স্বপ্নের ফেরিওয়ালারা - (২)



‘মড়ার কি জাত থাকে রে ?’

 

খুব রাগ হয় !  খুব রাগ হয় মায়ের ওপর, বাবার ওপর, বাড়িশুদ্ধু সব্বার ওপর !

এদিকে রোজ বিকেলে আমার কাকাবাবু মানে বড়কাকা, অফিস থেকে ফিরেই আমার ছোট্ট ছোট্ট হাতদুখানি ধরে আমাদের ছানাপট্টির গলি থেকে বেড়িয়ে রামদুলাল সরকার স্ট্রীট ধরে সোজা হেদুয়া’য় !  তারপর বার দুয়েক একটা গোটা ডিমের মতো রেলিঙ-ঘেরা পুকুরটার চারধারে কাকা’র হাত ধরে হেঁটে হেঁটে দক্ষিণ-পশ্চিম কোনের গেটটা দিয়ে বেরিয়েই সেই গরম গরম চিনেবাদাম ভাজা’র ঠোঙা হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরা ! রোজ ! প্রত্যহ !  মা চিনেবাদাম খাবে খোলা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে তাই দেওরের রোজই চিনেবাদাম কেনা !  আর এদিকে আমি যে আমি, গরমকালের হেদো’র (এটা চলিত নাম) পুকুরে টুপিমাথা বাচ্চাদের রোজ রোজ পা ছুঁড়তে দেখে যখন আবদার করতাম, সাঁতার শিখবো বলে, তখন নাকি কতো কথা ! বাজে জল। শরীর খারাপ হবে। খুব গভীর। তারপর নাকি গোটা তিনেক পাতকুয়ো আছে পুকুরের তলায় এমন আরো আরো কতো কি !  আসলে এ সবই বাজে কথা। বংশের পেত্থম নাতি তো ! তাই যদি কোনো অঘটন ঘটে আর কি ! কেউ বোঝে নি জানেন, কেউই না !

আর এই জন্যেই তো ইন্দ্রনাথে’র সাথে দেখাই করতে পারলাম না আজও !  সেই শ্রীকান্ত’র বন্ধু কাম গুরু যে !  যদি প্রথম দেখাতেই জিজ্ঞেস করে বসে – ‘সাঁতার জানিস ?’

যদি বলি – নাগো ! তাহলে শুনবোই বা কি ? ঐ বয়সী একটা দামাল ছেলের কাছে ?

‘তবে আয় ভাই! বলিয়া সে আমার একটা হাত ধরিল। কহিল,আমি একলা এত স্রোতে উজোন বাইতে পারিনে— একজন কাউকে খুঁজি,যে ভয় পায় না।’

এই জন্যেই আমার সাঁতার না শেখার যন্ত্রণা কুরে কুরে খায় !  সেই ছোট্টবেলা থেকে – যবে থেকে শরৎচন্দ্র পড়তে শিখেছি স্কুলের বাঙলা বইতে’ই। কতোবার মন চলে যেত সেই ভাগলপুরের গঙ্গায় ! যখন এই উপন্যাসের ছোট ছোট অংশগুলো আমাদের পাঠ্য ছিল বিভিন্ন নাম দিয়ে।

“খাড়া কাঁকরের পাড়। মাথার উপর একটা বহু প্রাচীন অশ্বত্থবৃক্ষ মূর্তিমান অন্ধকারের মত নীরবে দাঁড়াইয়া আছে এবং তাহারই প্রায় ত্রিশ হাত নীচে সূচিভেদ্য আঁধার-তলে পরিপূর্ণ বর্ষার গভীর জলস্রোত ধাক্কা খাইয়া আবর্ত রচিয়া উদ্দাম হইয়া ছুটিয়াছে। দেখিলাম,সেইখানে ইন্দ্রের ক্ষুদ্র তরীখানি বাঁধা আছে। উপর হইতে মনে হইল,সেই সুতীব্র জল ধারার মুখে একখানি ছোট্ট মোচার খোলা যেন নিরন্তর কেবলই আছাড় খাইয়া মরিতেছে।”

ক্লাস সেভেন এইটের ছোট্ট ছেলের কাছে যা ছিল স্বপ্নের আকাশ, আজও যখন ‘শ্রীকান্ত’ খুলে পড়তে শুরু করি – সেই অনুভূতিটুকুই তাড়া করে ফেরে এখনোও। ভুলে যাই সব কিছু – সব।

“আমি নিজেও নিতান্ত ভীরু ছিলাম না। কিন্তু ইন্দ্র যখন উপর হইতে নীচে একগাছি রজ্জু দেখাইয়া কহিল,ডিঙির এই দড়ি ধ’রে পা টিপে টিপে নেমে যা,সাবধানে নাবিস্,পিছলে পড়ে গেলে আর তোকে খুঁজে পাওয়া যাবে না ;তখন যথার্থই আমার বুক কাঁপিয়া উঠিল। মনে হইল,ইহা অসম্ভব। কিন্তু তথাপি আমার ত দড়ি অবলম্বন আছে,কিন্তু তুমি?

