দেয়া নেয়া -
লক্ষ্ণৌ’র বিখ্যাত ধনী ব্যবসায়ী বি. কে. রায়ে’র একমাত্র সন্তান প্রশান্ত। পারিবারিক ব্যবসায় একেবারেই মন নেই তার। মন পড়ে থাকে সংগীতে। প্রশান্ত’র মা জানলেও তার বাবা নিজের ছেলের গানের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না। আসলে তাঁর বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে সংগীতচর্চ্চা করে শুধু রাস্তার বাইজী আর কিছু লোফারেরা। তাই প্রশান্ত রায়-এর গানের জগতে ছদ্মনামেই পরিচিত। ‘অভিজিৎ চৌধুরী’। একটা গানের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এক বিকেলে প্রশান্ত যেদিন স্যুটকেশ নিয়ে বেরোবে বলে মা’কে প্রণাম করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে যাবে ঠিক সেইদিন, সেই মুহূর্তে বি. কে. রায় বাড়ি ফিরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকেন। প্রশান্ত’কে ওই অবস্থায় দেখে তিনি মাঝ সিঁড়িতেই প্রশ্ন করেন—
— একটা কাজ ছিল।
ঝাঁঝিয়ে ওঠেন বি. কে. রায়।
— হেল্ উইথ ইয়োর কাজ ! সুইস ফার্মের অর্ডারের একাউন্টটা সাবমিট করবার কথা ছিল। সেটা কমপ্লিট করে রেখে আসোনি কেন ?
— শাট্ আপ্।‘
পুনরায় গর্জে ওঠেন বি. কে. রায়। ব্যাপার স্যাপার দেখে প্রশান্ত’র মা জানতে চান যে ব্যাপারটা কি হয়েছে ? আমায় বলবে তো !
— তোমায় কি বলব ? তুমি এক বর্ণও বুঝতে পারবে না।’
বি. কে. রায় মুখ খোলেন আবার।
— ‘হিসেব করতে ভাল লাগবে কেন ? টাকা রোজগারের চেষ্টা তো আর করতে হয় না-
— প্রয়োজন মনে করি না। আর টাকা রোজগারটাই জীবনের সব নয় !
— ও তাই বুঝি এখানে ওখানে ফুর্তি করে বেড়াও। লোকসানটা গায়ে লাগে না। ইরেস্পন্সিবল্, ওয়ার্থলেস।
— রেকর্ডিং করাচ্ছিলাম।
— রেকর্ডিং ? কিসের রেকর্ডিং ?
— গানের—
— তুমি গান গাও ?!
— হ্যাঁ।
— স্ট্রেঞ্জ ! নিজের কাজ কামাই করে যে কেউ গান গাইতে পারে, এটা আমার জানা ছিল না। তোমাকে আমার
— কি বলছেন আপনি ?
— হ্যাঁ হ্যাঁ। শহরের কয়েকটা নোংরা বাইজি আর লোফার ছাড়া আর কেউ গান করে না।
— গান সম্বন্ধে আপনার এ ধারণা ভুল।
— ভুল ??
— হ্যাঁ ভুল। সারা জীবনটা লোহালক্কড়ের মধ্যেই কাটিয়ে দিয়েছেন। গান বোঝার মতো মনের অবস্থা আপনার
— রিয়েলি ? তা এই লোহালক্কড়ওয়ালা মানুষের শেল্টারটি ছেড়ে নিজে কিছু রোজগার করে, গান সম্বন্ধে কথা
— তাহলে আপনি বলতে চান যে গান গাইলে আপনার শেল্টারে থাকা চলবে না ?
— বলতে চান নয় ! বলছি।‘
প্রশান্তর মা বলে ওঠেন ‘এ তুমি কি বললে ?’
— বেশ তবে তাই হোক।
মায়ের হাজার অনুরোধ উপরোধ সত্ত্বেও ও বাড়িতে অপমান সহ্য করে আর থাকতে রাজি হয় না প্রশান্ত। গট্ গট্ করে স্যুটকেস হাতে তুলে দ্রুতপদে বেরিয়ে যায় বাড়ি থেকে। এরপরে নিজের গাড়িখানা বিক্রি করে দিয়ে গীতিকার বন্ধু অসুস্থ সুকান্ত’র বাড়ি ঘুরে কলকাতা চলে আসে প্রশান্ত।
তেষট্টি সালের চৌরঙ্গী। রাস্তায় ফিয়াট, স্টুডিবেকার, অস্টিনের রমরমা। কলকাতার রাস্তায় তখনো দেখা মেলে শেভ্রলে, ডজ, ফোর্ড, হচকিস, রেনো, ওল্ডসমোবাইল, ক্লিভ্ল্যাণ্ড, হাম্বার, রোভার, নেপিয়ার, লানসিয়া, ভক্সহল, ওপাল, মরিস, উলস্লি, ব্যুইক, রোলস্ রয়েস। আর ছিল রেডিও। রোজ দুপুরে আকাশবাণী। শনি-রবিতে অনুরোধের আসর।
কলকাতা’য় এসে প্রশান্ত ওঠে প্রাণের বন্ধু অসীম-এর বাড়ি। আর সেদিনটা রোববার থাকায় জমে ওঠে পারিবারিক আড্ডা আর গান। সেই সময়কার কলকাতার নিস্তরঙ্গ পরিবেশ সত্যিই নরম ছিল। বিকেল বেলা পদব্রজেই একটু শহর পাড়া ভ্রমণে বেরোয় প্রশান্ত। আচমকাই প্রশান্তর ঘাড়েও ওপর এসে পড়ে একটা মোটাসোটা লোক। সে অনুনয় প্রকাশ করে জানায় যে তার মাথার ঠিক নেই কারণ তার বাবুর মটর গাড়ি বিগড়েছে। আর তাই হন্যে হয়ে মেকানিক খুঁজতে বেরিয়েছে সে। প্রশান্ত গাড়ি দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তাকে প্রায় ভগবান পাওয়ার মত ক’রে জাপ্টে ধরে নিয়ে আসে বিখ্যাত ধনী অমৃতলাল মজুমদারের বাড়ি।
রিক্সায় চেপে যেতে যেতে প্রশান্ত জানতে পারে অমৃতলাল বাবু আর তাঁর এক ভাগ্নী নিয়েই তাদের সংসার। অকৃতদার মামা আদতে পশ্চিমের মানুষ। ইঞ্জিনিয়ার। আর তস্য ভাগ্নীটি গ্রাজুয়েট। খুব রাগী আর রেগে গেলে তার মুখ দিয়ে নাকি ভাষাজ্ঞানের খিচুড়ি বেরোয়। এমন এক বাড়িতে আগমন হয় প্রশান্তর। এবং খারাপ হওয়া গাড়িটা চালু করে দেয়।
