সুবর্ণরেখা

 

আজ আমার চার নম্বর পোস্ট। আজকের আলোচনায় “সুবর্ণরেখা” ছায়াছবি।

চলচ্চিত্রটি ১৯৬২ সালে তৈরি হলেও এটি মুক্তি পায় ১ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে।

সুবর্ণরেখা এক নদী। যার বালি খুঁড়লে নাকি এখনো সোনা মেলে। এই নদীকে নিয়েই ঋত্বিক নির্মান করলেন অসাধারণ এক বাংলা ছায়াছবি। দেখালেন ভালবাসা অমর।

সাতচল্লিশের বাংলা ভাগ। সীতা আর ভাই ঈশ্বর পূর্ব পাকিস্থান থেকে ছিন্নমূল হ’য়ে কলকাতার এক উদ্বাস্তু কলোনীতে আশ্রয় পায়। ধর্মের জন্য উদ্বাস্তু হ;ইয়ে যাওয়া হাজার হাজার সব-হারানো পরিবার তখন বৃহত্তর কলকাতার চারপাশে কলোনী তৈরি করে নেয় জীবনের আশায়। সেই আশা স্বপ্ন বয়ে আনে ঈশ্বর আর তার বন্ধু হরপ্রসাদের কাছে। সে স্বপ্ন এই উদ্বাস্তু ছেলেমেয়েদের শিক্ষাদান।

সে সময় কলোনীগুলো তৈরিই হয়েছিল বিভিন্ন ফাঁকা জায়গায় যার মধ্যে অনেকাংশই ছিল তাদানীন্তন জমিদারদের ফেলে রাখা জমি বা বাগান। কলোনিতে ভাগাভাগি বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষে মানুষে। শুধু দেশভাগই নয়। আরো কত ভাগ  যে ছিল বা আছে এই নিরন্নতার মধ্যেও ! আর তাই ইশকুল প্রতিষ্ঠার দিনেই, বাগদী মা আর ছেলে অভিরাম আলাদা হয়ে পড়ে জমিদারের তাড়ায়। সেদিন ঈশ্বর বাঁচাতে উঠে দৌড়ে গেলেও হরপ্রসাদ পেছন থেকে সাবধান করে যেন ওদের বাঁচাতে গিয়ে ঈশ্বর নিজে ধরা না পড়ে যায় আর শিশুদের বলতে থাকে ভারতমন্ত্র উচ্চারণ করতে। এখান থেকেই শুরু হয় আরেক প্রস্থ বিভেদের বীজ।

এ দায় কার? কারোর একার? নাকি কম বেশি সবার? এই প্রশ্ন আর তার উত্তর ফিরে ফিরে এসেছে এই সিনেমায় বহুবার, আমাদের দর্শকদের চোখে এই ‘সত্য’ আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে।

ঈশ্বরও ডেকে আনে এই ভাগ। একসাথে দু-বন্ধুর পথচলায় বিরতি পড়ল। সীতার জন্য আর মা হারানো অভিরামের জন্য এক বন্ধু রামবিলাস ঘাটশিলার নিকট রাঢ়বঙ্গে তার লোহার কারখানার খাজাঞ্চি-র চাকরি গ্রহণ করতে বলে। ঈশ্বর বন্ধুর সহায়তায় নিয়ে নেয় নতুন চাকরি। দূরে…। কলোনীর জীবন থেকে। সুবর্ণরেখা’র তীরে।  হরপ্রসাদের কাছে তার পরিচয় ‘পলাতক’ এক যোদ্ধা। নিজের সুখ যার কাছে বড়। সুবর্ণরেখার ধারে এক সকালে সীতাকে দেখাল নতুন কাজের জায়গার চারপাশ। সত্যের মুখোশ খুলে যায় অচিরেই যখন সে সীতাকে বলে শিশুদের মিথ্যে কথা না বলতে। 

বয়স থাকে না থেমে। সীতা আর অভিরাম বড় হ’তে থাকে। সীতা আর অভিরামের ভালবাসা পূর্ণতা পায় নানান অভিঘাতের মধ্যে দিয়ে। নতুন ঘরের সন্ধান পেয়ে সেখানে চলে যাবার আগেই মারা যায় অভিরাম। ততদিনে সীতার শরীরে নতুন প্রাণ, বিনু। বিনুকে নিয়ে কষ্টের সংসার টানতে হিমশিম খায় সীতা। শরীর বেচতে পথে নামার হাতছানিতে সাড়া দিতেই হয় সীতা’কে।

সিনেমার ক্লাইম্যাক্স তুঙ্গে ওঠে যখন সীতা’র প্রথম খদ্দের হয়ে তার কাছে আসে তার দাদা ঈশ্বর। সীতা আত্মহত্যা করে। হয়তো এও এক জহরব্রত !

