স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা - (৩)
‘--দ্যাট ডিপেণ্ডস্ !’
১৯৭২ – আমি তখন ক্লাস ইলেভেন।
ছোটোকাকা’র কোনও এক বন্ধুর সাথে যাবার কথা ছিল দীঘায়। তিনি যেতে পারলেন না। অগত্যা আমার সুযোগ এল সুন্দরী দীঘাকে চর্মচক্ষে দেখার। একটা সাদা শান্ত অনুভূতি যেন। কোথায় যে হারিয়ে গেল সব সমুদ্রগর্ভে – কি জানি।
আজকের ট্যুরিষ্ট লজকে ডানহাতি রেখে সমুদ্র চোখে পড়তে না পড়তেই বাসগুলো স্যাট্ করে ডানহাতে ঘুরে যেত বাসস্ট্যান্ডে। আর দুপাশে ক্যাসুরিনার সারি ঘেরা সোজা রাস্তাটা নেমে যেত সাগর সৈকতে। সেই প্রথম দেখা, সমুদ্র সৈকতে হু হু করে ছুটছে গাড়ি – যদিও তখন হয়তো সারাদিনে একটা মটোর গাড়িকেই দেখতে পেতাম।
ওঠা হয়েছিল ‘চিপ ক্যান্টিনে’। সরকারী থাকার জায়গা। তক্তা পাতা একখানা ঘর, কমন টয়লেট। একটাকা হয়তো ভাড়া ! আর বিছানা নিলে আরো কয়েক পয়সা ! খাওয়া হতো ‘ক্যফেটেরিয়া’-য়। সেই সময়ে ঐ সমুদ্রের ধারে গোল বাড়িটাতেই খাবার ব্যবস্থা ছিল। আর সব শুনশান। ঝাউয়ের পাতা নড়া আর সাগরের ঢেঊ গর্জন। এই নিয়েই ছিল বাহাত্তরের দীঘা।
থাকার যায়গা বলতে এই চীপ ক্যান্টিন আর ‘সৈকতাবাস’। যতদূর মনে পড়ে।
নেট ঘেঁটে আর আমার প্রিয় লেখক শ্রদ্ধেয় শ্রী নারায়ণ সান্যাল মশাই—এর বই থেকে যা জানতে পেরেছি তাই বলি এবার।
হিকি সাহেবের গেজেট – মে – ১৭৮০
“We are informed that the following persons of figures and consequences arrived at Beercool for the benefit of their health and fish. Henry Grant Esqr, and Lady, and brother-in-law, Major Camac, Capt. Robinson of the Vellow, Dr. Allen (lately returned from Europe) Simeon Dronge Esqr., with his lady and son and heir, Miss. Brune, an extreamly elegant and agreeable young lady.”
চলুন না একটু মনে মনে ১৭৮০ সালে। পলাশী’র যুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্তর তেইশ বছর আগে ভাগীরথী তীরে। এগারো ঘন্টায় ! রবার্ট ক্লাইভ গোপনে গোপনে দলে টেনেছেন মীর জাফর, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ, রায় দুর্লভ ইত্যাদি মন্ত্রি-আমলাদের। বাঙলার শেষ নবাব সিরাজৌদ্দোল্লা বাঁচাতে পারলেন না বাঙলাকে। কলকাতা সারা ভারতের রাজধানী হতে চলেছে...
এমনই সময়ে কজন ইংরেজ চললেন ‘বিয়ারকুল’। অতীতের দীঘায় ! এক উদ্ভিন্নযৌবনা সুন্দরী ইংরেজ তনয়া মিস. ব্রুনে-কে নিয়ে – সাগরের হাওয়া আর মাছ খেতে। কি ভাবছেন ? ১৭৮০ সালের সুন্দরী দীঘা’র (বিয়ারকুল) সৈকতে সেই “সাউণ্ড অফ দ্য মিউজিক”-এর নায়িকা ‘জুলি এনড্রুজ’ এর মতো গীটার হাতে অষ্টাদশী মিস. ব্রুনেই ! জাস্ট এমাজিং ! ফাঁকা সৈকত ভরে উঠছে ব্রুনেই এর গানে। সাগরের ঢেউয়ে মিশে যাচ্ছে গীটারের শব্দ। ঘন ক্যাসুরিনায় ভরে আছে চারপাশ। চতুর্দিকে সাদা বালির শক্ত সৈকত।
কিন্তু এখানেই একটা খটকা ! এনারা জানলেন কি করে যে এমন একটা জায়গা বাঙলায় আছে !
