আগন্তুক -
—"পরনিন্দা নয়‚ পরচর্চা নয়‚ মুখেন মারিতং জগৎ নয়.."
আর শেষে‚
—"মাতব্বরী জিনিসটা আমার একেবারে সহ্য হয় না।"
এই চারটে লাইন‚ যতদিন বাঙ্গালী হিসেবে বেঁচে থাকবো‚ "হৃৎপিন্ডে দন্তশূল"-এর মতো তীক্ষ্ণ হুল ফুটিয়ে যাবে।
করোনা বা কোভিড-১৯ অনেককিছু উন্মোচিত করে দিয়ে গেল আমাদের এই পোড়া দেশে। আমাদের বিশ্বকবি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বুঝেছিলেন “…… ভাগ্যচক্রের পরিবর্তনের দ্বারা একদিন না একদিন ইংরেজকে এই ভারতসাম্রাজ্য ত্যাগ করে যেতে হবে। কিন্তু কোন্ ভারতবর্ষকে সে পিছনে ত্যাগ করে যাবে? কী লক্ষ্মীছাড়া দীনতার আবর্জনাকে। একাধিক শতাব্দীর শাসনধারা যখন শুষ্ক হয়ে যাবে, তখন এ কী বিস্তীর্ণ পঙ্কশয্যা দুর্বিষহ নিষ্ফলতাকে বহন করতে থাকবে। জীবনের প্রথম আরম্ভে সমস্ত মন থেকে বিশ্বাস করেছিলুম য়ুরোপের অন্তরের সম্পদ এই সভ্যতার দানকে। আর আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেল।…………এই কথা আজ বলে যাব, প্রবলপ্রতাপশালীরও ক্ষমতা মদমত্ততা আত্মম্ভরিতা যে নিরাপদ নয় তারই প্রমাণ হবার দিন আজ সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে।”
১৯৫৬-য় ‘পথের পাঁচালী’ থেকে যাত্রা শুরু ক’রে ১৯৮৩ সালে ‘ঘরে বাইরে’ পরিচালনাকালীন হঠাৎ করেই হার্ট-এ্যাটাক্ হয় সত্যজিৎ রায়ের। একটু সুস্থ হলে তারপরে তিন খানা সিনেমা আমরা পাই তাঁর কাছ থেকে যা মূলতঃ ইনডোরেই নির্মান। আর বলতে নেই এই তিনখানা ছবিতেই তিনি তাঁর জীবন-দর্শন, বা বলা ভালো জীবনের বিশ্বাসকে ঢেলে ব্যবহার করেছেন এই ছবিগুলোর সংলাপে। যা ইদানীংকালের অনেক বিখ্যাত ইউরোপীয়ান সিনেমাতে আমরাও দেখতে পাই। এক বা দুটি চরিত্র নিয়ে একটা গোটা সিনেমা এ কথা আমরা আগে ভাবতেই পারতাম না। এবং স্বাভাবিকভাবেই এ সমস্ত ছবি সংলাপ-নির্ভরই। এর পরবর্তী কালে কম চরিত্রের সাথে যুক্ত হয়েছে এক্কেবারে মিনিমাম সংলাপ। এ ভাবেই এগিয়ে চলেছে বিশ্ব-সিনেমা।
তো, গোড়ায় যা বলছিলাম, করোনা এসে সত্যিই আমাদের ঠুনকো সমাজের যে নোংরা দিকগুলো যা আমাদের রোজই দেখতে হচ্ছে টিভিতে বা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে তা এক কথায় ভয়াবহ। এমন কি একটা পরিবারের মধ্যেও বিভেদ তৈরি হচ্ছে এই অসুখটা নিয়ে। এ কোন সভ্যতা ?
সত্যজিৎ ২০১৫ সালে এই সব প্রশ্নের অনেককিছুরই উত্তর দিয়েছেন ‘আগন্তুক’ সিনেমায়। তার আগে যদিও ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘শাখা প্রশাখা’ আর ‘গণশত্রু’-ও ছিল সংলাপ-নির্ভর ছবি তথাপি ‘আগন্তুক’-এ এসে তিনি যাকে বলে এই মেকি সভ্যতার ‘কাপড় খুলে দিয়েছেন একেবারে’। বিশেষ করে আমাদের, অর্থাৎ বাঙালিদের।
‘আগন্তুকে সত্যজিৎ কোনো কাহিনীর ভরসায় বসে নেই। তাঁর একান্ত নিজের কনভিকশন‚ নিজের দর্শনের আকার নেওয়া মনমোহনের চরিত্র দিয়ে তৈরী এ তাঁর "personal" ছবি‚ যার "author" একমাত্র তিনিই। গল্প একটা আছে আগন্তুকে‚ শেষে একটা ও হেনরী সুলভ টুইস্টও আছে‚ কিন্তু সেটা গৌণ। মনমোহনের চরিত্রটা শেষ অবধি এতো আচ্ছন্ন করে রাখে যে এই শেষ টুইস্টটার কথা মনেও থাকে না’।
ধানাই-পানাই না বাড়িয়ে মূল গপ্পোটা শোনাই আপনাদের।
