স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা - (৭)
‘মুরলী কী ধুন শুনি বাওরিয়া’
একদিন সকালের খবরের কাগজে দেখলাম “ডোভার লেন মিউজিক কনফারেন্স” এর বিজ্ঞাপন। ভারতীয় ধ্রুপদী গান বাজনা আমার শুনতে ভালো লাগে। তবে তার পোকা আমি নই। এবারের বিজ্ঞাপনে দেখলাম কৌশিকি চক্রবর্তী তো আছেনই, এছাড়া আছেন সন্দীপন সমাজপতি। যতদূর শুনেছি, আমাদের কলকাতার ফুটবল মাঠের এক বিখ্যাত খেলোয়ার শ্রী সুকুমার সমাজপতি খুব ভাল গান গাইতেন। সন্দীপন, তাঁর সুযোগ্য পুত্র। কঠোর অনুশীলনে নিজেকে তৈরী করেছে সে। আর কৌশিকি’র কথা তো আপনারা সবাই জানেন।
হঠাৎ করেই আমার কিছু বইয়ের প্রসঙ্গ মনে এল, যা এই উচ্চাঙ্গ সংগীতের উপরে লেখা। আমার কাছে যে বইটি রয়েছে তার নাম “স্মৃতির অতলে”। রচয়িতা শ্রী অমিয় নাথ সান্যাল। চটি বই। কিন্তু তখনকার সেই ত্রিশ চল্লিশের দশকে কলকাতা তথা সারা ভারতের উচ্চাঙ্গ সংগীতের তিন মহীরূহের কথা লেখক এখানে সাজিয়েছেন। বাংলা ভাষার ওপর কতখানি দখল থাকলে এমন একটি চটি বইও অমূল্য হতে পারে, তা এই বইটা না পড়লে বোঝা যাবে না। লেখক নিজে শিল্পী তো ছিলেনই, আর ছিলেন গুণী সমঝ্দার। তিন প্রবাদ প্রতিম উচ্চাঙ্গ কণ্ঠশিল্পীর কিছু কথা এই বইতে সন্নিবিষ্ট। এঁরা হলেন মৌজ্জুদ্দীন, ফৈয়াজ খাঁ এবং কালে খাঁ। ওনাদের সাথে সাথে জানতে পারি, তখন কার কলকাতার সংগীতপ্রেমী মানুষজন’দের বিভিন্ন টুকরো স্মৃতি’র ঝলক। বিখ্যাত এবং আমাদের এক জনপ্রিয় সাহিত্যিক শ্রী নারায়ণ সান্যাল মশাই এর পিতৃব্য ছিলেন এই অমিয়নাথ সান্যাল মহাশয়। এবার নারায়ণ সান্যাল মশাই এর লেখা, একটি স্মৃতিচিত্রে’র অংশ বিশেষ আমি তুলে দিচ্ছি। আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে। এবং বুঝতে পারবেন যে ভারতীয় মার্গসঙ্গীত কোন পর্যায়ে যেতে পারে...
“ ............ যাঁর কথা বলছি তিন আমার আত্মীয়, পরম আত্মীয়। ঈশ্বরেচ্ছায় সেই অশীতিপর সঙ্গীতকেশরী আজও ধরাধামে আছেন – ভগবান করুন সুস্থ শরীরে আরও দীর্ঘদিন তিনি আমাদেরই মধ্যে থাকুন। বিশ পঁচিশ বছর আগে তাঁর কাছে শোনা কাহিনীটির মূল কাঠামো বজায় রেখে এখানে লিপিবদ্ধ করছি। বিষেষ কারণে নাম-ধাম পাত্র-পাত্রীকে পরিবর্তন করতে বাধ্য হলাম।
মনে করুন, আমার এ খন্ড-কাহিনীর নায়কের নাম অমৃতনাথ সান্যাল। আজ থেকে অর্ধশতাব্দী আগেকার কথা – তখন তাঁর বয়স চল্লিশ-বেয়াল্লিশ। কিন্তু ঐ বয়সেই সঙ্গীতসমাজে তিনি প্রতিষ্ঠিত। গায়ক বা বাদক হিসাবে তাঁর প্রতিষ্ঠা কম নয়। বস্তুতঃ সঙ্গীতরস পরিবেশনে তাঁর যতটা খ্যাতি তার চেয়ে সমজদার হিসাবে তাঁর খ্যাতি বেশি। সঙ্গীত তাঁর স্বাভাবিক নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মতই স্বতঃস্ফুর্ত।
যে অর্থে হরিদাস স্বামীর শিষ্য বৈজুপ্রসাদ হচ্ছেন ‘বাওরা’ সে অর্থে কৃষ্ণনগরবাসী আমার খুল্লতাতও উন্মাদ। সারা ভারত পরিক্রমা করেছেন সঙীত-সাধকদের জানতে, চিনতে, শুনতে, বুঝতে। কোথায় কোন প্রান্তে কে একটি নূতন তান, একটি নূতন বাট সংযোজিত করেছেন অমৃতনাথ তা স্বকর্ণে শুনতে ছুটতেন। এমনি ভাবে একবার তিনি এসে উপস্থিত হয়েছেন – ধরুন বেতিয়ায়। উঠেছেন একজন সঙ্গীতজ্ঞের বাড়িতে – মনে করা যাক মনোহরবাবুর ভদ্রাসনে। মুখে মুখে খবর রটে গেল মনোহরবাবুর বাড়িতে এসে ডেরা-ডান্ডা গেড়েছেন অমৃতনাথ। এখানে ওখানে রোজই আসর বসে। মনোহর তাঁর অতিথি বন্ধুকে নিয়ে হাজিরা দেন সঙ্গীত আসরে। এভাবেই কেটে গেল দিন পনের।
তারপর একদিন।
মনোহরবাবুর এক বন্ধু তেওয়ারিজি বললেন, বাবুজি, আপনি মীনাবাঈয়ের গান শুনেছেন কখনও ?
- কোন মীনাবাঈ ? গান শুনিনি, তবে নাম শুনেছি এক মীনাবাঈ-এর। এই
বেতিয়ারই গায়িকা – তবে শুনেছি আজকাল আর গান করেন না তিনি।
- ঠিকই
শুনেছেন। আজকাল আর তিনি গান করেন না। অন্তত গত দশ বছরের
ভিতর তিনি কোথাও মুজরো নেননি। অন্ধ হয়ে যাবার পর।
- অন্ধ
হয়ে গেছেন ? তা তো জানতাম না।
- হ্যাঁ।
স্টোভ বার্স্ট করেছিল। প্রাণে বেঁচে গেছেন, কিন্তু মুখখানা নাকি বীভৎস
হয়ে
গেছে তাঁর। আজকাল আর তাই লোকসমাজে বের হতেই চান না। প্রকাশ্যে
গানও করেন না।
অমৃতনাথ একটি দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বললেন, অতি দুঃখের কথা। আমারও দূর্ভাগ্য ! এখানে এসেই মনোহরকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম মীনাবাঈ-এর কথা। ইচ্ছা ছিল, তাঁর একটি ভজন শুনে যাব। কিন্তু হল না।
মনোহর বললেন, না। উনি আর আসরেই আসেন না। রাজার ব্যবস্থা করা মাসোহারা আছে। তাতেই কোনক্রমে চলে যায়।
আবার একটি দীর্ঘশ্বাস পড়ল অমৃতনাথের।
কিন্তু দিনতিনেক পরেই ফিরে এলেন তেওয়ারীজি। বললেন, সান্যালমশাই, আপনার ভাগ্য ভাল। সেদিন আমাদের যে আলোচনা হয়েছিল কোন সূত্রে তা মীনাবাঈজীর কর্ণগোচর হয়েছে। শুনে তিনি বললেন, অমৃতনাথ আমার গান শুনতে চেয়েছেন, সে তো আমার পরম সৌভাগ্য। বাইরের লোকের সামনে বের হইনা বলে কি ঘরের লোকের সামনেও এ পোড়া মুখখানা বার করব না !