ফিরতে হবে ১৭৭০ এ। গর্ভনর জেনারেল ওয়ারেন হেষ্টিংস তাঁর বিলেত প্রবাসী স্ত্রী মেরি’কে চিঠি’তে জানাচ্ছেন এই সৈকতের বর্ণনা। তিনি উল্লেখ করেছিলেন দীঘা’কে “The Brighton of the East” – এই নামে।
“ BEERCOOL was the sanatorium the Brighton of Calcutta, and the newspapers and Council records mention constantly that So-and-so is " gone to Beer-cool for his health." Coursing, deer-stalking, hunting, and fishing are mentioned as being obtainable in the neighbourhood, and in May of this year the * Bengal Gazette' gives publicity to a scheme for developing the place, quite in the modern style. It has already the advantage of a beach which provides perhaps the best road in the world for carriages, and is totally free from all noxious animals except crabs, and there is a pro-posal to erect convenient apartments for the reception of the nobility and gentry, and organise entertainments. The scheme appears to have been only partially carried out, for in 1796 Charles Chapman writes :
" We passed part of the last Hot Season at Beercool, to which place, I believe, you and Mrs Hastings once projected an Excursion. The Terrace of the Bungalo, intended for you, is still pointed out by the People, but that is all that remains of it. The Beach is certainly the finest in the World, and the Air such as to pre-clude any Inconvenience being felt from the Heat. Mrs Chapman found the Bathing agree with her so well, that if here and alive next year, we shall make another Trip."
BALASORE
was further off, quite out of the river, and was often the goal when a short
sea-voyage was ordered for an invalid. “
এরপরে বলতেই
হয় এই দীঘার জনক ‘জন ফ্রাংক
স্নেইথ্’ এর কথা। এখনো
তাঁর স্মৃতি ছড়িয়ে আছে পুরোনো দীঘার চতুর্দিকে। আমার কাছেও।
স্বাধীনতার পরে বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী হলেন ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়। স্নেইথ্ সাহেব তাঁর কাছে একটা চিঠি লিখে অনুরোধ করলেন এই সৈকতে একটা সুন্দর ট্যুরিস্ট স্পট বানানোর। দুরদর্শী ডাক্তারবাবু এই চিঠির সৌজন্য রেখেছিলেন। তৈরি হল দীঘা। পরবর্তী কালে দীঘা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি। গড়ে উঠল থাকার জন্য সৈকতাবাস, চীপ ক্যান্টিন আর ক্যাফেটেরিয়া। ট্যুরিষ্ট লজের ভাবনা তো অনেক পরের গল্প। সাধারন মানুষ যাতে সমুদ্র সৈকত শহর দীঘায় জমি কিনে বাড়ি বানাতে পারেন তার রূপরেখা বা ব্রোশিওর আমি স্বচক্ষে দেখেছি। খুবই ছোট তখন। কিন্তু সে প্রকল্প মুখ থুবড়েই পড়েছিল আমাদের অনীহায় না সরকারী ঔদাসীন্যে তা ভবিষ্যতের গবেষক খুঁজে বার করতে পারেন।
কবি তুষার রায় লিখে ফেললেন কবিতা দীঘা’কে নিয়েও...