সে কহিল,তুই নেবে গেলেই আমি দড়ি খুলে দিয়ে নাব্‌ব। ভয় নেই,আমার নেবে যাবার অনেক ঘাসের শিকড় ঝুলে আছে।

আর কথা না কহিয়া আমি দড়িতে ভর দিয়া অনেক যত্নে অনেক দুঃখে নীচে আসিয়া নৌকায় বসিলাম। তখন দড়ি খুলিয়া দিয়া ইন্দ্র ঝুলিয়া পড়িল। সে যে কি অবলম্বন করিয়া নামিতে লাগিল,তাহা আজও আমি জানি না। ভয়ে বুকের ভিতরটা এমনি ঢিপঢিপ করিতে লাগিল যে,তাহার পানে চাহিতেই পারিলাম না! মিনিট দুই-তিন কাল বিপুল জলধারার মত্তগর্জন ছাড়া কোনও শব্দমাত্র নাইহঠাৎ ছোট্ট একটুখানি হাসির শব্দে চকিত হইয়া মুখ ফিরাইয়া দেখি,ইন্দ্র দুই হাত দিয়া নৌকা সজোরে ঠেলিয়া দিয়া লাফাইয়া চড়িয়া বসিল। ক্ষুদ্র তরী তীব্র একটা পাক খাইয়া নক্ষত্রবেগে ভাসিয়া চলিয়া গেল।”

উফফ্‌ ! গায়ে কাঁটা দেয়, এই বয়সেও ! 

“কয়েক মুহূর্তেই ঘনান্ধকারে সম্মুখ এবং পশ্চাৎ লেপিয়া একাকার হইয়া গেল। রহিল শুধু দক্ষিণ ও বামে সীমান্তরাল প্রসারিত বিপুল উদ্দাম জলস্রোত এবং তাহারই উপর তীব্রগতিশীলা এই ক্ষুদ্র তরণীটি এবং কিশোরবয়স্ক দুটি বালক। প্রকৃতিদেবীর সেই অপরিমেয় গম্ভীর রূপ উপলব্ধি করিবার বয়স তাহাদের নহে,কিন্তু সে কথা আমি আজও ভুলিতে পারি নাই ! বায়ুলেশহীন,নিষ্কম্প,নিস্তব্ধ,নিঃসঙ্গ নিশীথিনীর সে যেন এক বিরাট্ কালীমূর্তি। নিবিড় কালো চুলে দ্যুলোক ভূলোক আচ্ছন্ন হইয়া গেছে,এবং সেই সূচিভেদ্য অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া করাল দংষ্ট্রারেখার ন্যায় দিগন্তবিস্তৃত এই তীব্র জলধারা হইতে কি এক প্রকারের অপরূপ স্তিমিত দ্যুতি নিষ্ঠুর চাপাহাসির মত বিচ্ছুরিত হইতেছে। আশেপাশে সম্মুখে কোথাও বা উন্মত্ত জলস্রোত গভীর তলদেশে ঘা খাইয়া উপরে উঠিয়া ফাটিয়া পড়িতেছে,কোথাও বা প্রতিকূল গতি পরস্পরের সংঘাতে আবর্ত রচিয়া পাক খাইতেছে,কোথাও বা অপ্রতিহত জলপ্রবাহ পাগল হইয়া ধাইয়া চলিয়াছে।

আমাদের নৌকা কোণাকুণি পাড়ি দিতেছে,এইমাত্র বুঝিয়াছি। কিন্তু পরপারের ঐ দুর্ভেদ্য অন্ধকারের কোনখানে যে লক্ষ্য স্থির করিয়া ইন্দ্র হাল ধরিয়া নিঃশব্দে বসিয়া আছে তাহার কিছুই জানি না। এই বয়সেই সে যে কত বড় পাকা মাঝি,তখন তাহা বুঝি নাই। হঠাৎ সে কথা কহিলকি রে শ্রীকান্ত,ভয় করে ?

আমি বলিলাম, নাঃ—

ইন্দ্র খুশি হইয়া কহিলএই ত চাই—সাঁতার জানলে আবার ভয় কিসের! প্রত্যুত্তরে আমি একটি ছোট্ট নিশ্বাস চাপিয়া ফেলিলাম—পাছে সে শুনিতে পায়। কিন্তু এই গাঢ় অন্ধকার রাত্রিতে,এই জলরাশি এবং এই দুর্জয় স্রোতের সঙ্গে সাঁতার জানা এবং না-জানার পার্থক্য যে কি,তাহা ভাবিয়া পাইলাম না। সেও আর কোন কথা কহিল না।”

কি বলি একে !  ওই বয়সে আমাদের বাঙলা টেক্সট বইয়ে’র পাতায় পাতায় ছড়ানো এমন সব মণিমুক্তো। সাধ্য কি আমাদের যে, অন্য দিকে মুখ ফেরাই ! 

সাঁতার জানা এবং না-জানার ফলাফলের যে কোনো দামই নেই একথা শুনে একটু ভেজে মন। কিন্তু তারপর !  যখন শ্রীকান্ত বালির পাড় ভাঙা’র শব্দে ভয় পেয়ে উঠে ফিরে যেতে চায় তখন নিমেষের মধ্যেই উচ্চারিত হয় একটাই শব্দ ‘কাপুরুষ’ !