বিনু আর ঈশ্বর পুনরায় গিয়ে দাঁড়ায় সেই সুবর্ণরেখার তীরেই। বুড়ো হ’য়ে যাওয়া ঈশ্বর আবার মিথ্যে স্বপ্ন দেখায় ছোট্ট বিনুকে নতুন ঘরের। নতুন ঠিকানার।

ছবি থামে একসময়।

এ সিনেমার চিত্রগ্রাহক, দিলীপ রঞ্জন মুখার্জী, সম্পাদনায়, রমেশ যোশী, শব্দযন্ত্রী, সত্যেন চট্টোপাধ্যায়। শিল্প নির্দেশনায় রবি চট্টোপাধ্যায়।

এ ছবির সুরকার ওস্তাদ বাহাদুর খান। আর 'সুবর্ণরেখা' চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় ছিলেন ঋত্বিক কুমার ঘটক।

বাংলাদেশের লেখক আবদুল্লাহ আল মোহন ‘অবিভাজ্য বাঙালি ঋত্বিক ঘটক’ নামে এক লেখায় বলেছেন—

“………

‘- বাড়ি কোন জিলায় ?

- ঢাকায়।

- তাহলে এহানে কিছু হবে টবে না। এখানে সব পাবনার লোক। জিলায় জিলায় বিভেদ

  একেও যদি আমরা টিঁকিয়ে না রাখতে পারি, তাহলে আমাদের রইলটা কী ?’

এই না হলে পাবনার পোলা ঋত্বিক ঘটক ! সুবর্ণরেখায় এভাবেই আত্মউন্মোচন করেন, নস্টালজিক হন ঋত্বিক। বাংলা চলচ্চিত্র আকাশের এক উজ্জল নক্ষত্রের নাম ঋত্বিক কুমার ঘটক। মাত্র ৫১ বছরের জীবদ্দশায় ঋত্বিক কুমার ঘটক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে পেরেছিলেন ৮টি। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন সব মিলিয়ে ১০টি। আরও অনেকগুলো কাহিনীচিত্র, তথ্যচিত্রের কাজে হাত দিয়েও শেষ করতে পারেননি। পঞ্চাশের দশকে শিল্প সাহিত্য ও চলচ্চিত্র অঙ্গনে বিপ্লবের ছোয়া আনতে যে কয়টি নাম উচ্চারিত হয় তার মধ্যে ঋত্বিক ঘটক অন্যতম। সিনামা জগতে রীতিমত ‘ভাংচুর’ করে স্থানটা গড়ে নিয়েছেন তিনি। সেলুলয়েডের এই যোদ্ধার অনবদ্য সব সৃস্টিগুলো শুধু সিনেমা দর্শন নয় জীবন পাঠও হয়ে উঠেছে। পরিচালনা, অভিনয়, নাটক, চিত্রনাট্যসহ বিভিন্ন অঙ্গনে ছিলো তার অবাধ বিচরণ। আর তাই মনে প্রশ্ন জাগে, দেশভাগের বেদনার ভাষা কি আজও তৈরি হয়েছে ? তবে ঋত্বিকের ছবি নিঃসন্দেহে বিষাদের সেই অতলান্ত গভীরতাকে ছুঁতে পেরেছে অনেক বারই। নিজে যন্ত্রণায় আকীর্ণ নীলকণ্ঠ এক একক শিল্পী হয়েও সমষ্টির প্রতিবাদী চেতনার প্রতি আস্থাটা ঋত্বিক অবিচল রেখেছিলেন আজীবন। ‘সুবর্ণরেখা’-তে জন্মভূমি থেকে উৎপাটিত হয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘নবজীবন কলোনী’। সে যৌথতার আদর্শ থেকে নিজের একক সুখের অন্বেষায় চলে যাওয়া ঈশ্বর চরিত্রটার করুণ পরিণতি এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে তার নতুন বাড়ির সন্ধান, মানব জীবনের গোটা চক্রটাকেই যেন ধারণ করলেন ঋত্বিক। পালানোর পথ নেই। লড়াই করেই বাঁচতে হবে। অভিজ্ঞতার উপলব্ধি অপাপবিদ্ধ মননের কাছে কখনওই ধরা দেয় না। দেশভাগের আদিপাপের উপলব্ধি যখন সকল বাঙালির চেতনাকে স্পর্শ করবে, ঋত্বিক ঘটক নামের এই অসামান্য সিনেমা-শিল্পীর আজন্ম এষণা সেদিন সার্থক হবে।”

ফিরে আসি সিনেমার প্রসঙ্গে…

সুবর্ণরেখা ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনায় জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র-র পরিবর্তে সুরারোপ করেন বিখ্যাত সরোদিয়া ওস্তাদ বাহাদুর হুসেন খাঁ সাহেব। নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী হিসেবে যোগদান করেন গায়িকা আরতি মুখার্জি।  রনেন রায়চৌধুরী তো ছিলেনই। বাহাদুর খাঁ সাহেবের সঙ্গীত পরিচালনায় এই ছায়াছবির সঙ্গীত ও তার গান দেশের আপামর জনসাধারণের চিত্তহরণ করেছিল। ছবির টাইটেল পেজ ওঠার সময় সেতার, বাঁশি, ক্ল্যারিওনেট ও জলতরঙ্গের অর্কেস্ট্রা শোনা যায় এবং নেপথ্যে শঙ্করাচার্যের ‘মোহমুদগর’ থেকে নির্বাচিত শ্লোক পাই। কেদার রাগে আশ্রিত এই অংশবিশেষ ছবির শুরুতেই দর্শকদের মোহাবিষ্ট করে রাখে।

