স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা - (৮)

পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌

আজ সকালে অনেকদিন পরে দেখলাম বাঁদর-খেলা দেখাতে একজন লোককে। সেই ছোটবেলায় এগুলো আকছার দেখতাম কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়। সাপখেলা, বাঁদরখেলা তারপরে সেই চৌকোবাক্সে শালিমার নারকেল তেলের টিন ফিট্‌ করা জায়গা দিয়ে সিনেমা দেখা। এগুলো এখন সত্যিই স্মৃতি।

ফিরে এসে বারান্দায় বসে খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে বসলাম বটে কিন্তু মনের আনাচে কানাচে তখন খেলা করছে সেই পুরোনো হারিয়ে যাওয়া দিন গুলোর অষ্পষ্ট আর ঝাপসা ঝাপসা কিছু ছবির কোলাজ। হঠাৎ মনে পড়ল, বাংলা একটা উপন্যাসে পড়া এক অদ্ভুত এই প্রাণীর কথাগুলো। আস্তে আস্তে কোলাজগুলো পরপর মিশিয়ে একটা মালা গাঁথার ইচ্ছে হলো। দেখুন ভাল লাগে কি না ! আর এই প্রসঙ্গে আমার মনে হলো যে আপনাদেরও মনে পড়ে কিনা সেই উপন্যাস আর লেখকের নামটা, তা একটু দেখাই যাক্‌ না।

আমার লেখায় বেশ অনেকটাই সেই লেখকের লেখা অংশগুলো তুলে দিয়েছি। আর খানিকটা আমার ইন্টারনেট বিদ্যা।

সন ১৮৭১ এর এক মেঘলা সকাল।

বোষ্টন থেকে সিড্‌নি যাচ্ছে এক মালবাহী জাহাজ। নাম তার ব্রিন্ডল্‌। জাহাজটির সবারই মুখ বেশ শুকনো। ঝড় যে কোনো সময় আছড়াতে পারে। জাহাজ আস্তে আস্তে এগোচ্ছে সেই ভয়াবহ ফ্রেঞ্চ পাসের দিকে।

এবারে সেই বইটার অংশ থেকেই তুলে দিই...

এই ফ্রেঞ্চপাসের নামেই ভয়ে বুকের ভেতরটা গুড়গুড় করে না এমন নাবিক নেই। শান্ত আকাশ আর শান্ত সমুদ্রেও এই ফ্রেঞ্চ-পাসে যে কত জাহাজ ডুবেছে আর কত শত শত প্রাণ গেছে ঠিক নেই ! এই বিশাল ফ্রেঞ্চ-পাস্‌ শুরু হয়েছে পেলে্রাস সাউণ্ড থেকে, শেষ হয়েছে টাস্‌মান বে-তে এসে। এই লম্বা রাস্তা পাড়ি না দেওয়া পর্যন্ত সর্বক্ষণ সংকট সর্বক্ষণ জীবন-সংশয়। সেখানকার বিশ্বাসঘাতক জলের স্রোত কোন জাহাজ কোথায় নিয়ে গিয়ে ডোবাবে ঠিক নেই, সেখানকার জলের তলায় কোন্‌ লুকোনো পাহাড়ে ধাক্কা লেগে কোন্‌ জাহাজটা যে খানখান হয়ে যাবে তারও ঠিক নেই। তার ওপর এই ফ্রেঞ্চ-পাসএ ডুকে পড়ার পর দুর্যোগ এলে জাহাজ বাঁচানো বা প্রাণ বাঁচানো তো এক আশ্চর্য ব্যাপার।       

জাহাজ চলেছে। দিনের আর সমুদ্রের অবস্থা দেখে নাবিকেরা বিষণ্ণ, ক্যাপ্টেন চিন্তিত। হঠাৎ নাবিকেরা দেখে জাহাজের সামনেই বিশাল একটা শুশুক লাফিয়ে উঠল। ঝকঝকে তকতকে গাঢ় নীল রঙ। এত বড় যে নাবিকেরা প্রথম ভাবল তিমির বাচ্চা হবে। জাহাজের ঠিক আগে তরতর করে সাঁতরে চলল সে, ফুর্তিতে ডিগ্‌বাজী খাচ্ছে এক-একবার। এমনভাবে চলেছে যেন জাহাজটা তার বন্ধু, অনেকদিন বাদে বন্ধুর দেখা পেয়েই আনন্দ যেন ধরে না তার।