সত্যজিত-এর নিজেরই লেখা ‘অতিথি’ ছোটগল্পের চিত্রনাট্যরুপ এই ‘আগন্তুক’। ছবির শুরু এক দুর্গাপুজোর দিনকয়েক আগে। বাবা সুধীন্দ্র, মা অনিলা, আর একটি ছোট ছেলে বাবলু এই নিয়ে কলকাতার এক উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার। তো সেই সকালে অনিলা’র কাছে আসে সাধুভাষায় লেখা একটা ইনল্যাণ্ড লেটার। প্রাপক মিসেস সুধীন্দ্র বোস। প্রেরক এম. মিত্র, কুতুব হোটেল, দিল্লী। এই এম. মিত্র হলেন মনোমোহন মিত্র যিনি নাকি অনিলা’র ছোটমামা। যে ছোটমামা পঁয়ত্রিশ বছর আগে ১৯৫৫ –য় বি. এ. পাশ করেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছিলেন। ভাগ্নী’র কাছে মামা’র আবেদন –
‘••• আমি যখন গৃহত্যাগ করি তখন তুমি তাই খুকি। যাহা হউক, আমি পশ্চিমে সফর শেষ করিয়া সবে মাত্র এখানে আসিয়াছি। শীতলকান্ত কাকার নিকট হইতে অনুসন্ধান করিয়া জানিলাম, আমার নিকট-আত্মীয় বলিতে একমাত্র তুমিই আছ এবং স্বামীপুত্র লইয়া সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসার করিতেছ। আমি অল্পকালের মধ্যেই পুনরায় ভ্রাম্যমাণ জীবনে ফিরিয়া যাইব। আমার একান্ত ইচ্ছা, ইত্যবসরে তোমাদের অতিথিরূপে এক সপ্তাহকাল আমার জন্মস্থান কলিকাতায় অতিবাহন করি ! তোমার এই মাতুলকে তুমি চাক্ষুষ চিনিবে না, আমিও তোমাকে চিনি না। এই অবস্থায় আমার প্রস্তাব যে এক প্রকার imposition তাহা আমি বুঝি।- আমাদের দেশে অতীতে যে সামাজিক প্রথা প্রচলিত ছিল তাহাতে সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তিও গৃহস্থের আতিথেয়তা হইতে বঞ্চিত হইত না। সেই আদর্শের কথা স্মরণ করিয়াই আমি আমার অনুরোধ পেশ করিতে সাহসী হইলাম।
আমি স্থির করিয়াছি আগামী ১৬ই রাজধানী এক্সপ্রেসে রওনা হইয়া ১৭ই সকালে কলিকাতায় পৌঁছিয়া ট্যাক্সি-সহযোগে তোমাদের গৃহে উপস্থিত হইব। আমাকে অতিথিরূপে গ্রহণ করা বা না-করা সম্পর্কে তোমাদের সিদ্ধান্ত আমার শিরোধার্য। মনে রাখিও অম্ল-মধুর-তিক্ত-কষায় সব রকম অভিজ্ঞতায় আমি সমান অভ্যস্ত। ইতি, আশীর্বাদক- তোমার ছোটমামা শ্রী মনোমোহন মিত্র’
এই চিঠির বক্তব্য শুনে সুধীন্দ্র প্রচণ্ড সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে যা কিছুটা ভর করে স্ত্রীর উপরও। আর ছোট ছেলেটি, শুরু থেকেই সম্ভাব্য জাল দাদুর আগমনে রোমাঞ্চ অনুভব করতে থাকে। আগন্তুক মামা মনোমোহন মিত্র কলকাতায় পৌছানোর পরই কাহিনী শুরু হয়।
অনেক দোলাচলের মধ্যেই মনোমোহনের আগমন ঘটে সুধীন্দ্র বোসের বাড়ি। সন্দেহ এমন এক জায়গায় পৌঁছয় যে একটা ছোট্ট বর্ননা থেকেই তা স্পষ্ট হয়।
‘বসবার ঘর।
দেয়ালে টাঙানো এক বিশাল কালামকারী, আরেক দেয়ালে তিনটে রাজপুত মিনিয়েচার।
মাটিতে দেওয়ালের সামনে দাঁড় করানো রয়েছে দু’টি পাল যুগের পাথরের মূর্তি।
অনিলার চোখ যায় একটা bookshelf-এর উপর দুই প্রান্তে রাখা দুটো bronze figurines-এর দিকে।
সে দুটোকে তুলে নিয়ে ঘর
সেদিনই খেতে বসে অনিলা জানতে চায় মামার ঘর ছাড়ার শুরুর গল্প। উত্তরে মনোমোহনা জানায় ‘জার্মান ভাষায় একটা খুব সুন্দর কথা আছে – Wanderlust ! মানে হচ্ছে ভ্রমণের নেশা’। আর সেটা মাথায় এল কি করে ?
