স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা - (৫)

 

দিল্লী দূর অস্ত্‌

দিল্লীকালাড্ডু যো খায়া উ ভি পস্তায়া অউর যো নেহী খায়া উ ভি পস্তায়া।

একথা সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে শুনে কান পচে গেছে। ছাত্র জীবনে কতবার ভেবেছি যে কবে দিল্লী দেখবো তাজ দেখবো। কিন্তু সে সব দেখেছি অনেক পরে।

রাজধানী দিল্লি। ঐতিহাসিক এক শহর। আমার প্রাক্তন এক অফিস কলীগ যিনি তাঁর যৌবনে কাটিয়েছিলেন দিল্লীতে তাঁর কাছে শুনতাম দিল্লীর চারপাশে আগে কতো ময়ূর হরিন চড়ে বেড়াত। তিনি বলতেন একটু এদ্দিক ওদিক গেলেই দেখা যেত ঝোপ ঝাড় আর অজস্র ময়ূর আর হরিনের পাল। 

দিল্লী তো আমরা অনেকেই প্রায় হামেশাই যাই। কখনো কাজে, কখনো বেড়াতে আবার কখনো লেখাপড়ার জন্যে নানান ধান্দায়। একদিনের একটা কনডাক্‌টেড ট্যুর আর কুতুব মিনার। তারপরে হয় আগ্রা কিংবা হরিদ্বার। বাঙালির রুট ম্যাপে এই ভাবেই টিক্‌ পড়ে।

কিন্তু কজন যায় নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগায় !  যেখানে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন আমীর খসরু, কবি গালিব। খোলা আকাশের তলায় চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন আমাদের বোন জাহানারা। খুব বেশি দূর নয় দিল্লী থেকে। তবুও কজনই বা যায় আর ! আমি গেছিলাম একজনের লেখা পড়ে। বইটা পড়েছিলাম হয়তো ঊনিশ শ আশিতে। আর নিজামুদ্দিন আউলিয়ায় গেছিলাম আরো ধরে নিন পাঁচ ছ বছর পরে। এই বইটি আমার এক স্বপ্নের বই। বাঙলা সাহিত্যেরও। এখনো বেস্ট সেলার মনে হয় এই কাদা ছোঁড়াছুড়ি মার্কা সাহিত্যের যুগে। নতুন দিল্লী তৈরি হওয়ার এমন সুন্দর বর্ণনা আর কোনো বাঙলা বইতে আছে কিনা তা আমার জানা নেই। এই বইটায় দুটি চরিত্র আমার সত্যিই খুব প্রিয়। প্রথমজন নিজামুদ্দিন আউলিয়া। আর দ্বিতীয়জন ? পরেই বলি না হয় ! লেখকের জবানীতেই শুনি বরং নিজামুদ্দিন আউলিয়ার গপ্পো।

পাঠান সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজী তৈরী করেছিলেন একটি মসজিদ সেদিনকার দিল্লীর এক প্রান্তে। তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘকাল পরে একদা এক ফকির এলেন সেই মসজিদে। ফকির নিজামুদ্দিন আউলিয়া। স্থানটি তাঁর পছন্দ হলো। সেখানেই রয়ে গেলেন এই মহাপুরুষ। ক্রমে প্রচারিত হলো তাঁর পুণ্যখ্যাতি। অনুরাগী ভক্তসংখ্যা বেড়ে উঠল দ্রুত বেগে।

স্থানীয় গ্রামের জলাভাবের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট হলো তাঁর। মনস্থ করলেন খনন করবেন একটি দীঘি যেখানে তৃষ্ণার্ত পাবে জল, গ্রামের বধূরা ভরবে ঘট এবং নামাজের পূর্বে প্রক্ষালণ দ্বারা পবিত্র হবে মসজিদে প্রার্থনাকারীর দল। কিন্তু সংকল্পে বাধা পড়ল অপ্রত্যাশিতরূপে। উদ্দীপ্ত হলো রাজকোষ। প্রবল পরাক্রান্ত সুলতান গিয়াসুদ্দিন তোগলকের বিরক্তিভাজন হলেন এক সামান্য ফকির দেওয়ানা নিজামুদ্দিন আউলিয়া।

তোগ্‌লক রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গিয়াসুদ্দিনের পিতৃপরিচয় কৌলিন্য-যুক্ত নয়। ক্রীতদাসঅরূপে তাঁর জীবন আরম্ভ। কিন্তু বীর্য এবং বুদ্ধির দ্বারা আলাউদ্দিন খিলজীর রাজত্বকালেই গিয়াসুদ্দিন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন বিশিষ্ঠ ওমরাহরূপে। সম্রাটের মালিকদের মধ্যে তিনিই হয়েছিলেন অন্যতম।......

......   কিন্তু গিয়াসুদ্দিনের বিচক্ষণতা ছিল। সেকালে মুঘলদের আক্রমণ এবং আনুষঙ্গিক হত্যাকাণ্ড ও লুণ্ঠন ছিল উত্তর ভারতের এক নিরন্তর বিভীষিকা। গিয়াসুদ্দিন তাদের আক্রমণ ব্যর্থ করতে পত্তন করলেন নূতন নগর, তৈরী করলেন নগর ঘিরে দুর্ভেদ্য প্রাচীর এবং প্রাচীরদ্বারে দুর্জয় দুর্গ। একদিকে ক্ষুদ্র পর্বত আর একদিকে প্রাচীরবেষ্টিত নগরী, মাঝখানে খনিত হলো বিশাল জলাশয়। বর্ষার দিনে শৈলশিখর থেকে ধারাস্রোতে জল সঞ্চিত হতো এই জলাশয়ে ; সংবৎসরের পানীয় সম্পর্কে নিশ্চিত আশ্বাস থাকতো প্রজাপুঞ্জের।

ফকির এবং সুলতানে সংঘর্ষ ঘটলো এই নগর নির্মাণ, কিম্বা আরো সঠিকভাবে বলতে বলতে হয় নগরপ্রাচীর নির্মাণ উপলক্ষ করেই।

নিজামুদ্দিন আউলিয়ায় দিঘী কাটাতে মজুর চাই প্রচুর। গিয়াসুদ্দিনের নগর তৈরী কোরতেও মজুর আবশ্যক সহস্র সহস্র। অথচ দিল্লীতে মজুরের সংখ্যা অত্যন্ত পরিমিত, দুজায়গায় প্রয়োজন মিটানো অসম্ভব। অত্যন্ত স্বাভাবিক যে বাদশা চাইলেন মজুরেরা আগে শেষ করবে তাঁর কাজ, ততক্ষণ অপেক্ষা করুক ফকিরের খয়রাতি খনন। কিন্তু রাজার জোর অর্থের, সেটা পরিমাপ করা যায়। ফকিরের জোর হৃদয়ের, তার সীমা শেষ নেই। মজুরেরা দলে দলে কাটতে লাগলো নিজামুদ্দিনের তালাও। সুলতান হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, তবে রে

কিন্তু তার ধ্বনি আকাশে মিলাবার আগেই এত্তালা এল আশ কর্তব্যের। বাংলাদেশে বিদ্রোহ দমন করতে ছুটতে হলো সৈন্য সামন্ত নিয়ে।