“চল্‌ তোকে ফিরে রেখে আসি—কাপুরুষ! তখন চৌদ্দ পার হইয়া পনরয় পড়িয়াছি—আমাকে কাপুরুষ ?ঝপাৎ করিয়া দাঁড় জলে ফেলিয়া প্রাণপণে টান দিলাম। ইন্দ্র খুশি হইয়া বলিল,এই ত চাই। কিন্তু আস্তে ভাই—ব্যাটারা ভারী পাজী। আমি ঝাউবনের পাশ দিয়ে মক্কাক্ষেতের ভিতর দিয়ে এমনি বার করে নিয়ে যাব যে শালারা টেরও পাবে না। একটু হাসিয়া কহিল,আর টের পেলেই বা কি ?ধরা কি মুখের কথা! দ্যাখ্‌ শ্রীকান্ত,কিচ্ছু ভয় নেই—ব্যাটাদের চারখানা ডিঙি আছে বটে,কিন্তু যদি দেখিস ঘিরে ফেল্‌লে ব’লে—আর পালাবার জো নেই,তখন ঝুপ করে লাফিয়ে পড়ে এক ডুবে যতদূর পারিস গিয়ে ভেসে উঠলেই হ’ল। এ অন্ধকারে আর দেখবার জোটি নাই,তারপর মজা করে সতুয়ার চড়ায় উঠে ভোরবেলায় সাঁতরে এপারে এসে গঙ্গার ধার ধরে বাড়ি ফিরে গেলেই বাস্‌ ! কি করবে ব্যাটারা  

চড়াটার নাম শুনিয়াছিলাম,কহিলাম,সতুয়ার চড়া ত ঘোরনালার সুমুখে,সে ত অনেক দূর।

ইন্দ্র তাচ্ছিল্যভরে কহিল,কোথায় অনেক দূর ?ছ-সাত ক্রোশও হবে না বোধ হয়। হাত ভেরে গেলে চিত হ’য়ে থাক্‌লেই হ’ল—তা ছাড়া মড়া-পোড়ানো বড় বড় গুঁড়ি কত ভেসে যাবে দেখতে পাবি।

আত্মরক্ষার যে সোজা রাস্তা সে দেখাইয়া দিল,তাহাতে প্রতিবাদের আর কিছু রহিল না। এই দিক্‌-চিহ্নহীন অন্ধকার নিশীথে আবর্তসঙ্কুল গভীর তীব্র জলপ্রবাহে সাত ক্রোশ ভাসিয়া গিয়া ভোরের জন্য প্রতীক্ষা করিয়া থাকা। ইহার মধ্যে আর এ দিকের তীরে উঠিবার জো নাই। দশ-পনর হাত খাড়া উঁচু বালির পাড় মাথায় ভাঙ্গিয়া পড়িবে—এই দিকেই গঙ্গার ভীষণ ভাঙন ধরিয়া জলস্রোত অর্ধবৃত্তাকারে ছুটিয়া চলিয়াছে !” 

এই হ’ল ইন্দ্রনাথ। ‘রায়েদের ইন্দ্র’ইন্দ্রনাথ রায়...

একে কি ভাল না বেসে পারা যায় ? ইন্দ্র ‘ছাড়া এমন বাঁশিই বা বাজাবে কে’ বলুন দিকি মাঝ রাতে বাড়ি ফেরার সময় শর্টকার্ট করতে ‘গোঁসাইবাগানের ভেতর দিয়ে’ ! যে ‘গোঁসাইবাগানে কত লোক যে সাপে-কামড়ে মরেচে,তার সংখ্যা নেই...’

এবারে বলুন তো, সত্যিই রাগ ধরে কি না ! হাজার ইচ্ছে থাকলেও দেখা করতে পারবো না ইন্দ্রের সঙ্গে। শুধু সাঁতার জানিনা বলে !

এই পাঠ্যাংশটুকুর নাম ছিল ‘শ্রীকান্তের নৈশ অভিযান’ যখন আমরা সেভেন বা এইটে পড়ি। তখন থেকেই ইন্দ্রনাথ আমার কিশোর মনটাকে একেবারে অন্য এক জগতে নিয়ে যেত। এর পরের অংশটুকুর কি নাম ছিল তা আর এখন মনে পড়ে না। কিন্তু ঘটনার ছবি বা লাইনগুলো এখনো এই বয়সে এসেও আমায় তাড়া করে ফেরে।

তারপরে যেটা হল তা পড়তে শুরু করলে এখনো রোমাঞ্চিত হয়ে উঠি। একটা অক্ষর ও যেন বাদ দেবার উপায় নাই...

“একটার ভিতর দিয়া খানিকটা বাহিয়া গিয়াই আমরা খালের মধ্যে পড়িলাম। জেলেদের নৌকাগুলো তখন অনেকটা দূরে কালো কালো ঝোপের মত দেখাইতেছে। আরও খানিকটা অগ্রসর হইয়া গন্তব্য স্থানে পৌঁছান গেল।

ধীবর প্রভুরা খালের সিংহদ্বার আগুলিয়া আছে মনে করিয়া এ স্থানটায় পাহারা রাখে নাই। ইহাকে মায়াজাল বলে। খালে যখন জল থাকে না তখন এধার হইতে ওধার পর্যন্ত উঁচু উঁচু কাঠি শক্ত করিয়া পুঁতিয়া দিয়া তাহারই বহির্দিকে জাল টাঙ্গাইয়া রাখে। পরে বর্ষার জলস্রোতে বড় বড় রুই-কাৎলা ভাসিয়া আসিয়া এই কাঠিতে বাধা পাইয়া লাফাইয়া ওদিকে পড়িতে চায় এবং দড়ির জালে আবদ্ধ হইয়া থাকে। 

দশ,পনর,বিশ সের রুই-কাৎলা গোটা পাঁচ-ছয় ইন্দ্র চক্ষের নিমেষে নৌকায় তুলিয়া ফেলিল। সেই বিরাটকায় মৎস্যরাজেরা তখন পুচ্ছতাড়নায় ক্ষুদ্র ডিঙিখানা যেন চূর্ণবিচূর্ণ করিয়া দিবার উপক্রম করিতে লাগিল,এবং তাহার শব্দও বড় কম হইল না।

এত মাছ কি হবে ভাই ? ”  এরপরেই সেই সতর্ক জেলেরা জানতে পারলো যে কেউ বা কারা তাদের মাছ চুরি করতে এসেছে। অতঃপর... 