অমৃতনাথের চোখে জল এসে যায়। অচেনা অদেখা অমৃতনাথকে বাইজী ঘরের লোক বলেছেন – আত্মীয়তা কি রক্তের ? আত্মীয়তা ‘রাগ’-এর, অনুরাগের।
- বাবুজি ! মীনাবাঈ তাঁর গরীবখানায় আগামী পরশু সন্ধ্যায় আপনাকে পদধূলি দিতে বলেছেন। আর গুটি আট-দশ সঙ্গীতদরদীকে তিনি নিমন্ত্রণ করেছেন। এটি বোধহয় তাঁর শেষ প্রকাশ্য আসর।
মনোহর বললেন, তা কেমন করে হয় ? অমৃতবাবু যে কাল সন্ধ্যার মেলে ফিরে যাচ্ছেন। টিকিট পর্যন্ত কাটা হয়ে গেছে।
অমৃতনাথ বললেন, না। আমি যাব গান শুনতে। টিকিট ফেরত দিতে হবে। মনোহর বিস্মিত হয়ে বললেন, কিন্তু আপনি যে বললেন কলকাতায় কী একটা জরুরী অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে ?
অমৃতনাথ হেসে বলেছিলেন, তা আছে। কিন্তু সে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ‘বাইরের লোকের’ সঙ্গে।, তাই বলে কি ঘরের লোকের ডাক শুনে ছুটে যাব না ?
বেতিয়া জনপদের গ্রাম-প্রান্তে ছোট্ট একটি বাড়ি। তারই বৈঠকখানায় আসর বসেছে। ছোট্ট ঘর। দশ বারো জন মানুষের ঠাঁই হয় কি না হয়। অমৃতনাথকে সসম্মানে নিয়ে গিয়ে আসরের সামনে এসে বসালেন তেওরারীজি। তাঁর সঙ্গে মীনাবাঈ-এর দীর্ঘদিনের জান-পহ্ চান। অমৃতনাথ বুঝতে পারেন, তেওয়ারীজির মাধ্যমেই বাঈজী সংবাদ পেয়েছিলেন তিনি ওঁর গান শুনতে ইচ্ছুক। সে যাই হোক, একটু পরে পর্দা সরিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন মীনাবাঈ। শিউরে উঠলেন সবাই। যাঁরা ঐ বাঈজীকে আগে দেখেছেন তাঁরা মনে মনে ‘হায় হায়’ করে ওঠেন। এককালে সুন্দরী হিসাবে খ্যাতি ছিল মীনাবাঈজীর – সেই মুখখানা এখন কী বীভৎস হয়ে গেছে ! মাথা নামিয়ে বাঈজী সকলকে আদাব জানিয়ে বললেন, আপ কাঁহা হ্যাঁয় ?
বাঈজী অমৃতনাথের চেয়ে একটু ছোটই হবেন হয়তো। বাহুল্যবর্জিত সজ্জা – রাজস্থানী ঢঙে পরা ! দৃঢ়নিবন্ধ কাঁচুলি ও ঘাগ্রা এবং ওড়না। অমৃতনাথ বুঝে উঠতে পারেন না বাঈজী কাকে খুঁজছেন। কিন্তু ঠিকই বুঝে নিয়েছিলেন তেওয়ারীজি। বাঈজীর হাতখানি তুলে নিয়ে অমৃতনাথের বাহুতে স্পর্শ করান। বাঈজীর সেই দৃষ্টিহীন হাতখানি ওঁর বাহুমূল বেয়ে নেমে এল হাঁটুতে, পায়ে। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল ওঁকে। কেমন যেন কুণ্ঠিত হয়ে পড়লেন অমৃতনাথ।
বাঈজী বললে,
আপ্ মুঝকো আশীর্বাদ নহী কিয়া পন্ডিতজি ?
অমৃতনাথ সংক্ষেপে
বললেন, করেছি। মনে মনে।
- ক্যা
প্রার্থনা কিয়া মঝকো লিয়ে ? দীর্ঘ জীবন ?
- না। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি তোমার সাধনা যাতে সিদ্ধিলাভ করে।
বাঈজী এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর বসল নিজের আসনে। সারেঙ্গী তুলে নিল তার যন্ত্রটা। তবল্চি হাতুড়িটা তুলে নিয়ে ঠুক্ঠাক শুরু করল।
তারপর দীর্ঘ চার পাঁচ ঘন্টা কেটে গেছে। বাঈজী শুরু করল গহরজানের একটি ঠুংরী, খাম্বাজে –
“তনমন
কী সুধ বিসর গঈ
কৈসী বাহাইরে বাঁসরিয়া
জবসে ভনক শুনি কানন মেঁ
তব সে নীদঁ নহীঁ মেরে নৈনু মেঁ
কহে গহর পিয়ারী মন তূ ন লীজিয়ো
মুরলী কী ধুন শুনি বাওরিয়া...”
অমৃতনাথ তন্ময় হয়ে গেছেন। ভুলে গেছেন – কোথায় বসে, কার গান শুনছিলেন, তাঁর মনে হল বাঈজী নয়, শ্রীরাধিকার আর্তি। “আমি তনুমনের বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছি। ও কেমন করে বাঁশী বাজালে তুমি ! যখন থেকে তোমার বংশীধ্বনি শুনলাম তখন থেকে আমার আঁখিপাতে আর নিদ্রা আসে না। গহর বলছেন, মুরলী শুনে তো উন্মাদিনী হয়ে রয়েছ, আর এ পাগলীর মনকে নিয়ে কী করবে ?” তাঁর মনে হল – বুঝি তিনি নিজেই বাঁশ বাজিয়ে ঐ সঙ্গীতজ্ঞাকে উতলা করে তুলেছেন। ওঁর মুরলীধ্বনি শুনে ঐ শ্রীরাধিকা তনুমনের বোধশক্তির কথা ভুলে গেছেম সে বাওরিয়া হয়ে গেছে। উন্মাদিনীর মতো অঝোরধারে কাঁদছে।
চার পাঁচ ঘন্টা সময় কোথা দিয়ে কেটে গেছে কারও খেয়াল নেই। সেই মারাত্মক দুর্ঘটনার পর – গত পাঁচ বছর ধরে মীনাবাঈজী এমন প্রকাশ্য আসরে গান গায়নি ; পাঁচ বৎসরের পুঞ্জীভূত সঙ্গীত রসধারা আজ রাত্রে যেন লকগেটের বাঁধ ভেঙ্গে উছল্ধারায় বয়ে চলেছে। সমস্ত আসর বুঁদ হয়ে গেছে। মধ্যরাত্রে সঙ্গীত শেষ করলেন মীনাবাঈ। সারা আসর ‘হায় হায়’ করে উঠল। মীনাবাঈ তার অন্ধ দুটি দৃষ্টি সামনের দিকে মেলে প্রশন করল, ক্যা পন্ডিতজি ? আপ্ কুছ নহীঁ বোলা ?