সীতা গান শিখত মাস্টারমশাই এর কাছে। একটি দৃশ্যে সীতা ও অভিরাম হাত ধরাধরি করে এরোড্রামে দৌড়াদৌড়ি করে খেলা করে। একসময় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে গোরা সৈন্যরা এই এরোড্রাম তৈরি করেছিল। আজ সেখানে দুই বন্ধু খেলা করে। এই দৃশ্যে সুরকার ক্ল্যারিওনেট, সেতার ও তালতন্ত্রের এক অনবদ্য মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এই দৃশ্যের রেশ ধরে আমরা দেখতে পাই ‘বহুরূপী’ চৈতন্যকে। হঠাৎই কালীবেশে সে ক্রীড়ারত সীতার সামনে এসে পড়ে। সীতা ভয় পেয়ে যায়। বৃদ্ধ ম্যানেজারবাবু চৈতন্যকে মৃদু তিরষ্কার করলে সে লজ্জিত হয়ে চলে যায়। সীতার জীবনে এই প্রথম অদ্ভুত অভিজ্ঞতার নিরিখে আবহে বেজে ওঠে বাঁশির মেঠো সুর।

ছোট্ট সীতা বড় হয়। আমরা দেখি বিরহী সীতা একা একা এরোড্রামে বসে গান গায়। আরতি মুখার্জির কণ্ঠে সেই রাগাশ্রয়ী গান — ‘মোর দুখুয়া কা সে কহু/মোহন বিনা জিয়া নাহি লাগে/ দেখ ভোর ভয়ি/দশদিক জাগে’।

তারও অনেক পরে কলকাতার একটা ভাড়া ঘরের একটি দৃশ্যে সীতা একা একা তানপুরায় গান গায়। মেঘ রাগে সেই গান — ‘ঘনন আয়ে ঘোরি বরখা কে/ ঘন গগন ছায়ে দামিনী দমকৎ’। এই গানের মাধ্যমেই সে তার দুঃখদুর্দশার কথা নিভৃতে বলতে চেয়েছে। পরবর্তী ক্ষণেই ছোট ছেলে বিনুর মন ভোলাতে সে করতালি দিয়ে গেয়ে ওঠে — ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায় লুকোচুরি খেলা’। এই গানটি পুনরায় ফিরে আসে ছবির শেষ দিকে যখন ছোট্ট বিনু’র গলায় উচ্চারিত হয় তার মায়ের শেখানো এই গান। ‘জীবন’ নামক ধানের ক্ষেতে সুখ (ছায়া) ও দুঃখের (রোদ) যে নিরন্তর আসা যাওয়া তার এমন সার্থক প্রয়োগ বাংলা সিনেমার জগতে আমার আর তো মনে পরে না।

সুবর্ণরেখা ছবির শিল্পীরা—

অভি ভট্টাচার্য - ঈশ্বর চক্রবর্তী

বিজন ভট্টাচার্য - হরপ্রসাদ

ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী - ছোট্ট সীতা

গীতা দে - কুশল্যা (বাগদি বাউ)

শ্রীমান তরুণ - ছোট্ট অভিরাম

রনেন রায় চৌধুরী - বাউল

অবনীশ বন্দোপাধ্যায় - হরি বাবু

রাধা গোবিন্দ ঘোষ - ম্যানেজার

ঋত্বিক ঘটক - সংগীত শিক্ষক

মাধবী মুখোপাধ্যায় - সীতা

সতীন্দ্র ভট্টাচার্য - অভিরাম

জহর রায় - মুখোপাধ্যায় (ফোরম্যান)

উমানাথ ভট্টাচার্য্য - অখিল বাবু

সীতা মুখোপাধ্যায় - কাজল দিদি

পিতাম্বর - রামবিলাস

এবারে আসি ঋত্বিক ঘটক-এ। নিজের লেখা ‘নিজের পায়ে নিজের পথে’ বইখানা থেকে কিছু অংশ আপনাদের শোনাই।

“(‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’র) মধ্যে নিশ্চয়ই একটা অন্তর্নিহিত সূত্র আছে। ‘মেঘে ঢাকা তারা’ was completely…..in my subconscious affair. ‘কোমল গান্ধার’ was a very conscious affair. আমার এই মহিলার সঙ্গে বিবাহ ব্যাপারটা তার সঙ্গে প্রচণ্ড ভাবে জড়িত। আর ‘সুবর্ণরেখা’ is a very serious work. ওখানে খাটতে হয়েছে, হ্যাঁ মানসিক ভাবে……a work behind দৈহিক ভাবে খাটার ব্যাপার নয়, মানসিক ভাবে প্রচণ্ড খাটতে হয়েছে এবং এটাকে আমাকে দাঁড় করাতে হয়েছে। কদ্দূর দাঁড়িয়েছে সে আমি জানি না, কিনতি মীঞা কথা হইত্যাছে, যে খাটছি আমি।   