“অনুকূল স্রোতে মিনিট দুই-তিন খরবেগে ভাঁটাইয়া আসিয়া হঠাৎ একস্থানে একটা দমকা মারিয়া যেন আমাদের এই ক্ষুদ্র ডিঙিটি পাশের ভুট্টা-ক্ষেতের মধ্যে গিয়া প্রবেশ করিল। তাহার এই আকস্মিক গতিপরিবর্তনে আমি চকিত হইয়া প্রশ্ন করিলাম,কি ?কি হ’ল ?

ইন্দ্র আর একটা ঠেলা দিয়া নৌকাখানা আরও খানিকটা ভিতরে পাঠাইয়া দিয়া কহিল,চুপ ! শালারা টের পেয়েছে—  চারখানা ডিঙি খুলে দিয়েই এদিকে আসচে—  ঐ দ্যাখ !

তাই ত বটে! প্রবল জল-তাড়নায় ছপাছপ শব্দ করিয়া চারখানা নৌকা আমাদের গিলিয়া ফেলিবার জন্য যেন কৃষ্ণকায় দৈত্যের মত ছুটিয়া আসিতেছে। ওদিকে জাল দিয়া বন্ধ,সুমুখে ইহারা। পলাইয়া নিষ্কৃতি পাইবার এতটুকু স্থান নাই। এই ভুট্টা-ক্ষেতের মধ্যেই যে আত্মগোপন করা চলিবে,তাহাও সম্ভব মনে হইল না।

কি হবে ভাই ?বলিতে বলিতেই অদম্য বাষ্পোচ্ছ্বাসে আমার কণ্ঠনালী রুদ্ধ হইয়া গেল। এই অন্ধকারে এই ফাঁদের মধ্যে খুন করিয়া এই ক্ষেতের মধ্যে পুঁতিয়া ফেলিলেই বা কে নিবারণ করিবে?

 

    কি অসম্ভব রোমাঞ্চকর !

“......কিছু একটা সন্দেহ করিয়াই যে তাহারা আসিয়াছে এবং তখনও খুঁজিয়া ফিরিতেছে,তাহাতে লেশমাত্র সংশয় নাই।

সহসা নৌকাটা একটু কাত হইয়াই সোজা হইল। চাহিয়া দেখি,আমি একাকী বসিয়া আছি,দ্বিতীয় ব্যক্তি নাই। সভয়ে ডাকিলাম,ইন্দ্র ?হাত পাঁচ-ছয় দূরে বনের মধ্য হইতে সাড়া আসিল,আমি নীচে।

নীচে কেন ?

ডিঙি টেনে বের করতে হবে। আমার কোমরে দড়ি বাঁধা আছে।

টেনে কোথায় বার করবে ?

ও গঙ্গায়। খানিকটা যেতে পারলেই বড় গাঙে পড়ব।”

 

এর কি কোনো চিত্রনাট্য-এর প্রয়োজন হয় ? চোখের ওপর সব কিছু ভেসে ওঠে যেন !

“......মিনিট-পনর এইভাবে কাটিল। আর একটা জিনিস লক্ষ্য করিতেছিলাম। প্রায়ই দেখিতেছি,কাছাকাছি এক-একটা জনার,ভুট্টাগাছের ডগা ভয়ানক আন্দোলিত হইয়া ‘ছপাৎ’ করিয়া শব্দ হইতেছেএকটা প্রায় আমার হাতের কাছেই। সশঙ্কিত হইয়া সেদিকে ইন্দ্রের মনোযোগ আকৃষ্ট করিলাম। ধাড়ী শুয়ার না হইলেও বাচ্চা-টাচ্চা নয় ত ?

ইন্দ্র অত্যন্ত সহজভাবে কহিল,ও কিছু না—সাপ  জড়িয়ে আছে ;তাড়া পেয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

কিছু না—সাপ ! শিহরিয়া নৌকার মাঝখানে জড়সড় হইয়া বসিলাম। অস্ফুটে কহিলাম,কি সাপ ভাই ?

ইন্দ্র কহিল,সব রকম আছে,ঢোঁড়া,বোড়া,গোখ্‌রো,করেত্‌— জলে ভেসে এসে গাছে জড়িয়ে আছে—কোথাও ডাঙ্গা নেই দেখচিস নে ?