নাবিকেরা কেউ কেউ ধারালো হারপূন দিয়ে ওটাকে খতম করে জাহাজে তুলতে চাইলে। তিমি শিকারের জন্য হারপূন জাহাজে থাকেই। কিন্তু ক্যাপ্টেনের বউ ভয়ানক আপত্তি করলে, আ-হা, মেরো না বাপু, ওটাকে কেউ মেরো না তোমরা।

আশ্চর্য, ওটা সঙ্গে চলল তো চললই। এদিকে কুয়াশা, দুর্যোগ দূরের কিছুই দেখা যায় না। নিরুপায় ক্যাপ্টেনের নির্দেশে জাহাজ তখন ওই জলের জীবটাকেই অনুসরণ করে চলেছে। সে যেখান দিয়ে যাচ্ছে আশা করা যায় সেখানকার অজ্ঞাত স্রোত বিপদের কারণ হবে না,  আর আশা করা যায় ঈ-পথে জলের নীচে লুকোনো পাহাড়ও থাকব না। জাহাজ চলেছে সামনের এই প্রাণীটা তার কাণ্ডারী।

ফ্রেঞ্চ-পাস নির্বিঘ্নে পার ! নাবিকেরা সব আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু তাদের বন্ধু ? বন্ধু গেল কোথায় ? দেখা গেল বন্ধু ফিরে চলেছে।

সেই শুরু। এরপর পেলোরাস সাউণ্ডএর কাছে কোনো জাহাজ এলেই অব্যর্থ সাক্ষাৎ মিলবে তার। জলের ওপর থেকে বারকয়েক লাফিয়ে উঠে জাহাজটাকে অভ্যর্থনা জানাবে সে। তারপর নির্বিঘ্নে পার কর দেবে সেই ভয়াবহ ফ্রেঞ্চ-পাস। কোনো একটা জাহাজকে সে অবহেলায় ছেড়ে দেবে না, সঙ্গশূন্য করবে না। একেবারে ফ্রেঞ্চ-পাসের শেষে এসে তবে ফিরবে।

বিপদের শুরু পেলোরাস সাউণ্ডের মুখেই বাস করে প্রাণীটা, তাই নাবিকেরা তার নাম দিল পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌। দেখতে দেখতে তামাম দুনিয়ার নাবিকের কাছে ছড়িয়ে পড়ল পেলোরাস জ্যাকের নাম। ফ্রেঞ্চ-পাসের ভয় কেটে গেল। জাহাজের মালিকেরা ফ্রেঞ্চ-পাসএর যাত্রাকে অনিশ্চিত যাত্রা ভাবত ভুলে গেল। রোজ জাহাজ চলতে লাগল। পেলোরাস্‌ সাউণ্ডের মুখেই প্রতিদিন প্রতিটি জাহাজের জন্য অপেক্ষা করছে বন্ধু পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ - ভাবনা কি ! জাহাজ পেলোরাস সাউণ্ডের মুখে এলেই প্রতিটি নাবিক, ক্যাপ্টেন, সকলে সমুদ্রের দিকে ঝুঁকুবে, রেলিংএ হুমড়ি খেয়ে পড়বে।

পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !  পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !  পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !

ওই যে ! ওই যে - পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !

জলের ওপর বারকয়েক ডিগবাজী খেয়ে দেখা দেবে সাড়া দেবে অভ্যর্থনা জানাবে পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌। শত মানুষের চিৎকারে আর উল্লাসে জাহাজ যেন ফেটে যাবে। তারপর নিশ্চিন্ত। সব দায়িত্ব এখন পেলোরাস্‌ জ্যাকের। সে যে পথে যায় সেই পথে চলো ! পরম নিশ্চিন্তে চলো। বিপদ গোটাগুটি পার করে দিয়ে তবে ফিরবে পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌। নাবিকেরা, ক্যাপ্টেন সকলে সমস্বরে আবার বিদায় সম্ভাষণ জানাবে তাকে, পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !  পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !

পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ ফিরে তাকাবে না, সম্ভাষণের জবাবে বারকয়েক শুধু ডিগবাজী খেয়ে মনের আনন্দে ফিরে যাবে যেখান থেকে তার ডিউটি শুরু সেইখানে।

১৮৭১ থেকে ১৯০২ অবধি অর্থাৎ একটানা প্রথম একত্রিশ বছরের মধ্যে প্রচণ্ড ঝড়ে দুর্যোগেও একটিও জাহাজ ফ্রেঞ্চ-পাসএর মধ্যে তলিয়ে গেল না, একটি প্রাণও নষ্ট হল না। কারণ ভালো সময় হোক আর মন্দ সময় হোক, ওই একত্রিশ বছরে একটি জাহাজকেও পেলোরাস্‌ জ্যাকের সঙ্গ বা নিশানা বঞ্চিত হয়ে পার হতে হয়নি।

তারপর এলো ১৯০৩ সাল আর ১৯০৩ সালের সেই দুর্ভাগা পেঙ্গুইন জাহাজ। সকলে নিশ্চিন্ত। পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ পাইলট, সে-ই জাহাজ নিয়ে চলেছে ফ্রেঞ্চ-পাসের ভিতর দিয়ে।

 

জাহাজে ছিল এক মাতাল যাত্রী। সকালেই আচ্ছা করে মদ খেয়েছে। তারপর দেখেছে জীবটা চলেছে জাহাজের পাশে পাশে। কি দুর্মতি হল তার। পিস্তল বার করে দিলে গুলি চালিয়ে।

জাহাজের নাবিকেরা চমকে লাফিয়ে উঠল। চমকে লাফিয়ে উঠল পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ও। কিন্তু এটা তার আনন্দে লাফিয়ে ওঠা নয়, রক্তাক্ত যাতনায়। তারপরেই ডুব দিল পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌।

আর্তনাদ করতে করতে নাবিকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই মাতাল যাত্রিটির ওপর। তাকে খুন করবে, খুন করবেই তারা। তাদের সেই জিঘাংসু রোষ থেকে তাকে রক্ষা করা জাহাজের যাত্রীদের আর ক্যাপ্তেনের কাছে এক প্রাণান্তকর ব্যাপার। লোকটা প্রাণে বাঁচল কোনোরকমে।

একত্রিশ বছর বাদে পর পর দু সপ্তাহের জন্য দেখা গেল না পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌কে।

জাহাজ পেলোরাস সাউণ্ডের কাছে এলেই নাবিকেরা ঝুঁকে পড়ে, ক্যাপ্তেন ঝুঁকে পড়ে - যাত্রীরাও।

পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !   পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !

দু সপ্তাহ পর্যন্ত ডাকাডাকি সার। পেলোরাস সাউণ্ডের মুখে জাহাজ দেখে বা ডাক শুনে জলের তলা থেকে কেউ লাফিয়ে উঠল না, কেউ অভ্যর্থনা জানালো না। সকলে ধরে নিল পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ মাতাল যাত্রীর গুলি খেয়ে মরে গেছে।

আসলে পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ কিছুদিনের সিক্‌ লিভ নিয়েছিল তামাম নাবিকদের কাছ থেকে। আহত হয়ে কিছুদিন নিজেকে নিজেই শ্রুশুষা করে গেছিল সে। একত্রিশ বছর মানে ১১ হাজার ৩১৫ দিনের চাকরীতে জমানো ছুটির থেকে মাত্র দু হপ্তার জন্য সে মেডিক্যাল লিভ। একটা দিনের জন্যেও পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ ক্যাজুয়্যাল লিভ নেয়নি। আর্নড বা প্রিভিলেজ লিভ তো দূরস্থান !  এমন কি কলকাতার সরকারি অফিস বাবুদের মতো তার য়্যাটেণ্ডেন্স রেজিষ্টারে একটাও লাল দাগ পড়েনি তখনো অব্দি !