মনোমোহন বলতে থাকেন— ‘ তো- আমি ঠিক করেছিলাম কলেজের পড়া শেষ করে আর্ট স্কুলে ভর্তি হব। তা একদিন হল কি, আমি তখন ফাস্ট ইয়ারে পড়ি - হাতে একটা বিদেশী পত্রিকা এলো। খুলে দেখি পাতাজোড়া বাইসনের ছবি ! ফোটো নয়, হাতে আঁকা ! বাইসন কাকে বলে জানো তো দাদু’
বাবলু জানায় যে - হ্যাঁ, মাথায় শিং আছে।
মনোমোহন বলেন – ‘হ্যাঁ, সেই শিং বাগিয়ে চার্জ করছে, জানো মা – সে এক আশ্চর্য ছবি - (উত্তেজিত হয়ে) এমন তেজ, এমন দৃপ্ত ভঙ্গি - যেন দাভিঞ্চিকেও হার মানিয়ে দেয় ! কে এঁকেছে এই ছবি - কে সে অসামান্য শিল্পী। ছবির নিচে দেখি লেখা আছে – আজ থেকে বিশ হাজার বছর আগে, প্রস্তর যুগে স্পেনের আলতামিরা অঞ্চলে একজন আদিম গুহাবাসী একেছিল এই ছবি ! ব্যাপারটা এমনই অদ্ভুত যে মনে মনে বললাম, তোমার ক্ষুরে দণ্ডবৎ বাইসন ভায়া, আমি জীবনে আর যাই হই না কেন, কিছুতেই আর্টিস্ট হব না। সারা দুনিয়ায় এমন কোনো আর্ট স্কুল নেই যা আমাকে এই রকম বাইসন আঁকা শেখাতে পারে। সেই থেকে সভ্য ব্যাপারটা কি, আর অসভ্য ব্যাপারটাই বা কি – এই নিয়ে একটা কৌতূহল আমার মনে জেগে উঠেছিল, আর তার সঙ্গে যোগ হল Wanderlust -এই দুইয়ে মিলে আমাকে দেশ ছাড়া করল’।
‘ফিরিয়ে দাও এ অরণ্য, লও এ নগর! ছবির প্রধান চরিত্র মনোমোহন মিত্র বিশ্ব চষে বেড়িয়েছেন, থেকেছেন আধুনিক সব দেশে ! কিন্তু তার বরাবরই পছন্দসই বন্য জীবন। হাইপোডার্মিক সিরিঞ্জ দিয়ে নিজের দেহে ভয়ঙ্কর মাদকরস চালান দিয়ে সমনকে সমন জারি করছে বিশ্বের লক্ষ্য তরুণ, বোতামে টিপ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ মারা হচ্ছে, নিশ্চিহ্ন হচ্ছে শহর, এগুলোকে সভ্যতা বলে মানেন না তিনি। তিনি মনে করেন নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা হচ্ছে বিরাট এক ভাঁওতা, বন্য সভ্যতাই আসল সভ্যতা। সাঁওতাল, কোল, নাগা, মুণ্ডা, ওরাওসহ নানা উপজাতিদের সঙ্গে কাটিয়েছেন মনোমোহন। বন্য জীবনই তার কাছে আসল জীবন।
মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে দেখে ধর্ম, জাত মানেননা তিনি। স্ট্রাগলকে তিনি স্ট্রাগল বলেন না, বলেন মগজ-মাংশপেশির পুষ্টি আর মানুষ চেনার প্রথম পদক্ষেপ। ফেলুদা সিরিজের লালমোহন বাবুর ভাষায় বলা যায়, মনোমোহন মিত্র চরিত্রটা এমন মজার চরিত্র যার সঙ্গে দুমিনিট মিশলেই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, আপনাকে তো কালটিভেট করতে হচ্ছে মশাই! ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ মনমোহন মিত্রের সঙ্গে অনিলার বরের বন্ধু পৃথ্বীশ সেনগুপ্তের তর্কযুদ্ধ। বৈঠকখানায় চলা সেই চায়ের কাপে ঝড়ের সংলাপগুলো দর্শকরা অবাক বিস্ময়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আজো দেখে! আর সংলাপে হেরে গিয়ে পৃথ্বীশের মনমোহনকে অপমানের অংশটায় দর্শকমনে মন খারাপের কালো মেঘ নেমে আসে।
আমি সরাসরি ‘আগন্তুকে’র চিত্রনাট্য থেকে তুলে দিচ্ছি—
“অনিলা এতক্ষণ তানপুরা tune করছিল, এবার সে গান ধরে।
অনিলা :-
বাজিল কাহার বীণা মধুর স্বরে
আমার নিভৃত নব জীবন-'পরে।
প্রভাতকমলসম ফুটিল হৃদয় মম
কার দুটি নিরুপম চরণ-তরে।
জেগে উঠে সব শোভা, সব মাধুরী,
পলকে পলকে হিয়া পুলকে পুরি।
কোথা হতে সমীরণ আনে নব জাগরণ,
পরাণের আবরণ মোচন করে।
লাগে বুকে সুখে দুখে কত যে ব্যথা,
কেমনে বুঝায়ে কব না জানি কথা।
আমার বাসনা আজি ত্রিভুবনে উঠে 'বাজি,
কাঁপে নদী বনরাজি বেদনাভরে।
গান শেষ হয়। কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর—
মনোমোহনের ঘোর যেন হঠাৎ কেটে যায়। পৃথ্বীশের দিকে দেখে ।
পৃথ্বীশ — আপনি religion মানেন কিনা –
মনোমোহন — Oh, yes……religion - religion - আমি – লোকটা জানেন মিঃ সেনগুপ্ত, একটু
পৃথ্বীশ — সে তো ভালো কথা –
মনোমোহন — যে জিনিস মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে - আমি তাকে মানি না। Religion এটা করে,
পৃথ্বীশ — ঈশ্বর ?
মনোমোহন একবার পৃথ্বীশের দিকে তাকায় ও তারপর কপালে হাত রেখে গান ধরে -
মনোমোহন —
‘অন্ধজনে দেহ আলো
মৃতজনে দেহ প্রাণ –’
সকলে কিছুক্ষণ চুপ। তারপর –
মনোমোহন — কে দেবে আলো, কে দেবে প্রাণ ? মুশকিলটা কী জানেন মিঃ সেনগুপ্ত - আজকালকার দিনে
পৃথ্বীশ — হুঁ - true enough -এ বিষয়ে আমি আপনার সঙ্গে এক মত। কিন্তু What about science ?
মনোমোহন — আমার মত শুনে কী হবে ? For a change আপনার মতটা কী শুনি না !
পৃথ্বীশ — নতুন কিছু না - ঐ আর পাঁচটা শিক্ষিত লোকে যা বলে তাই —
মনোমোহন — And what is that ?