শাহজাদা মহম্মদ তোগ্‌লক রইলেন রাজধানীতে রাজ-প্রতিভূরূপে। তিনি নিজামুদ্দিনের অনুরাগীদের অন্যতম। তাঁর আনুকূল্যে দিবারাত্রি খননের ফলে পরহিতব্রতী সন্ন্যাসীর জলাশয় জলে পূর্ণ হলো অনতিবিলম্বে। তোগলকাবাদের নগর-প্রাচীর রইল অসমাপ্ত।

অবশেষে সুলতানের ফেরবার সময় হলো নিকটবর্তী। প্রমাদ গণনা করল নিজামুদ্দিনের অনুরাগীরা। তারা ফকিরকে অবিলম্বে নগর ত্যাগ করে পলায়নের পরামর্শ দিল। ফকির মৃদু হাস্যে তাদের নিরস্ত করলেন,-দিল্লী দূর অস্ত্‌

প্রত্যহ যোজন পথ অতিক্রম করছেন সুলতান। নিকট হতে নিকটতর হচ্ছেন রাজধানীর পথে। প্রত্যহ ভক্তরা অনুনয় করে ফকিরকে। প্রত্যহ একই উত্তর দেন নিজামুদ্দিন,-দিল্লী দূর অস্ত্‌

সুলতানের নগর প্রবেশ হলো আসন্ন, আর মাত্র একদিনের পথ অতিক্রমণের অপেক্ষা। ব্যাকুল হয়ে শিষ্য প্রশিষ্যেরা অনুনয় করল সন্ন্যাসীকে, এখনও সময় আছে, এই বেলা পালান। গিয়াসুদ্দিনের ক্রোধ এবং নিষ্ঠুরতা অবিদিত ছিলনা কারো কাছে, ফকিরকে হাতে পেলে কি দশা হবে তাঁর সে কথা কল্পনা করে তারা ভয়ে শিউরে উঠল বারংবার। স্মিত হাস্যে সেদিনও উত্তর করলেন বিগতভয় সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী, ,-দিল্লী হনুজ দূর অস্ত্‌। দিল্লী এখনও অনেক দূর। হাতে জপের মালা ঘোরাতে লাগলেন নিশ্চিন্ত ঔদাসীন্যে।

নগরপ্রান্তে পিতার অভ্যর্থনার জন্য মহম্মদ তৈরী করেছেন মহার্ঘ মণ্ডপ। কিংখাপের সামিয়ানা। জরীতে, জহরতে ঝলমল। বাদ্যভাণ্ড, লোকলস্কর, আমীর ওমরাহ মিলে সমারোহের চরমতম আয়োজন। বিশাল ভোজের ব্যবস্থা, ভোজের পরে হস্তীযূথের প্রদর্শনীপ্যারেড।

মণ্ডপের কেন্দ্রস্থলে ঈষৎ উন্নত ভূমিতে বাদশাহের আসন, তার পাশের তাঁর উত্তরাধিকারীর। পরদিন গোধূলি বেলায় সুলতান প্রবেশ করলেন অভ্যর্থনা মণ্ডপে। প্রবল আনন্দোচ্ছ্বাসের মধ্যে আসন গ্রহণ করলেন। সিংহাসনের পাশে বসালেন নিজ প্রিয়তম পুত্রকে। কিন্তু সে মহম্মদ নয়, তার অনুজ।

ভোজনান্তে অতি বিনয়াবনত কণ্ঠে মহম্মদ অনুমতি প্রার্থনা করলেন সম্রাটের। জাঁহাপনার হুকুম হলে এবার হাতীর কুচকাওয়াজ শুরু হবে। হস্তিযূথ নিয়ন্ত্রণ করবেন তিনি নিজে। গিয়াসুদ্দিন অনুমোদন করলেন স্মিতহাস্যে।

মহম্মদ মণ্ডপ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন ধীর শান্ত পদক্ষেপে।

কড়্‌ কড়্‌ কড়্‌ড় কড়াৎ।

একটি হাতীর শিরসঞ্চালনে স্থানচ্যুত হলো একটি স্তম্ভ। মুহূর্ত মধ্যে সশব্দে ভূপতিত হলো সমগ্র মণ্ডপ।

চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল অসংখ্য কাঠের থাম। চাপাপড়া মানুষের আর্ত কণ্ঠে বিদীর্ণ হলো অন্ধকার রাত্রির আকাশ। ধূলায় আচ্ছন্ন হলো দৃষ্টি। ভীত সচকিত ইতস্ততঃ ধাবমান হস্তিযূথের গুরুভার পদতলে নিষ্পিষ্ট হলো অগণিত হতভাগ্যের দল। এবং সে-বিভ্রান্তকারী বিশৃঙ্খলার মধ্যে উদ্ধারকর্মীরা ব্যর্থ অনুসন্ধান করল বাদশাহের।

 

পরদিন প্রাতে মণ্ডপের ভগ্নস্তূপ সরিয়ে আবিষ্কৃত হলো বৃদ্ধ সুলতানের মৃতদেহ। যে প্রিয়তম পুত্রকে তিনি উত্তরাধিকারী মনোনীত করেছিলেন মনে মনে, তার প্রাণহীন দেহের উপরে সুলতানের দুই বাহু প্রসারিত। বোধ করি আপন দেহের বর্মে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন তাঁর স্নেহাস্পদকে।

সমস্ত ঐহিক ঐশ্চর্য প্রতাপ ও মহিমা নিয়ে সপুত্র গিয়াসুদ্দিনের শোচনীয় জীবনান্ত ঘটল নগরপ্রান্তে। দিল্লী রইল চিরকালের জন্য তাঁর জীবিত পদক্ষেপের অতীত।

দিল্লী দূর অস্ত্‌। দিল্লী অনেক দূর।

 

নিজামুদ্দিনের দরগায় প্রবেশ করে আজও প্রথমেই চোখে পড়ে আউলিয়া খনিত পুকুর। তার পাশ দিয়ে আসা গেল এক প্রশস্ত চত্বরে যার মাঝখানে সমাধিস্থ হয়েছে ফকিরের দেহ। সমাধির উপরে ও আশেপাশে রচিত হয়েছে সুদৃশ্য ভবন ও অলিন্দ। উত্তরকালে সম্রাট সাজাহান সমাধির চারদিক ঘিরে তৈরী করেছেন শ্বেত পাথরের খিলান ; প্রাঙ্গণ বেষ্টিত করেছেন সূক্ষ্ম কারুকার্য-খচিত জালিকাটা পাথরের দেয়ালে। .........

