বালিকা বধূ -

 


        ১৯৭৩। সে দিনটা একটু মেঘলাই ছিল, মনে পড়ে। সম্ভবতঃ আগস্টের তৃতীয় হপ্তা। সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠেই বরানগর বাজারমুখী। আমাদের হায়ার সেকেন্ডারীর রেজাল্ট এসে গেছে। সে সময় পাড়ার কিছু দাদাদের কাছে এগুলো ছিল উপরি ইনকামের রাস্তা। হাতে গেজেট নিয়ে রোল নাম্বার জিজ্ঞেস করে বলে দেওয়া পাশ না ফেল ! পাশ এ দুটাকা। ফেল-এ ফ্রি।
 
         বরানগর বাজারের আগেই তে-মাথার মোড়ে কালিবাড়ি। তার আগে সেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের অতি প্রিয় ফাগুর তেলেভাজার দোকান। তার আগের তিনতলা বাড়ির দোতলায় আমাদের টাইপ-শর্ট-হ্যাণ্ড শেখার স্কুল। আর তার নিচের লাল বারান্দা জুড়ে সেই গেজেট হাতে দু-তিনজন দাদার ব্যস্ততা। রোল নাম্বার বলতেই এক দাদা এক আঙুল দিয়ে খুঁজেই বলে দিল, নাম নেই ! যাস্‌শালা ! নাম নেই মানে ? ইয়ারকির আর জায়গা পায় নি ! এতটাই আত্মবিশ্বাস ছিল নিজেদের ওপরে। আবার গাঁইগুঁই শুরু। গেজেটখানা এক হাতে টান দিয়ে খুঁজে বার করা গেল যে নাম আছে। দ্বিতীয় ডিভিশন। ব্যস আর পায় কে !
 
         উঁহুউঁহু……নাক সিঁটকোবেন না। সে বছর মানে ১৯৭৩ এ বাণিজ্য বিভাগে পাসের হার ছিল ১৭%। তার মধ্যে মাত্র ৫০ জন প্রথম ডিভিশান। ২৫০ জনের মতো দ্বিতীয় ডিভিশন। সারা বাংলায়। বাকি সব্বাই তৃতীয় ডিভিশনে পাশ করেছিল। তাতেও সব্বাই কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিলাম। বিজ্ঞান বিভাগে পাশের হার ছিল সম্ভবতঃ ২৩ বা ২৪%। তো, তারপরে ঝড়ের বেগে বাড়ি এসে খবর দেওয়া। দাদুর থেকে দু-তিনটাকা আদায় করে কোনোরকমে ভাত খাওয়া সেরেই হাতীবাগান। মিত্রায় চলছে বালিকা বধূ। হাউস ফুল। একটাকা চল্লিশ পয়সার টিকিট দুটাকা দিয়ে কিনে সোজা হলের ভেতরে। তরুণ মজুমদারের সিনেমা আর হেমন্তের সুরে দুর্দান্ত সব গান। কিশোর মনে আবেগের মাখামাখি এক্কেরে।
 
         নায়িকা নবাগতা ইন্দিরা (মৌসুমী) চট্টোপাধ্যায়। যাকে নাকি তরুণবাবু স্কুলে যেতে দেখে ধরে এনে এ ছবিতে নামিয়ে দিয়েছেন। ছটফটানি, অল্প জেদ, আর গজদাঁতে ঝিলিক তোলা সে মেয়ে তো  পাকা বুড়ি। সিনেমায় তার ডাক নাম চিনি। মৌসুমী লিখছেন একজায়গায়—“ আমি তখন ক্লাস ফাইভে। কীভাবে আমায় দেখেছিলেন তরুণ মজুমদার, জানি না। তবে আমাকে দেখার পরেই তিনি আমার বাবার সঙ্গে কথা বলেন। আমি সিনেমায় অভিনয় করব শুনে ভীষণ রাগী বাবা সঙ্গে সঙ্গে 'না' বলে দেন। তখন হাল ধরেন সন্ধ্যা রায়। তিনি অনেক কষ্টে বুঝিয়ে রাজি করেন বাবাকে। হাজার দু'য়েক টাকাও বাবার হাতে তুলে দেন। হালকা হেসে বাবা সেই টাকা সন্ধ্যা রায়কে ফেরত দিয়ে বলেছিলেন, 'এই টাকা রাখুন। ওর বায়না মেটাতে কাজে লাগবে আপনাদের।'
 
         নায়ক পার্থ চট্টোপাধ্যায়। অন্যান্য মুখ্য শিল্পীরা হলেন রবি ঘোষ, রুমা গুহঠাকুরতা, অনুভা গুপ্ত, অনুপকুমার, জুঁই বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভৃতি।
 
        বিমল কর-এর এই উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয় দেশ পত্রিকায়। পরে ১৯৬৫ তে এটি বই হিসেবে ছেপে বেরোয় কিছু পরিবর্তন সহ। যদিও বিমল কর এটিকে উপন্যাস বলতে নারাজ। তাঁর ভাষায়, ...এটি দীর্ঘ কাহিনী, উপন্যাস নয়।
 
         এক সাক্ষাৎকারে তরুণবাবু জানাচ্ছেন যে সাতের দশকের মাঝামাঝি দেশ পত্রিকায় প্রথম কিস্তি পড়েই মনে হয়েছিল যে এটা থেকে ছবি হতে পারে। যদিও ওখানে তেমন একটা ঘটনা কিছু নেই, তবু একটা ফ্লেভার আসে না ! আমি সাগরময় বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী সপ্তাহে যেটা বেরোবে সেটা আগেই পড়ে নিয়েছিলাম।
 
         একটা মেয়ে, তার একটা অল্পবয়সী ছেলের সঙ্গে বিয়ে হচ্ছে। মেয়েটা অনবরত বাপের বাড়ি চলে যায়। ঝগড়া করে। শেষ অবধি শ্বশুরবাড়ি আসে। এই তো গল্প। এটা নিয়ে কী এমন ছবি হবে ? একমাত্র বংশী আমায় বলেছিল, আপনি যদি এ-ছবিটা না করেন আমি আর কোনোদিন আপনার সঙ্গে কাজ করব না। ওটা খানিকটা আমার মনে হয়েছিল যে, গল্পটা নিয়ে ছবি করা যায়। একটা সিক্সথ সেন্স গ্রো করে না যে, এটা নিয়ে ছবি করা যায়। আসলে আমি এখন ঠিক ডিফাইন করতে পারব না; কিন্তু তখন মনে হয়েছিল এটা নিয়ে ছবি হয়।
 
         বিমল কর-এর এই উপন্যাসটিকে যথেষ্ট যোগ বিয়োগ করেই চিত্রনাট্য লেখেন তরুণবাবু। অমল আর রজনীর রোম্যান্টিক কৈশোর জীবনে বিয়ে আর সেই দুজনের মান-অভিমান বা বলা ভাল, খুনসুটিকে কেন্দ্র করে তরুণ মজুমদার আমাদের উপহার দেন হাসিঅভিমানে ভরা এক কিশোর দম্পতির নিটোল অনুরাগের গল্প। অপূর্ব ঘরোয়া এবং মিষ্টি সংলাপের যাদুতে ভরিয়ে দেন গোটা সিনেমা-খানা। হৈ হৈ করে বক্স অফিসের সাফল্য পায় বালিকা বধূ
 
