স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা - (৪)



আত্মত্যাগী ভৈরবী মূর্ত্তি

কি না তুমি তাঁর নিলে ? তাঁর জাতি নিলে,ধর্ম নিলে,সমাজ,সংসার,সম্ভ্রম সমস্তই নিলে। দুঃখ যত দিয়াছ,আমি ত আজো তাহার সাক্ষী রহিয়াছি। এতেও দুঃখ করি,জগদীশ্বর ! কিন্তু যাঁর আসন সীতা,সাবিত্রী,সতীর সঙ্গেই,তাঁকে তাঁর বাপ,মা,আত্মীয়-স্বজন,শত্রু-মিত্র জানিয়া রাখিল কি বলিয়া ?কুলটা বলিয়া,বেশ্যা বলিয়া ! ইহাতে তোমারই বা কি লাভ ?সংসারই বা পাইল কি ?

এই লাইনকটা বুকের মধ্যে বিদ্যুৎচমকের মতো ধাক্কা দিয়েছিল আমার কলেজ জীবনে। ততদিনে মানে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরে পরেই বাঙলা সাহিত্যের বেশ কিছু অংশ আমার মাথায় গিজগিজ করছে। একটু বুদ্ধিশুদ্ধি খুলছে। কলেজে বিভিন্ন বন্ধুবান্ধবদের সাথে গল্প-আড্ডায় এক নতুন বোধ তৈরি হচ্ছে। নিজের ওপর বিশ্বাস বাড়ছে ক্রমশঃ। নকশাল যুগ শেষ হয়েছে সদ্য। চলাফেরার ব্যাপ্তি তখন শহরের অনেকটাই জুড়ে। রবীন্দ্রনাথ পড়ছি তখন।

কিছু কিছু চরিত্র যেন মনের মধ্যে সোনার অক্ষরে গাঁথা হয়ে যায়। সে বইসিনেমানাটক যাই হোক না কেন। আমাদের যৌবনে আকাশবাণী কলকাতার নাটক শোনার যে উন্মাদনা ছিল, তা কোনও অংশেই কম ছিল না জলজ্যান্ত নাটক দেখার চেয়ে। রামের সুমতি নামের রোগা বইটা কে দিয়েছিল আজ আর মনে পড়ে না। কিন্তু এই বয়সে এসেও মনে হয় নারায়ণী’—র মতো বৌদি যদি জীবনে পেতাম ! একেবারে আপনার একেবারে নিজের। কিন্তু এক ছেলে হবার সুবাদে সে আর কপালে ঘটে নি !

আজ সকালবেলা রাম দুই-তিন হাত একটা অশ্বত্থ-চারা আনিয়া উঠানের মাঝখানে পুঁতিতে আরম্ভ করিয়া দিল। রান্নাঘরের দাওয়ায় বসিয়া দিগম্বরী মালা ঘুরাইতে ঘুরাইতে সমস্ত লক্ষ্য করিয়া তীক্ষ্ণস্বরে বলিলেন,ওটা কি হচ্চে রাম ?

রাম তাঁহার দিকে চাহিয়া বলিল,অশ্বত্থ-গাছটা বড় হলে বেশ ছায়া হবে গো ! মাস্টারমশাই বলেছে,অশথের ছায়া খুব ভাল। গোবিন্দ যা,ঘটি করে জল নিয়ে আয়। ভোলা,মোটা দেখে একটা বাশঁ কেটে আন বেড়া দিতে হবে। নইলে গরুবাছুরে খেয়ে ফেলবে।

দিগম্বরী হাড়ে হাড়ে জ্বলিয়া গিয়া বলিলেন,উঠানের মাঝখানে অশ্বত্থ-গাছ ! এমন ছিষ্টিছাড়া কান্ড কখনও বাপের বয়সে দেখিনি বাবা !

রাম সে কথায় কর্ণপাতও করিল না।

এর পরে নারায়ণী নদী হইতে স্নান করিয়া ফিরিয়া আসিলেন। তাঁর মা দিগম্বরী তখন ক্রোধে উন্মাদ।

 

নারায়ণী হাসিতে লাগিলেন। ওদিকে মায়ের ক্রুদ্ধ ব্যস্ত ভাব,এদিকে রামের এই পাগলামি, সমস্ত জিনিসটাই তাঁহার কাছে পরম হাস্যকর ব্যাপার বলিয়া ঠেকিল। হাসিয়া বলিলেন, উঠানের মাঝধানে অশ্বত্থ-গাছ কি হবে রে ?

রাম আশ্চর্য হইয়া বলিল,কি হবে কি বৌদি !  কেমন চমৎকার ঠাণ্ডা ছায়া হবে বল ত,আর এই যে ছোট ডালটি দেখচ,উটি বড় হলে,এই গোবিন্দ,আঙ্গুল দেখাস নে বড় হলে গোবিন্দর জন্যে একটা দোলা টাঙ্গিয়ে দেব। ভোলা,একটু উঁচু করে বেড়া দিতে হবে,নইলে কালী গলা বাড়িয়ে খেয়ে নেবে ;দে কাটারিখানা,আমার হাতে দে,তুই পারবি নে। খটখট ঠকঠক করিয়া বাঁশ কাটা শুরু হইয়া গেল।

নারায়ণী হাসিতে হাসিতে কক্ষস্থিত পূর্ণকলস রান্নাঘরে রাখিয়া দিতে চলিয়া গেলেন।

নারায়ণীর চরিত্র যেন কল্পনার রঙে রঙিন হয়ে উঠে আমার যৌবন বেলায় একখানা বন্ধুর মতো কাউকে খুঁজে বেড়াতো। অথচ সে আমার মা-এর মতো !  তাঁর সঙ্গে যা খুশী করা যায়, যত আবদার, যত খুনসুটি সব। আমি এখনো জানি না, আমাদের বাঙলা তথা ভারতীয় পরিবারে বৌদি-র যে স্থান দেওর আর বৌদির যে চিরকালীন সম্পর্ক তা আর কোনো দেশে এমন করে পরিব্যপ্ত আছে কিনা !  এই মধুর সম্পর্ক নিয়ে বাঙলা সাহিত্য তো উজ্জ্বল হয়ে আছে। আর সত্যিই তো আমরা ছোটো বেলা থেকেই মা আর কাকাদের যে মধুর সম্পর্ক দেখতে দেখতে বড় হয়েছি তাই বা ভুলি কি করে ? আমাদের ছেলেপুলেরা বুঝলই না এসবের কিছু ! ছোট পরিবার, সুখী পরিবার’—এর দাপটে !