      সে ত দেখচি। কিন্তু ভয়ে যে পায়ের নখ হইতে মাথার চুল পর্যন্ত আমার কাঁটা দিয়া রহিল। সে লোকটি কিন্তু ভ্রূক্ষেপমাত্র করিল না,নিজের কাজ করিতে করিতে বলিতে লাগিল,কিন্তু কামড়ায় না। ওরা নিজেরাই ভয়ে মরচে—দুটো-তিনটে ত আমার গা ঘেঁষে পালালো। এক-একটা মস্ত বড়—সেগুলো বোড়া-টোড়া হবে বোধ হয়। আর কামড়ালেই বা কি করব। মর্‌তে একদিন ত হবেই ভাই ! এমনি আরও কত কি সে মৃদু স্বাভাবিক কণ্ঠে বলিতে বলিতে চলিল,আমার কানে কতক পৌঁছিল,কতক পৌঁছিল না। আমি নির্বাক-নিস্পন্দ কাঠের মত আড়ষ্ট হইয়া একস্থানে একভাবে বসিয়া রহিলাম। নিশ্বাস ফেলিতেও যেন ভয় করিতে লাগিল—ছপাৎ করিয়া একটা যদি নৌকার উপরেই পড়ে !”

ভাবা যায় ?  খুব ছোট বয়সে আমি অন্ততঃ রবীনহুডের খুব ভক্ত ছিলাম। কিম্বা রঘু ডাকাতের। শুকতারা’র পাতায় পাতায়। সম্ভবতঃ ছোট ছোট কিছু বই ও পাওয়া যেত তখন। স্মৃতি আজ বেলাগাম তাই মনেও পড়ে না আর !  কিন্তু, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে কোট আনকোট দিয়ে “......’মর্‌তে একদিন ত হবেই ভাই !’ – এই বাক্যে প্রশ্নকর্তা কি বলিতে চাহিয়াছেন ? এবং কেন ?” – র উত্তর কি লিখতাম জানি না আমার ওই বয়সে ! হয়তো এখনো এই প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক যে লিখতে পারব তা আমি অন্ততঃ মনে করি না !

“মর্‌তে একদিন ত হবেই ভাই” !  কে বলছে ? একটা বছর ষোলোর স্কুল পালানো ছেলে কি অবলীলায় !  এত কিছু আন্তরিক ছিল সেই ইন্দ্রনাথের যে ওইটুকু বয়সেই বুঝে গেছিল পৃথিবীর চরমতম সত্য ! এই পাঁচটা শব্দ কেন তাড়া করে ফেরে মাঝে মাঝে বুঝি না যে এখনো !

শুধু কি এই ! এর চেয়েই আরো ছ-ছটা শব্দের একটা বাক্যকে তো আজ ভারতবর্ষের জাতীয় ক্যাপশন করা যেতেই পারে। আমার মোটা মাথা তো তাই বলে !  এবার বলি সেই কথা।

তার আগে বলে নি ইন্দ্রনাথের সরল বিশ্বাসের কি অপূর্ব উদ্ধৃতির কথাগুলো ! এই কথাগুলো বলে বা লিখে হয়তো এই বাজারে আমি সাম্প্রদায়িক বা গেরুয়া ভূষণে ভূষিত ও হয়ে যেতে পারি। কিন্তু আমাদের ছেলেবেলায় আমরা সবাই এই বোধেই দীক্ষিত ছিলাম। হয়তো এই অবসর জীবনে এসেও তাই-ই আছি। সে যে যাই বলুক না কেন ! কেউ তো আর কেড়ে নিতে পারবে না –

“..............................—মাথার ভিতরে

স্বপ্ন নয়,কোন্ এক বোধ কাজ করে;

স্বপ্ন নয়—শান্তি নয়—ভালোবাসা নয়,

হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;

আমি তারে পারি না এড়াতে,

সে আমার হাত রাখে হাতে,

সব কাজ তুচ্ছ হয়—পণ্ড মনে হয়,

সব চিন্তা—প্রার্থনার সকল সময়

শূন্য মনে হয়,

শূন্য মনে হয়।”          -   (বোধ – জীবনানন্দ)

 

সত্যিই আজকাল সব কিছু খুব শূন্য-ই মনে হয় যেন !

হ্যাঁ, যা বলছিলাম। সেই খুব সাধারন সরল অথচ মা, ঠাকুমাদের শেখানো কথাগুলো কি অপূর্ব ব্যঞ্জনায় ইন্দ্রনাথ বলে উঠেছিল সেই নৈশ অভিযানের রাতে !

“খস্‌—স্‌—বালুর চরে নৌকা বাধিয়াছে। ব্যস্ত হইয়া উঠিয়া বসিলাম। এই যে এপারে আসিয়া পৌঁছিয়াছি। কিন্তু এ কোন্‌ জায়গা ?বাড়ি আমাদের কত দূরে?বালুকার রাশি ভিন্ন আর কিছুই ত কোথাও দেখি না ?প্রশ্ন করিবার পূর্বেই হঠাৎ নিকটেই কোথায় যেন কুকুরের কলহ শুনিতে পাইয়া আরও সোজা হইয়া বসিলাম। কাছেই লোকালয় আছে নিশ্চয়।

ইন্দ্র কহিল,একটু বোস শ্রীকান্তআমি এখ্‌খুনি ফিরে আসব— তোর কিছু ভয় নেই। এই পাড়ের ওধারেই জেলেদের বাড়ি।”

......

......