সকলেরই দৃষ্টি গেল সেদিকে। অমৃতনাথ যেখানে বসেছিলেন সে স্থানটা শূণ্য। সকলে যখন সঙ্গীতরসে আত্মহারা, বাহ্যজ্ঞানহীন, তখন নিঃশব্দে তিনি উঠে চলে গেছে। ব্যাপারটা বিশ্বাস হল না কারও ! একটু এদিক ওদিক খোঁজখবরও করা হল – কিন্তু না, অমৃতনাথের জুতোজোড়াও নেই – দরজার পাশে হেলান দিয়ে রাখা ছিল যে শৌখিন হাতির দাঁতের মুঠওয়ালা ছড়িটা সেটাও অন্তর্হিত। ক্ষুব্ধ হল সবাই অমৃতনাথের অসৌজন্যে – নিমন্ত্রিত অতিথি তিনি; বস্তুত তাঁকে উপলক্ষ করেই এ আসরের আয়োজন। এ ক্ষেত্রে গৃহস্বামিনীকে কোন কিছু না বলে এভাবে নীরবে তাঁর স্থানত্যাগ রুচিবিগর্হিত। মনোহর এবং তেওয়ারীজি অমৃতনাথের হয়ে বারে বারে গৃহস্বামিনীর কাছে মার্জনা ভিক্ষা করতে থাকেন।
কিন্তু সে কথায় কর্ণপাত করল না মীনাবাঈ। যত বড়ই সঙ্গীতাচার্য হোন না কেন, এভাবে কেন তিনি অপমান করলেন বাঈজীকে ? যদি তাঁর ভাল নাই লেগে থাকে তাহলে তাঁর উচিত ছিল সৌজন্যের নির্দেশে আসর শেষ হওয়া না পর্যন্ত অপেক্ষা করা। মীনাবাঈ বলে, নহীঁ জী ! ম্য্য নেহী মান্লি। টাঙ্গা বোলাইয়ে – ম্যয় খুদ যাউঙ্গি পন্ডিতজিকো পাস। মুঝে সমঝ্না চাহিয়ে কি কেঁও পন্ডিতজিনে –
ওঁরা বারে বারে বোঝাতে থাকেন মধ্যরাত্রি অতিক্রান্ত। এত রাত্রে কী হবে অতটা ধাওয়া করে। কাল সারাদিন তো অমৃতনাথ আছেন বেতিয়াতে, সন্ধ্যায় ট্রেন ধরবেন – এ ক্ষেত্রে কাল সকালে বাঈজী অনায়াসে ও সংবাদটা সংগ্রহ হরতে পারেন। কিন্তু কে কার কথা শোনে ? অভিমান-ক্ষুব্ধা বাঈজী কারও কথা শুনল না – সে জানতে চায়, কোথায় তার ত্রুটি হল। কেন এভাবে আসর ত্যাগ করে গেলেন অমৃতনাথ।
মনোহরের বাসায় যখন টাঙ্গাটা এসে পৌঁছল তখন রাত একটা। অমৃতনাথ জেগে ছিলেন। আলো নিভিইয়ে অন্ধকারে চুপচাপ বসে ছিলেন। ফেরার পথে একটানা এতটা রাস্তা হেঁটে এসেছেন। এখন অপরাধবোধে ভুগছেন। ওরা কি ভাবল ? কী কৈফিয়ত দেবেন বন্ধু মনোহরকে ? ঠিক তখনই স্তব্ধ রাত্রির নীরবতা ছিন্ন করে গেটের ভিতর ঢুকল টাঙ্গা। মনোহর ফিরে এসেছেন। কী বলবেন তাঁকে ?
অমৃতনাথ উঠে এলেন বারান্দায়। এসেই স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি। তেওয়ারীজির হাত ধরে টাঙ্গা থেকে নেমে আসছে অন্ধ গায়িকা মীনাবাঈ। নিঃশব্দে এগিয়ে এলেন অমৃতনাথ, কিন্তু যতই নিঃশব্দে অগ্রসর হন দৃষ্টিহীনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে দিলে অপরাধী নীরবে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। সরাসরি প্রশ্নটায় নেমে এল বাঈজী। বললে, অব্ বাতাইয়ে –ক্যেঁও ?
এতক্ষণ অনুশোচনায় ভুগছিলেন, কিন্তু এখন এভাবে মধ্যরাত্রিতে বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করে এসে কৈফিয়ত চাওয়ায় অমৃতনাথ একটু ক্ষুব্ধ হলেন। হিন্দীতে বললেন, বাঈজী, আমার অপরাধটা কি এতই গুরুতর যে, এত রাত্রে আমার কৈফিয়ত নিতে এসেছ ?
- জী হাঁ ! তবে আপনি আসর ছেড়ে উঠে আসার জন্য আমি কৈফিয়ত চাইতে আসিনি – আমি জানতে এসেছি – কেন আপনি ব্রাহ্মণ পন্ডিতজি হয়ে আমাকে ঝুটা আশীর্বাদ করলেন !
- ঝুটা
আশীর্বাদ ! তার মানে ?
- যার গান শুনে শ্রোতা পালিয়ে বাঁচে তার সঙ্গীত-সাধনা কোনদিন কী সিদ্ধিলাভ করে ?
অমৃতনাথ ম্লান হয়ে গেলেন ! এ অভিযোগের কি উত্তর দেবেন ? শেষে দৃঢ়কন্ঠে বললেন, বিশ্বাস কর মীনাবাঈ, তোমার গানের কোন ত্রুটির জন্য নয়, সম্পূর্ণ অন্যু কারণ আমি উঠে আসতে বাধ্য হয়েছি। ত্রুটি তোমার নয়, আমারও নয়... কিভাবে তোমাকে বোঝাব ?
মীনাবাঈজী তার অন্ধ দুটি চোখ মেলে বীভৎস মুখটা মাড়িয়ে ধরে বললে, পন্ডিতজি, আপনি কি বুঝতে পারেন না – না বুঝে গেলেও আমার চলবে না। আজকের এই ঘটনাটা, আজকের এই অসাফল্য জিন্দেগীভর আমার মনে কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকবে ?