যোগসূত্র এই তিনটার মধ্যে একটা মাত্র। সেটা হচ্ছে দুই বাংলার মিলন। দুইডা বাংলারে আমি মিলাইতে চাইছি। দুইডারে আমি ভালবাসি হেইডা কমু গিয়া মিঞা, এবং আজীবন কইয়া যামু, যখন মৃত্যু পর্যন্ত আমি কইয়া যামু। আমি পরোয়াই (করি না), আমার পয়সার পরোয়াই (নাই)। I can fight that out. ঋত্বিক ঘটক can do that out here and in Dhaka. আমারে কে মারব লাথি, মারুক গা যাক। বইয়া গ্যাছে গিয়া।”

এই হ’লেন ঋত্বিক। আপোষহীন। সত্যিকারের এক অসাধারণ বোহেমিয়ান হয়তো। যাঁর নিজের জীবনের ওপরে বিন্দুমাত্র লোভ নেই। জীবন বলতে আমি ক্যারিয়ার বোঝাতে চাইছি।

“ছবি as such, cinema as such, film as film পেটের ভাত দেয়, সোজা বাংলা কথা। ছবি লোকে দেখে। ছবি দেখানোর সুযোগের পথ যত দিন খোলা থাকবে, ততদিন আমি পেটের ভাতের জন্য ছবি করে যাব। কালকে বা দশ বচর পরে যদি সিনেমার চেয়ে ভাল কোন   বেরোয় আর দশ বছর আমি যদি বেঁচে থাকি, তা হলে সিনেমাকে লাথি মেরে আমি সেখানে চলে যাব। সিনেমার প্রেমে, মশায়, আমি পড়িনি।”

এক্কেরে ঝকঝকে সাদা বাংলা কথাগুলো। আমি তো জানিনা আর কেউ এমন কথা মনে মনেও ভাবতে পেরেছে কিনা !

এই হলেন ঋত্বিক ঘটক। ঋত্বিক ঘটককে নিয়ে যদি পারি কোনোদিন লিখব। ইচ্ছে রইল। তবে সেটা বেশ বড় হবেই কারণ আমার সংগ্রহে ঋত্বিক-এর ওপরে যা যা রেফারেন্স আর বই আছে তার থেকে অল্প অল্প কিছু উল্লেখ করলেও তা একটা বিশাল আকার নেবেই।

আজ আমার আলোচনা শুধুমাত্র ‘সুবর্ণরেখা’তেই নিবিষ্ট রাখি মাত্র।

১৯৬৬ সালে সুমিত মিত্র সমালোচনা করলেন ‘সুবর্ণরেখা’র তীক্ষ্ণভাবে। সমালোচনা তো নয়, যেন সারা শরীর পোস্ট মর্টেম করতে গিয়ে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। সেই সমালোচনার কিছু খণ্ড খণ্ড অংশ আমি তুলে ধরছি। সম্পূর্ণ পড়তে হলে রজত রায় সম্পাদিত ‘ঋত্বিক ঘটক’ বইটির ২৬০ নাম্বার পাতাটি খুলুন। এই বইটিতে গুরুদাস ভট্টাচার্য্যের লেখা আরেকটি সুন্দর আলোচনা রয়েছে এ ছবিকে নিয়েও।

“……প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল, ‘সুবর্ণ-রেখা’র মূল সমস্যা বাংলাদেশের উদ্‌বাস্তুসমস্যা নয়। ঈশ্বরের জীবনে বিপর্যয়, সংঘাত, যন্ত্রণা, আত্মিক উপলব্ধি—এর কোনোটিই তারুদ্‌বাস্তু পরিচয়কে ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। সেসব এসেছে নেহাতই আপতিকভাবে বা দৈবক্রমে। ঈশ্বরের জন্ম পশ্চিমবাংলার বা পৃথিবীর যে-কোনো জায়গায় হলেও ক্ষতি ছিল না। ………

……সুবর্ণ-রেখা’য় রিয়ালিজম অনুপস্থিত। নীতিবাদ কিন্তু আছে। সার্ত্র একবার কাম্যু সম্পর্কে বলেছিলেন যে কাম্যু অন্তরে ঘোর নীতিবাদী—তাঁর নীতিবাদ সপ্তদশ শতকের ফরাসি নীতিবাদীদের ঐতিতে লালিত। মোটামুটি, পাপপুণ্যের ব্যাপারটাকেই দূরে ঠেলে রেখেছিলেন কাম্যু। তাঁর মতে পাপ দ্বেষ হিংসা ক্রোধ—এ সবকিছুই মানুষকে স্পর্শ করে না। পৃথিবীতে আউটসাইডারের কাছে পাপই-বা কী, পুণ্যই-বা কী ? ঋত্বিকবাবুর পাপ সম্পর্কে ধারণাটা কিন্তু অত গভীর জীবনদর্শনসঞ্জাত নয়। তাঁর নীতিবাদ প্রায় পাঠশালার গুরুমশায়ের মতো। বিংশ শতাব্দীর মানুষ, কী করে ওরকম বাইবেল-কথিত পাপের ধারণা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে ? উনবিংশ শতকেই বোদলেয়র তা পারেননি, ভিক্‌তর হুগোও পারেননি। ফলে সুবর্ণরেখা’র নায়কের আত্মিক সমস্যা তাকে বৃহত্তর জীবনসত্যে উত্তীর্ণ করায় না। তার বিপর্যয়ে দর্শকমনে এক ধরনের ধাক্কা দেয় কেবল—একটা পাষণ্ডপীড়নগোছের ব্যাপার হচ্ছে বলে মনে হয়।