“এটা কোন্‌ জায়গা,তাই ভাবিতেছি,দেখি ইন্দ্র ছুটিয়া আসিয়া উপস্থিত হইলকহিল,শ্রীকান্ত,তোকে একটা কথা বলতে ফিরে এলুম। কেউ যদি মাছ চাইতে আসে,খবরদার দিসনে— খবরদার ব’লে দিচ্ছি। ঠিক আমার মত হয়ে যদি কেউ আসে,তবু দিবিনে— বল্‌বি,মুখে তোর ছাই দেব— ইচ্ছে হয়,নিজে তুলে নিয়ে যা। খবরদার হাতে ক’রে দিতে যাস্‌নে যেন,ঠিক আমি হলেও না,খবরদার !

 কেন ভাই ?

ফিরে এসে বল্‌ব— খবরদার কিন্তু— বলিতে বলিতে সে যেমন ছুটিয়া আসিয়াছিল,তেমনই ছুটিয়া দৃষ্টির বহির্ভূত হইয়া গেল।

এইবার আমার পায়ের নখ হইতে মাথার চুল পর্যন্ত কাঁটা দিয়া খাড়া হইয়া উঠিল। বোধ হইতে লাগিল,যেন দেহের প্রতি শিরা-উপশিরা দিয়া বরফ-গলা জল বহিয়া চলিতে লাগিল। নিতান্ত শিশুটি নহি যে,তাহার ইঙ্গিতের মর্ম অনুমান করিতে পারি নাই !”

......

......

......

“ইন্দ্র কথা কহিল,জিজ্ঞাসা করিল,তুই একটুও ভয় পাস্‌নি,না রে শ্রীকান্ত ?

আমি সংক্ষেপে জবাব দিলাম না

ইন্দ্র কহিল,কিন্তু তুই ছাড়া ওখানে আর কেউ ব’সে থাকতে পারত না,তা জানিস ?তোকে আমি খুব ভালোবাসি— আমার এমন বন্ধু আর একটিও নেই। আমি যখন আস্‌ব,তোকে শুধু ডেকে আন্‌ব,কেমন?

আমি জবাব দিলাম না। কিন্তু এই সময়ে তাহার মুখর উপর সদ্য মেঘমুক্ত যে চাঁদের আলোটুকু পড়িল তাহাতে মুখখানি কি যে দেখাইল,আমি এতক্ষণের সব রাগ অভিমান হঠাৎ ভুলিয়া গেলাম। জিজ্ঞাসা করিলাম,আচ্ছা ইন্দ্র,তুমি কখনো ঐ সব দেখেচো ?

কি সব ?

ঐ যারা মাছ চাইতে আসে ?

না ভাই দেখিনি— লোকে বলে,তাই শুনেচি।

আচ্ছা,তুমি এখানে একলা আসতে পারো?

ইন্দ্র হাসিল।  কহিল,আমি ত একলাই আসি।

ভয় করে না ?

না। রামনাম করি। কিছুতে তারা আসতে পারে না। একটু থামিয়া কহিল,রামনাম কি সোজা
রে
?তুই যদি রাম নাম করতে করতে সাপের মুখ দিয়ে চ’লে যাস্‌,তবু তোর কিছু হবে না। সব দেখবি ভয়ে ভয়ে পথ ছেড়ে দিয়ে পালাবেকিন্তু ভয় করলে হবে না। তা হ’লেই তারা টের পাবে,এ শুধু চালাকি করছে—তারা সব অন্তর্যামী কিনা !”

কি দিয়ে বিচার করি পুরুষানুক্রমে চলে আসা এই রামনামের !  আমরা তো এখন অনেক আধুনিক। সবেতেই গেরুয়া, লাল, সবুজ খুঁজেই বেড়াই ! কিন্তু তবু আমাদের মতো পাতি বাঙলা ইশ্‌কুলে পড়া মানুষজন আশা করি এর মর্ম উদ্ঘাটন করে নিতে এক মুহূর্ত দেরী করবেন না ! একটা কবিতা মনে পড়ল। ষাট দশকের এক কবির –

কয়েকজন বাজিকর উইংসের আড়ালে

হাতের সুতোর টানে নাচছে ন্যালাখ্যাপা পুতুল

পা থেকে মাথা পর্যন্ত বেতালা—বেমক্কা

ডান দিকে টানলে বাঁয়ে পড়ছে ঢলে

#

উইংসের আড়ালের বাজিকর দেখলো

ভুলগুলোই ফুটে উঠছে ফুল হয়ে, আর

তরবার ধরছে নুলো, প্রত্যেকটি শব্দ যেন

খুন হয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে যাতে মশায়

মেগাটন বিস্ফোরণ যেন ঠোঙা ফাটা

#

কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলতে উঠে আসছে বুক

কন্ট্রাসেপটিভের ফুটো দিয়ে জন্মাচ্ছেন

ভবিষ্যত নেতা, অর্থাৎ আগামী বাজিকর

ভেবে ক্লাউন পাপেটের চোখে জল আর

পারাবার জুড়ে জমছে—মেঘ ও বাতাস

#

অর্থাৎ রাডার বললো আরেকটি ঝড় আসবে।”  - (রাডার – তুষার রায়)


এবারের ইন্দ্রনাথ বর্ণনা দ্রুত শেষ করি। নাহলে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন আপনারা। রামনাম তো গেল, এবারে বলি সেই ছটি শব্দের এক অমোঘ বার্তার কথা।

“কিছুক্ষণ হইতে কেমন একটা দুর্গন্ধ মাঝে মাঝে হাওয়ার সঙ্গে নাকে আসিয়া লাগিতেছিল। যত অগ্রসর হইতেছিলাম,ততই সেটা বাড়িতেছিল। এখন হঠাৎ একটা দমকা বাতাসের সঙ্গে সেই দুর্গন্ধটা এমন বিকট হইয়া নাকে লাগিল যে,অসহ্য বোধ হইল। নাকে কাপড় চাপা দিয়া বলিলাম,নিশ্চয় কিছু পচেছে,ইন্দ্র !