পাক্কা দু হপ্তা পরে আবার লাফ্‌ দিয়ে তার উপস্থিতি জানান দিলো পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌। এই দু হপ্তা বন্ধই ছিল ফ্রেঞ্চ-পাসে জাহাজ চলাচল। জাহাজ কোম্পানীগুলো হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। নাবিকেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গান শুরু করে দিল। ছুটোছুটি হুড়োহুড়ির বন্যা যাকে বলে।

আপনারা টোয়েন্টি থাউজ্যাণ্ডস লীগস্‌ ইন দ্য সী সিনেমায় কার্ক ডগলাসের সেই বিখ্যাত গানটা শুনেছেন কিনা জানি না তবে আমি কল্পনা করে নিতে পারি যে এমনই আনন্দ গ্রাস করেছিল সেদিনে সেই ফ্রেঞ্চ-পাসের জাহাজগুলোর ডেকে।

Got a whale of a tale to tell ya, lads

A whale of a tale or two

'Bout the flappin' fish and the girls I've loved

On nights like this with the moon above

A whale of a tale and it's all true

I swear by my tattoo

There was Mermaid Minnie, met her down in Madagaskar

She would kiss me, any time that I would ask her

Then one evening her flame of love blew out

Blow me down and pick me up!

She swapped me for a trout......

আগ্রহীজনেরা দেখে নিতে পারেন নীচের লিংকটা :-

 

https://www.youtube.com/watch?v=PPPRBAPGYJw

পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌কে পেয়ে আত্মহারা নাবিকদের মুখে ফুটলো স্বস্তির খোলা হাওয়া। দমবন্ধ করা দু হপ্তার অবসান ঘটলো। নিউজিল্যাণ্ড সরকার ওয়েলিংটন কাউন্সিল থেকে এক্কেরে অর্ডিন্যান্স জারী করে দিল। যে কেউ কোনোরকম ভাবে পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌-এর ক্ষতি করার চেষ্টা করবে তাকে যথাযথ শাস্তি পেতেই হবে। আর এই আইন কে চোখে চোখে রাখার দায়িত্ব হাসিমুখে গ্রহণ করে নিলো তামাম নাবিককুল। সারা দুনিয়ার।

তখনো অনেক বিস্ময় বাকি ছিল।

কিছুদিন পরেই এই ফ্রেঞ্চ-পাস পেরোনোর জন্য হাজির হল সেই পেঙ্গুইন জাহাজ। নাবিকেরা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌  পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ !  কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা ! এলো না সে ! অদৃশ্য হয়ে অভিমানে মুখ লুকিয়ে রইল পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌।

একা একাই পাড়ি দিতে হল পেঙ্গুইন জাহাজকে এর পর। দুর্যোগ ঘনিয়ে এলো ওই জাহাজ কোম্পানীর। একে একে সব্বাই চাকরী ছাড়তে শুরু করলো। অভিশপ্ত জাহাজকে একাই পেরোতে হত ফ্রেঞ্চ-পাস। ১৯০৯ সালে এই ফ্রেঞ্চ-পাসেই ডুবে গেল পেঙ্গুইন। দীর্ঘ ৩১ বছরের একমাত্র বিপর্যয়।

বাকি সব জাহাজের জন্য পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ যথাসময়েই হাজির হয়ে যায়। এইভাবে চললো আরো কয়েক বছর। এলো ১৯১২ সালের এপ্রিল মাস। পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌ তার চল্লিশ বছরের কর্মজীবন সাঙ্গ করে হুট্‌ করে একদিন লাপাত্তা হয়ে গেল।

পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌  পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌   ডাকে আর কেউ সাড়া দিল না তারপর। সব শুন্য হয়ে গেল নাবিকদের।

কি অপূর্ব সত্যি একখানা গল্প বলুন তো !   

কবে পড়েছিলাম জানেন ?  ১৯৭৪ সালে খুব সম্ভবতঃ। তার আগে আমি অবশ্য দেব সাহিত্য কুটির প্রকাশিত পুজাবার্ষিকিতে চিনে গেছি পিন্‌ডিদা কে আর তার স্রস্টার নামও জেনে গেছি। কিন্তু এ গল্প পিন্‌ডিদার নয়।

