মহাপুরুষ -
“………
কাল অতি বিচিত্র বস্তু
কথায় বলে, ‘আজ আছি, কাল নাই’
আমি বলি, ‘কাল আছে,আজ নেই’
কাল অর্থাৎ সময়, টাইম। কাল আছে, কিন্তু আজ…… অর্থাৎ বর্তমান, বর্তমান বলে কিছু নেই।
কি করে থাকবে ? এ্যা, কি করে থাকবে ?
যা ভবিষ্যত, যা ভবিতব্য, তা যখন ঘটলো, সে তো আর ঘটে এক জায়গায় থেমে রইলো না যে তাকে বর্তমানের লেবেল দিয়ে ,পায়ে শিকল এঁটে ধরে রেখে দেবে, আর ধরে দিয়ে বলবে, এই দেখো, এই হলো বর্তমান। কটা দিন ফুরিয়ে গেলো, অমনি তা হয়ে গেলো ঘটেছে, বা ঘটে গেছে, বা ঘটেছিলো।
অর্থাৎ অতীত, ভূত !
এই নিয়ে প্লেটোর সংগে আমার কতো কথা কাটাকাটি। প্লেটো বললে, ‘ইফ নিউম্যান লোগাস কগনোসিস’- তোমার কথা আমি বুঝতে পারছিনা। ‘ভিক্টস জারগন প্যারানয়ন’- তুমি আবোল তাবোল বকছো !
আমি বললাম, বেশতো………তুমি বুঝতে না পারো,আমার কথা যদি বুঝতে না পারো, তো আমি সংকেতে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
প্লেটো বললো, ‘ওরে বাবা, কি সংকেত?’ বড় ভয় পেত আমাকে !
আমি বললুম, ভয় কি প্লেটো ? খুব সহজ। এই দেখো, এই আমার ডান হাত, এই অনামিকা, এই ঘুরলো ডান দিকে, ক্লকওয়াইজ অর্থাৎ সময় যে দিকে যায় সেই দিকে। সময় কোন দিকে যায় ? ভবিষ্যতের দিকে। আর এই বা হাত,এই ঘুরলো বা দিকে, এ্যান্টিক্লকওয়াইজ অর্থাৎ যা ঘটে গেছে তার দিকে। ভূত। আর এই ঘুরলো এক সাথে…………
স্মৃতি
কি কিছু মনে করাচ্ছে ওপরের লেখাগুলো পড়ার পরে ? যাঁর মুখনিসৃত এই সব চরম বাণী, আসুন
তাঁর কিঞ্চিৎ পরিচয় দিই আগে…
পরশুরাম (রাজশেখর বসু)-এর ছোটগল্প ‘বিরিঞ্চি-বাবা’তে বাবার সম্বন্ধে বলছেন…
“…বিরিঞ্চি-বাবা সভা অলঙ্কৃত করিয়া
বসিয়াছেন। তাঁর চেহারাটি বেশ লম্বা-চওড়া, গৌরবর্ণ মুণ্ডিত মুখ, সুপুষ্ট গালের আড়াল
হইতে দুইটি উজ্জ্বল চোখ উঁকি মারিতেছে। দু-পয়সা দামের সিঙাড়ার মত সুবৃহৎ নাক, মৃদু
হাস্যমণ্ডিত প্রশস্ত ঠোট, তার নীচে খাঁজে খাঁজে চিবুকের স্তর নামিয়াছে। স্বামীগিরির
উপযুক্ত মূর্তি। অঙ্গে গৈরিক-রঞ্জিত আলখাল্লা, মস্তকে ঐরূপ কান-ঢাকা টুপী। বয়স ঠিক
পাঁচ হাজার বলিয়া বোধ হয় না, যেন পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন। বাবার বেদীর নীচে ডানদিকে ছোটমহারাজ
কেবলানন্দ বিরাজ করিতেছেন। ইহার বয়স কয় শতাব্দী তাহা ভক্তগণ এখনো নির্ণয় করেন নাই,
তবে দেখিতে বেশ জোয়ান বলিয়াই মনে হয়। ইনিও গুরুর অনুরূপ বেশধারী, তবে কাপড়টা সস্তাদরের”।
৭
মে, ১৯৬৫। মুক্তি পেল সত্যজিৎ রায়’-এর
১৪তম সিনেমা “কাপুরুষ মহাপুরুষ”। দুটি গল্পের এক জুড়ি। প্রথমটি
'কাপুরুষ', যার মুল কাহিনী সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের 'জনৈক কাপুরুষের কাহিনী গল্প
থেকে নেওয়া।
আর
দ্বিতীয় ছবিটি “মহাপুরুষ” যা পরশুরাম (রাজশেখর বসু)-এর
ছোটগল্প বিরিঞ্চিবাবা অবলম্বনে তৈরী। পরিচালক সত্যজিৎ রায় কিছু সংযোজন করে লিখেছিলেন
চিত্রনাট্য। সেই মহাপুরুষ ছবি’র
বিরিঞ্চিবাবার এক বিখ্যাত সংলাপ দিয়েই আমার এ আলোচনা শুরু করেছি।
গল্পটা
এইরকম—
রাজশেখর বসু (পরশুরাম)-এর
ছোটগল্প ‘বিরিঞ্চি-বাবা’ অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় কিছু সংযোজন
করে এই ‘মহাপুরুষ’ চলচ্চিত্র তৈরি করেন। ছবির শুরুই
হয় বারাণসী থেকে হাওড়াগামী একটি ট্রেন, দাঁড়িয়ে রয়েছে শিমুলতলা স্টেশনে। আর সেই ট্রেনের
দরজায় দাঁড়িয়ে বিরিঞ্চিবাবা মিষ্টান্নের হরির লুঠ দিয়ে চলেছেন অগনিত ভক্তগন’কে। অবশেষে স্টেশনের স্টেশন মাস্টারমশাইকে
মিষ্টান্ন ছুঁড়ে দেবার পরে বাবাজী তাকে হাত দেখিয়ে ট্রেন ছাড়ার ইঙ্গিত দিলেন। তখন স্টেশন
মাস্টারের মুখের বাঁশী বাজল। বিরিঞ্চিবাবা ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুল বার করে রাখলেন যতক্ষণ
না অব্দি ট্রেন স্পীড নেয়। এর পরে বাবাজী এসে
বসেন তার সিটে।
উল্টোদিকের
সিটে বসা বুড়ো অ্যাডভোকেট গুরুপদ মিত্তিরের সাথে ট্রেনে আলাপ-পরিচয় শুরু করেন বাবাজি—
“…
বাবাজী — কোত্থেকে ?
গুরুপদ — আজ্ঞে, আমরা আসছি বেনারস থেকে—।
বাবাজী — কাশী ?