পৃথ্বীশ — Technology-র অভাবনীয় progress - কিছুদিন আগে পর্যন্ত যা স্বপ্নেও ভাবা যেত না- A big feather in the cap of NASA –
মনোমোহন — NASA—
পৃথ্বীশ — হ্যাঁ, NASA—
মনোমোহন — আর তার পাশেই নেশা ! Hypodermic syringe দিয়ে নিজের দেহে ভয়ংকর মাদক রস চালান দিয়ে শমনকে সমন জারি করছে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষ, আর অধিকাংশই তরুণ। একে রোধ করবে কোন Technology মিঃ সেনগুপ্ত ?
পৃথীশ — হুঁ, তা আপনি তো এতদিন পশ্চিমেই কাটিয়েছেন ?
মনোমোহন — কাটিয়েছি।
পৃথ্বীশ — কেন ? সেখানে তো Technology-র রাজত্ব -সেটা যদি আপনাকে এতই পীড়া দেয় তা জঙ্গলে গিয়ে জংলীদের মধ্যে বাস করতে পারতেন –
মনোমোহন সশব্দে হাততালি দিয়ে উঠে পড়ে - তার দৃষ্টি উদ্ভাসিত।
মনোমোহন — দ্যাখো, দ্যাখো- clairvoyance ! এ জিনিস তো বিজ্ঞানের আওতায় আসে না !
পৃথ্বীশ — আপনি বলতে চান আপনি জংলীদের মধ্যে বাস করেছেন ?
মনোমোহন — Nothing but the truth, so help me God ! - গৃহত্যাগের পর প্রথম পাঁচ বছর আমি দেশেই কাটাই এবং বন্য পরিবেশে কাটাই। সাঁওতালদের নিয়ে শুরু করার পর ক্রমশ কোল ভীল নাগা মুণ্ডা মুরিয়া মারিয়া ওঁরাও টোডা - কত নাম করব ?
পৃথ্বীশ — এই সব উপজাতিদের সঙ্গে আপনি সময় কাটিয়েছেন ?
মনোমোহন — আপনি কখনো ইদুরের মাংস খেয়েছেন ? Field rat ? সাপের মাংস ? বাদুরের মাংস ? (অনিলাকে) মা, আমি বলেছিলাম আমি সর্বভুক। সেটা কিন্তু কোনো figure of speech নয় - সর্বৈব সত্য –
পৃথ্বীশ — তা এই পাঁচ বছরে আপনি বিশেষ উপার্জন করেছিলেন বলে তো মনে হয় না –
মনোমোহন — On the contrary-আমার শেষ সম্বলটুকুও নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল !
পৃথ্বীশ একদৃষ্টে মনোমোহনের দিকে চেয়ে থাকে।
মনোমাহন — আপনি ভাবছেন যে সম্বলটা কোখেকে এল - তাই তো ?
পৃথ্বীশ — আপনার বাবা নিশ্চয়ই এই গৃহত্যাগের ব্যাপারটা sponsor করেন নি !
মনোমোহন — Strange notion ! (সোফায় বসে) আসল কথাটা বলি, শুনুন - আমার দিদিমা - the late গিরিবালা দাসী, যার কথা একটু আগেই বলেছিলাম তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন - এমন কি spoil করতেন বললেও ভুল হবে না- তা আমি ম্যাট্রিকে প্রথম হই, ইন্টারমিডিয়েটেও প্রথম হই - তারপর যখন বি.এ-তে ফার্স্ট ক্লাস পাই তখন সেই দিদিমা আমার হাতে একটা lump sum তুলে দিয়ে বলেন : ‘বাছা, তুমি বংশের মুখ উজ্জ্বল করেছ-- ভগবান তোমার মঙ্গল করুন।' – Three thousand rupees -সে যুগে চাট্টিখানেক কথা ছিল না। সুতরাং আমার নিজের পুঁজি নিয়েই গৃহত্যাগ করি প্রয়োজনে আমাকে কোনো দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হয় নি !
পৃথ্বীশ — বুঝলাম। তা সেই সম্বল তো বললেন ফুরিয়ে গেল। এখানে একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে এসে পড়ে – Who paid for your trips abroad ?
মনোমোহন — I earned my way- ধর্মাবতার ! As a cabin boy- P and 0 কোম্পানির S. S. Olympia জাহাজের cabin boy-!
পৃথ্বীশ — তারপর ? লণ্ডনে পৌছে ?
মনোমোহন — বছর পাঁচেক -শুধু লণ্ডনে নয়, ইয়োরোপের বিভিন্ন শহরে –
পৃথ্বীশ — কী ? কী করেন ?