তা যা বলছিলাম।

আলোচনা শুরু করেছিলাম যে কোট আনকোট অংশ দিয়ে তা মোটামুটি বুঝেছিলাম কলেজ জীবনে গিয়েই। ততদিনে রাজলক্ষীরমাঅভয়াঅচলাসাবিত্রীঅলকাবন্দনামনোরমা দের চিনে ফেলেছি যে !  শরতবাবু আমাদের বাঙলা সাহিত্য জগতে মেয়েদের যে চরিত্র এঁকে দিয়েছেন তাঁদের ভুলি কি করে ? 

কিন্তুতবুঅথচবাহয়তো ওপরের ওই নামগুলো ছাড়াও আর একটি চরিত্র উজ্জ্বল হয়ে ছিলআছেথাকবেই যতদিন বোধ থাকবে আমার। ইন্দ্রনাথ কে পড়তে গিয়ে বারংবার তাঁর নাম আসবেই। আর অবধারিতভাবেই আমি বিস্ময়ে শ্রদ্ধায় ভালবাসায় বুঁদ হয়ে যাবো এমন একটা দিদির জন্যে - যাঁর তুল্য চরিত্র-চিত্রণ বিশ্বসাহিত্যে আছে কি না জানি না।

       পাঠক এতক্ষণে আশা করি বুঝতেই পেরে গেছেন কার কথা আমি বলতে চাইছি। শরৎচন্দ্রের সেই অসামান্য লেখনীর কাছে আবার নত হই :

  হায় রে,কোথায় তাঁহার এই-সব আত্মীয়-স্বজন,শত্রু-মিত্রএ যদি একবার জানিতে পারিতাম ! সে দেশ যেখানে যত দূরেই হউক,এ দেশের বাহিরে হইলেও হয়ত এতদিন গিয়া হাজির হইয়া বলিয়া আসিতাম এই তোমাদের অন্নদা ! এই তাঁর অক্ষয় কাহিনী ! তোমাদের যে মেয়েটিকে কুলত্যাগিনী বলিয়া জানিয়া রাখিয়াছ,সকালবেলায় একবার তাঁর নামটাই লইও অনেক দুষ্কৃতির হাত এড়াইতে পারিবে। 

তবে আমি একটা সত্য বস্তু লাভ করিয়াছি। পূর্বেও একবার বলিয়াছি,নারীর কলঙ্ক আমি সহজে প্রত্যয় করিতে পারি না। আমার দিদিকে মনে পড়ে। যদি তাঁর ভাগ্যেও এতবড় দুর্নাম ঘটিতে পারে,তখন সংসারে পারে না কি ?এক আমি,আর সেই সমস্ত কালের সমস্ত পাপ-পুণ্যের সাক্ষী তিনি ছাড়া,জগতে আর কেহ কি আছে,যে অন্নদাকে একটুখানি স্নেহের সঙ্গেও স্মরণ করিবে ! তাই ভাবি,না জানিয়া নারীর কলঙ্কে অবিশ্বাস করিয়া সংসারে বরঞ্চ ঠকাও ভাল,কিন্তু বিশ্বাস করিয়া পাপের ভাগী হওয়ায় লাভ নাই।

বস্তুতঃ অন্নদাদিদির মত এমন একটা ক্রিটিক্যাল চরিত্র শুনলে বা পড়লে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা হয়তো তাঁকে বোকা বলেই সম্ভাষিত করবে। ঊনিশ শ ষোলোসাতের সালে লেখা এই উপন্যাস আমি কিন্তু খুঁটিয়ে পড়েছিলাম ঊনিশ শ একাত্তরবাহাত্তরে। তখনো আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারে বিনোদন বলতে ছিল সেই ভালভ্‌ সেট থেকে গমগমে আওয়াজের আকাশবাণী কলকাতা। কই, তখনো তো একটা ষোলো বছরের বালকের চোখে এ চরিত্র বোকা ঠেকেনি। এমনকি আজও ঠেকে না। আসলে হাজারো বিনোদন এলেও আমাদের বয়সী মানুষজনদের কাছে সেই সময়ের মূল্যবোধ এখনো শিরায় শিরায় বহমান। তার থেকে হয়ত আর বেরিয়ে আসতে পারবোই না। 

শ্রীকান্তর মনে ইন্দ্রনাথের ওপর কিছুটা বিতৃষ্ণা যে জন্মেছিল তা আমরা জানি। প্রথমে শ্রীকান্ত ভেবেছিল যে ইন্দ্র ওই জেলেদের মাছ চুরি করে পয়সা উপায় করে থাকে। কিন্তু পরে শ্রীকান্তর সে ভ্রম দূর হয়। যখন সে নিজের চোখে অন্নদাদিদিকে দেখে। আর তারপরেই শ্রীকান্ত মনে মনে বলে ওঠে :

  আজ মনে ভাবি,আমার বহুজন্মের সুকৃতির ফল যে,সেদিন ভয়ে পিছাইয়া আসি নাই ! সেই দিনটিকে উপলক্ষ্য করিয়া যে জিনিসটি দেখিয়া লইয়াছিলাম,সারা জীবনের মধ্যে পৃথিবী ঘুরিয়া বেড়াইয়াও তেমন কয়জনের ভাগ্যে ঘটে ?আমিই বা তাহার মত আর কোথায় দেখিতে পাইলাম ? জীবনে এমন-সব শুভ মুহূর্ত অনেকবার আসে না। একবার যদি আসে,সে সমস্ত চেতনার উপর এমন গভীর একটা ছাপ মারিয়া দিয়া যায় যে,সেই ছাঁচেই সমস্ত পরবর্তী জীবন গড়িয়া উঠিতে থাকে। আমার তাই বোধ হয়,স্ত্রীলোককে কখনও আমি ছোট করিয়া দেখিতে পারিলাম না। বুদ্ধি দিয়া যতই কেন না তর্ক করি,সংসারে পিশাচী কি নাই ?নাই যদি তবে পথেঘাটে এত পাপের মূর্তি দেখি কাহাদের ?সবাই যদি সেই ইন্দ্রর দিদি,তবে এত প্রকার দুঃখের স্রোত বহাইতেছে কাহারা ?তবুও কেমন করিয়া যেন মনে হয়,এ-সকল তাহাদের শুধু বাহ্য আবরণ,যখন খুশি ফেলিয়া দিয়া ঠিক তাঁর মতই সতীর আসনের উপর অনায়াসে গিয়া বসিতে পারে। বন্ধুরা বলেন,ইহা আমার একটা অতি জঘন্য শোচনীয় ভ্রম মাত্র। আমি তাহারও প্রতিবাদ করি না। শুধু বলি,ইহা আমার যুক্তি নয় আমার সংস্কার। সংস্কারের মূলে যিনি,জানি না সেই পুণ্যবতী আজও বাঁচিয়া আছেন কি না। থাকিলেও কোথায় কি ভাবে আছেন,তাঁহার নির্দেশমত কখনো কোন সংবাদ লইবার চেষ্টাও করি নাই। কিন্তু কত যে মনে মনে তাঁকে প্রণাম করিয়াছি,তাহা যিনি সব জানিতে পারেন,তিনিই জানেন।

( ২ )

একটু শুরুর দিকে চোখ ফেরাই। শ্রীকান্তর সাথে অন্নদাদিদির দেখা হবার সূচনা পর্বটা।

শ্রীকান্ত !