অমৃতনাথ অনেকক্ষণ জবাব দিলেন না। তারপর মনস্থির করে বললেন, তুমি ঠিক বলেছ মীনাবহি্ন ! সব কথা আমাকে অকপটে স্বীকার করে যেতে হবে। না হলে জিন্দেগীভর এ-কথাটা আমার মনেও কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকবে। শোনো ! তোমার গান শুনে প্রথম থেকে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। এমন ‘দরদ্ভরি গানা’ আমি বহু-বহুদিন শুনি নি। আমার মনে হচ্ছিল – এটা বেতিয়া নয়, বৃন্দাবন ! আমি অমৃতনাথ নই, আমি সেই বংশীওয়ালা ! আর তুমি আগুনে পুড়ে আজ খাঁটি সোনা হয়েছ – তুমি সেই বিরহ-কাতরা গোরোচনা গোরি ! আমি... আমি নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না ! ... তারপর তুমি খাম্বাজপিলুতে ঠুংরি ধরলে –
বোলো
মোরে রাজা
কাঁহা
গোঁয়ারি সারা রাতিয়া।
সোতনকে
সঙ্গ্ হাসত খেলত তু
হাম সঙ্গ, করত রুঠি রুঠি বাতিয়া।।
- তখন আমার মনে হল – তাই তো ! আমার এমন শ্রীরাধিকাকে ত্যাগ করে আমি কেন ঝুটো মুক্তো নিয়ে পড়ে আছে। সম্মোহিতের মত আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম – আসরে কেউ খেয়াল করেনি। সেই খন্ড-মুহূর্তেই যদি আমার চেতনা ফিরে না আসত তাহলে হয়তো পর মুহূর্তেই আমি ছুটে গিয়ে তোমাকে আলিঙ্গনপাশে আবদ্ধ করতাম ! হয়তো চুম্বন করে বসতাম তোমাকে ! বিশ্বাস কর বহিন্জি – আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কেউ আমাকে লক্ষ্য করছে না দেখতে পেয়ে – অশালীন কিছু করে বসার আগেই পালিয়ে এসেছি।
দগ্ধাননী মীনাবাঈয়ের দুটি অন্ধ নয়নে তখন নেমেছে দুটি জলের ধারা। মুহূর্তে সে লুটিয়ে পড়ে ব্রাহ্মণের চরণতলে। ওঁর পায়ে অশ্রুআর্দ্র মুখটা নামিয়ে দিয়ে বললে, পন্ডিতজি ! তুমি আজ আমাকে যা দিলে – কোন রাজা-মাহারাজা আমাকে তার চেয়ে বড় পুরস্কার দিতে পারেনি !” - ( কৃতজ্ঞতা – নারায়ণ সান্যাল মশাই এর লেখা “পঞ্চাশোর্দ্ধে” )
এবারে ওনার সেই
বিখ্যাত বই “স্মৃতির অতলে” থেকে কিছু শোনাই। বাঙলা ভাষায়
এমন নিপুণ শব্দবন্ধে সঙ্গীত সম্পর্কেও যে লেখা যায় তা একটু না শোনাতে,পারলে আমার শান্তি
নেই যে। বাঙলা, উর্দু, ফার্সি এসব শব্দ কি অনায়াস দক্ষতায় উঠে এসেছে তাঁর রচনায়।
বইখানার ভূমিকা-র
অংশ দিয়েই শুরু করি –
“......বাস্তবিক স্মৃতির অতলে
রচনাগুলি লিখে গিয়েছি ব্যক্তিগত দলিলেরই মতো। প্রতিটি অক্ষর যেন সাক্ষীর স্বাক্ষর
; সরকারী শীল-মোহরের প্রয়োজন বধ করিনি। ভিতরকার কথা খুলে বলতে হয়। কিছুদিন যাবৎ মন
আমাকে ব’লে আসছিল, সে নাকি
অন্তরের মধ্যে,—খাস করে’ স্মৃতির অতলে ছোট ছোট দেবোত্তর
সম্পত্তির সন্ধান পেয়েছে। খোদ্ মালেক নাবালগ্ অর্থাৎ চিরকিশোর ; তাই হবে বুঝি ; কারণ
দেবতারা’ই চিরকিশোর
! অলক্ষ্যে রয়েছেন সেই দেবতা, যেন কূট সাক্ষী
হয়ে ; আর আমাকে রেখেছেন বেনামদার করে। মন ইচ্ছামত খাজনা প্রভৃতি এনে দেয় আমার কাছে,
আর সম্পত্তিগুলির তত্ত্বাবধান করতে থাকে, যদিও আসল তত্ত্বের সাক্ষাৎকার হয়নি এ পর্য্যন্ত।
মন ক্রমশঃ বুড়ো হয়ে পড়ছে ; বলে—“আমি
আর কতদিনই বা থাকব। সময় থাকতে থাকতে এসব গোলমেলে
সম্পত্তির সম্বন্ধে দলিল লিখে ফেল, যেমন বলে যাই আমি।” তার কথামত দলিল লিখে যাই। খাজনা
ওগায়রহ্ যখন আমিই ভোগ করছি, তখন দলিলে সই করতে হচ্ছে আমাকেই। যাঁর হয়ে বেনামদার আমি,
তাঁর কাছে হিসেব দাখিল করতেই হবে একদিন। বিশেষ করে, ভয়ের খবরও কিছু পাচ্ছি। আমি ত আলস্য-বিলাসী।
মনের মতো কর্মকুশল আর সন্ধানচতুর নায়েবেরও অজ্ঞাতসারে নানারকমের অতীতের ভূতেরা নাকি
ফল-ফুলের বাগান নষ্ট করে দিচ্ছে, হুটোপুটি ক’রে
; সম্পত্তির সীমানাগুলিও নাকি ভেঙ্গে ফেলেছে লুট-পাট করে। অতএব আর দেরী নয়। মনের কত্থা
যেরকম শুনে যাচ্ছি, তাতে বোধ হচ্ছে, মৌজুদ্দিন আদি করে নামগুলি অতলের খাস-দখল সম্পত্তির
এলোমেলো ভাঙ্গা-জোড়া চৌহদ্দির নাম-নিশানা বই আর কিছু নয়।
............যাঁরা ইতিহাসঘটিত জরীপ জমাবন্দী করে অতীতের দাম কষেন, তাঁরা এরকম দলিল দেখে বিষণ্ণ হয়ে পড়বেন, হয় ত ! কিন্তু নাচার আমি। আপাততঃ যা সম্ভব আমার পক্ষে, তারই চেষ্টা করছি। বিদেহী গুণীদের লক্ষ্য করে স্মৃতির পুষ্পচন্দন নিবেদন করতে গিয়ে ইতিবৃত্ত অংশ অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। রূপ রস শব্দ প্রভৃতির অনুবাসনা এসে পড়ার কারণে ইতিহাসের মর্যাদাও ক্ষুণ্ণ হয়ে পড়েছে সম্ভত। তবুও এ সব স্বয়মাগত নৈবেদ্যকে “ন স্যাৎ”এর বিধিলিং দিয়ে ঝুড়ি চাপা দিতে পারিনি, দলিলের অধিকার থেকে সরিয়ে দিতে পারিনি।”
ভারতীয় রাগসংগীতের ওপর এমন অপূর্ব পদ্ম-পাপড়ির মতো শব্দযোজনা আমি অন্ততঃ পড়িনি এই বইখানা পড়বার আগে। এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করেছিলাম এই চটি বইখানি। উপহার হিসেবে দিয়েছিও অনেক বন্ধুকে। জানিনা তাঁরা কি বলবেন ! এই বইটার নাম আমার চোখে পড়েছিল আমার অত্যন্ত এক প্রিয় লেখক শ্রী বুদ্ধদেব গুহ মশাই-এর একটি লেখা থেকে। তারপর, কলেজ স্ট্রীট পাড়া ঢুঁড়ে জোগাড় করেছিলা খানকয়েক কপি। কেন যে এসব বই স্মৃতির অন্তরালে লুকিয়ে থেকে যায় কে জানে !
