১৩ অক্টোবর, ১৯৬৬।
নিজের লেখা গল্প নিয়ে তপন সিংহ তৈরি করলেন এক ফ্যান্টাসি। গল্প হলেও
সত্যি। গল্প তো গল্পই, সে আবার কবে সত্যি হ’ল ?
অথচ এ সিনেমা দেখতা দেখতে সারাক্ষণ মনে হবে সেই ষাটের দশকের বাঙালির যৌথপরিবারগুলোর
এক সত্যি কাহিনী-ই। ভাঙতে চলা সাবেকি একান্নবর্তী পরিবারগুলোর আসল মজা, কৌতুক, ঘটনা,
দুর্ঘটনার এক বাস্তব ছবি এই ‘গল্প হলেও সত্যি’।
তপন সিংহ জন্মেছিলেন ১৯২৪ সালের ২ অক্টোবর, কলকাতা শহরে। শিক্ষাজীবন
কেটেছে ভাগলপুর এবং কলকাতায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর
করেছিলেন। নিউ থিয়েটার্স-এর শব্দযন্ত্রী হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। লন্ডনে গিয়ে
হাতে কলমে চলচ্চিত্র নির্মাণ শিখেছিলেন। ইংল্যান্ড থেকে ফিরে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর জীবনের বড়ো প্রেরণা।
এ ছবির আগে আরো অনেকগুলো সফল ছবি পরিচালনা করেছিলেন তপন সিংহ। ১৯৫৪ সালে
‘অঙ্কুশ’
দিয়ে শুরু। তারপরে একে একে উপহার (১৯৫৫), কাবুলীওয়ালা (১৯৫৭), ক্ষুধিত পাষাণ (১৯৬০),
ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১), হাঁসুলি বাঁকের উপকথা (১৯৬২), নির্জন সৈকতে (১৯৬৩), জতুগৃহ
(১৯৬৪), অতিথি (১৯৬৫) আর আরোহী (১৯৬৫)-র মতো বিখ্যাত এবং সফল ছায়াছবি। নিজেই লিখতেন
গান। দেশ-বিদেশের নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন তপন সিংহ। শ্রেষ্ঠ ভারতীয় চলচ্চিত্রের
জন্য তিনি অনেকবার জাতীয় পুরস্কার লাভ করেছেন।
মহানায়ক উত্তমকুমার এই মানুষটার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা অব্দি করেছিলেন।
সে এক গল্প। তপন সিংহের বেশ কিছু ছবিতে কাজ করেছেন উত্তমকুমার। “‘উপহার’ দিয়ে শুরু, তারপরে দু’জনের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়ে যায়। ‘জতুগৃহ’ প্রযোজনা করেছিলেন উত্তমকুমার নিজেই। দু’জনের বন্ধুত্বে চিড় ধরে ‘বাঞ্ছারামের বাগান’ ছবিটি নিয়ে। সেখানে জমিদার ছকড়ি ও তার ছেলে নকড়ি – দু’টি চরিত্র করার কথা ছিল উত্তমকুমারের। ঠিক
ছিল, শীতকালে শুটিং হবে। কিন্তু হঠাৎ বোম্বেতে অন্য ছবির কাজ পরে যাওয়ায় উত্তমকুমার
ডেট পাল্টাতে চাইলেন। জানালেন, মার্চের আগে ডেট দিতে পারবেন না। তপন সিংহ রাজি হলেন
না, ওই দুই চরিত্রের জন্য দীপঙ্কর দে’কে নিলেন। ছবিতে শীতকাল ফুটিয়ে তোলার জন্য
সবজির ব্যবস্থা করা হয়েছিল বাগানে, কয়েক মাস দেরি করলে সেগুলো নষ্ট হয়ে যেত। আর্থিক
ক্ষতি হত প্রয়োজক ধীরেশ চক্রবর্তীর। কিন্তু উত্তমকুমার রুষ্ট হয়ে আদালতে মামলা করলেন।
আদালতে বিচারকের সামনে তপন সিংহ বলেছিলেন, “তিন মাস পরে উত্তমকুমারকে পাব, কিন্তু শীতের
সর্ষেফুল? কোথায় পাব?” সেই মামলায় উত্তমকুমার হেরে যান।“”
ছবির গল্পে ফিরি।
একান্নবর্তী যৌথ সংসার
হালদার বাড়ির। বাড়ির বৃদ্ধ কর্তা ছাড়াও বাড়িতে কর্তার তিন ছেলে, তাদের তিন বউ, বড় ছেলের
বিবাহিত ছেলে বৌমা, সেজ ছেলের ছোট্ট ছেলে আর বাড়িতে মারা যাওয়া সেজছেলে-বৌ-এর একমাত্র
মেয়ে কৃষ্ণা। বড় ছেলে এক সওদাগরি অফিসের কেরানি, সেজ ছেলে ইসকুল-মাস্টার, ছোট ছেলে
ব্যাচিলর – চেলো বাজিয়ে। দশজনের জমাটি সংসারে প্রতি
ভোর শুর হ’ত বাড়ির একটামাত্র কলতলা’য় (বাথরুম যাকে বলি এখন) কে আগে যাবে এই অশান্তি নিয়েই।
এত জনের গুষ্টির রান্নার
দায়িত্বে বড়বউ। অন্য বউ-এরা কেউ কুটোটি নাড়ায় না। শুধু খেতে দেওয়া আর নিজেদের সোয়ামীদের
ফাই-ফরমাশ খাটা ছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই। সেজ ছেলের কথায় ‘একান্নবর্তী পরিবারের অন্নসংস্থান ! এ যেন কম্যুনিজম্ এও মতো – খেটে যাও, আর রেকগনিশন পাবে ব্যাটাচ্ছেলে… !”