গুরুপদ — আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাবাজী — যাওয়া হয়নি অনেককাল।
গুরুপদ — ওহো। তা আপনি বুঝি কাশীতেই…
বাবাজী — বড় দলাদলি। বড্ড ভীড়।
গুরুপদ — আজ্ঞে হ্যাঁ। তবু…
বাবাজী — গোড়াতেই বলেছিলুম, শহর তো গড়লে। কিন্তু এ শহর কি আর এমনটি থাকবে ?
ওপর দিয়ে কতো ঝড় বইবে। কতো আসবে, কতো যাবে। হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ।
একদিন শঙ্কর এসে বললে, তুমি অদ্বৈতবাদ না মানতে চাও মেনো না। কিন্তু গৌতম
যে দেশের সব্বোনাশ করলে সেটা মানো তো ? এর একটা বিহিত করা উচিৎ নয় কি ?
আমি বল্লুম করো বিহিত। করো, তাতে যদি শান্তি পাও তো করো। কিন্তু এটা মনে
রেখো, তোমার কাজ পণ্ড করানোরও লোক আসবে। দেশে ধর্ম নিয়ে ফুটবল খেলা
হবে। সেটা জেনে রেখো। ছোকরার মধ্যে জিনিস ছিল, কিন্তু আয়ুর্বিজ্ঞানটা রপ্ত হয়নি তো ! তাই, বত্রিশ বছর বয়সেই……”
হঠাৎ
করে আধশোয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসেন। দু হাতের আঙুলগুলোকে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ঘোরাতে
ঘোরাতে ট্রেনের জানলা দিয়ে ‘ওঠ্
ওঠ্ বলতে চিৎকার করতে থাকেন। গুরুপদবাবু আর তার মেয়ে বুঁচকি’র চোখে তখন বিস্ময়। দূরে দেখা
যায় ওই ওঠ্ ওঠ্ ব্যাটা ওঠ্ ধ্বনির সাথে সাথে সূর্যদেব উঠছেন আকাশে…। পরক্ষণেই আবার আধশোয়া হয়ে বাবাজী
বলতে থাকেন—‘নিশ্চিন্ত হবার
যো নেই। ব্যাটাকে রোজ ডেকে তুলতে হয়। এই দেখে গুরুপদবাবু উঠে গিয়ে বাবাজীর পায়ের কাছে
গিয়ে বসে বলেন—
“…
গুরুপদ — বাবা ! আমার মনে বড় অশান্তি বাবা—
বাবাজী — কি নাম তোমার ?
গুরুপদ — আজ্ঞে, আমার নাম গুরুপদ মিত্তির, এ্যাডভোকেট।
গুরুপদ বুঁচকি’কে ডাকে। অনিচ্ছাসত্তেও বুঁচকি উঠে কাছে যায়। বাবাজীর পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করে। পাশে বসায় বুঁচি’কে।
গুরুপদ — এই আমার ছোট মেয়ে বাবা। নাম বুঁ—(ঢোঁক গিলে) নিলীমা। এর মা গত
পৌষে গত
হয়েছেন। কাশী বৃন্দাবন থেকে ঘুরে এলুম বাবা কিন্তু কিছুতে জোর পাচ্ছি না।
বাবাজী — জোর পাচ্ছো না ?
গুরুপদ — না বাবা…
বড়
বড় আয়ত চোখে বাবাজী তাকায় গুরুপদ’র
মুখের দিকে। তারপরে ডান হাতের মুঠো দেখিয়ে ধরতে বলে গুরুপদকে। গুরুপদ দ্বিধা করতে থাকেন।
বাবাজী জোরে ধমক দিয়ে বলে—ধরো,
শক্ত করে। গুরুপদ কাঁদতে কাঁদতে দুহাতে বাবাজীর রিস্টখানা জড়িয়ে ধরে।
বাবাজী — কি ! অশান্তি
আছে ? কি ? দুঃখ আছে ? ক্ষোভ আছে ? ক্লান্তি
আছে ? শুন্যতা আছে ?
জড়তা আছে ? ”
ফোকলা গুরুপদ হতভম্ব হয়ে মাথা নাড়ায় দুদিকে। প্রথম দৃশ্য শেষ হয়।
ধর্ম নিয়ে ব্যবসা
তো আজ নতুন নয়। চলে আসছে সেই যুগ যুগ ধরে। ধর্মের প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাসকে পুঁজি
করে এক বাবাজীর প্রতারণা ও মানুষ ঠকানোর গল্পকে সেলুলয়েডে নথিভুক্ত করেছেন সত্যজিৎ
রায় এই মহাপুরুষ সিনেমায় সেই ১৯৬৫ সালেই। যদিও মূল গল্প ‘বিরিঞ্চি-বাবা’
পরশুরাম লিখেছিলেন ১৯৩৫এ। বর্তমান সময়ে এসে সত্যিই আমরা দেখতে পাচ্ছি ধর্ম নিয়ে ফুটবল
খেলা কি করে হয় ?
