করোনা নাকি কোরোনা -

 


শুরু সেই চব্বিশে মার্চ ২০২০। লকডাউন এর। তারপর থেকে কত না জল গড়ালো।


মনে আছে প্রথম দুদিন পুলিশদের কি হম্বিতম্বি !  মুখে মাস্ক নেই কেন ? কোথায় যাবেন ? তেমন হলে সাইকেলের হাওয়া খুলে দেওয়া। যতোরকম পারা যায় আইনরক্ষক হিসেবে। অথচ প্রথম দিকে জিনিসপত্র বেশি দামেই কিনেছিলাম। কেউ কেউ একখানা ডিম দশ টাকায়ও বিক্রি করছে -দেখেছি, সেখানে পুলিশ চিন্তিত নয়। ওরা প্রচণ্ড চিন্তিত জনগনেশের স্বাস্থ্য নিয়ে। তা যাই হোক, সেই প্রথম দুতিনদিন একটু ভয়ে ভয়ে দোকান বাজার করতে হয়েছে। অনেকেরই বাড়ির সামনে সব্জিওয়ালা বা মাছবিক্রেতারা আসলেও আমাদের সে সব সুবিধে ছিল না। অতএব দোকানে বেরোতেই হয়েছে। একটা পুরোনো অভ্যাসের চল শুরু হয়ে গেছিল। পুলিশের ভয়ে সব্বার হাতেই বাজারের ব্যাগ। 


লকডাউন হতে চলেছে তা ভারতবাসী জানতে পেরেছিল বিশে’ মার্চ রাতে। বিশ আর চব্বিশের মাঝের তিনদিন দেখেছিলাম আবার অন্য দৃশ্য। শুধু মুদীর দোকান আর দুধের দোকানগুলো খুলেছিল সে সময়টায়। যে মানুষ মাস গেলে বিশ কিলো চাল কেনেন, তিনি হঠাৎ করেই পঞ্চাশ কিলো চাল কিনে ফেলছেন। ডিম তো গোটা ক্রেট প্রায়। বিস্কুট মুড়ি ডাল মশলা মাখন কাঁড়ি কাঁড়ি। সেই যে ম্যাগী উধাও হ’ল সেদিন থেকে, আমাদের পাড়ায় আজ অব্দি তা আসেনি। তেইশ তারিখ আমি নিজে টাটা সল্ট পাইনি দোকানগুলোয়। এ আবার আরেক দিকদর্শন। কিছু লোক শুধু নিজেরাই বাঁচবে মাসদুয়েক তারপরে বাকি কথা ভাববে। আমি নিজের চোখে দেখেছি চার-পাঁচ পাউণ্ড পাউরুটি কিনে নিয়ে যেতে। এক অদ্ভুত ভাবনা !


তারপর থেকে শুরু হল সারাদিন মাইকে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষন। কিভাবে লাইন দিতে হবে, কিভাবে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এই সব শুনতে শুনতে সব্বার জান কয়লা হয়ে গেল তবুও লোকের মনে ধরলো না। পুলিশের হম্বিতম্বি হারিয়েই গেল। আস্তে আস্তে স্টেশনারি, মিস্টির দোকান খুললো। আরো কিছুদিন পরে প্রায় সব দোকানই খুলে গেল শুধু সেলুন ছাড়া। আর নতুন নতুন হকার এল পাড়ায় পাড়ায়, যারা বিক্রি করতে শুরু করলো বিভিন্ন কাপড়ের মাস্ক, হাতের গ্লাভস, লোকাল স্যানিটাইজার ইত্যাদি। তারপর থেকে প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ লোক মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে শুরু করলো। দেখে মনে হ’ল, মাস্ক পরলেই আর করোনা ধরবে না। 


এর মধ্যেই আমাদের পথ চলা শুরু হয়ে আজ মে মাস যায় যায়। 


করোনার সংক্রমণ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। টেস্ট এর কোনো চাপ নেই। শুধু ধরা পড়লেই পুলিশ !  রুগী মানে যাঁর পজিটিভ তাঁকে যে কোথায় নিয়ে যাবে দেবাঃ ন জানন্তি। বাড়ির বাকি লোকেদের কোয়ারেন্টাইন সেন্টার এ পাঠিয়ে দেওয়া। এই হ’ল পুলিশের কাজ। 