ছবির শুরু একটি সকালে। বৃদ্ধ কর্তা বড় খোকাকে চবণপ্রাশ আর এক গ্লাস জল
দিয়ে যেতে বললে, গামছা পরে থাকা বড় খোকা সেই অর্ডারটা পাস করে সেজ খোকাকে। সে অর্ডার
গিয়ে বর্তায় চেলো নিয়ে রেওয়াজে বসা ছোট খোকার ওপরে। সেখান থেকে ওই ‘অর্ডার’ নামক বলটি গিয়ে পড়ে খোকা’র মানে বড় ছেলের ছেলের হাতে। বড় নাতি দাড়ি কামাতে কামাতে সেই অর্ডার
পালন করার ভার নিজের বৌ-এর ঘাড়ে ফেলে আবার নিশ্চিন্তে ক্ষৌরকার্য্যে মন দেয়। নাত-বৌ
চলে যায় রান্নাঘরে তার শ্বাশুড়ী মা’কে বলতে যে দাদু জল আর চ্যবনপ্রাশ চাইছে।
দু-হাতে দুখানা জ্বলন্ত উনুনের ওপরে বসানো হাঁড়ি আর কড়াই সামলাতে ব্যস্ত ঝংকার দিয়ে
বলে ওঠেন—কেন ? সেজবউ কি করছে ? সে মহারানী কোথায়
? ডাক পড়ে সেজবউ এর। সে তখন বাড়ির উঠোনে রাজকুমারকে নাওয়াতে ব্যস্ত। বড়গিন্নির মেজাজ
সপ্তমে চড়ে। শুকনো লংকা ভেঙে কড়াইতে দিতে দিতে বলে ওঠেন—সক্কাল থেকে নিজের স্বামী আর ছেলে ছাড়া আর কি কিছুই করবার নেই
? বাবার চবণপ্রাশটুকু ওই কচি বৌটাকে (মানে
ওনার বৌমা’কে) দিতে হবে ? ছেলেকে স্নান করিয়ে ঘরে
পাঠিয়ে রান্নাঘরের আসরে এসে উপস্থিত হয় সেজবউ। এসেই চোখ পড়ে কৃষ্ণা’র ওপরে। সে বেচারি তরকারি কুটছিল। তাকে তো যা নয় তাই ব্যঙ্গে বিদ্রুপ
করে সেই চবণপ্রাশ আর জলের দায়িত্ব ঘাড় থেকে নামিয়ে দেয় কৃষ্ণার ওপরেই। আল্টিমেট্লি
দাদু জল আর চ্যবণপ্রাশ পায় কৃষ্ণার হাত থেকে। এই ভাবেই হালদার বাড়ির সংসার চলতেই থাকে
দিনরাত-প্রতিদিন।
এমন সময় বাড়ির পুরোনো চাকরকে তাড়িয়ে বাড়ির ঝি-কে বাকি কাজ করতে বললে
সে আবার ‘এশোসন’
এর ভয় দেখায়। ‘এশোসন’
মানে ঝি-দের এসোসিয়েশন। এ কথা শুনে সেজকর্তা জানতে চায় সে এশোসন এর নেতা কি পন্থী।
বাম না দক্ষিণ ! এই ভাবেই চলতে থাকে গল্প হলেও
সত্যি।
আজ থেকে এত বছর আগে নির্ম্মিত তপন সিংহের এ ছবি আজ হয়তো আর প্রাসঙ্গিক
নয় কারণ আমাদের এই কলকাতা শহরে আজ মাথা খূঁড়ে মরলেও একান্নবর্তী এমন সংসার আর হয়তো
পাওয়াই যাবে না। তাই এখনকার যুবক-যুবতীদের কাছে এ ছবি অনেকটাই ফ্যান্টাসি রুপেই ধরা
দেবে। এ ছবিতে মধ্যবিত্ত বাঙালিকে দেওয়া কর্তব্যমুখী হওয়ার পরামর্শ, মিলেমিশে একসাথে
থাকার পরামর্শ আর সর্বোপরি একটু এ্যাডজাস্ট করার পরামর্শ হয়তো এই সময়ে আর কাজে লাগবে
না। তবে এই “করোনা”
কালীন সময় বাঙালির এটমিক পরিবারেও কাজের লোকজন না এলে যে কি বিশৃঙ্খল অবস্থা ঘরে ঘরে
সৃষ্টি হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। রাতের রুটির দোকানগুলোও আজকাল বন্ধই থাকছে অনেকসময়
!
আজকাল ওয়েব এ ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল’কে
উদ্ধৃত করি একটু।
‘তিন ভাই বা তিন খোকাকে নিয়ে এ সংসার।
বড় খোকা (প্রসাদ মুখোপাধ্যায়) পেশায় অফিসের বড়বাবু। রিটায়ার করার সময়
হয়েছে কিন্তু তিনি তা ভাবতে পারেন না। নিজেকে ইয়ংম্যান মনে করেন। এই বয়েসেও ট্রামে
বাসে ঝুলতে ঝুলতে অফিস যান। আর রোজ অফিসফেরতা বাজার করে বাড়ি ফেরেন। একেবারে টিপিক্যাল
বাঙালি চরিত্র। বাড়ির মেজ ছেলে, মেজ বউ তাদের একমাত্র মেয়ে কৃষ্ণাকে (কৃষ্ণা বসু) রেখে
অনেকদিন মারা গেছেন। সেজ বউয়ের (ভারতী দেবী) যত রাগ তাদের ওপর। তারা নাকি কৃষ্ণাকে
পরিবারের বাকি লোকেদের ঘাড়ে চাপিয়ে নিশ্চিন্তে স্বর্গে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
সেজ খোকা (বঙ্কিম ঘোষ) স্কুলমাস্টার। তাই উঠতে বসতে বাড়ির লোকেদের ওপর
মাস্টারি করেন। ছোট খোকা (ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) শিল্পী মানুষ। বিয়ে–থা করেননি। সিনেমার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে চেলো বাজান। এই নিয়েই তিনি
ব্যস্ত। বড় খোকার একটি মাত্র ছেলে। সে বড় আধুনিক। চোঙা প্যান্ট, ছুঁচলো জুতোয় হিরো
সেজে শুধু বড় বড় লেকচার। এ দেশের কিছু হল না আর হবেও না। তার আদর্শ ইওরোপ–আমেরিকা। অথচ সেই লক্ষ্যে না দৌড়ে অল্প বয়েসে বিয়েটা সেরে ফেলেছে। অন্যদিকে
বাড়ির বড় ও সেজ বউ সারাটা দিন ঘর–সংসারের কাজে ব্যস্ত। আর কারণে–অকারণে বাপ–মা মরা কৃষ্ণাকে দাঁতে চেবান। তাকে খাটিয়ে
মারেন। এছাড়া নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি তো লেগেই আছে। অবশ্য আর একজন আছেন। তিনি পরিবারের