ক্লাস নাইনে যখন আমাদের অঞ্চলের পালপাড়া পাবলিক লাইব্রেরির মেম্বার হলাম তখন থেকেই শুরু উপন্যাস পড়া। আজ অমুক লেখকের উপন্যাস তো কাল তমুক লেখকের। হঠাৎ একদিন লাইব্রেরিয়ান অজয়দা ধরলেন আমায়। মাথায় ঢুকিয়ে দিলেন বই পড়ার প্রাথমিক শর্ত। কি সেটা ?  না, এমন করে পড়বে না বই। যখন রবীন্দ্রনাথ পড়বে তখন ধারাবাহিক ভাবেই তাঁর লেখা সব উপন্যাস এক নাগাড়ে পড়বে। সেটা শেষ হলে অন্য লেখকের উপন্যাস ধরবে আবার। আমিও শুরু করলাম। রবীন্দ্রনাথ বাড়িতেই ছিল। শুরু হল পড়া। তবে মাত্রাতিরিক্ত পড়া শুরু হল উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে, ছুটিতে। প্রতিদিনই একটা করে বই গিলতাম। এভাবেই বাঙলা সাহিত্যের জগতে আমার অনুপ্রবেশ।

তা সেই ফর্মূলানুযায়ী একসময় এসে পড়লেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। ইনি বাঙলার বাঘ নন মোটেই, এমন কি সাহিত্যের জগতে বলতে গেলে এক ঘরেই। কিন্তু ওই বয়সে পঞ্চতপা, সাত পাকে বাঁধা, আমি সে ও সখা, প্রণয়পাশা, বলাকার মন, চলাচল, সাবরমতী ইত্যাদি সব উপন্যাস পড়ে যখন সিনেমার পর্দায় দেখতাম আর কল্পনার রসে জারিত হত আমার সেই কৈশোরক চিন্তাগুলো কেড়ে নিত রাতের ঘুম, তখন কি ভালই যে লাগত !  এ লেখক একঘরে কিংবা পাতে দেবার যোগ্য নয় বলে শুনতাম প্রায়শই। কিন্তু ওই যে, উত্তমকুমার কিম্বা সৌমিত্রর সিনেমার পোকা হিসেবে এই সব ছবি যাঁর উপন্যাস অবলম্বনে তাঁকে অস্বীকার করি কি করে !  গ্রোগ্রাসে গিলতাম সব। ওনার লেখা প্রায় সব উপন্যাসই সিনেমা হয়েছে।

আমাদের সময় প্রায় প্রতি বাড়িতেই যে বইখানা থাকতোই থাকতো, তা হল বেণীমাধব শীল মহাশয়ের পাঁজি। প্রায় ডিকশ্‌নারীর মতো মোটা আর তার মধ্যেই থাকতো বৃহৎ মূলা-র পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন। প্রায় তেমনই ঢাউসমার্কা কখানা উপন্যাস লিখেছিলেন আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। যেমন কাল তুমি আলেয়া, শতরূপে দেখা, নগরপারে রূপনগর ইত্যাদি। এগুলো প্রায় ছ-সাতশ পাতার উপন্যাস।

সেই নগরপারে রূপনগর বইটা পড়তে গিয়ে বইটার প্রায় শ পাঁচেক পাতায় গিয়ে যখন পড়তে শুরু করলাম পেলোরাস্‌ জ্যাক্‌কে আনন্দে উৎসাহে আর ঘুমই হল না। পাঠক মনে রাখবেন সালটা ১৯৭৪। গুগুলবাবা তখনো পৃথিবীর আলো দেখে নি। আমাদের সম্বল পাড়ার লাইব্রেরী। সুতরাং বাকি কিছু জানা আর উত্তরমেরু যাওয়া প্রায় একইরকম ছিল।

         এবারে শেষ করি আলোচনা। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কে নিয়ে তাঁর মেয়ে সর্বাণী মুখোপাধ্যায় একটা লেখা লিখেছিলেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। সেই লেখার কিছু অংশ তুলে দিই আপনাদের জন্য :

 

