অঙ্ক আর খেপু —


       যদিও আমরা মানে বাঙালী ছেলেরা সাধারণতঃ দু-খানি বিষয়ের পরীক্ষা দিতে গেলেই একটু কেন, বেশ ভয়ে ভয়েই থাকি। তার প্রথম বিষয়টি হল ইংরেজি আর দ্বিতীয়টি অঙ্ক। অথচ এই দুটি বিষয় আবার অনেক ছাত্র-ছাত্রীর কাছে পরম আদরের বস্তু। এই তর্ক বা ঝকমারীর মধ্যে না যাওয়াই ভাল। আমি বরং আমার কথাই বলি। আমার খুব ভয় করতো অঙ্ককে। যতদিন পাটিগণিত অব্দি ছিল, সেটা মন্দ ছিল না। মোটামুটি বাঁশ বেয়ে ওঠা-নামা অথবা দুধে জল কিংবা চা-এর সাথে কাঠের গুঁড়ো মেশানোর অনুপাত-সমানুপাত মুখস্থ বিদ্যের জোরে উৎরে যেতগোল বাধল ক্লাস সেভেনে উঠে। শুরু হল এক নতুন সাবজেক্ট। গণিতের বীজ বা বীজগণিত। এ যে কি এক অসম্ভব ঝামেলা তৈরি হল মনের ভেতরে, তা আর কহতব্য নয়। স্যার যতই বোঝান যে ধরে নাও এ সমান সমান এক্স আর বি সমান সমান ওয়াই ততই মাথার ঘিলু আরো তেতে উঠত ইদানীংকার স্মার্ট মোবাইলের মতো। আরে বাবা, ১ থেকে ০ (শূন্য) এই সংখ্যা বাদ দিয়ে কেন যে ধরাধরিতে যাওয়া তা কিছুতেই মানতে পারতাম না। বলা বাহুল্য বুঝতেও পারতাম না। এ, বি, সি, ডি এগুলো তো অক্ষর আর ১,২,৩,৪ এগুলোই তো সংখ্যা, এই তো শিখেছিলাম। কিন্তু শিখলে কি হবে, ওই বীজগণিত এসে এমন মগজধোলাই দিতে শুরু করল যে ভবিষ্যতে আমি অঙ্কের ভয়ে বাণিজ্য বিভাগ নিয়ে পড়াশোনা করলাম। তখন অবশ্য বাণিজ্য বিভাগে এখনকার মতো এতো অঙ্ক থাকতো না প্রায় গ্রাজুয়েশন অব্দি। যেটুকু থাকতো তা মুখস্থবিদ্যায় চালিয়ে দেওয়া যেত।

 

কোন ভদ্রলোক যে এই অদ্ভূত গণিত (বীজগণিত) সৃষ্টি করেছিলেন কে জানে ! এখন এই বয়সে এসে অবশ্য ধারণা একদমই পালটে গেছে। এখন মনে হয় সত্যিই আমাদের জীবনে এই অঙ্কের প্রভাব কতখানি। যেমন ভাবতেন সেই প্যারাবোলা স্যার! নারায়ণ সান্যাল মশাই-এর এই উপন্যাসের নায়ক।

 

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় যে যখন অঙ্ক সৃষ্টি হয়নি অথচ আমাদের মানব জীবন বহাল তবিয়তে চলত তখন কি করতেন সে যুগের মানুষজন। কি বিচিত্র সব প্রক্রিয়ায় সেই সব মানুষজন তাদের হিসেবপত্তর রাখতেন তা আজ যখন জানতে পারি, তখন মনে হয় জীবন কখনো থেমে থাকে নি। সে ঠিক তার রাস্তা বার কর নিয়েছে নিজের মত করে। তেমনি এক পুরোনো দিনের কিছু কথা শেয়ার করি আপনাদের সাথে।

 

