষ্পিত হইতেছে, ছায়া বিস্তৃত হইতেছে, শ্যামল বল্লরীর পল্লবস্তবকে যৌবনগর্বে নিকুঞ্জ পরিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে। কিন্তু জয়সিংহের এ-সকল প্রাণের কথা, ভালোবাসার কথা, বড়ো কেহ একটা জানিত না; তাঁহার বিপুল বল ও সাহসের জন্যই তিনি বিখ্যাত ছিলেন।” --রাজর্ষি
জয়সিংহ মা’-র সেবক। রঘুপতির প্রাণ। যুবক জয়সিংহ এসব দেখে শুনে দোলাচলে। রাজা গোবিন্দমাণিক্যেরও পরম প্রিয় সে। একদিকে রাজা, অপরদিকে তার আশ্রয়দাতা রঘুপতি। আবার যুবক জয়সিংহ-র মনে বালিকা অপর্ণা-র করুন মুখচ্ছবি। অপর্ণা জয়সিংহ কে বলে, ‘ব্রাহ্মণেরে বড়ো ভয় করি। / কী কঠিন তীব্র দৃষ্টি ! কঠিন ললাট / পাষাণসোপান যেন দেবীমন্দিরের।’ আবার পরক্ষণেই রঘুপতি-র মুখে যখন সে শোনে যে তাঁর পিতাস্থানীয় রঘুপতিকে অপমান করেছে রাজা গোবিন্দমাণিক্য। তখন সে বিস্ময়ে বলে ওঠে –
“জয়সিংহ। গোবিন্দমাণিক্য ! প্রভু, কারে অপমান?
রঘুপতি। কারে! তুমি, আমি, সর্বশাস্ত্র, সর্বদেশ,
/ সর্বকাল, সর্বদেশকাল-অধিষ্ঠাত্রী /
মহাকালী, সকলেরে করে অপমান / ক্ষুদ্র সিংহাসনে
বসি। মা’র পূজা-বলি
/
নিষেধিল স্পর্ধাভরে।
জয়সিংহ। গোবিন্দমাণিক্য !
রঘুপতি। হাঁ গো, হাঁ, তোমার রাজা গোবিন্দমাণিক্য
! / তোমার সকল-শ্রেষ্ঠ–তোমার
প্রাণের / অধীশ্বর ! অকৃতজ্ঞ ! পালন
করিনু / এত যত্নে স্নেহে তোরে
শিশুকাল হতে / আমা-চেয়ে প্রিয়তর আজ
তোর কাছে / গোবিন্দমাণিক্য ?”
জয়সিংহ মন থেকে
তাড়াতে পারে না কাউকেই। তাই বলে ওঠে –
“জয়সিংহ।
প্রভু, পিতৃকোলে বসি / আকাশে বাড়ায় হাত ক্ষুদ্র
মুগ্ধ শিশু / পূর্ণচন্দ্র-পানে–
দেব, তুমি পিতা মোর, / পূর্ণশশী
মহারাজ গোবিন্দমাণিক্য।
কিন্তু এ কী বকিতেছি! কী কথা শুনিনু
! / মায়ের পূজার বলি নিষেধ করেছে
রাজা ? এ আদেশ কে মানিবে ?