         ছবি শুরু হয় ষোলো বছরের অমলের জন্য, একখানা বালিকার ছবি নিয়ে অমলের বাবা অমলের মা আর পিসিকে দেখানো দিয়ে। ভাল ঘরের এক ডাক্তারের মেয়ে। অমলের মা সেই ছবিখানা অমলের বোন চন্দ্রাকে আলমারিতে রাখতে বললেও চন্দ্রা লুকিয়ে এই মেয়েটির ছবি নিয়ে চলে আসে দাদা অমলের ঘরে। অমলের(পার্থ মুখোপাধ্যায়) হবু স্ত্রী রজনীর (মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়) ছবি নিয়ে চন্দ্রা (জুঁই বন্দ্যোপাধায়) অমলকে বলে
“……
চন্দ্রা : দাদা, তোকে একটা জিনিস দেখালে তুই আমাকে কি দিবি ?
অমল : কি আর দেবোকান মোলে দেবো তোর।
চন্দ্রা : আরে যা যা, দেখলে তোর মাথা ঘুরে যাবে!
অমল : কি বটে, বল না ?
চন্দ্রা : ভাব কি হতে পারে?
অমল : আচার ?
চন্দ্রা। : (ছবিটা আসতে আসতে পিছন্ থেকে বের করে) হাঁ, নে চাট !
 
        কি মধুর সংলাপ না ? এরপরে চন্দ্রা, রজনীর সেই ছবিটি নিয়ে অমলের পড়তে থাকা মুখের কাছে দোলাতে থাকে। যা আসলে একেবারে বাঙালির চিরকালের ভাই-বোনের হাসি-ঠাট্টাকে মনে করায়। আর তারপরেই সিনেমার পর্দ্দা জুড়ে বাজনা আর সানাইয়ের সুরে সুর মিলিয়ে অমলের বিয়ে শুরু হয়ে যায়।
 
         এর পরে নানান ছোট ছোট দৃশ্য-মালায় এগিয়ে চলে বালিকা বধূ।  রজনীর সঙ্গে অমলের পূর্ণিমার রাতে বাইরে বেড়াতে যাওয়া, রজনীর অমলকে লেখা রুমাল দেওয়া, অমলের পছন্দের প্রিয় তরকারি মোচার ঘন্ট রজনীর চন্দ্রার কাছ থেকে জেনে রাঁধতে শিখে নেওয়া, অমল-রজনীর সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে শরৎ-চন্দ্রার মুখ্য ভূমিকা নেওয়া। এসব কিছু চলচ্চিত্রটি মানুষের মনে দাগ কেটে যায় । তাই আলোকচিত্র পরিচালক সৌমেন্দু রায় বলেছেন,
 
                “‘বালিকা বধূ সর্বাঙ্গীণ একটি মিষ্টি সুন্দর ছবি
 
         বালিকা বধুর সময়কাল সেই ইংরেজ রাজত্বে। যখন বাল্য বিবাহ প্রচলিত ছিল। সেজন্যেই অমল আর রজনীর কাছে বিয়ে মানে শুধুই একটা বন্ধুত্ব। সেই নিয়েই গল্প। বিয়ের কয়েকদিন বাদেই রজনী তার বাবার বাড়ি ফিরে যায়। অমল ও পড়াশোনায় ফেরে। এর মধ্যে দুর্গা পুজো চলে আসে। শোনা যায় রজনী পুজোয় আসবে অমলদের বাড়ি। অমলের আশায় জল ঢেলে রজনী আসে বিজয়া দশমীর দিন। অমলের তখন ক্রোধ উপছে পরছে চোখেমুখে।
 
        এর মধ্যে গ্রামের প্রিয় মাস্টারমশাই এর বাড়ি পুলিশ সার্চ করে। বে-আইনি কিছু পেয়ে মাস্টারমশাইকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। এই স্বাধীনতা সংগ্রামের দৃশ্য মূল উপন্যাসে নেইযা তরুণবাবুএ নিজস্ব সংযোজন। পরিচালক তরুণ মজুমদার তাঁর বাতিল চিত্রনাট্য গ্রন্থে লিখেছেন—“বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় বাংলার এক গ্রামে সম্পন্ন এক পরিবারের গৃহশিক্ষক। সাত্ত্বিক চেহারার প্রবীণ এক মানুষ, প্রায় নীরব তাঁর উপস্থিতি, বার-বাড়ির একপাশে ছোট্ট একটাঘরে বাস, দুবেলা বাড়ির ছেলেদের পড়ান। সংসারে তাঁর কেউ নেই। অবলম্বন বলতে পুরনো একটা বেহালা। মাঝে মাঝে চাঁদনি রাতে বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর চরে কাশের বনে বসে তিনি আপনমনে যন্ত্রটি বাজান। কখনও গ্রামছাড়া ওই রাঙ্গামাটির পথ, কখনও বা ও আমার দেশের মাটি। এই মাস্টারমশাই এর অপরাধ তাঁর বেহালার বাক্সে পাওয়া গেছে অনেকগুলি বোমা আর একখণ্ড গীতা। অর্থাৎ মাস্টারমশাই গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। কিন্তু এই গ্রেফতার হয়ে যাবার দৃশ্যে মাস্টারমশাইবেশী সন্তোষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ অভিনয় আর পরিচালকের পরিচালন দক্ষতায় অসাধারণত্ব লাভ করেছে । পরিচালকের নিজের ভাষায়—“যে দৃশ্যে পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে বাড়ি থেকে নিয়ে যাচ্ছে, সেই দৃশ্যে মাস্টারমশাই বাড়ির সবার দিকে চেয়ে হাতজোড় করে এমনভাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গেলেন যে উপস্থিত যারা শুটিং দেখছিল তারাও হায় হায় করে উঠলো। সহশিল্পী সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় আর অনুপকুমার হিরণকে(তরুণ মজুমদারের ছদ্মনাম) এসে বললেন, কী আর্টিস্ট বলো দিকিনি ! কোথায় তুলে দিয়ে গেল জায়গাটা !
 
         বিজয়া দশমীর রাতে রজনী আর অমল কাছাকাছি হলে রজনী অমলকে কাঁদতে কাঁদতে বলে
 
রজনী : (কাঁদতে কাঁদতে) আমার বাবা-মা যদি না পাঠায় তবে আমি কি করে আসবো ? আমি কি
         করে ওদের বলবো আমাকে আমার বরের কাছে পাঠাও ! আমার কি লজ্জা-শরম নেই ?
         (কাঁদতে থাকে)
অমল : কিন্তু, তুমি আমার দুর্গাপূজাটা কেন মাটি করলে ?
রজনী : ঊচন্দ্রা এখানে থাকতে পারে আর আমি আমার বাবার বাড়ি থাকতে পারি না ?
অমল : তুমি আমার কেউ নও।
রজনী : কেউ নয় ? আমি তোমার বউ। তুমি আমাকে বিয়ে করেছো।
অমল : আমি বড়ো হয়ে আবার বিয়ে করবো।
রজনী : আর আমি পেত্নি হয়ে ওই রক্ত খাবো।
অমল : তুমি তো পেত্নিই।
রজনী : ভূতের বউ তো পেত্নিই হয়।
 