সিনিয়র মেম্বার। খোকাদের বাবা ৮০ বছরের বৃদ্ধ যোগেশ চট্টোপাধ্যায়। বাড়ির বাইরের ঘরে
চুপচাপ বসে থাকেন। সকলের ‘গালমন্দ, নালিশ, হুমকি’ হজম করেন। তিনিও একরকম অবহেলার শিকার। তাঁর সম্বল প্রভিডেন্ট ফান্ডের
তিরিশ হাজার টাকা ও মৃত স্ত্রীর গয়না, তাও প্রায় দশ–বারো হাজার টাকা হবে। এরই জোরে তিনিও মাঝে মধ্যে হুঙ্কার দেন। গোটা পরিবার
সেটা জানে। তাই তাঁকে বেশি ঘাঁটায় না কেউ। যদি বুড়োর সম্পত্তির ভাগ না পায়।
ঠিক এই পরিস্থিতিতেই কোথা থেকে চাকর ধনঞ্জয়ের (রবি ঘোষ) উদয় এবং সকলকে
অব্যাহতি দিয়ে কাজে লেগে পড়া। বাজার করা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা, ঘরদোর পরিষ্কার, চা–জলখাবার রান্নাবান্না এমনকী গান গাওয়া, ধর্মোপদেশ দেওয়া ও ঘরের অবিবাহিতা
তরুণীর প্রেমের পথকে সহজ করে তোলা পর্যন্ত। আর যখন যার যেটি প্রয়োজন সেটি মুখের কাছে
জুগিয়ে দেওয়া। ব্যাপার স্যাপার দেখে সবাই তো স্তম্ভিত। এমন মানুষও দুনিয়ায় আছে। অদ্ভুত
তার চাল চলন, দূরদর্শিতা আর আন্তরিকতা।
এই ভাবেই কয়েক দিনের
মধ্যে ধনঞ্জয় সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে গেল। এবার শুরু হল তার দোসরা খেলা। বড় খোকার সামনে
বড় খোকার প্রশংসা। সেজ খোকার সামনে সেজ খোকার, ছোট খোকার সামনে ছোট খোকার প্রশংসা।
প্রশংসায় খোদ খোদারও মন গলে আর এ তো সাধারণ মানুষ। কাজেই নানা উপায়ে ধনঞ্জয় সকলকে বুঝিয়ে
দিল প্রত্যেকে প্রত্যেকের ভাই। আপনজন। তাই সকলেরই একটা কর্তব্য আছে। তা পালন করতে গেলে
কারও যদি স্বার্থত্যাগ করার প্রয়োজন হয়, তা হলে প্রত্যেকেই তা করবে। এরপর ধনঞ্জয়ের
এই স্বার্থত্যাগের ঢেউ পরিবারে এমন ভাবে আছড়ে পড়ল যে বৃদ্ধ দাদু যিনি গয়নার বাক্স আগলে
বসেছিলেন তিনিও সে সব বড় খোকার হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বললেন, ‘অর্থম অনর্থম ভাবয় নিত্যম’।
বাপ–মা মরা যে কৃষ্ণা পাশের বাড়ির কলেজপড়ুয়া অলোকের সঙ্গে ভাব–ভালবাসা করেছিল বলে একদিন মারধর খেয়েছিল আজ বাড়ির সবাই একবাক্যে তাদের
বিয়ে দিতে রাজি হয়ে গেল। এবং সকলেই বৃদ্ধের গয়নার মোহ ত্যাগ করে সেই অলংকার কৃষ্ণার
হাতে তুলে দিল। এর পরের দৃশ্য খুবই করুণ। একদিন সকালে উঠে দেখা গেল ধনঞ্জয় নেই! তন্ন
তন্ন করে খুঁজেও বাড়ির ত্রিসীমানায় তাকে পাওয়া গেল না। তার খোঁজে কৃষ্ণা ছুটে বেরিয়ে
গেল বাড়ি থেকে। দূর থেকে সে দেখল ধনঞ্জয় তার নিজের মনে এগিয়ে চলেছে। কৃষ্ণা ছুটে গিয়ে
তার পথ আটকাল। বলল, ‘তুমি যে বড় চলে যাচ্ছ?’ ধনঞ্জয় উত্তর দিল, ‘আমার কাজ যে ফুরিয়েছে কৃষ্ণাদি।’ কৃষ্ণা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি আর কখনও আসবে না?’ ধনঞ্জয় বলল, ‘আমার আসার আর দরকার হবে না।’ এই বলে সে সকলকে স্বস্তি দিয়ে ক্রমে বাড়ির সবার মধ্যে ঐক্য ফিরিয়ে এনে,
তাদের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটিয়ে আবারও এক কুয়াশা ঢাকা ভোরে সে বিদায় নিল’।
তপন সিংহ এই সিনেমায় যাঁদের অভিনয় করার জন্য বেছেছিলেন ছবিটা দেখার পরে
মনে হয় তাঁদের ছাড়া আর কোনো বিকল্প ভাবাই যেত না। তিনি যাঁদের ওপর বেশি ভরসা করেছেন
সেই রবি ঘোষ ও ছায়া দেবীর অভিনয় সত্যিই ভোলার নয়। রবি ঘোষ যেমন ভৃত্যের ভূমিকায় মাতিয়ে
দিয়েছেন, তেমনই বড় বউয়ের চরিত্রে ছায়া দেবী। বড় জা ছায়া দেবীর পাশাপাশি সেজ জা ভারতী
দেবীও অনবদ্য। তিন ছেলের ভূমিকায় প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বঙ্কিম ঘোষ, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়।
তাদের বাবা অশীতিপর যোগেশ চট্টোপাধ্যায় অবিবাহিতা নাতনি কৃষ্ণা ওরফে কৃষ্ণা বসু, পার্থ
মুখোপাধ্যায়— সকলেই পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। সঙ্গে
বিমল মুখোপাধ্যায়ের ক্যামেরায় কৌতুকের মেজাজ।
এ সিনেমার দুখানা গান যা তপন সিংহ-রই লেখা। ধনঞ্জয়ের গলায় আছে…
(১) কা তব কান্তা কস্তে পুত্রা
সংসারোহম অতীব বিচিত্রা…
… … …
… …
… …
… …।
আর অপর গানটি ধনঞ্জয় শিখিয়েছিল নাতিবাবুকে…
(২)
শুক বলে ওঠ শারি ঘুমায়োনা আর,
এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার।
মনে রেখো এ সংসারে যারা কর বাস,
সং ছাড়ি সারটিতে রাখ অভিলাষ।
আসে যায় সুখ-দুখ আলোক আঁধার—
এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার
শয়নে বসিয়া কেন এখনও এমন
কী যে পেলে কী হারালে মিছে ভাবি মন।
তোমারে ডাকিয়া বলে জীবন তোমার—
এ জীবন গেলে ফিরে আসে না আবার।
প্রহর ডট ইন-এ মেঘদূত
রুদ্র লিখেছেন ‘শুধুমাত্র গল্প-বলিয়ে হয়েই থেকে গেলেন তপন
সিংহ, শিক্ষকের স্থান দিল না বাঙালি’। তিনি লিখছেন… ‘তপন সিংহ মহাশয়কে বাংলা তথা ভারতীয় ছবির
একটা বিশেষ ঘরানার জনক বলা যায়। সেটা হল ‘মিডল অব দ্য রোড’ ঘরানা। তাঁর ছবিতে শিল্প আর জনপ্রিয় ঘরানার সিনেমার একটা আশ্চর্য মিশেল
ঘটেছিল। একটা সুন্দর গল্পকে সুন্দরতর চিত্রনাট্যে সাজিয়ে সুন্দরতম ভাবে চলচ্চিত্রায়িত
করার যে ধারা ওঁর ছবিতে দেখা যায়, ভারতবর্ষের খুব কম পরিচালক এতটা নিখুঁতভাবে সেটা
করতে পেরেছেন। প্রায় দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের কেরিয়ারে তিনি চল্লিশটার মতো ছবি বানিয়েছিলেন।
শিল্প মানেই সেটাকে বামপন্থী
আদর্শের হতে হবে এরকম কোনো মানে নেই। আইজেনস্টাইন তাঁর নিজের লেখাতেই সিনেমার স্বাতন্ত্র্য
অস্তিত্বের কথা লিখে গেছেন বহুবার। আমরা মানিনি। এছাড়া আমরা একধরণের ‘হাই ব্রাও’ শিল্পকেই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প বলে মনে করে
এসেছি। প্রথমে রবীন্দ্রনাথ তারপর সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন ইত্যাদি। এই ‘হাই ব্রাও’ সংস্কৃতিতে আমরা তপন সিংহকে স্থান দিতে
পারিনি। তিনি জিনিয়াস ছিলেন না। সবাইকে হতেও হয় না। কিন্তু তিনি ছিলেন মাস্টার ফিল্ম
মেকার। কিন্তু ওঁকে নিছক একজন গল্প বলিয়ে হিসেবে মনে করা হয়েছে। চলচ্চিত্র শিক্ষক হিসেবে
মনে করা হয়নি।
গল্প উনি বলতেন ঠিকই।
সেই সময় বাংলা ছবিতে এটাই মন দিয়ে প্র্যাকটিস করা হত। উনি ছাড়াও অজয় কর, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়,
অসিত সেন, অগ্রদূত গোষ্ঠী, যাত্রিক গোষ্ঠীর প্রভৃতি পরিচালকরা ছবির পর ছবি জুড়ে পর্দায়
একটা নিখুঁত আখ্যানকে দর্শকের সামনে তুলে ধরার কাজে এক্সপার্টাইজ অর্জন করেছিলেন। ওঁরা
বিশ্বাস করতেন যে বাঙালি দর্শক আসলে গল্পই দেখতে চায়। হাজার বছর ধরে শুধু গল্প শোনার
আশাতেই বাঙালি বসে আছে। সেই বিশ্বাস থেকেই ওঁরা ছবি বানাতেন। এই ব্যাপারটা ওনারা হলিউড
থেকে রপ্ত করেছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে নিজস্বতাও ছিল। বাঙালিয়ানা ছিল পুরদমে।‘
‘তপন সিংহ – সার্বিক চলচ্চিত্র বীক্ষা - আবেশ কুমার
দাস’ নামের বইটি নিয়ে লিখতে গিয়ে অবসর ডট নেট
পেজে সরোজ দরবার তাঁর ‘এক সার্বিক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত’-র আলোচনায় লিখছেন—‘
কী করে যে আমরা এমন অসামান্য ছবিকে শুধুমাত্র হাসির ছবি বলে ভুল করতে
পারলাম! ' গল্প হলেও সত্যি' প্রসঙ্গে এহেন আক্ষেপ সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের। গোড়াতেই
তিনি সন্দিহান ছিলেন। তপন সিংহের সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক অবস্থানে কি ভুল হয়েছিল?
নিবন্ধ শেষে সঞ্জয়বাবু বুঝিয়েছিলেন, তা যে হয়েছিল সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। উত্তরকালে
সে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করলেন আবেশ কুমার দাশ। বস্তুত তাঁর ' তপন সিংহ: সার্বিক চলচ্চিত্র
বীক্ষা' বইটি যেন ততটাই ব্যঞ্জনাময়, প্রক্ষিপ্ত যেভাবে মহাকাব্যের গবেষণায় নতুন দিগন্ত
উন্মোচনকারী হয়ে ওঠে।
আসলে তপন সিংহ সম্পর্কে আমাদের ভুলটা হয়েছিল ঠিক সেখানে, যেখানে মহাকাব্য
আর মঙ্গলকাব্যের মধ্যে দূরত্ব রচিত হয়। যদিও দুটোই ধারণ করে সময়কে, ও সময়কে চেনার
ক্ষেত্রে দুটিই সমানভাবে প্রয়োজনীয়। সময়ের সে হাইফেনে যেন জুড়ে বসে সাংস্কৃতিক
ঔদাসীন্য। ফলে, সত্যজিত-ঋত্বিক এবং কিছু অংশে মৃণাল সেন নিয়ে আমাদের মাতামাতি একটা
ছদ্ম বুদ্ধিবৃত্তির স্মারক হয়ে ওঠে। আমরা অবলীলায় ভুলে যাই নির্মল দে, অজয় করদের।
এবং তপন সিংহ ও তরুণ মজুমদারদের নাম প্রথম সারির আসনে লিখতে আমাদের দ্বিধার মধ্যেই
আক্ষরিক ঐতিহাসিক ভুলের জন্ম হয়। আমার ধারণা, এই ঔদাসীন্য আসলে একরকম সাংস্কৃতিক মৌলবাদেরই
পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। নইলে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়কে কেনই বা আমরা দিনে দিনে ভুলে
যেতে থাকব !