গাড়ি সারানো হ’লে অমৃতবাবু বিস্মিত হয়ে পড়েন। প্রশান্তকে মেকানিক-কাম-ড্রাইভার হিসেবে থাকতে বলেন। প্রশান্ত গোবরডাঙ্গায় থাকে শুনে বলেন যে প্রশান্তকে ওনার বাড়ির কোয়ার্টারেই থাকতে হবে।
তো তাই হল। পুরোনো ড্রাইভার অনুমান (যদিও মালিক তাকে ‘হনুমান’ বলেই ডাকতেন) এর সাথে আর এক মেকানিক-কাম-ড্রাইভার হিসেবে কাজ শুরু হল হৃদয় হরণে’র। সেই সময় আমাদের চারদিক যে কত নির্মল ছিল তা বোঝা যায় এ ছবির সংলাপেই। পরের দিন যখন প্রশান্ত’র কাছে অনুমান জানতে চান যে সে ছুচি (সুচী মানে সুচরিতা) মেমসাহেবকে কেমন দেখলেন ? প্রশান্ত অল্প হেসে ‘জিনিষ’ বলে চলে যাওয়াতে অনুমানের অবাক হওয়াই বুঝিয়ে দেয় যে, তখনো আজকালের এইসব প্রাগৈতিহাসিক হয়ে যাওয়া শব্দ’ও সবার কাছে পরিচিত ছিল না।
সুচরিতা মেমসাহেব আবার অভিজিৎ চৌধুরী’র এক্কেরে যাকে বলে ডাই-হার্ড ফ্যান। খুব ইচ্ছে তাঁকে দেখার কিন্তু কিছুতেই সুচরিতা‘র সে আশা পূর্ণ আর হয় না। কারণ গায়ক-সুরকার অভিজিৎ চৌধুরী’র কোনো ছবিই তখনো অব্দি বাজারে নেই। এমন কি কলকাতায় অভিজিৎ চৌধুরী’র রেকর্ড সকালে যদি বেরোয় তা আর বিকেলে পাওয়া যায় না। ছটফট করতে থাকে সুচরিতা রেকর্ড না পেয়ে।
আকাশবাণী কলকাতা’য় সুকান্ত বসুর লেখা গান শুরু হয়। গায়ক অভিজিৎ চৌধুরী। সারা কলকাতার লোকের সাথে সুচরিতা অধীর আগ্রহে সে গান শোনে। তখন রেডিওতে লাইভ অনুষ্ঠান হ’ত। দুই বন্ধু তন্ময় হ’য়ে তখনকার সেই ভালভ-সেটের রেডিওর দিকে চেয়ে চোখের পাতা না ফেলে তাকিয়েই থাকে। গান শেষ হলে প’রে সুচরিতা প্রতিজ্ঞা করে ‘লোকটার সঙ্গে আলাপ করতেই হবে’। ফোন যায় আকাশবাণী’তে। প্রথমে ফোন ধরলেও সুচরিতা’র নাম শুনে ফোন ছেড়ে দেয় প্রশান্ত। সুচরিতার পরের গন্তব্য অসীমের বাড়ি। কিন্তু সেখানেও নিরাশ হয় ছুচি মেমসাহেব। অসীম জানায় যে অভিজিৎ এর একটা ছবি আছে। আর তা হল কলেজের সাজাহান নাটকে’র দিলদারে’র চরিত্ররুপী অভিজিৎ-এর।
ওদিকে লক্ষ্ণৌ’তে প্রশান্ত’র মা ছেলের শোকে প্রায় শয্যাগত। খাওয়া দাওয়ায় হরতাল। প্রেশার নিম্নগামী। এই দেখে রায়সাহেব গিন্নির কাছে বলেই ফেলেন যে গদাই’কে কলকাতা পাঠিয়ে বন্ধুর বাড়ির থেকে খবর নিয়ে আসতে। গদাই’কে ডেকে রায়সাহেব কলকাতায় যেতে বলেন। কলকাতা যাত্রার প্রাক্কালে গদাই-এর হাতে দুজনেই টাকা গুঁজে দেন আর কর্তা বলেন যে টাকা গিন্নি দিয়েছে বলতে। আর গিন্নি বলেন কর্তা টাকা দিয়েছেন এই কথা জানাতে। বাঙালির বাবা-মা-এর মন কষাকষি’র চিরন্তন এক সহজ অথচ বিপুল ভালোবাসার মুহূর্ত পরিচালক অতি অনায়াসেই ফুটিয়ে তোলেন।
আজকালের বাংলা সিনেমা দেখতে দেখতে তাই ভাবি যে সেই ষাট-সত্তরের দশকে এইসব অল্পখ্যাত পরিচালকেরা কি অপূর্ব দৃশ্য নির্মাণ করতে পারতেন কতো অনায়াসেই। যা হয়তো খুবই সহজ মনে হয় অথচ বুকের ভেতরে আছাড় দিয়ে যায়ই। অথচ এখনকার পরিচালকদের হাবভাব আর সিনেমা দেখলে মনে হয় যে বাংলা সিনেমা এগোয় নি কণামাত্র বরং পিছিয়েই গেছে অনবরত। দৈবাৎ একটা আধটা সিনেমা ছাড়া।
এই বইতেই আরেকটা
দৃশ্যের কথা বলি। প্রশান্তের চাকরীর কথা বলতে আসার দিনটায়। সকালবেলায় প্রশান্তকে দেখে
অনুমান বলে দোতলায় চলে যেতে। বাবুর ঘর দোতলাতেই। সেখানে উঠে প্রশান্ত দেখে ছুচি মেমসাহেব
পিয়ানো বাজাচ্ছে। পেছন থেকে দেখতে থাকে প্রশান্ত। ঠিক এই সময়ে প্রশান্তকে দেখে খুশী
হন অমৃতবাবু। তিনি বলেন—
সুচরিতা পিয়ানো থামিয়ে ঘাড় ঘোড়ায়। অমৃতবাবু বলেন—
— তারপর ! কি ঠিক করলে ? কাজ করবে ?
— আজ্ঞে আপনি মাকে মেকানিক হিসেবে রাখবেন তো ? (কারণ যাতে অনুমানের চাকরীটা থাকে)।
— ইয়েস, সার্টেনলি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, গাড়ি খারাপ না হলে তুমি তাতে হাত দেবে না। নো নো,
আর থাকতে না পেরে সুচরিতা বলে ওঠে—
— মামা, কি তোমাদের কথা হচ্ছে আমি একবার শুনতে পারি কি ? মনে হচ্ছে আমরা একজন মেকানিক্
— বারে ! তুই নিজেই তো বললি, আর তাছাড়া দরকার আছে কিনা সেটাতো কাল বিকেলে ভাল করে টের
— হুঁউ—বলছিলাম শুধু শুধু এক্সপেন্সেস বাড়িয়ে লাভ কি ?