“নীল
গাঢ় দূরে সাগরের কাছে
চুপ শুনি ঝুপ বালিয়াড়ি ভাঙে
দেখি ঝাউবন খুব ঝুঁকে আছে
খুব ঝুঁকে কিছু বললো ছেলেটা
মুখেতে কুলুপ মেয়েটিও রাঙে
বুঝি মাছ পেলো ওপাশে জেলেটা
এসেছি দীঘায় টানা নীল রঙ বাসে
বাকি আছে শুধু চাঁদের জোয়ার দেখা
দুলে ওঠে ঝাউ একটানা নিঃশ্বাসে
অস্তবেলায় আকাশে এমন লাল
দেখছি ধূসর বেলায় দাঁড়িয়ে একা
নেই কোথা কেউ ঘনায় আঁধার জাল
এসেছি এখানে দুটি বেলা আজ কাল
একাই এসেছি একা চলে যাব কাল। - (কবিতা - দীঘা ’৭১ – তুষার রায়)
আমার শ্রদ্ধেয় লেখক শ্রী নারায়ন সান্যাল মহাশয় কে স্মরণ করতেই হচ্ছে এবার –
“আজকের তমলুকের সঙ্গে প্রাচীন তাম্রলিপ্তের যেটুকু নাড়ীর যোগ, আজকের দীঘার সঙ্গে অষ্টাদশ শতাব্দীর বীয়ারকুলের রক্তের সম্পর্কটা ছিল তার চেয়েও নিকটতর। রামনগর খাল, দীঘা মোহনা, বীরকুল পরগণার পরিচয় দেখে মনে হয় যে, আজকের দীঘা আর সেদিনের বীয়ারকুলের অবস্থান অভিন্ন। ক্যারী সাহেবের Hon’ble John Company – তে পাচ্ছি ;
‘হিজলী (Hidgelee) থেকে অনতিদূরে এই সমুদ্রসৈকতটির নাম বারকুল
(Burcool)। ১৭৮০ থেকে ১৭৮৫ সালের মধ্যে এই মনোরম সমুদ্রসৈকতটি ‘কলকাতার ব্রাইটন’ নামের খেতাব পেয়েছিল। সে সময়ে
সেখানে অনেকগুলি বাঙলোবাড়ি ছিল –
অবসর যাপনের উদ্দেশ্যেই অনেকেই সেখানে যেতেন। তারপর কেন জানিনা, এই সমুদ্রসৈকতটি জনশূন্য
হয়ে পড়ে। ১৮২৩ সাল-তক্ সেখানে একটিমাত্র বাঙলোবাড়ি মাথা খাড়া করে দাঁড়িয়েছিল। বাঙলোটি
বানিয়েছিলেন ওয়ারেন হেষ্টিংস্।’
......
সে আমার প্রথম
দীঘা-দর্শন নয়। উনিশ শ’
বাষট্টি সালের শেষাশেষি। বিধানচন্দ্র গত হয়েছেন—প্রফুল্লচন্দ্র
তখন সদ্য হয়েছেন বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী। দীঘাতে
সমবেত হবেন গণ্যমান্য অতিথিবৃন্দ। মন্ত্রীই আসবেন সাত-আটজন। এমন—কি স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। আর কালো
গগ্লস্ চোখে আরও একজন কিং—মেকার
! ফলে একেবারে হৈ-হৈ রৈ-রৈ কাণ্ড। কাঁধে—ক্যামেরা
সাংবাদিকদের দল দীঘাকে ছেয়ে ফেলেছেন। উদ্দেশ্য মহৎ এবং সনাতন। ‘বেঙ্গল গেজেটে’র ১৭৮০ সালের প্রকাশিত সম্পাদকীয়
ভাষায় : বীয়ারকুলকে একেবারে আধুনিক ঢঙে ঢেলে সাজাবার ব্যবস্থা !
......
......অপরাহ্নে সমুদ্রের ধারে একটু বেড়াতে যাবার ইচ্ছে ছিল—ঐ যেখানে আমার কল্পনার সৈকতাবাস অদূর ভবিষ্যতে মাথা চাড়া দিয়ে জেগে উঠবে ; হয়তো ঠিক ঐখানটাতেই দেড়—দুশ’ বছর আগে সমুদ্রস্নান করে গেছেন সেই এলিগেন্ট এবং এগ্রিয়েব্ল্ তরুণী মিস্ বার্ণে। ......রাতে ভূরিভোজের আয়োজনটি ছিল পরিপাটি। দিঘার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর অরুণবাবু এসে যোগ দিলেন আহারের টেবিলে।
আহারান্তে অরুণবাবু সৈকতাবাসের নক্শাটি দেখতে চাইলেন। আমি সেটা খাটের ওপর মেলে দিলুম। ব্যাপারটা ওদের বুঝিয়ে দিতে থাকি—অর্থাৎ আগামীকালের একটা স্টেজ রিহার্সাল হয়ে গেল আমার। উপসংহারে বলি, বাড়িটা আপাতত দো—তলা হচ্ছে, যদিও তিন—তলার বনিয়াদ আছে।
শার্দূলজী বলেন, কেঁও ? একসাথ ত্রি-স্টোরিড হলেই তো আচ্ছা হতো !
যেখানে বাঘের ভয় ! এ প্রশ্নটার জবাব আমি জানি না। বলতে গেলাম, বাজেট প্রভিশন নেই বোধহয় ; কিন্তু তাঁর আগেই অরুণবাবু বলে ওঠেন, না ! তা হবে না ! বিশেষ কারণে ও বাড়িটা আপাতত ত্রি—তল করা যাবে না।
মনে হল অরুণবাবু প্রকৃত কারণটা জানেন, তাই চেপে ধরি, আপনি জানেন কেন ঐ বাড়িটা ত্রি—তল করা হচ্ছে না ?