সাড়ে চব্বিশ বছরেরও আগের কথা। আর এই চলে যাওয়ার পঁচিশতম বছরে যখন বাবাকে নিয়ে লিখছি, তখন অদ্ভুত এক সমাপতন। ওরই উপন্যাস অবলম্বনে সাত পাকে বাঁধা (হিন্দিতে কোরা কাগজ) সদ্য পঞ্চাশ পেরিয়েছে। কয়েক জায়গায় এ নিয়ে লেখালেখিও চোখে পড়ল। কিন্তু সব খানেই অনুচ্চারিত কাহিনিকারের নাম। আজ বলে নয়, তখনও। একই ব্যাপার বাবার ছোট গল্প নার্স মিত্র নিয়ে করা আরেক সুপার-হিট দীপ জ্বেলে যাই-এর (হিন্দিতে খামোশি) বেলাতেও। চলাচল (হিন্দিতে সফর), পঞ্চতপা, আমি সে ও সখা(হিন্দিতে বেমিশাল) ...? একজনও কি মনে রেখেছেন কাহিনিকারের নাম! আজ বলে নয়, তখনও। উপেক্ষায়, অবজ্ঞায় বাবা বোধহয় অভ্যস্তই ছিল। বলত, কী যায় আসে! বিয়ের সময় বাবা যেভাবে মেয়েকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরের হাতে তুলে দেয়, আমিও সেটাই করেছি। বিয়ের পর মেয়ে তো পরেরই হয়ে যায়। প্রত্যেকটি গল্প-উপন্যাস ছিল বাবার কাছে তাঁর মেয়ে। সিনেমার রাইট দিয়ে দেওয়াকে বাবা বলত, পরের হাতে তুলে দেওয়া। চিত্রনাট্য লেখাটা ওর কাছে ছিল সাজিয়ে গুছিয়ে দেওয়া।

দিনের পর দিন দেখেছি বড় বড় প্রযোজক-পরিচালক স্ক্রিপ্ট করে নিয়ে এসেছেন। একবার চোখ বুলিয়ে কিসসু হয়নি বলে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছে বাবা। নিজে বসে গিয়েছে কলম হাতে। তার পরেও পর্দায় নাম দূরে থাক,কৃতজ্ঞতাস্বীকারটাও যে পেয়েছে,তাও না। তাতে হেলদোল ছিল কি ?অভিমান ?রাগ ?অপমানবোধ ?কোনও দিন বুঝিনি। শুধু মাঝে মধ্যে এটুকু বলতে শুনেছি,চালের কাঁকর বাছার মতো করে এক-একটা অক্ষর ধরে ধরে লিখেছি। আগাপাস্তলা ঝেড়ে মুছে স্ক্রিপ্ট করেছি। তবে না ছবিগুলো হিট হয়েছে। ব্যস। আর কিছু না।

ব্যতিক্রম ছিল একমাত্র কাল তুমি আলেয়া। তাও উত্তমকুমারের জন্য। উত্তমকাকু বাবাকে বলেছিল,এটা হতে পারে না দাদা। তুমি আমার বাড়ি এসে রাতের পর রাত জেগে ঘষেমেজে স্ক্রিপ্ট করবে। আর তোমার নাম থাকবে না,তা হয় না।

বাবার কথা বলতে গিয়ে একজনের কথা না বললেই নয়। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। একেবারে প্রথম দিকের লেখা পঞ্চতপা উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছিল ওঁকেই। এদিকে প্রায় দুমাস তাঁর দিক থেকে কোনও সাড়া শব্দ নেই। বাবা তখন কলকাতার একটি খবরের কাগজে সাব এডিটরের কাজ করেন।

হঠাৎই এক দুপুরে অফিসে হাজির তারাশঙ্কর। সোজা তার হাত ধরে টেনে তুলে সম্পাদক পরিমল গোস্বামীকে তিনি বললেন,একটা বিশেষ দরকারে ওকে নিয়ে যাচ্ছি। একেবারে পুলিশি গ্রেপ্তারি যাকে বলে !  গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতে যেতে জেরা,তোমার পঞ্চতপা-র ছড়া-পাঁচালিগুলো তুমি নিজে লিখেছ ?শুকনো মুখে আসামির জবাব,হ্যাঁ এ বার প্রশ্ন,কেন ?তুমি নিজে বানাতে গেলে কেন ?