সামগ্রিক রবীন্দ্র কাহিনিকে তপনবাবু যেভাবে চলচ্চিত্রায়িত করেছেন, বাংলা
ছবির ইতিহাসে তা গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ' রবীন্দ্র নাটকের সাফল্যমণ্ডিত মঞ্চায়নের নেপথ্যে
বাংলা নাট্য জগতে শম্ভু মিত্রের যা অবদান, বাংলা ছবির ইতিহাসে রবীন্দ্র-কাহিনির সফল
রূপায়ণে তপন সিংহের কৃতিত্ব তার কম কিছু নয়।'-এ যে মোটেও অত্যুক্তি নয়, তা বুঝি,
যখন আবেশ ধরিয়ে দেন, 'কাবুলিওয়ালা'র মধ্য দিয়ে আসলে তপন সিংহ মার্ক্সীয় বীক্ষণের
রাষ্ট্রসীমানাহীন কল্পবিশ্বের রূপকটিকেই তুলে ধরছেন, এবং সেখানেও উদারকামী রবীন্দ্রনাথের
স্বতন্ত্রতা চিহ্নিত করে দিচ্ছেন’।
‘তপন সিংহ মিউজিকটাও ভাল বুঝতেন। এক বৈঠকি আড্ডায় তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল,
যদি আবহসঙ্গীত শুধু ভারতীয় সঙ্গীতের ওপর করা হয় তবে আলি আকবর খাঁ ও রবিশঙ্করের কোনও
জুড়ি নেই। তবে আবহসঙ্গীত করতে গেলে যে উচ্চাঙ্গসঙ্গীত সম্পর্কে বিশাল জ্ঞান থাকতে হবে
তারও কোনও মানে নেই। মোটামুটি থাকলেই চলবে। দেখতে হবে চরিত্রটা মিউজিক হবে নাকি ব্যাকড্রপের
ওপর মিউজিক করব, না থিম বা বিষয়বস্তুর ওপর করব। তার ওপর সব কিছু নির্ভর করছে। ‘গল্প হলেও সত্যি’–র ক্ষেত্রে তাঁর এই মিউজিক–মস্তিষ্ককে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন তিনি। বলতে গেলে তাঁর এই গুণগুলিই
তাঁকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছে দিয়েছিল। প্রায়শই বলতেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এমন ফিল্ম তৈরি করতে চাই যাতে আমার দেশের মানুষের
মন মেজাজ ও রুচির স্বাদ মিশে আছে। আমাদের এই বিচিত্র বিশাল উপমহাদেশের চিন্তাধারা ও
দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্য যে কোনও দেশের থেকে ভিন্ন। ভারতবর্ষ ভিন্ন কিন্তু অনন্য
এটা বুঝতে হবে।’ এই ধ্যানধারণা নিয়েই তিনি কাজ করে গেছেন
আজীবন। আর ছিল আত্মবিশ্বাস। যার জোরে অনেক সময় স্রোতের বিপক্ষে গিয়েও তিনি কূলে ভিড়েছেন
একেবারে নির্বিঘ্নে। নজরও কেড়েছেন দর্শকদের। এই তো গোটা বাংলা যখন উত্তম–সুচিত্রায় মজে আছে, তখন সেই জুটিকে পাশ কাটিয়ে মাত্র আঠাশ দিনে তিনি
‘গল্প হলেও সত্যি’–র কাজ শেষ করলেন এবং মনে মনে তিনি নিশ্চিত ছিলেন রবির অভিনয় দর্শক নেবেই।
হলও তাই। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও দারুণ বাজার পেল।
মধ্যবিত্ত মানুষের মনের গভীরে পৌঁছে গেল পরিচালকের সেই শ্বাশ্বত বাণী ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’। সাদা–কালো
এই ছবিটি দীর্ঘদিন চলেছিল। ১৯৬৬ সালে আঞ্চলিক ভাষার শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে রাষ্ট্রপতির
সম্মান লাভ করেছিল আবার ‘বাবুর্চি’ নামে হিন্দিতে রিমেকও হয়েছিল ছবিটি। করেছিলেন হৃষীকেশ মুখার্জি। ধনঞ্জয়ের
ভূমিকায় সেখানে অভিনয় করেন রাজেশ খান্না’।
এই প্রসঙ্গে নিজের বই
‘মনে পড়ে’
তে তপন সিংহ’র লেখা - কিছু অংশ বারবার মনে পড়ছে।
“……একদিন বংশীচন্দ্র গুপ্ত এসে বলল, ‘মানিক তোমাকে একবার ডেকেছে।' বললাম মানিক, মানে অসিত সেন ? বংশীর উত্তর,
‘না। সত্যজিৎ রায়।'
কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কমার্শিয়াল আর্টিস্ট হিসাবে সত্যজিৎ রায়ের
নাম শুনেছিলাম। ভাবলাম, ইনি আবার আমাকে ডাকছেন কেন ? পরিচয় হওয়া দূরের কথা, ভদ্রলোককে
কোনওদিন চোখেও দেখিনি। গিয়ে দেখি, ও হরি, এ তো সেই ভদ্রলোক—মেট্রো, লাইট হাউসের সিনেমা টিকিটের লাইনে যাঁকে প্রায়ই দাঁড়িয়ে থাকতে
দেখেছি ! উচ্চতা যে কারও চেয়ে এক হাত লম্বা, খোদাই করা মুখ, মায়াময় আয়ত দুটি চোখ।
পরিচয়ের পর সত্যজিৎবাবু কোনও ভূমিকা না করেই বললেন, ‘পথের পাঁচালী ছবি করব। সবটাই আউটডোরে—সাউন্ডের
ব্যাপারটা কী করা যায় বলুন তো ? তারপর, ‘আচ্ছা এক কাজ করা যাক, আপনার সময় আছে
? বললাম, “হ্যাঁ।' তিনি বললেন, ‘স্ক্রিপটটা শুনবেন ? তাহলে হয়তো আপনার বোঝার সুবিধে হবে।' সানন্দে রাজি
হলাম। সত্যজিৎ রায়ের মুখে ‘পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্য শুনতে শুনতে কখন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম, খেয়াল করিনি।
এর আগে দেশ-বিদেশের বহু স্ক্রিপ্ট আমি পড়েছি, কিন্তু এ যেন এক নতুন অভিজ্ঞতা। ঘণ্টা
দুয়েক ধরে স্ক্রিপ্ট শোনানোর পর বললেন, “বলুন, সাউণ্ড নিয়ে কী করা যায় ? বললাম,
‘দূর ! স্ক্রিপটা শুনে সাউণ্ড-টাউণ্ড কোথায়