রঘুপতি। না মানিলে / নির্বাসন।
জয়সিংহ। মাতৃপূজাহীন রাজ্য হতে / নির্বাসন
দণ্ড নহে। এ প্রাণ থাকিতে / অসম্পূর্ণ নাহি
রবে জননীর পূজা।”
‘অসম্পূর্ণ নাহি রবে জননীর পূজা’ – কি গভীর কথা উচ্চারিত হয় জয়সিংহ-র কন্ঠ থেকে। এর পরে যা ঘটে তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। রঘুপতি তাঁর দিকে টানতে থাকেন রাজপরিবারের বিশ্বাসভাজনদের এবং তলে তলে খেপিয়ে তুলতে থাকেন গোবেচারা প্রজাদের।
গোবিন্দমাণিক্য
যখন বুঝতে পারেন যে তাঁর প্রিয় মহিষী গুণবতীকেও বশ করে ফেলেছেন রঘুপতি তখন তাঁদের মধ্যেও
দোলাচল শুরু হয়। কিন্তু রাজা তাঁর লক্ষ্যে স্থির। গুণবতী যখন নিরুপায় হয়ে বলে ওঠেন
- “ব্রাহ্মণ ফিরিয়া পাক
নিজ অধিকার, / দেবী নিজ পূজা, রাজদণ্ড ফিরে যাক / নিজ অপ্রমত্ত মর্ত-অধিকার-মাঝে।” গোবিন্দমাণিক্য তখন স্থির বিশ্বাসে
রাণীকে বোঝান – “ধর্মহানি ব্রাহ্মণের নহে অধিকার।
/ অসহায় জীবরক্ত নহে জননীর / পূজা। দেবতার আজ্ঞা পালন করিতে / রাজা বিপ্র সকলেরই আছে
অধিকার।” রাজা বোঝাতে থাকেন
গুণবতীকে –
“এই
কি উচিত মহারানী ? নীচ স্বার্থ,
নিষ্ঠুর ক্ষমতাদর্প, অন্ধ অজ্ঞানতা,
চির রক্তপানে স্ফীত হিংস্র বৃদ্ধ প্রথা–
সহস্র শত্রুর সাথে একা যুদ্ধ করি;
শ্রান্তদেহে আসি গৃহে নারীচিত্ত হতে
অমৃত করিতে পান; সেথাও কি নাই
দয়াসুধা ? গৃহমাঝে পুণ্যপ্রেম বহে,
তারো সাথে মিশিয়াছে রক্তধারা ? এত
রক্তস্রোত কোন্ দৈত্য দিয়েছে খুলিয়া–
ভক্তিতে প্রেমেতে রক্ত মাখামাখি হয়,
ক্রূর হিংসা দয়াময়ী রমণীর প্রাণে
দিয়ে যায় শোণিতের ছাপ ! এ শোণিতে
তবু করিব না রোধ ?”
কি মনে হচ্ছে পাঠক ? সন ১৮৯০ নাকি ২০১৭ ?
“নিষ্ঠুর ক্ষমতাদর্প, অন্ধ অজ্ঞানতা, চির রক্তপানে স্ফীত হিংস্র বৃদ্ধ প্রথা–”। আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন নাটকের এই সংলাপ। কতো সমালোচনা, কতো উপহাস সহ্য করতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথ’কে জীবদ্দশায় - এমন কি মারা যাবার পরেও, এই আমাদের দেশে। তবুও কবি আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল ধ্রুবতারকার মত ভাস্বর হয়ে - আলো দিয়ে যাচ্ছেন এখনো আমাদের। দুঃখ শুধু একটাই – তাঁর ভাবনার পথে আমরা শরিক হ’তে পারলাম না। ভারতবর্ষের মত এক ঐতিহ্যশালী দেশে শুধু ফড়ে’রাই রাজত্ব করে চলছে এখন। ‘শিক্ষার মিলন’ নামক এক প্রবন্ধে কি সুন্দর উপমা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের চারপাশ :-
“আমি একদিন একটি গ্রামের উন্নতি করতে গিয়েছিলুম। গ্রামের লোকদের জিজ্ঞাসা করলুম, "সেদিন তোদের পাড়ায় আগুন লাগল, একখানা চালাও বাঁচাতে পরলি নে কেন?' তারা বললে, "কপাল !' আমি বললেম, "কপাল নয় রে, কুয়োর অভাব। পাড়ায় একখানা কুয়ো দিস নে কেন ?' তারা তখনি বললে, "আজ্ঞে কর্তার ইচ্ছে হলেই হয়।' যাদের ঘরে আগুন লাগাবার বেলায় থাকে দৈব তাদেরই জল দান করবার ভার কোনো-একটি কর্তার। সুতরাং, যে করে হোক এরা একটা কর্তা পেলে বেঁচে যায়। তাই এদের কপালে আর-সকল অভাবই থাকে, কিন্তু কোনো কালেই কর্তার অভাব হয় না।”
এই হলেন আমার প্রাণের
রবিঠাকুর...