— আরে সে আর কতটুকুই বাড়বে বল ? বরং এগেন্সট দ্যাট, সিকিওরিটি এ্যাণ্ড সেফটি আমরা হান্ড্রেড
— আজ্ঞে, আমি তো মামাবাড়িতে মানুষ। হ্যাঁ মামাবাড়িতে মানুষ। তো মামা বললেন, যে লেখাপড়া শিখে আর
— আই সী…
— আজ্ঞে হ্যাঁ।
— তা তোমার নামটা কি হে বাপু ?
— আজ্ঞে ইয়ে মানে… হৃদয় হরণ !
চমকে উঠে সুচরিতা বলে বসে—
— নন্সেন্স্। এটা একটা নাম নাকি ? কি বলে ডাকবে লোকে ?
— আজ্ঞে হৃদয়…………না হলে হরণ !
— হরণ ? (মামাবাবু বলেন) আচ্ছা, হরণটাকে যদি ছোট করে হরু ক’রে নেওয়া হয় ?
— দ্যাটস্ অলসো সিলি। (সুচরিতার জবাব) তার চেয়ে হরণ ভাল।
— আচ্ছা আচ্ছা বেশ। হরন-ই। তা হরণ, আজ থেকে তাহলে কাজে লেগে যাও বাপু।
— আজ্ঞে, আজ থেকেই ?
— হ্যাঁ হ্যাঁ, খাওয়া-দাওয়া পাবে, বছরে দু-বার করে জামা-কাপড় পাবে আর মাস গেলে একশ টাকা মাইনে
— আমি বলছিলাম কি যে, কাল থেকে কাজে লাগলে হয় না !
— কেন ? কাল থেকে কেন ?
— তাহলে বাড়িতে একটা খবর দিয়ে আসতাম।
— তোমার বাড়িতে আর কে আছে ?
— আজ্ঞে ইয়ে মানে আমার স্ত্রী আছেন। আর ট্যাঁপা আর টেঁপি আছে।
এই শুনে ফিক করে হেসে ওঠে ছুচি ম্যাডাম। হরণ বলে—
— আজ্ঞে হ্যাঁ। আমার ছেলে মেয়ে। ওরা যমজ।
হাসি চাপতে না পেরে সুচরিতা একটা ইংরেজী পত্রিকার আড়ালে মুখ ঢাকে। অমৃতবাবু বলেন—
— আচ্ছা বেশ। কাল সকালে।
— আরে দাঁড়াও দাঁড়াও। তুমি আগাম কিছু চাও ?
— আজ্ঞে না।
দুহাত তুলে মামাকে নমষ্কার করে প্রশান্ত। আর বইয়ের আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকা সুচরিতাকেও। এই দৃশ্যটার কথাই বলছিলাম। প্রশান্ত অত ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে হয়েও যে সৌজন্য দেখিয়ে দুজনকেই নমস্কার জানায়, এর থেকে সৌজন্যতার স্বাভাবিক নিয়মকানুনগুলোও আমরা কৈশোর বয়সেও শিখে যাই। আজকাল এ সবের পাট তো আর নেই। বরং মা বাবা খুশি হয় তাদের পুত্র কন্যা যদি বলতে পারে…’হাই আঙ্কেল…হাইই আন্টি……আর তাই দেখে গর্বিত বাবা-মায়েরা বলে ওঠেন—
‘ইংলিশ’ ওর গুলে খাওয়া, ওটাই ‘ফাস্ট’ ল্যাঙ্গুয়েজ
হিন্দি সেকেন্ড, সত্যি বলছি, হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ।
কী লাভ বলুন বাংলা প’ড়ে?
বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে ?
বেঙ্গলি ‘থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ তাই, তেমন ভালোবাসে না
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।…”
এইভাবেই রচনা লিখতে শিখেছি, “Travelling is a part of Education” কিংবা “চলচ্চিত্রের সমাজ বীক্ষণ”। সব হারিয়ে ফেললাম বাঙালি হয়েও ! যাক্ সিনেমায় ফিরি…
কতো মজাই না হারিয়ে গেল আমাদের জীবন থেকে। এ সিনেমার একটা দারুন উপভোগ্য দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে পড়বেই সব্বার। একদিন চারবন্ধু মিলে সেই হুডখোলা গাড়ি নিয়ে বেড়াতে বেরোলে (অবশ্যই ড্রাইভার হরণ পাশের সিটে) ছুচি মেমসাহেব বন্ধুদের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে হাতে তুলে নেয় সে গাড়ির স্টিয়ারিং। সামনে যাচ্ছিল একটা বেবি অস্টিন। বন্ধুরা এই নিয়ে ব্যঙ্গ করতেই থাকে। পাশে বসা হরণ তার মেমসাহেবের সম্মান রক্ষা করতে আস্তে আস্তে সুচরিতার পা সরিয়ে দিয়ে, পা রাখে এ্যাকসিলেটারে। আর একটা হাত স্টিয়ারিং-এর নিচের অংশে যাতে পেছনের সিটে বসে থাকা বন্ধুরা না দেখতে পায়। সুচরিতা পা রাখে হরণের পায়ের ওপরেই। আর হরণের একটা হাত সুচরিতার হাতের ওপর ধরে ওভারটেক্ করে যায় সেই বেবি অস্টিনখানাকে। বন্ধুদের ব্যঙ্গ থামে।
ভাবুন তো আজকালের
দিনে এমন একটা রোম্যান্টিক দৃশ্য কি পরিচালক উপহার দিতে পারতেন আমাদের ? শেষ ভরসা এ্যাম্বাসাডর
ও চলে গেছে প্রায়। ইদানীংকার প্রায় সমস্ত গাড়িরই সামনে দুখানা আলাদা আলাদা সিট। মাঝে
বিশাল ফাঁক। রোমান্স আর থাকবে কোথায় !!