এর মধ্যে আরেকটা নতুন শব্দ শিখে গেলাম। পরিযায়ী শ্রমিক। এতোকাল জেনে এসেছি যে সুদূর সাইবেরিয়া থেকে উড়তে উড়তে যে সব পাখী এখানে চলে আসে শীত কাটাতে এবং প্রজননের কারণে তারা হ’ল পরিযায়ী পাখি। এখন দেশের মানুষ পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিহার বা তামিলনাডু গেলেই তাঁরা হয়ে যান পরিযায়ী। এটা যে কার আবিষ্কার সেটা অগোচরেই এখনো। যদিও খুঁজে চলেছি। কেউ জেনে থাকলে একটু জানাবেন প্লিজ। ছোটোবেলা থেকেই দেখে আসছি আমাদের এই কলকাতায় উড়িষ্যা আর বিহারের মানুষজনকে বিভিন্ন কাজে। ছোটোবেলায় বাড়ির চাকর বা পাচক অবশ্যই উড়িষ্যাবাসীদেরই দেখে বড় হয়েছি। পুলিশে বিহারী লোকজনকে। এখনও যে মানুষগুলো আমাদের বাড়িতে বাড়িতে ঠেলা গাড়ি করে খাওয়ার জল দেন সেই অন্ধকার থাকতে থাকতেই, তাঁরা তো সব্বাই উড়িষ্যাবাসী। জলকলের ভাল মিস্ত্রি মানেই উড়িষ্যাবাসী। আগে বাঙালিরা এসব ছোট বা নোংরা কাজ করতি না তাই এনারা এসেছিলেন আমাদের সাহায্য করতে। আজ নাকি তাঁরা পরিযায়ী। ভাবুন !


এতো গেল গেল রাজ্যস্তরীয় ব্যাপার। আমার বাড়িতে যে মাসি বাসনমাজার কাজ করেন তিনি অভাবের টানে পরিবার নিয়ে চলে এসেছেন মুর্শিদাবাদ থেকে। এমন অজস্র কাজের লোক আজ জেলাস্তরীয়। এনারা তাহলে কেমন ধরণের পরিযায়ী ? 


আমাদের এখানে আবার এমন অনেকেই আছেন যাঁরা বাঙলাদেশ থেকে এসেছেন কাজ করতে। বছরে একবার তাঁরা বাংলাদেশ যান কিন্তু। তাঁদের না আছে পাশপোর্ট না আছে কিছু। এনারা তাহলে পরিযায়ী’র কোন গ্রেডে বিলং করেন একটু জানাবেন তো বাবুমশাইরা !


এবার আমার মূল প্রশ্নে আসি। যা বলতে চাইছি অথচ বলা হচ্ছে না। 


এই যে কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার এই লকডাউনের বাজারে যেভাবে যেভাবে চলতে উপদেশ দিচ্ছেন তা আমরা মানতে পারছি না কেন ?


মানতে পারছি না—নাকি মানতে চাইছি না ? কোনটা ?


সকালে বাজার বা দোকানের সামনে দাঁড়ালে যে মানুষগুলো প্রায় ঘাড়ের ওপর দিয়ে হাত বাড়াচ্ছেন বা এক্কেবারে গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে পড়ছেন, তাঁদের মুখ দেখে তো অশিক্ষিত বলে মনে হয় না আমার। তবে ?  টিভিতে বা সোসাল মিডিয়ায় সল্ট লেক, বালীগঞ্জ, ভবানীপুর এসব পশ এলাকার ছবিও তো দেখছি। একই যাপন। কেন ?  কেন ?  কেন ?


সারা পৃথিবীর খবর রাখছি আমরা আজকাল। ফেসবুকে জ্ঞানের বন্যা বইয়ে দিচ্ছি সারাটা দিন। কিন্তু এহেন আচরণ কেন ?  বারংবার ডাক্তারবাবুরা বলেই যাচ্ছেন যে এই করোনা থেকে দূরে থাকার প্রাথমিক এবং অন্যতম উপায় হ’ল দূরত্ব বজায় রাখা। তবে ? এ কথাখানা কি আমাদের কানে ঢুকছে না ? 