( ৩ )
এরপরে রঘুপতি খেপিয়ে তুলতে থাকে সব্বাইকেই। চক্রান্তের জাল দ্রুত বিস্তার করতে থাকে। কারণ হাতে সময় কম। এরই মধ্যে রাজা গোবিন্দমানিক্যে-র আপন ভাই নক্ষত্ররাইয়’কে ডেকে রাজরক্তের আবদার করে রঘুপতি। এমত প্রস্তাবে দ্বিধা ঘিরে ফেলে নক্ষত্ররায়ের মনে। রঘুপতি আদেশের সুরে বলে ওঠে : “ বুঝেছ নক্ষত্ররায় ? দেবীর আদেশ, / রাজরক্ত চাই–শ্রাবণের শেষ রাত্রে। / তোমরা রয়েছ দুই রাজভ্রাতা–জ্যেষ্ঠ / যদি অব্যাহতি পায়, তোমার শোণিত / আছে, তৃষিত হয়েছে যবে মহাকালী, / তখন সময় আর নাই বিচারের।”
এইসব শুনে জয়সিংহ চঞ্চল হয়ে ওঠে। রঘুপতি তাকে এই হত্যা’র কার্যকারণ বোঝাতে থাকেন। দোলাচলে অস্থির হয়ে ওঠে জয়সিংহ। যাঁকে পিতা বলে, গুরু বলে জেনেছে সে এতদিন তাঁর এই যুক্তিতে বিচলিত হয়ে পড়ে সে। পর দৃশ্যেই অপর্ণাকে দেখে জয়সিংহ বলে ওঠে “...সত্য হলে এমন কি হত ? হা অপর্ণা, / তুমি আমি কিছু সত্য নই, তাই জেনে / সুখী হও–বিষণ্ন বিস্ময়ে, মুগ্ধ আঁখি / তুলে কেন রয়েছিস চেয়ে! আয় সখী, / চিরদিন চলে যাই দুই জনে মিলে / সংসারের ‘পর দিয়ে, শূন্য নভস্তলে / দুই লঘু মেঘখণ্ড-সম।”
ব্যাপার স্যাপার দেখে রঘুপতি বলে ওঠেন জয়সিংহ-কে “ দূর করে দাও ওই বালিকারে / মন্দির হইতে।–মায়াবিনী, জানি আমি / তোদের কুহক।–দূর করে দাও ওরে ! ” জয়সিংহ-র মুখে এই প্রতিধ্বনি শুনে অপর্ণা বলে ওঠে – “তুমি চলে এস জয়সিংহ, এ মন্দির / ছেড়ে, দুইজনে চলে যাই।”
পরের দিন “জয়সিংহ প্রতিমার দিকে চাহিয়া জড়হস্তে কহিলেন, "কেন মা, আজ এমন অপ্রসন্ন কেন ? একদিন তোমার জীবের রক্ত তুমি দেখিতে পাও নাই বলিয়া এত ভ্রূকুটি ! আমাদের হৃদয়ের মধ্যে চাহিয়া দেখো, ভক্তির কি কিছু অভাব দেখিতেছ ? ভক্তের হৃদয় পাইলেই কি তোমার তৃপ্তি হয় না, নিরপরাধের শোণিত চাই ? আচ্ছা মা, সত্য করিয়া বল্ দেখি, পুণ্যের-শরীর গোবিন্দমাণিক্যকে পৃথিবী হইতে অপসৃত করিয়া এখানে দানবের রাজত্ব স্থাপন করাই কি তোর অভিপ্রায়? রাজরক্ত কি নিতান্তই চাই ? তোর মুখের উত্তর না শুনিলে আমি কখনোই রাজহত্যা ঘটিতে দিব না, আমি ব্যাঘাত করিব। বল্, হাঁ কি না।"
সহসা বিজন মন্দিরে শব্দ উঠিল, "হাঁ।"
জয়সিংহ চমকিয়া পশ্চাতে
চাহিয়া দেখিলেন, কাহাকেও দেখিতে পাইলেন না, মনে হইল যেন ছায়ার মতো কী একটা কাঁপিয়া
গেল। স্বর শুনিয়া প্রথমেই তাঁহার মনে হইয়াছিল, যেন তাঁর গুরুর কণ্ঠস্বর। পরে মনে করিলেন,
মা তাঁহাকে তাঁহার গুরুর কণ্ঠস্বরেই আদেশ করিলেন ইহাই সম্ভব। তাঁহার গাত্র রোমাঞ্চিত
হইয়া উঠিল। তিনি প্রতিমাকে ভূমিষ্ঠ প্রণাম করিয়া সশস্ত্রে বাহির হইয়া পড়িলেন।” - রাজর্ষি
চাঁদপাল রাজাকে জানায় – “ স্বকর্ণে শুনেছি / মহারাজ, রঘুপতি যুবরাজে মিলে / গোপনে মন্দিরে বসে স্থির হয়ে গেছে / সব কথা।” এই কথা শুনে গোবিন্দমাণিক্য বলে ওঠেন আপনমনেই – “জানিয়াছি, দেবতার নামে / মনুষ্যত্ব হারায় মানুষ।” প্রতিমার দিকে চেয়ে বলতে থাকেন -
“রক্ত
নহে, ফুল আনিয়াছি মহাদেবী!