হিন্দুর অন্তিম অভিলাষ গঙ্গাতীরে দেহরক্ষার ন্যায় শত শত বর্ষ ধরে দিল্লীর বিত্তশালীরা কামনা করেছেন আউলিয়ার কবরের নিকট সমাধিস্ত হতে, চেয়েছেন জীবনান্তে মীর মজলীসের সান্নিধ্য। তাই তার আশেপাশে আছে সংখ্যাতীত আমীর ওমরাহের সমাধি। তারই মধ্যে একটির গর্ভে আছে কবি আমীর খসরুর দেহাবশেষ।

খসরুর প্রতিভা ছিল বিস্ময়কর ; খ্যাতি ছিল বহুবিস্তৃত। দিল্লীর কবিগোষ্ঠিতে তিনি ছিলেন অনন্যসাধারণ।

নিজামুদ্দিনের সংলগ্ন সমাধিক্ষেত্রে আর একজন কবি রয়েছেন চিরনিদ্রিত, যাঁর রচনা আজও উর্দু সাহিত্যে অজাতশত্রু। কবি গালিবের সমাধিটি আড়ম্বরহীন, সাধারণ পারস্তর-বেদিকায় মাত্র আবৃত।

.........মুসলমানেরা প্রিয়তম-প্রিয়তমার স্মৃতিকে করতে চেয়েছে কালজয়ী। রাখতে চেয়েছে স্মারকচিহ্ন। তাই সৌধ গড়েছে পিতার, পতির, পত্নীর এমন কি উপপত্নীর সমাধিতে। হিন্দুরা তপস্বী, তারা দিয়েছে বেদ ও উপনিষদ। মুসলমানেরা শিল্পী, তারা দিয়েছে তাজ ও রঙমহল। হিন্দুরা সাধক, তারা দিয়েছে দর্শন। মুসলমানেরা গুণী, তারা দিয়েছে সঙ্গীত্র। হিন্দুর গর্ব মেধার, মুসলমানের গৌরব হৃদয়ের। এই দুই নিয়েই ছিল ভারতবর্ষের অতীত ; এই দুই নিয়েই হবে তার ভবিষ্যৎ। একটিকে বাদ দিলেই পাকিস্তান,--মিস্টার মহম্মদ আলি জিন্না না চাইলেও।

.........

জাহানারা ও জেবুন্নেসা দুজনেই ছিলেন আওরঙ্গজেবের অতি নিকটতম আত্মীয়া। একজন অনুজা, অপরজন আত্মজা। দুজনেই ছিলেন রূপসী, দুজনেই ছিলেন অসাধারণ নির্ভীক ও তেজস্বিনী। দুজনেই চিরকুমারী এবং দুজনেরই জীবনের সুদীর্ঘকাল কেটেছে আওরঙ্গজেবের কারাগৃহে।

কিন্তু আরও এক জায়গায় এই দুই দুর্ভাগিনীর মিল ছিল গভীরতর। তারা দুজনেই ছিলেন কবি। মুঘল যুগের মহিলা কবি।

জাহানারার সমগ্র রচনা সযত্নে রক্ষিত হয়নি। গহন অরণ্যে প্রস্ফুটিত পুষ্পের মতো প্রায় সবই লোকচক্ষুর অন্তরালে ধুলিতে হয়েছে বিলীন। দুএকটি মাত্র নিদর্শন আছে ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত।

জেবুন্নেসার কাব্যখ্যাতি অধিকতর বিস্তৃত। জেব উল্‌-মুনশোয়াতে সত্যিকার কাব্যপ্রতিভার চিহ্ন আছে।

এই দুজনেরই সমাধি রয়েছে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগায়। ছাদহীন, মণ্ডপহীন এই চৌকো জায়গায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই দুই রমণী। শুধু জাহানারার কবরের ওপরে লেখা আছে তাঁরই লেখা একটা কবিতা

বেগায়ব সবজা না পোশাদ কসে মাজারে মারা

কে কবর পোষে গড়িবান্‌ হামিন্‌ গিয়াহ বসন্ত্‌।

--একমাত্র ঘাস ছাড়া আর যেন কিছু না থাকে আমার সমাধির ঊপরে। আমার মতো দীন অভাজনের সেই তো শ্রেষ্ঠ আচ্ছাদন।


( ২ )

এবারে আসি দ্বিতীয় চরিত্রের অবতারণায়। এ এক অদ্ভুত চরিত্র-চিত্রণ। এ চরিত্রকে হাজার চেষ্টায় ও ভোলা যায় না হৃদয় থেকে, বাঙলা সাহিত্য থেকে। এই বইটির প্রথম প্রকাশ বাঙলা ১৩৫৭ সালে। মানে ইংরেজির ১৯৫০ সাল। আজ থেকে একাত্তর বছর আগে। এবং আজও সমান তালে বিক্রি হয় এই বই। যাক্‌গে ! যা বলছিলাম।

আমার দ্বিতীয় প্রিয় চরিত্র এক মারাঠি ব্রাহ্মণের। সে কথাই শোনাই এবার

......বয়স চল্লিশের অনেক উপরে, মাথায় কালোর চাইতে সাদার ছোপ বেশী, বলিষ্ঠ দেহ, প্রশস্ত ললাট, উন্নত নাসা। সব চেয়ে আশ্চর্য তার চোখ দুটি। দীর্ঘায়ত নয়ন, অবনী ঠাকুরের আঁকা ভারতীয় চিত্রকলার অর্জুনের মতো। তাতে অপরিসীম ক্লান্তির ছাপ। দৃষ্টিতে বুদ্ধির দীপ্তি আছে বটে, কিন্তু তাকে ছাপিয়ে আছে আষাঢ়ের জলভারনত ঘনমেঘের মতো কালো গম্ভীর ছায়া। সাধারণতঃ চোখে পড়ে না পুরুষের এমন অসাধারণ চোখ।

কিন্তু নয়াদিল্লীর সোসাইটিতে চারুদত্ত আধারকারের খ্যাতি পানীয়ঘটিত। এক বৈঠকে তিনি দশ পেগ হুইস্ক পান করতে পারেন অবলীলাক্রমে। চোখের পাতা কাঁপবে না এতটুকু। সেটা অভূতপূর্ব নয়। আরও দুচার জন পারেন তা। কিন্তু আধারকারের কৃতিত্ব শুধু পানীয়ের গ্রহণে নয়, উদ্ভাবনেও। সংখ্যাতীত মিক্সিং জানা আছে চারুদত্তের। ককটেল তৈরীর বহু পদ্ধতি তাঁর নখাগ্রে। ডিনারে, পার্টিতে নিমন্ত্রণকারিণীরা আগে ভাগে পরামর্শ করেন আধারকারের সঙ্গে। মহানন্দে মন্ত্রণা দেন তিনি। কে কে আসছে, কতজন আসছে ? যদি তিন রাউণ্ডেই ঘায়েল করতে চাও, তবে প্রথমে দাও রাম অরেঞ্জ, তারপর জিন অ্যাণ্ড লাইম। তারপর হুইস্কি। মেয়েদের জন্য মাঝখানে ব্রান্ডি দিতে পার জিঞ্জারেলের সাথে মিশিয়ে। কি বললে, রাম-অরেঞ্জ কেমন করে করবে জানো না ! হোয়াট এ পিটি ! আচ্ছা শিখিয়ে দিচ্ছি। shaker-এর মধ্যে সিকি ভাগ নাও ইটালিয়ান ভারমুথ। ইটালিয়ান নেই ? আচ্ছা অভাবে ফ্রেঞ্চই দাও। মেশাও সিকি ভাগ কমলালেবুর রস, অর্ধেক ঢালো রাম। বেশী করে বরফ, আর সামান্য একটু দারুচিনির রস। ব্যস। আচ্ছা করে মিশিয়ে এবার কক্‌টেল গ্লাসে পরিবেশন কর।

............কিন্তু আমার জন্যে এ সবের চেয়েও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। ভোজন পর্বের শেষে অতিথিদের সনির্বন্ধ অনুরোধে বেহালা বাজিয়ে শোনালেন আধারকার। দরবারী কানেড়ার সুর। গৎ নয়, শুধু আলাপ। প্রায় মিনিট কুড়ি ধরে বাজালেন অপূর্ব দক্ষতায়। বাজনা শেষে আমার পানে তাকিয়ে বললেন, বলতে পারো কী সুর বাজালেম, মিনি সাহেব ?’’