এবারে শোনাই একটু খেয়াল গানের বর্ননা। আমি সঙ্গীত সমঝ্দার নই। তাই এই রাগ সঙ্গীতের বিভিন্ন টার্মের সাথে আমার কোনোই পরিচয় নেই। কিন্তু বাঙলা ভাষার সাথে কিঞ্চিৎ পরিচয় তো হয়েছে, আর তাতেই মনে হয়েছে যে রাগসঙ্গীতের এমন মনোগ্রাহী বর্ননা পড়ে আর পড়িয়েও আমার শান্তি।
মৌজ্দিন এর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমিয়নাথ লিখছেন –
“মৌজ্দিনের সঙ্গত্ করার জন্য বসলেন বাবুজী ও বশীর হার্মোনিয়ম নিয়ে ; গিরিজাবাবু নিলেন তম্বুরা ; সারেঙ্গী বেঁধে নিলেন বেঁটে গোলগাল চেহারা ইমদাদ খাঁ সারেঙ্গীয়া, যিনি গণপতরাও সাহেবের ঘরের তান কর্তবে অভ্যস্ত, এমন কি সুপটুই ছিলেন এবং গহরের সঙ্গে সংগত করতেন ; আবেদ্ হুসেন খাঁর ঘরের শিষ্য আলিকদর তবল্চি,--চুলবুল্লেওয়ালী মাল্কাজান্ বাঈজীর ভাই,--ইনি, ডুগী-তবলা ধরলেন।
যথারীতি গান আরম্ভ হ’ল। মৌজ্দিন আরম্ভ করলেন “এ অবতো রুত্মানে আয়ে” পুরিয়া-ধানশ্রীর ঢিমা আস্থায়ী। এর পরে ধরলেন “সাঁবরো তু মেরি” দিন্-কি-পুরিয়ার মধ্যলয়ের আস্থায়ী এবং খেয়াল অঙ্গ শেষ করলেন “ডাল ফুল ফল” পরজ-বাহারের বিচিত্র গান দিয়ে।
শেষের গানটির মধ্যে পরজ ও বাহার ছাড়াও অনেক রাগের এত বিচিত্র সংস্পর্শ ও অপ্রত্যাশিত ছায়ার সৃষ্টি হচ্ছিলে যে, মৌজ্দিন, বাবুজী, বসির ও ইমদাদ এঁরা কেউই পরিবেশন থেকে বিরত হতে পারছিলেন না। বাবুজী আগে নতুন রাগের ছায়া দেখান মাত্রই, মৌজ্দিন তাঁর অসামান্য প্রতিভা দিয়ে রাগের অভিনব লতাবিতান রচনা করছিলেন এবং অদ্ভূত সামঞ্জস্যের শৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ফিরে আসছিলেন পরজের উপক্রমণিকায়। বুঝলাম—‘বাহার’ বলতে ‘বাহার’ রাগ নয় ; বাহার অর্থে বিচিত্র শোভা। ঠিক এ রকম গান আর শুনিনি। অথচ একে ‘রাগমালা’ বা ‘সাগর’ও বলা যায় না।
যাই হ’ক—সুর ও রসের দিক দিয়ে অনবদ্য হয়েছল পুরিয়া-ধানশ্রীর গানটি। এখানেও মর্মে মর্মে অনুভব করলাম—মৌজ্দিনের কণ্ঠমাধুর্য ও রচনা-চাতুরী ; আরম্ভেই ছিল রেখব-ষড়জ-নিখাদের একটি কন্ (সুরের কণা) ; সপ্রেম অভিমানের একটিমাত্র কটাক্ষের মতো তীব্র সতক অথচ মধুর ! আর এর পরেই ছিল সেই উদারার নিখাদ থেকে মুদারার কোমল ধৈবত পর্যন্ত একটি মীড় ; অভিমানের অন্তেসঞ্চিত যেন হৃদয়ের সঞ্চিত মাধুর্য উছলে পড়েছে একটি মাত্র অশ্রুরেখার মধ্যে ! মৌজুদ্দিনই এমনতর অনুভব আস্বাদন করিয়ে দিয়েছিলেন, যেটা কানে আর মরমে বেজে ওঠে এখনও। সমস্ত গানটি মনে হচ্ছিল রসে আপ্লুত ; মুহূর্তের জন মনকে অন্য কাজে লাগাতে পারিনি। গয়াতে যেমন, কলিকাতাতেও তাই ; মোজ্দিন, মৌজ্দিনই আছে এবং তার নাগাল পাওয়া অসম্ভব।”
আসি ফৈয়াজ খাঁ প্রসঙ্গে –
“......অকস্মাৎ মুহূর্তের ভ্রমরগুঞ্জন আমাদের কানে এল। প্রস্তুত হতে না হতেই আমাদের প্রত্যাশার চরমকেও ছাড়িয়ে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হল “রকীব্সে যো উয়ো” চরণটি। শেষের শব্দ যখন পঞ্চম স্বরে এসে স্থির মাধুর্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন মনে হল সুরের আলো জ্বলে উঠেছে। অন্ধকারে জোনাকির চিকিমিকি নয়, এ যেন মেঘনির্মুক্ত চন্দ্রপ্রভা ! ননী ও আমি বিস্ময়ে আনন্দে বিমোহিত হয়েছি।
এত ভাবও কি লুকিয়ে ছিল মাত্র তিনটি শব্দের মধ্যে ! অথবা এতখানি সুর ও দরদই বুঝি লুকিয়েছিল ঐ অশ্রুতপূর্ব কণ্ঠে, ঐ অজ্ঞাতপরিচয় হৃদয়ে ! এ তো কাঁচা সুরনবীশের কণ্ঠ নয় ; এ তো গানের অভিনয় নয়। গানের কার্বণ-কপিও নয় ! আমার কথা বাদ দিলাম, আমার হৃদয় দুর্বল। সুরের দরদ নিয়ে শব্দের একটিমাত্র পাপড়ি খুলে গেলে আমায় গান শোনার নেশা ধরে, তা যে কোন গানই হোক। কিন্তু ননী ছিল সেই ধরণের লোক, যার চোট খেলেও সহজে বেদনা স্বীকার করে না। সেও দেখি, ঐ পঞ্চমের আবাহনে আত্মসমর্পণ করেছে। আর মাল্কা ! তাঁর স্নিগ্ধ শান্ত অথচ সাভিলাষ দৃষ্টি কোথায় যেন চলে গিয়ে স্তব্ধ হয়েছে। এক একটি সুর এসে কাউক নিয়ে যায় সুরের অনন্তে, কাউকে বা নিয়ে যায় বিস্মৃত অতীতের দিগন্তে।
শব্দের পর শব্দের পরাগ সঞ্চয় করে নিয়ে সুরের পর সুরে তিনি এগিয়ে চলেন অনায়াসে। ধৈবত ও কোমল নিষাদের চক্ত নক্শা সেরে নিয়ে ফিরে এসে সমাহিত হলেই পঞ্চমে, “অরতে হ্যাঁয়” ধ্বনির মধ্যে। মনে হল যেন বসন্ত তিলকের রহস্য সঙ্গে করে’ ফুলের এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে এসে ভ্রমর বসল ফুলেরই উপর। সে পঞ্চমের কি স্ফূর্তি, কত শোভা ! ভীমপলশ্রী রাগের যত মধু, সবই বুঝি উজাড় করে ঢেলে দিল ঐ পঞ্চমের ধ্বনি ; যত সৌরভ, সবই বুঝি উন্মত্ত হয়ে ছুটে বেরুল ঐ পঞ্চমের শ্রুতিধারায় !