একদা এমনই বাদলশেষের রাতে—
মনে হয় যেন শত জনমের আগে—
সে এসে সহসা হাত রেখেছিল হাতে,
চেয়েছিল মুখে সহজিয়া অনুরাগে ;
সে-দিনও এমনই ফসলবিলাসী হাওয়া
মেতেছিল তার চিকুরের পাকা ধানে ;
অনাদি যুগের যত চাওয়া, যত পাওয়া
খুঁজেছিল তার আনত দিঠির মানে।
একটি কথার দ্বিধাথরথর চুড়ে
ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী ;
একটি নিমেষে দাঁড়ালো সরণী জুড়ে,
থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি ; …………”। ( ‘শাশ্বতী – সুধীন্দ্রনাথ দত্ত )
সেদিনই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে ঢোকার আগে সুচরিতা একটা খাবারের বাক্স ধরিয়ে দেয় হরণের হাতে। কৃতজ্ঞতা স্বরুপ।
গদাই কলকাতায় এসে প্রশান্তর সাথে দেখা করলে, প্রশান্ত গদাইকে ফিরে যেতে বলে। এমনকি মা-বাবার পাঠানো টাকা নিতেও অস্বীকার করে। গদাই লক্ষ্ণৌ ফিরে এ খবর জানায়। অস্থির বি. কে. রায় উপায়ান্তর না পেয়ে লালাবাজারে খবর পাঠান ছেলে মিসিং বলে। কলকাতা পুলিশ যথারীতি প্রশান্ত’র বন্ধু অসীমের বাড়ি যায়। আর অন্য দিকে সুচরিতার জন্মদিনে সুচরিতা অভিজিৎ এর গাওয়া গান পরিবেশন করে। মা’র খবরে কিছুটা হলেও থমকে যায় প্রশান্ত। অমৃতবাবুর বাড়ি থেকে না বলে উধাও হয়ে যায় প্রশান্ত। তিনিও বাধ্য হয়ে বালীগঞ্জ থানায় জানায় যে তাঁর ড্রাইভার হৃদয় হরণকে পাওয়া যাচ্ছে না। অমৃত বাবুর মাথায় তখন একটাই চিন্তা—‘মাইনে না নিয়ে কেন চলে যাবে হৃদয় হরণ’।
অসীমের বাড়ি গুটি গুটি পায়ে হাজির হয় সুচরিতা। বৌঠান ঘটকালি করতে চাইলে সুচরিতা লজ্জায় ছদ্ম ক্রোধ দেখায়। ওদিকে কলকাতা পুলিশ কে ‘ওয়ার্থলেস’ বলে নিজেই ছেলেকে খুঁজতে কলকাতা আসার কথা বলেন প্রশান্ত’র মা’কে। তিনিও আসতে চান কলকাতায়।
কলকাতার এক মেসে আস্তানা গাড়ে প্রশান্ত। হৃদয় হরণের নামে রেডিওর নিরুদ্দেশ সংবাদ শোনে প্রশান্ত। একটা চিঠি আসে অসীমে’র অফিসে।
ভাই অসীম, অজ্ঞাতবাস করছি। কারণটা পুলিশও বটে, আবার নিজের মনও বটে। বিষেষ করে মায়ের অসুখটা শোনার পর থেকেই আর কিছু ভাল লাগছে না। হয়তো মায়ের কাছেই ফিরে যেতে হবে। যদি যাই, তবে গান ছেড়ে হার স্বীকার করে মাথা নিচু করেই ফিরে যাব। যাই হোক নিচে ঠিকানা রইল। যদি দরকার পড়ে যোগাযোগ করিস। ইতি – প্রশান্ত।
এই রাতেই সুকান্ত চলে আস কলকাতায় অসীমের বাসায়। লক্ষ্ণৌর ডাক্তার হাল ছেড়ে দিয়েছেন। কলকাতার যাদপুরের টি. বি. হাসপাতালে ভিয়েনা থেকে ডাক্তার ডেমন এসেছেন। যদি তাঁকে দেখানো যায় এই অভিপ্রায়ে। প্রশান্তও পাশে নেই একথা জানায় সুকান্তের স্ত্রী।
অসীম যায় সুকান্তর মেসে। সুকান্ত জানায় যে বাড়ি থেকে যে মন নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম, সে মন এখন তার আর নেই। সুকান্তের খবর জানায় অসীম। আরো জানায় যে অসীম সুকান্তকে ডাক্তার ডেমনের কাছে নিয়ে গেছিল। তিনি বলেছেন এক্ষুনি অপারেশন করলে ঠিক হয়ে যাবে সুকান্ত। কিন্তু টাকা লাগবে অনেক।
সুকান্তের অপারেশনের খরচা তুলতে “অভিজিৎ চৌধুরী” পাবলিক ফাংশানে গান করতে চায়। সারা কলকাতা বিজ্ঞাপনে ছেয়ে যায়। আনন্দে লাফাতে থাকে ছুচি ম্যাডাম।
জুবিলী হলে টিকিট কাটে দুই বন্ধু। একেবারে সামনের সিটে। পর্দা খুললে বন্ধু অসীম জানায় কেন অভিজিৎ এই অনুষ্ঠান করছে। সে আরো জানায় যে, সুকান্ত’র অপারেশনের জন্যে যা টাকার প্রয়োজন ছিল, তার থেকে অনেক বেশি টাকা উঠে গেছে দর্শকদের শুভেচ্ছায়।
মঞ্চে আসে অভিজিৎ। সুচরিতা হতবাক হ’য়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। পেছনের দর্শকদের ধমকানিতে বসতে বাধ্য হয়। ওদিকে বি. কে. রায় কে পুলিশ নিয়ে আসে ছেলেকে চেনানোর তাগিদে। জীবনের শেষ গান শুরু করে অভিজিৎ চৌধুরী। সেই গান আকাশবাণী ব্রডকাস্ট করলে সুকান্ত শোনে তা। গান শেষ হলে অভিজিৎ চৌধুরী’কে পাকড়াও করে বাবার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য অমৃত বাবুর বাড়ি নিয়ে যায় তাকে। অভিজিৎ বলে যে এতো অমৃত লাল বাবুর বাড়ি। পুলিশ জানায় যে বি. কে. রায় এই বাড়িতেই উঠেছেন কলকাতায় এসে। এর পরে হৃদয় হরণের কি দুর্গতি হয় তা আপনারাই দেখে নেবেন ইউট্যুবে।
বিধায়ক ভট্টাচার্যের লেখা চিত্রনাট্য নিয়ে গায়ক শ্যামল মিত্র প্রযোজনা করেছিলেন ‘দেয়া নেয়া’। সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচালনায় এ ছবির মন মাতানো সেই গানগুলোর সুরকার ছিলেন শ্যামল মিত্র। ১৯৬৩ সালে মুক্তি প্রাপ্ত 'দেয়া নেয়া' ছবিটি উত্তমকুমারের কেরিয়ারে অন্যতম হিট ছবি। এই ছবিতে উত্তম-তনুজা জুটি সকলের মন কেড়েছিল। একটা নিটোল মিষ্টি গল্পের অপূর্ব সিনেমা এই ‘দেয়া নেয়া’। মায়াবি সুরের সেই সব গান আজও যেন উজ্জ্বল। অর্দ্ধেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় এ সিনেমার শিল্পীরা হলেন—
তনুজা - সুচরিতা।
পাহাড়ী সান্যাল - অমৃতলাল মজুমদার।