কি ভাই ?

তোর তোর কাছে টাকা আছে?

টাকা ?

টাকা ?এই ধর্‌,পাঁচ টাকা

আছে। তুমি নেবে ? বলিয়া আমি ভারি খুশি হইয়া তাহার মুখপানে চাহিলাম। এ কয়টি টাকাই আমার ছিল। ইন্দ্রর কাজে লাগিবার অপেক্ষা তাহার সদ্ব্যবহার আমি কল্পনা করিতেও পারিতাম না। কিন্তু ইন্দ্র ত কৈ খুশি হইল না। মুখ যেন তাহার অধিকতর লজ্জায় কি একরকম হইয়া গেল। কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া কহিল,কিন্তু আমি ত এখন তোকে ফিরিয়ে দিতে পারব না।

আমি আর চাইনে, বলিয়া সগর্বে তাহার মুখের পানে চাহিলাম। 

আবার কিছুক্ষণ সে মুখ নীচু করিয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে কহিল,আমি নিজে চাইনে। একজনদের দিতে হবে,তাই। তারা বড় দুঃখী রেখেতেও পায় না। তুই যাবি সেখানে ?চক্ষের নিমেষে আমার সে রাত্রির কথা মনে পড়িল। কহিলাম,সেই যাদের তুমি টাকা দিতে নেমে যেতে চেয়েছিলে ? ইন্দ্র অন্যমনস্ক ভাবে মাথা নাড়িয়া বলিল,হাঁ তারাই। টাকা আমি নিজেই ত কত দিতে পারি,কিন্তু দিদি যে কিছুতে নিতে চায় না। তোকে একটিবার যেতে হবে শ্রীকান্ত,নইলে,এ টাকাও নেবে না ;মনে করবে,আমি মায়ের বাক্স থেকে চুরি করে

        এনেচি ! যাবি শ্রীকান্ত ?

তারা বুঝি তোমার দিদি হয় ?

ইন্দ্র একটু হাসিয়া কহিল,না,দিদি হয় না দিদি বলি। যাবি ত ?আমাকে চুপ করিয়া থাকিতে দেখিয়া তখনি কহিল,দিনের বেলা গেলে সেখানে কোন ভয় নেই। কাল রবিবার ;তুই খেয়েদেয়ে এইখানে দাঁড়িয়ে থাকিস্‌,আমি নিয়ে যাব ;আবার তখ্‌খুনি ফিরিয়ে আন্‌ব। যাবি ত ভাই ?বলিয়া যেমন করিয়া সে আমার হাতটি ধরিয়া মুখের পানে চাহিয়া রহিল,তাহাতে আমার না বলিবার সাধ্য রহিল না। আমি দ্বিতীয়বার তাহার নৌকায় উঠিবার কথা দিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিলাম।

এর পরে একদিন, ডিঙি চেপে শ্রীকান্ত আর ইন্দ্রনাথ গেল দিদির বাড়ি।

   ......... প্রায় দশ মিনিট চলিবার পর একটা পর্ণকুটীর দেখা গেল। কাছে আসিয়া দেখিলাম,ভিতরে ঢুকিবার পথ আগড় দিয়া আবদ্ধ। ইন্দ্র সাবধানে তাহার বাঁধন খুলিয়া ঠেলা দিয়া প্রবেশ করিল এবং আমাকে টানিয়া লইয়া পুনরায় তেমনি করিয়া বাঁধিয়া দিল। আমি তেমন বাসস্থান কখনো জীবনে দেখি নাই। একে ত চতুর্দিকেই নিবিড় জঙ্গল,তাহাতে মাথার উপরে একটা প্রকাণ্ড তেঁতুল গাছ এবং পাকুড় গাছে সমস্ত জায়গাটা যেন অন্ধকার করিয়া রাখিয়াছে। আমাদের সাড়া পাইয়া একপাল মুরগি এবং ছানাগুলা চিৎকার করিয়া উঠিল। একধারে বাঁধা গোটা দুই ছাগল ম্যাঁ ম্যাঁ করিয়া ডাকিয়া উঠিল। সুমুখে চাহিয়া দেখি ওরে বাবা ! একটা প্রকাণ্ড অজগর সাপ আঁকিয়া-বাঁকিয়া প্রায় সমস্ত উঠান জুড়িয়া আছে। চক্ষের নিমেষে অস্ফুট চিৎকারে মুরগিগুলাকে আরও ত্রস্ত ভীত করিয়া দিয়া আঁচড়-পিঁচড় করিয়া একেবারে সেই বেড়ার উপর চড়িয়া বসিলাম।

ইন্দ্র খিল্‌খিল্‌ করিয়া হাসিয়া উঠিয়া কহিল,ও কিছু বলে না রে,বড় ভালমানুষ। ওর নাম রহিম। বলিয়া কাছে গিয়া তাহার পেটটা ধরিয়া টানিয়া উঠানের ওধারে সরাইয়া দিল। তখন নামিয়া আসিয়া ডানদিকে চাহিয়া দেখিলাম,সেই পর্ণকুটীরের বারান্দার উপরে বিস্তর ছেঁড়া চাটাই ও ছেঁড়া কাঁথার বিছানায় বসিয়া একটা দীর্ঘকায় পাতলাগোছের লোক প্রবল কাসির পরে হাঁপাইতেছে। তাহার মাথায় জটা উঁচু করিয়া বাঁধা,গলায় বিবিধ প্রকারের ছোটবড় মালা। গায়ের জামা এবং পরনের কাপড় অত্যন্ত মলিন এবং এক প্রকার হল্‌দে রঙে ছোপানো। তাহার লম্বা দাড়ি বস্ত্রখণ্ড দিয়া জটার সহিত বাঁধা ছিল বলিয়াই প্রথমটা চিনিতে পারি নাই ;কিন্তু কাছে আসিয়াই চিনিলাম সে সাপুড়ে। মাস পাঁচ-ছয় পূর্বে তাহাকে প্রায় সর্বত্রই দেখিতাম। আমাদের বাটীতেও তাহাকে কয়েকবার সাপ খেলাইতে দেখিয়াছি। ইন্দ্র তাহাকে শাহ্‌জী সম্বোধন করিল এবং সে আমাদিগকে বসিতে ইঙ্গিত করিয়া,হাত তুলিয়া ইন্দ্রকে গাঁজার সাজ-সরঞ্জাম এবং কলিকাটি দেখাইয়া দিল। ইন্দ্র দ্বিরুক্তি না করিয়া আদেশ পালন করিতে লাগিয়া গেল এবং প্রস্তুত হইলে শাহ্‌জী সেই কাসির উপর ঠিক যেন মরি-বাঁচি পণ করিয়া টানিতে লাগিল এবং একবিন্দু ধোঁয়াও পাছে বাহির হইয়া পড়ে,এই আশঙ্কায় নাকেমুখে বাম করতল চাপা দিয়া মাথায় একটা ঝাঁকানির সহিত কলিকাটি ইন্দ্রের হাতে তুলিয়া দিয়া কহিল,পিয়ো।