এদিকে বাবাজী’র এইসব নানারকম ভেল্কিবাজীতে
মুগ্ধ হয়ে গুরুপদ তাকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান শিষ্যত্ব গ্রহনের জন্য।
‘মহাপুরুষ’ ছবির যাবতীয় সংকট যিনি নিবারণ
করেছেন, তিনি নামেও নিবারণ। কি আশ্চর্য যোগাযোগ ! কেমন মানুষ তিনি? এই প্রশ্নের জবাব
থেকেই আমরা বুঝব বিজ্ঞানমনস্ক, বুদ্ধিমান মানুষের চরিত্র সম্পর্কে কী ছিল সত্যজিতের
ধারণা।
বুঁচকির এক প্রেমিক
আছে। তার নাম সত্যরঞ্জন। যুবক বয়েস। কিন্তু প্রেম করে দুধের শিশুর মতো। বেনারসে দীর্ঘ
প্রবাসে থাকাকালীন বুঁচকি একটিমাত্র দশ লাইনের চিঠি পেয়েছিল। সত্যরঞ্জনের কাছ থেকে,
তার ন’লাইন বঙ্কিমচন্দ্র,
শেলি আর রবীন্দ্রনাথের কোটেশন, বাকি এক লাইনে লেখা ‘তুমি
কেমন আছ, আমি ভাল আছি’।
তাতে বুঁচকি ভয়ংকর আহত। রাগ করে দীক্ষা নেবার ব্যাপারে দুম করে সায় দিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু সত্যরঞ্জন এমন ‘লাভেবল
ইডিয়ট’ হলে হবে কি, তার
মেলামেশা এমন একটা দলের সঙ্গে, যারা অত্যন্ত বুদ্ধিমান, বিজ্ঞানমনস্ক এবং যুক্তিবাদী।
এই দলের পাণ্ডা
হলেন নিবারণ। মূল গল্পের বর্ণনানুযায়ী…
“চৌদ্দ নম্বর হাবশীবাগান লেনের
মেসটি ছোট কিন্তু বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, কারণ ম্যানেজার নিবারণ মাষ্টার খুব আমুদে
লোক হইলেও সবদিকে তার কড়া নজর আছে। বসিবার জন্য একটি আলাদা ঘর, তাতে ঢালা ফরাশ এবং
অনেক রকম বাদ্যযন্ত্র, দাবা , তাস, পাশা ও অন্যান্য খেলার সরঞ্জাম, কতকগুলি মাসিক পত্রিকা
প্রভৃতি চিত্তবিনোদনের উপকরণ সজ্জিত আছে। নিবারণ কলেজে পড়ায়। পরমার্থ ইন্সিওরান্সের
দালালি, হঠযোগ এবং থিয়সফির চর্চ্চা করে। পাশের বাড়ির নিতাইবাবু নিত্যই এখানে আসেন।
তাঁর একটু বয়স হইয়াছে।”
এই তিনজনের বুদ্ধির
মাপ তিন রকম, তাই বুদ্ধির গোড়ায় এঁদের তিন রকমের ধোঁওয়া দরকার হয়। ধোঁওয়ার পরিমাণ
দেখেই বোঝা যায়, কার বুদ্ধির দৌড় কতটা। নিবারণ খায় চুরুট, দালাল খায় সিগারেট, আর
নিতাই খায় বিড়ি।
যা হোক, সত্যরঞ্জন
উড়ে এসে জুড়ে বসা এই বিরিঞ্চি বাবার সব খবরাখবর পৌছে দেয় তার মেসে। তারা খবরাখবর পান,
বিরিঞ্চি বাবার বয়স কেউ বলতে পারে না তবে, প্লেটো, গৌতম বুদ্ধ আর যীশুর সাথেও নাকি
তার একাধিকবার তর্ক হয়েছিলো, এবং চেকোস্লাভিয়াতে সাধনা করবার এক ফাঁকে E=mc2 সূত্রটা
নাকি তিনিই আইনস্টাইনের মাথায় ঢুকিয়েছিলেন। যথারীতি বাড়তে থাকে তার ভক্ত সংখ্যা, লোকের
আনাগোনা আর ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকেন বাবা এবং তার প্রাচীণ ব্যবিলন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া
সহচর। বুঁচকি সত্য’কে শর্ত দেয়- যদি সে এই বিরিঞ্চি বাবাকে বাসা থেকে
তাড়ানোর কোন পথ বের করতে না পারে, তাহলে সেও প্রেম বিসর্জন দিয়ে বাবার শিষ্যত্ব গ্রহন
করবে।
ভ্রাতৃপ্রতিম সত্যরঞ্জনের
হাত থেকে তার প্রেমিকা প্রায় বেহাত হয়ে যাচ্ছে, এবং তা ঘটাচ্ছে এক বুজরুক, ভণ্ড বাবাজি— এই অবস্থা কিছুতেই মেনে নিতে
পারলেন না নিবারণ অ্যান্ড কোং। একটা হেস্তনেস্ত করার জন্য বুদ্ধিতে শান দেওয়া শুরু
হল। শুরু হল ‘অপারেশন-বাবাজি’।
‘অপারেশন বাবাজী’র প্রথম ধাপ বাবাজী’র খবর সংগ্রহ। গুরুপদবাবুর বড়
জামাই ননী বিজ্ঞানী। নিবারণের ক্লাসমেট। এক বিকেলে নিবারণ পৌঁছল ননী’র বাড়ি। ননীর বৈঠকখানা ঘরে ঢুকে
নিবারণের চোখে পড়ে ঘরের মেঝেতে একটা তোলা উনুনে একটা ডেকচি বসানো। আর পাশে রাখা একটা
হারমোনিয়াম থেকে একটা রবারের নল বেরিয়ে ডেক্চির জলে চোবানো আছে। ননী তাঁর মেয়ে পটলী’কে বলে হারমোনিয়ামটা বাজাতে—মানে বেলো করতে। বেলো শুরু হতেই
ওই গরম জলে ভুড়ভুড়ি উঠতে শুরু করলো হাওয়ার বেগে। নিবারণকে ননী জানালো যে ঘাস হাউড্রোলাইজড
হয়ে কার্ব্বোহাইড্রেট হবে। তাতে দুটো এমিনো-গ্রুপ জুড়ে দিলেই হেক্সা-হাইড্রক্সি-ডাই-এমিনো—। এই পরীক্ষা সফল হলে নাকি পৃথিবীতে
আর খাদ্যসমস্যা বলে কিছু থাকবে না।
ননীর
গিন্নি, নিরুপমার মুখে বাবাজীর খবর শুনতে চাইলে, তিনি বলেন যে প্রায় মাসখানেক ধরে এই
সব ব্যাপার চলছে। বিরিঞ্চিবাবা’র
সাথে আছে চেলা কেবলানন্দ। গণেশ-মামা এসব দেখাশুনো করছেন দিনরাত।
যাই
হোক নিবারণ নিরুপমাকে বলে এক বিকেলে নিতাই আর সত্য’কে
নিয়ে উপস্থিত হন বাবাজী-দর্শনের অভিলাষে। আসর তখন জমজমাট। সত্য’কে নিবারণ পাঠালেন বাবাজী’কে প্রণাম করতে। সত্য ভূমিষ্ঠ
হয়ে পেন্নাম সেরে বিরিঞ্চিবাবা’র
পা স্পর্শ করলো। বাবাজী প্রসন্ন হেসে সত্য’কে
বললেন—“চেনা চেনা বোধ হচ্চে”। সে কি গলার জোর বাবাজী’র। সত্য তখন বিস্ময়ে অবাক। বাবাজী সত্যকে বলে চলেছেন—“…… কোথায় যেন দেখেছি তোমায়,