নিখুঁত সুরে একটি ছোট্ট ফিরৎ, একটি মোলায়েম ঝট্কা দিয়ে দ্বিতীয় চরণটি দুলিয়ে দুলিয়ে নিয়ে এসে তিনি দাঁড়ালেন সুরে। পঞ্চম নেপথ্যে অন্তর্হিত হয়েছেন ; মধ্যম, গান্ধার, রেখবও ক্ষণিকের গোপন রহস্য জানিয়ে চলে গিয়েছে। সুর এসে দাঁড়িয়েছে বিস্ময়ের বাণী মাত্র বহন করে তবুও মনে হল যেন গানের ফুলটি তখনও দুলছে সেই পঞ্চমের আবেগে ; যেন জানিয়ে দিচ্ছে তার অতৃপ্ত বাসনা, “আবার এসো, পঞ্চমকে সার্থক করো, সে পিপাসা তো মেটেনি।
গজল গানের নিয়মধর্ম পালন করে প্রথম চরণের পদাঙ্কগুলি অনুসরণ করে তিনি আরম্ভ করলেন তৃতীয় চরণটি। পঞ্চমে সেই ক্ষণিক আবেশ, স্বপ্নের সেই লুকোচুরি। কিছু ঘুরে ফিরে এসে সেই পঞ্চমেই যেন সম্ভোগের পূর্ণাহুতি ! এবার চতুর্থ চরণে ফিরে এলেন তিনি, খণ্ড খণ্ড সুরের আরতিচক্র করে ; যেন সম্মোহনী লীলার শেষে সুরে বিশ্রান্তি হল। পঞ্চমের সেই বিলাস, তার সুগন্ধ, তার আকৃতি, সব কিছু ঝরে গিয়েছে ফিরবার পথে, মধ্যম-গান্ধার রেখবের ত্বরিত তর্পণের অন্তরালে ! সুরে এসে দেখা দিল যেন খণ্ডিতার অচিরসঞ্চিত বেদনাবশেষগুলি ! নিরাশ হৃদয়ে রেখে গেল শুধু একটি তৃষ্ণা, একটি সঙ্কেত, - যাদের সার্থক করতেই হবে হানের গহনে, সুরের পথ, নূতন বাণীর সাজে, নূতন অভিসার দিয়ে। বর্তমানের বিরতি অর্থ ভবিষ্য আরতির নূতন বর্তিকায় নূতন আকাঙ্খার অগ্নিস্পর্শ।”
আমি শুধু আমার স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’দের একটু পরিচয় করাতে চাইছি এই সময়ে দাঁড়িয়ে। আর কিছুই না ! এই সব লেখনী’র সাথে পাঞ্জা দেবার স্পর্ধা বাতুলতা, তাই এত কোট-আনকোটের ভীড়। আমি চাই, এ বইগুলো, এ চরিত্রগুলো পাঠক আত্মস্থ করুক নিজের হৃদয়ের তাগিদে, বাঙলা ভাষার অপরূপ সুষমাকে চোখ ভরে দেখে নিক। সেই হবে আমার সবকিছু।
শেষ করবো কালে খাঁ’র স্মৃতি নিয়ে :
“...... সে বৎসর, অর্থাৎ ইং ১৯১৪ সালের বর্ষার এক সন্ধ্যা ; শ্যামলালজী ও আমরা অল্প কয়েকজন বসে ; মনে পড়ছে বাবুজী, তন্নুলালজী ও চিরঞ্জীবকে মাত্র। বাবুজী ফরাস ছেড়ে পৃথক্ আসনে গড়গড়ায় তামাক সেবন করছেন। তাকিয়াকোলে তন্নুলালজী বাবুজীকে সাময়িক সংবাদ গোচর করাচ্ছেন। চিরঞ্জীব তার পোষা হারমোনিয়ামটি নিয়ে, হাত সাধবার আগে পান ও কিমাম ব্যবহার করতে লেগেছে। বদল্ খাঁ সাহেব অনুপস্থিত, বর্ষণের কারণে। গিরিজাবাবু ( প্রসিদ্ধ গায়ক গিরিজাশঙ্কর চক্রবর্তী ) বার হয়ে গেলেন বর্ষা মাথায় করে।
এমন সময়ে ভিজে গায়ে এসে উপস্থিত হ’ল ঠাণ্ডীরাম। তার দু’গালে পান বোঝাই করা। কথা বলার উপায় নেই তার ; কথা বললেই বিপদ ; অমৃতবিন্দু মুখ থেকে ছিটকে পড়বে বাবুজীর তিরষ্কার শুনতে হবে। নিঃশব্দে নমষ্কার জানিয়ে ঠাণ্ডীরাম উবু হয়ে বসল ফরাসের উপর ; ঐ রকমই ছিল তার আসন পরিগ্রহ করার কায়দা। ......”
এর মধ্যে ‘বাবুজী’র’ কথা অনেকবারই উল্লিখিত হয়েছে। মার্জনা করবেন। আমার আগেই বলা উচিৎ ছিল। আসুন, পরিচয় করিয়ে দিই এই ‘বাবুজী’র’ সাথে – খোদ অমিয়নাথে’র বর্ণনা থেকেই –
“ ইংরাজী ১৯১২ সাল থেকে আরম্ভ হল কলিকাতার সঙ্গীত-স্মৃতির নূতন দিগন্ত। সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতার সুখ-স্মৃতি বহন করে নিয়ে আসে কয়েকটি বড় বড় নক্ষত্রব্যুহ ও আশে-পাশের তারকাবীথিগুলি। স্বয়মাগত স্মৃতির মধ্যে স্পষ্ট ও প্রধান হয়ে দেখা দেয় মহারাজ নাটোরের ভবনে গুণী সমাগম, আমার সঙ্গীতগুরু শ্যামলাল বাবুজীর সঙ্গীত-তীর্থ...।
গুরুদের শ্যামলালজীকে কেন্দ্র করে গুণীদের জমায়েৎ হত ১০১ নং হ্যারিসন রোডের বাড়ীর দ্বিতল প্রকোষ্ঠে। কাঁচের কাজকরা মেঝের উপর সতরঞ্জি, তার উপর পরিষ্কার সাদা চাদর এবং গুটিকয়েক তাকিয়া ; দেয়ালের সংলগ্ন কয়েকটি আয়না-বসান আলমারী এবং মাথার উপর বিজলী-বাই ও পাখা ; - এই নিরীহ সাধাসিধা আসরে সকালে ও সন্ধ্যায় জমে উঠত বিচিত্র রকমের গুণীসঙ্গম। প্রধানতঃ চর্চা হত গীত বাদ্য নৃত্যের উৎকৃষ্ট পরিচয়গুলির ; প্রাসঙ্গিকভাবে ও কথোপকথনের ছলে উপভোগ হত কাব্যশিত্য ও কিম্বদন্তীর রূপগুলির। শ্যামলালজী ছিলেন জ্ঞানী, রসিক, সংযতবাক ও আজীবন ব্রহ্মচারী। উচ্ছল ও সানন্দ অভ্যর্থনা দিয়ে তিনি সকলকে আপনার করে নিতেন। কুশল প্রশ্ন ও বিদগ্ধ আলাপের মধ্যে দিয়ে আপ্যায়িত করতেন গুণীদের ; অনুগৃহীত করতেন তাঁদের যথাযোগ্য পরামর্শ দিয়ে ও যথাসাধ্য সাহায্য করে। বৈঠক থেকে ফিরে যেতেন সকলেই সেই শুদ্ধ শিষ্ট সত্তার প্রভাব নিয়ে। এখানে ফিরে আসার কারণের ঘটত না।