কমল মিত্র - বি. কে. রায়।
ছায়া দেবী - প্রশান্ত’র মা।
তরুনকুমার - অসীম।
লিলি চক্রবর্তী - অসীমের স্ত্রী।
প্রেমাংশু বসু - সুকান্ত।
শ্যাম লাহা - অনুমান।
এছাড়া বিধায়ক ভট্টাচার্য্য। সুমিতা সান্যাল। জয়নারায়ণ মুখোপাধ্যায়। নৃপতি চট্টোপাধ্যায়।
মনি শ্রীমানী। মুকুন্দ চট্টোপাধ্যায়। রবি রায় চৌধুরী। রতন ব্যানার্জী। কবিতা রায়। সীমা দেবী। প্রভৃতি।
‘দেয়া নেয়া’ সিনেমার কন্ঠশিল্পিরা হলেন – শ্যামল মিত্র। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আরতি মুখোপাধ্যায়। এ ছবির গীতিকার গৌরী প্রসন্ন মজুমদার।
‘মাধবী মধুপে হল মিতালি’ গানটি গেয়েই বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে নাম হয়েছিল আরতির। আরতি মুখোপাধ্যায় এক জায়গায় বলেছেন যে “তখন আমি খুবই ছোট। নিজেও বুঝিনি গানটি এমন হিট হবে ! আর শুধু এই গানটিই নয়। ‘দেয়া নেয়া’র সব গানই সুপার হিট হয়েছিল। কী সুরই না দিয়েছিলেন শ্যামলদা।” এই গানটির জন্য আরতির নাম প্রস্তাব করেছিলেন ভূপেন হাজারিকা। ‘মারফি অল ইন্ডিয়া রেডিও কনটেস্ট’-এ আরতি প্রথম হয়েছিলেন। আর ভূপেন হাজারিকা ছিলেন সেই প্রতিযোগিতার বিচারক।
শ্যামল মিত্র’র ভাই সলিল মিত্র জানিয়েছেন—“আসলে আমার দাদার জীবনকথা নিয়েই ‘দেয়া নেয়া’র কাহিনি। নৈহাটির বিশিষ্ট চিকিৎসক সাধনকুমার মিত্র নিজে ছিলেন এক জন দক্ষ এস্রাজবাদক। আর কাকা ছিলেন ক্লাসিক গায়ক। কাজেই সঙ্গীত আমাদের রক্তেই। এ সত্ত্বেও সাধনবাবু কখনও চাননি যে, তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র শ্যামল চিকিৎসক না-হয়ে গায়ক হোন। কিন্তু যাঁর স্বপ্ন গায়ক হওয়ার, তাঁকে আটকায় কে ? নৈহাটির প্রাসাদোপম বাড়ি ছেড়ে শ্যামল মিত্র চলে এলেন কলকাতায়”
সলিলবাবু জানান, দেয়া নেয়া’-র নায়ক হিসেবে উত্তমকুমারকে ছাড়া আর কারও কথা কী করেই বা মনে আসবে প্রযোজক শ্যামল মিত্রের ? ‘‘দু’জনের রসায়ন ছিল দেখার মতো”।
কিন্তু নায়িকার সন্ধানে অনুজকে নিয়ে শ্যামলবাবু পাড়ি দিয়েছিলেন তখনকার বোম্বেতে। প্রথমে শর্মিলা ঠাকুর এবং আশা পারেখ ডেট দিতে না পারায় নূতনকে রাজি করানোর জন্য তাঁরা পৌঁছে গিয়েছিলেন নায়িকার মা শোভনা সমর্থের বাড়ি। কিন্তু নূতনও ডেট দিতে পারলেন না। ওই সময়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসছিলেন শোভনার ছোট মেয়ে তনুজা। স্কার্ট আর টপ পরা ফুটফুটে সুন্দরী, হিন্দি ছবিতে নবাগতা তনুজাকে দেখেই শ্যামলের পছন্দ হয়ে গিয়েছিল।
নির্দিষ্ট দিনে তনুজা পৌঁছে গেলেন কলকাতায়। শুরু হল শ্যুটিং। আর তার পর পুরোটাই ইতিহাস। সুপার-ডুপার হিট হল ওই ছবি। শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরতে লাগল গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে’ বা ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন’।
দেয়া নেয়া আর ‘দোলে দোদুল দোলে দুলোনা’ ? “এই গানের সরগম মানবদা করেছিলেন।
রূপায়ণ ভট্টাচার্যের এক লেখায় পাই—‘শ্যামল মিত্র তাঁর ‘দেয়া নেয়া’ ছবিতে ‘দোলে দোদুল দোলে’ সুর করেছেন। প্রথমে ভেবেছিলেন, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডাকবেন ডুয়েট করার জন্য। ঘনিষ্ঠরা অনেকে তাঁকে বলেন, প্রসূন বাবু তিন মিনিটের ভিতরে ক্লাসিকাল গাইতে পারবেন না। এর চেয়ে অনেক ভালো হবেন মানবেন্দ্র।
শ্যামলের মনে ধরে কথাটা। একবার ফোন করতেই বন্ধু মানবেন্দ্র হাজির শ্যামলের বাড়ি। হইচই করে মাতিয়ে দিতেন এমনিতে। শ্যামল পুত্র সৈকতের কাছে শোনা, গানটা শুনে তোলার পর মানবেন্দ্র জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছিলেন তাঁর বাবাকে। তার পর যা বলেন, তা লিখতে বসার সময় আমার গায়েও কাঁটা দিচ্ছে। ‘যত দিন পৃথিবী থাকবে, তত দিন এ গান থাকবে।’
গানটা তো তুলে নিয়ে চলে গিয়েছেন মানবেন্দ্র। কিন্তু বাড়ি ফিরে তাঁর নাওয়াখাওয়া নেই। শুধু এ গানই গেয়ে চলেছেন। শুধু সরগম। মানবেন্দ্রর স্ত্রী বেলা ফোন করেছিলেন শ্যামলকে। রাতের দিকে শ্যামলকে ফোন করে আবার হাজির মানবেন্দ্র। উস্কোখুস্কো চুল। জনক রোডের বিখ্যাত রাধুবাবুর দোকান থেকে কাটলেট আনা হলে একসঙ্গে খেয়ে ফেললেন অনেকটা কাটলেট। তারপর সুরকারকে খুব বিনয়ের সঙ্গে মানবেন্দ্র বলেছিলেন, ‘তোর করা সরগমটা কি একটু পাল্টানো যাবে? ওটা আসলে ঠিক মিলছে না।’ শ্যামল রাজি হতেই গেয়েছিলেন ছোট এক সরগম। যা গানটার মাত্রাই পাল্টে দেয়।
রেকর্ডিংয়ের পরে সবাই ধন্য ধন্য করছিল এই অনন্য কালজয়ী যুগলবন্দির। স্টুডিওয় মানবেন্দ্রর দিকে খাম এগিয়ে শ্যামল বলেছিলেন, ‘আসলে আমিই তো প্রোডিউসর। তাই আমাকেই দিতে হচ্ছে টাকাটা।’ মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিল মেজাজি মানবেন্দ্রর। ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিলেন, ‘শুয়োরের বাচ্চা। আমায় তুমি রাস্তার গায়ক পেয়েছো ?’