নেপালে। উহু, মুরশিদাবাদে”।
সত্য ভ্যাবাচাকা খেয়ে গিয়ে বলে ‘শার্পেনটাইন
লেনে’।
বাবাজী
বলতেই থাকেন—“তোমার মনে
থাকবার কথা নয়। জগৎশেঠের কুঠিতে, তার মায়ের শ্রাদ্ধের দিন। অনেক লোক ছিল,—রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রায়-রায়ান্
জাকীপ্রসাদ, নবাবের সিপাহ-সলার খা-খানা মহব্বৎ জং, সুতোনুটির আমিরচন্দ,—হিষ্ট্রিতে যাকে বলে উমিচাঁদ।
তুমি শেঠজির খাজাঞ্চি ছিলে, তোমার নাম ছিল—রোসো--মোতিরাম। উঃ, শেঠজি
খুব খাইয়েছিল, কেবল সুতানুটির বাবুদের পাতে
মণ্ডা কম পড়ে, তারা গালাগাল দিয়ে চলে যায়। তা মোতিরাম, উহু-সত্যরঞ্জন, তুমি ধূর্জটি-মন্ত্র
জপ করতে শেখ, তাতে তোমার সুবিধে হবে। রোজ ভোরে উঠেই একশ-আটবার বলবে—ধূর্জটি—ধূর্জটি—ধূর্জটি— খুব তাড়াতাড়ি। আচ্ছা, এখন
বসো গিয়ে।
নিতাই
এবারে এগোতে গেল এক জনের প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকেন বাবাজী—“… …তুলসী
(মানে রামায়ণের অনুবাদকার তুলসীদাস) ছিল সন্ন্যাসী। আমি বল্লুম—বাপু, ভোগ না হলে ত নিবৃত্তি
হবে না। তার রামায়ণ লেখা শেষ হলে তাকে রাজা মানসিংহ ক’রে দিলুম। বল্লুম, কতো ভোগ করবি ! কর্…অনেক বিষয়-সম্পত্তি করেছিল, কিন্তু
কিছুই রইল না। তার ব্যাটা জগৎসিংহ বাঙালীর মেয়ে বে ক’রে সমস্ত উড়িয়ে দিলে। বঙ্কিম তার বইএ সেকথা আর লেখে
নি।”
নিতাইবাবু
আর থাকতে না পেরে ছুটে গিয়ে সোজা বাবাজীর চরণে। ভল্চার ব্রাদার্সের আপিসের লেজার-কিপার
নিতাইবাবুর সমস্যা শুনে নিয়ে নিদান দিলেন বাবাজী—“…ষড়ৈশ্বর্য্য
সস্তায় হয় না বাপু, কঠোর সাধনা চাই, মূলাধার চক্রে ঠেলা দিয়ে কুলকুণ্ডলিনীকে আজ্ঞা-চক্রে
আনতে হবে, তারপর তাকে সহস্রবার পদ্মে তুলতে হবে। সহস্রারই হচ্চেন সূর্য। এই সূৰ্য্যকে
পিছু হাঁটাতে হবে। সূৰ্য্যবিজ্ঞান আয়ত্ত না হলে কালস্তম্ভ করা যায় না। তাতে বিস্তর
খরচ, তোমার কম্ম নয়। তুমি আপাতক কিছুদিন মার্তণ্ডমন্ত্র জপ কর। ঠিক দুকুর বেলা সূর্যের
দিকে চেয়ে একশ আটবার বলবে—মার্তণ্ডমার্তণ্ড-মাৰ্ত্তণ্ড,
খুব তাড়াতাড়ি। কিন্তু খবরদার, চোখের পাতা না পড়ে, জিভ জড়িয়ে না যায়,-তা হলেই
মরবে”। বমকে গিয়ে নিতাই
ফিরে এসে বসে পড়েন।
বিরিঞ্চিবাবা
বলতেই থাকেন—“…ধন-দৌলৎ সকলেই
চায়, কিন্তু উপযুক্ত পাত্রে পড়া চাই। এই
নিয়েই ত যিশুর সঙ্গে আমার ঝগড়া। যিশু বলত, ধনীর কখনো স্বর্গরাজ্য লাভ হবে না। আমি
বলতুম—তা কেন? অর্থের সদ্ব্যবহার
করলেই হবে। আহা, বেচারা বেঘোরে প্রাণটা খোয়ালে”।
অতঃপর
তিনজনে ফিরে আসে। বাবাজি দর্শনের পর থেকেই নিবারণের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল বাবার
আঙুল ঘোরানোর ভেলকির রহস্য উন্মোচন। নিবারণ দেখলেন একটু ধৈর্য ধরে অনুশীলন করলেই ওই
ভেলকি কায়দা আয়ত্ত করা যে-কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এবং যে-মুহূর্তে ওই
কায়দা তার আয়ত্তে চলে এল, তখনই তিনি নিঃসন্দেহ হলেন বিরিঞ্চি কোনো অলৌকিক পুরুষ নন,
বরং এই বাবাজির ভণ্ডামি হাতেনাতে ধরা যাবে একটু ধৈর্য ধরলেই।
ধৈর্য ধরতেই সেই
শুভক্ষণ উপস্থিত হল। এবং দু-হাজারেরও বেশি বয়স দাবি করা প্লেটো-যিশু-মনুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু
বিরিঞ্চিবাবার বুজরুকি হাতেনাতে ধরা পড়ে গেল সামান্য ভিজে খড়ের গাদায় দেশলাইয়ের
আগুন জ্বালিয়ে। ভকভকে সাদা ধোঁওয়া দেখে বাবাজি ভাবলেন বাড়িতে বুঝি আগুন লেগেছে,
আর আগুনের সেই ভয়েই তার সমাধি থেকে তিনি মুহুর্তে জেগে উঠে ‘আপন প্রাণ বাঁচা’ নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে বাড়ি
থেকে পালিয়ে বাঁচলেন।
সিনেমা শেষ হয় বিরিঞ্চিবাবা আর তার
চেলা’র অন্ধকার রাস্তায়
সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া দিয়ে।
এই সিনেমার ক্যামেরাম্যান
ছিলেন সৌমেন্দু রায়। সম্পাদনা দুলাল দত্ত-র। চিত্রনাট্য সংগীত আর পরিচালনায় সত্যজিৎ
রায়। এ ছবির অন্যতম আকর্ষণ সমস্ত শিল্পীদের মারকাটারি অভিনয়। শিল্পীরা ছিলেন—
প্রসাদ মুখোপাধ্যায় - গুরুপদ মিত্র
রবি ঘোষ - কেবলরাম
সতীন্দ্র ভট্টাচার্য - সত্য
সন্তোষ দত্ত - প্রফেসর ননী
সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় - নিতাইবাবু
গীতালি রায় - গুরুপদ মিত্রের মেয়ে
চারুপ্রকাশ ঘোষ - বিরিঞ্চিবাবা
হরিধন বন্দ্যোপাধ্যায় – গণেশমামা
সুমিতা সান্যাল – বুঁচকি।
চারুপ্রকাশ
ঘোশ-এর অনবদ্য অভিনয় এ ছবির প্রাণকেন্দ্র। তার চেলার চরিত্রে আরেক অসাধারণ অভিনয় রবি
ঘোষে’র। ‘ক্যালকাটা ফিল্ম সোসাইটি’ গড়ে ওঠার সময় সত্যজিৎ রায়ের
সঙ্গে চারুপ্রকাশ ঘোষের ঘনিষ্ঠতা হয়। যদিও দুই পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল।