         বিভিন্ন সিকোয়েন্সে শরতের (অনুপকুমার) বিভিন্ন সময় স্ত্রী চন্দ্রাকে উদ্দেশ্য করে, ছড়া কাটা, নাকে নস্যি নিয়ে হেঁচে স্ত্রীকে জরুরি ডাক দেওয়া, কিংবা পূর্ণিমা রাতে অমল-রজনীকে বাইরে পাঠিয়ে সাংকেতিক নির্দেশ হিসেবে গাধার আওয়াজ করে অথবা অমল রজনীকে বাইরে পাঠিয়ে নিজেরা তাদের জন্য মশা তাড়ানোর অনুপম দৃশ্যগুলি উপভোগ্য হয়ে ওঠে তরুণবাবুর সুযোগ্য পরিচালনার গুণে।

         বিশিষ্ট পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় বলেছেন—‘তনুবাবুর (তরুণ মজুমদারের ডাকনাম) তখন বালিকা বধূ করে খুব সুনাম
 
         তরুণ মজুমদারের বালিকা বধূ' ছবি দেখে সত্যজিৎ রায় ও খুবই প্রশংসা করেছিলেন। তরুণবাবু লিখেছেন এক জায়গায়—“…..আমার ইউনিটের সব খবরই সত্যজিৎবাবুর কাছে পৌঁছে যেতো বংশী চন্দ্রগুপ্ত মারফত আর সৌমেন্দু রায়ের মাধ্যমে। ওঁরাই মাঝে মাঝে বলতেন মানিকবাবু (সত্যজিৎ রায়) দেখে এসেছেন, ওঁর খুব ভালো লেগেছে। বালিকা বধূ'-র পরে সত্যজিৎবাবু একদিন চায়ের নেমন্তন্ন করলেন বাড়িতে।
 
         বালিকা বধূ' চলচ্চিত্রে দেখি, বালিকা বধূ রজনী বাপের বাড়ি থেকে কয়েকদিনের জন্যে শ্বশুরবাড়িতে এলে প্রথম দিকে তার কিশোর স্বামী অমল খুব উৎসাহী হয়। কিন্তু রজনী অন্য কাজের মধ্যে থেকে তাকে সময় না দিলে অমল মনে মনে খুব কষ্ট পায়। রজনীর এতে কিছুই এসে যায় না। এমন সময়ে একদিন রজনীর সমবয়সী তার ঠাকুরঝি চন্দ্রা তার চুল বাঁধতে বাঁধতে বলে
 
চন্দ্রা : এই, রাঁধতে জানিস?
রজনী : হু।।
চন্দ্রা : কী ?
রজনী : ভাত, ডাল, মাছ, তরকারি
চন্দ্রা : মোচার ঘন্ট ?
রজনী : উহু।
চন্দ্রা : শিখে নিস। দাদা খেতে ভালোবাসে।
রজনী : (ঠোঁট উল্টে) বাসুক গে।
চন্দ্রা : (রজনীর পিঠে নরম একটা কিল বসিয়ে দিয়ে) এই ! বাসুক গে কী রে ? একদিন এ
         বাড়ির হাল ধরতে হবে না ? দাদা কী ভালোবাসে-না-বাসে...।
 
রজনী একথা বললেও চিরন্তন বাঙালি মেয়েদের মতো স্বামীর পছন্দের খাবার রপ্ত করে ফেলে। তাই চলচ্চিত্রের শেষের দিকে সে স্বামী অমলকে চুপি চুপি জানায়
 
            জানো, আমি না...মোচার ঘন্ট রাঁধতে শিখে গেছি।
 
         আমার কাছে বালিকা বধূ ছবিটি এক অপূর্ব উচ্চতায় পৌঁছে যায় যখন দেখি দেখি রজনী তার বাবা মা ও নলিনীদিদির সঙ্গে কোনার্কের সূর্যমন্দিরের গায়ে আঁকা মিথুন মুর্তির ভাস্কর্য্যগুলি দেখে লজ্জায় দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলে। একটা দৃশ্যেই রজনী নারী হয়ে যায় অনায়াসেই। পরিচালকের বোধ ছুঁয়ে যায় সবাইকেই।
 
        তরুণ মজুমদার আনন্দবাজার পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন
 
.....আমার কিন্তু বরাবরই ভালোবাসা ফুটিয়ে তোলার ধারাটা সহজ, সরল ও স্বচ্ছ রাখার চেষ্টায় থেকেছে। আমি তোমাকে ভালোবাসি’—এই কথাগুলো ঠিক এই ভাষায় না হলেও সিনেমার ফর্মে খুব সহজ করে বুঝিয়ে দেওয়ার পথে থেকেছি বরাবর। ভালোবাসার জটিলতাগুলোও সহজ করে দেখানোর রাস্তা নিয়েছি। ধরুন, বালিকা বধূ ছবিটার কথাই। কেউ যদিও বলেনি সেখানে আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু অন্য একটা প্রসঙ্গ এনে কথাটা বলে দেওয়া গেছে।.......
 
         এই ভাবেই সিনেমা এগিয়ে চলে। চিনি বাপের বাড়ি যায়, ফের আসে...এ ভাবেই যেতে-আসতে, যেতে-আসতে এক সময় তার মনেও একটা পরিবর্তন এসে গেছে। শেষে একদিন স্বামীকে ও বলে, আমার খুব ইচ্ছে করে এরকম জোছনার রাতে বাইরে গিয়ে দৌড়োই। তা শুনে বর বলে, তা হলে চলো দৌড়োই। ওরা তারপর চাঁদনি রাতে দৌড়তে দৌড়তে এক সময় হাঁপিয়ে বসে পড়ে এক জায়গায়। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি বলে, তোমায় একটা কথা বলবো ? বর জিজ্ঞেস করে, কী ? মেয়েটি বলে, আমি... কথাটা শুরু করেই বরের দিক থেকে চোখ নামিয়ে নেয়। এটুকুতে যা বলার সেটা বলে দেওয়া হয় যেন অর্থাৎ, তুমি যে-ভাবে আমাকে চেয়েছো সেভাবেই নিজেকে তৈরি করেছি। ভালোবাসা বোঝাতে আর কী চাই বলুন ? 
 
         এ ছবির আরেক সম্পদ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুর সংযোজনা। ছবিতে দশখানা গান। তরুণ মজুমদারের অন্যান্য সিনেমার মতো বালিকা বধূতেও নজর কাড়ে এই ছবির গানগুলি। এই ছবিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, মনমোহন, হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার রচিত গানে ছবিগুলি আরও উজ্জ্বলতা পেয়েছে।
 
         প্রথম ছবি চাওয়া পাওয়াতে সুরকার ছিলেন নচিকেতা ঘোষ৷ গানও সুপারহিট৷ তবু তারপর গানের ক্ষেত্রে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর এত চমত্‍কার জুটি তৈরি হল কী করে ? তরুণবাবু বলছিলেন, হেমন্তবাবুর সততা ও সারল্য তাঁকে মুগ্ধ করেছিল৷ তাই পঁচিশ বছরের বেশি জুটিটা টিকে গিয়েছে একের পর এক হিট গান দিয়ে৷ নিজেই বললেন, ব্যাপারটা বেনজির৷ বিশ্বে পাওয়া মুশকিল৷
 