মনোমোহন — গ্রাসাচ্ছাদনের জন্যে struggle ! - বাঙালির অতি প্রিয় শব্দ। আমি অবশ্য ওটাকে struggle বলি না- আমি বলি মগজের পুষ্টি - মাংসপেশীর পুষ্টি ! আর মানুষ চেনার প্রথম পদক্ষেপ—
পৃথ্বীশ — তারপর আবার জঙ্গলে ফিরলেন কবে ? এ সবই তো মনে হচ্ছে শহরের ঘটনা - সভ্য শহর -
মনোমোহনের মুখে দুষ্ট হাসি দেখা দেয়। সে হঠাৎ আঙলে তুড়ি দিতে দিতে উঠে পড়ে পাকা গায়কের গলায় দু-লাইন কীর্তন গেয়ে দেয় -
মনোমোহন —
‘রাই ধৈর্যং বহু ধৈর্যং,
রাই ধৈর্যং বহু ধৈর্যং,
মম গচ্ছং মথুরায় –’
পৃথ্বীশের ধৈর্যচ্যুতি হয়, সে বিরক্তভাবে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বার করে সশব্দে সামনের টেবিলের উপর রাখে। মনোমোহন পৃথীশের দিকে এগিয়ে আসে।
মনোমোহন — My আত্মজীবনী won't get you much nearer the truth, my friend ! আপনি তো পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে আদত মানুষটার নাগাল পেতে চাইছেন ? সেটা অত সহজ হবে না ! তবু for the sake of record আমি জানিয়ে রাখি, তখন আমি পত্র-পত্রিকায় লিখতে শুরু করেছি – ফলে কিঞ্চিৎ bank balance - ফলে ছাত্রাবস্থার দ্বিতীয় পর্যায় -a degree in Anthropology -তৎপর যুক্তরাষ্ট্র যাত্রা –
পৃথ্বীশ — যুক্তরাষ্ট্র ?
মনোমোহন — মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র –
পৃথ্বীশ — কারণ ?
মনোমোহন — Indians –
পৃথ্বীশ — কী ? Oh, I see-American Indians ! তা এবারেও কি cabin boy ?
মনোমোহন হেসে ওঠে।
মনোমোহন — No, Sir ! কিছু মনে করবেন না - আত্মপ্রচারের মতো হলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে সেখানকার পরীক্ষাতেও আমি যথারীতি প্রথম স্থান অধিকার করি - ফলে struggle করতে হয় নি। একটি বিশিষ্ট Anthropological সংস্থা আমার আমেরিকা ভ্রমণের খরচপত্র বহন করেন। শর্ত ছিল যে আমি আমার অভিজ্ঞতা নিয়মিত তাদের কাছে লিখে পাঠাব along with photographs । সেই শর্ত আমি পালন করে এসেছি। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মিলে তেতাল্লিশটি উপজাতির সান্নিধ্যে বেশ কয়েকটা বছর কাটাই। সেই অভিজ্ঞতাই আমার জ্ঞানেন্দ্রিয় উন্মেষের প্রধান কারণ।
পৃথ্বীশ এবার অসহিষ্ণুভাবে উঠে দাড়ায়।
পৃথ্বীশ — ঠিক আছে, let me take over from here- আপনি বসুন, আপনার গলা শুকিয়ে গেছে। আপনি বসুন—
মনোমোহন — (বসে পড়ে) জো হুজুর !
পৃথ্বীশ — আমি বলছি, আপনি শুনুন-ভুল হলে শুধরে দেবেন -
মনোমোহন — As your honour pleases !
পৃথ্বীশ — মোদ্দা কথা যেটা দাঁড়াচ্ছে, সেটা হচ্ছে যে এই সব অভিজ্ঞতা থেকে আপনার উপলব্ধি হয়েছে যে নগর কেন্দ্রিক সভ্যতা হচ্ছে একটা বিরাট ভাঁওতা, বন্য সভ্যতা হচ্ছে আসল সভ্যতা। এখানে বলে রাখা ভালো যে আমি নিজে শহুরে মানুষ হলেও tribal life সম্বন্ধে একেবারে অজ্ঞ নই -এ সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা আমারো আছে - আমি জানি যে ওদের ধর্ম আছে, শিল্প ও সংস্কৃতি, সংগীত ইত্যাদি আছে। কিন্তু –
মনোমোহন — Uno momento Signor Sen Gupta ! (ওঠে পড়ে এগিয়ে আসে) What is ‘ইত্যাদি’ ? ইত্যাদি বলে কী উহ্য রাখছেন সেটা বলুন এদের ! নইলে এরা আমায় চিনবেন কি করে ? বন্য সভ্যতা সম্বন্ধেই বা জানবেন কী করে ?
পৃথ্বীশ — কী বাদ গেছে সেটা আপনিই বলুন।
মনোমোহন — আরে বাপরে! আসল জিনিসটিই তো বাদ ! Science ! Technology।
আপনি শুধু ভাবছেন Neptune-এর কথা, Voyager-এর কথা। আচ্ছা এটা ভাবুন তো মানুষ নিরালম্ব বর্বর বাঁদুরে অবস্থা থেকে hunting, fishing, agriculture, weaving, pottery - জীবন ধারণের যাবতীয় উপাদান উদ্ভব করতে কী ক'রে শিখল ? আরো আছে – architecture ! একটা পর্ণকুটিও স্থাপত্যের সাক্ষ্য বহন করে। আপনি Igloo জানেন ? এস্কিমোদের বাড়ি ? তাতে দু’রকম বরফ ব্যবহার হয় জানেন ? এক opaque - অস্বচ্ছ - যা দিয়ে বাড়ির ছাউনি তৈরি হয়। আর দ্বিতীয় হচ্ছে স্বচ্ছ – transparent - যা দিয়ে বাড়ির চতুষ্কোণ জানলা তৈরি হয়। একে কি বলবেন ? Science নয় ? Technology নয় ?
পৃথ্বীশ — থামুন মশাই ! Totem, Taboo, Voodooism, Witchcraft, Mumbo-Jumbo ! আপনি আপনার ব্যারাম হলে কি ওঝাকে call দেন ?