চারুপ্রকাশের ঠাকুরদা ছিলেন দ্বারকানাথ ঘোষ। সেসময় দ্বারকানাথ বিশেষ পরিচিত ছিলেন ‘ডোয়ারকিন’ হারমোনিয়ামের জন্য। এই হারমোনিয়ামই
ছিল উপেন্দ্রকিশোর আর দ্বারকানাথ ঘোষের পারিবারিক বন্ধনের সূত্র।
সমস্ত
খুঁটিনাটি ব্যাপারে সত্যজিৎ রায়-এর কতখানি প্যাশন ছিল তা আমরা অনেকেই জানি বিভিন্ন
লেখার সূত্রে। এই ছবির স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ যখন চলছে, সে সময় চারুপ্রকাশ ঘোষ আর সত্যজিৎ
রায় গেছিলেন মোহনানন্দ ব্রহ্মচারীর এক ধর্মসভায়। দুজনেই খুব খুঁটিয়ে দেখেছিলেন সেই
সভা। শোনা যায় ওই দুহাতের আঙুল ঘোরানো সত্যজিতেরই মাথা থেকে বেরিয়েছিল।
ছবির
শুরু এক ফাঁকা স্টেশনে। এ ছবির সহকারী পরিচালক সুব্রত লাহিড়ী জানিয়েছেন, শিমুলতলার
রেল-স্টেশনে এই দৃশ্যের শ্যুটিং হয়েছিল। গোটা ট্রেনটা ছিল ভাড়া করা। আর প্ল্যাটফর্মে
ভীড় করা বিরিঞ্চিবাবার ভক্তরা সব্বাই ছিলেন শ্যুটিং ইউনিটেরই সব লোকজন। পরিচালক জানতেন
যে আমাদের দেশে সত্যিকারের এই দৃশ্যখানা তুলতে গেলে স্থানীয় জনগনের চোখ অবশ্যম্ভাবী
থাকবেই ক্যামেরার দিকে। তাই উনি ঐ ভক্তবৃন্দের জমায়েতের ছবি শ্যুট করেছিলেন ইণ্ডোরেই।
এবারে
জানাই ট্রেনের জানলায় সূর্য্যদেবের উদয় কি করে টাইমিং মেলালেন ? চলন্ত ট্রেনের কামরায়
সব কিছু নির্দিষ্ট করে ওই অল্প সময়ে ওই দৃশ্য গ্রহণ করতে গেলে, কতোগুলো সূর্য্যোদয়ের
জন্য অপেক্ষা করতে হ’ত তা
নিশ্চিত জানতেন পরিচালক। সুব্রত লাহিড়ী জানাচ্ছেন, ‘এই
দৃশ্যের পুরোটাই স্টুডিয়োর মধ্যে তোলা হয়েছিল ‘ব্যাকপ্রজেকশন্'
পদ্ধতিতে। সে সময় কলকাতার নিউ থিয়েটার্সের দু-নম্বর স্টুডিওতেই ‘ব্যাকপ্রজেকশন্' পদ্ধতির কাজ
হ’ত। স্টুডিয়োর মধ্যে একটা
নকল ট্রেনের কামরা তৈরি করে, কামরার জানলার পেছন দিকে সামান্য দূরে রাখা হয়েছিল একটা
সাদা পর্দা। এই পর্দা’র
ওপরেই পেছন দিক থেকে প্রজেক্টারের সাহায্যে সূর্য্যোদয়ের ছবি পর্দা’র ওপরে ফেলা হয়েছিল। বিরিঞ্চিবাবাকে
নকল কামরার জানলার সামনে বসিয়ে কামরার ভেতরে ক্যামেরা রেখে শ্যুট করা হয়েছিল। সম্পাদনার
পরে যখন চূড়ান্ত দৃশ্যকে এডিট করা হ’ল
তখন আর কারর বোঝার উপায়ই ছিল না কি করে এই রকম একটা কঠিন কাজকে সামান্য বুদ্ধির প্রয়োগে
কতোখানি সহজ করে নিয়েছিলেন সত্যজিৎ।
আরেকটা
কঠিন দৃশ্যগ্রহণের কথা বলি। হোমের সময় বিরিঞ্চিবাবার গোটা শরীরে সাদা কালো ছবিতেও কি
অপূর্ব এফেক্ট আনা গেছিল তা শুনলে সত্যিই রোমাঞ্চ হয়। দৃশ্যটা মনে করুন। হোমের আগুনের
সামনে বসে আছেন বিরিঞ্চিবাবা। সে আগুনের কম্পমান আলো সোজাসুজি নীচের থেকে পরেছে বিরিঞ্চিবাবার
চোখে মুখে। আর এই আলোয় বিরিঞ্চিবাবার নাকের পাশ আর দুচোখের ওপরের অংশ স্পষ্ট। বাকিটা
ঘন এক ছায়া সৃষ্টি হ’য়ে
এক মায়াময় বা বলা ভাল, বিরিঞ্চিবাবার মুখকে রহস্যময় করে তুলেছে। সাদা কালো সিনেমায়
এক দুর্দান্ত লাইট-এফেক্ট। সহকারী আলোকচিত্রী পূর্ণেন্দু বসুর জবানী’তে—‘শ্যুটিংয়ের সময় পুরো পুরো সেটটাকে বেশ মোটা কাপড়
দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল। এটা করার উদ্দেশ্য ছিল যাতে বাবাজীর পেছন থেকে অন্য কোনো আলো
প্রতিফলিত না হয়। কিন্তু শ্যুটিংয়ে শুধু হোমদের আলো যথেষ্ট নয় বলে সামান্য কিছু কৃত্রিম
আলোও ব্যবহার হয়েছিল। আলোক-বিজ্ঞানের নিয়ম অনুসারে সাদা কালো ছবিতে হলুদ থেকে লাল—এই রেঞ্জের সমস্ত আলোই হ’ল উষ্ণ বাঁ ওয়ার্ম লাইট। আর সাদা
থেকে নীল—শীতল বাঁ কোল্ড
লাইট। প্রথমটার তুলনায় দ্বিতীয় ধরণটায় আলো বেশী ভাস্বর হয়। তাই সাদা কালো ছবিতে লালচে-হলুদ
হোমের আগুনের আলোয় বিরিঞ্চিবাবার মুখ কিছুটা
ম্লান হবার চান্স ছিলই। এর সমাধানের জন্যেই শ্যুটিংয়ের সময় অতিরিক্ত সাদা আলো কিছুটা
নীচের দিক থেকে সরাসরি বাবাজীর মুখে ফেলা হয়েছিল। এবারে প্রশ্ন হল যে আলোকে কম্পমান
দেখানো হ’ল কি করে ? সেটার
জন্যে, ঐ এক্সট্রা সেট-লাইটের সামনে মোটা সাদা সেলোফেন কাগজ নাড়ানো হয়েছিল ধীরে ধীরে।
ধর্মের প্রতি মানুষের সরল বিশ্বাস আর অনুভূতিকে
পুঁজি করে ধান্দাবাজী আর ব্যবসার ইতিহাস তো অনেক আগ থেকেই সমাজের নানাস্তরে নানাভাবে
বিদ্যমান। এগুলোকে এক্সপোজ করার দায়িত্ব কার, আর কিভাবেই বা সেটা করা যায়? আজকে ভারতে
ওহ মাই গড বা পিকে মুভি আসবার পর অনেকটাই যেন নতুন জোয়ার এসেছে এই আন্দোলনে, তবে পঞ্চাশ
বছর আগেকার একটা ছোট্ট সাদাকালো মুভি এই বিষোয়ে কথা বলে গেছে, হয়তো অনেকেই সেটা খেয়াল
করি নি।
সত্যজিৎ
রায় কে নিয়ে দু-চার কথা।
সত্যজিৎ রায় ছিলেন
এক বিশ্ববিন্দিত চলচ্চিত্রকার। ডাক নাম -মাণিক। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ২রা মে (১৮ বৈশাখ