         তরুণ মজুমদার পরিচালক জীবনের প্রথম কয়েক বছর শচীন মুখার্জি ও দিলীপ মুখার্জিকে সাথে নিয়ে যাত্রিক নামে যৌথ ভাবে চারটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। উত্তম-সুচিত্রাকে নিয়ে যাত্রিক তৈরি করেছিলেন চাওয়া পাওয়া (১৯৫৯)। ১৯৬০-এ যাত্রিক-এর তৈরি স্মৃতিটুকু থাক-এ সুচিত্রার ছিল দ্বৈত ভূমিকা। ১৯৬৩-তে যাত্রিক আরও দুটি হিট ছবি উপহার দেন পলাতককাচের স্বর্গ। ১৯৬৫ সাল থেকে তরুণবাবু নিজেই সিনেমা পরিচালনা শুরু করেন।
 
তাঁর একক ভাবে পরিচালিত চলচ্চিত্র
 
    আলোর পিপাসা-১৯৬৫
    একটুকু বাসা-১৯৬৫
    বালিকা বধূ-১৯৬৭
    রাহগির-১৯৬৯
    নিমন্ত্রণ-১৯৭১
    কুহেলি-১৯৭১
    শ্রীমান পৃথ্বীরাজ-১৯৭৩
    ঠগিনী-১৯৭৪
    ফুলেশ্বরী-১৯৭৪
    সংসার সীমান্তে-১৯৭৫
    বালিকা বধূ -১৯৭৬ (হিন্দি)
    গণদেবতা- ১৯৭৮
    দাদার কীর্তি-১৯৮০
    শহর থেকে দূরে- ১৯৮১
    মেঘমুক্তি-১৯৮১
    খেলার পুতুল-১৯৮২
    অরণ্য আমার-১৯৮৪
    অমর গীতি-১৯৮৪
    ভালোবাসা ভালোবাসা-১৯৮৫
    পথভোলা- ১৯৮৬
    আগমন-১৯৮৮
    পরশমণি- ১৯৮৮
    আপন আমার আপন-১৯৯০
    পথ ও প্রাসাদ-১৯৯১
    সজনী গো সজনী- ১৯৯১
    কথা ছিল-১৯৯৪
    আলো-২০০৩
    ভালোবাসার আরেক নাম-২০০৫
    চাঁদের বাড়ি-২০০৭
 
         ১৯৩১ সালে বাংলাদেশের বগুড়ায় জন্ম আমাদের খুব প্রিয় পরিচালক এই তরুণ মজুমদারের। হিন্দু মুসলমান প্রায় সমান সমান বগুড়ায় তখন। এক সাক্ষাৎকারে তরুণ মজুমদার বলছেন—“শ্রদ্ধেয় মাস্টারমশাইরা বেশিরভাগই মুসলমান। তাঁরা যে কি ভালোবাসা দিয়েছেন আমাকে তার সীমা-পরিসীমা নেই। বন্ধুবান্ধবের ক্ষেত্রেও একই কথা বলব। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল একজন মুসলিম ছেলে। ১৯৪৫ এ দেশত্যাগ। গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং। তার মধ্যেই ম্যাট্রিকুলেশন দেওয়া। সব সাবজেক্টে লেটার শুধু অঙ্ক ছাড়া। তাই প্রেসিডেন্সি, সেন্ট জেভিয়ার্স, স্কটিশ চার্চ ইত্যাদিতে ভর্তি হতে না পেরে সেন্ট পলস কলেজ। ওখানকার হোস্টেলেই থাকা। স্কলারশিপের টাকাতেই পড়াশুনো। সেন্ট পলস থেকে আইএসসি পাশ করে স্কটিশ চার্চে কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে ভর্তি। পড়াশোনার পর্ব স্কটিশেই শেষ।
         বগুড়াতে দুটো সিনেমা হল ছিল। ওখানে যেসব ছবি আসত, তাদের মধ্যে হয় এখানকার নিউ থিয়েটার্সের ছবি অথবা বোম্বে টকিজের ছবি। ইংরেজি ছবি মানে যেমন চার্লি চ্যাপলিনের ছবি ইত্যাদি দেখেই ছবির প্রতি এক গোপন আকর্ষণ। সে সময় থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু। এমন সময় একজন হঠাৎ একদিন এসে বলল, মেট্রো সিনেমার গলিতে সাইক্লোস্টাইল করা স্ক্রিপ্ট বিক্রি হয় খুব সস্তায়। বোধহয় চার আনা দাম ছিল। ১৯৪৫-৪৬ সাল তখন। গিয়ে দেখলেন, সত্যি সত্যি রাস্তার ধারে কিছু মুসলমান স্ক্রিপ্ট ঢেলে, ছড়িয়ে অবহেলায় বিক্রি করছে। আসলে মেট্রো গোল্ডউইন মেয়ারের যেসব ছবি আসত, তাদের সঙ্গে এক কপি করে সাইক্লোস্টাইল স্ক্রিপ্ট পাঠানো হতো সেন্সরের জন্য। সেন্সর হয়ে যাওয়ার পর ছবি রিলিজ হয়ে গেল, ওইগুলো ওরা হয়তো সের দরে বিক্রি করত। সেগুলো কিনে নিয়ে এরা আবার চার আনা দরে বেচত। এছাড়াও সেই সময়ের কিছু কিছু পত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়ে জানাচেনা ইত্যাদি এগিয়ে চলছে। মনের মধ্যকার সুপ্তবাসনাটা হারিয়ে যায়নি। সব ইংরেজি ছবির স্ক্রিপ্ট। এই করতে করতে, আগ্রহ জন্মাতে শুরু করল। স্ক্রিপ্টের স্ট্রাকচার সম্পর্কে ধারণা জন্মাতে শুরু করল। একটা স্ক্রিপ্টে কী কী হয়, কী কী থাকে ইত্যাদি। ওনার মামাবাড়িতে ওনার বড়মামা ফিল্মের সঙ্গে রিমোটলি কানেক্টেড ছিলেন। যখন পড়াশোনো শেষ হয়ে গেল তখন বড়মামাকে বললেন ফিল্ম লাইনে যোগ দেবার ইচ্ছের কথা।
 
         উনি বলছেন—“ আমার বাবা, মা, কাকা, অন্য কাকারা বললেন, তোমার মন যেদিকে চায় তুমি তাই করো, আমরা ঠিক চালিয়ে নেব। তখন আমি মামাকে ফের বলতেই মামার এক পরিচিতকে মামা আমার কথা বললেন। তিনি ছিলেন একটি ফিল্ম স্টুডিওর মালিক। পার্ক সার্কাসের ঝাউতলা লেনে তাঁদের স্টুডিও ছিল। এখন অবশ্য সেটা আর নেই। একদিন সেখানে মামা আমায় নিয়ে গিয়ে ওই মালিক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। তিনি আমাকে বললেন যে, আপনাকে আমরা তো এমনি নিতে পারব না, মাইনেও দিতে পারব না, আপনি ক্যামেরা ডিপার্টমেন্টে অবজারভার হয়ে থাকতে পারেন। প্রথম দু-তিনদিন আমি জাস্ট এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকতাম, লজ্জা লজ্জা করত। অবশ্য কেউ আমাকে বিশেষ লক্ষও করত না। টিফিন খাওয়ার সময় সবার জন্য খাবার এলে আমি আস্তে আস্তে এক কোণে সরে যেতাম, আবার পরে চলে আসতাম। কিন্তু কদিন পরে দেখা গেল আমাকে নিয়েও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। ওখানকার যিনি সাউন্ড রেকর্ডিস্ট তিনি একদিন এসে বললেন, আপনি এখানে কেন ঘোরাফেরা করছেন, আপনি তো আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের মেম্বার নন। ফলে এখানে খুব একটা সুবিধে হবে না। CTAB বলে একটা সংস্থা ছিল সেই সময় Cine Technicians Association of Bengal। আমি বললাম, আমি যদি মেম্বার হই? বললেন, না। এখন আর মেম্বার নেওয়া হচ্ছে না, কারণ এমনিতেই চারদিকে অনেক বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। সুতরাং আপনার কাজ করা চলবে না। অগত্যা আমি বেরিয়ে এলাম। এটা স্টুডিওতে ঢোকার দিন পাঁচ-ছয় পর।
 