--জানি। ডক্টর
রায় বারণ করে গেছেন। আমি সে মিটিঙে উপস্থিত ছিলাম। তাঁর মৌখিক আদেশ !
ডক্টর বিধানচন্দ্র কয়েকমাস আগে গত হয়েছেন। এমন অদ্ভূত মৌখিক আদেশ তিনি কেন দিয়ে যাবেন ? অরুণবাবুকে বলি, কতদিন ও—বাড়িটা তিনতলা করা হবে না ?
--দ্যাট ডিপেণ্ডস্
!
--ডিপেণ্ডস্ অন হোয়াট ? – প্রশ্ন করি আমি।
অরুণবাবু জবাব দেবার আগেই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো একজন। কি একটা জরুরী সংবাদ এনেছে সে। অরুণবাবু তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে গেলেন। আসর ভাঙল। তারপর রাত দশটা নাগাদ বাতি নিবিয়ে শুয়ে পরি।
শুয়ে শুয়ে ভাবছি
একই কথা। অরুণবাবু যা বললেন তা কি বিশ্বাসযোগ্য ? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কেন এমন একটা
অদ্ভুত মৌখিক আদেশ জারি করে যাবেন ? যদি মনে করা যায় সমুদ্রের ভাঙনে বাড়িটার নিরাপত্তা
বিষয়েই সন্দেহ আছে, তাহলে ওখানে দো—তলা
বাড়িই বা তৈরি করা হচ্ছে কেন ? আর সে—কথা
বিবেচনা করবেন এঞ্জিনিয়াররা। মুখ্যমন্ত্রী কেন বলবেন তিনিতলার বনিয়াদ সমেত আপাতত দোতলা
বানাও ? তিনতলা যদি কোনোদিন না-ই করা হয় তাহলে মাটির তলায় টাকা পুঁতে তিনতলার বনিয়াদ
রাখা হচ্ছে কেন ?
......
কি কথা থেকে কি কথায় এসে পড়েছি। কথা হচ্ছিল অষ্টাদশ শতাব্দীর হারিয়ে যাওয়া বীয়ারকুলকে নিয়ে। কলকাতার কুঠিয়ালের বড় বড় সাহেব—বিবি সেখানে আসতেন—ঘোড়ায়, নৌকায়, পাল্কিতে। প্রবাসী ইংরেজের চোখে এ সমুদ্র-সৈকত ব্রাইটনের স্মৃতি জাগিয়ে তুলত। বালিয়ারির ওপরে গড়ে উঠেছিল সারি সারি বাঙলো বাড়ি। সদলবলে ওঁরা যখন আসতেন তখন সমুদ্রতীর কলরব—মুখরিত হয়ে উঠত। মাছ—ধরা, শিকার, নাচ আর মদের ফোয়ারা ছুটতো ! কি আশ্চর্য ! এতটা রাজানুগ্রহ লাভ করা সত্ত্বেও বীরকুলের চিহ্নমাত্র আজ অবশিষ্ট নেই। কেন নেই ? ঊনবিংশ শতকেই কেন এখানেই গড়ে ওঠেনি নতুন শহর ? আধুনিক স্বাস্থ্যাবাস ? আর পাঁচটা জনপদ যেভাবে গড়ে উঠেছে !
--হয়তো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুছে গেছে সমুদ্র—সৈকতের সে জনপদ। -- বলেছিলেন শ্রী চট্টোপাধ্যায়। অরুণবাবু। দীঘার সেই তদানীন্তন অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। দীঘাতে উনি প্রথম আসেন উনিশ শ আটচল্লিশে। সরকারি অফিসার হিসাবে নয়। একবেলা মাত্র ছিলেন। রাত্রিবাস করেননি। ওঁর যতদূর মনে পড়ে দুখানি মাত্র পাকা বাড়ি দেখতে পেয়েছিলেন সে—সময়। একটি সেচ্বিভাগের ডাক—বাঙলো, দ্বিতীয়টি স্নেইথ সাহেবের কুঠি।
স্নেইথ সাহেবের নাম আমি সেই প্রথম শুনলাম !
উনি বললেন, স্নেইথ সাহেবকে সেবার দূর থেকে দেখেছিলাম মাত্র। আলাপ স্নেইথ্হয়নি। দেখেছিলাম—নির্জন নির্জন বালিয়াড়ির উপর হ্যাট মাথায় একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছেন একজন সাহেব। সঙ্গে একজোড়া অ্যালসেশিয়ান।
প্রশ্ন করি স্নেইথ্ সাহেবটি কে ?