ইন্দ্র বলিল,মড়া। আজকাল ভয়ানক কলেরা হচ্ছে কিনা! সবাই ত পোড়াতে পারে না—মুখে একটুখানি আগুন ছুঁইয়ে ফেলে দিয়ে যায়। শিয়াল-কুকুরে খায় আর পচে। তারই অত গন্ধ।

কোন্‌খানে ফেলে দিয়ে যায় ভাই ?

ঐ হোথা থেকে হেথা পর্যন্ত—সবটাই শ্মশান কিনা ! যেখানে হোক ফেলে রেখে ঐ বটতলার ঘাটে চান করে বাড়ি চ’লে যায়,আরে দূর ! ভয় কি রে ! ও শিয়ালে-শিয়ালে লড়াই করচে। আচ্ছা আয়,আয়,আমার কাছে এসে বোস।”

.........

.........

“অকালমৃত্যু বোধ করি আর কখনও তেমন করুণভাবে আমার চোখে পড়ে নাই। ইহা যে কত বড় হৃদয়ভেদী ব্যথার আধার,তাহা তেমন করিয়া না দেখিলে বোধ করি দেখাই হয় না! গভীর নিশীথে চারিদিক নিবিড় স্তব্ধতায় পরিপূর্ণ—শুধু মাঝে মাঝে ঝোপঝাড়ের অন্তরালে শ্মশানচারী শৃগালের ক্ষুধার্ত কলহ-চিৎকার,কখন বা বৃক্ষোপবিষ্ট অর্ধসুপ্ত বৃহৎকায় পক্ষীর পক্ষতাড়নশব্দ,আর বহুদূরাগত তীব্র জলপ্রবাহের অবিশ্রাম হু-হু-হু আর্তনাদ—ইহার মধ্যে দাঁড়াইয়া উভয়েই নির্বাক্‌,নিস্তব্ধ হইয়া,এই মহাকরুণ দৃশ্যটির পানে চাহিয়া রহিলাম। একটি গৌরবর্ণ ছয়-সাত বৎসরের হৃষ্টপুষ্ট বালক—তাহার সর্বাঙ্গ জলে ভাসিতেছে,শুধু মাথাটি ঘাটের উপর। শৃগালেরা বোধ করি জল হইতে তাহাকে এইমাত্র তুলিতেছিল,শুধু আমাদের আকস্মিক আগমনে নিকটে কোথাও গিয়া অপেক্ষা করিয়া আছে। খুব সম্ভব তিন-চারি ঘণ্টার অধিক তাহার মৃত্যু হয় নাই। ঠিক যেন বিসূচিকার নিদারুণ যাতনা ভোগ করিয়া সে বেচারা মা-গঙ্গার কোলের উপরেই ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল। মা অতি সন্তর্পণে তাহার সুকুমার নধর দেহটিকে এইমাত্র কোল হইতে বিছানায় শোয়াইয়া দিতেছিলেন। জলে-স্থলে বিন্যস্ত এমনিভাবেই সেই ঘুমন্ত শিশু-দেহটির উপর সেদিন আমাদের চোখ পড়িয়াছিল।

       মুখ তুলিয়া দেখি,ইন্দ্রের দুই চোখ বাহিয়া বড় বড় অশ্রুর ফোঁটা ঝরিয়া পড়িতেছে। সে কহিল,তুই একটু সরে দাঁড়া শ্রীকান্ত,আমি এ বেচারাকে ডিঙিতে তুলে ঐ চড়ার ঝাউবনের মধ্যে জলে রেখে আসি !

চোখের জল দেখিবামাত্র আমার চোখেও জল আসিতেছিল সত্য;কিন্তু ছোঁয়াছুঁয়ির প্রস্তাবে আমি একেবারে সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলাম। পরদুঃখে ব্যথা পাইয়া চোখের জল ফেলা সহজ নহে,তাহা অস্বীকার করি না ;কিন্তু তাই বলিয়া সেই দুঃখের মধ্যে নিজের দুই হাত বাড়াইয়া আপনাকে জড়িত করিতে যাওয়া—সে ঢের বেশি কঠিন কাজ ! তখন ছোট-বড় কত জায়গাতেই না টান ধরে ! একে ত এই পৃথিবীর সেরা সনাতন হিন্দুর ঘরে বশিষ্ঠ ইত্যাদির পবিত্র পূজ্য রক্তের বংশধর হইয়া জন্মিয়া,জন্মগত সংস্কারবশতঃ মৃতদেহ স্পর্শ করাকেই একটা ভীষণ কঠিন ব্যাপার বলিয়া ভাবিতে শিখিয়াছি,ইহাতে কতই না শাস্ত্রীয় বিধিনিষেধের বাঁধাবাঁধি,কতই না রকমারি কাণ্ডের ঘটা! তাহাতে এ কোন্‌ রোগের মড়া,কাহার ছেলে,কি জাত—কিছুই না জানিয়া এবং মরিবার পর এ ছোকরা ঠিকমত প্রায়শ্চিত্ত করিয়া ঘর হইতে বাহির হইয়াছিল কিনা,সে খবরটা পর্যন্ত না লইয়াই বা ইহাকে স্পর্শ করা যায় কিরূপে ?