বিস্ময়ে হতবাক হয়ে রইলেম খানিকক্ষন, উত্তর দেওয়ার কথাই মনে রইল না। পরিষ্কার বাংলা।

কি, একেবারে থ হয়ে রইলে যে ? এবারও বাংলায়।

সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেম, আপনি আশ্চর্য। বাংলা শিখলেন কেমন করে ?

একি একটা প্রশ্ন ? তুমি ইংরেজী শিখেছ কেমন করে ?

আমি শিখেছি পেটের দায়ে।

আমি শিখেছি প্রাণের দায়ে। না, না, আর প্রশ্ন নয়, curiosity is a feminine vice.

      বিদায় নেবার আগে আন্তরিকতার সঙ্গে করমর্দন করে বললেন, মিনি সাহেব, তুমি বলছি বলে চটোনি তো মনে মনে ? তুমি তো বয়সে অনেক ছোটই হবে। আমি থাকি রটেণ্ডাম রোডে, বাইশ নম্বর। এস একদিন সন্ধ্যাবেলা, বাংলা বলবো, বেহালা শোনাবো, আর দেব টপ-হ্যাট। টপ-হ্যাট জানো তো ? জানো না ? অর্ধেক জিন, সিকিভাগ ফ্রেঞ্চ ভারমুথ সিকিভাগ ইটালিয়ান। একফোঁটা বিটার্স, তার সঙ্গে খুব খানিকটা বরফ।

আধারকারের বাড়িতে গেলেম। টপ-হ্যাটের লোভে নয়, লোকটির আশ্চর্য আকর্ষণে। একদিন গেলেম, দুদিন গেলেম। তারপর প্রত্যহ। কখনও বা সকালে এবং বিকেলে। ... অল্প সময়ে আন্তরিকতা এত ঘনিষ্ঠ হলো যে, আধারকার পুরুষ না হলে নিন্দুকের কুৎসারটনায় কলঙ্কিত হতে পারতো আমার নাম। ............গোটা তিন চার চাকর, বেয়ারা খানসামা নিয়ে আধারকারের হোম গভর্নমেন্ট। .........তর্ক চলে আলোচনা হয়। .........কোনো বিষয় বাদ পড়ে না। মাঝে মাঝে হয় কাব্যালোচনা। রবি ঠাকুরের বহু কবিতা তাঁর কণ্ঠস্থ। গভীর কণ্ঠে আবৃত্তি করেন মন দেয়া নেয়া অনেক করেছি মরেছি হাজার মরণে, নূপুরের মতো বেজেছি চরণে চরণে। আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন, বল, কোথায় আছে ?  বলতে পারলে বলেন, সাবাস্‌ ! Now you have earned a drink, নাও একটা অরেঞ্জ গিম্‌লেট খানিকটা জিন ও কমলালেবুর রস। এই্‌ বয়, সাবকোবাস্তে-- কোনো দিন বলেন, আজ পরীক্ষা। বল, কোথায় আছেআমারে যে ডাক দেবে তারে বারংবার এ জীবনে ফিরেছি ডাকিয়া ; সে নারী বিচিত্র বেশে, মৃদু হেসে, খুলিয়াছে দ্বার থাকিয়া থাকিয়া।

স্ত্রী নেই আধারকারের সেকথা সবাই জানে। কিন্তু আত্মীয়, পরিজন ? কারো জানা নেই কোনো তথ্য। হাসিতে, খুশিতে, গল্পে, গুজবে, সরগরম রাখেন মজলিশ, মুখরিত করেন নিজ গৃহের প্রাত্যাহিক বন্ধু সমাগম। তবু চোখের দিকে তাকালে মনে হয় এহ বাহ্য। কী এক গভীর দুঃখের ভার পুঞ্জীভূত হয়ে আছে ওই ভাবানত নয়নের অন্তরালে, নিঃসঙ্গ জীবনের পশ্চাতে আছে অপরিসীম বেদনার ইতিহাস। কিন্তু কৌশলে প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে আবৃত্তি করেন আধারকার,--

আমারে পাছে সহজে বোঝ তাইতো এত লীলার ছল ;

বাহিরে যার হাসির ছটা, ভিতরে তার চোখের জল।

এই হল চারুদত্ত আধারকার। আমার অত্যন্ত প্রিয় চরিত্র। লেখকের বর্ণনায় এমন মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ি যে বলবার কথা নয়। কিছু কিছু চরিত্র যতবারই পড়ি না কেন, পুরোনো হয় না। যেমন শ্রীকান্ত, যেমন অমিত রায়, যেমন অন্নদাদিদি আর ইন্দ্রনাথ, যেমন অপূর্ব কতো আর বলি। এই সব চরিত্রগুলো পড়তে পড়তে মিশে যাই যেন চরিত্রের সাথে। সর্বদাই মনে হয় যদি আমি হতে পারতাম। এ এক অদ্ভুত মাদকতা !     

আর এই বইটার বিশেষ সম্পদ হলো এর লেখনশৈলী। এই বইটি উপন্যাস নয় ইংরেজিতে এই বইটাকে বলা হয়, belle letters. বাংলায় আমরা একে রম্য রচনা বলেই ধরে নিতে পারি।

এই দুখানা চরিত্র ছাড়াও এই বইটাতে রয়েছে অসংখ্য চরিত্রের এক চাঁদমালা। আর রয়েছে আমাদের নতুন দিল্লী গড়ে ওঠার ইতিহাস। দিল্লীর অভিজাত মহলের নানা রকম টুকরো ছবিতে প্রাণ পেয়েছে এই বইটা। লেখকের ভাষার গঠন অসম্ভব ঋজু এবং বাহুল্যবর্জিত যাকে বলে। একটু উদাহরণ দিই :-

বিলাতে না গিয়ে যাহারা সায়েব, তাঁরা আরও দুধর্ষ। কংগ্রেস থেকে লীগে যোগ দেওয়া মুসলমানের মতো, হিরোডকে করেন আউটহিরোড। স্লিপিং পায়জামা না পরে ঘুমানো বা ছুরি কাঁটা দিয়ে না খাওয়াকে তাঁরা প্রায় মধ্যযুগের গঙ্গায় সন্তান বিসর্জন বা সতীদাহের ন্যায় রোমহর্ষক বর্বরতা জ্ঞান করে থাকেন।

এক মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক প্রসঙ্গে লিখছেন চাকরীকে জানেন জীবনের অনিবার্য অবলম্বন, গভর্নমেন্ট পোস্টকে আকাঙ্খিত সৌভাগ্য। তাঁর ধ্যান, ধারণা, চিন্তা ও স্বপ্ন সমস্তই এই চাকরিকে কেন্দ্র করে। ক্যারেক্টার রোল নিয়ে তার আরম্ভ, পেন্সন নিয়ে তার শেষ। এবং এই আদি অন্তের মাঝখানে প্রোমোশন দিয়ে তার বিস্তার।