দক্ষিণ আমারিকার একটি দেশ পেরু এই পেরুতেই শুরু হয়েছিল এক সুপ্রাচীন সভ্যতা। পেরুর কুজ্‌কো বা কুস্কো (Cuzko)এলাকায় দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে মধ্য আমেরিকা থেকে আগত একদল উপজাতি এসে বসবাস করতে শুরু করেন। এই গোষ্ঠির মধ্যে কৃষক, কামার, কারিগর, যোদ্ধা ইত্যাদি সব ধরণের মানুষজন ছিলেনশোনা যায়, হাতুন তাপাক নামে এক সাহসী বীর বা যোদ্ধা ১৩৯০ সাল নাগাদ একটি রাজত্ব শুরু করেন। এই রাজত্বের নাম হয় ইন্‌কা এবং এই তাপাক নিজেকে ভিরাকোচা ইন্‌কা (জনগনের ঈশ্বর) বলে শুরু করেন এই ইন্‌কা সাম্রাজ্য।

 

......দক্ষিণ আমেরিকার গিরিশ্রেণী বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণ ইকুয়েডর থেকে চিলি পর্যন্ত আধুনিক ইকুয়েডরের পাহাড়ি অঞ্চল,বলিভিয়ার পশ্চিম,সমগ্র পেরু,চিলির উত্তর অংশ এবং আর্জেন্টিনার উত্তর-পশ্চিমঅংশ এই বিস্তীর্ণ এলাকার প্রাচীন জনপদবাসী পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে তাদেরই মধ্যে বেড়ে ওঠা ইন্‌কা জনগোষ্ঠীর অধীনস্থ হয়ে পড়ে। যেহেতু এই ইন্‌কা জনগোষ্ঠী অল্প সময়ের ভেতর উত্তর থেকে দক্ষিণে সমগ্র অঞ্চলটিকে একটি কেন্দ্রীয় শাসনভুক্ত করে এবং নিজেদের বংশজাতির নামে অভিহিত করেন,সেইজন্য,এই অঞ্চলটিকে ইন্‌কা সাম্রাজ্য বলা হয়।

 

এই ইন্‌কা সাম্রাজ্যে সকলেই কাজ করতে বাধ্য ছিল এবং অলসব্যক্তিদের বিচারের জন্য বিশেষ বিচারক নিযুক্ত থাকতেন। প্রতিটি ব্যক্তি তাদের পিতা বা রাষ্ট্রের কাছে কাজ করবে; বালক-বালিকা ৫-৭ বছরের ওপর হয়ে গেলে তাদের সামর্থ মতন কাজ করতে বাধ্য করা হবেএমনকি অন্ধ, খঞ্জ, মূক ব্যক্তিরা, যাঁরা তাদের হাত ব্যবহারে সক্ষম কোন না কোন কাজ করবেন সরকার তাদের উপযোগী কাজ সৃষ্টি ও প্রদান করতে বাধ্য থাকবে । একমাত্র বৃদ্ধদের পাঠানো হত কৃষিভূমি থেকে পাখি তাড়ানোর জন্য (যাতে পাখিরা ফসল খেয়ে না ফেলে ) শুধুমাত্র বৃদ্ধদের সব দায়িত্ব ছিল সরকারের । সরকারী গোলাঘর থেকে তাদের খাদ্য সরবরাহ করা হত।.........

 

এবার আসি আমার সেই প্রথম অংশ সেই অঙ্ক-এর ব্যাপারে।

 

যতদূর জানা যায়, এই ইন্‌কাদের কোনো নির্দিষ্ট লিপি ছিল না। তবু কি আশ্চর্যজনক ভাবে তারা আবিষ্কার করেছিলেন তাদের নিজস্ব গণিত-বিজ্ঞান। না ছিল পাটীগণিত, না ছিল বীজগণিত। কিন্তু হিসাবরক্ষার জন্যে তারা এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন যা শোনার পর মনে হয় যে তাদের বুদ্ধিবৃত্তি কতখানি উন্নত ছিল। একটা সভ্যতা উন্নতি লাভ করতে গেলে প্রাথমিক ভাবে লাগেই হিসেব-নিকেশের ব্যবহার। কিন্তু তখন তারা এই ব্যাপারে অসাধ্য সাধন করেছিল তাদের মগজাস্ত্র বা আধুনিক পরিভাষায় যাকে বলে ইন্টেলেক্ট, তা দিয়ে। তাদের সব কিছুর সম্পদের পরিমাপ রাখার জন্যে অর্থাৎ হিসেব-পত্র ঠিকঠাক রাখার জন্যে দড়ির ওপরে গিঁট দিয়ে একক,দশক, শতক, সহস্র বা তারও বেশী গুণিতক-এর মাধ্যম দিয়ে এক বিচিত্র সংখ্যা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছিলেন বিনা লিপি দিয়েইযা শুনলে আধুনিক এই আমাদের মন শ্রদ্ধায় নত হয়ে আসে।