         এরপর কী করি ! কী করি ! কী করি ! অন্য একটি চাকরি পেয়ে ঢুকে গেলে, ফিল্ম থেকে চিরকালের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে যাব, এই ভেবে তখন আমি যারা শুধু ফিল্মেরই পাবলিসিটি করে, এমন একটি পাবলিসিটি কনসার্নে চাকরি নিয়ে ঢুকলাম। খুব অল্প টাকায়, শুধু যোগাযোগটা রাখার জন্য। একটু কষ্ট হলেও ফিল্মের লোকজনের কাছাকাছি আসতে পারব, এটুকুই ছিল বড় পাওনা। যাঁরা ওই কনসার্নে পাবলিসিটির ভার দিতেন, তাঁদের মধ্যে কানন দেবী, দেবকী বাবু ছিলেন। এঁদের সঙ্গে আমার আস্তে আস্তে আলাপ শুরু হলো। শেষ পর্যন্ত কানন দেবীই একদিন বললেন, আমি শুনেছি যে, আপনার ফিল্মে আসার ইচ্ছে আছে। আপনি আমার অর্গানাইজেশন শ্রীমতী পিকচার্সে অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে জয়েন করুন। আমার দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট আছে। আমি তো মাইনে দিয়ে রাখতে পারব না, কিন্তু আপনি অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবে কাজ করুন। দ্বিতীয়বার আমি ফিল্ম-আঙিনায় পা দিলাম। আমি অ্যাপ্রেন্টিস হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছি without any pay। পরের দিকে ওঁরা আমাকে রেমুনারেশন নিতে বলেছিলেন, কিন্তু আমি দেখলাম ওঁদের সঙ্গে এত সুন্দর সম্পর্ক হয়ে গেছে, টাকা-পয়সা মাঝখানে এসে যদি তাকে নষ্ট করে দেয়, সেজন্য আমি আর কিছু বলিনি। ওইখানে থাকতে আমার ওপর যে দুজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন তারাই হলেন দিলীপ বাবু আর শচীনবাবু। ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হলো। তারপর আমরা ঠিক করলাম আমরা নিজে পরিচালনায় আসব।
 
         এই সময়েই আলাপ উত্তমকুমারের সাথে। উত্তমই আমাকে বলেছিল যে, ভবিষ্যতে আপনি যদি কোনো ছবি করেন আর আমাকে দরকার হয়, তাহলে বলবেন, আমি আছি। আমি ভাবলুম, এ বোধহয় কথার কথা। রাতেই আবার আমরা যেখানে ছিলাম, রাজগিরে, সেখানে এসে বললেন, আমি কিন্তু তখন এমনি এমনি বলিনি। সত্যি সত্যি বলেছি। যদি দরকার হয় তো বলবেন।
 
        আর মিসেস সেনও আলাদাভাবে এরকমই বলেছিলেন। এই খবর কী করে বাইরে প্রচার হয়ে যায়, তখন যারা রূপবাণী, ভারতী, অরুণা সিনেমা হলের মালিক, তাদের একটা প্রোডাকশন অর্গানাইজেশন ছিল। তারা আমাদের ডেকে বললে, তোমরা সৎপথে থেকে কাজ করো। খেটে-খুটে ছবি করো, আমরা তোমাদের পেছনে আছি। এই হলো চাওয়া-পাওয়া ছবির শুরু।
 
         আর থামতে হয়নি তরুণবাবুকেআপামর সাধারণ বাঙালির খুব কাছের মানুষ হয়েই থেকেছেন আজীবন। সম্প্রতি একটি গল্পের বই বেরিয়েছে দেজ পাবলিশিং থেকে৷ নাম বাতিল চিত্রনাট্য৷ তার থেকে একটা গল্প শোনাই। তাহলেই বুঝতে পারবেন কেমন ভালোবাসা পেয়েছিলেন তরুণ মজুমদার। গল্পে হিরণ সেন হলেন তিনি নিজেই
“………
মুন্নি (গানের কোরাসে এক শিশু শিল্পীর গল্প)
 
পরিচালক হিরণ সেন তাঁর ডায়মন্ড জুবিলি সিনেমা দেখতে গিয়েছেন রবিবার৷ দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখতে৷ হঠাত্‍ই বেপরোয়ার মতো ভিড় ঠেলে তাঁর কাছে হাজির এক তরুণী৷ সামনে এসে বলেন, কী মানুষ রে বাবা ! ডেকে ডেকে গলা চিরে গেল ! তার পর প্রণাম করেই প্রশ্ন, চিনতে পারছেন আমায়? কিছুতেই চিনতে পারা যাচ্ছে না৷ আর বিবাহিত তরুণী প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছেন৷ বললেন, জানতাম, নামী মানুষরা ভুলেই যান৷ ঠিক আছে৷ আমায় না হয় ভুলে গিয়েছেন৷ কিন্তু মাটির স্বর্গ ছবিটা ভুলে যাননি তো?
 