এর পরের ঘটনার দ্রুত বিস্তার। শ্রীকান্ত তাড়া লাগিয়ে ইন্দ্রকে বলে ওঠে যে তুমি যাবে না তোমার সেই দিদির বাড়ি। ইন্দ্র বলে, আরে এটাই তো দিদির বাড়ি। আমি তো অপেক্ষা করছি দিদির জন্যে। শ্রীকান্ত বলে ওঠে এই তোমার দিদির বাড়ি! এরা ত সাপুড়েমুসলমান !

এরপর ইন্দ্র সাপখেলা দেখাতে চায় শ্রীকান্তকে। ঘরের থেকে ঝাঁপি বার করে এনে বাশিঁ বাজিয়ে সে খেলা দেখাতে যায় শ্রীকান্তকে। কিন্তু ঝাঁপির মধ্যে থাকা একটা সদ্য ধরে আনা গোখরো সাপ ইন্দ্রর হাতের ডালায় ছোবল দেয়। পরমুহূররতেই বাশিঁর আগায় ছোবল মেরেই ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢোকে। অপ্রস্তুত ইন্দ্র বলে ওঠে যে, এ সাপটা বুনো সাপ নিশ্চই। না হলে এমন করত না। হঠাৎ ইন্দ্র বলে ওঠে ......এই যে দিদি ! এসো না,এসো না ;ঐখানে দাঁড়িয়ে থাকো। আমি ঘাড় ফিরাইয়া ইন্দ্রর দিদিকে দেখিলাম। যেন ভস্মাচ্ছাদিত বহ্নি ! যেন যুগ-যুগান্তরব্যাপী কঠোর তপস্যা সাঙ্গ করিয়া তিনি এইমাত্র আসন হইতে উঠিয়া আসিলেন।

বাঁ-কাঁকালে আঁটিবাঁধা কতকগুলো শুক্‌নো কাঠ এবং ডানহাতে ফুলের সাজির মত একখানা ডালার মধ্যে কতকগুলি শাক-সবজি। পরনে হিন্দুস্থানী মুসলমানীর মত জামাকাপড়গেরুয়া রঙে ছোপানো,কিন্তু ময়লায় মলিন নয়। হাতে দুগাছি গালার চুড়ি। সিঁথায় হিন্দু-নারীর মত সিঁদুরের আয়তি-চিহ্ন।

সব ঘটনা শুনে দিদি নিজে ঘরে ঢুকে ওই সাপটিকে ধরে এনে ঝাঁপিতে ঢোকান।

......... ইন্দ্র ঢিপ করিয়া তাঁহার পায়ের উপর একটা নমস্কার করিয়া পায়ের ধূলা মাথায় লইয়া বলিল,দিদি,তুমি যদি আমার আপনার দিদি হতে ! তিনি ডান হাত বাড়াইয়া ইন্দ্রের চিবুক স্পর্শ করিলেন,এবং অঙ্গুলির প্রান্তভাগ চুম্বন করিয়া মুখ ফিরাইয়া বোধ করি অলক্ষ্যে একবার নিজের চোখদুটি মুছিয়া ফেলিলেন।

তারপর সেদিনই নানা ঘাত প্রতিঘাতে জানা যায় ইন্দ্রর আসল লক্ষ্য এই শাহ্‌জীর কাছ থেকে সাপের মন্তর আর বিষ-পাথর আদায় করা। শ্রীকান্তকে ইন্দ্র বলে ওঠে যে এই শাহ্‌জী নাকি তিনদিনের বাসি মড়াকেও জ্যান্ত করে দিতে পারে। এই কথা শুনেই দিদি ... অনেকক্ষণ নিঃশব্দে নতমুখে বসিয়া মনে মনে কি যেন চিন্তা করিয়া লইলেন ;শেষে মুখ তুলিয়া ধীরে ধীরে বলিলেন,ইন্দ্র,তোর দিদির এ-সব কানাকড়ির বিদ্যেও নেই। কিন্তু কেন নেই,সে যদি তোরা বিশ্বাস করিস ভাই,তা হলে আজ তোদের কাছে আমি সমস্ত ভেঙ্গে বলে আমার বুকখানা হাল্কা করে ফেলি। বল্‌ তোরা আমার সব কথা আজ বিশ্বাস করবি ? বলিতে বলিতেই তাঁহার শেষের কথাগুলি কেমন একরকম যেন ভারী হইয়া উঠিল।

আমি নিজে এতক্ষণ প্রায় কোন কথাই কহি নাই। এইবার সর্বাগ্রে জোর করিয়া বলিয়া উঠিলাম,আমি তোমার সব কথা বিশ্বাস করব দিদি ! সব যা বলবে সমস্ত। একটি কথাও অবিশ্বাস করব না।

তিনি আমার প্রতি চাহিয়া একটুখানি হাসিয়া বলিলেন,বিশ্বাস করবে বৈ কি ভাই! তোমরা যে ভদ্রলোকের ছেলে। যারা ইতর,তারাই শুধু অজানা অচেনা লোকের কথায় সন্দেহে ভয়ে পিছিয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আমি ত কখনও মিথ্যে কথা কইনে ভাই !......

দিদি বলিলেন, ওটা শুধু হাতের কৌশল ইন্দ্র, কোন মন্ত্রের জোরে নয়। সাপের মন্ত্র আমরা জানিনে।

ইন্দ্র বলিল,যদি জান না,তবে তোমরা দুজনে জোচ্চুরি করে ঠকিয়ে আমার কাছ থেকে এত টাকা নিয়েচ কেন ?