ভক্তি শুধু– হিংসা নহে, বিভীষিকা নহে।
এ জগতে দুর্বলেরা বড়ো অসহায়
মা জননী, বাহুবল বড়োই নিষ্ঠুর,
স্বার্থ বড়ো ক্রূর, লোভ বড়ো নিদারুণ,
অজ্ঞান একান্ত অন্ধ–গর্ব চলে যায়
অকাতরে ক্ষুদ্রেরে দলিয়া পদতলে।
হেথা স্নেহ-প্রেম অতি ক্ষীন বৃন্তে
থাকে,
পলকে খসিয়া পড়ে স্বর্থের পরশে।
তুমিও, জননী, যদি খড়্গ উঠাইলে,
মেলিলে রসনা, তবে সব অন্ধকার!
ভাই তাই ভাই নহে আর, পতি প্রতি
সতী বাম, বন্ধু শত্রু, শোণিতে পঙ্কিল
মানবের বাসগৃহ, হিংসা পুণ্য দয়া
নির্বাসিত। ......”
কি ? “স্বার্থ বড়ো ক্রূর, লোভ বড়ো নিদারুণ” এই কথাগুলো মনে হচ্ছে কি এতোকাল
আগের লেখা ? প্রতিদিন খবরের কাগজ বা বিভিন্ন মিডিয়ায় কি দেখছি আমরা রোজ রোজ ? রোজ সন্ধ্যে হলেই বিজ্ঞ মানুষজন চুল চেরা বিশ্লেষণে
ফাটিয়ে দেন টিভি’র স্পিকার
! কিন্তু নিজের বেলায় সব আঁটিশুটি। আশ্রয় নিই
রবীন্দ্রনাথের –
“...অতএব ঈশ্বর করুন, আজ যেন আমরা
ভয়ে, ক্রোধে, আকস্মিক বিপদে, দুর্বল চিত্তের অতিমাত্র আক্ষেপে আত্মবিস্মৃত হইয়া নিজেকে
বা অন্যকে ভুলাইবার জন্য কেবল কতকগুলা ব্যর্থ বাক্যের ধুলা উড়াইয়া আমাদের চারি দিকের
আবিল আকাশকে আরো অস্বচ্ছ করিয়া না তুলি। তীব্র বাক্যের দ্বারা চাঞ্চল্যকে বাড়াইয়া তোলা
হয়, ভয়ের দ্বারা সত্যকে কোনোপ্রকারে চাপা দিবার প্রবৃত্তি জন্মে। অতএব, অদ্যকার দিনে
হৃদয়াবেগ-প্রকাশের উত্তেজনা সম্বরণ করিয়া যথাসম্ভব শান্তভাবে যদি বর্তমান ঘটনাকে বিচার
না করি, সত্যকে আবিষ্কার ও প্রচার না করি, তবে আমাদের আলোচনা কেবল যে ব্যর্থ হইবে তাহা
নহে, তাহাতে অনিষ্ট ঘটিবে।
আমাদের হীনাবস্থা
বলিয়াই উপস্থিত বিভ্রাটের সময় কিছু অতিরিক্ত ব্যগ্রতার সহিত তাড়াতাড়ি অগ্রসর হইয়া উচ্চৈঃস্বরে
বলিতে ইচ্ছা করে, "আমি ইহার মধ্যে নাই; এ কেবল অমুক দলের কীর্তি, এ কেবল অমুক
লোকের অন্যায়; আমি পূর্ব হইতেই বলিয়া আসিতেছি, এ-সব ভালো হইতেছে না; আমি তো জানিতাম,
এমনি একটা ব্যাপার ঘটিবে।'”
- (পথ ও পাথেয়)
আবার ফিরে আসি নাটকে :-
এরপরে, এসব দেখে শুনে রঘুপতি তাঁর প্রিয়তম শিষ্যকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেন “বল্ তবে, “আমি এনে দিব রাজরক্ত / শ্রাবণের শেষ রাত্রে দেবীর চরণে।’” মন্দিরে স্থাপিত প্রতিমার মুখ উল্টোদিকে ঘুরিয়ে রেখে গ্রামবাসীকে খেপিয়ে তোলেন এই বলে যে, – “মার জন্যে এক ফোঁটা রক্ত দিতে পারিস নে, এই তো তোদের ভক্তি ?”