যাঁরা অশিক্ষিত তাঁদের নাহয় আমি বাদ রাখছি। আমি জানি যাঁরা দিনের উপার্জনে সংসার চালায় তাঁদের এসব ভাবার সময় কই !  আমি তাঁদের কথা বলছি না। আমি বলছি এই আমাদের মতো নিশ্চিন্ত চাকরিজীবী বা পেনশনভোগীদের কথাই। এমন কি যাঁরা আমাদের চারপাশে বেশ বড়সড় ব্যবসা করেন, তাঁরা ?  অর্থাৎ যাঁদের বসে বসে সংসার চালানোর সামর্থ্য আছে বা যাঁরা হয়তো এই পরিস্থিতিতেও অফিস কাছারি করছেন তাঁরা। কেন এই নিয়ম না মানার এত ব্যকুলতা ?


ব্যকুলতা কি ? না কি ঔদ্ধত্য ? কোনটা। 


আজ ফেসবুকেই এক ডাক্তারবাবুর একটা লেখা পড়ে আমার ভাবনাটা আবার চাগাড় দিল এটা লিখতে। ‘ডাক্তারস’ ডায়লগ’ বলে একটা গ্রুপ আছে যেখানে অনেক ডাক্তারবাবুরা অনেক কিছু আলোচনা করেন। ভারী সুন্দর এই গ্রুপ। 


ডাঃ ইন্দ্রনীল সাহার আজকের প্রবন্ধটা ভারী ইন্টারেস্টিং। একটা নতুন দিক জানতে পারছি। তিনি বলছেন— 


“...যখন দেশে এই অসুখে আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়ে গেছে কিংবা রাজ্যের সংখ্যাও যথেষ্ট উদ্বেগজনক তখন কি মনে একইরকম ভয় বা আশঙ্কা আছে? অনেকেরই উত্তর হবে, না নেই। কিন্তু কেন এমন হয়? এর ব্যাখ্যা সুন্দরভাবে দিয়েছেন এলিজাবেথ কুবলের রস নামে এক মনস্তাত্বিক। তাঁর বিখ্যাত ‘কুবলের রস মডেল’ নামে দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে। কুবলের রস মডেল-এ বলা হয়েছে, যে কোনও দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অতিমারীর ক্ষেত্রে আমরা প্রায় সবাই পাঁচটি ধাপ অতিক্রম করে এগোই। এই পাঁচটি ধাপ হল,


প্রথমে বিষয়টাকে না মানা (Denial), ২)রাগ (Anger), ৩) দর কষাকষি (Bargain), ৪) হতাশা (Depression), ৫) তার সঙ্গে আপোষ করে নেওয়া (Acceptance)। একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে করোনার ক্ষেত্রে আমাদের তাই হয়েছে। যেমন,


১) প্রথমে অসুখটাকে আমরা তেমন গুরুত্বই দিইনি। ভেবেছি,চিনে অসুখটা হয়েছে বলে আমাদেরও হবে তার কোনও মানে নেই। তার ওপর সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু ভুয়ো খবর যে আমাদের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে এই অসুখ প্রভাব ফেলবে না তাতেও বিশ্বাস করে নিশ্চিন্তে ছিলাম।


২) যখন রোগটার বাড়বৃদ্ধির খবর আসতে লাগল তখন রাগ হতে লাগল। কেন, আমলার ছেলে ওভাবে ঘুরে বেরাল, কেন বিদেশ থেকে লোক আসায় নিষেধাজ্ঞা জারী করা হল না, কেনই বা লকডাউন করা হল– নানা বিষয়ে আমাদের রাগ বাড়তে লাগল।


৩) অসুখে আক্রান্তের সংখ্যা যত বাড়তে লাগল ততই সবার মনে হতে লাগল, কেন লকডাউন কঠোরভাবে মানানোর চেষ্টা করা হল না? কেনই বা কিছু কিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়া হল? লকডাউন করে কী সুবিধা হল এসব নানারকম ভাবনা মনে দেখা দিতে লাগল।


৪) দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবন থেকে সরে গিয়ে ঘরে বসে থাকা, অসুখের ভয় মনের মধ্যে চেপে বসা এবং আর্থিক চিন্তায় মনের মধ্যে অনেকেরই হতাশা দেখা দিয়েছিল।