টাকাটা না নিয়ে স্টুডিও থেকে হনহন করে বেরিয়ে গিয়েছিলেন মানবেন্দ্র’। এমনই সব সম্পর্ক ছিল সেসময় !
উত্তমকুমারের কথা কি বলবো। প্রতিটা গানের লিপ মেলানো গুলো লক্ষ্য করে দেখবেন। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে আমার কাছে দেখা এই ব্যাপারে একমাত্র অদ্বিতীয় উত্তম। ধুতি শার্ট বা ধুতি পাঞ্জাবী পরেই উত্তম মাতিয়ে রাখলেন এ ছবি। এ ছবিতে উত্তমকুমার প্রসঙ্গে আরেক অভিনেত্রী লিলি চক্রবর্তী কি বলেছেন শুনি—
‘১৯৬৩ সাল। পরিচালক সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দেয়া নেয়া' ছবিতে উত্তম কুমারের বন্ধুর স্ত্রী-র ভূমিকায় অভিনয়ের অফার পেলাম। তার আগে দু-একটি ছবি করেছি। কিন্তু মহানায়কের সঙ্গে নয়। ফলে, একটু জড়োসড়ো হয়ে থাকব, টেনশন হবে---এটাই স্বাভাবিক। সামনে যেতেই দেখি, সব খুব নর্মাল। যেন মাটির মানুষ উত্তমকুমার। এত বড় মাপের, কিন্তু একটুও বুঝতে দেননি। উল্টে, আমাদের মতো নতুনদের হাতে ধরে শিখিয়ে দিতেন, কীভাবে অভিনয় করলে ন্যাচারাল অ্যাক্টিং হবে। অভিনয়টা অভিনয় বলে মনে হবে না। আস্তে আস্তে আমার ভয় ভাঙল। যেহেতু ছবিতে আমি ওঁর বন্ধুর বউ তাই সেট থেকে সেই যে ‘বউঠান' বলে ডাকতে শুরু করলেন শেষ দিন পর্যন্ত ওই ডাকটাই ধরে রেখেছিলেন।
তখনকার প্রজন্মে বলুন বা এখনকার, সবারই একটা কৌতূহল ছিল উত্তমকুমারকে নিয়ে। যে মানুষটা পর্দায় এতটাই রোম্যন্টিক তিনি কি বাস্তবেও তেমনটাই ? আমি বলব, উনি পর্দায় যা করতেন সেই অনুভূতি কখনও বাস্তবে বয়ে বেড়াতেন না। রোম্যান্টিক নায়ক কখনোই অভিনয়ের বাইরেও নায়িকাদের সঙ্গে সেটে প্রেম করতেন না। যে যেমন ব্যবহার করতেন তাঁকে ঠিক সেটাই ফেরত দিতেন দাদা। আমার অভিনয় জীবনের শুরু থেকে আমাকে চিনতেন। বিয়ের পর অভিনয়ে আসি। তাই আমার স্বামীকেও জানতেন। আমার স্বামী তো ওঁর অন্ধ ভক্ত ছিলেন। তাই ওঁকে চিনতেন, জানতেন বলেই ওঁর সঙ্গে অভিনয় করতে দিতে কোনোদিন ভয় পাননি বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেননি। আমারও প্রথম দিন থেকেই উত্তমকুমারের ওপর শ্রদ্ধা মিশ্রিত সম্মান ছিল। প্রেম করব মহানায়কের সঙ্গে! এমন ভাবনা কস্মিনকালেও ঠাঁই পায়নি মাথায়!
উত্তমকুমারের গুণের শেষ ছিল না। কী ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারতেন! একবার আমি, বাসবী, রাজশ্রী, আরও সবাই মিলে রবীন্দ্রসদনে একটা অনুষ্ঠান করেছিলাম। ঋতুমঙ্গল ধাঁচের। চারটি ঋতু নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান গেয়েছিলাম আমরা। উনি সেখানেও ছিলেন আমাদের নায়ক। তখন সামনে থেকে ওনার গান শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। রবীন্দ্রসঙ্গীত ওঁর গলায় অদ্ভুত খুলত। আর খুব দিলদরিয়া মানুষ ছিলেন। খাওয়াতে খুবই ভালোবাসতেন। সেটা একা দাদা নন, বেণুদিও। সেটে দাদা-র জন্য বেণুদি রান্না করে নিয়ে আসতেন। সেসব থেকে ভাগ দিতেন আমাকে। অনুষ্ঠানের রিহার্সালের সময় যখন বিকেলে ওঁদের বাড়িতে আমরা যেতাম, নানা রকমের খাওয়াদাওয়া ছিল মাস্ট। দাদা সবসময় বেণুদিকে বলতেন, আমার বাড়ি থেকে কেউ যেন শুধু মুখে ফিরে না যায়।
উত্তমকুমারকে ঘিরে কত স্মৃতি! ২৪ জুলাই এলেই সেগুলোকে যেন সময়ের ধুলো ঝেড়ে নামাই। নেড়েচেড়ে দেখি। আবার যত্ন করে তুলে রাখি। এগুলোই তো অমূল্য সম্পদ ! যেমন, দাদা কোনোদিন কাউকে ছোট নজরে দেখতেন না। সবাই তাঁর চোখে সমান ছিল। তিনিই প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন টেকনিশিয়ানদের ভালো ভাবে খাওয়ার না দেওয়ার জন্য। একদিন শালপাতায় করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে দেখে ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, 'ওঁরা কি মানুষ নন ! এভাবে খাওয়া যায় ! শিগগিরি ওঁদের জন্যে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা চাই। সঙ্গে প্রত্যেকের আলাদা থালা-বাসন। না হলে কাজই করব না।' দাদার সেই ধমকে কাজ হয়েছিল। তার কয়েকদিন পরেই দাদা যা বলেছিলেন সেই মতো ব্যবস্থা হয়েছিল টেকনিশিয়ানদের।
আর একটা মজার কথা বলি ? একবার ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে আমরা সবাই বসে। একদিকে পরিচালক, উত্তমদা, বিকাশ রায়ের মতো দিকপালেরা। আরেকদিকে বেণুদি, আমি আরও অনেকে। লাইটের সেটিং হচ্ছে। সময় লাগছে বলে আড্ডায় মারছি। তখন আমি মুম্বই ফেরত। একটু পান-জর্দা খাওয়া ধরেছি। হঠাৎ বেণুদি বললেন, লিলি পান খাবি ? সঙ্গে সঙ্গে রাজি। দোকান থেকে জর্দা দেওয়া পান এল। কাগজে মুড়িয়ে আলাদা করে ১২০ জর্দাও এল। আমি পাকামি মেরে জর্দা পান খাওয়ার পরে আবার জর্দা খেলাম। আর যায় কোথায়! ডবল ডোজে আমার তখন মাথা ঘুরছে। বমি পাচ্ছে। নিতাইদা বলে একজন টেকনিশিয়ান ধরে ধরে ভেতরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিয়ে বললেন, পাখার বাতাস করি দিদি। আপনি শুয়ে থাকুন। সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু ঠিক আর হই কই ? ইন্দ্রপুরী স্টুডিও-র অনেকগুলো দরজা ছিল। এভাবেই বিছানায় শুয়ে যখন ছটফট করছি দেখি পেছনের দরজা দিয়ে উত্তমদা ঢুকলেন। আমার অবস্থা দেখতে। দাঁড়াননি একটুও। হেঁটে যেতে যেতে বললেন, 'যা সহ্য হয় না তা খাওয়া কেন !' তারপর বেণুদিকে পাঠালেন।