 

ইন্‌কারা দড়ির গিঁটকে QUIPU (কুইপু বা খিপু) বলতেন। প্রধানতঃ উৎপাদিত দ্রব্য বা সামগ্রীর হিসেব রাখার জন্যেই এই পদ্ধতি তারা আবিষ্কার করেছিলেন। এক ধরনের দশমিক ও তারা ব্যবহার করতেন। দড়ির ওপরের অংশ শতক,মাঝের অংশ দশক এবং নীচের অংশকে একক ধরেই হিসেব তৈরী করা হত। ধরা যাক ৫৪৩ সংখ্যাটি। এটাকে যদি আমরা এইভাবে ভাবি শুধু গিঁট বা দাঁড়ি এঁকে এঁকে তাহলে সেটা দেখাবে এমন :

 

।।।।।   ।।।।   ।।।   অর্থাৎ  ।।।।। (পাঁচ)  ।।।। (চার)  ।।। (তিন) = ৫৪৩

 

তবে এটাও মাথায় রাখা দরকার যে তখনো ইন্‌কার মানুষ এই সংখ্যাটি (৫৪৩) লিপিতে লিখত কি করে। কারণ যতদূর জানা যায় তখনো পর্যন্ত ইন্‌কারা লিপির ব্যবহার জানত না। তাহলেও তারা এই গিঁট দিয়ে দিয়েই দড়ির দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে বাড়িয়ে অযুত, লক্ষ, নিযুত, কোটি অব্দি ও পরিমাপ করতে নিশ্চয় সক্ষম ছিল। এই গিঁট বা গ্রন্থির বিশেষ পদ্ধতিকে খিপু নামে অভিহিত করা হত।

 

 

ওপরের এই ছবিটি ভাল করে লক্ষ্য করলে আপনারা নিশ্চিতভাবে অনুধাবন করতে পারবেন ব্যাপারটা। আপনারা ভাল করে দেখুন কিভাবে তারা ৩৪২ বা ১৬১৩ সংখ্যার হিসেব রক্ষা করতো।

 

The Quipu is a system of knotted cords used by the Incas and its predecessor societies in the Andean region to store massive amounts of information important to their culture and civilization.

 

এই পদ্ধতি দিয়েই ইন্‌কারা তাদের সভ্যতা এবং সংস্কৃতির উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছিল। বিভিন্ন বস্তু বা সামগ্রীর পরিমাপের জন্য তারা বিভিন্ন রঙের দড়ি বা সুতো ব্যবহার করত। সোনা বা যব এর পরিমান করা হত সোনালী দড়ি দিয়ে। গৃহপালিত পশুর সংখ্যা জানা যেত সবুজ দড়ির গিঁট থেকে। জনসংখ্যার হিসেব রাখতে দড়ির প্রথম অংশে পুরুষ, দ্বিতীয় অংশে নারী এবং শেষ অংশ দিয়ে শিশুদের সংখ্যা বোঝান হত। হাভার্ড-এর বিশিষ্ট নৃতত্ববিদ Gary Urton জানাচ্ছেন যে অন্তত এক হাজার পাঁচশ রকমের বস্তু বা সামগ্রীর হিসেব রাখতো এই ইন্‌কারা এই পদ্ধতি মারফৎ। দড়ির শুরু থেকে (যে দিকটাকে শুরু ধরা হত) একক, দশক, সহস্র এগুলিকে প্রতি গিঁট বা গ্রন্থি দ্বারা বোঝা তো যেতই, এমন কি ওই গিঁট এর অনুপস্থিতি দ্বারা শূন্যও বোঝা যেত।

 