৫) সব শেষে বুঝলাম এই অসুখকে মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমরা অনেকেই এখন মনে মনে তৈরি হয়ে গেছি। বুঝে গেছি জীবনে এই অসুখ মোকাবিলার জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে। আর অসুখ হলে তার চিকিৎসা আছে। কাজেই আর হতাশার কোনও জায়গা নেই।


যে কোনও স্বাভাবিক মানুষ প্রথম স্তর থেকে পঞ্চম স্তরে গিয়ে জীবনে এগিয়ে চলার পরবর্তী পদক্ষেপ তৈরি করে নেন। আর যিনি তা পারেন না তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কাজেই সুস্থ থাকতে হলে সবাইকে এই পাঁচটি ধাপ মেনে নিতে হবে। তাহলেই আস্তে আস্তে করোনার আতঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব।”         (ফেসবুকের “Doctors’ Dialogue”  পেজে Dr. Indranil Saha,  Reproductive medicine specialist  মহাশয়ের লেখা “করোনার সঙ্গে আপোষ করাই বুদ্ধিমানের কাজ” প্রবন্ধ থেকে নেওয়া)


উনি যা বলেছেন সেগুলো আমি আমার মত ক’রে আরেকটু জানতে চাই আর কি !


প্রথম পয়েন্ট এ রয়েছে “না মানা বা (Denial)”। উনি বলছেন যে প্রথমে অসুখটাকে গুরুত্ব না দেওয়া। কিন্তু কেন ? আসলে আমরা এতে অভ্যস্তই নই। ডাক্তার দেখাতে এমনিতেই আমাদের ভয়ংকর এ্যালার্জি। প্রথম কারণ পয়সাকড়ি। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কারণ ‘এপোয়েন্টমেন্ট জোগাড় করা (নামী ডাক্তার হ’লে)’ আর সময়ের বাহুল্যতা। অর্থাৎ ভোরবেলা উঠে বা রাত জেগে লাইন দিয়ে যদিও বা ডাক্তারবাবুর ‘এপো’ পাওয়া গেল, কিন্তু নির্দিষ্ট সময় চেম্বারে গিয়ে যে কতক্ষণ হাঁ করে বসে থাকতে হবে তা অকহতব্য। আর গরীব মানুষের সরকারী হাসপাতাল !  রাত থেকে আউটডোরের লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট ক’রে কখন যে প্রেসক্রিপশন সহ রুগী বাড়ি ফিরবে তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। সেই কারণেই সামান্য পেটব্যথা বা অম্বলের জন্য জনগনের ভরসা পাড়ার চায়না’দার ওষুধের দোকান। এবং সেই ওষুধ কিনে রোগটাকে ধামাচাপা দেওয়া। এই করতে করতে যখন শেষ স্টেজ, ক্যানসার কিংবা প্রাণঘাতী অন্য অসুখের তখন রূগী হাতের বাইরে। 

এরপরে আছে আমাদের সাধারণ জ্ঞানের অসাধারণ বহর। চীনে হয়েছে বলে আমাদের যে হতেই হবে এই আলোচনায় গোপাল’দার চা-এর দোকানে তুমুল চর্চা। ভাগ্যিস এই লকডাউনে গোপাল’দার দোকান বন্ধ, নাহলে যে কি  হত !  এর পরে আছে ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম, ইউট্যুবের মতো দারুন দারুন মাস্টারমশাইরা। আবিষ্কার হয়ে গেল অলরেডি, যে করোনা ভাইরাস গরমে মরে যায়। ব্যস সক্কাল থেকে শুরু হল গরম জলে দাঁত মাজা, গরম নুন জলে গার্গল, গরম জলে স্নান। শালা আরো কতো কি !  ওদিকে “হু” কিন্তু বারবার বলে যাচ্ছে কি করতে হবে এ সময়। ইচ্ছে করলে সব সময় ফোনেই আপডেট দিচ্ছে “হু”।  কিন্তু আমাদের স্বভাব যায় না মলে। কে কার কথা শোনে !