বললেন, লিভিংস্টোন অফ দীঘা !
লিভিংস্টোন না
লিভিং স্টোন ? খুঁটিয়ে শুনলাম সব কথা। বিংশ শতাব্দীতে নূতন করে দীঘাকে আবিষ্কারের কৃতিত্ব
যে—কয়জনের প্রাপ্য তার ভিতর
উনিই নাকি একমাত্র তখন জীবিত।
......
......
দলের সঙ্গে স্নেইথ্-সাহেব যখন দীঘায় এসে পৌঁছান তখন তাঁর বয়স চল্লিশের কোঠায়। অকৃতদার কর্মঠ যুবাপুরুষ। দীর্ঘ ক্লান্তিকর পথ অতিক্রম করে এসে দীঘাকে দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। নিঃসন্দেহে প্রথম দর্শনেই তিনি সুন্দরী দীঘার প্রেমে পড়ে গেলেন। ওর ঝাউবনের হাতছানিতে যে প্রেমের সাক্ষাৎ পেলেন স্নেইথ্ তা পল্লবগ্রাহী দর্শনেন্দ্রিয়ের মোহগ্রস্ত আবেশ নয়—নিবিড় ভালবাসা। অবিচ্ছেদ্য গ্রন্থি পড়ল তাঁর মনে। বীয়ারকুল নয়, দীঘা—সুইট দীঘা।
পরের বছর ঐ দুর্গম
পথ অতিক্রম করে তিনি আবার এলেন দীঘায়। স্বল্প মূল্যে কিনে ফেললেন একটা ভূখণ্ড। বালিয়াড়ির
উপর বানালেন ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর। অবসর পেলেই তিনি ফিরে আসেন তাঁর পর্ণকুটিরে। কিন্তু
নাঃ, দু—চার বছরের মধ্যেই
তিনি বুঝতে পারেন দীঘার সঙ্গে তাঁর চিরকালের বন্ধন বাঁধতে হবে। প্রায় বাইশ বিঘা জমি
তিনি নামমাত্র মূল্যে কিনে তৈরি করলেন একটি দ্বিতল প্রাসাদ। দীঘার প্রথম বসতবাড়ি। একদিনেই
কিন্তু সবটা তৈরি হয়নি। ঊনিশ শ পঁয়ত্রিশ সালের পর থেকে প্রতি বছরেই তিনি কয়েকটা মাস
এখানে কাটিয়ে গেছেন। ক্লান্তিকর স্থলপথের তোয়াক্কা রাখেননি অতঃপর। একটি ছোট্ট মনোপ্লেন
কিনে ফেলেন। সমুদ্র—সৈকতে
সেটা অনায়াসে ওঠা—নামা করে।
স্নেইথ্ এর সঙ্গে দীঘার বন্ধন নিবিড়তর হল।
......
......ওয়ারেন হেস্টিংস্-এর দুশ’ বছর পরে আবার যিনি দীঘাকে আধুনিক ঢঙে সাজাবার স্বপ্ন দেখলেন তিনি ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়। শত তরঙ্গভঙ্গে সাগর বাঙলার বন্দনা রচনা করে। অথচ দুর্ভাগ্য বাঙালির, সমুদ্র দর্শন করতে এতদিন তাকে যেতে হত প্রতিবেশী রাজ্যে। এ দীর্ঘদিনের অভাব মোচন করতে উঠে পড়ে লেগেছিলেন বিধানচন্দ্র। তাঁরই নির্দেশে গড়ে উঠল ছোট্ট জনপদ—দীঘা। তৈরি হল খড়গপুর থেকে পিচমোড়া সড়ক, সাতমাইল ব্রীজ, পিছাবনী সাঁকো। ......