মনোমোহন — তাও দিয়েছি মিঃ সেনগুপ্ত - অনন্যোপায় হয়ে দিয়েছি। ঐ জঙ্গলে আর ডাক্তার কোথায় পাব বলুন ! (বসে পড়ে) আর সে কী রকম ওঝা জানেন ? পাঁচশো medicinal plants-এর গুণাগুণ তার নখদর্পণে ! সে আমায় সারিয়ে তুলেছিল - এমনিতে call দিই না বটে, যে কারণে এই ঘরের সোফায় বসে আপনাদের সঙ্গে চা বিস্কুট খাচ্ছি, সেই কারণেই দিই না ! ( উঠে পড়ে) আপনি একটা সহজ ব্যাপারকে ( উত্তেজিত হয়ে) কেন এত জটিল করে ফেলছেন বলুন তো ? আপনি কেন বুঝতে পারছেন না। আমি নিজে জংলী নই ! এটা আমার পরম আক্ষেপের বিষয় যে আমি জংলী নই – আমি আলতামিরা গুহাবাসীদের মতন বাইসন আঁকতে পারি না। কিন্তু উপায় কী বলুন ? ঘর ছাড়ার অনেক আগে আমার মজ্জার মধ্যে ঢুকে গেছে Shakespeare, বঙ্কিম, মাইকেল, Marx, Freud, রবীন্দ্রনাথ। সেই জন্যেই তো আমার Field note-এর দরকার – আমি নিজে জংলী হলে কি দরকার হতো ? হতো না … …
মনোমোহন আবার সোফাতে বসে।
পৃথ্বীশ — আপনি তো মুরিয়াদের study করেছেন বললেন, তাই না ?
মনোমোহন — হ্যাঁ, করেছি।
পৃথ্বীশ — তা তাদের ‘ঘটুলে’ যা ঘটে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যে অবাধ যৌন সম্পর্ক – (অনিলাকে) sorry বৌদি- (মনোমোহনকে)-সে সম্বন্ধে আপনার Field notes
কী বলে ?-সেটা চূড়ান্ত promiscuity ? নয় ? সেটা কি আপনি সভ্য বলবেন ?
মনোমোহন — না -
‘যদেতদ্ হৃদয়ং তব
তদস্তু হৃদয়ং মম –
যদিদং হৃদয়ং মম
তদস্তু হৃদয়ং তব’ – Holy wedlock – এটাই হচ্ছে সভ্য !
পৃথ্বীশ — একটু আগে তো আপনি নিজেকে সর্বভুক বল্লেন। তা আপনি মানুষের মাংস খেয়েছেন ?
মনোমোহন :- সে সৌভাগ্য আমার হয় নি –
পৃথ্বীশ — সৌভাগ্য !
মনোমোহন — শুনেছি নরমাংস খুব সুস্বাদু – কিন্তু আমি খাই নি। (অনিলকে) সর্বভূক বলাটা মিথ্যে বলা হয়ে গেছে মা, অপরাধ নিও না।
পৃথ্বীশ — এই cannibalism-কে আপনি সভ্যতার কোন স্তরে ফেলবেন ?
মনোমোহন — সভ্য ? সভ্য কোথায় ? বর্বর - Barbaric--সভ্য কে জানেন ? সভ্য হচ্ছে সেই মানুষ, আঙুলের একটি চাপে, একটি বোতাম টিপে, একটি ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ করে, সমস্ত অধিবাসী সমেত একটা গোটা শহর নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। আর সভ্য কারা জানেন ? যারা এই অস্ত্র প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে --without turning a hair!
পৃথ্বীশ — Any way, Mr Mr...
মনোমোহন — কী ? Mr Sen Gupta ? পদবীতে এসে হোঁচট খেলেন তো ? আরে তা তো হবেই! মিত্র
পৃথীশের মুখ গম্ভীর, থমথমে।
পৃথ্বীশ — আপনি No one, না Some one, সেটাই তো প্রশ্ন। আপনি আমার এই বন্ধু এবং তার স্ত্রীকে কী সমস্যায় ফেলেছেন তা জানেন ? আপনি এদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন সেটা জানেন আপনি ? নেহাৎ এরা অত্যন্ত ভদ্র, তাই এদের আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখছে না। কিন্তু আপনি guest হিসেবে welcome, না unwelcome, সেটাই তো বুঝতে দিচ্ছেন না! আপনি বলছেন আপনার passport proves nothing - কিন্তু সেটা যে জাল কি না-জাল সেটা তো আপনি নিজেই জানেন। তাহলে আপনি সেটা খোলাখুলি ওদের বলছেন না কেন - Why ? Look, either come clean, or just clear out –
মনোমোহন তার সামনে সোফায় স্থির হয়ে মাথায় হাত দিয়ে বসে, দৃষ্টি নিচে।
পৃথ্বীশ হঠাৎ উঠে পড়ে ।
পৃথ্বীশ -- ঠিক আছে, আমি আসি –”