আবার ফিরি আধারকারে

আধারকারের কুলগত পেশা যুদ্ধ। তাঁর পূর্বপুরুষেরা লড়েছে মুঘলের সঙ্গে, লড়েছে যশোবন্ত সিংহের বিরুদ্ধে। তাঁর প্রপিতামহ বিষ্ণুদত্ত পেশোয়া বাজিরাওয়ের অন্যতম সেনাপতি ছিলেন। আসাইর যুদ্ধে পেশোয়ার দক্ষিণ পার্শ্ব থেকে শত্রু নিপাত করেছেন অমিতবিক্রমে। আধারকার বালক বয়সে দেখেছেন তাঁর রুধিরাক্ত লৌহবর্ম, পরিবারের সযত্নে রক্ষিত গৌরবময় উত্তরাধিকার। বীরের রক্ত আছে তাঁর ধমনীতে।

পরিবারে বিত্ত ছিল প্রচুর, বীর্য ছিল বিখ্যাত, কিন্তু বিদ্যা ছিল না আধুনিক। আধারকার পিতার একমাত্র সন্তান, শিক্ষা লাভ করেন পুণার এক ইংরেজী স্কুলে। এল্‌ফিন্‌স্টোন কলেজ থেকে পাশ করে গেলেন ম্যাঞ্চেস্টারে। বয়নবিদ্যাবিশেষজ্ঞ হয়ে যখন ফিরলেন স্বদেশে য়ুরোপের প্রথম মহাযুদ্ধ তখন ক্ষান্ত হয়েছে। বম্বেতে স্থাপন করলেন এক কাপড়ের কল, অসুরের মতো খাটতে লাগলেন তাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে।

বছর পাঁচেক পরের কথা। এক সন্ধ্যায় এক বন্ধুর আগমন সম্ভাবনায় এসেছেন দাদর ষ্টেশনে। বন্ধু এলেন না। ফিরে আসছেন এমন সময় কানে এল এক নারীকণ্ঠ। সে তো কণ্ঠ নয়, সে সুর। ভাষা বুঝলেন না, পিছনে তাকিয়ে দেখলেন, প্ল্যাটফরমে দাঁড়িয়ে এক তরুণী, সঙ্গে একজন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। সামনে সুটকেশ, হোল্ডঅল, বেতের ঝুড়ি ইত্যাদি মালপত্র। উভয়ের মুখে উদ্বেগের ছাপ সুস্পষ্ট। বম্বেতে তখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার তাণ্ডব চলছে সাঙ্ঘাতিক। ষ্টেশনের ভিতরে কুলির অভাব, বাইরে যানবাহনের। সন্ধ্যার পরে বাইরে যাওয়া নিরাপদ নয়।

        আধারকার জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি বম্বেতে এই প্রথম এলেন ?

ভদ্রলোক বললেন, হ্যাঁ, আমার এক আত্মীয় থাকেন এখানে। তাঁকে টেলিগ্রাম করেছিলাম ষ্টেশনে হাজির থাকতে। আসেননি দেখছি। বোধহয় টেলিগ্রাম পাননি।

......... আধারকার প্রস্তাব করলেন, যদি আপত্তি না থাকে, চলুন আমার ফ্ল্যাটে। কাল প্রাতে খোঁজ করা যাবে আপনাদের আত্মীয়ের। আমার সঙ্গে গাড়ী আছে।

       এর পরে সেই স্বামী স্ত্রী মুখ চাওয়াচায়ি। তরুণী একটু সঙ্কুচিত হয়ে জানালেন তাঁর স্বামীকে যে এই রাতে গিয়ে আধারকারের স্ত্রীকে বিরক্ত করা কি ঠিক হবে !

আবার সেই সুর। বোধকরি, এ সুর ছিল ভীমসিংহপত্নী পদ্মিনীর, যা দিয়ে তিনি রাজপুত যুবককে উদ্বুদ্ধ করিয়েছিলেন যুদ্ধে প্রাণ দিতে, হয় তো ছিল হেলেন অব ট্রয়ের, যাঁর জন্য সহস্র রণতরী ভেসেছিল সাগরে !

আধারকার যখন জানালেন যে তাঁর স্ত্রী নেই তখন ভদ্রমহিলা বলে উঠলেন অতি স্বাভাবিকভাবেই, আপনাকে ধন্যবাদ। আমরা কোনোরকম করে রাতটা প্ল্যাটফরমেই কাটিয়ে দেবো।

আধারকার গোয়ানিজ কুলীদের ভয় দেখিয়ে গুড নাইট করে চলে যেতে গিয়েও আবার ফিরে এলেন। প্রস্তাব দিলেন তাঁর ফ্ল্যাটেই যেতে আর উনি না হয় ওনার কর্মচারীর বাড়িতে গিয়েই শোবেন রাতটা। গোয়ানিজ কুলির বর্ণনায় মহিলাটির মনে ভয় ধরে। স্বামীটিও দোনামনা করে রাজি হলেন অবশেষে। কুলীর দেখা না পাওয়ায় আধারকারই বইলেন ঢাউস সুটকেশ দুখানা।

নিজের ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়ে আধারকার যেতে চাইতেই মহিলার বিচলিত স্বরে পরিষ্কার ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করলেন ওকি, কোথায় যাচ্ছেন ?

আমার কেরানীর বাড়িতে ?

কেরানীর বাড়ীতে ? সে কতদূর ?

মাইল পাঁচেক হবে। ......

কেন এ বাড়ি দোষ করল কী ?

দোষ নয়, মানে আপনাদের অসুবিধে—“

কে কবে ফেলতে পেরেছে এমন মধুর কণ্ঠের আকুতি !

মহিলা বলে উঠলেন ...আপনাকেই এই দাঙ্গা হাঙ্গামার রাত্রিতে বাড়ী থেকে তাড়িয়ে নিজেদের সুবিধা ভোগ করব, আমাদের এতোখানি জংলী ঠাওরালেন কেন ? তার চেয়ে বলুন, আমরা আবার সেই ষ্টেশনের প্ল্যাটফরমেই ফিরে যাচ্ছি।

ব্যাচিলর আধারকরের গৃহে একটিমাত্র খাট। তাঁর ইচ্ছে সেখানেই অতিথিরা দখল করুন। কিন্তু মহিলার কণ্ঠের যাদুতে তাঁকেই ঘুমোতে হলো তাঁরই ঘরে। মহিলাটি এবার আরো একটু স্বতঃস্ফুর্ত ; লোকটি আপনি সুবিধের নন, তা টের পেয়েছি ! অত্যন্ত ঝগড়াটে

পরের দিন আধারকারের ঘুম যখন ভাঙল তখন আটটা বাজে। সকালে উঠেই শুনতে হলো সুপ্রভাত আর অনুযোগ কাল রাত্তিরে শুতে যাবার সময় বললেন, আমাদের ভূমিশয্যার কথা মনে করে খাটে শুয়ে ভালো ঘুম হবে না আপনার। কনশেন্স খোঁচা মারবে। এই আপনার ঘুম না হওয়ার নমুনা ? কনশেন্সের খোঁচা নিয়ে বেলা আটটা ?