সুবর্ণ-রেখা’র অন্তর্লীন রোমান্টিকতা ছবি দেখতে বসে প্রতি পদেই ধরা পড়ে। এ প্রসঙ্গে একটু আঙ্গিকের আলোচনায় আসতে হবে। ছবির অধিকাংশেই পাত্রপাত্রীদের শট নেওয়া হয়েছে উঁচু কোনে-ক্যামেরাকে ওপর দিকে করে বেঁকিয়ে। অধিকাংশ শট-ই ক্লোজ বা মিড-ক্লোজে নেওয়া। এর ফলে ফ্রেমটি প্রায়ই দেখতে ভালো হয়—পাত্রপাত্রীদের মহিমান্বিত দেখায়, ব্যাকগ্রাউন্ডের উঁচু উঁচু গাছপালা, এমনকি টিনের শেডও অসম্ভব দৃষ্টিনন্দন রূপরেখা (Pattern) সৃষ্টি করে। সাধারণ খুচরো ব্যাকগ্রাউন্ডে কবি শেলির কথা “Poetry...makes familiar objects appear as if they were not familiar'। ঋত্বিকবাবুর শট কম্পোজিশনও সেই মনস্তত্ত্ব দ্বারা চালিত। এবার সীতার আত্মহত্যার দৃশ্যটি মনে করা যাক—যেখানে পর্দায় সীতার দুটি ডাগর চোখের বিগ ক্লোজ-আপ দেখানো হয়েছে অনেকক্ষণ ধরে। শটটি দেখতে খুব ভালো, সন্দেহ নেই। কিন্তু এত ভালো যে তার অন্তর্নিহিত সমস্ত যন্ত্রণা সব গ্লানি যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। ছবিটি যেন একটি ভালো স্থিরচিত্রের উদাহরণ, যা ক্লোজ-আপ লেন্সের বিপুল অগ্রগতির বিজ্ঞাপনের মতোই পর্দায় ঝুলতে থাকে। কিন্তু এ ছবিতে শটটির শৈল্পিক সার্থকতা কোথায় ?.........

শিল্পগত উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শিল্পের মধ্যে বিকৃতি ঘটানোটা অপরাধ নয়। যেমন ‘আমব্রেলাজ অফ শেরবুর্গ’ ছবিতে গান গেয়ে সংলাপ উচ্চারণ করা, অথবা সংগীতের বিভিন্ন মুভমেন্ট-এর অনুসরণে সংলাপের সুরকে বেঁধে দেওয়া। এ এক ধরনের অস্বাভাবিকতা সন্দেহ নেই—কিন্তু এরাই ছবির অন্তর্লীন স্বাভাবিকতাকে আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত করে।………

সুবর্ণ-রেখা’তেও সে ধরনের অস্বাভাবিকতা আছে—কিন্তু সেসবের বিশেষ কোনো শিল্পগত উদ্দেশ্য নেই। যেমন হরপ্রসাদের চরিত্র-কল্পনাটি। এর inconsistency চরিত্রটিকে প্রায় grotesque দুর্জ্ঞেয়তার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ………

আরও হাস্যকর এ ছবির প্লট-বিন্যাসের ব্যাপার। অভিরামের সঙ্গে তার মা-র ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর এক যুগ কেটে গেছে। সে যখন শিশু, তখনই তার মা-র সঙ্গে বিচ্ছেদ। এতদিন পরেও স্টেশনে একটি বাগদি বউকে মরতে দেখে সে মা বলে চিনতে পারে। আশ্চর্য স্মরণশক্তি তার। তারপর, প্লটের বিন্যাস এমনই চমৎকারিত্বে পৌঁছেছে, যে ঈশ্বর পতিতালয়ে যেতে গিয়ে ঠিক সীতার ঘরেই প্রবেশ করল। আর সেটাই আবার এ পথে সীতার ‘প্রথম রজনী’না হলে সীতা-মার পবিত্রতাটা থাকে কোথায়—স্বয়ং জানকী কি কর্মলিপ্ত হতে পারেন ?.........

মাধবী মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় ভালো। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ স্বাভাবিকতা যথার্থ ভালো ছবির মানে পৌঁছোয়। অভি ভট্টাচার্যের মুখমণ্ডল বড়ো inelastic—ফলে চরিত্রটির বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যাহত হয়েছে। বিজন ভট্টাচার্যের এ ছবিতে অভিনয় রীতিমতো নিম্নস্তরের। তাঁর অতিরিক্ত হাত-পা-নাড়া, প্রতিটি কথা টেনে বা দ্রুত উচ্চারণ করে সংলাপকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে নাটকীয় করে তোলা— এসবই তিরিশের দশকের বাংলা সিনেমা কিংবা অহীন্দ্র চৌধুরী মশায়ের ট্র্যাডিশনকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়’ গানটি অত্যন্ত সুপ্রযুক্ত। অন্য একটি গান (আজু কি আনন্দ’) গাওয়ার দোষে রীতিমতো কর্ণপীড়ার কারণ। ছবিতে নানান জটিল রাগরাগিণী আছে। কিন্তু যথার্থ ফিল্ম মিউজিক, যার সঙ্গে ছবির ইমেজ অঙ্গাঙ্গীভাবে সম্পৃক্ত, তা এ ছবিতে খুঁজে পাওয়া যায় না।