গোবিন্দমাণিক্য গ্রামবাসীদের বোঝাতে থাকেন –
“নিষেধ করেছি বলি, সেই অভিমানে / বিমুখ হয়েছে মাতা! আসিছে মড়ক, / উপবাস, অনাবৃষ্টি, অগ্নি, রক্তপাত– / মা তোদের এমনি মা বটে! দণ্ডে দণ্ডে / ক্ষীণ শিশুটিরে স্তন্য দিয়ে বাঁচাইয়ে / তোলে মাতা। সে কি তার রক্তপানলোভে ? / হেন মাতৃ-অপমান মনে স্থান দিলি / যবে, আজন্মের মাতৃস্নেহস্মৃতিমাঝে / ব্যথা বাজিল না ? মনে পড়িল না মা’র / মুখ?–“রক্ত চাই’ “রক্ত চাই’ গরজন / করিছে জননী, অবোলা দুর্বল জীব / প্রাণভয়ে কাঁপে থরথর–নৃত্য করে / দয়াহীন নরনারী রক্তমত্ততায়– / এই কি মায়ের পরিবার? পুত্রগণ, / এই কি মায়ের স্নেহছবি ?”
জয়সিংহ সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে রঘুপতিকে – “সত্য বলো, প্রভু, তোমারি এ কাজ ?”
রঘুপতি বিস্তার করতে থাকেন যুক্তিজাল – “আমি কি ডরাই সত্য / বলিবারে ? আমারি এ কাজ। প্রতিমার / মুখ ফিরায়ে দিয়েছি আমি। কী বলিতে / চাও বলো। হয়েছ গুরুর গুরু তুমি, / কী ভর্ৎসনা করিবে আমারে ? দিবে কোন / উপদেশ ?”
জয়সিংহ বলে – “বলিবার কিছু নাই মোর।”
রঘুপতি – “কিছু নাই ? কোনো প্রশ্ন নাই মোর কাছে ? / সন্দেহ জন্মিলে মনে মীমাংসার তরে / চাহিবে না গুরু-উপদেশ ? এত দূরে / গেছ ? মনে এতই কি ঘটেছে বিচ্ছেদ ? / মূঢ়, শোনো। সত্যই তো বিমুখ হয়েছে / দেবী, কিন্তু তাই ব’লে প্রতিমার মুখ / নাহি ফিরে। মন্দিরে যে রক্তপাত করি / দেবী তাহা করে পান, প্রতিমার মুখে / সে রক্ত উঠে না। দেবতার অসন্তোষ / প্রতিমার মুখে প্রকাশ না পায়। কিন্তু / মূর্খদের কেমনে বুঝাব ! চোখে চাহে / দেখিবারে, চোখে যাহা দেখাবার নয়। / মিথ্যা দিয়ে সত্যেরে বুঝাতে হয় তাই। / মূর্খ, তোমার আমার হাতে সত্য নাই। / সত্যের প্রতিমা সত্য নহে, কথা সত্য / নহে, লিপি সত্য নহে, মূর্তি সত্য নহে– / চিন্তা সত্য নহে। সত্য কোথা আছে–কেহ / নাহি জানে তারে, কেহ নাহি পায় তারে। / সেই সত্য কোটি মিথ্যারূপে চারি দিকে / ফাটিয়া পড়েছে। সত্য তাই নাম ধরে / মহামায়া, অর্থ তার “মহামিথ্যা’।”
কি অপূর্ব সুললিত বাণী ! তাই না ?