এই কনভার্সেশনের উপসংহারে আমরা লক্ষ্য করি, পৃথ্বীশ চরম আক্রোশে বলছে, আপনি নো বডি না সামবডি, তা এদের বলে দিচ্ছেন না কেন? এই পুরো কনভার্সেশনের প্রশ্ন কিন্তু এটাই। অথচ এই প্রশ্ন কিন্তু বিভিন্নভাবে আগেও উচ্চারিত হয়েছে। সাত্যকির সংলাপে আমরা দেখি, সে বলছে, তুমি আমার দাদু। হতেও পারো আবার নাও হতে পারো। কী অদ্ভূত না ? একই প্রশ্ন দুই প্রজন্মের জবানে। কিন্তু একটা কী রুক্ষ আরেকটা কী কোমল ! এর মাধ্যমে কী সাধারণ মনোযোগের অগোচরে সত্যজিৎ আরও একবার সভ্য-অসভ্যের সংজ্ঞা দিয়ে বসলেন ? কাহিনী-বিন্যাসে তার দক্ষতার প্রমাণ রাখলেন বরাবরের মতোই। আমরা বোধহয় খুব তাড়াতাড়ি চলে এসেছি বিজ্ঞানের কল্পে। মানবিক ব্যাপারগুলোকে আমাদের আরও একটু সময় নিয়ে গভীরভাবে বুঝবার দরকার ছিলো। কোনো মন্তব্য ছাড়াই একটা উক্তি তুলে দেওয়া যাক। “সভ্য কে জানেন ? সভ্য হচ্ছে সেই মানুষ, যে আঙুলের একটি চাপে, একটি বোতাম টিপে, একটি বোম নিক্ষেপ করে সমস্ত অধিবাসীসমেত একটা গোটা শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। সভ্য কারা জানেন? যারা এই অস্ত্র প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”
তবে পৃথ্বীশ নয়‚ এ ছবিতে সত্যজিতের প্রকৃত "বাঙ্গালী" চরিত হলো রক্ষিত-দম্পতি। পৃথ্বীশ ওয়ান-ডাইমেনশ্যানাল চরিত্র‚ শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক। কিন্তু রক্ষিত-দম্পতি ঐ পাঁচ মিনিটেই এতো শেড দেখালেন নিজেদের চরিত্রের! রবি ঘোষকে দেখি আর বিস্মিত হই। রক্ষিত-দম্পতির মতো অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি মারার তীব্র অশ্লীল কৌতুহল‚ এ জিনিস বাংলার বাইরে কিন্তু আনকমনই।
পৃথ্বীশের সাথে বাক্যালাপের পরের দিন সকালেই অনিলা আবিষ্কার করে যে মনোমোহন চলে গেছেন। এর পরে খানিকটা ইনিট্যুইশন বলুন আর দু-য়ে দু-য়ে চার করাই বলুন, সুধীন্দ্র অনিলা আর বাবলু পৌঁছে যায় শান্তিনিকেতন। শীতলকাকার উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে বনের পুকুরে মনোমোহনকে খুঁজে পাওয়া, আদিবাসী নাচ আর তারপরে কলকাতা থেকে চলে যাবার আগের একদিন অনিলার কাছে থাকা দিয়ে এ সিনেমা সমাপ্তির দিকে এগোয়।
এই নাচের দৃশ্য প্রসঙ্গে শঙ্খ ঘোষ তাঁর ‘ইশারা অবিরত’ বইটিতে লেখেন— ‘‘ও-ছবির শেষ দিকে সাঁওতালি নাচটার কথা ভাবুন। মনোমোহনের পাশে দাঁড়িয়ে সুধীন্দ্র আর অনিলা দেখছে সেই নাচ, মুগ্ধ ট্যুরিস্টরা যেভাবে দেখে। কিন্তু দেখতে দেখতে, অনিলার শরীরে অল্প অল্প দোলা লাগে, বোঝা যায় তার ভিতরে আসছে নাচ। সুধীন্দ্র তাকে ইশারা করছে সাঁওতালদের সঙ্গে যোগ দেবার জন্য। উদ্ভাসিত অনিলা জিজ্ঞেস করছে ‘যাই ?’ আর চলেও যাচ্ছে খুশি মনে, দলের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে তৈরি হচ্ছে চমৎকার তার নাচ, তাদের নাচ। সুধীন্দ্রকে ডেকে কানে কানে মনোমোহন বলছেন: এতক্ষণে বিশ্বাস হচ্ছে ও আমার ভাগ্নি।’’
ছবির শেষে অনুতপ্ত অনিলা আর সুধীন্দ্রকে যখন তিনি প্রাপ্ত পৈতৃক সম্পত্তির পুরোটাই দিয়ে বিদায় নেন, তখন ইংরেজি অভিধানের সবচেয়ে বেশি অক্ষরের সবচেয়ে বড় শব্দটা উচ্চারণ করে তার অর্থটাও পরিষ্কার করে দেন:
“Floccinaucinihilipilification”
তার পর হেসে সুধীন্দ্রকে বলেন— ‘Setting little or no value - এই বোঝাতেই ২৯টি অক্ষর ! এই না হলে সভ্যতা ?’
আর বাবলুকে বলেন— কখনো যেন ‘কুপমণ্ডুক’ না হয়। কারণ কূপমণ্ডুকদের জীবন একটা বৈচিত্রহীন, অভিজ্ঞতাহীন, নিরস কিছু অভ্যাস যাপন করে যাওয়া কেবল।
সত্যজিৎ এ ছবিতে অনেক কিছুই শিখিয়ে দিয়ে যান আমাদের। এমন কি ‘ভাঁড়ামি আর পরনিন্দায় সুখ খুঁজে পাওয়া আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল দৈন্যতাও স্মরণ করিয়ে দিতে চান তিনি। সক্রেটিস, প্লেটোদের দর্শন, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি নিয়ে চক্রের উল্লেখ করে তিনি হয়তো পথপ্রদর্শন করতে চান সভ্য নাগরিকদের। অথবা একপ্রকার হা-হুতাশ করে ওঠেন ‘নিম্নগামী’ মেধার বিষয়বৈচিত্রহীন আলাপচারিতার প্রতি ইঙ্গিত করে। আরও একটি ব্যাপারে খুব সুক্ষ্মভাবে ‘স্যাটায়ার’ করলেন আগন্তুক সত্যজিৎ রায়। মারামারি-হানাহানির যুগে পলিটিক্সই একমাত্র হাসির খোরাক। যথার্থ বৈকি’!