দেখতে পাচ্ছি, আমি ঘুমিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হতভাগা কনশেন্সটাও ঘুমে বেহুঁশ হয়েছিল।

ঊচ্চ হাস্য উত্থিত হলো টেবিলে।  স্বামী ও গৃহস্বামীর অট্টহাস্যের সঙ্গে মিশল নারীকণ্ঠের কলধ্বনি। মহিলা বললেন, তাই নাকের ডাকে পাশের ঘরে চোখের দুপাতা এক করা দায় !

নাকের ডাক ? নাক ডাকে নাকি আমার ? কই, আমি তো টের পাইনি কখনও।

ঐতো মজা ! যখন টের পাওয়ার অবস্থা হয়, নাক তখন আর ডাকে না। আবার সেই পুরুষ ও নারীকণ্ঠের সম্মিলিত হাস্যোচ্ছ্বাস। সন্ধ্যার কিছু আগে অতিথিরা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন তাঁদের আত্মীয়ের গৃহে। ......

তাঁদের গাড়িতে তুলে দিয়ে আধারকার এসে বসলেন বারান্দায়। পড়তে চেষ্টা করলেন অন্যদিনের মতো এক ইংরেজী প্রেমের উপন্যাস। এগুতে পারলেন না বেশীদূর। মন বার বার উন্মনা হতে লাগল।

সুনন্দা ব্যানার্জীরা দিন দশেক রইলেন বম্বেতে। প্রত্যহ অপরাহ্নে আপিস থেকে আধারকার সোজা এসে হাজির হতেন ব্যানার্জীর আত্মীয়গৃহে। দল বেঁধে যেতেন কোনোদিন সিনেমায়, কনোদিন এপোলো বন্দর, কোনোদিন মহালক্ষ্মী মন্দির, কোনোদিন বা এলিফেন্টার কেভস্‌।

বম্বে ত্যাগ করে স্বস্থানে প্রত্যাবর্তন করলেন ব্যানার্জী দম্পতি। আধারকার রইলেন বম্বেতে, ফিরে গেলেন আপন রূপহীন রসহীন, বৈচিত্রবর্জিত জীবনের ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তির মধ্যে। প্রভাত আর আনে না কোনো প্রত্যাশা, সন্ধ্যায় ঘটে না কোনো প্রার্থিত সান্নিধ্য, রাত্রিতে থাকে না পরবর্তী দিবসের প্রগাঢ় প্রতীক্ষা। সুনন্দাবিরহিত নগরীর কুত্রাপি নেই কোনো আকর্ষণ, কোনোখানেই নেই মধু, নেই স্বাদ।

কিন্তু বিচ্ছেদ মানেই নয় ছেদ, যতির অর্থ নয় ইতি। অদর্শনের সান্ত্বনা থাকে পত্রে, বাচনের বিকল্প লেখনে। লাহোর পৌঁছে সুনন্দা ব্যানার্জী লিখলেন,  মিস্টার আধারকার, নিরুপায় নিশীথে অপরিচিত আগন্তুকদের আপনি আশ্রয় দিয়েছিলেন। আতিথ্য দিয়েছিলেন অকৃপন ঔদার্যে, সে জন্য ধন্যবাদ। আপনার সৌজন্য স্মরণে রাখব চিরকাল।

জবাবে আধারকার লিখলেন, এক রাত্রির অবস্থিতির দ্বারা ব্যাচিলরের গুহাকে আপনি দিয়েছেন সম্মান, গৃহস্বামীকে দিয়েছেন দুর্জয় মর্যাদা। কৃতজ্ঞতা তো জানাব আমি। সৌজন্যের প্রকাশ কর্মে, সেটা সহজসাধ্য ; প্রীতির প্রবেশ মর্মে, তা দুরূহলভ্য। মিসেস্‌ ব্যানার্জী, আপনার অনুগ্রহ বচনাতীত।

ত্বরিত উত্তর এল পত্রের। দেখছি, আপনার কুশলতা শুধু আতিথেয়তার নয়, পত্ররচনায়ও বটে। মশাই, আপনি তো চারুদত্ত নন, আপ্পনি চারুবাক।

এমনি চিঠি লেখালিখির খেলা চলে দুই পক্ষে। সেচিঠিতে উক্তের চাইতে অনুক্তের ভাগ বেশী ; শব্দের চাইতে অর্থের।

এর মধ্যে নিজের মিলের কাজে আধারকারকে যেতে হল লাহোর। এবং অবধারিত ভাবেই অতিথি হলেন ব্যানার্জী বাড়ীতেই। এর পরের অংশ আমার জবানে মানাবেই না। তাই স্মরণ করি লেখককে

লাহোরে সেদিন অপরাহ্নবেলায় গিয়েছিলেন এক পরিচিত বন্ধু সন্দর্শনে, শহর থেকে অনেকতা দূরে। আশা ছিল সন্ধ্যার পূর্বেই প্রত্যাবর্তনের। কিন্তু এড়াতে পারলেন না অনুরোধ, নৈশভোজন সমাধা করতে হল সেখানে। ফেরার পথে নামল বৃষ্টি। তার উপরে বাহন হলো বিকল। টাঙ্গার অশ্ব ও আসন দুই-ই প্রাচীনত্বে সমান, চলতে চলতে একটি চাকা স্থানচ্যুত হয়ে ভেঙে পড়ল অকস্মাৎ ; আরোহী সবলে নিক্ষিপ্ত হলেন কর্দমাক্ত পথে। উত্তর ভারতে শীতকালের বর্ষণ বর্ষার প্রবল বারিপাতকেও হার মানায়। জনহীন প্রান্তরে সিক্ত হলেন দীর্ঘকাল, ব্যানার্জীগৃহে যখন এসে পৌঁছলেন রাত তখন প্রায় চারটা।

         মৃদু আঘাত করতেই দ্বার খুলে দিলেন যিনি তিনি স্বয়ং সুনন্দা।

কোথায় ছিলে এই বাদলার মধ্যে ? সারা রাত ধরে উৎকণ্ঠায় মরছি বলতে বলতে কণ্ঠ রুদ্ধ হলো বাস্পে। ঝর ঝর ধারায় অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ল দুই গন্ডে। আত্মসংবরণ করতে ত্বরিত অন্তর্হিতা হলেন পাশের কক্ষে।

দোর খোলার শব্দে গৃহস্বামীর নিদ্রা ভঙ্গ হয়েছিল। তিনি দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, কী ব্যাপার ! কোথায় ছিলেন এতক্ষণ ? আমরা ভেবে ভেবে মরি, বিদেশ বিভূঁই এই দুর্যোগের রাত্রিতে কোথায় কি হয়। সুনন্দা তো এক মিনিটের জন্য বিছানায় যায়নি, কেবল বারান্দায় এদিক ওদিক করেছে। একটু শব্দ হলেই তো টাঙ্গা এল ভেবে নীচে যায়।  

আধারকার বাহনবিভ্রাট বিবৃত করলেন সবিস্তারে, ক্ষমা প্রাথর্না করলেন নিজ বিলম্বের জন্য। সুনন্দা বেরিয়ে এসে গভীর কণ্ঠে বাধা দিয়ে বললেন, ভিজে জামা-কাপড়গুলি ছাড়া হবে কি ? টাঙ্গার চাকা কইঞ্চি ভেঙেছে, ঘোড়া কগজ লাফিয়েছে সে সব কাহিনী কাল সকালে ব্যাখ্যান করলে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। মাথা থেকে এখনও জল ঝরছে, নিউমোনিয়া না বাধালে বোধ হয় বাহাদুরিটা পূরা হবে না।