মাটির স্বর্গ পরিচালকের তেইশ বছর আগের ছবি৷ (আসলে তরুণ মজুমদারের সিনেমার নাম ছিল কাঁচের স্বর্গ৷ করেছিলেন ১৯৬১ সালে)
তরুণী তাঁকে প্রশ্ন করেন, কটা গান সেটায় ছিল মনে আছে?
হিরণবাবু হিসেব কষে বলেন, চারটে৷
তরুণীর প্রশ্ন, কোনও গ্রুপ সং ছিল তাতে ? রবীন্দ্র সঙ্গীত ?
হিরণবাবু বলেন, আগুনের পরশমণি৷ কালিম্পংয়ে হয়েছিল শুটিং৷ আপনি বুঝি শুটিং দেখতে গিয়েছিলেন?
মেয়েটি যেন সব দেখতে পাচ্ছেন, এই ভাবে বিবরণ দিতে থাকেন৷ হা আমার কপাল গো৷ আপনি কাকে আপনি বলছেন, ও কাকু ? কাজলমাসি হয়েছিলেন হেডমিসট্রেস৷ আপনি ওই সিনে চব্বিশ জন ছাত্রীকে লাইনে সার বেঁধে দাঁড় করিয়েছিলেন৷ ফার্স্ট রোয়ের ডান দিকে আপনি কাকে দাঁড় করিয়েছিলেন, মনে করে দেখুন৷ রিহার্সালের ফাঁকে সবার হাতে চারটে করে টফি দিলেন৷ আমাকে প্রশ্ন করলেন, তোমার কী নাম ? আমি যখন বললাম, মু্ন্নি, আপনি বললেন, মুন্নি কী ? ভালো নামটা বলো৷ আমি যখন বললাম, পারমিতা ব্যানার্জি৷ আপনি বললেন, বাঃ বেশ নাম! বলেছিলেন কিনা৷ বুকে হাত রেখে বলুন৷
সঙ্গে স্বামী ও বাচ্চা৷ খপ করে পরিচালকের হাত ধরে মুন্নি বলেন, আমার বাড়ি চলুন৷ এই তো সামনে বকুল বাগানে৷ দুমিনিট লাগবে৷
কোনও ভাবে এড়িয়ে যেতে না পেরে মুন্নিদের সঙ্গে বাড়ি যেতে হয় পরিচালক ও তাঁর বন্ধুকে৷ গিয়ে দেখা যায়, আদতে গলির গলি তস্য গলির মধ্যে পুরোনো বাড়ির একতলায় দেড় খানা ঘর৷ কোনও মতে সংসার চলে৷ লোডশেডিংয়ের মধ্যে বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে৷ মেয়েটি বরকে দোকানে পাঠিয়ে খাবার আনায়৷ তার পর হিরণের বাঁ-হাত খানা টেনে কড়ে আঙুলের গোড়ায় অসংকোচে চাপ দিয়ে বলে, ও কাকু সেটা আছে এখনও?
কোনটা?
সেই যে গো, তোমার কড়ে আঙুলের ব্যথাটা ? শুটিংয়ের সঙ্গে পা হড়কে পড়ে যা কাণ্ড বাঁধালে৷
অবাক হিরণ৷ বলে ওঠে, তোমার মনে আছে ?
ও মা, মনে থাকবে না কেন ? সবাই ছুটে এসেছিল৷ বরফ ঘষল৷ আপনি বললেন, ও কিছু নয়৷ মুখে বললেন বটে, কিন্তু আমি তো জানি, চোট বেশ ভালোই৷ বুকে হাত দিয়ে বলুন৷
উঠে আসার আগে হিরণ সংকোচে বলেন, তোমায় আমি যদি একটা জিনিস দিই, নেবে ? তোমায় ঠিক নয়, তোমার খোকনের জন্য৷
তিনি ও তাঁর বন্ধু বুঝে গিয়েছেন, মুন্নির সংসারে খুব টানাটানি৷ দিন আনি দিন খাই দশা৷
কী জিনিস ? তাঁর প্রশ্ন৷
পরিচালক আরও সংকোচ নিয়ে একটা পাঁচশো টাকার নোট বের করেন৷ যা দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন মুন্নি৷
তারপর বলেন, তুমি কী গো কাকু ? তুমি নিজে দিচ্ছ, তাও আমার বাবুসোনার জন্য৷ আর আমি নেব না ? বলতে বলতে টাকাটা নিজের হাতে নিয়ে বলেন, টানাটানির সংসার আমাদের৷ নুন আনতে পান্তা ফুরোয়৷ ওর যা চাকরি, মাইনে বাড়ার সম্ভাবনা নেই৷ বিয়ের পর সব ঠিকঠাক ছিল৷ কিন্তু জিনিসের এত দাম বেড়ে গেল, বাবু সোনা এল, খুব কষ্ট৷ ভেতরের ঘুন বুঝতে দিই না৷ এমব্রয়ডারি দিয়ে ঢেকে রাখি৷  বলে পাঁচশো টাকার নোটটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেন সেই তরুণী৷ হেসে বলে, তা বলে এ টাকা আমি খরচ করতে পারব না৷ আজ না, কোনও দিন না৷ বাবুসোনা বড় হয়ে দেখবে, তুমি নিজে এসেছিলে ওকে আশীর্বাদ করতে৷ কত বড় শুভচিহ্ন এটা ? শুভচিহ্ন কি নষ্ট করতে আছে ? বলো!
 
হিরণ ও তাঁর বন্ধুকে প্রণাম করে আলমারির অজস্র জিনিসের মধ্যে একটা ফুলদানি বের করে আনেন মুন্নি৷
একটা জিনিস দেখাই তোমাদের৷
কী ?
ফুলদানিতে হাত ঢুকিয়ে অতিকষ্টে রঙিন কটা কাগজের টুকরো বের করে আনেন তিনি৷ পুরনো হয়ে গিয়েছে কাগজগুলো৷ দলা পাকানো কাগজ হাতের মধ্যে রেখে হিরণকে প্রশ্ন করেন মুন্নি, কাকু, চিনতে পারো এ গুলো ?
কী এ সব ?
ভেবে দ্যাখো৷ খুব ভালো করে ভেবে দ্যাখো৷ দেখি তোমার বুদ্ধি৷
পরিচালককে নির্বাক দেখে মুন্নি নিজেই বলেন, সেই যে কালিম্পংয়ে শুটিংয়ের সময় চারটে টফি দিয়েছিলে৷ টফিগুলো অবশ্য নেই৷ তবু মোড়কগুলো রেখে দিয়েছি৷ রং চটে গিয়েছে৷ তবু তোমার স্মৃতির জন্য রেখেছি৷ টাকার নোটটা ফুলদানির মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে মুন্নি বলেন, এটাও থাকবে এমনি করে৷ তুমি দেখে নিয়ো৷ এটা আমার বাবুসোনার শুভচিহ্ন৷
 
         বুকের মধ্যে থেকে আনন্দের কান্না ঠেলে বেরিয়ে আসে যেন। তাই না ?
 
বালিকা বধূর গানগুলো
 
লাগ লাগ লাগ রঙের ভেলকি লাগ    - হেমন্ত মুখোপাধ্যায়  -         গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার
ছেড়ে দাও রেশমী চুড়ি               - সবিতাব্রত দত্ত      -         চারণকবি মুকুন্দ দাস
আমি কুসুম তুলিয়া                   - হেমন্ত + বাণী দাশগুপ্ত -       গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার
শুক বলে সারি কেন                  - হেমন্ত + বেলা মুখোঃ -        গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার
ভজ গৌরাঙ্গ কহ গৌরাঙ্গ              - হেমন্ত                  -     প্রচলিত
আজি এসেছি আজি এসেছি            - রবীন বন্দ্যোপাধ্যায়      -    দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
মলয় আসিয়া কহি গেছে কানে         - রবীন বন্দ্যোপাধ্যায়      -          দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
ভালবেসে সখী নিভৃতে যতনে          - লতা মঙ্গেশকর          -          রবীন্দ্রনাথ
গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ                                    -         রবীন্দ্রনাথ
ও আমার দেশের মাটি                                           -         রবীন্দ্রনাথ
 
(১)
হায় এরেরেরেরেরেরেরেএএ হোলি হ্যায়
লাগ লাগ লাগ রঙের ভেলকি লাগ
পরাণে জেগেছে ফাগুয়া
হোলি হ্যায়।
কুমকুম রাঙা ফাগে আবীরের অনুরাগে
রাঙাব তোমারি তনু ওগো বঁধূয়া
হাআআআআ রাঙাব তোমারি তনু ওগো বঁধূয়া।
হোলি হ্যায়।
কোনো মানা নাহি মানি রাঙাব বসনখানি
ভুবনে এসেছে আজি মধু-ফাগুয়া।
ওগো নাগরী কাঁখে গাগরী
শোনো নীপশাখে রহে শুধু
ঝুলনে দুলিব দুঁহু
রাঙাব তোমারি তনু ওগো বধূয়া
হাআআআআ রাঙাব তোমারি তনু ওগো বধূয়া।
হোলি হ্যায়।
আজ বধূ সারা বেলা হবে শুধু হোলি খেলা
ভুবনে এসেছে আজি মধু-ফাগুয়া।
এমনি বিজনে মোরা দুজনে
শুধু রঙহারা পিচকারি ক্ষণে ক্ষণে ছুঁড়ে মারি
রাঙাব তোমারি তনু ওগো বধূয়া
*
(২)
সখী রে আমার প্রাণপাখি রে
আমি কুসুম তুলিয়া গেঁথেছি যে মালা
এই যে কুঞ্জ কাননে
প্রাণেশ্বরী হে পরাণ ব্যাকুল
হয় গো তোমারি স্ত্রীধনে।
 