দ্বিতীয় পয়েন্ট   রাগ (Anger)। কিসের রাগ ? প্রথম রাগ ডাক্তারবাবুর কথা অনুযায়ী পড়ল গিয়ে স্বরাস্ট্র দফতরের ওই আমলা আর তাঁর ছেলের ওপরে। হ্যাঁ,নিশ্চিত তাঁরা একটা প্রায় ক্রিমিনাল অফেন্স করেছেন তাঁদের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে। সেই রাগ কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি আমাদের। রাজনীতির কল্যাণে আমাদের ভারতবাসীর এই রাগ সর্বজনবিদিত অথচ তা প্রকাশ করতে গেলেই রাস্ট্রশক্তি দিয়ে ভয় দেখানো বা হাপিশ হয়ে যাওয়ার ভয়। সে কংগ্রেস,বাম,ডান সব আমলের এক জড়ো হওয়া রাগ। না পাওয়ার ক্ষোভ। কাউন্সিলর এসি স্করপিও চেপে সামনে দিয়ে হুস করে চলে যাওয়ার ক্রোধ। আর সরকারি সব জায়গায়ই এমন একটা দায়সারা ভাব যেন তাঁরা দয়া করছেন। শালা আমাদেরই ট্যাক্সের টাকা সরকার দান খয়রাতি করছে অথচ ট্যাঁফু করার উপায় নেই। সুতরাং রাগ।এ রাগ ঘুঁষঘুষে। মানে রক্তের সাথে ঘুরে বেড়ায় অথচ ফেটে বেরোনোর উপায় নেই। কি করবে অসহায় জনগন ! দাদাদের হাতে বন্দী আমরা অনেককালই। আগে ছিল শিক্ষিত দাদা। এখন বেশীর ভাগটাই কি আর বলি! মুস্কিল হল,এই দাদারা পুরোনো ইতিহাসগুলো বেশ কায়দা করে ভুলে যেতে পারেন। নতুন করে আবার ইতিহাস তৈরি করে নেন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে।অথচ আমাদের মুখ বন্ধ। তো সেই পুঞ্জীভুত রাগ প্রথম প্রথম গিয়ে পড়লে সেই আমলার ছেলের ওপরেই। তারপরে কিন্তু আমরা য্থারীতি সেসব ভুলে গেছি। মিডিয়াও আরেক জন। আমাদের উত্তেজিত করায় কিন্তু কোনো খবরের উপসংহার জানায় না আর । রাগ জমতেই থাকে। মাইগ্রেন বাড়লে নিজেই ভুগতে হয়। 


তৃতীয় পয়েন্ট সেই আমাদের  দর কষাকষি ( Bargain)। এটা আমরা দারুন পারি। হাতীবাগান বা গড়িয়াহাটের ফুটপাথের বাজারে আমাদের কি কম অভিজ্ঞতা ! একশো টাকা দামকে অবলীয়ায় সতেরো টাকা থেকে দরাদরি শুরু করতে পারি। আরেকজন কতো বেশি দাম দিয়ে কিনেছে একথা তাঁকে শুনিয়ে আহ্লাদে গদগদ হই। কেন ঠিকঠাক লকডাউন হচ্ছে না তাঁর চিন্তায় আকুল হই অথচ বাজার থেকে ফিরে ডাক্তারবাবুদের পরামর্শ অনুযায়ী জামাকাপড়জুতো পড়েই শুধুমাত্র হয়তো হাতটা ধুয়েই বিছানায় উঠে বসি নির্বিকারে। আর মাথায় খেলাতে থাকি সরকারের কি উচিত ছিল না আরো আগে শ্রমিকদের ফেরানো ?