বোঝা গেল, শাসনকর্ত্রী নেপথ্যেই ছিলেন, টাঙ্গা দুর্ঘটনার বিবরণ শুনেছেন স্বকর্ণে।

আপন শয়নকক্ষে এসে নিদ্রার চেষ্টা করলেন আধারকার। ঘুম এল না। মুদ্রিত কমল-কলিকার পার্শ্বে গুঞ্জনরত  লুব্ধ ভ্রমরের মতো মন বারংবার কেবলই প্রদক্ষিণ করে ফিরতে লাগল একটি কক্ষপথে। অতিথির বিলম্বে গৃহকর্ত্রীর এই ব্যকুল উৎকণ্ঠা, বিনিদ্র নয়নে এই সূদীর্ঘ প্রতীক্ষা, সগোপন অভিমান-জড়িত এই শাসন এবং সর্বোপরি এই অশ্রুধারা প্লাবিত আননের মধ্য দিয়ে নারীহৃদয়ের কোন গোপন রহস্য আজ অকস্মাৎ উদ্‌ঘাটিত হলো ? শয্যা ত্যাগ করে আধারকার বাইরে এসে দাঁড়ালেন।

রাত্রি বিগতপ্রায়। তারকাহীন নভস্তল মেঘমালায় আবৃত এবং দিগন্তবর্তী তরুশ্রেণি বিলীয়মান রজনীর ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। আসন্ন প্রভাতের প্রতীক্ষারত ধরণীর এই প্রশস্ত গম্ভীর মূর্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আধারকার যেন আজ তাঁর জীবন-দেবতার প্রসন্ন কল্যাণ করস্পর্শ প্রথম অনুভব করলেন ললাটে। দুই হাত যুক্ত করে প্রণাম করলেন কাকে তা তিনি নিজেই জানেন না। শুধু আমি ধন্য, আমি ধন্য এই বাক্য উদ্বেল অন্তরের অন্তস্থল থেকে উত্থিত একটি মহান সঙ্গীতের মতো দ্যুলোক, ভূলোক পরিব্যপ্ত করে বিশ্বলোকের বীণাতন্ত্রীতে অনাহত রাগিণীতে ধ্বনিত হতে লাগল।

আধারকার থাকেন বম্বেতে সুনন্দা থাকেন লাহোরে। প্রায় এক হাজার মাইলের ব্যবধান। কিন্তু যোজনা গণনা করে নেয় দূরত্ব, নৈকট্যের নির্দেশ হৃদয়ে। হৃদয়ের সে অদৃশ্য যোগাযোগের নিবিড় বন্ধনে বহুদূরবর্তী এই দুটি নরনারী পরস্পরের কাছে রইলেন নিকটতম।

সুনন্দা একদিন কথাচ্ছলে বলেছিল, চারু, ইংরেজীতে কথা কয়ে সুখ নেই। আমি যদি মারাঠি বলতে পারতেম তবে বেশ হতো।

আধারকার বললেন, পর্বত যদি মহম্মদের কাছে না আসতে পারে, মহম্মদ যাবে পর্বতসকাশে।

অসাধ্য সাধন করলেন আধারকার। ছমাসে শিখলেন বাংলা, বৎসরকালে কণ্ঠস্থ করলেন রবীন্দ্রনাথের কাব্য, দুবছরে সাঙ্গ করলেন পঠনযোগ্য সমুদয় বাংলা সাহিত্য।

 

এর পরে চারুদত্ত গেলেন বিলেতে তাঁর নিজের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে। লাহোর থেকে সস্ত্রীক ব্যানার্জী পরিবার এসে জাহাজে তুলে দিয়ে গেলেন চারুদত্তকে। এরপরে দিন যায়, মাস যায়, এমন কি বছরও ঘুরে যায়। দেশে ফেরেন চারুদত্ত। এবং ফিরেই চেপে বসএন লাহোরগামী ট্রেনে। যথাসময়ে লাহোরে পৌঁছে চারুদত্ত আধারকার দেখেন শুধুই মিঃ ব্যানার্জী একা এসেছেন তাঁকে নিয়ে যেতে। বাড়ী পৌঁছেই আধারকার জানতে পারেন সুনন্দা কোথাও গেছেন। ফিরবেন সন্ধ্যেয়। অকারণ বেদনায় চারুদত্ত লক্ষ্য করেন সবকিছুই পরিপাটি, এমন কি তাঁর খাটের পাশে ফুলদানীতে রাখা প্রিয় ফুল শ্বেতকরবীও। কতো কি ভেবেছিলেন আধারকার। কতো গল্প করবেন। কিছুই হলো না সেসব। সুনন্দার আতিথেয়তা বা পরিচর্যায় কোনো ত্রুটি নেই কিন্তু শুধু কেমন আছ এই টুকু কথায় মন ভরলো না চারুদত্তের। এমন কি এক পরিচিতর বাড়ী গিয়ে আধারকার জানতে পারেন যে তাঁর লাহোরে আসার দিন সুনন্দা তাঁর এক পরিচিতা আত্মীয়ার সাথে সিনেমা দেখতে গেছিলেন। মনের কোনায় জল জমতে থাকে তাঁর। ফেরার দিন আধারকারকে ট্রেনে তুলে দিতে আসেন ব্যানার্জী দম্পতি। ওয়েটিং রুমের একান্তে সুনন্দার থেকে শোনেন দুটি মাত্র বাক্য তোমাকে আজ সারাদিন এত আনমনা দেখাচ্ছে কেন ?  কি এত ভাবছো বলো তো ? সংক্ষেপে আধারকার জানান সুনন্দাকে যে কিছুই হয় নি তাঁর। আস্তে আস্তে মিলিয়ে যেতে থাকে লাহোর স্টেশনের ডিসট্যান্ট সিগন্যাল।

এর মধ্যে ভাঙা হৃদয়কে জোড়া লাগাতে কসুর করলেন না আধারকার। বারকয়েক গেলেন লাহোর। কিন্তু কোথায় যেন একটা ছন্দপতনের নীরব ঝংকারে থিতু হতে পারলেন না তিনি। মেমসাহেব ব্যস্ত থাকলেন রসুইখানায়। একদিন বিকেলে সুনন্দাকে বলেই ফেললেন চলো বেড়িয়ে আসি সাহাদারা গার্ডেন। অনেকবার রিকোয়েস্ট করেও টলাতে পারলেন না সুনন্দাকে। উত্তরে শুনতে হলো একা তোমার সঙ্গে দেখলে লোকে কি বলবে ?

ফিরে এলেন বোম্বে। শীতের শেষে সেবারে বোম্বেতে দেখা দিল বসন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব। আধারকারের গায়েও দেখা দিল গুটিকা। পরেরদিন সন্ধ্যেবেলায় আধারকারের লাহোর এজেন্টের কাছে খবর পেয়ে এসে পৌঁছলেন সুনন্দা। আধারকার জিজ্ঞেস করলেন ব্যানার্জীকে দেখছি না যে ? উত্তরে জানলেন একাই এসেছে সুনন্দা। আধারকারের মুখেই শুনলেন চাকরবাকরেরা পালিয়েছে ভয়ে। শুধু ড্রাইভারটিই যা আছে। সুনন্দা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে উঠলেন খাসা ব্যবস্থা ! খবরের কাগজে শুধু শোক সংবাদ ছাপাটুকুই যা বাকি !