বেণুদি এসে আমায় নিয়ে গেলেন ড্রেসিং রুমে। সেখানে গিয়ে বসতেই হুড়হুড়িয়ে বমি করলাম। তারপর যেন শান্তি হল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার অবস্থা দেখে ব্রেক দেওয়া হয়েছিল আমায়। প্রায় ঘণ্টা চারেক টানা ঘুমোনোর পর যখন উঠলাম তখন ঝরঝরে। আর পেট জ্বলছে খিদেয়। খাবার চাইতেই দেখি গরম গরম খাবার আমার সামনে ধরলেন এক টেকনিশিয়ান দাদা। অবাক হয়ে তাকাতেই বললেন, দাদা-র কড়া হুকুম। বলেছেন, 'লিলির শরীর খারাপ। ওকে একদম ডাকবে না। আর ঘুম ভাঙার পর খেতে চাইলে ভালো করে খেতে দেবে। গরম করে। ঠান্ডা, পান্তা যেন খেতে দিও না !'
এমনটাই ছিলেন আমাদের মহানায়ক উত্তমকুমার।
তাঁর ভুবনভোলানো
হাসি, অকৃত্রিম রোমান্টিক চোখের দৃষ্টি আর অতুলনীয় অভিনয়ের গুণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম
পেরিয়েও বাঙালি দর্শকদের হৃদয়ের মণিকোঠায় তিনি মহানায়ক। ১৯৪৮ সালে 'দৃষ্টিদান' দিয়ে
শুরু আর ১৯৮০ সালে এসে 'ওগো বধূ সুন্দরী' ছবিতে অভিনয় করার সময় জীবনাবসান। মাত্র ৫৪
বছরের ক্ষণজন্মা কিংবদন্তী অভিনেতা উত্তম কুমার চলচ্চিত্র শিল্পকে দিয়েছেন ঝাড়া ৩২
বছর। এ হেন উত্তমকুমার জীবদ্দশায় একটি সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, “সুচিত্রা পাশে না থাকলে আমি কখনোই
উত্তমকুমার হতে পারতাম না। এ আমার বিশ্বাস। আজ আমি উত্তমকুমার হয়েছি, কেবল ওর জন্যই।”
এই ছিলেন উত্তম।
‘দেয়া নেয়া’ ছবিতে তরুনকুমারের অভিনয়ও মনে দাগ কাটে। উত্তমকুমার বলতেন, সাবি (সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়) ও তরুন, দুজনে আমার থেকে অনেক ভাল অভিনেতা। ওদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে ভয় লাগে। ভাবুন একবার !
ছবির প্রতি এক অদম্য আগ্রহ ছিল উত্তমকুমারের ! কোনও বাছবিচার ছিল না, যে-কোনও চরিত্রেই অভিনয় করতে রাজি হয়ে যেতেন, অভিনয়ের এক চূড়ান্ত খিদে তাকে কুড়েকুড়ে খেত! নিউ থিয়েটার্সের দিলীপ সরকার বলেছিলেন, “উত্তম ছবিতে অভিনয় করার ব্যাপারে ভীষণ আগ্রহী ছিলেন। একবার উনি এসেছেন, তখন নিউ থিয়েটার্সে একটা ছবির শুটিং চলছিল। পরের দিন বিয়েবাড়ির একটা দৃশ্যের শুটিং হবে, তার জন্য বরযাত্রীর লোক লাগবে। তাঁকে বলতেই রাজি হয়ে গেলেন। পরের দিন ধুতি-পাঞ্জাবি পরে তৈরি। এই ছিলেন উত্তম।”
১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত একের পর এক সিনেমা করলেও সব কটাই ফ্লপ হয়। তার মধ্যে ‘বসুবাড়ি’ ছবিটি তাও যা একটু চলেছিল। সেইসময় উত্তমকুমারকে দেখলেই টালিগঞ্জের লোকজন মুখ ফিরিয়ে নিতেন। উত্তমের নাম-ই হয়ে উঠল ফ্লপমাস্টার জেনারেল। এমনকী তখনকার হিট নায়ক-অভিনেতারা প্রযোজক-পরিচালকদের বলতেন, ‘কেন ওকে নিচ্ছেন ছবিতে! টাকাটা জলে ফেলবেন কেন ?’ সেইসব কথা কানে যেত উত্তমের, কিন্তু তিনি দমে যাননি ! তিনি যে মহানায়ক হতে এসেছিলেন... অল্পসল্পতে হাল ছেড়ে দেওয়া কি আর তাঁকে মানায় ? মুখ বুজে সব সহ্য করতেন , কাউকে একটা কথাও বলেননি, উপরন্তু সেই সমস্ত লোকের সঙ্গে পরবর্তী কালে, যখন তিনি সাফল্যের শীর্ষে, তখনও হেসে কথা বলেছেন।
সত্যিই উত্তমকুমারের কোনও বিকল্প হয় না।
*
(১)
জীবন খাতার প্রতি পাতায় যতই লেখ হিসাব নিকাষ
কিছুই রবে না।
লুকোচুরির এই যে খেলা প্রাণের যত দেয়া নেয়া
পুর্ন হবে না॥
কণ্ঠ ভরা এ গান শুনে- ছুটে তুমি এলে দ্বারে ।
চোখে দেখে এত করেও চেননিতো কভু তারে ।
অবহেলা সহেও তবু আমায় তুমি নাও গো ডেকে
সেতো কবে না॥
যে আঁখি হয়না খুশি আকাশ ভরা তারা দেখে ।
সেই হাসি কাচের ঝারে মোমের বাটি জ্বেলে রেখে ।
জানি আমি আমার এ মন এ গান আমার ভালবাসুক ।
নিজের ভুলে পথের ধুলে পরশ মানিক ফেলে আসুক ।
তোমার প্রাণের ওই ঠিকানে দেখেও আমায় তবু কি গো
ডেকে রবে না॥ [ শিল্পী – শ্যামল মিত্র ]
(২)
এ গানে প্রজাপতি পাখায় পাখায় রঙ ছড়ায়
এ গানে রামধনু তার সাতটি রঙের দোল ঝরায়।
এ গানে প্রজাপতি পাখায় পাখায় রঙ ছড়ায়॥
সীমানা ছাড়িয়ে যায় যে হারিয়ে
গানে আমার কে যে দিলো সুর
সে তো জানি না
সে তো জানি না॥
আমার এ গান সুনীল সাগর কোলে
মুক্ত খোঁজে শুধু যে ঝিনুক তোলে
লা লা লা, লা লা লা, লা লা লা
সে কার বাঁশিতে চায় যে হাসিতে
কাছে আমার আসে কেন দূর
কাছে আমার আসে কেন দূর
সে তো জানি না
সে তো জানি না॥ [ শিল্পী – সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ]
(৩)
মাধবী মধুপে হল মিতালি
এই বুঝি জীবনের মধু গীতালি
জ্বলে দেখি জোনাকি মন হল আনমনা কি
মাধবী মধুপে হল মিতালি
এই বুঝি জীবনের মধু গীতালি।
তাই কি বাতাস ফুলের গন্ধে ভরানো
তাই কি নয়ন মধুর স্বপ্নে জরানো
যদি চুপি চুপি কথা বলে মন
সেই কথা বল কভু যায় শোনা কি ?