১৩২৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। এঁর পিতামহ ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
(লেখক, চিত্রকর, ভারতীয় মুদ্রণশিল্পের পথিকৃত)। পিতার নাম সুকুমার রায় (প্রখ্যাত শিশু
সাহিত্যিক), মায়ের নাম সুপ্রভা দেবী। এঁদের আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার
মসুয়া গ্রামে।
কারিগর।
এক কথায় এটুকুই হতে পারে কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিত রায়ের পরিচয়। তিনি যেখানেই
হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলেছে। সত্যজিতের
কর্মজীবন একজন বাণিজ্যিক চিত্রকর হিসেবে শুরু হলেও প্রথমে কলকাতায় ফরাসি চলচ্চিত্র
নির্মাতা জঁ রনোয়ারের সাথে সাক্ষাৎ ও পরে লন্ডন শহরে সফররত অবস্থায় ইতালীয় চলচ্চিত্র
‘বাইসাইকেল চোর’ দেখার পর তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে
উদ্বুদ্ধ হন।
ডকুমেন্টারি ফিল্ম,
শর্ট ফিল্ম, ফিচার ফিল্মসহ সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেছেন মোট ৩৭ টি ছবি। ৩৭ বছরের কর্মজীবনে
তিনি নির্মাণ করেন অপুর সংসার, পরশপাথর, জলসাঘর, কাঞ্চনজঙ্ঘা, চারুলতা, দেবী, মহানগর,
অভিযান, কাপুরুষ, মহাপুরুষ, গুপী গাইন বাঘা বাইন, প্রতিদ্বন্দ্বী, সীমাবদ্ধ, জনারণ্য,
হীরক রাজার দেশ, গণশত্রু, আগন্তুক, শাখা প্রশাখা, সোনার কেল্লা, জয়বাবা ফেলুনাথ প্রভৃতি
চলচ্চিত্র।
চলচ্চিত্র নির্মাতা
হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও সাহিত্য, চিত্রকলা, নাটক আর সংগীত বিষয়েও প্রতিভার দ্যুতি
ছড়িয়েছেন সত্যজিৎ রায়। তাকে চলচ্চিত্র প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, সাহিত্যিক, সংগীত পরিচালক,
গীতিকার, চিত্রশিল্পী ও সাহিত্যিক হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।
বাংলা সাহিত্যেও
গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি। সৃষ্টি করেছেন ফেলুদা আর প্রফেসর শঙ্কুর মতো অবিস্মরণীয়
চরিত্র।
১৯৮৩ সালে ঘরে বাইরে
ছবির কাজ করার সময় সত্যজিত রায় হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর থেকে তার কাজের গতি অনেকটাই
কমে যায়। এরপর ১৯৯২ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে সত্যজিৎ রায় হাসপাতালে ভর্তি হন। অসুস্থ
অবস্থায় হাসপাতালের বেডে কাটে তার শেষ দিনগুলি। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন
এই মহান চলচ্চিত্রকার। মৃত্যুর মাত্র একসপ্তাহ আগে সত্যজিৎ রায় পান বিশ্ব চলচ্চিত্রের
সর্বোচ্চ সন্মানজনক অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড (অস্কার)। জীবদ্দশায় তিনি অর্জন করেন ৩২টি
আন্তর্জাতিক পুরস্কার।
সত্যজিৎ রায়ের প্রাপ্ত
পুরস্কারের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে পদ্মশ্রী (১৯৬৫), পদ্মভূষণ (১৯৬৭), ম্যাগসেসে
পুরস্কার (১৯৭১), Star of Yugoslavia (১৯৭৩), Doctor of Letters(১৯৭৪), D. Litt.(১৯৭৬),
পদ্মবিভূষন(১৯৭৮), D. Litt., Special Award, Berlin Film Festival, Deshikottam,
Visva-Bharati University, India (১৯৭৯), Special Award, Moscow Film Festival (১৯৮০),
বিদ্যাসাগর পুরস্কার (১৯৮২), Fellowship, The British Film Institute (১৯৮২), দাদা
সাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৮৫), অস্কার (১৯৯২), ভারতরত্ন (১৯৯২)।
সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রের কালানুক্রমিক
তালিকা—
পথের পাঁচালী (১৯৫৫)
অপারিজত (১৯৫৬)
পরশপাথর (১৯৫৮)
জলসাঘর (১৯৫৮)
অপুর সংসার (১৯৫৯)
দেবী (১৯৬০)
তিনকন্যা [পোষ্টমাস্টার, মনিহার, সমাপ্তি] (১৯৬১)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৬১)
কাঞ্জনজঙ্ঘা (১৯৬২)
অভিযান (১৯৬২)
মহানগর (১৯৬৩)
চারুলতা (১৯৬৪) টু (১৯৬৪)
কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)
নায়ক (১৯৬৬)
চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)
গুপী গাইন বাঘ বাইন (১৯৬৮)
অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৬৯)
প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০)
সীমাবদ্ধ (১৯৭১)
সিকিম (১৯৭১)
The Inner Eye (১৯৭২)
অশনী সংকেত (১৯৭৩)
সোনার কেল্লা (১৯৭৪)
জান অরণ্য (১৯৭৫)
বালা (১৯৭৬)
সতরঞ্জী কে খিলাড়ি (১৯৭৭)
জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮)
হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)
পিকু (১৯৮০)
সদগতি (১৯৮১)
ঘরে বাইরে (১৯৮৪)
সুকুমার রায় (১৯৮৭)
গণশত্রু (১৯৮৯)
শাখা-প্রশাখা (১৯৯০)