......সেবার সেই ঊনিশ শ’ বাষট্টি সালে দীঘা থেকে ফিরে আসার আগে অরুণবাবুর সঙ্গে গিয়ে দেখা করেছিলাম দীঘা—জনকের সাথে। সেই বৃদ্ধকে দেখতে যাবার আগেই অরুণবাবু অবশ্য রহস্যটার সমাধান করেছিলেন। কেন সৈকতাবাসে তিনতলার ভিত থাকা সত্ত্বেও বিধানচন্দ্র মৌখিক নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন—ওটা আপাতত তিন—তলা হবে না।
প্রস্তাবিত সৈকতাবাসের অবস্থান স্নেইথ্ সাহেবের বাড়ির ঠিক দক্ষিণে। হ্যামিল্টন কোম্পানীর সেই বড় সাহেব তখন পাকাপাকিভাবে দীঘার বাসিন্দা। প্রায় চলৎশক্তিহীন। তাঁর দ্বিতল বাড়ির ব্যালকনিতে বসে দিবারাত্র সমুদ্র দেখেন তিনি। সৈকতাবাস ত্রিতল হওয়ার অর্থ স্নেইথ—সাহেবের চোখের সামনে থেকে সমুদ্রকে ছিনিয়ে নেওয়া। দার্জিলিং থেকে সুন্দরবনের ভালোমন্দ নিয়ে যে বৃদ্ধ মুখ্যমন্ত্রী দিবারাত্র অতন্দ্র পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন তাঁর খেয়াল ছিল প্রস্তাবিত সৈকতাবাসের উত্তরে আছে এক অকৃতদার অশীতিপর বৃদ্ধের বাড়ি, যাঁর জীবন-সঙ্গিনী ঐ নীলাম্বরী পরা দীঘাসমুদ্র। ঊনিশ শ’ বাষট্টি সালের গোড়ার দিকে বস্তুত তাঁর জীবনাবসানের মাত্র কয়েকমাস আগে তাই বিধানচন্দ্র মৌখিক নির্দেশ দিয়ে গেছিলেন আমার চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে—যতদিন স্নেইথ্ সাহেব এ ধরাধামে থাকবেন ততদিন সৈকতাবাস তিনতলা করা চলবে না। ......
ফিরে আসার আগে সেই স্নেইথ্ সাহেবের সাথে দেখা করতে গেলাম। অরুণবাবুই নিয়ে গেলেন আমাকে। উনি বসে ছিলেন বাগানে। পড়ন্ত বেলায়। একখানা ইজিচেয়ার দখল করে। অরুণবাবু আমার পরিচয় দেবার সময় আমার সরকারি ভূমিকাটা এড়িয়ে বললেন ইনি একজন লেখক।
মৃদু হাসলেন স্নেইথ্ সাহেব। বসতে বললেন আমাদের। ...আমার আগ্রহ দেখে একজন ভৃত্য—শ্রেণীর লোককে দিয়ে আনালেন কিছু প্রাচীন কাটিং আর একটা ফটো অ্যালবাম। ঝাউবনে ঢাকা অতীত—দীঘার কিছু দুর্লভ পীতাভ আলোকচিত্র দেখলুম অ্যালবামে। ট্রেতে কিছু শীতল পানীয় এলো আমাদের দুজনের জন্য। তারপর উনি উঠলেন। লাঠিতে ভর দিয়ে সমস্ত বাগানটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন। ...... চলতে চলতে হঠাৎ থেমে পড়েন বৃদ্ধ ; দক্ষিণদিকে—সমুদ্রের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে বললেন, শুনছি ঐখানে পর্যটন বিভাগ একটা পান্থশালা তৈরি ক দেখা যাবে তা সত্তরাচ্ছে। তার নাম সৈকতাবাস। ওটা তৈরি হয়ে গেলে আর এ বাড়িতে বসে সমুদ্র দেখতে পাব না।
দৃঢ়তার সঙ্গে বললুম—না। আপনার বাড়ির দ্বিতলের বারান্দা থেকে সমুদ্র দেখা যাবে তা সত্ত্বেও।
--য়ু থিংক সো ? সাহিত্যিকের আন্দাজটা জানতে চাইলেন উনি।
......
থম্কে দাঁড়িয়ে পড়ি। পিছন ফিরে দেখি আর একবার। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। সমুদ্রের পটভূমিকায় দেখতে পেলাম পিছন—ফেরা এক বৃদ্ধের স্যিলুয়ে। সমুদ্র-প্রেমিক...”
#
©গৌতম দত্ত
১লা জুলাই, ২০১৭
কলকাতা।
#
--কৃতজ্ঞতা
১) Article Source:
http://EzineArticles.com/expert/Indranil_Sengupta/2313665
২) পঞ্চাশোর্ধ্বে – নারায়ণ সান্যাল
৩) উইকিপিডিয়া
৪) The letters of
Warren Hastings to his wife -- by Hastings, Warren,
1732-1818; Hastings, Anna Maria Apollonia von Chapuset,
1747-
1837; Grier, Sydney C., 1868-1933।
এবং অবশ্যই গুগুল।