চতুর্থ পয়েন্ট - হতাশা বা (Depression)। এটা এসেছে মূলতঃ সামাজিক আর রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকেই আমার ধারণায়। আমার চেয়ে কতো কম শিক্ষে নিয়ে কেমন তরতর করে ম্যানেজার হয়ে গেল যেহেতু কাস্ট সার্টিফিকেট আছে বলেই এদিয়েই তো আমাদের হতাশা শুরু হয়। মানে চাকরিজীবীদের। অথচ এর বিরুদ্ধে কিচ্ছু বলতে পারি না। রাগ পুষেই রাখি মনে মনে। আমি শিক্ষিত হয়ে চাকরী করেও সংসার চালাতে হিমসিম হয়ে যাই আর আশেপাশের কতো নাম না জানা দাদারা গাড়ি হাঁকিয়ে সামনে দিয়ে হুস করে চলে যায় শুধু ক্ষমতার জোরে এ কি রাগ বাড়ায় না ? ধর্মঘটের দিন পাড়ার দাদারা অফিস কাছারি যেতে বলেন মাইক হাতে নিয়ে অথচ নিজেরা কিন্তু ভুলেও পাড়ার বাইরে যান না এ ছবিই দেখে অভ্যস্ত আমরা। অবসরপ্রাপ্ত মানুষ যাঁদের শুধুমাত্র জমানো টাকার সুদে সংসার চলে তাঁদের কথা কোনো সরকারই ভাবে না। শুধু নেতাদের বাণী। দিন দিন সুদ কমে ব্যাংকের। এর পরে আছে সঞ্চয়িতাগুলোর মতো চিট ফাণ্ডের রমরমা ব্যবসা। নেতারা সমবেদনা জানিয়ে বড় বড় বক্তিমে দেন তাতে তো আর সংসার চলে না। বাড়ির ছেলেগুলো বেকার। যারা একটু লেখাপড়া শিখেছে তাদের অন্য রাজ্যে গিয়ে পরিযায়ী শ্রমিক হতেই হয় পেটের জ্বালায় অথচ নেতারা অঞ্চলে বসেই বহাল তবিয়তে সংসার চালিয়ে যান। হতাশা জাগানোর আর কি কিছু বাকি রইলো। 


পঞ্চম এবং শেষ পয়েন্ট হ’ল ৫)তার সঙ্গে আপোষ করে নেওয়া {Acceptance)। সব কিছুর সাথেই। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত মানুষের আর আছেই বা কি! কিছু না হ’লে “ঈশ্বরের দান” তো আছেই আমাদের। ভারতবাসী চিরটাকালই ধর্মের অনুশাসনে বাঁধা। হিপোক্রেসী বা প্রিটেনশনে ভর্তি প্রচুর মানুষ। বিশেষ করে রাজনৈতিক মানুষজন। সাধারণ মানুষের সাথে তাঁদের বিরাট দূরত্ব। ক্লাস বা শ্রেণী সব পার্টিতেই বহমান এখনো। এছাড়া আর কিছু করার নেই আমাদের। 

মূল কথায় ফেরৎ আসি আবারও। এই যে না মানার ইচ্ছে সেই তাসের দেশ এর মতো এটার উৎপত্তি কিন্তু আমাদেরই চারপাশ থেকেই। সামাজিক এবং রাজনৈতিক। অর্থনৈতিক শব্দটাকে আর আলাদা করে নাই বা বললাম। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করতে পারি। বাসের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে থুতু বা পিক ফেলতে পারি। এক হাত দিয়ে গাড়ি থামিয়ে অবিচলিতভাবে রাস্তা পেরিয়ে যেতে পারি। খুব স্বাধীন আমরা। 


কিন্তু এই স্বাধীনতা তো আমাদের ছোটোবেলায় দেখিনি। যখন সকাল বিকেল কলকাতার রাস্তা ধোওয়া হ’ত। যখন পাঞ্জাবী ট্যাক্সি ড্রাইভারেরা খুচরো পয়সা নিশ্চিত করে ফেরত দিতেন। এই যে সবেতেই একটা উন্নাসিক ভাব এটা এলো কবে থেকে ? ছোটোবেলায় দাদু বলতেন যে ভাই, সাইকেল চালাতে দিয়ে যদি ঠেলাগাড়িতে ধাক্কা মারো তবে নাকি আমায় শহরের বাইরে বার করে দেব সেইই গুপী’র মতো। তার মানে কি ? একটা কিছু মাপকাঠি ছিল নিশ্চই আমাদের জীবনে—যাপনেও। ছিল একটা মুল্যবোধ ফল্গু’র মতো বহমান। সেগুলো গেল কোথায় আজ ? আমার ছোটোবেলায় চীন ভারতের যুদ্ধের কথা আবছা মনে আছে। সন্ধ্যের পরে কম আলো জ্বলত বাড়িতে। তখন তো টিউব লাইট ছিল না। বাল্ব মানে আমরা যাকে ‘ডুম’ বলতাম সেগুলো তারে ঝুলে থাকতো। সেই সব ডুমের ওপরে লাগানো হয়েছিল শেড। যাতে ওপর থেকে আলো না দেখা যায়। পাড়ায় একটু বেচাল দেখলেই দাদু কাকাদের বকুনি কাম আদর ছিল। সে সব গেল কোথায় ? 


