সপ্তপদী
নিজে গ্যাঁড়াকলে পরে আমাকে ফেলেছে ! আমার স্কুলবন্ধু @Sunil Karmakar। এ শালা লকডাউনে আমাদের আরেক স্কুলের বন্ধু @Himadri Sekhar Dutta।
খেলা ! নিয়ম হ’ল দশ দিনে দশটা নিজের ভালো লাগা বাংলা সিনেমা নিয়ে পোস্ট। শুধু তাই নয় ! প্রতিদিন আবার নতুন এক জন কে নমিনেট করে উৎসাহিত করতে হবে। কি জ্বালা বলুন দিকি ! আজ আমি করলাম ঊদ্ভাবক @Himadri Sekhar Dutta কে’ই। ক দিন পারব জানি না ! আজ আমার ছবি “সপ্তপদী”।
সাত পা একসঙ্গে পা হাঁটলে হিন্দু শাস্ত্রমতে অবিচ্ছেদ্য বন্ধু হয়। হিন্দু ধর্মমতে, একসাথে সাত পা হাঁটলে চির-বন্ধন অর্থাৎ বিয়ে হয়। বিবাহ বন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা বুঝাতে 'সাত পাঁকে বাঁধা' বা 'সপ্তপদী' ব্যবহৃত হয়।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘সপ্তপদী’ উপন্যাসে একটু অন্যভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে মনের মিল এবং প্রগাঢ় ভালবাসাও মনের মাঝে রচনা করে সপ্তপদী। আর এই উপন্যাসটিকে নিয়ে, পরিচালক অজয় কর মশাই তৈরি করলেন এক অপূর্ব সিনেমা যা এখনো টিভি’তে দেখতে পেলে বুঁদ হ’য়ে বসে পড়তেই হয় ; অন্তত আমাদের প্রজন্মের মানুষদের।
“এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো
তো?
যদি পৃথিবীটা স্বপ্নের দেশ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো?”
এই গান আর সেযুগে দৃশ্যায়িত করা সিনেমার ওই সিকোয়েন্স দেখেন নি – এমন বাঙালি কি কেউ আছে ? আমার তো মনে হয় না।
অজয় কর মশাইয়ের প্রতিভা নিয়ে বা সপ্তপদী সিনেমার অন্ততঃ এই দৃশ্যের শ্যুটিং সে সময়ে কর মশাই কিভাবে করেছিলেন সে কথায় আসার আগে একবার সিনেমার গপ্পোটা বলি সংক্ষেপে।
ছবি শুরু ১৯৪৩ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে। সারা বাংলাদেশেই সেই যুদ্ধের করাল ছায়া। এই রকম সময়ে ‘বাবাসাহেব’ নামে এক সৌম্যদর্শন ডাক্তার (রেভারেণ্ড কৃষ্ণস্বামী) সাইকেলে ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা চালায় প্রতিদিন। তার আশ্রমে কুষ্ঠ রোগীরা বিনামূল্যে চিকিৎসা পায়। এমন এক সন্ধ্যেবেলায় বাবাসাহেবের আশ্রমে এক অচেতন মহিলা মিলিটারি অফিসারকে বয়ে নিয়ে আসে। তার মুখের দেখা পাওয়া মাত্রই ফ্ল্যাশব্যাকে সিনেমা নিয়ে যায় কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গনে। এই বাবাসাহেব তখন কলকাতা মেডিকেল কলেজের এক উজ্জ্বল ছাত্র, কৃষ্ণেন্দু। পরের দৃশ্যে ফুটবলে মাঠ। খেলা হচ্ছে বাঙালি ডাক্তারি পড়ুয়া ছেলেদের সাথে অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান মেডিকেল ছাত্রদের। বাঙালির ছেলেরা খালি পায়ে। আর ওরা খেলছে ফুটবল খেলার দামী বুট পড়ে। অ্যাংলো-ডাক্তারি ছাত্রী রিনা ব্রাউন তাদের দলের সাপোর্টার। সেই খণ্ড দৃশ্যগুলো অজয় করের মুন্সীয়ানা আর উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের অভিনয়ে যে ঊচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল সেই সময়, তার থেকে বাঙালি আজও বেরোতে পারেনি।