আমার জীবনে ঠিক এ রকমের সমাগম আর দেখিনি। সেই সাদা ফরাসের উপরেই বিভিন্ন সময়ে আসন গ্রহণ করেছেন সঙ্গীতের মূর্তিমান্ বিগ্রহ গণপৎ রাও ভাইয়া সাহেব, খলিফা বদল্ খাঁ সাহেব, মৌজুদ্দিন, কালে খাঁ সাহেব, আল্লাদিয়া খাঁ, চন্দন চোবেজী, রাধিকামোহন গোস্বামী, মুস্তাক হোসেন খাঁ সাহেব, সজ্জাত হুসেন, জনাব মির্জা সাহেব, দিল্লীর মীর সাহেব, গহরজান বাঈজী, আগ্রাওয়ালী মাল্কাজান বাঈজী, চুল্বুল্লেওয়ালী মাল্কাজান বাঈজী, জদ্দন বাঈজী, তখনকার উত্তর-ভারতের শ্রেষ্ঠ নৃত্যপটিয়সী চৌধুরাণ বাঈজী, সরোদিয়া ফিদা হুসেন খাঁ, আলাউদ্দীন খাঁ ও হাফিজ খাঁ সাহেব, ইমদাদ খাঁ সাহেব, বীণকার মজিদ খাঁ ও হাফিজ খাঁ, হারমোনিয়ামে সেরা শিল্পী বশীর ও জঙ্গী, শম্ভূপাখাওজী, ন্যাটা আব্দুল, বীরু মিশ্র ও আবেদ্ হুসেন খাঁ সাহেব প্রভৃতি বিচিত্রকর্মা কলাকুশলী। প্রসিদ্ধ গিতশিল্পী গিরিজাবাবু, যিনি প্রথমে রাধিকা গোস্বামীর ও পরে গণপত রাও সাহেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তখনও শ্যামলালজীর পক্ষপুটের আশ্রয়ে সাধনা করছেন। প্রায় নিত্যকার সভাসদ্দের মধ্য বদল্ খাঁ সাহেব, হুকিমজী, ঠুমরীর অদ্বিতীয় সমঝদার তন্নুলালজী এবং আরও কয়েকজন অন্তরঙ্গ গুণগ্রাহক সন্ধ্যার আসরে এসে জমতেন এবং রাত দশটা বা এগারোটায় ফিরতেন।”
আশা করি এর পরে আর বিস্তৃতির অপ্রয়োজন। ফিরে যাই কালে খাঁ’র প্রসঙ্গে :
“...খাঁ সাহেব তম্বুরার সুর অদল বদল করে নিয়েছেন, খরজের তার খরজে আর পঞ্চমের তার মধ্যমে। আসর গম্গম করতে থাকে যুগল তম্বুরার সুর—মধ্যমের মধুর সংবাদে। বিশ্বনাথজী বল্লেন, “আমাদের খাঁ সাহেব তো মালকৌশে সিদ্ধ !” আমি ভাবলাম সিদ্ধির আর কী নমুনা বাকী থাকতে পারে ! সত্য সত্যই খাঁ সাহেব আরম্ভ করলেন মালকৌশ রাগের একটি পদ “পগ্লাগন দে”, মধ্য লয়ের তেতালায় আর বিনা উপক্রমণি্কায়। জীবনে এই গানটি প্রথম শুনলাম। পরেও শুনেছি কয়েকবার, কিন্তু প্রথম পরিচয়টি যেন শেষ পরিচয় হয়ে আছে, এ পর্যন্ত সময়ে।
আরম্ভেই মুদারার মধ্যমস্বরে দুই গমকের মাণিকজোড়। পরেই একটি সূত্, যেন সুরশৃঙ্গারের ধ্বনির মতো চিকণ উজ্জ্বল রেখা নীচে নেমে এসে উদরার কোমল নিষাদের চারিদিকে কুণ্ডলী পাকিয়ে নিষাদকে কয়েদ্ অরেই নিয়ে চলে যায় কোমল ধৈবতের অপ্রমেয় সীমান্তে। এর পরেই বাণী ও সুর একসঙ্গে সপ্রতিভ সঞ্চারে ফিরে এসে দাঁড়ায় ষড়্জে ; সমের মন্দিরে রাগবিগ্রহের অধিষ্ঠান হয়ে যায়। ঐ জোড় গমক আর সূতে সুচারু চরণক্ষেপ আর প্রকাশভঙ্গিমা ত ভুলতে পারিনি। পরে মজিদ খাঁ সাহেবের বীণাবাদন শুনে মনে মনে তর্ক করেছি, বীণ্কার গুণীরাই কি গায়ক গুণীদের কণ্ঠ থেকে কিছু কিছু ধ্বনি তুলে নেন তাঁদের আঙ্গুলে ? না, কি গুণী গায়কেরাই বীণাবিনোদলহরীর কিছু অমৃত আকণ্ঠ পান করে সঞ্চয় করেন হৃদয়ের আধারে, গীতসুধার অভিনব ধারায় যেটা উছলে পড়ে গানের সময়ে ? রামের গুরু শিব না শিবের গুরু রাম ! মজিদ খাঁ সাহেবকে, কালে খাঁ সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, কালে খাঁ সাহেবকে তিনি ত জানেন না, তিনি বন্দে আলি খাঁ সাহেব বীণ্কারের শাগিরদ্। যাই হ’ক এসব কথা ভাবতে ভাবতে পরে মনে হয়েছে, এঁদের মধ্যে কে উত্তমর্ণ আর কে অধমর্ণ, এ বিষয়ে পাছে তর্ক কলহ হয়, এ জন্যই ত দেবী সরস্বতী একাধারে বাগ্বাদিনী ও বীণাধারিণী হয়ে আমাদের ধ্যানে আবির্ভূত হন ; ঐতিহাসিক তিজ্ঞাসার তিমির অপসৃত হ’ক আমাদের চোখের সামনে থেকে। প্রতিভা বস্তুটি ধার করা যায় না, ধার দেওয়া যায় না। উপস্থিত, কালে খাঁ সাহেবের কণ্ঠের সূত-গমকের লহরী উছলে পড়ে স্মৃতির মধ্যে ; যেন প্রণয়ী-জনের ওমল করাবঘাত সঙ্কেত দিয়ে স্মৃতির লহরী বলতে থাকে – আপাতত রমণীয় বস্তুর দিকেই তোমার লক্ষ্য রাখো, ইতিহাসের শুষ্ক হাস্য তোমার কাজে লাগছে না।
সঙ্কেতটা বুঝেই কালে কাঁ সাহেবের গানের দিকে মন দেই। কিন্তু এ কি ! ‘পগ্লাগন দে’ দিয়ে আরম্ভ করা মুহরাটি কায়েম হতে না হতেই একটি সপাট তান হয়ে গেল তড়িৎগতিতে। এর পরে গানের পূর্ণ স্থায়ী পদটি দেখা দিল যেন ঝড়ের আগে কাক-চিলের মত ; যে যেমন করে পারে, সেই অন্য শব্দগুলি এলোমেলো হয়ে পালিয়ে ঘরে ফিরতে পারলে যেন বাঁচে, এমন তাদের অবস্থা ! হঠাৎ এমন ভাবে সুরের ঝড় উঠ্ল যে, অন্য কথাগুলি তাদের রূপ বজায় রেখে পরিচয় দিতে পারল না ! খাঁ সাহেবের হৃদয়ে সুর আর ছন্দের একটা অভিনব উত্তেজনা এসেছে বুঝলাম তাঁর চোখ-মুখের উদগ্র উল্লসিত ভাব দেখে, তাঁর কণ্ঠধ্বনির আকুল আবেদন অনুভব ক’রে। সাধারণত মধ্যলয়ের ছন্দে গানের আর সঙ্গতের গুরুলঘু শব্দগুলি শ্রোতার মন মাত্রার একটা চেতনা জাগিয়ে রাখে ; নিয়ম-নিষ্ঠার মধ্যে দিয়েই শ্রোতার মনে আশা আর প্রত্যাশাগুলী আনাগোনা করে ; কাল পূর্ণ হলে চলে যায়, আবার ফির আসে এরা। গানের আরম্ভেই ধ্বনি আর ছন্দের এই আশা-প্রত্যাশাগুলি যেন তালগোল পাকিয়ে যায়। খাঁ সাহেব তাদের পিষে বেটে রগড়ে সুর আর ছন্দের নূতন সাজে সাজিয়ে রচনা করতে থাকেন রূপগুলু ; আর বিদায় করে দেন মুহূর্তের মধ্যে। আমাদের মনপ্রাণ ভরে গেল সুর অ ছন্দের মধুর উতরোলে। কথাগুলি এল, কি এল না, কি চলে গেল, এদিকে আমাদের কানই নেই। ঝড়ের সৌন্দর্যে যখন প্রাণ ভ’রে ওঠে, তখন কি প্রজাপতির সুযোগ দুর্যোগের কথা ভাবতে পারি !