কুণ্ঠিত হইয়া যেই জিজ্ঞাসা করিলাম,কি জাতের মড়া— তুমি ছোঁবে ?ইন্দ্র সরিয়া আসিয়া একহাত তাহার ঘাড়ের তলায় এবং অন্যহাত হাঁটুর নীচে দিয়া একটা শুষ্ক তৃণখণ্ডের মত স্বচ্ছন্দে তুলিয়া লইয়া কহিল,নইলে বেচারাকে শিয়ালে ছেঁড়াছিঁড়ি করে খাবে। আহা ! মুখে এখনো এর ওষুধের গন্ধ পর্যন্ত রয়েচে রে! বলিয়া নৌকার যে তক্তাখানির উপর ইতিপূর্বে আমি শুইয়া পড়িয়াছিলাম,তাহারই উপর শোয়াইয়া নৌকা ঠেলিয়া দিয়া নিজেও চড়িয়া বসিল। কহিল,মড়ার কি জাত থাকে রে ?

আমি তর্ক করিলাম,কেন থাকবে না?

ইন্দ্র কহিল,আরে এ যে মড়া। মড়ার আবার জাত কি ?এই যেমন আমাদের ডিঙিটা— এর কি জাত আছে ?আমগাছ,জামগাছ যে কাঠেরই তৈরি হোক—এখন ডিঙি ছাড়া একে কেউ বলবে না—আমগাছ,জামগাছ—বুঝলি না ? এও তেমনি।”

এবারে কি বলি ? “মড়ার কি জাত থাকে রে ?”  লেখক বলছেন – “দৃষ্টান্তটি যে নেহাৎ ছেলেমানুষের মত,এখন তাহা জানি। কিন্তু অন্তরের মধ্যে ইহাও ত অস্বীকার করিতে পারি না—কোথায় যেন অতি তীক্ষ্ণ সত্য ইহারই মধ্যে আত্মগোপন করিয়া আছেমাঝে মাঝে এমনি খাঁটি কথা সে বলিতে পারিত।”

আমি আর কি বলি ? এই কথাখানা কি করে উচ্চারিত হতে পারে এমন একটা কিশোর এর কাছ থেকে ! আমি তাই তো বলি যে আধুনিক ভারতবর্ষের কি শ্লোগান হতে পারে না এই কটা লাইন ?

“আরে এ যে মড়ামড়ার আবার জাত কি ?এই যেমন আমাদের ডিঙিটা— এর কি জাত আছে ?আমগাছ,জামগাছ যে কাঠেরই তৈরি হোক—এখন ডিঙি ছাড়া একে কেউ বলবে না—আমগাছজামগাছ—বুঝলি না ?  এও তেমনি।”

না তা হবে না।  কারণ এখন মড়া ও খুব দামী। ওই পদার্থটাকে নিয়েও আজকাল লাল, নীল, হলদে, সবুজ, কমলা-র কামড়াকামড়ি চলে সেই শেয়ালগুলোর মতো। যাদের মুখ থেকে এই মৃত এই শিশুর দেহটাকে – যার মুখে তখনো ওষুধের গন্ধ মাখা – সরিয়ে রেখে আসতে চেয়েছিল ইন্দ্রনাথ। ভেবেছিল “শৃগালেরা বোধ করি জল হইতে তাহাকে এইমাত্র তুলিতেছিল,শুধু আমাদের আকস্মিক আগমনে নিকটে কোথাও গিয়া অপেক্ষা করিয়া আছে।”

১৩২২ বঙ্গাব্দের মাঘ মাস থেকে ১৩২৩ বঙ্গাব্দের মাঘ মাস পর্যন্ত মোট তেরোটি সংখ্যায় ভারতবর্ষ মাসিক পত্রিকায় শ্রীকান্তর ভ্রমণ কাহিনী নামে এই উপন্যাস প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ১৯১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯১৭ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত্য।

এখন ২০১৭। আমরা কি সত্যিই এগোচ্ছি ?  কে দেবে এর উত্তর ?

তবুও আশা জাগে জানেন !  সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক ইন্দ্রনাথ’দের এখনো দেখি রোজ চা-এর দোকানে’র আড্ডায়, পাড়ার মোড়ে মোড়ে অথবা কোনও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটলে।  এরা সবাই কিন্তু আমাদের মতন নয়। অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্তে’র সেই ‘ছন্নছাড়া’-র দলবল সব।

“ছন্নছাড়া ক’টা বেকার ছোকরা

রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে--

চোঙা প্যান্ট,চোখা জুতো,রোখা মেজাজ,ঠোকা কপাল—”  - (ছন্নছাড়া – অচিন্ত্য কু. সেনগুপ্ত)

 

শুধু চোঙা প্যান্টটাই যা ‘বারমুডা’ হয়ে গেছে !

#

©গৌতম দত্ত

১৭ই জুন, ২০১৭

কলকাতা

#

কৃতজ্ঞতা :

১)     শরৎ রচনাবলী

২)     কবিতা – জীবনানন্দ দাস

৩)     কবিতা – তুষার রায়

৪)     কবিতা – অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত

এবং অবশ্যই

গুগুল’কে – ছবি এবং আরো অনেক কিছুর জন্য’ই।