ফুটিল মালতী বহিছে মলয়
চন্দ্র হাসিছে গগনে
বসন্ত তিথি মিছেই আসেনি
আজিকে মম জীবনে।
এই যে কুঞ্জ কাননে
 
এসেছি এসেছি কেঁদো নাগো আর
মুছে নাও আঁখি ভাই
তোমারে ছাড়িয়ে ওগো প্রিয়তম
দেখো কি হয়েছে ভালবাসা মম 
জনম মরণে তুমি প্রাণনিধি
তোমারে ছাড়িব কেমনে।
 
ও মুখখানি করিও না ভার
আমি আর যে সহিতে পারি না।
 
এসো ওগো আজিকে  মিলে যাব খেলায়
মাতব মোরা দুজনে
কর্ম টুটে রহিব জাগি দেখব বাসর শয়নে।
*
(৩)
শুক বলে কেন সারি বাপের বাড়ি যাস
সারি বলে তোর জ্বালা কে সইবে বারো মাস।
জ্বালাতন সইব না সইব না-
তোর ঘরে রইব না।
শুক বলে ওলো সারি ঘরে ফিরে চল
সারি বলে ফিরতে পারি পায়ে ধরে বল।
নইলে ফিরব না ফিরব না
তোর ঘরে ফিরব না।
শুক বলে সোয়ামী কি ধরে বৌয়ের পা
আর সারি বলে তাহলে তুই বেগুন পোড়া খা-
নইলে বাঁচবি কিসে !
শুক বলে নাক ফুলিয়ে দোলাস নে রে নথ।
আর সারি বলে ফিরতে পারি
দে তুই নাকে খৎ আমার দায় পড়েছে।
 
কলিকালে কি হল- হায় বিধি কি হল।
ও সারি- সারিরে তুই ঘরে ফিরে চল।
      বলছিস ?
আমার মাথা খা।
      বলছিস ?
জ্বালাতন করব না-  করব না
চুলের মুঠি ধরব না।
শুক বলে দোহাই সারি ঘরে ফিরে চল
আর সারি বলে কথা দে তুই, গড়িয়ে দিবি মল।
নইলে দায় পড়েছে।
শুক বলে গঞ্জনা তোর, আর তো নাহি সয়
এই সারি বলে, মুখের কথায় ভবী ভোলার নয়।
আমার দায় পড়েছে।
শুক বলে তুই বললে সবই করতে পারি।
সারি বলে, তাহলে ভাব আর নয় আড়ি।
শুক বলে সবই দেব পরাণ যা তোর চায়-
সারি বলে তোর মত আর সোয়ামী কজন পায় !
আমি ভাগ্যবতী পরম সতী আমার মত সুখী কে ?
আমি ভাগ্যবান বৌ যে প্রাণ আমার মত সুখী কে ?
আমি ভাগ্যবতী পরম সতী আমার মত সুখী কে ?
আমি ভাগ্যবান বৌ যে প্রাণ আমার মত সুখী কে ?
*
(৪)
আজি এসেছি, আজি এসেছি, এসেছি বঁধু হে
নিয়ে এই হাসি, রূপ, গান;
আজি আমার যা কিছু আছে, এনেছি তোমার কাছে,
তোমায় করিতে সব দান।।
 
আজি তোমার চরণতলে রাখি এ কুসুম ভার,
এ হার তোমার গলে দিই বঁধু উপহার,
সুধার আধার ভরি, তোমার অধরে ধরি, কর বঁধু কর তায় পান।
আজি হৃদয়ের সব আশা, সব সুখ-ভালোবাসা
তোমাতে হউক অবসান।।
 
ওই ভেসে আসে কুসুমিত উপবন-সৌরভ,
ভেসে আসে উচ্ছল-জলদল-কলরব,
ভেসে আসে রাশি রাশি, জ্যোত্স্না‌র মৃদু হাসি, ভেসে আসে পাপিয়ার তান।
আজি, এমন চাঁদের আলো, মরি যদি সেও ভালো,
সে- মরণ স্বরগ সমান।।
 
আজি তোমার চরণতলে লুটায়ে পড়িতে চাই,
তোমার জীবনতলে ডুবিয়া মরিতে চাই,
তোমার নয়নতলে শয়ন লভিব বলে, আসিয়াছি তোমার নিধান।
আজি সব ভাষা সব বাক্‌, নীরব হইয়া যাক্‌,
প্রাণে শুধু মিশে থাক্‌ প্রাণ।।
*
(৫)
ছেড়ে দেও রেশমী চুড়ী বঙ্গনারী,
কভু হাতে আর প'রো না।
জাগ গো জননী ও ভগিনী,
মোহের ঘুমে আর থেকো না॥
কাঁচের মায়াতে ভুলে শঙ্খ ফেলে,
কলঙ্ক হাতে আর প'রো না।
তোমরা যে গৃহলক্ষ্মী ধর্মসাক্ষী,
জগত্ ভ'রে আছে জানা।
চটকদার কাঁচের বালা ফুলের মালা,
তোমাদের অঙ্গে শোভে না॥
বলিতে লজ্জা করে প্রাণ বিদরে,
কোটি টাকার কম হবে না।
পুঁতি কাঁচ ঝুটো মুক্তায় এই বাংলায়,
নেয় বিদেশী কেউ জানে না॥
ঐ শোন বঙ্গমাতা শুধান কথা,
জাগ আমার যত কন্যা।
তোরা সব করিলে পণ মায়ের এ ধন,
বিদেশে উড়ে যাবে না॥
আমি অভাগিনী কাঙ্গালিনী,
দু'বেলা অন্ন জোটে না।
কি ছিলেম, কি হইলেম, কোথায় এলেম,
মা যে তোরা চিনলি না॥
*
(৬)
ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম রে।
যেই জনা গৌরাঙ্গ ভজে, সে হয় আমার প্রাণ রে॥
গৌরাঙ্গ ভজিলে, গৌরাঙ্গ জপিলে হয়, দুঃখের-ও অবসান রে।
ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম রে॥
গৌরাঙ্গ বলিয়া, দু-বাহু তুলিয়া, নাচিয়া নাচিয়া বেড়াও রে।
ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম রে॥
ভজ গৌরাঙ্গ, কহ গৌরাঙ্গ, লহ গৌরাঙ্গের নাম রে।
যেই জনা গৌরাঙ্গ ভজে, সে হয় আমার প্রাণ রে॥
*
(৭)
মলয় আসিয়া কয়ে গেছে কানে, প্রিয়তম তুমি আসিবে।
মম তৃষিত অন্তর ব্যথা সযতনে তুমি নাশিবে।
রবি শশী তারা সুনীল আকাশ,
সকলে দিয়েছে তোমার আভাস,
গোপনে হৃদয়ে করেছে প্রকাশ, তুমি এসে ভাল বাসিবে।
মম মর্ম মুকুরে দূর হতে সখা পড়েছে তোমার ছায়া,
সেথা অন্তরলোকে প্রেমপুলকে গড়েছি স্বপন কায়া।
আমার সকল চিত্ত প্রণয়ে বিকশি,
তোমার লাগিয়া উঠেছে উছসি,
কবে তুমি আসি অধর পরশি, মুখপানে চেয়ে হাসিবে।
*
(৮)
 
ভালোবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো-- তোমার
                                    মনের মন্দিরে।
আমার পরানে যে গান বাজিছে তাহার তালটি শিখো-- তোমার
                                    চরণমঞ্জীরে॥
ধরিয়া রাখিয়ো সোহাগে আদরে আমার মুখর পাখি-- তোমার
                                    প্রাসাদপ্রাঙ্গণে॥
মনে ক'রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী-- তোমার
                                    কনককঙ্কণে॥
আমার লতার একটি মুকুল ভুলিয়া তুলিয়া রেখো-- তোমার
                                    অলকবন্ধনে।
আমার স্মরণ শুভ-সিন্দুরে একটি বিন্দু এঁকো-- তোমার
                                    ললাটচন্দনে।
আমার মনের মোহের মাধুরী মাখিয়া রাখিয়া দিয়ো-- তোমার
                           অঙ্গসৌরভে।
আমার আকুল জীবনমরণ টুটিয়া লুটিয়া নিয়ো-- তোমার
                                    অতুল গৌরবে॥
*
(৯)
গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ    আমার মন ভুলায় রে।
ওরে    কার পানে মন হাত বাড়িয়ে    লুটিয়ে যায় ধুলায় রে॥
ও যে    আমায় ঘরের বাহির করে,    পায়ে-পায়ে পায়ে ধরে--
ও যে    কেড়ে আমায় নিয়ে যায় রে    যায় রে কোন্‌ চুলায় রে।
ও যে    কোন্‌ বাঁকে কী ধন দেখাবে,    কোন্‌খানে কী দায় ঠেকাবে--
          কোথায় গিয়ে শেষ মেলে যে    ভেবেই না কুলায় রে॥
*
(১০)
ও আমার      দেশের মাটি, তোমার 'পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে       বিশ্বময়ীর,  তোমাতে   বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা ॥
তুমি              মিশেছ মোর দেহের সনে,
তুমি              মিলেছ মোর প্রাণে মনে,
তোমার ওই     শ্যামলবরন কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা ॥
ওগো মা,      তোমার কোলে জনম আমার, মরণ তোমার বুকে।
                   তোমার 'পরে খেলা আমার দুঃখে সুখে।
তুমি              অন্ন মুখে তুলে দিলে,
তুমি              শীতল জলে জুড়াইলে,
তুমি যে         সকল-সহা সকল-বহা মাতার মাতা ॥
ও মা,            অনেক তোমার খেয়েছি গো, অনেক নিয়েছি মা--
তবু               জানি নে-যে কী বা তোমায় দিয়েছি মা!
আমার           জনম গেল বৃথা কাজে,
আমি             কাটানু দিন ঘরের মাঝে--
তুমি              বৃথা আমায় শক্তি দিলে শক্তিদাতা ॥
 
বেশ কয়েকটা গান এই লিংকে পাবেন-
https://mio.to/album/Dwijendralal+Roy/Balika+Badhu+%281967%29
 
         জীবনের শেষ সীমানায় পৌঁছে নায়ক অমল অনুভব করে জীবনটাকে সে তার পিতৃপুরুষের গৃহ এবং আবাল্য পরিচিত অঞ্চলের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরে প্রসারিত করেনি। তার এই সীমিত পরিসরের জীবনের একটিই প্রাপ্তি তার স্ত্রী চিনি ওরফে রজনীর সান্নিধ্য। এই দীর্ঘ চল্লিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে তারা পরস্পরের ছায়া হয়ে উঠেছে যেন, তারা পরস্পরের প্রতিটি কথা বোঝে, নীরবতা বোঝে; রাত্রে স্বামীর নিঃশ্বাসের শব্দের সামান্য হেরফেরে ঘুম ভেঙে যায় রজনীর। একটি মানুষকে এমন গভীর ভাবে চেনা, পরস্পরের অন্তবর্তী সংলাপ স্রোত আজীবন কাল প্রবাহিত রাখাএও এক বড় রকমের প্রাপ্তি । উপন্যাসের একেবারে শেষে তাই অমল স্বীকার করে নেয়।
 
বাহিরের অসীম আকাশ, তাহার দূর-দূরান্তের নক্ষত্র, তাহার উফুল্ল জ্যোৎস্না, ওই দিগন্তব্যাপী প্রান্তর বৃক্ষলতাদি একদা আমায় এই অতিক্ষুদ্র কক্ষ হইতে পরম উপেক্ষায় বাহিরে টানিয়া লইয়া ফুৎকারে বাতাসে মিলাইয়া দিবে। কিন্তু উহারা কোনওদিন বুঝিবে নাতাহাদের বিশ্বব্যাপী শূন্যতার সাধ্য নাই আমায় কিছু দেয়। অথচ নিতান্ত নগণ্য এক গৃহকোণে আমার বালিকা বধূ উহাদের সাধ্যাতীত। বস্তুগুলিই দিয়াছে।আমার পিতাঠাকুরকে আমি প্রণাম করি । তাঁহার কৃপায় অনেক পাইয়াছি।
 
আলোচনা শেষ করি মৌসুমী মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'বালিকা বধূ'র প্রিন্ট পুড়িয়ে দিয়েছিলাম লেখা থেকে একটুকরো উদ্ধৃতি দিয়ে। অত ছোট বয়সে কাজ করতে একটুও ইচ্ছে করত না। তার ওপর আমায় বড় দেখাতে টাইট ব্লাউজ, শাড়ি পরানো হত। ভীষণ বিরক্ত লাগত আর রেগে যেতাম। সেই রাগ মেটাই কী করে ? একপ্রস্থ শুট হওয়ার পর যেই ব্রেক হত ওমনি শুট হওয়া ফিল্ম পুড়িয়ে দিতাম ! আবার নতুন করে শুট হত। শেষে সন্ধ্যা রায় আমায় চোখে চোখে রাখতে শুরু করলেন। তিনি না থাকলে 'বালিকা বধূ' হতই না !  বাবার থেকেও বেশি ভালবাসতেন হেমন্তকাকু।
 
(সমাপ্ত)
 
#
 
©গৌতমদত্ত
৫ আগস্ট ২০২০
 
##
 
কৃতজ্ঞতা :-
 
১)      উইকিপিডিয়া।
২)      সুশীল সাহা ও শৌভিক মুপোপাধ্যায়-এর নেওয়া সাক্ষাৎকার মুখোমুখি তরুণ মজুমদার কালি             ও কলম ডট কম।
৩)      এম.ডেলিহান্ট ডট কম এর বিনোদন-এর পাতায় 'বালিকা বধূ'র প্রিন্ট পুড়িয়ে দিয়েছিলেন !
৪)      রূপায়ণ ভট্টাচার্য - তরুণ মজুমদারের আশ্চর্য কিছু সৃষ্টি – ব্লগএইসময় ডট ইণ্ডিয়াটাইমস ডট কম।
৫)      বাবলু মণ্ডল তরুণ মজুমদার এর ওপর গবেষণা পত্রের কিছু অংশ।          
৬)      তরুণ মজুমদার বাতিল চিত্রনাট্য দেজ।
৭)      অবশ্যই গুগুল।

##