দিদি তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারিলেন না;বোধ করি বা নিজেকে একটুখানি সামলাইয়া লইতে লাগিলেন। ইন্দ্র পুনরায় কর্কশকণ্ঠে কহিল, ঠগ্‌ জোচ্চোর সব আচ্ছা আমি দেখাচ্ছি তোমাদের মজা।

অদূরেই একটা কেরোসিনের ডিপা জ্বলিতেছিল। আমি তাহারই আলোকে দেখিতে পাইলাম,দিদির মুখখানি একেবারে যেন মড়ার মত সাদা হইয়া গেল। সভয়ে সসঙ্কোচে বলিলেন,আমরা যে সাপুড়েভাই, ঠকানোই যে আমাদের ব্যবসা। 

ব্যবসা বার করে দিচ্ছি চল্‌রে শ্রীকান্ত, জোচ্চোর শালাদের ছায়া মাড়াতে নেই। হারামজাদা বজ্জাত ব্যাটারা। বলিয়া ইন্দ্র সহসা আমার হাত ধরিয়া সজোরে একটা টান দিয়া খাড়া হইয়া উঠিল, এবং মুহূর্ত বিলম্ব না করিয়া আমাকে টানিয়া লইয়া চলিল।

এর পরে কিছু কথা কাটাকাটি। এর মধ্যেই শাহ্‌জি চোখ মেলে ব্যাপারটা অনুধাবন করার চেষ্টা করলেন। ইন্দ্র তো তাঁকে যা নয় তাই বলে শ্রীকান্তর হাত ধরে টেনে নিয়ে ফেরার পথ ধরলো। একটু পা বাড়িয়েছে কি বাড়ায় নি হঠাৎ দিদির তীব্র চীৎকারে ইন্দ্র আবার ফিরে এসে দেখে যে দিদি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে আর শাহ্‌জির হাতে বর্শা। তারপরে ইন্দ্র শাহ্‌জির দ্বৈরথ যুদ্ধ। ইন্দ্রর হাতে বর্শার ফলা লেগে সে এক রক্তারক্তি ব্যাপার।

দিদি যখন চোখ চাহিয়া উঠিয়া বসিলেন,তখন রাত্রি বোধ করি দ্বিপ্রহর ! তাঁহার বিহ্বল ভাবটা ঘুচাইতে আরও ঘণ্টাখানেক কাটিয়া গেল। তারপরে আমার মুখে সমস্ত বিবরণ শুনিয়া ধীরে ধীরে উঠিয়া গিয়া শাহ্‌জীর বন্ধন মুক্ত করিয়া দিয়া বলিলেন, যাও, শোও গে।

লোকটা ঘরে চলিয়া গেলে তিনি ইন্দ্রকে কাছে ডাকিয়া,তাহার ডান হাতটা নিজের মাথার উপর টানিয়া লইয়া বলিলেন, ইন্দ্র, এই আমার মাথায় হাত দিয়া শপথ কর্‌ ভাই, আর কখনো এ বাড়িতে আসিস্‌ নে। আমাদের যা হবার হোক, তুই আর আমাদের কোন সংবাদ রাখিস্‌ নে।

        ইন্দ্র প্রথমটা অবাক্‌ হইয়া রহিল। কিন্তু পরক্ষণেই আগুনের মত জ্বলিয়া উঠিয়া বলিল,তা বটে ! আমাকে খুন করতে গিয়েছিল,সেটা কিছু নয়। আর আমি যে ওকে বেঁধে রেখেছি, তাতেই তোমার এত রাগ ! এমন না হলে কলিকাল বলেচে কেন ? কিন্তু কি নেমকহারাম তোমরা দুজন ! আয় শ্রীকান্ত,আর না।

দিদি চুপ করিয়া রহিলেন একটি অভিযোগেরও প্রতিবাদ করিলেন না। কেন যে করিলেন না তাহা পরে যত বেশিই বুঝিয়া থাকি না কেন তখন বুঝি নাই। তথাপি আমি অলক্ষ্যে নিঃশব্দে সেই টাকা-পাঁচটি খুঁটির কাছে রাখিয়া দিয়া ইন্দ্রের অনুসরণ করিলাম। ইন্দ্র প্রাঙ্গণের বাহিরে আসিয়া চেঁচাইয়া বলিল,হিঁদুর মেয়ে হয়ে যে মোচলমানের সঙ্গে বেরিয়ে আসে,তার আবার ধর্মকর্ম ! চুলোয় যাও আর আমি খোঁজ করব না,খবরও নেব না হারামজাদা নচ্ছার ! বলিয়া দ্রুতপদে বনপথ অতিক্রম করিয়া চলিয়া গেল।

দুজনে নৌকায় আসিয়া বসিলে ইন্দ্র নিঃশব্দে বাহিতে লাগিল,এবং মাঝে মাঝে হাত তুলিয়া চোখ মুছিতে লাগিল। সে যে কাঁদিতেছে,তাহা স্পষ্ট বুঝিয়া আর কোন প্রশ্ন করিলাম না। 

ইন্দ্র কেন বললো এ কথা ?  কেনই বা এদিন চোখের জলে ভেসে গেল ইন্দ্র - এ কথার উত্তর খুঁজতে গেলে আরেকটু বলতে হয়।

এই ঘটনার প্রায় তিন-চারমাস বাদে আবার এক যাত্রার আসরে শ্রীকান্তের পিঠে ইন্দ্রনাথের টোকা। অবাক বিস্ময়ে শ্রীকান্ত পেছনে তাকায়। ইন্দ্র চুপিচুপি বলে ওঠে ... আয় শ্রীকান্ত,দিদি একবার তোকে ডাকচেন। তড়িৎস্পৃষ্টের মত সোজা খাড়া হইয়া উঠিলাম। কোথায় তিনি ?

বেরিয়ে আয় নাবলচি। পথে আসিয়া সে শুধু কহিল, আমার সঙ্গে আয়। বলিয়া চলিতে লাগিল।

গঙ্গার ঘাটে পৌঁছিয়া দেখিলাম,তাহার নৌকা বাঁধা আছেনিঃশব্দে উভয়ে চড়িয়া বসিলাম, ইন্দ্র বাঁধন খুলিয়া দিল।

আবার সেই সমস্ত অন্ধকার বনের পথ বাহিয়া দুজনে শাহ্‌জীর কুটীরে আসিয়া উপস্থিত হইলাম। তখন বোধ করি, রাত্রি আর বেশি নাই।

একটা কেরোসিনের ডিপা জ্বালাইয়া দিদি বসিয়া আছেন। তাঁহার ক্রোড়ের উপর শাহ্‌জীর মাথা। তাহার পায়ের কাছে একটা প্রকাণ্ড গোখ্‌রো সাপ লম্বা হইয়া আছে।

অতঃপর জানা যায় যে সম্প্রতি ধরে আনা এক বুনো গোখরো সাপের ছোবলে শাহ্‌জি প্রাণ হারিয়েছেন। দিদি অতঃপর ...... হাত দিয়া অত্যন্ত সন্তর্পণে শাহ্‌জীর মুখাবরণ উন্মোচন করিয়া গভীর স্নেহে তাহার সুনীল ওষ্ঠাধরে ওষ্ঠ স্পর্শ করিয়া বলিলেন,যাক,ভালই হল ইন্দ্রনাথ ! ভগবানকে আমি এতটুকু দোষ দিইনে।

আমরা উভয়েই নির্বাক্‌ হইয়া দাঁড়াইয়া রহিলাম। সে কণ্ঠস্বরে যে কি মর্মান্তিক বেদনা,কি প্রার্থনা,কি সুনিবিড় অভিমান প্রকাশ পাইল,তাহা যে শুনিয়াছে,তাহার সাধ্য নাই যে জীবনে বিস্মৃত হয়। কিন্তু কিসের জন্য এই অভিমান ? প্রার্থনাই বা কাহার জন্য ?