জ্বলে দেখি জোনাকি মন হল আনমনা কি
মাধবী মধুপে হল মিতালি
এই বুঝি জীবনের মধু গীতালি।
এই যে এত আলো হাসি কখনো আগে জাগেনি
নিজেরে তো আর কোনোদিন এমন করে ভালো লাগেনি
ওগো পরাণের অভিমত
আজ হাতে বাঁশি তুলে দাও
উৎসবে এ লগন
সুরে সুরে দাও ভরে দাও
আজ চোখে চোখে চেয়ে সারারাত
হবে শুধু আকাশের তারা গোনা কি?
জ্বলে দেখি জোনাকি মন হল আনমনা কি। [ শিল্পী – আরতি মুখোপাধ্যায় ]
(৪)
দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা ।
দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা ।
দোলে কৃষ্ণ দোলে ঝুলনা ।
দোলে রাই দোলে ঝুলনা ।
দোলে দোদুল নাই তুলনা তুলনা ।।
রাধার অধরে জাগে হাসি ।
কহিছে ডেকে শ্যামের বাঁশি ।
এ লগন রাই ভুল না ।।
ধা নি পা নি সা রে-
নি-সা-গারে মা গা পা –
পা নি সা রে গা রে সা নি ধা পা মা গা রে সা
দোলে শিখি পাখা দোলে সুখ-সারি
ময়ূরী দোলে প্রেম অভিসারি ।
এ রাতের নাই তুলনা
এ লগন রাই ভুলনা ।।
মাধব কহিছে ওগো রাধা–
তুমি আমি একই সুরে বাঁধা
ওগো- তুমি আমি একই সুরে বাঁধা ।
এ বাঁধন কভু খুলোনা॥ [ শিল্পী – শ্যামল মিত্র ও মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় ]
(৫)
আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন
আজ ওই চোখে সাগরের নীল
আমি তাইকি গান গাইকি
বুঝি মনে মনে হয়ে গেল মিল।
কবরীতে ওই ঝর ঝর কনকচাঁপা
না বলা কথায় থর থর অধর কাঁপা ।
তাই কি আকাশ হল আজ আলোয় আলোয় ঝিলমিল ।
আমি তাইকি গান গাইকি
বুঝি মনে মনে হয়ে গেল মিল।
এই যেন নই গো প্রথম, তোমায় যে কত দেখেছি –
স্বপনেরও তুলি দিয়ে তাই, তোমার সে ছবি এঁকেছি-
মৌমাছি আজ গুন গুন দোলায় পাখা
যেন এই হৃদয় রামধনু খুশিতে মাখা
তাই কি গানের সুরে আজ ভরে আমার রিনিকি ।
আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন
আজ ওই চোখে সাগরের নীল
আমি তাইকি গান গাইকি
বুঝি মনে মনে হয়ে গেল মিল। [ শিল্পী – শ্যামল মিত্র ]
(৬)
গানে ভুবন ভরিয়ে দেবে ভেবেছিল একটি পাখী
হঠাৎ বুকে বিঁধল যে তীর স্বপ্ন দেখা হল ফাঁকি
তাই গান শোনাতে হায় কণ্ঠ কেঁপে যায়
তারে হাসিমুখে যেতে দাও শেষবার শুনে নাও
মনে রেখো মনে রেখো তার এই শেষ গান।
যার গান শুনে একদিন কণ্ঠে পরালে মালা
আজ তোমাদের সভা হতে তার বিদায় নেবার পালা
ঝড়ে কত তারা আলোকে মনে রাখে বলো কে?
ছিল কত সুখ বুকে তার জানিবে না কেহ আর
মনে রেখো মনে রেখো তার এই শেষ গান॥ [ শিল্পী – শ্যামল মিত্র ]
(সমাপ্ত)
#
©গৌতমদত্ত
১৩ আগস্ট ২০২০
#
কৃতজ্ঞতা :-
১) উইকিপিডিয়া এবং বাংলাপিডিয়া।
২) কৃশানু ভট্টাচার্য – ‘দেয়া নেয়া ৫০ - শ্যামল মিত্র ২৫’ – আর্কাইভস ডট আনন্দবাজার ডট কম।
৩) উপালী মুখার্জী’র অনুলিখনে - ‘মৃদু ধমকে মহানায়ক বলেছিলেন, যা সহ্য হয় না তা খাওয়া
কেন !’ লিলি চক্রবর্তী – মুভিজ ডট এনডিটিভি ডট কম।
৪) ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল থেকে সুপারস্টার’ – বেঙ্গলী ডট নিউজএইট্টিন ডট কম।
৫) রূপায়ণ ভট্টাচার্য - রাগমালার মানবেন্দ্র – ফেসবুক
৬) অরিত্র দাশ - “সুচিত্রা পাশে না থাকলে আমি কখনোই উত্তমকুমার হতে পারতাম না” –
বঙ্গদর্শন ডট কম।
৭) এবং অবশ্যই গুগুল।