শেষে, সুবর্ণ-রেখা’ সম্পর্কে দর্শক হিসেবে আমার ধারণা সুবর্ণ-রেখা’ নিশ্চয়ই পরিচ্ছন্ন ছবি, সাধারণ বাংলা ছবির তুলনায় অনেক উন্নত মানের ছবি। কিন্তু ফর্ম বা কনটেন্ট বা উভয়েরই প্রয়োগগত কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে সুবর্ণ-রেখা’ আমাদের কাছে আসেনি। তবে কেবলমাত্র ‘বেশ ছবি’ হওয়াটাই বা কম কীসে, বিশেষত বাংলা ছবির দর্শকের কাছে।” 

সুবর্ণরেখা প্রসঙ্গে প্রবন্ধে ঋত্বিক নিজে কি লিখেছেন দেখি—

“প্রত্যক্ষভাবে সুবর্ণরেখা’ ছবিতে উপস্থাপিত সংকট উদ্বাস্তু সমস্যাকে অবলম্বন করে আছে। কিন্তু ‘উদ্বাস্তু’ বা ‘বাস্তুহারা’ বলতে এ ছবিতে কেবল পূর্ববঙ্গের বাস্তুহারাদেরই বোঝাচ্ছে না— ঐ কথাটির সাহায্যে আমি অন্যতর ব্যঞ্জনা দিতে চেয়েছি। আমাদের দিনে আমরা সকলেই জীবনের মূল হারিয়ে বাস্তুহারা হয়ে আছি এটাও আমার বক্তব্য। ‘বাস্তুহারা’ কথাটিকে এইভাবে বিশেষ ভৌগোলিক স্তর থেকে সামান্য স্তরে উন্নীত করাই অন্বিষ্ট, ছবিতে হরপ্রসাদের মুখের সংলাপে, (আমরা ‘বায়ুভূত, নিরালম্ব') কিংবা ছবির প্রথমেই এসে একজন কর্মচারীর মুখে, উদ্বাস্তু ! কে উদ্বাস্তু নয় ?” এই কথায় সেই ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে।......... 

‘সুবর্ণরেখা’কে আমি ক্রনিক প্লের ভঙ্গিতে ধরার চেষ্টা করেছি। পরিচয়লিপি থেকেই তার ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করেছি। এ ধরনের ক্রনিকলের যা রীতিনীতি হওয়া উচিত সেগুলোকে বজায় রেখে মাঝে মাঝে লেখা এনেছি।..........

এ ছবি করতে গিয়ে একটা স্তরে রবীন্দ্রনাথের শিশুতীর্থ’ আমাকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। সেটা শুধু শেষে গিয়ে দুটো লাইন জুড়ে দেবার ব্যাপার নয়। গোটা ছবিময় গোড়া থেকে টুকরো টুকরো সংলাপে, কিছু কিছু সংগীতের ব্যবহারে, কিছু কিছু ঘটনার সংস্থাপনে ‘শিশুতীর্থ অনিবার্যভাবেই এসে পড়েছে। এবং সেই জন্যই শেষের তিনটি লাইনও অনিবার্য। ওটা নিরাশারও নয়, অবক্ষয়েরও নয়। 

আর ভাল করে অনুধান করতে বলি ছবিতে ব্যবহৃত বেদ ও উপনিষদের শ্লোকগুলি। অনেক ভেবে, অনেক বাছাই করে ঐ কটিকে আমি গ্রহণ করেছিলাম। তাদের প্রত্যেকটির বিশেষ ব্যঞ্জনা আছে এবং আমার অর্থ প্রকাশের পক্ষে তারা খুবই সাহায্য করেছে।…… 

‘সুবর্ণরেখা’—এই চিত্রটির দ্বারা আমি প্রচলিত ধারার উপর সরাসরি আঘাত হানতে চেয়েছিলাম।

এই ছবিটিকে মেলোড্রামা বলা হয়েছে এবং তাতে কিছু ভুল হয়নি। সমালোচকদের স্মরণে থাকা উচিৎ ব্রেশ্‌টের কথা। তিনি কিন্তু বিচিত্র ঘটনা পরম্পরার উপরে নির্ভর করেছেন, এবং ‘বিচ্ছিন্ন অনুভূতি’র একটা ব্যাপার তৈরী করেছিলেন, কথাটা মনে রাখা ভাল।

তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর প্রসারতা আমাকে প্রভাবিত করেছে।…আজকে আমার এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধটিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবো।— 

প্রত্যেক শিল্প একমাত্র সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হলেই সর্বাঙ্গসুন্দর হয়। শুধুমাত্র সত্য দ্বারা শিল্পসৃষ্টি সম্ভব নয় এ কথা সত্যি, কিন্তু সত্য ব্যতীত শিল্প সম্পূর্ণ হয় না। আমরা এটুকু মনে রাখলে ভাল করবো।”

এবার শোনাই অভিরাম চরিত্রের অভিনেতা অভী ভট্টাচার্য‘র লেখা ‘সুবর্ণরেখার স্মৃতি’ নামে এক আলোচনার কিছু কীছূ অংশ……