তারপর কত স্মৃতি, কত ঘটনা! ক্লেটন সেজে রিনাকে বোকা বানানো, মিক্সড্ টেনিসে নিজে হেরে ওকে জেতানো আর কলেজ ফাংশনে রিনার সাথে অভিনয় করা- ওথেলো কৃষ্ণেন্দু, আর রিনা ডেসডিমোনা। তারপর মায়ের মৃত্যু, রিনার সাথে ঘনিষ্ঠতা, ওর বাবার শর্তে রাজি হয়ে ধর্ম পরিবর্তন করা। অবশেষে, বজ্রপাতের মতো আকস্মিক ও নিদারুণ আঘাত, রিনারই তরফ থেকে! হ্যাঁ, রিনা তাকে প্রত্যাখ্যান করে, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে। তারপর পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো বছর। সেদিনের সেই ধর্মনিষ্ঠ খ্রিস্টান রিনা ব্রাউন আজ উচ্ছৃঙ্খল, মদ্যপ আর চরম নাস্তিক মিলিটারি অফিসার।
সিনেমার শেষে জানা যায় কৃষ্ণেন্দুর গোঁড়া ধর্মপ্রাণ বাবা তাঁর একমাত্র ছেলের জন্য জীবন ভিক্ষা করেন রিনা ব্রাউন এর কাছে। রিনা ফেরাতে পারে না কাতর এক বৃদ্ধের করুণ অনুনয়। কথা দেয় তাঁকে অথচ তা কৃষ্ণেন্দু’কে জানাতেও পারে না কৃষ্ণেন্দু’র বাবা’র শর্তানুযায়ী। এক অদ্ভুত ঘটনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এক তুমুল প্রেমের নায়ক আর নায়িকা। একদম শেষে কৃষ্ণেন্দু’র বাবা বুজতে পারেন যে ধর্মের চেয়ে মনুষ্যত্ব অনেক বড়। কিন্তু ততদিনে যা ঘটার তা এদের দুজনের জীবনে ঘটে গেছে।
একঝাঁক উজ্জ্বল শিল্পীর সমাবেশে এ ছবি দর্শকদের চোখ ফেরাতেই দেয় না। এখনোও। রিনার ভূমিকায় সুচিত্রা সেনের দৃপ্ত পদক্ষেপ, আবেদনময়ী অভিব্যক্তি অন্যদিকে কৃষ্ণেন্দু’র চরিত্রে মহানায়ক উত্তমকুমার।
কৃষ্ণেন্দুর বাবার চরিত্রে ছবি বিশ্বাস। এছাড়া ছায়াদেবী, পদ্মাদেবী, তরুণ কুমার প্রত্যেকেই নিজ মহিমায় জীবন্ত। আর ওথেলো নাট্যাভিনয়ের এক অসাধারণ মুহূর্তে উত্তম সুচিত্রার নেপথ্যে কণ্ঠ দিয়েছেন উৎপল দত্ত ও জেনিফার কেন্ডাল। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও মনেই হয় না যে ওগুলো ওদের নিজেদের গলা নয়।
এ ছবির চিত্রনাট্যকার বিনয় চ্যাটার্জি এক অপূর্ব সিকোয়ন্সে সাজিয়েছিলেন চিত্রনাট্য যা মূল উপন্যাসের মাধুর্যকে ধরে রেখেছে একেবারে প্রাণবন্ত করে। আরেকজন হলেন মেকাপ আর্টিস্ট অনন্ত দাস। এছাড়া হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় আর সুজি মিলারের কণ্ঠে প্রত্যেকটি গান হয়ে উঠেছে অতুলনীয়, যা এখনো বিস্ময় জোগায়। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের সেসব গানকে করেছেন কালজয়ী।