নক্ষত্ররায় দাদা’র কাছে স্বীকার করে রঘুপতির প্ল্যান। ওদিকে গুণবতী তাঁর প্রিয় দেওরকে ক্ষেপিয়ে তোলেন রাজার এক পালক সন্তান ধ্রুব-র বিরুদ্ধেই। ধ্রুব-কেই বলি দিতে মন্ত্রণা দেন গুণবতী। নাটক ক্রমশঃ চরম উত্তেজনায় ফুটটে থাকে।
গোবিন্দমাণিক্য চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন এবারে। রঘুপতিকে আট বছর নির্বাসন দণ্ডের বিধান দেন। নক্ষত্ররায় নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে গেলে গোবিন্দমাণিক্য-র মুখ দিয়ে বের হয় সেই অমোঘ সত্য কথাগুলো – “......ক্ষমা কি আমার / কাজ ? বিচারক আপন শাসনে বদ্ধ, / বন্দী হতে বেশি বন্দী। এক অপরাধে / দণ্ড পাবে এক জনে, মুক্তি পাবে আর, / এমন ক্ষমতা নাই বিধাতার–আমি / কোথা আছি !”
“বিচারক আপন শাসনে বদ্ধ, বন্দী হতে বেশি বন্দী। ” – ক্লাস নাইন থেকে ক্লাস ইলেভেন অব্দি যতগুলো পরীক্ষায় বসেছি, এই লাইনটির যে কতো বার ভাব সম্প্রসারণ লিখতে হয়েছে – তা এখনো পষ্ট মনে পড়ে !
এর পরে এসে পড়ে শ্রাবণের সেই রাত। ঝড় জল বাদলের শব্দে রঘুপতি ছটফট করতে থাকেন কখন জয়সিংহ রাজরক্ত নিয়ে আসবে – এই চিন্তায় ! জয়সিংহ অবশেষে খালি হাতে উপস্থিত হলে উদগ্রীব রঘুপতি খুঁজতে থাকেন রাজরক্ত ! জয়সিংহ চীৎকার করে বলে ওঠে –
“আছে
আছে। ছাড়ো মোরে। /
নিজে আমি করি নিবেদন।– /
রাজরক্ত /
চাই তোর, দয়াময়ী, জগৎপালিনী /
মাতা ? নহিলে কিছুতে তোর মিটিবে না
/
তৃষা ? আমি রাজপুত, পূর্ব পিতামহ /
ছিল রাজা, এখনো রাজত্ব করে মোর /
মাতামহবংশ–রাজরক্ত আছে দেহে। /
এই রক্ত দিব। এই যেন শেষ রক্ত
হয় মাতা, এই রক্তে মিটে যেন /
অনন্ত পিপাসা তোর! রক্ততৃষাতুরা।”
............ এই বলে কোমর থেকে লুকোনো ছোরাখানা বার করে আমূল বসিয়ে দেয় নিজের বুকে ! রাজরক্ত পান দেবী। কি ভাবে তা কিন্তু জানি না। শুধু জানি, রঘুপতি একদম শেষে ওই কালীমূর্ত্তি জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তাঁর জননীকে দেখতে পান অপর্ণা-র মধ্যে। বলে ওঠেন –
“...পাষাণ
ভাঙিয়া গেল–জননী আমার
এবারে দিয়েছে দেখা প্রত্যক্ষ প্রতিমা
!
জননী অমৃতময়ী !”
*
“যুক্ত
করো হে সবার সঙ্গে,
মুক্ত করো হে বন্ধ,
সঞ্চার করো সকল কর্মে
শান্ত তোমার ছন্দ।” - গীতাঞ্জলি - রবীন্দ্রনাথ।
#
©গৌতম দত্ত
১৪ই জুলাই, ২০১৭
কলকাতা।
#
কৃতজ্ঞতা -
১) কগবরক, রবীন্দ্রনাথ - জলধর মল্লিক - ১১ আগস্ট, ২০১২ – গণশক্তি পত্রিকা
২) বিসর্জন / রাজর্ষি / গীতাঞ্জলি / শিক্ষার মিলন এবং পথ ও পাথেয় - রবীন্দ্রনাথ
##