এই সাম্রাজ্যের হিসাবরক্ষকদের বল হত Quipucamayocsএই Quipucamayocs রা এই খিপু পদ্ধতিতেই সাধারণ যোগ, বিয়োগ, গুণ এবং ভাগ পর্যন্ত করতে পারতেন। যেহেতু লিখিত কোনো লিপি ইন্‌কাদের ছিল না তাই এই খিপু সাহায্যেই তারা তাদের ইতিহাস রক্ষা করেছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।

 

যে ভয় দিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলাম, সেই অঙ্কভীতি মনে হয় কেটেই যেত আমার, যদি এমন কিছু পদ্ধতি আমাদের পরীক্ষায় থাকতো ! কিন্তু তারই মাঝে কে যে আবিস্কার করে বসলেন ওই বীজগণিত – কে জানে !

 

হিরাম্‌ বিংহ্যাম্‌ নামে এক আমেরিকান পর্যটক ১৯১১ সালে আবিস্কার করেন এই Machu Picchu শহরের ধ্বংসাবশেষ। তিনি তাঁর বই Lost City of the Incas, The Story of Machu Picchu and its Builders এ লিখছেন :

 

"The Incas had never acquired the art of writing, but they had developed an elaborate system of knotted cords called quipus. These were made of the wool of the alpaca or the llama, dyed in various colors, the significance of which was known to the magistrates. The cords were knotted in such a way to represent the decimal system and were fastened at close intervals along the principal strand of the quipus. Thus an important message relating to the progress of crops, the amount of taxes collected, or the advance of an enemy could be speedily sent by the trained runners along the post roads."

 

আমার আলোচনা কিন্তু সীমাবদ্ধ রেখেছি শুধুমাত্র এই অঙ্কের ব্যাপারটা নিয়েই। কিন্তু ইন্‌কাদের রাজত্ব যে কত উন্নত এবং রাজ্য-শাসন যে কত সুন্দর ছিল তা আপনারা আজ সহজেই জানতে পারেন আমাদের গুগুল বাবার দৌলতেইএকটা উদাহরণ দেবার লোভ সামলাতে পারছি না,  চুরির ক্ষেত্রে বিচারক বিচার করে দেখতেন, যে লোকটি চুরি করেছে সেটা তার অভাবে না স্বভাবে। যদি স্বভাবে চুরি করেছে এই সিদ্ধান্তে আসতেন বিচারক তাহলে কঠিনতম শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড অব্দি দেওয়া হত। আর অভাবে হলে, সেই চোর যে অঞ্চলের অধিবাসী সেই অঞ্চলের কুরকা (শাসনকর্তা) কে প্রাণদণ্ডই দেওয়া হতএকবার ভেবে দেখুন।

 

লিপির পরিবর্তে এই গিঁট পদ্ধতি অনুসরণ করেই ইন্‌কারা খ্যাতির চরম শিখরে পৌঁছেছিলেন।  বিভিন্ন রঙের দড়ি এবং সেই দড়িতে গিঁট লাগিয়ে এই ইন্‌কারা তারিখ, হিসেবপত্র, স্ট্যাটিস্টিক্স বা পরিসংখ্যান এমনকি ওদের নিজস্ব উপকথা, গল্প কিংবা কবিতা বিভিন্ন উপায়ে সংগ্রহে রাখতেনআধুনিক কালে বিভিন্ন স্কলাররা জানাচ্ছেন যে এই খেপু পদ্ধতিতে শুধুমাত্র সংখ্যা বোঝানো হত তা কিন্তু নয়। তাঁরা বলছেন যে, ইন্‌কা সাম্রাজ্য যদি না ধ্বংস হয়ে যেত, তাহলে এই খেপু-র মাধ্যমেই ইন্‌কারা বর্ণনামুলক ঘটনাকেও এই পদ্ধতির সাহায্যে এমন এক জায়গায় পৌঁছে দিত যে, সেটা হয়ত একটা লিখিত ভাষার রূপ পেয়ে যেত।

 

গবেষণায় উঠে আসা তথ্য বলছে, নির্দিষ্ট কিছু খিপু তৈরি হত অনুভূমিক (Horizontal) দড়ি কিংবা কাঠের দীর্ঘ ষষ্টী (Bar) দিয়ে যেখানে ঝুলত গিঁট বাঁধা অনেকগুলি রেশমী বা সুতোর দড়ি। এবং সেই গিঁটগুলোর বিভিন্ন আকৃতি দিয়ে সংখ্যা ছাড়াও অন্য অনেক কিছু অর্থ বোঝানো হত।