উড়ে গেছে, ভাবছি কী করে এমন কাজ করলেন ! হাসতে হাসতে তিনি বললেন, আপনার ভাল লেগেছে
? সংক্ষেপে বললাম, “অসাধারণ ! সত্যজিৎ বললেন, “আমার ইউনিটের বাইরে আপনাকেই প্রথম শোনালাম। আমার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে, এককাপ
কফি খেয়ে চলে এসেছিলাম সেদিন। সাউন্ড নিয়ে আলোচনা আর করা হল।
‘অতিথি’
ছবি শেষ করে দার্জিলিঙে প্রযোজক এস.এন. সরকার আর মীরা সরকারের আতিথ্য নিয়েছি। সরকারদের
বাড়ি ‘পিকো টিপ’ অত্যন্ত সুন্দর। পাশেই উইণ্ডার মেয়ার হোটেলে উঠেছেন সত্যজিৎবাবু, কিন্তু
দেখা হচ্ছে না। বিজয়াদি বললেন, ‘মাত্র একবার হোটেল থেকে বের হয়। সিগারেট
কিনতে। ঘরে বসে ‘নায়ক’-এর
স্ক্রিপট করছে।'
আমরা একদিন খেতে ডাকলাম । এলেন। খানিকক্ষণ তাস পেটা হল। যাবার সময় বললেন,
আজ ‘নায়ক’-এর
স্ক্রিপ্ট শেষ করব। কাল সকালে একবার শুনবেন ? অরুন্ধতী, তুমিও এসো না ? দুজনেই গেলাম। ঝাড়া চারঘণ্টা চিত্রনাট্য শুনলাম। চমকিত হওয়ার মতো অভিজ্ঞতা।
বললেন, এ ছবিতে উত্তমকে নেব ভাবছি, ঠিক হবে ?' বললাম, “উত্তম ছাড়া এ চরিত্র হয় না।'
দার্জিলিঙে থাকাকালীন একদিন ভোরে কাঞ্চনজঙ্ঘা আত্মপ্রকাশ করেছিল। দুপুরে
বিজয়াদি বললেন, ‘ও তো ভোর থেকে হাঁকডাক শুরু করেছে। আ-রে
তপনকে ডেকে খবর দাও। কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে—ও
হয়তো ঘুম মারছে।' এইরকম। সব সময় সব ব্যাপারে যে তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছি তা নয়। আমার
মতও অকপটে প্রকাশ করেছি। সত্যজিৎ তাতে খুশিই হয়েছেন এই ভেবে যে আমি স্তাবকের দলে পড়ি
না’।
তপন সিংহ মশাই-এর ছবির তালিকা
অঙ্কুশ (১৯৫৪)
উপহার (১৯৫৫)
কাবুলীওয়ালা - বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভাল-এ প্রদর্শিত (১৯৫৭)
ক্ষুধিত পাষাণ (১৯৬০)
ঝিন্দের বন্দী (১৯৬১)
হাঁসুলি বাঁকের উপকথা (১৯৬২)
নির্জন সৈকতে (১৯৬৩)
জতুগৃহ (১৯৬৪)
আরোহী (১৯৬৫)
অতিথি (১৯৬৫)
গল্প হলেও সত্যি (১৯৬৬)
হাটে বাজারে (১৯৬৭)
আপনজন (১৯৬৮)
সাগিনা মাহাতো – বিএফজেএ’র সেরা সংগীত পুরস্কার। (১৯৭০)
জিন্দেগি জিন্দেগি (১৯৭২)
সাগিনা (১৯৭৪)
সফেদ হাতি (১৯৭৭)
সবুজ দ্বীপের রাজা (১৯৭৯)
বাঞ্ছারামের বাগান (১৯৮০)
আদালত ও একটি মেয়ে (১৯৮২)
অভিমন্যু (১৯৮৩)
আদমি আউর অউরত (দূরদর্শন) -
(১৮৮৪)
বৈদুর্য রহস্য (১৯৮৫)
আতঙ্ক (১৯৮৬)
আজ কা রবিনহুড (১৯৮৭)
এক ডক্টর কি মউত (১৯৯১)
হুইল চেয়ার (১৯৯৪)
আনোখা মোতি (২০০০)
ডটার্স অফ দিস সেঞ্চুরি (Daughters of This Century) (২০০১)
গল্প হলেও সত্যি সিনেমার
মূল কাণ্ডারী একদিকে ছায়া দেবী আর অপর দিকে রবি ঘোষ।
এ ছবির নায়ক রবি ঘোষ সম্পর্কে কিছু না বললে আলোচনা পূর্ণ হবেই না।
মামার বাড়ি কুচবিহারে
২৪ নভেম্বর ১৯৩১ এ পৃথিবীর প্রথম আলো দেখা। বাবা জীতেন্দ্রনাথ ঘোষদস্তিদার আর মা জ্যোৎস্না
ঘোষদস্তিদারের দ্বিতীয় সন্তান এই রবীন্দ্রনাথ ঘোষদস্তিদার। বড়মামা আর মা এর উৎসাহেই
অভিনয়ে হাতেখড়ি।
কুচবিহার জেনকিন্স স্কুলে
পড়াশুনো শুরু। ম্যাট্রিকুলেশন দেন কলকাতার সাউথ সুবার্বান মেন স্কুল থেকে। এই স্কুলে
তাঁর সহপাঠী ছিলেন উত্তমকুমার ভ্রাতা তরুনকুমার। আশুতোষ কলেজ থেকে আই.এস.সি. পাশ ১৯৪৯
এ। অতঃপর আশুতোষ কলেজেই নৈশ বিভাগে বি.কম. পড়া শুরু। আর তার সাথে শুরু নিয়মিত শরিরচর্চা।
বাস্তব জীবনে অত্যন্ত
গম্ভীর একজন মানুষ। সময় পেলেই পড়তেন ‘রামকৃষ্ণ কথামৃত’। আর সে বই থেকে পড়েও শোনাতেন নিকটজনকে। তুমুল আড্ডাবাজ আর পরোপকারী
মানুষটির প্রিয় খাবার ছিল লুচি আর পাঁঠার মাংস। গুরু মানতেন চার্লি চ্যাপলিনকে। ১৯৫৩
সালে চাকরিজীবন শুরু কলকাতা ব্যাঙ্কশাল কোর্টে। কিন্তু ১৯৬১ তে সে চাকরি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে
অভিনয় জীবনে।
পাঁচের দশকে উৎপল দত্তের
‘সাংবাদিক’ নাটকে এক সংবাদপত্র বিক্রেতার চরিত্র দিয়ে মাত্র তিরিশ সেকেণ্ডের চোখে
পড়া। আর তাইতেই চোখে পড়েন মৃনাল সেন এর। উৎপল দত্ত’র
সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন কলেজের আরেক বন্ধু সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
১৯৫৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
কলকাতার ‘মিনার্ভা’ নাট্যমঞ্চে শুরু হল “অঙ্গার”।
সেদিন থেকে শেষ শো এর দিন অব্দি একটা দিনের জন্যেও বিরতি দেন নি রবি ঘোষ। অঙ্গার নাটক
শুরুর মাত্র পাঁচ দিন আগে বাবার মৃত্যুও দমিয়ে দেয় নি এই মানুষটিকে। পেশাদার শিল্পী
যাকে বলে আর কি !