একটুখানি স্থির থাকিয়া বলিলেন,তোমরা ছেলেমানুষ,কিন্তু তোমরা দুটি ছাড়া ত আমার আর কেউ নেই ভাই,তাই এই ভিক্ষে করি,এঁর একটু তোমরা উপায় করে দিয়ে যাও। আঙ্গুল দিয়া কুটীরের দক্ষিণ দিকের জঙ্গলটা নির্দেশ করিয়া বলিলেন,ওইখানে একটু জায়গা আছে,ইন্দ্রনাথ,আমি অনেকদিন ভেবেচি,যদি আমার মরণ হয়,ওইখানেই যেন শুয়ে থাকতে পাই! সকাল হলে সেই জায়গাটুকুতে এঁকে শুইয়ে রেখো ভাই,অনেক কষ্টই এ-জীবনে ভোগ করে গেছেন তবু একটু শান্তি পাবেন।

ইন্দ্র প্রশ্ন করিল, শাহ্‌জীকে কি কবর দিতে হবে ?

দিদি বলিলেন, মুসলমান যখন, তখন দিতে হবে বৈ কি ভাই!

ইন্দ্র পুনরায় প্রশ্ন করিল, দিদি, তুমিও কি মুসলমান ?

দিদি বলিলেন, হাঁ, মুসলমান বৈ কি।

......... ইন্দ্র সেই নির্দিষ্ট স্থানে কবর খুঁড়িয়া আসিল এবং তিনজনে আমরা ধরাধরি করিয়া শাহ্‌জীর মৃতদেহটা সমাহিত করিলাম।

হঠাৎ দিদি সেই গোরের উপর লুটাইয়া পড়িয়া বিদীর্ণকণ্ঠে কাঁদিয়া উঠিলেন, মা গঙ্গা, আমাকেও পায়ে স্থান দাও মা ! আমার যে আর কোথাও জায়গা নেই। তাঁহার এই প্রার্থনা,এই নিবেদন যে কিরূপ মর্মান্তিক সত্য,তাহা তখনও তেমন বুঝিতে পারি নাই,যেমন দুদিন পরে পারিয়াছিলাম। ইন্দ্র একবার আমার মুখের পানে চোখ তুলিল,তার পরে উঠিয়া গিয়া সেই আর্ত নারীর ভূ-লুণ্ঠিত মাথাটি নিজের কোলের উপর তুলিয়া লইয়া,তাঁহারই মত আর্তস্বরে বলিয়া উঠিল, দিদি, আমার কাছে তুমি চলআমার মা এখনো বেঁচে আছেন, তিনি তোমাকে ফেলবেন না কোলে টেনে নেবেন। তাঁর বড় মায়ার শরীর, একবার শুধু তাঁর কাছে গিয়ে তুমি দাঁড়াবে চল। তুমি হিন্দুর মেয়ে দিদি, কিছুতেই মুসলমানী নও।

দিদি কথা কহিলেন না। মূর্ছিতের মত কিছুক্ষণ তেমনিভাবে পড়িয়া থাকিয়া শেষে উঠিয়া বসিলেন। তার পরে উঠিয়া আসিয়া তিনজনে গঙ্গাস্নান করিলাম। দিদি হাতের নোয়া জলে ফেলিয়া দিলেন,গালার চুড়ি ভাঙ্গিয়া ফেলিলেন। মাটি দিয়া সিঁথির সিন্দূর তুলিয়া ফেলিয়া সদ্য-বিধবার সাজে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার কুটীরে ফিরিয়া আসিলেন।

এতদিন পরে আজ তিনি প্রথম বলিলেন যে,শাহ্‌জী তাঁহার স্বামী ছিলেন। ইন্দ্র কিন্তু কথাটা ঠিকমত মনের মধ্যে গ্রহণ করিতে পারিল না। সন্দিগ্ধকণ্ঠে প্রশ্ন করিল, কিন্তু তুমি যে হিন্দুর মেয়ে দিদি।

দিদি বলিলেন,হাঁ বামুনের মেয়ে। তিনিও ব্রাহ্মণ ছিলেন।

ইন্দ্র ক্ষণকাল অবাক্‌ হইয়া থাকিয়া কহিল, জাত দিলেন কেন?

দিদি বলিলেন,সে কথা ঠিক জানিনে ভাই। কিন্তু তিনি যখন দিলেন,তখন আমারও সেই সঙ্গে জাত গেল। স্ত্রী সহধর্মিণী বৈ ত নয়। নইলে আমি নিজে হতে জাতও দিইনি কোন দিন কোন অনাচারও করিনি।

ইন্দ্র গাঢ়স্বরে কহিল, সে আমি দেখেচি দিদি সেই জন্যেই আমার যখন-তখন এই কথাই মনে হয়েচে,আমাকে মাপ কোরো দিদি, তুমি কি করে এর মধ্যে আছ,তোমার কেমন করে এমন দুর্মতি হয়েছিল ! কিন্তু এখন আমি আর কোন কথা শুনব না, আমাদের বাড়িতে তোমাকে যেতেই হবে। এখনি চল।

দিদি অনেকক্ষণ পর্যন্ত নীরবে কি যেন চিন্তা করিয়া লইলেন,পরে মুখ তুলিয়া ধীরে ধীরে বলিলেন, এখন আমি কোথাও যেতে পারিনে ইন্দ্রনাথ।

কেন পার না দিদি?