এ বার নতুন লেখকের যা-হয়-হোক মরিয়া জবাব,“’কবি উপন্যাসেও তো অনেক ছড়া পাঁচালি আছে। কবির লেখক হয়ে আপনি নিজে সেগুলো বানাতে গেলেন কেন?মানী জ্যেষ্ঠের মুখের ওপর বেফাঁস কথা বলে উত্তরের অপেক্ষা করে থাকা ছাড়া আর উপায় কী! কিন্তু কোনও জবাব নেই। লম্বা সারাটা পথে গম্ভীর মুখে বসে কবির লেখক।

বাড়িতে পৌঁছে গাড়ি থেকে নেমে ইশারায় সঙ্গে আসতে বলে গটগটিয়ে সোজা ভেতরের ঘরে স্ত্রীর কাছে গেলেন তারাশঙ্কর। আঙুল তুলে আসামীকে দেখিয়ে বললেন,এই হল আশু,আমাকে ওর নিজের বানানো ছড়া-পাঁচালি লেখা বই উপহার দিয়েছে। ওকে কিছু খেতে দাও তো।

তার পর গায়ের জামাটা খুলে ব্র্যাকেটে ঝুলিয়ে কাছে এসে,এইবার বিশেষ দরকারি কাজটা সেরে নিই। যে জন্য এভাবে নিয়ে এলাম। খালি গায়ে এগিয়ে এসে দুহাত বাড়িয়ে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর খোলা বুকে জাপটে ধরলেন তাঁর চেয়ে অনেকই ছোট,সদ্য কুঁড়ি-ফোঁটা আরেক লেখককে। বহু বার এ গল্প করত বাবা। বলত,এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। সেই স্পর্শ এখনও আমার শরীরে ছেয়ে আছে। এমন নবীনবরণ কি আজও হয় ?

প্রবীণের মধ্যে যেমন তারাশঙ্কর,নবীনের মধ্যে তেমন সমরেশ বসু। তিনি আর বাবা এক সময়ের লেখক। কিন্তু বাবা বলত,সমরেশ হল কাঁচা মাটি ছেনে উঠে আসা জীবনঘাঁটা সাহিত্যিক। আমি ওর মতো লিখতে পারব না। আমরা তো ড্রইংরুম রাইটার।

একবারের ঘটনা বলি। তখন সমরেশ বসুর বিবর আর প্রজাপতি নিয়ে তুলকালাম। এদিকে বাবা এ নিয়ে কোনও কথাই বলছেন না। অপেক্ষায় থেকে থেকে একদিন সমরেশ বসু বললেন,পড়েছেন ? প্রশ্নের মতোই জবাবও একটি শব্দে,পড়েছি। আবার এক শব্দের জিজ্ঞাসা,দুটোই?উত্তর,দুটোই। এবার ধৈর্য হারিয়ে সমরেশ বসু,কী হল ? কিছু বলবেন না?দুদিকে মাথা নাড়িয়ে আশুতোষের উত্তর,নাঃ, আমার কিচ্ছু বলার নেই। আমি এরকম লিখতেও পারব না। লিখবও না।

এ কথায় প্রচণ্ড ক্ষোভে সমরেশ বললেন,ওঃ। বুঝেছি। টিপিক্যাল মিডল ক্লাস মেন্টালিটিতে ওই সেক্স আর জৈবিক ব্যাপারগুলো হজম করতে পারছেন না। তাই তো ? পারবেন,সেক্স ছাড়া শরীর ছাড়া যৌনতার গন্ধ ছাড়া একটাও রোম্যান্টিক লেখা লিখতে।

সঙ্গে সঙ্গে জবাব,পারব। লিখে সব থেকে আগে আপনাকেই পড়াব। এর পরই বাবা লিখল,মনমধুচন্দ্রিকা। যেখানে নায়ক-নায়িকা শরীরী হওয়া দূরে থাক,নিজেদের মধ্যে একটা কথাও বলেনি। লেখা পড়ে সমরেশ বসু বলেছিলেন,আনথিংকেবল্ ! কনগ্র্যাচুলেশনস্। তার পর,আমারও কেবল একটা কথাই বলার আছে ... আমিও পারব না... তবে আপনার মতো বলতে পারছি না লিখবও না। দুই বন্ধুর উষ্ণ হাতের তালু তখন একে অপরের কাছে বন্দি।

এই খুনসুটিগুলোও কেমন হারিয়ে গেল,না ?হারিয়ে যাওয়া,ভুলে যাওয়া মুখগুলোর মতো ?

 

#

©গৌতম দত্ত

১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০১৭

 

http://archives.anandabazar.com/archive/1140111/11smaran.html

#