সক্রেটিস তার নিকট সত্য থাকার ব্যাপারে যেভাবে বলেছিলেন, এই তর্ক সত্যের সন্ধান দিতে পারে না। তার জন্য সময়ের প্রয়োজন। সত্যজিৎও অপরিচিতের পরিচয় পাবার একটাই সমাধান বাতলে দেন, ‘সময় লাগবে’। তার মতে দুর্নীতির এই সময়ে ছবি আর নাম-ঠিকানা লেখা পাসপোর্ট জাল করা কঠিন কোনো ব্যাপারই না। ছোট্ট একটা বই কীভাবে একজন মানুষের পরিচয় বহন করতে পারে? তার জন্য তাকে বুঝতে হবে, গভীরভাবে পড়তে হবে। তবেই না সম্ভব একজন মানুষের পরিচয় লাভ।
‘আগন্তুক’ এ মিউজিক শুরু হয় টাইটেল-এই ট্রাম্পেটের একটা ফ্লারিশ দিয়ে। বাংলা সিনেমায় সত্যজিৎই বোধ হয় প্রথম দর্শককে টাইটেল মিউজিকও মুখস্থ করিয়ে ছেড়েছিলেন। ‘বাজিলো কাহার বীণা’ গানটা যেন ঠিক টেনশনের মুহূর্তটাকে দূরে রাখার কারণে। আর পৃথ্বীশ এর সাথে ওই জমাট তর্কবিতর্কের শেষে একটা চেলো। এর চেয়ে বেশি আর বলার নেই আমার।
সত্যজিৎ কঠিন ছবি বানাতেন না‚ বা বলা ভালো ছবির ভাষাটা সহজ রাখতেন। মানে ঐ ত্রফো-গোদার-বুনুয়েলদের মতো নয়‚ যাদের ছবি দেখাটা সত্যি বলতে কি খুব চাপের‚ এতো বেশী ইমোশন্যাল অ্যাটেনশন চেয়ে বসে ছবিগুলো। তবে কারুকার্যের জন্য কঠিন ছবি বানাতে হবে তার কোনো মানে নেই। হলিউডে ফোর্ড‚ কাপ্রা বা আমাদের সত্যজিৎ বা তপন সিংহ তাঁদের কাজে একথা বারেবারে প্রমাণ করে গেছেন। এঁদের ছবি‚ আর যাই হোক‚ দুর্বোধ্য নয়।
সংলাপ ক্রমশই হয়ে উঠতে থাকে লক্ষণাত্মক। ‘আগন্তুক’-এ তো মনোমোহন অধিকাংশ সময়েই কথা বলে যান প্লেফুল মুড-এ। মৃণাল সেন ‘আগন্তুক’-এর সংলাপ নিয়ে নির্দিষ্ট ভাবে মন্তব্যই করেছিলেন ‘‘দ্য ওয়ার্কিং আউট অব দ্য ওয়ার্ডস অ্যান্ড লাইনস মে বি লাইকেন্ড টু আ মাস্টার পেন্টার প্লেইং উইথ ব্রাশ অ্যান্ড কালার।’’
অভিনয়ের ব্যাপারে শুধু বলি আমরা যে উৎপল দত্তকে ভিলেন চরিত্রে দেখা অভ্যস্ত তার থেকে বেরিয়ে কি অসম্ভব এক পরিণত স্বাভাবিক অভিনয়ের দর্শক রইলাম আমরা ! বাকিরা যে যার জায়গায় যথাযথ।
(সমাপ্ত)
** যদি কখনো সম্ভব হয় তাহলে সত্যজিৎ রায়ের এই দর্শনের পেছনে যে মানুষটি রয়েছেন সেই বিখ্যাত ফরাসী নৃতাত্বিক ক্লঁদ লেভি-স্ট্রসের তত্ত্ব ও তার প্রয়োগকথা। প্রবুদ্ধ মজুমদারের কথায় বলি ‘লেভি-স্ট্রস বললেন‚ যেসব মানুষের হাতে সভ্যতার সৃষ্টি‚ তারা কোনোভাবেই নির্বুদ্ধিতায় আচ্ছ্বন্ন ছিলেন না। মানুষের ভাবনাচিন্তার যে প্রক্রিয়া‚ সেটা সব সময় সব সমাজে একই রকম ছিলো‚ তথাকথিত বন্যদের সঙ্গে আজকের শহুরে মানুষের সেদিক থেকে কোনো তফাত নেই‚ দুজনেই সমান "ইন্টেলেকচুয়াল"। শুধু তাই-ই না‚ দুজনেই খুব বেসিক কতগুলো প্যারামিটার দিয়েই তার পরিপার্শ্বকে মাপে‚ যেমন গরম-ঠাণ্ডা‚ সোজা-উল্টো‚ ভালো-খারাপ‚ বন্য-সভ্য ইত্যাদি। এই বাইনারী ফর্মুলা আমাদের সিস্টেমে ঢুকে গেছে বলেই আমরা কারুর ব্যাপারে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি‚ এ ভালো ও খারাপ এ ধান্দাবাজ ও চোর ইত্যাদি। লেভি-স্ট্রসের আর একটা কনসেপ্ট যেটা সত্যজিতের মনে ধরেছিলো‚ একটা পরিবার‚ সেটা শুধু স্বামী-স্ত্রী-সন্তানকে নিয়েই গঠিত হয় না। তাতে পেরিফেরাল চরিত্ররা‚ দাদুঠাকুরমাদিদামাসীপিসীমামাকাকা ইত্যাদি সম্পর্কগুলো-ও নিজের নিজের ভূমিকা পালন করে’।
#