আগন্তুক (১৯৯১)
আমার
এ লেখার উপসংহার টানি, মার্টিন স্করসেসে-র (অস্কারজয়ী প্রবাদপ্রতিম পরিচালক, চিত্রনাট্যকার,
প্রযোজক, এবং অভিনেতা) একটা ছোট্ট বিশ্লেষণী আলোচনা দিয়ে—
“সিনেমার নাতিদীর্ঘ ইতিহাসে সত্যজিৎ
রায় নামটা আমাদের জানা দরকার, তাঁর ছবি আমাদের দেখা দরকার। এবং বারবার দেখা দরকার,
যেমন আমি প্রায়শই করে থাকি।
পশ্চিমে আমাদের
জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে অপু ট্রিলজি –
পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অপরাজিত (১৯৫৬), এবং অপুর সংসার (১৯৫৯)। ততদিন আমরা বড় পর্দায়
ভারতকে দেখেছি বটে, তবে সম্পূর্ণ ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, যার অর্থ স্বভাবতই ছিল
যে মুখ্য চরিত্রে আমরা দেখতাম পশ্চিমী দুনিয়ার প্রতিনিধিদের, এবং ভারতীয়রা ছিলেন ‘এক্সট্রা’, যাঁরা প্রচ্ছন্ন থেকে ‘লোকাল কালার’ যোগাতেন। আমরা কেউ জানতাম না,
সেইসব ছবির পটভূমি গুজরাট, না কাশ্মীর, না পশ্চিমবঙ্গ, নাকি মহারাষ্ট্র – সবটাই ছিল স্রেফ ‘ইন্ডিয়া’।
জঁ রেনোয়া-র ছবি
‘দ্য রিভার’ (১৯৫১), যার লোকেশন খুঁজতে সাহায্য
করেছিলেন সত্যজিৎ, একটু অন্য ধরনের ছিল, যার মূলে ছিল ভারতের প্রতি এবং বাংলা সংস্কৃতির
প্রতি গভীর অনুরাগ। তবে মেলানি-র ভূমিকায় রাধা বার্নিয়ার ছাড়া সমস্ত প্রধান চরিত্রই
ছিল হয় ইংরেজ, নাহয় আমেরিকান।
সুতরাং প্রথমবার
অপু ট্রিলজি দেখে আমাদের শুধু চক্ষুরুন্মীলন হয়েছিল তাই নয়, আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম আমরা।
যেসব মানুষ এতদিন ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকতেন, তাঁরাই আজ মুখ্য চরিত্র হিসেবে ক্যামেরার
সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। দৈনিক জীবনের গল্প বলছিল এইসব ছবি, কিছুটা ইটালিয়ান নিও-রিয়েলিজমের
মতো। কিন্তু ছবি তৈরির শিল্প, শৈলী দেখে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। একাধারে
কাব্যিক, সুদূর-বিস্তৃত, এবং একান্ত অন্তরঙ্গ।
ম্যানহ্যাটান-এর
একটি হলে বসে একবারে পরপর তিনটি ছবি দেখে ফেলেছিলাম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো। পথের পাঁচালীতে
অপুর চোখের ওই অসামান্য ক্লোজ-আপ, এবং দৃশ্যটি কাট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রবিশঙ্করের সুরের
ঝঙ্কার – সিনেমা হলে বসে
অকস্মাৎ কিছু আবিষ্কার করার যে দুর্লভ মুহূর্তগুলি, তার মধ্যে একটি – এবং চিত্রনির্মাতা হিসেবে আমার
ওপর গভীর এবং চিরস্থায়ী রেখাপাত করেছিল সেই মুহূর্ত।
এবং সিনেমার ইতিহাসে
অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজের স্রেফ সূচনা ছিল ওই ট্রিলজি।
আমাদের সকলেরই সত্যজিৎ
রায়ের ছবি দেখা দরকার, এবং বারবার, বারবার, দেখা দরকার। সবকটি ছবিকে একত্রিত করে আমাদের
পরম মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখা উচিত।
(সমাপ্ত)
#
©গৌতমদত্ত
৮ আগস্ট ২০২০
কাল অতি বিচিত্র বস্তু
কথায় বলে, ‘আজ আছি, কাল নাই’
আমি বলি, ‘কাল আছে,আজ নেই’
কাল অর্থাৎ সময়, টাইম। কাল আছে, কিন্তু আজ…… অর্থাৎ বর্তমান, বর্তমান বলে কিছু নেই।
কি করে থাকবে ? এ্যা, কি করে থাকবে ?
যা ভবিষ্যত, যা ভবিতব্য, তা যখন ঘটলো, সে তো আর ঘটে এক জায়গায় থেমে রইলো না যে তাকে বর্তমানের লেবেল দিয়ে ,পায়ে শিকল এঁটে ধরে রেখে দেবে, আর ধরে দিয়ে বলবে, এই দেখো, এই হলো বর্তমান। কটা দিন ফুরিয়ে গেলো, অমনি তা হয়ে গেলো ঘটেছে, বা ঘটে গেছে, বা ঘটেছিলো।
অর্থাৎ অতীত, ভূত !
এই নিয়ে প্লেটোর সংগে আমার কতো কথা কাটাকাটি। প্লেটো বললে, ‘ইফ নিউম্যান লোগাস কগনোসিস’- তোমার কথা আমি বুঝতে পারছিনা। ‘ভিক্টস জারগন প্যারানয়ন’- তুমি আবোল তাবোল বকছো !
আমি বললাম, বেশতো………তুমি বুঝতে না পারো,আমার কথা যদি বুঝতে না পারো, তো আমি সংকেতে বুঝিয়ে দিচ্ছি।
প্লেটো বললো, ‘ওরে বাবা, কি সংকেত?’ বড় ভয় পেত আমাকে !
আমি বললুম, ভয় কি প্লেটো ? খুব সহজ। এই দেখো, এই আমার ডান হাত, এই অনামিকা, এই ঘুরলো ডান দিকে, ক্লকওয়াইজ অর্থাৎ সময় যে দিকে যায় সেই দিকে। সময় কোন দিকে যায় ? ভবিষ্যতের দিকে। আর এই বা হাত,এই ঘুরলো বা দিকে, এ্যান্টিক্লকওয়াইজ অর্থাৎ যা ঘটে গেছে তার দিকে। ভূত। আর এই ঘুরলো এক সাথে…………
“…
বাবাজী — কোত্থেকে ?
গুরুপদ — আজ্ঞে, আমরা আসছি বেনারস থেকে—।
বাবাজী — কাশী ?
গুরুপদ — আজ্ঞে হ্যাঁ।
বাবাজী — যাওয়া হয়নি অনেককাল।
গুরুপদ — ওহো। তা আপনি বুঝি কাশীতেই…
বাবাজী — বড় দলাদলি। বড্ড ভীড়।
গুরুপদ — আজ্ঞে হ্যাঁ। তবু…
বাবাজী — গোড়াতেই বলেছিলুম, শহর তো গড়লে। কিন্তু এ শহর কি আর এমনটি থাকবে ?