সবশেষে বলি পরিচালক আর ক্যামেরাম্যান অজয় করের কথা। সপ্তপদী’, ‘হারানো সুর’, ‘সাত পারে বাঁধা’ বা ‘মাল্যদান’- ছবির নামগুলো মনে রাখলেও আমরা ভুলেছি অজয় কর’কে। এই সময় প্রকাশিত অনিরুদ্ধ কর-এর লেখা থেকে বলি—
“‘সপ্তপদী’র সেই বাইক দৃশ্য৷ উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন বাইকে৷ ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’৷ পিছনে সরে, সরে যাচ্ছে হাইওয়ে৷ ব্যাক প্রোজেকশনে৷ অজয় কর পরিচালিত ছবি যখন, দর্শক ধরেই করে নিয়েছিলেন বাংলা সিনেমায় যে দৃশ্যকল্প শিল্পী পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন ১৯৫৪ সালে, যিনি চলমান ছবি তোলার কৌশলে বাংলা ছবিতেই প্রথম ব্যাক প্রজেকশন প্রযুক্তি নিয়ে আসেন তার বছর দশেক আগেই, সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে চারু রায়ের ‘পথিক’ ছবিতে, তিনি নিশ্চয় এখানেও একই চাল চেলেছেন৷
‘কিন্ত্ত ওই দৃশ্যে ব্যাক নয়, করবাবু ব্যবহার করেছিলেন ফ্রন্ট প্রজেকশন,’ বলছিলেন অজয় করের পরিচালনায় ২৪টি ছবির মধ্যে ১৯টি ছবির প্রোডাকশন ম্যানেজার ক্ষিতীশ আচার্য্য৷ প্রায় ৯০ বছর বয়সী ক্ষিতীশবাবুর গলা কেঁপে উঠল কথা বলতে গিয়ে৷ বললেন, ‘করবাবুকে যে কেউ মনে রাখল না, এটা ভাবলেই আমার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে৷ একটা মানুষ সারাটা জীবন কেবল বাংলা সিনেমাকে দিয়েই গেল, পেল না কিছুই৷ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না৷’ ‘হারানো সুর’ ছবিতে একটি নৃত্যানুষ্ঠানের দৃশ্যে শিশুশিল্পী ছিলেন অনুরাধা কর (বসু)৷ সম্পর্কে অজয় করের ভাইঝি৷ স্মৃতিচারণ করতে-করতে বললেন, ‘জ্যাঠামশাই যখন মারা যান তখন আমি বিদেশে৷ অনেক দিন ফেরা হয়নি৷ যদি এ-দেশে থাকতাম, তাহলে জ্যাঠামশাইয়ের ছবিগুলো যাতে রেস্টোর করা সম্ভব হয়, প্রিজার্ভেশন যাতে করা যায় তার একটা বন্দোবস্ত নিশ্চয়ই করতাম৷ আর কেউ করলেন না, এটা দুঃখের৷ মানুষ ছবিগুলোর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মনে রাখলেন, অথচ ছবির সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে গেলেন, এর চেয়ে খারাপ কী হতে পারে? এটা বাংলা সিনেমার দুর্ভাগ্য৷’
তাঁর হাতে তৈরি সিনেমাটোগ্রাফার শক্তি বন্দ্যোপাধ্যায় সে কথাই যেন বললেন ঘুরিয়ে- ‘কারও যদি তাঁর কথা মনে পড়ত তাহলেই মনে হত আমাদের দেশটা বোধ হয় বদলে গেল৷ শুধুই করবাবু কেন? নীতিন বসুকে কে মনে রেখেছে? বিমল রায় বিরাট ক্যামেরাম্যান, কেউ মনে রেখেছে তাঁকে?’