দিদি বলিলেন, আমি জানি, তিনি কিছু কিছু দেনা রেখে গেছেন। সেগুলি শোধ না দেওয়া পর্যন্ত ত কোথাও নড়তে পারিনে।

ইন্দ্র হঠাৎ ক্রুদ্ধ হইয়া উঠিল সে আমিও জানি ! তাড়ির দোকানে, গাঁজার দোকানে তার দেনা ;কিন্তু তোমার তাতে কি ? কার সাধ্যি তোমার কাছে টাকা চাইতে পারে ? তুমি চল আমার সঙ্গে, কে তোমাকে আটকায় দেখি একবার।

কিছুতেই ইন্দ্রনাথ তার দিদিকে নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে পারল না। এর - তিনদিন পরে স্কুলের ছুটির পর বাহির হইয়াই দেখি,ইন্দ্র গেটের বাহিরে দাঁড়াইয়া আছে। তাহার মুখ অত্যন্ত শুষ্ক,পায়ে জুতা নাই হাঁটু পর্যন্ত ধূলায় ভরা। এই অত্যন্ত দীন চেহারা দেখিয়া ভয় পাইয়া গেলাম। বড়লোকের ছেলে,বাহিরে সে একটু বিশেষ বাবু। এমন অবস্থা তাহার আমি ত দেখিই নাইবোধ করি আর কেহও দেখে নাই। ইশারা করিয়া মাঠের দিকে আমাকে ডাকিয়া লইয়া গিয়া ইন্দ্র বলিল, দিদি নেই কোথায় চলে গেছেন। আমার মুখের প্রতিও আর সে চাহিয়া দেখিল না। কহিল,কাল থেকে আমি কত জায়গায় যে খুঁজেচি, কিন্তু দেখা পেলাম না। তোকে একখানা চিঠি লিখে রেখে গেছেন, এই নে, বলিয়া একখানা ভাঁজ করা হলদে রঙের কাগজ আমার হাতে গুঁজিয়া দিয়াই সে আর-একদিকে দ্রুতপদে চলিয়া গেল।

মোটামুটি এই অব্দিই অন্নদাদিদির চালচিত্র এঁকে গেছে শরৎচন্দ্র। তবু এটুকুটেই যত মায়া যত কিছু। এর পরে শ্রীকান্ত অন্নদাদিদি সম্পর্কে জানতে পারে ওই চিঠিটায়। আর ওই চিঠিখানা পড়ার পরেই শ্রীকান্ত বলে ওঠে ......তার পরে অনেক জায়গায় ঘুরিয়াছি। কিন্তু এই দুটো পোড়া চোখে আর কখনও তাঁহার দেখা পাই নাই। না পাই,কিন্তু অন্তরের মধ্যে সেই প্রসন্ন হাসি মুখখানি চিরদিন তেম্‌নিই দেখিতে পাই। তাঁহার চরিত্রের কথা স্মরণ করিয়া যখনই মাথা নোয়াইয়া প্রণাম করি,তখন এই একটা কথা আমার কেবল মনে হয়,ভগবান ! এ তোমার কি বিচার ! আমাদের এই সতী-সাবিত্রীর দেশে স্বামীর জন্য সহধর্মিণীকে অপরিসীম দুঃখ দিয়া সতীর মাহাত্ম্য তুমি উজ্জ্বল হইতে উজ্জ্বলতর করিয়া সংসারকে দেখাইয়াছ,তাহা জানি। তাঁহাদের সমস্ত দুঃখ-দৈন্যকে চিরস্মরণীয় কীর্তিতে রূপান্তরিত করিয়া জগতের সমস্ত নারীজাতিকে কর্তব্যের ধ্রুবপথে আকর্ষণ করিতেছ তোমার সে ইচ্ছাও বুঝিতে পারি,কিন্তু আমার এমন দিদির ভাগ্যে এতবড় বিড়ম্বনা নির্দেশ করিয়া দিলে কেন ?কিসের জন্য এতবড় সতীর কপালে অসতীর গভীর কালো ছাপ মারিয়া চিরদিনের জন্য তাঁকে তুমি সংসারে নির্বাসিত করিয়া দিলে ?

কি লেখা ছিল সে চিঠিখানায় ?  ছিল, অন্নদাদিদির ছোট্ট একটা জীবনচরিত। খুবই মামুলী অথচ তা আজও আমার মননে উজ্জ্বল। এই সুযোগে শরৎবন্দনা নামক বইটায় শ্রী বিশ্বপতি চৌধুরীইন্দ্রনাথ ও অন্নদাদিদি নামক আলোচনাটায় শ্রী চৌধুরী কি বলেছেন একটু শুনি ......এমনি করিয়া ইন্দ্রনাথের ভিতর দিয়া অপর্য্যাপ্ত প্রাণধর্ম শ্রীকান্তের মনের উপর যখন একটি প্রগাঢ় ছাপ কাটিবার উপক্রম করিতেছিল, ঠিক সেই সময় তাহার সহিত পরিচয় হইল এমন একটি মহীয়সী নারীর, যিনি আপনার অন্তর্নিহিত সংষ্কারজাত সতীধর্ম্মের যজ্ঞাগ্নিতে প্রাণধর্ম্মকে পুড়াইয়া তাহারই বিভূতি সর্বাঙ্গে লেপন করিয়া ভৈরবী হইয়া বসিয়াছেন।    আমরা  অন্নদাদিদির কথা বলিতেছি। ইন্দ্রনাথের ভিতর দিয়া অপর্য্যাপ্ত প্রাণধর্ম্মের মহিমা যেমন একদিকে তাহাকে আকর্ষণ করিয়াছিল, অপরদিকে তেমনি অন্নদাদির চরিত্রমহিমা প্রাণধর্ম্মের উদ্দামতাকে সংস্কারের এই আত্মত্যাগী ভৈরবী মূর্ত্তির সম্মুখে নতমস্তক করিয়া দিল।

যিনি আপনার অন্তর্নিহিত সংষ্কারজাত সতীধর্ম্মের যজ্ঞাগ্নিতে প্রাণধর্ম্মকে পুড়াইয়া তাহারই বিভূতি সর্বাঙ্গে লেপন করিয়া ভৈরবী হইয়া বসিয়াছেন একটা বাক্যে অন্নদাদিদির বর্ণনা !  কিন্তু এই লাইনটার যদি ভাব সম্প্রসারণ করিতে হয় তাহলে আমাদের সেই মহান ভারতবর্ষের, যুগে যুগে ধাবিত আত্মার মর্মমূলে যে ফল্গু বয়ে চলেছে প্রেমভালবাসাস্বামীস্ত্রী এসব সম্পর্কের ভেতর দিয়ে তা যেন এইটুকু চরিত্রচিত্রণে শরৎচন্দ্র আমাদের ধন্য করে রেখে গেছেন।