ওপর দিয়ে কতো ঝড় বইবে। কতো আসবে, কতো যাবে। হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ।
একদিন শঙ্কর এসে বললে, তুমি অদ্বৈতবাদ না মানতে চাও মেনো না। কিন্তু গৌতম
যে দেশের সব্বোনাশ করলে সেটা মানো তো ? এর একটা বিহিত করা উচিৎ নয় কি ?
আমি বল্লুম করো বিহিত। করো, তাতে যদি শান্তি পাও তো করো। কিন্তু এটা মনে
রেখো, তোমার কাজ পণ্ড করানোরও লোক আসবে। দেশে ধর্ম নিয়ে ফুটবল খেলা
হবে। সেটা জেনে রেখো। ছোকরার মধ্যে জিনিস ছিল, কিন্তু আয়ুর্বিজ্ঞানটা রপ্ত হয়নি তো ! তাই, বত্রিশ বছর বয়সেই……”
“…
গুরুপদ — বাবা ! আমার মনে বড় অশান্তি বাবা—
বাবাজী — কি নাম তোমার ?
গুরুপদ — আজ্ঞে, আমার নাম গুরুপদ মিত্তির, এ্যাডভোকেট।
গুরুপদ বুঁচকি’কে ডাকে। অনিচ্ছাসত্তেও বুঁচকি উঠে কাছে যায়। বাবাজীর পায়ে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করে। পাশে বসায় বুঁচি’কে।
হয়েছেন। কাশী বৃন্দাবন থেকে ঘুরে এলুম বাবা কিন্তু কিছুতে জোর পাচ্ছি না।
বাবাজী — জোর পাচ্ছো না ?
গুরুপদ — না বাবা…
জড়তা আছে ? ”
ফোকলা গুরুপদ হতভম্ব হয়ে মাথা নাড়ায় দুদিকে। প্রথম দৃশ্য শেষ হয়।
রবি ঘোষ - কেবলরাম
সতীন্দ্র ভট্টাচার্য - সত্য
সন্তোষ দত্ত - প্রফেসর ননী
সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় - নিতাইবাবু
গীতালি রায় - গুরুপদ মিত্রের মেয়ে
চারুপ্রকাশ ঘোষ - বিরিঞ্চিবাবা
হরিধন বন্দ্যোপাধ্যায় – গণেশমামা
সুমিতা সান্যাল – বুঁচকি।
অপারিজত (১৯৫৬)
পরশপাথর (১৯৫৮)
জলসাঘর (১৯৫৮)
অপুর সংসার (১৯৫৯)
দেবী (১৯৬০)
তিনকন্যা [পোষ্টমাস্টার, মনিহার, সমাপ্তি] (১৯৬১)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯৬১)
কাঞ্জনজঙ্ঘা (১৯৬২)
অভিযান (১৯৬২)
মহানগর (১৯৬৩)
চারুলতা (১৯৬৪) টু (১৯৬৪)
কাপুরুষ ও মহাপুরুষ (১৯৬৫)
নায়ক (১৯৬৬)
চিড়িয়াখানা (১৯৬৭)
গুপী গাইন বাঘ বাইন (১৯৬৮)
অরণ্যের দিনরাত্রি (১৯৬৯)
প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০)
সীমাবদ্ধ (১৯৭১)
সিকিম (১৯৭১)
The Inner Eye (১৯৭২)
অশনী সংকেত (১৯৭৩)
সোনার কেল্লা (১৯৭৪)
জান অরণ্য (১৯৭৫)
বালা (১৯৭৬)
সতরঞ্জী কে খিলাড়ি (১৯৭৭)
জয় বাবা ফেলুনাথ (১৯৭৮)
হীরক রাজার দেশে (১৯৮০)
পিকু (১৯৮০)
সদগতি (১৯৮১)
ঘরে বাইরে (১৯৮৪)
সুকুমার রায় (১৯৮৭)
গণশত্রু (১৯৮৯)
শাখা-প্রশাখা (১৯৯০)
আগন্তুক (১৯৯১)
৮ আগস্ট ২০২০
#
কৃতজ্ঞতা:-
১) উইকিপিডিয়া।
২) পরশুরাম – ‘বিরিঞ্চিবাবা’ – ‘কজ্জলী’ নামক গল্পগ্রন্থে প্রকাশিত।
৩) অনিরুদ্ধ ধর – ‘ছবি তৈরির গল্প’ – পাঁচালী থেকে অস্কার- প্রতিভাস।
৪) মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল – ‘কাপুরুষ নাকি মহাপুরুষ’! – ভোরেরকাগজ ডট কম।
৫) মুভি রিভিউ : মহাপুরুষ (১৯৬৫) – শেখ মহদীজ ব্লগ - skmahdi ডট ওয়ার্ল্ডপ্রেস ডট কম।
৬) সত্যজিৎ রায় - অনুশীলন ডট ওয়ারজি।
৭) মার্টিন স্করসেসে (অস্কারজয়ী মার্কিন পরিচালক) – ‘সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে
২) পরশুরাম – ‘বিরিঞ্চিবাবা’ – ‘কজ্জলী’ নামক গল্পগ্রন্থে প্রকাশিত।
৩) অনিরুদ্ধ ধর – ‘ছবি তৈরির গল্প’ – পাঁচালী থেকে অস্কার- প্রতিভাস।
৪) মুহাম্মাদ আলতামিশ নাবিল – ‘কাপুরুষ নাকি মহাপুরুষ’! – ভোরেরকাগজ ডট কম।
৫) মুভি রিভিউ : মহাপুরুষ (১৯৬৫) – শেখ মহদীজ ব্লগ - skmahdi ডট ওয়ার্ল্ডপ্রেস ডট কম।
৬) সত্যজিৎ রায় - অনুশীলন ডট ওয়ারজি।
৭) মার্টিন স্করসেসে (অস্কারজয়ী মার্কিন পরিচালক) – ‘সত্যজিৎ রায়ের ছবি দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে
গিয়েছিল’ – বেঙ্গলী ডট ইণ্ডিয়ানএক্সপ্রেস
ডট কম।
৮) ‘শ্রদ্ধাঞ্জলীতে সত্যজিৎ রায়’ – জাগোনিউজটোয়েন্টিফোর ডট কম।
৯) ‘মহাপুরুষ’ সিনেমার লিংক –https://www.youtube.com/watch?v=bljuNMSll0A ইউট্যুব।
১০) অবশ্যই গুগুল।
৮) ‘শ্রদ্ধাঞ্জলীতে সত্যজিৎ রায়’ – জাগোনিউজটোয়েন্টিফোর ডট কম।
৯) ‘মহাপুরুষ’ সিনেমার লিংক –https://www.youtube.com/watch?v=bljuNMSll0A ইউট্যুব।
১০) অবশ্যই গুগুল।