এগুলো নিয়ে কিন্তু ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে বলে মনে হয়। আমার ধারণায় এই সব না মানার উৎস কিন্তু একদিনে আসেনি। একটু একটু করে গ্রাস করেছে আমাদের। অশিক্ষা, কুশিক্ষা, বেকারত্ব, তোলাবাজি এগুলোও মনে হয় এক একটা ফ্যাক্ট্রর। অন্য রাজ্যে গিয়ে দেখেছি যে পুলিশকে কিন্তু সব্বাই ভয় পায়। কিন্তু পশ্চিমবাঙলায় অটোচালকের হাত সাধারণ পুলিশ শুধু নয়, সার্জেন্ট মানে অফিসারদের গালে গিয়ে পরে। কেন ? সব কিছুর মূলে একটাই কারণ আর তা হল ‘দাদাগিরি’।  অন্য রাজ্যে কি এতো দাদা’রা আছেন ? জানার ইচ্ছে রইলো আমার পাঠকদের কাছে। 


আজ এই অব্দিই থাক। দেখা যাক। আরো এক মাস লকডাউন বাড়লো। কি হয় সাধারণ মানুষের ?  জানিনা, কিচ্ছু জানিনা। তবে এটুকু জানি যে সংখ্যাটা হয়তো আরো বাড়বে। “হু’র” রিপোর্ট তাই বলছে। ফেসবুকের তাত্ত্বিকেরা বলছেন যে চীনে যেহেতু শৃঙ্খলা আছে সেই কারণে ওখানে কমছে করোনা আক্রান্ত রুগী। চীনের সব খবর কি আসে ঠিকঠাক ? কি জানি। তবে চীনে নতুন করে আবার করোনার সংক্রমণ হয়েছে শোনা যাচ্ছে। একমাত্র সিকিম আর ভুটান পেরেছে করোনা আটকাতে। তাদের থেকে কি আমরা শিক্ষা নেবো ? আমার ধারণা যতদিন না আইন সবার জন্যে সমান হবে ততোদিন এ ঔদ্ধত্য আরো বাড়বে বই কমবে না। মন্ত্রী—আমলা—নেতারা আইনের সুযোগও নেবেন, আবার তাঁরাই এর অপব্যবভার করবেন এমনই অসভ্য, দেশের আইনকানুন। আগে নিজেদের ঠিক হতে হবে। করোনা পজিটিভ হ’লে নেতারা বাড়িতে থাকবেন আর আমাদের জন্য পুলিশ এ চলতে থাকলে হতাশা আরো সর্বগ্রাসী হবেই। এর কোনোই বিকল্প নেই আর।  শেষ করি আমার আগের ‘টেলিফোন’ নামের একটা লেখার শেষ অংশটুকু দিয়ে... আমার ছোটবেলার গপ্পো এটা...


আমাদের পাড়া বিখ্যাত ছিল ‘ছানাপটি’ নামে। কত ছানার দোকান। বেশীর ভাগ বিক্রি হোতো বিকেলে। আমাদের বাড়ীটেও একটা দোকান ভাড়া দেওয়া ছিল। বিকেল হলেই বাঁকে করে আসত  ছানা। বিশেষ করে উড়িষ্যার লোকজন এই বাঁক বইতো। গরম গরম ছানার যে কি টেস্ট সে এখনো ভুলতে পারি না। 


পাড়ার যে কোনো ছানার দোকানে বিকেলে হাত বাড়ালেই দোকানদার হাতে দিত একটু গরম ছানা। কি সুস্বাদু সে ছানা ! বিভিন্ন রকমের ছানা আসতো। 