পরের দিন এলেন ব্যানার্জী। জানা গেল চিকেন পক্স। একটু সেরে উঠতেই জোর করে আধারকারকে নিয়ে গেলেন লাহোরে। রইলেন প্রায় পনেরো দিন।

         সুনন্দারা হিন্দু নয়, খ্রীষ্টান। বহু বৎসর পূর্বে তাঁর পিতামহ এসে স্থায়ী আবাস গড়েছিলেন লাহোরে। সুনন্দা মানুষ হয়েছেন য়ুরোপীয় আবেষ্টনে, বিদ্যাভাস করেছেন শেতাঙ্গদের কন্‌ভেন্টে, পরিণীতা হয়েছেন খ্রীষ্টীয় প্রথায়। তাঁদের সমাজে তরুণীরা অবগুণ্ঠনবতী নয়, স্ত্রীরা নন অন্তঃপুরিকা। পুরুষের অবাধ সাহচর্য সেখানে নিন্দনীয় নয়, বাইরে বন্ধুসঙ্গ নয় নিষিদ্ধ। এমনকি বিবাহবিচ্ছেদ এবং পুনর্বিবাহেও সামাজিক অন্তরায় ছিল না সুনন্দার।

         কঠোর তিক্ত সত্য হৃদয়ঙ্গম করলেন আধারকার। মোহভঙ্গ হয়েছে সুনন্দার। সুধার পাত্র হয়েছে রিক্ত। মন্থন করলে আর উঠবে না মধু, উঠবে হলাহল।

এই সময়ে একদিন একটা সিনেমা দেখতে ঢুকে পড়লেন আধারকার। সিনেমা তখন শুরু হয়ে গেছে। কিছুক্ষন পরেই নিজের নাম শুনতে পেলেন আধারকার। গলা শুনে বুঝতে বাকি রইল না যে কার গলা ! এ গলাই তো তিনবছর আগে দাদর স্টেশনে শুনেছিলেন তিনি। বান্ধবীর চটুল বাক্যালাপের উত্তরে সুনন্দা পরিষ্কার করে জানালেন ......ছাড়া পেলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচি ! প্রশ্নকর্ত্রী বলতে গেলেন যে আধারকার তো পাত্র হিসেবে ভালই। ভদ্র, শিক্ষিত, বিত্তশালী, সিম্পল।

         সিম্পল নয় সিম্পলটন। কাণ্ডজ্ঞান নেই এতটুকু। সব জিনিষই অত্যন্ত সীরিয়সলি নেবে। কবে কখন fun করে কি বলেছি, কি করেছি, সেটাকেই মনে করে বসেছে, আমি ওর প্রেমে পড়েছি। ইডিয়ট ! সত্যি বলছি তোকে আমি ক্রমশঃ যেন টায়ার্ড হয়ে উঠছি।

সকলের অলক্ষ্যেই বেরিয়ে এলেন হল থেকে। সেই রাত্রেই ধরলেন বোম্বের ট্রেন। যুদ্ধক্ষেত্রে দেখা যায় বোমার আঘাতে আহতের একটি বাহু দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে অদূরে, অথচ তার সংজ্ঞা হয়নি বিলুপ্ত। এ্যাম্বুল্যান্স-বাহিত সে আহত স্পষ্ট দেখতে পায়, ফেলে রেখে যাচ্ছে সে আপন খণ্ডিত বাহু। আধারকার অনুভব করলেন সেই অনুভূতি। আপন চোখে দেখতে পেলেন, পশ্চাতে ফেলে রেখে যাচ্ছেনবাহু নয়, শতধাবিদীর্ণ হৃদয়।

ফান্‌ই বটে ! স্নেহ নয়, প্রীতি নয়, শোভাগন্ধ বিমণ্ডিত হৃদয়াবেগের বাস্পমাত্র নয়, শুধু কৌতুক। নিষ্ফল প্রণয়ের উপশম আছে করুণায়, কিন্তু উপহসিতের নেই সান্ত্বনা। তার লজ্জা দুঃসহ।

 

বোম্বে ফিরে চেষ্টা করলেন কাজে মন বসাতে। পারলেন না। জলের দামে বিক্রি করে দিলেন নিজের হাতে গড়া সাধের কারখানা। এক রাবার কোম্পানীর ম্যানেজারের চাকরী নিয়ে চলে গেলেন মালয়েশিয়ায়। পৃথিবীর বিভিন্নদেশ ঘুরে অবশেষে এক ব্রিটিশ কোম্পানীর ম্যানেজার হয়ে থেকে গেলেন দিল্লীতে। এই ঘটনা শুনতে শুনতে লেখক দেখলেন যে আধারকার কখন উঠে চলে গেছেন ঘর থেকে। তিনি বেরিয়ে পড়লেন আধারকারের বাড়ী থেকে।

       কানে কানে বাজতে থাকলো আধারকারের সংলাপ মিনি সাহেব, আমি ইডিয়টই বটে ! পরিহাসকে মনে করেছি প্রেম ; খেলাকে ভেবেছি সত্য। কিন্তু আমি তো একা নই। জগতে আমার মতো মূর্খরাই তো জীবনকে করেছে বিচিত্র ; সুখে দুঃখে অনন্ত মিশ্রিত। যুগে যুগে এই নির্বোধ হতভাগ্যের দল ভুল করেছে, ভালবেসেছে, তারপর সারা জীবনভোর কেঁদেছে। ...এদের ভুল, ত্রুটি, বুদ্ধিহীনতা নিয়ে কবি রচনা করেছেন কাব্য, সাধক বেঁধেছেন গান, শিল্পী অঙ্কন করেছেন চিত্র, ভাস্কর পাষাণ-খণ্ডে উৎকীর্ণ করেছেন অপূর্ব সুষমা। জগতে বুদ্ধিমানের করবে চাকরি, বিবাহ, ব্যাঙ্কে জমাবে টাকা, স্যাকরার দোকানে গড়াবে গহনা ; স্ত্রী, পুত্র, স্বামী, কন্যা নিয়ে নির্বিঘ্ন জীবন যাপন করবে স্বচ্ছন্দ স্বচ্ছলতায়। তবু আমরা মেধাহীনের দল একথা কোনোদিন মানবো না যে, সংসারে যে বঞ্চনা করল, হৃদয় নিয়ে করল ব্যঙ্গ, দুধ বলে দিল পিটুলী,তারই হলো জিত, আর ঠকল কেবল সে, যে উপহাসের পরিবর্তে দিল প্রেম।

শেষ করি বইটার শেষ প্যারাটা দিয়েই প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা। কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কী ? তাকে দেয় দাহ। যে আগুনে আলো দেয় না অথচ দহন করে, সেই দীপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন কাণ্ডজ্ঞানহীন হতভাগ্য চারুদত্ত আধারকার।

এখনো আমি যাযাবর’—এর লেখা দৃষ্টিপাত বইটা খুলে বসলে, শুরু থেকে শেষ না করে থাকতেই পারি না।

#

©গৌতম দত্ত

২০শে জুলাই, ২০১৭

কলকাতা