‘অঙ্গার’
নাটকে সনাতনের ভূমিকায় একজন ছোটোখাটো চেহারার মানুষ খনি থেকে উঠে উচ্চ স্বরে বলে উঠেছিলেন
‘আমি একজন ভূতপূর্ব লোক’ ‑ যাঁরা সেই কন্ঠস্বর শুনেছিলেন তাঁরা আজীবন
ভুলতে পারেননি।
এই নাটক দেখেই পরিচালক
অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ‘কিছুক্ষণ’ ও তপন সিংহ ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’র জন্য তাঁকে ডাকেন। এর পরেই প্রস্তাব আসে সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’-এর জন্য।
অভিনয় ছিল তাঁর কাছে
একমাত্র আশ্রয়। ‘ঠগিনী’
ছবির শ্যুটিং চলাকালীন একদিন দেরী করে ফ্লোরে এসেছিলেন রবি যা কখনই হ’ত না তাঁর। পরে জানা গেল যে সেদিন মা’কে
দাহ করে ফেরার জন্য তাঁর এই দেরী।
বাবা জীতেন্দ্রনাথ প্রায়শই
তাঁর স্ত্রীকে বলতেন—“রবি অভিনয় কইরা সময় নষ্ট করে ক্যান? তোমার
পোলারে কয়া দিও ওই চেহারায় অভিনয় হয় না। সে ছিল দুর্গাদাস বাঁড়ুজ্যে, হিরোর মতো চেহারা।”
প্রথম স্ত্রী অনুভা গুপ্ত। ‘হাঁসুলিবাঁকের উপকথা’ ছবি করার সময় থেকে অনুভাদেবীর সঙ্গে যোগাযোগ। সেসময় অসুস্থ রবিকে সেবাযত্নে সারিয়ে তোলেন অনুভা। পরে বিয়ে
হয় তাঁদের। কিন্তু সে জীবন ছিল ক্ষণস্থায়ী। ১৯৭২ এ মারা যান অনুভা। বছর দেড়েক অভিনয়
ছেড়ে দিয়ে পুনরায় দিরে আসেন ‘গুপি গাইন বাঘা বাইন’ ছবিতে। ১৯৮২ তে দ্বিতীয় বিয়ে করেন বৈশাখীদেবী’কে। ৪৭ নং মহিম হালদার স্ট্রিটের আস্তানা ছেড়ে চলে আসেন গলফ গ্রীনের
ফ্ল্যাটে।
কতোজনকে যে চলচ্চিত্রে
সুযোগ করে দিয়েছেন এই অভিনেতা তা সব ইতিহাস আজ। পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ‘ধন্যি মেয়ে’-তে জয়াকে নেন রবি ঘোষেরই কথায়। এমনকী হৃষীকেশ
মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘গুড্ডি’র
জন্য জয়া বচ্চনকে হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে শেষে রবি ঘোষেরই কালীঘাটের বাড়িতে ফোন করে
তাঁকে উদ্ধার করেন।
তিনি চকোলেটের লোভ দেখিয়ে রাজি করিয়েছিলেন জয়া ভাদুড়িকে সত্যজিৎ রায়ের
‘মহানগর’-এ
অভিনয়ের জন্য। তাঁর জিমন্যাস্টিক দেখে ভাড়া করতে চেয়েছিল সার্কাস পার্টি। সে আর এক
কাণ্ড ! ’৬৯-’৭০
সালের কথা। একগুঁয়ে, অভিমানী জয়া কিছুতেই যাবে না মুম্বই। বাংলা ছবি করবে। সে বারও
তাকে বুঝিয়েটুঝিয়ে বম্বে পাঠান রবি ঘোষই।
যে মানুষ জোরজার করে অন্যকে মুম্বই পাঠান, তিনি কিন্তু এক বছরের বেশি
থাকতে পারেননি টিনসেল টাউনে।
উখরি’তে শ্যুটিং চলছে ‘গু-গা-বা-বা’র। কনকনে ঠাণ্ডা। প্রায় পাঁচতলা সমান একটা বরফের স্লোপিং দেখিয়ে সত্যজিত
গুপী-বাঘা’কে জিজ্ঞেস করলেন—“ওখান থেকে ঝাঁপ দিতে পারবে না তোমরা ?” চোখের সামনে স্থানীয় লোকজন তর তর করে উঠে যাচ্ছে। ঝপাঝপ ঝাঁপও দিচ্ছে।
দেখেশুনে ওঁরা এক কথায় রাজি। কিন্তু চুড়োয় উঠে হাত-পা পেটের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার জোগাড়!
কনকনে হাওয়া। তার ওপর ক্যামেরা গণ্ডগোল পাকালো। ফলে অপেক্ষা দীর্ঘ হল। বেশ খানিক পরে
ঝাঁপ দেওয়ার তলব। এর পর শোনা যাক রবি ঘোষের মুখে, “দিলাম
ঝাঁপ। সে এক এক্সাইটিং ফিলিং। মনে হল পেঁজা তুলোর ওপর দিয়ে গড়িয়ে এলাম। কিন্তু হাত-পা
স্টিফ। মানিকদা বললেন, ‘শিগগির ওদের ভ্যানে তোলো। আর গরম দুধ খাওয়াও।’ সব রেডিই ছিল। গাইড বলল, ‘খবরদার আগুনের কাছে যাবেন না। পা ফেটে যাবে।
শুধু পা ঠুকুন। হাত পায়ের সাড় ফিরতে লাগল পাক্কা চব্বিশ ঘণ্টা।”
এই মানিক’দার সাথে পরিচয় পর্বটিও বেশ মজার। ‘হাঁসুলী
বাঁকের …’ করার সময়ই আরও একটা ঘটনা ঘটল। রাস্তায়
ভানু ঘোষের সঙ্গে দেখা। সত্যজিৎ রায়ের অ্যাসিসট্যান্ট। “কোথায় থাকিস? মানিকদা তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এক্ষুনি চ।” সোজা লেক টেম্পলে সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি।
এরপরের সত্যজিৎ রায়-রবি ঘোষ সংলাপটা এ রকম—
কোথায় থাকো, তোমাকে একটা রোল করতে হবে। কী! করবে তো ?
(না করার প্রশ্নই নেই। তবু উত্তরও জোগাচ্ছে না মুখে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
সত্যজিৎ আবার বললেন)
আগামী সপ্তাহে তোমার আর সৌমিত্রর স্ক্রিন টেস্ট নেব। সৌমিত্র ড্রাইভার।
তুমি ক্লিনার। ক্লিনার দেখেছ ?