       “এক দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত থেকেও, আজ সবকিছুকে আর পরিষ্কার করে মনে। পড়ে না। তবে প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন অনেক ঘটনা থাকে, ব্যক্তি থাকে যার কথা। স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যায় না। ফিরে আসে। ফিরে ফিরে আসে। আমার জীবনে ঋত্বিক সেইরকমই এক ব্যক্তি।

       বর্তমান বাংলাদেশের, পাবনা জেলায় ঋত্বিকের জন্ম। আমারও ওই একই গ্রামে বাড়ি। বয়সে আমার থেকে ঋত্বিক ছোটো হলেও ওর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল। পরে দুজনেই রাজশাহী কলেজে পড়ার ফলে, সেই বন্ধুত্ব ক্রমে আরও ঘনিষ্ঠ হয়।……

       কলকাতায় রাধেশ্যামের একটা ফ্ল্যাট ছিল। ওই ফ্ল্যাটের একটা অংশ বিক্রি করে রাধেশ্যাম ছবি শুরু করল। ছবি হবে কলকাতায়। আমি হলাম ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র। আর মাধবী মুখার্জি হয়েছিলেন আমার বোন। তখনও মাধবী এত নাম করেনি। আমরা প্রায় বিনা পয়সাতেই অভিনয় করেছিলাম। কারণ, পয়সাকড়ির স্বচ্ছলতা মোটেই ছিল না। যাই হোক, বহু পরিশ্রম করে, বহু কষ্টে ছবি শেষ হল। ছবির ডিস্ট্রিবিউশন হল না। এদিকে বাজারে বিস্তর ধারদেনা হয়ে গেছে। তখন ওই ধারদেনা শোধ করার জন্য রাধেশ্যাম বোম্বাই-এর বিখ্যাত ফিলম ডিস্ট্রিবিউটর রাজশ্রী পিকচার্সকে মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকায় ছবি বিক্রি করে দেয়। রাজশ্রী প্রোডাকশনের ব্যানারে ছবি রিলিজ হল। তবে চলল না। পরে অবশ্য চলেছিল। আসলে এসব ছিল সময়ের থেকে অনেক এগিয়ে থাকা। অবশ্য সত্যজিৎবাবুও এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন।

       সত্যজিৎ রায় ছিলেন ঋত্বিকের বিশেষ পরিচিত। সুবর্ণরেখায় মাধবীর অভিনয় দেখে উনি বলেছিলেন, “ঋত্বিকের কাস্টিং সেন্স অসাধারণ।” সুবর্ণরেখা দেখেই সত্যজিৎবাব। মাধবীকে ওনার ‘চারুলতা'-র জন্য নির্বাচন করেন।

      ফ্রান্সের বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক জর্জ সাঁদুল তখন ফ্রান্স ও ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত ছিলেন। মনে আছে, জর্জ সাঁদুল কলকাতায় ঋত্বিকের ছবিগুলো দেখেন। আর ফ্রান্সে গিয়ে ঋত্বিককে পাঠান এক দীর্ঘ চিঠি। সেই চিঠি ঋত্বিক আমাকে দেখায়। চিঠিটা এখন খুঁজে পেলাম না। কিন্তু পরিষ্কার মনে আছে, তাতে লেখা। ছিল, “ইয়োর পিক্‌চার ইজ মোর আর্টিস্টিক দ্যান রে’স চারুলতা”। ভারত সরকার ঋত্বিকের সব ছবিকেই ‘আনঅফিসিয়াল এনট্রি ফর ফেস্টিভ্যাল’ এবং সাবটাইটেল ছাড়া পাঠাত। ফলে ঋত্বিকের ছবি রেকগনাইজড হতে পারত না। সাঁদুল আবার লিখলেন—সেনড্‌ ইয়োর পিকচার অ্যাজ অফিসিয়াল এনট্রি। রাজশ্রী পিকচার্সকে চিঠির কথা জানালে তারা ছবিটা উৎসবের জন্য কিছুটা দৈর্ঘ্য কমিয়ে প্রিন্ট করে। তৎকালীন ভারত সরকারের তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রকের প্রধানকে ঋত্বিকের সুবর্ণরেখা’-র কথা জানালে তিনি অফিসিয়াল এনট্রির জন্য রাজি হন এবং সেই ব্যাপারে একটা চিঠি দিতে বলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য ! আমাদের ছবি যখন ভেনিস ফেস্টিভ্যালের জন্য প্রস্তুত হল, ততদিনে মিনিস্ট্রি বদলে গেছে। ছবি আর পাঠানো সম্ভব হল না।।

      প্রবাসী বাঙালিদেরকেও এই ছবি ভীষণভাবে ধাক্কা দিয়েছিল। এই ছবি দেখে তাদের আবেগ, উচ্ছাস আর মন্তব্য আজও পরিষ্কার মনে পড়ে। বেশ কিছু প্রবাসী বাঙালি আমায়। বলেছিল—“দাদা! বহু সিনেমাই দেখেছি, কিন্তু এভাবে কোনোদিন প্রহৃত হইনি।” বোম্বাই-এর এক বিখ্যাত অবাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক ছবি দেখে হলের বাইরে এসে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেন। আর আমার দু-হাত জড়িয়ে ধরে জানান আন্তরিক ধন্যবাদ। অবশ্যই ঋত্বিককে।……