   


    এই গিঁট এবং দড়ির রঙ-এর যে এতরকমের অর্থ হত যে তা বোঝার জন্যেই অনেক ব্যক্তি ছিলেন যাদের কথা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি। এই khipu kamayuq (also quipucamayos)-রা এই গিঁটএর সাথে তাদের স্মৃতি যোগ করে ধরে রাখতেন তাদের ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তবে কখনো যদি এঁদের স্মৃতি ধরে রাখা থেকে বিচ্যুত হতেন এই quipucamayos -রা তখন তাঁদের জন্য শাস্তির ব্যবস্থাও ছিল এই ইন্‌কা সাম্রাজ্যে। তার কারণ ও ছিল। কেননা এই খিপু পণ্ডিত-রাই এই পদ্ধতির মাধ্যমে যুদ্ধ-জয়-পয়াজয় এবং আমরা যাঁদের নীল-রক্ত বলে থাকি সেই সম্রাট বংশধরদের ক্রমান্বয়ী বংশতালিকা ইত্যাদি সব কিছুই অধিগত করে রাখতেন তাঁদের পারিবারিক প্রজন্মে। আদমশুমারী (পুরুষ, মহিলা, শিশু, বিবাহিত এবং অবিবাহিত সব নিয়েই) তখনও হত এই খিপু পদ্ধতির সাহায্যে। এছাড়াও জমি-জমা, সৈন্যবাহিনীর সব কিছু, জ্যোতির্বিদ্যা, ক্যালেন্ডার, খাজনার হিসেব, সঞ্চয়ের যাবতীয় পরিমাণ ইত্যাদি সমস্ত কিছুই, যা একটা রাজত্ব চালাতে প্রয়োজন হয় সব কিছুকেই সাহায্য করতো এই খিপু পদ্ধতি। এছাড়াও ইন্‌কা সাম্রাজ্যে ডাক-বিভাগের সমস্ত পরিচিতি রাখতে এই পদ্ধতির (chaski)অবদান কিছু কম নয়।

 

    ...অ্যান্ডিজ পাহাড়শ্রেণীর পনের থেকে বাইশ হাজার ফুট উচ্চতায় বিস্তৃত ছিল এই ইন্‌কা সভ্যতা।  প্রশান্ত মহাসাগরের তটরেখা বরাবর উত্তর থেকে দক্ষিণ অবধি এক বিশাল চওড়া পথ ছিল মূল সড়ক । প্রায় চোদ্দ হাজার মাইল মোট পথ ছিল প্রধান সড়ক ও তার শাখা প্রশাখা মিলিয়ে । উঁচু পাহাড়ি পথ পাথরের চাঁই দিতে বাঁধানো ছিল এবং বেশ কিছুস্থানে দু পাশে পাথরের দেওয়াল করা হয়েছিল যাতে যাত্রীরা কোনভাবে পড়ে না যায় ।প্রধান সড়ককে All Weather Proof বলা যায় । কিছু দূর অন্তর অন্তর গোলাঘর ও বিশ্রামাগার থাকায় কুজকো থেকে শাসন পরিচালনা করা সহজ হয়েছিল। কঠিন শীত, বর্ষা, ঝড়, বন্যা সমস্ত রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপেক্ষা করে সেই সড়ক পথগুলির অধিকাংশ আজও টিকে আছে, অন্তত অতীতের গৌরব মুছে যায় নি... 