আরম্ভ হ’ল মোটা মোটা সুরের দানা দিয়ে হর্কতের পর হর্কত ; তার মধ্যে ক্ষণে ক্ষণে দেখা দেয় গমক-লাগান সুরের ফিরত্ আর ফিকর্বন্দী চক্রগুলি ; সুরের দলেরা হুড়মুড়্ করে ঘুরে বেড়ায় মুহরার এ পাশে ও পাশে ! ছন্দের দোলা ত যেন ঝড়ের দাপটে তাল-তমাল-শালবনের মাথাগুলির এদিক্ ওদিক্ উলট্-পাক্ খাওয়া ; অথচ যে যেমন, সে তেমনই থাকে সুরের ঝড় চ’লে গেলে ! হঠাৎ মনে হয়, সুরের ঝড়ের মধ্যে মুহরাটি এবার উড়তে উড়তে এসেই পড়ে ; কিন্তু আসে না। আমরা যখন ভাবতেই পারিনে – গানের মুহরা এসে পড়বে, তখন চকিতে ছুটে এসে পড়ে সেটা ; যেন ভয়ে আসরের কোলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ! ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসতে পেরেছে বলে আমরা যে তাকে একটু আদর আপ্যায়িত করব, এমন অবকাশও পাইনে ; কারণ, সেই দুর্দান্ত ছেলেটি নির্ভয়ে মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে যায় সুর ও ছন্দের সংগ্রাম এলাকায়, হুঙ্কার দাপট আর কলরোলের মধ্যে। ঘরে ফিরে আসাটা তার যেন চাতুরী, ছলনা, অভিনয় ! সুরের অবিরল ধারা আমাদের শ্রবণকে প্লাবিত করে রাখে, শ্রাবণের বর্ষণের মতো ! মনের আকাশে আলোচনার ছিদ্র নেই, অবকাশ নেই।
মধ্যালয়ে ছিল
গানের আরম্ভ। গতিবেগের উত্তেজনায় এখন গানের মেঘমালা যেন উড়ে চলে দ্রুত মান-লয়ের পাখা
মেলে। ছন্দের দোলায় দোলায় বয়ে যায় সুরের প্লাবন, অতর্কিতে দেখা দেয় তানের তুফান। এক
একটি পর্যায় শেষ হয় হলক্ তানের বাহার দিয়ে, ঝড়ের অবকাশে বিদ্যুতের ঝলকের সঙ্গে মেঘের
গুড়্গুড়্ ধ্বনির মতো। রুক্ষতার লেশমাত্র নেই এই হলকের মেঘধ্বনির মধ্যে। মধুর সুরে
ভেজান এরা, এই হলকের দল তিন সপ্তকের দিক্-বিদিক্ ছুটে যায় আর ফিরে আসে। এরা যে সুরে
ভেজান, বেশ বুঝতে পারি অনুভব্র মাধূর্য দিয়ে ; শুখ্ন ধোঁইয়া বা বাস্পের কুণ্ডলী নয়
এরা ! মধুর আওয়াজের এই হলক তানের দৃষ্টান্ত কোথায় পাই !
......
প্রতি বার নূতন রকমের সূক্ষ্ম সূত্ দিয়ে সুএর অভিনব জ্যোতির্মাল্য রচনা করেন গুণী ; বার বার এই হার পরিয়ে দেন রাগরাজ মালকৌশের কণ্ঠে ! এর পর আর কী হ’তে পারে, কী হবে, কীই বা হওয়া উচিত, কিছুই কল্পনা করিনি, কিছুই প্রত্যাশা করিনি। আমাদের মনসচক্ষে উদ্ভাসিত হ’ল যেন রাগের একটি সমাহিত যোগমগ্ন স্বরূপ ; তার-মধ্যমের রক্তললাটিকা তখনও যেন ঝক্ঝক্ অরে জ্বলে উঠছে, কণ্ঠ ও বক্ষ যেন ঈষৎ আন্দোলিত হয়ে উঠছে সুরের হারাবলীর আলিঙ্গনে।”
এমন ক’রে সুখপাঠ্য বাঙলা ভাষায় লেখা অমিয়নাথের এই বই খানির সন্ধান পেয়েছিলাম বাঙলা সাহিত্যের আর এক নির্জন ভবঘুরে লেখক শ্রী বুদ্ধদেব গুহ’র একটি লেখা থেকে। তারপরে খুঁজে পেলাম সওয়া দুশ’ পাতার এই চটি বই খানা। বাঙলা সাহিত্যের পরতে পরতে যে এমন কতো মণিমুক্তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আজ আর সেগুলোর সন্ধান কে দেবে ? আমাদের পাড়া’র লাইব্রেরীর অজয়’দা যে কতো বই পড়িয়েছেন ধরে ধরে তার জন্যে আমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই !
মাননীয় বুদ্ধদেব গুহ’র লেখা থেকে আরেকটি বই এর কথার উল্লেখ ও পেয়েছিলাম। সেটিও একটি চটি বই। জঙ্গলের ওপরে লেখা। সময় সুযোগ এলে সে বই নিয়েও আলোচনা করবার ইচ্ছে রইল।
“......
চারি দিকে সবে বাঁটিয়া দুনিয়া
আপন অংশ নিতেছে গুনিয়া--
আমি তব স্নেহবচন শুনিয়া
পেয়েছি স্বরগসুধা॥
সেই মোর ভালো, সেই বহু মানি--
তবু মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে প্রাণী,
সুরের খাদ্যে জান তো মা বাণী,
নরের মিটে না ক্ষুধা।
যা হবার হবে, সে কথা ভাবি না,
মা গো, একবার ঝংকারো বীণা,
ধরহ রাগিণী বিশ্বপ্লাবিনা
অমৃত-উৎস-ধারা॥
যে রাগিণী শুনি নিশিদিনমান
বিপুল হর্ষে দ্রব ভগবান
মলিন মর্ত-মাঝে বহমান
নিয়ত আত্মহারা।
যে রাগিণী সদা গগন ছাপিয়া
হোমশিখাসম উঠিছে কাঁপিয়া,
অনাদি অসীমে পড়িছে ঝাঁপিয়া,
বিশ্বতন্ত্রী হতে॥
যে রাগিণী চির-জন্ম ধরিয়া
চিত্তকুহরে উঠে কুহরিয়া,
অশ্রুহাসিতে জীবন ভরিয়া,
ছুটে সহস্র স্রোতে।
কে আছে কোথায়, কে আসে কে যায়,
নিমেষে প্রকাশে, নিমেষে মিলায়--
বালুকার 'পরে কালের বেলায়
ছায়া-আলোকের খেলা !” - (পুরষ্কার
– রবীন্দ্রনাথ)
গৌতমদত্ত