এই চিঠির অংশ দিয়েই আজ আমার প্রণাম জানাই আমার প্রিয় এই চরিত্রটিকে ...... শ্রীকান্ত,তোমার এই দুঃখিনী দিদির নাম অন্নদা। স্বামীর নাম কেন গোপন করিয়া গেলাম,তাহার কারণ এই লেখাটুকুর শেষ পর্যন্ত পড়িলেই বুঝিতে পারিবে। আমার বাবা বড়লোক। তাঁর ছেলে ছিল না। আমরা দুটি বোন। সেইজন্য বাবা দরিদ্রের গৃহ হইতে স্বামীকে আনাইয়া নিজের কাছে রাখিয়া লেখাপড়া শিখাইয়া মানুষ করিতে চাহিয়াছিলেন। তাঁহাকে লেখাপড়া শিখাইতে পারিয়াছিলেনকিন্তু মানুষ করিতে পারেন নাই। আমার বড় বোন বিধবা হইয়া বাড়িতেই ছিলেনইহাকে হত্যা করিয়া স্বামী নিরুদ্দেশ হন। এ দুষ্কর্ম কেন করিয়াছিলেন,তাহার হেতু তুমি ছেলেমানুষ আজ না বুঝিতে পারিলেও একদিন বুঝিবে। সে যাই হোক্‌ বল ত শ্রীকান্ত,এ দুঃখ কত বড় ?এ লজ্জা কি মর্মান্তিক ! তবুও তোমার দিদি সব সহিয়াছিল। কিন্তু স্বামী হইয়া যে অপমানের আগুন তিনি তাঁর স্ত্রীর বুকের মধ্যে জ্বালিয়া দিয়া গিয়াছিলেন,সে জ্বালা আজও তোমার দিদির থামে নাই। যাক সে কথা! তার পরে সাত বৎসর পরে আবার দেখা পাই। যেমন বেশে তোমরা তাঁকে দেখিয়াছিলে,তেমনি বেশে আমাদেরই বাটীর সন্মুখে তিনি সাপ খেলাইতেছিলেন। তাঁকে আর কেহ চিনিতে পারে নাই,কিন্তু আমি পারিয়াছিলাম। আমার চক্ষুকে তিনি ফাঁকি দিতে পারেন নাই। শুনি,এ দুঃসাহসের কাজ নাকি তিনি আমার জন্যই করিয়াছিলেন। কিন্তু সে মিছে কথা। তবুও একদিন গভীর রাত্রে,খিড়কির দ্বার খুলিয়া আমার স্বামীর জন্যই গৃহত্যাগ করিয়াছিলাম। কিন্তু সবাই শুনিল,সবাই জানিল,অন্নদা কুলত্যাগ করিয়া গিয়াছে। এ কলঙ্কের বোঝা আমাকে চিরদিনই বহিয়া বেড়াইতে হইবে। কোন উপায় নাই। কারণ স্বামী জীবিত থাকিতে আত্মপ্রকাশ করিতে পারি নাই। পিতাকে চিনিতাম,তিনি কোন মতেই তাঁর সন্তানঘাতীকে ক্ষমা করিতেন না। কিন্তু আজ যদিও আর সে ভয় নাইআজ গিয়া তাঁকে বলিতে পারি,কিন্তু এ গল্প এতদিন পরে কে বিশ্বাস করিবে ?সুতরাং পিতৃগৃহে আমার আর স্থান নাই। তা ছাড়া আমি আবার মুসলমানী।

এখানে স্বামীর ঋণ যাহা ছিল, পরিশোধ করিয়াছি। আমার কাছে লুকানো দুটি সোনার মাকড়ি ছিল, তাহাই বেচিয়াছি। তুমি যে পাঁচটি টাকা একদিন রাখিয়া গিয়াছিলে,তাহা খরচ করি নাই। আমাদের বড় রাস্তার মোড়ের উপর যে মুদীর দোকান আছে,তাহার কর্তার কাছে রাখিয়া দিয়াছিচাহিলেই পাইবে। মনে দুঃখ করিয়ো না ভাই। টাকা কয়টি ফিরাইয়া দিলাম বটে, কিন্তু তোমার ওই কচি বুকটুকু আমি বুকে পুরিয়া লইয়া গেলাম। আর এইটি তোমার দিদির আদেশ শ্রীকান্ত, আমার কথা ভাবিয়া তোমরা মন খারাপ করিও না। মনে করিও, তোমার দিদি, যেখানেই থাকুক, ভালই থাকিবে ; কেননা দুঃখ সহিয়া সহিয়া এখন কোন দুঃখই আর তার গায়ে লাগে না। তাকে কিছুতেই আর ব্যথা দিতে পারে না। আমার ভাই দুটি, তোমাদের আমি কি বলিয়া যে আশীর্বাদ করিব খুঁজিয়া পাই না। তবে শুধু এই বলিয়া যাই ভগবান পতিব্রতার যদি মুখ রাখেন, তোমাদের বন্ধুত্বটি যেন চিরদিন তিনি অক্ষয় করেন।

তোমাদের দিদি অন্নদা

কি দিয়ে ব্যাখ্যা করবো এ চরিত্র আমি তা জানি না। শুধুই কি পতিব্রতা ?  শুধুই কি সতীধর্ম ? এই বিচিত্র জীবনে কি প্রেম নেই একেবারেই ?  শুধুই কি কুলটা নামে অন্নদাদিদি বেঁচে থাকবেন তাঁর পাড়া প্রতিবেশীর কাছে ?  গ্রামের এক সাধারণ স্বল্প শিক্ষিতা ব্রাহ্মণকন্যা কোথা থেকে পেয়েছিলেন এই মানসিক দৃঢ়তা ?

এটাই ভারতবর্ষ। সীতাসাবিত্রীবেহুলা ছুঁয়ে বহমান দিকে দিকে দিনে দিনে। মৃত স্বামীকে বাঁচাতে গাঙুড়ের জলে ভেলার ওপরে মৃতদেহ নিয়ে ভেসেছিলেন বেহুলা। কিসের জোরে ?  জোর একটাই। তা হলো বিশ্বাসের জোর। প্রেমের জোর।

আজ এই ২০১৭ সালে এসে আধুনিক ভারতবর্ষ আধুনিক উপকরণের প্রাবল্যে হারিয়ে ফেলেছে সেই বিশ্বাস। মানুষ হত্যা করাচ্ছেন স্বামীস্ত্রীপুত্রকন্যাকে। শুধু টাকার জন্যে, ক্ষমতার জন্যে। বিশ্বাস তো আজ মমি হয়ে গেছে আমাদের হৃদয়ে।

তবে এখনো কিছু প্রেম বেঁচে আছে মনে হয় আমার। তা না হলে এখনো অন্নদাদিদিকে কেন রেখে দিয়েছি অন্তরের মাঝে। কেন এখনো শ্রীকান্ত পড়তে শুরু করলে থামতে পারি না আর !

এভাবেই বেঁচে থেকো অন্নদাদিদি আমার হৃদয়ে...

 

রাতে রাতে হেঁটে হেঁটে নক্ষত্রের সনে

তারে আমি পাই নাই; কোনো এক মানুষীর মনে

কোনো এক মানুষের তরে

যে জিনিস বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীর গহবরে !

নক্ষত্রের চেয়ে আরো এক নিঃশব্দ আসনে

কোনো এক মানুষের তরে কোনো এক মানুষের মনে  !       -- জীবনানন্দ দাশ

 

#

©গৌতম দত্ত

১১ই জুলাই, ২০১৭

কলকাতা