 

    ইউরোপিয়ান আর যুক্তরাষ্ট্রীয় সভ্যতা আজ পৃথিবীর নির্ণায়ক শক্তিহিসাবে পরিগণিত,কিন্তু অন্যান্য উচ্চমানের সংস্কৃতিকে চূড়ান্ত অসম্মান এবং সুযোগমত ধ্বংস করার অপরাধের জন্য ইতিহাস (হয়ত) কোনোদিনই তাদের ক্ষমা করবে না ।

 

    বেলজিয়ান লেখক জর্জ রেমি (ছদ্মনামে Herge)-র লেখা টিনটিনের বিখ্যাত কমিকস্‌ (Prisoners of the Sun )(বাংলায়- সুর্যদেবের বন্দি)গল্পটির কথা উল্লেখ করেছিলাম,যেখানে ঘটনার ক্লাইম্যাক্সে দেখানো হয়েছিল একজন ইনকা সম্রাটকে টিনিটিন কীভাবে সূর্য-গ্রহণের কথা বলে বোকা বানিয়ে যাবতীয় বিপদ থেকে মুক্ত হতে পেরেছিলেন। আর বাস্তবটা দেখুন... দেখুন,কত সূক্ষ্মভাবে বারবার প্রমাণ করা হয়ে থাকে যে ইউরোপীয়ান (তথা খ্রিশ্চিয়ান) সভ্যতা পৃথিবীর বাকী সমস্ত সভ্যতার থেকে অনেক এগিয়ে আছে। সামান্য সূর্যগহণ তো তুচ্ছ,তাবৎ সূর্যবিজ্ঞানে ইন্‌কাদের অসামান্য দক্ষতার সত্যতা স্বীকার করতে ইউরোপীয়ানদের অনীহা থাকতে পারে,কিন্তু আমরা যেন ভুলে না যাই,প্রাচীন যুগে ভারতীয় সভ্যতা,আন্দিজ সভ্যতা এবং এশিরিও সভ্যতার ধারেকাছে অন্য কেউ পৌঁছতে পারে নি। সূর্যবিজ্ঞানে এই অঞ্চলগুলির অকল্পনীয় উন্নতি আজকের তথাকথিত সভ্য সাহেবদের কাছে এতটাই বিষবৎ যে সাহেবরা একের পর এক প্রাচীন সভ্যতা ধ্বংস করেছেন,লুঠ করেছে তাদের সম্পদ,মুছে দিয়েছে তাদের ঐতিহ্য। রচনা ও রটনা করেছে একের পর এক মিথ্যের। বিজ্ঞানের মোড়কে মুছে দেওয়া হয়েছে প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোকে। যে আয়ুর্বেদ শত সহস্র বছর ধরে একটা সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখল, শুধু বিজ্ঞানের মোড়কে খুন হয়ে যেতে হল তাকেই। একই দশা ইউনানী চিকিৎসা পদ্ধতির। শুনেছি আলেকজাণ্ডারের বিশ্বজয়ের পথে নিযুক্ত সেনা-বাহিনীর মধ্যে প্রায় তিরিশজন দক্ষ ইউনানী চিকিৎসক ছিলেন। আয়ুর্বেদ এবং ইউনানী চিকিৎসা নিজেদের গায়ে সুকৌশলে বিজ্ঞানের তবকটি জড়িয়ে নিতে পারে নি বলে হারিয়ে যেতে বসেছে। ঠিক যেমন হারিয়ে যেতে বসেছে ইনকাদের সূর্যবিজ্ঞান গবেষণার কথা... 

 

    পরিশেষে বলি যে প্রাচীন সব কিছুকেই পাথেয় করে আমরা পৌঁছেছি আমাদের এই বর্তমান সময়ে। কিন্তু তা যদি আমরা ভুলে যাই বা অস্বীকার করি যেমন উন্নত দেশগুলো করেই থাকে তাহলে আমরা ইতিহাস কে অশ্রদ্ধা করতেই শিখব। তবু আশা জাগে যখন দেখি এই উন্নত দেশেরই কিছু একনিষ্ঠ গবেষক মুক্তো সেঁচে তুলে আনেন এই পুরনো হারিয়ে যাওয়া সম্পদগুলো তখন তাঁদের উদ্দেশ্যে মাথা হেঁট করতেই হয়।

 

(নবাঙ্কুর শারদ সংখ্যার প্রকাশিত)

 

**********

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার :

 

১।      একটি মানবিক সভ্যতার নাম... ইন্‌কা সোমেন রায়

২।     গুগুল এর থেকে অনেক ছবি সংগৃহীত।

৩।      এবং বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ওয়েব সাইট।

 

#

©গৌতমদত্ত

২৬শে আগষ্ট, ২০১৬

কলকাতা।