      সুবর্ণরেখা’-র শেষ দৃশ্যে প্রায় এক কথাতেই ঋত্বিক—আমার কী অনুভূতি হবে, তা কয়ে দিয়েছিল। আমিও ঋত্বিকের সেই নির্দেশ যথাসম্ভব পালন করার চেষ্টা করেছি। যাই হোক, ওর দক্ষ ক্যামেরায় সে দৃশ্য বাস্তবায়িত হয়েছিল।

        ঋত্বিক ছিলেন একজন সত্যিকারের সৎ শিল্পী। এক সম্পূর্ণ অন্য জগতের মানুষ”।     

        বঙ্গদর্শন ডট কম এ প্রকাশিত প্রিয়ক মিত্র’র এক লেখা থাকে জানতে পারলাম…

        “ঋত্বিক রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ নিয়ে সিনেমা বানাতে উৎসাহী ছিলেন। চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন। বিষ্ণু দে নিজে সাহায্য করছিলেন তাকে। সেই সিনেমা শেষপর্যন্ত হয়ে ওঠেনি। এই সম্ভাবনা নিয়ে আমার আফসোস থেকে যায় এই কারণেই যে ঋত্বিক কীভাবে পাঠ করতেন ব্যক্তি মনস্তত্ত্বের এমন জটিল সমীকরণকে, রেনেসাঁর সংকটকে, আধ্যাত্মিক সংশয়ের আখ্যানকে। ঋত্বিককে আমরা একমাত্রিক পাঠের আওতায় ফেলে দিয়েছি অনেকক্ষেত্রেই। ঋত্বিকের ভাবনা নিয়ে চর্চার অন্যতর আঙ্গিক আবিষ্কৃত হবে নিশ্চয় পরবর্তীতে, তার সমসময় বেঁচে থাকবে বহু উপেক্ষার গ্লানি নিয়ে”।

*

ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ছবিগুল-…

১৯৫১  বেদেনী।

১৯৫২ নাগরিক।

১৯৫৪  নরমেধ যজ্ঞ।

১৯৫৫ আদিবাসিয়োঁ কা জীবন স্রোত (ডকুমেন্টারি)।

১৯৫৫ বিহার কে দর্শনীয় স্থান।

১৯৫৫ ওঁরাও (ডকুমেন্টারি)।

১৯৫৮ অযান্ত্রিক।

১৯৫৮ বাড়ি থেকে পালিয়ে।

১৯৫৯ কত অজানারে।

১৯৬০ মেঘে ঢাকা তারা।

১৯৬১  কোমল গান্ধার। 

১৯৬২ Scissors (Short).

১৯৬৩ উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁন (ডকুমেন্টারি)।

১৯৬৫ Fear (Short).

১৯৬৫ Rendezvous (Documentary short)

১৯৬৫ সুবর্ণরেখা।

১৯৬৭ Scientists of Tomorrow (Short)

১৯৭০ আমার লেনিন (ডকুমেন্টারি)।

১৯৭০ পুরুলিয়ার ছৌ নৃত্য (ডকুমেন্টারি)।

১৯৭০ ইয়ে কৌন (ডকুমেন্টারি)।

১৯৭১  দুর্বার গতি পদ্মা (শর্ট)।

১৯৭১  Where the Padma Flows (Documentary short).

১৯৭৩ তিতাস একটি নদীর নাম।

১৯৭৪  Reason, Debate and a Story.

১৯৭৫ রামকিঙ্কর (ডকুমেন্টারি)।

১৯৭৭  যুক্তি তক্কো আর গপ্পো।

.

(সমাপ্ত)

#

©গৌতমদত্ত

২ আগস্ট ২০২০

*

কৃতজ্ঞতা :-

১)     উইকিপিডিয়া

২)     ‘নিজের পায়ে নিজের পথে’ – ঋত্বিক ঘটক

৩)     নিহিত কোমলগান্ধার: সিনেমা সঙ্গীত ও ঋত্বিক ঘটক - প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত –

       চারনম্বরপ্ল্যাটফর্ম ডট কম।

৪)     imdb.com

৫)     ঋত্বিক ঘটক – বিকাশপিডিয়া

৬)     বিভেদ আর আশার ‘সুবর্ণরেখা’র তীরে - রোকেয়া সামিয়া – পরস্পর ডট কম।

৭)     রবীন্দ্রনাথের ‘চতুরঙ্গ’ উপন্যাস নিয়ে সিনেমা বানাতে চেয়েছিলেন ঋত্বিক ঘটক  - প্রিয়ক মিত্র

       – বঙ্গদর্শন ডট কম।

৮)     অবিভাজ্য বাঙালি ঋত্বিক ঘটক - আবদুল্লাহ আল মোহন – সাহস২৪ ডট কম।

৯)     ঋত্বিক – সুরমা ঘটক। অনুষ্টুপ।

১০)    ঋত্বিক ঘটক – রজত রায় সম্পাদিত। প্রতিভাস।

১১)    সেই ঋত্বিক – সুব্রত রুদ্র সম্পাদিত। প্রতিভাস।