পাড়ায় তখন টেলিফোন বলতে একটাই ফোন।ঐ পল্লী সঙ্ঘে। গোটা পাড়ায় ঐ একটাই নাম্বার। আমার এখনো মনে আছে । ৫৫-১৫৬০। কেউ না কেউ কারোর ফোন এলে ডেকে দিত তাকে। তখন তো আর এই সময়ের বিধিনিষেধ ছিল না। যতক্ষন ইচ্ছে কথা বলা যেত ঐ একবারের ডায়ালে। মানে একটাই কলের পয়সা দিতে হোত।


আমার এখনো চোখে ভাসে ঐ কালো রঙের ঢাউস টেলিফোনটা। সবাই ফোনে কথা বলতো। কিন্তু আমাকে কেউ আর ফোন করে ডাকে না। খুব দুঃখ ছিল। প্রথম ফোন করেছিলাম যখন আমি ক্লাস টু তে পড়ি, এক স্কুলের বন্ধুকে। ওদের বাড়ী তখন ফোন ছিল। বাবা ডায়াল করে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কি উত্তেজনা আমার সেদিন !


সবচেয়ে আশ্চর্যের জিনিষ ছিল যেটা, সেটা ভাবলেই মনটা কেমন হয়ে যায় এখন।


টেলিফোনটা রাখা থাকত একটা তিনফুটের চৌকো টেবিলের ওপর। পয়সা জমানোর যে লক্ষীর ভাঁড় হয় যাতে মায়েরা-বৌরা,পয়সা জমায় তাতে একটা গর্ত থাকে টাকা পয়সা ফেলার জন্য। ঐ রকম একটা গর্ত ছিল ঐ ফোনের টেবিলটার ওপর। ফোন করার পর দেখতাম সবাই ঐ গর্তে পয়সা ফেলে দিত। 


আর ছিল কুপন। একেকটা কুপন বইতে বোধহয় ২৫ বা ৫০ টা কুপন থাকত। যাদের ফোন বেশী হোতো তারা আগেই ঐ কুপন কিনে রাখতেন। ফোন করার পর একটা করে কুপন ঐ গর্তে ফেলে দিত ঠিক। অন্যথা হয় নি কখনো। আর ফোন এলে যে কেউ সামনে থাকতো সেই ডেকে দিত যার ফোন তাকে...।


আমার বাবা ছিলেন পল্লী সঙ্ঘের ট্রেজারার। মাসের শেষে ঐ টেলিফোনের টেবিল খুলে বার করে আনতেন পয়সা আর কুপনগুলো। তারপর আলাদা করতেন পয়সা আর কুপনগুলো। তারপর সবকিছু গুণে তুলে রাখতেন । কিন্তু আমি কখনো শুনিনি যে টেলিফোনের বিলের সাথে অনেক তফাত হয়েছে ঐ পয়সা আর কুপনগুলোর যোগফল।


কোথায় হারিয়ে গেল সেই সব দিনগুলো। আমার জ্ঞান হওয়ার পর থেকে মানে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এটাই দেখে এসেছি। 


তারপর আমরা ওপাড়া ছেড়ে বরানগরে চলে আসি। কিন্তু টেলিফোনটা চালু ছিল।


তারপর এল নকশাল যুগ। তখন আমার ক্লাস নাইন। পূরোনো পাড়ায় যাতায়াত ছিলই আমার। দেখলাম ক্লাবের দুর্দশা। আমার মনে হয় মনের অবক্ষয় শুরু হোলো তার পর থেকে। টেলিফোনের বিল আসে কিন্তু পয়সা আর পরে না। কেউ কেউ কুপন দেয়, অনেকেই দেয় না। নকশালী ছেলেপুলেরা ওটাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে আরম্ভ করলো। তারপর বাকী সবাই। 


হারিয়ে গেল পাড়ার টেলিফোন। বন্ধ হোলো শেষ পর্য্যন্ত.....৫৫-১৫৬০....।


(সমাপ্ত)

##


©গৌতম দত্ত

কলকাতা।


#

.

কৃতজ্ঞতা :- 


১) ফেসবুকের “Doctors’ Dialogue”  পেজে Dr. Indranil Saha, Reproductive medicine specialist  মহাশয়ের লেখা “করোনার সঙ্গে আপোষ করাই বুদ্ধিমানের কাজ” প্রবন্ধ থেকে নেওয়া। 

২) ছবি গুগুল থেকে


#