শক্তিবাবু বলছিলেন, ‘নিজে পরিচালক থাকাকালীন সহকারীদের ক্যামেরার দায়িত্ব দিলেও কোন লাইট স্কিমে কন্ট্রাস্ট রেশিও কী থাকবে সেটা বলে দিতেন৷ এবং তাঁর নিয়মই ছিল কখনওই নায়ক-নায়িকার মুখ থেকে আলো সরে যাবে না৷ বলতেন, ছবিটা যখন পর্দায় পড়বে তখন দর্শক কি কোনটা সোর্স সেটা দেখবে, নাকি উত্তম-সুচিত্রার মুখ দেখবে? আর এই কারণেই রিয়েলিস্টিক সব সময় করতেন না৷ বলতেন, সুচিত্রা সেনের মুখকে করে তুলতে হবে মাখো-মাখো, তার জন্য ঠিক যেরকম আলো দরকার তাই হবে৷ কাননদেবী তাঁর পোর্ট্রেট ফোটোগ্রাফি এত পছন্দ করতেন যে তাঁকে দামী লেন্স উপহার দিয়েছিলেন৷ সেই লেন্স দিয়েই ‘সপ্তপদী’র শ্যুটিং করেছিলেন করবাবু৷’
এই ‘সপ্তপদী’ প্রসঙ্গেই ক্ষিতীশ আচার্য্য বলছিলেন, ‘সেই ছবিতে ওথেলো নাটক সিকোয়েন্সে দু’ধরনের আলো করেছিলেন অজয় কর৷ উত্তমকুমারের মুখের জন্য এক ধরনের আলো, আর সুচিত্রা সেনের জন্যে অন্য রকমের আলো৷ একটাই দৃশ্যে৷ এমনকী উত্তম এবং সুচিত্রার জন্য তিনি ব্যবহার করেছিলেন আলাদা-আলাদা লেন্স, যাতে দু’জন যে দু’ধরনের মানুষ সেটা বোঝা যায়৷’
সবচেয়ে কঠিন শটগুলোও অন্য কারও হাতে ছাড়তেন না৷ শ্যুটিং-এর সময় জটিল গাড়ি চালানোর সিকোয়েন্সে গাড়িটা চালাতেন নিজেই৷ যেমন ‘সপ্তপদী’ ছবিতে রীনা ব্রাউন যে গাড়ি চালিয়ে কৃষ্ণেন্দুর ডাক্তারখানায় আসছে, সেই গাড়ি চালিয়েছিলেন অজয় কর নিজে৷ এমনকী সে-ছবিতে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানে রাস্তার শটটিও তাঁরই তোলা লরির মাথায় চেপে৷ ‘হারানো সুর’ ছবিতে যে গাড়ির ধাক্কায় উত্তমকুমারের স্মৃতি ফিরে আসে, সেই গাড়িটিরও চালক স্বয়ং ছবির পরিচালকই৷ কারণ, তাঁর মতে এই দায়িত্ব অন্য কারও হাতে দিলে অভিনেতা-অভিনেত্রীর ক্ষতি হতে পারে, এবং বহুবার শট নিতে হতে পারে- জানা গেল ক্ষিতীশবাবুর দৌলতেই৷
আসলে অজয় করের জীবনে কোনও সেনসেশনালিজম ছিল না৷ কোনও বিতর্কও ছিল অনুপস্থিত৷ আবার তিনি কোনওদিনও ফেস্টিভ্যাল-সার্কিট-এর জন্যও ছবি বানাননি৷ যদিও ‘সাত পাকে বাঁধা’ মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিল৷ কিন্ত্ত সে ঘটনা বাঙালি মনে রেখেছে সুচিত্রা সেনের জন্য৷ সেই উত্সবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পেয়েছিলেন সুচিত্রা৷ অজয় করের প্রখ্যাত হওয়ার একমাত্র হাতিয়ার ছিল ছবি বানানো৷
এত আটপৌরে কারনে কে আর মনে রাখে তাঁর জীবনের খুঁটিনাটি ?......”
“সপ্তপদী”-তে অসামান্য অভিনয়ের জন্য উত্তম কুমার ১৯৬২ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে বি. এফ. জে. এওয়ার্ডে ভূষিত হন। ঠিক তার পরের বছর মস্কো আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারটি পান সুচিত্রা সেন, রিনা ব্রাউনের চরিত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠার জন্য। তিনি ভারতীয় অভিনেত্রীদের মধ্যে প্রথম এই সম্মানে ভূষিতা হন। সেন আর জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার(১৯৬১) আসে বাংলার দ্বিতীয় সেরা ফিচার ফিল্মের জন্য।
#
©গৌতমদত্ত
২৭ জুলাই ২০২০
#
কৃতজ্ঞতা :-
১। উইকিপিডিয়া
২। রোর মিডিয়া ওয়েব
৩। অনিরুদ্ধ ধর - এই সময়
৪।
গুগুল তো অবশ্যই।