দেখেছি মানে ? আমি কালীঘাটের ছেলে। ক্লিনারদের মতো দারুণ সিটিও দিতে
পারি। সিটি মেরে কত পায়রা উড়িয়েছি।
রবি ঘোষ লিখছেন, “মানিকদার বাড়ি থেকে বেরিয়েই সৌমিত্র জিজ্ঞেস
করল, ‘বিয়ার খান ?’ আমি বললাম ‘হ্যাঁ।’
তারপর ট্যাক্সি করে সোজা মধ্য কলকাতার এক বার-এ।”
এ ভাবেই শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর অভিনয়-জীবনের আর এক অধ্যায়। অন্য এক অভিযান
!
রবি ঘোষের অভিনয় প্রসঙ্গে উত্তমকুমার একবার বলেছিলেন, “আমরা হয়তো জাঁকিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছি, আর রবি হয়তো কয়েক সেকেন্ড
থেকে এমন একটা কিছু করবে যে ও গোটা দৃশ্যটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে যাবে, লোকে হেসে গড়িয়ে
পড়বে”। আর বলিউডের প্রখ্যাত পরিচালক হৃষীকেশ
মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, “সব অভিনেতা, সব শিল্পী সব সময় আমার কাছে
একশোয় একশো পায় না। রবি পেয়েছিল।”
যাই হোক ‘গল্প হলেও সত্যি’তে ধনঞ্জয়ের ভূমিকা বাঙালি চিরদিনই ম্নে রাখবে। আসলে তপন সিংহ এমন একজন
পরিচালক যিনি জানতেন সিনেমা’কে কিভাবে সমাজের কাজে লাগানো যায়। এই সিনেমার
নায়ক ধনঞ্জয় একটা মিডিয়াম বলা যায়। এমন একটা চরিত্রকে উপস্থাপিত করে সাধারণ মানুষের
বিবেককে যদি একটুও ধাক্কা মারা যায়, এই ছিল তপন বাবুর সারা জীবনের ধ্যান জ্ঞান। তিনি
বলেছেন—‘গল্প হলেও সত্যি’ রূপায়ণের আগে আমি ভেবেছিলাম আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার কথা, যা
হেসে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। আমার এই সামান্য সাধনার পথে আমি বিশ্বাস করি কে কী মতামত
দিলেন বা কে কী বললেন এটাই শেষ কথা হয়ে উঠতে
পারে না। আপনাদের কথায় যদি সমুদ্রের বিশালতা থাকে তবে আপনাকে ক্ষুদ্রতা সম্পর্কে সচেতন,
বিনয়ী, শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠতে হবে।’
আলোচনা এবারে গুটিয়ে
আনি, ফিল্মফ্রি ডট ওআরজি’র পাতা থেকে কিছু লেখা কোট আনকোট করে…
“চরিত্রটি সেই বাড়ি ছেড়ে যাবার সময় বলে যাওয়া
শেষ কথাটি বা সংলাপটি সেই সংসারের বা পরিবারের সবচেয়ে প্রতারিত ও বাপ-মা মরা উপেক্ষিত
চরিত্র এবং ওই পরিবারেরই মেয়ে কৃষ্ণাকে উদেশ্য করে বলে যেতে শোনা যায়। তার সময় ফুরিয়েছে
এ সংসারে থাকার এমন ধরনের কিছু বলতে শোনা যায় তাকে। অর্থাৎ, তার প্রধান কাজ ছিল বা
এই পরিবারে ঢোকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পরিবারটিকে অশান্তি থেকে মুক্তি দেওয়া। ঐক্যবদ্ধ
করে তোলা মানুষগুলোকে।
পরিবারটি যখন মুক্তি
পায় অনৈক্যতা থেকে [যেটি মূল অশান্তির কারণ ছিল], তখন সেই পরিচারক চলে যায় সেই বাড়ি
ছেড়ে, আর ঠিক তখনই প্রমাণিত হয়, সে পেশায় আদতেও
একজন পরিচারক অবশ্যই নয়। তবে কে সে ?— আমার আলোচনা এই বিষয় নিয়ে নয়। আমার ধারণা, তপন সিংহেরও এইটাই ছিল সেই
গল্প-- যে গল্পের কাঁধে চড়িয়ে কিছু অনুগল্পকে প্রকাশ করেছিলেন তিনি। প্রকাশ করেছিলেন
বাংলার ঘরে ঘরে ঘটে যাওয়া বা উৎপাদিত ফসল দিয়ে নিউ ওয়েভ হতে পারত বা ঘটে যেতে পারত
[যা আদৌ ঘটতে পারল না] এমন একটা প্রায়-অতীন্দ্রিয় কালচারাল ম্যাপকে। যে কালচারটির আবেগ
ভেঙে গেছে, ভেঙে গেছে তার আবেগ ভরা কলশিটি। অথচ রেখে গেছে সেই অবিভক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের
ম্যাপটির ওপর আবেগে উপচে পড়া কলশিতে থাকা স্বপ্ন, যেগুলোকে গেঁথে রাখা হয়েছে সেই ম্যাপের
চার কোণায়।”
(সমাপ্ত)
#
©গৌতমদত্ত
৪ আগস্ট ২০২০
#
কৃতজ্ঞতা :-
১) উইকিপিডিয়া
২) ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল – “বাংলা অগ্নিগর্ভ, তীব্র হচ্ছে খাদ্য আন্দোলন!
সেই সময় মুক্তি পেল ‘গল্প হলেও সত্যি’ – আজকাল ডট ইন।
৩) গল্প হলেও সত্যি – ফিল্মফ্রি ডট ওআরজি।
৪) পাপিয়া মিত্র – “রবি ঘোষ - ধনঞ্জয় থেকে বাঘা বাইন, কাকে
ফেলে কাকে রাখি” –
খবরঅনলাইন ডট
কম।
৫) রানা চক্রবর্তী - ‘গল্প হলেও সত্যি !’
- এখনখবর ডট কম।
৬) শ্রেয়ণ – “তপন সিংহের ছবিতে ডেট না পেয়ে মামলা করেছিলেন
উত্তমকুমার” –
বঙ্গদর্শন ডট
কম।
৭) মেঘদূত রুদ্র – “শুধুমাত্র গল্প-বলিয়ে হয়েই থেকে গেলেন তপন
সিংহ, শিক্ষকের স্থান দিল না
বাঙালি” –
প্রহর ডট ইন।
৮) সরোজ দরবার – “এক সার্বিক ভুলের প্রায়শ্চিত্ত” – অবসর ডট নেট।
৯) “মনে পড়ে” –
তপন সিংহ।
১০) ‘গুগুল’ অবশ্যই – কারণে অকারণে।
##