জ্যোতি নিভে গেল—
হাজার গলা ছিঁড়ে কেড়ে একটি হুঙ্কার
আমাকে টানো :
যেখানে কলে জল, মরা পিচের খাড়িতে জীবনের কোটাল
যেখানে জীবন আলোর বেগের জলসা যেখানে জীবন
আমার মিছিল যেখানে বে-ঠিকানা
তোমার ময়দান পথে-ফেরানো মুখ ;
আমার ভালবাসার মুখ।
আমাকে বাঁচাও / আমাকে বাঁচাও / তুমি বাঁচো ; / কলকাতা, কলকাতা।
(___কলকাতা, কলকাতা – মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়।)
পুড়ে গেল ‘জ্যোতি’ সিনেমা হল। পুড়ে খাক্ হয়ে গেল আমাদের যৌবনের আর এক চক্মকি।
৩২/১, ধর্মতলা স্ট্রীট (এখন লেনিন সরণী)। ১৯৩০ সালের তৈরী কলকাতার এই সিনেমা হলটিতে সত্তর মিলিমিটারের ফিল্ম দেখা যেত। প্রথম দিকে মূলতঃ ইংরেজি সিনেমাই বেশী দেখানো হত কিন্তু সবার কাছে ‘জ্যোতি’ পরিচিত হয়ে উঠল ১৯৭৫ সালে। সেই গব্বর সিং-এর “শোলে”-র সুবাদে। পরবর্তীকালে খুব সম্ভবতঃ ২০০৮ সাল থেকেই বন্ধ এই চিত্রগৃহটি।
“শোলে”
সিনেমাটি দেখার আগে আমার সত্তর মিলিমিটারের কিছু ইংরেজি ছবি দেখা হয়ে
গেছে। জ্যোতি ছাড়াও ‘এলিট’ এবং ‘গ্লোব’—এও এই সত্তর মিলিমিটারের সিনেমা দেখানোর ব্যবস্থা ছিল। গ্লোব এখন বড়সড় দোকান। ভাবলেই যন্ত্রণা হয়। ‘ব্যাটেলশীপ পোটেমকিন’ আমরা কলেজ জীবনে এই গ্লোবেই দেখেছিলাম। এই সিনেমাটি দেখতে গিয়ে দেখেছিলাম সত্যজিৎ রায়’কে। অমন মানুষটিকে সেই আমার প্রথম দর্শন। এছাড়া ‘প্যাটন’ বা ‘তোরা তোরা তোরা’—র সেই কামানগর্জন এখনো যেন কানে লেগে আছে। ‘এলিটে’ দেখা
সত্তর মিলিমিটারের ‘বেনহার’ বা
‘স্পার্টাকাস’—এর কথাই বা ভুলি কি করে
! চোখের জলের দাম আর আমাদের এই কলকাতায় কে দেয় !
চোখের সামনে
রবীন্দ্রনাথের নাম দেওয়া “রূপবাণী’ সিনেমা হলটা এখন কংক্রিটের বস্তি হয়ে গেল। বছর খানের আগে কাশী বোস লেন থেকে বেরিয়ে হাতিবাগানের দিকে আসতে
চোখ চলে গেছিল “রঙমহল”
নাট্যগৃহের দিকে। চোখ সেদিন
সত্যিই জলে ভরে গেছিল ভারতবর্ষের প্রথম রিভলভিং বা ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চকে আমরা বাঙালীরা
ধরে রাখতে পারলাম না বলে। বড়াই করা বাঙালীর
মজ্জাগত ! কিন্তু আর
কিসের বড়াই করবো আমরা। স্কুল অফ পাবলিক
হাইজিনের কাছাকাছি, সেন্ট্রাল
এভিনিউ-এর ওপর পড়ে থাকা কেশব চন্দ্র সেনের বসতবাড়ি খানা কেন সাত-আট তলা বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট হয়ে গেল কে জবাব দেবে তার ! একটা ছোট্ট মার্বেল ফলকে এখন শুধু একটুকরো স্মৃতি সেই বাড়ির ইতিহাস বহন করছে,
যেখানে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণদেব দক্ষিণেশ্বর থেকে ঘোড়ার গাড়ি করে গেছিলেন
বাহ্মসমাজের অবিসংবাদিত পুরুষ কেশব চন্দ্রকে দেখতে। জানতাম ব্রাহ্মসমাজের অনেক গণ্যমান্য মানুষজন থাকেন মহারানীর
এই কলকাতা শহরে। তাঁরাও কেন নিশ্চুপ রইলেন এর উত্তর কে দেবে !
শাওয়ারের জলের
ধারার মত অনেক কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে। তাই ধান ভাঙতে
শিবের গীত গেয়ে ফেললাম। হচ্ছিল ‘জ্যোতি’র কথা সেই যেখানে
প্রথম অনুভব করেছিলাম যে আমাদের ভারতীয় সিনেমাও পারে—একটা কয়েন
ছোঁড়ার পরে পাহাড়ে গড়িয়ে পড়ার সেই শব্দকে ধরে শোনাতে। তখন তো আমাদের সাউন্ড সিস্টেম বলতে ‘মোনো’-ই বুঝতাম। সেই প্রথম আমাদের মাথায় ‘স্টিরিও সাউন্ড’ ঢোকালো ‘শোলে’—র নির্দেশক রমেশ সিপ্পি। কি উৎসাহ আমাদের
ব্যাপারটা জানার আর সবাইকে জানানোর। ফিলিপ্স হল্যান্ডের
সেই বড় স্পুল-ওয়ালা টেপরেকর্ডারে
চারখানা ট্রাক তখন দেখেছিলাম কিন্তু স্টিরিওর মগজ ধোলাই করল শোলে’র সেই কয়েন টস্। দুই বন্ধু
ভিরু আর জয়ের সেই দৃশ্যগুলি জ্যোতির ওই অত বড় পর্দায় আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল ওই
বয়সে। স্মৃতি বেদনারই হয় বেশী—সুখের ঘরে তার যাতায়াত খুব অল্পই। যে পায় সে পায় আর যে পায়না তার মত হতভাগ্যের আর কে আছে !
মনটা ভারীপর্দায়
ওঠানামা করছে। তাই একটু হাল্কা হই। আবছা মনে পড়ছে ওই জ্যোতি সিনেমা হলের—ই কাছাকাছিই কোনো একটা বাড়ির দোতলায় চেম্বার
করতেন কিরীটি রায়ের স্রষ্টা
ডাঃ নীহার
রঞ্জন গুপ্ত। রুগীর ভীড় ছিল খুবই কম। ওই চেম্বারের মধ্যেই রুগী দেখার বদলে তখন জন্ম নিচ্ছে সেই কালোভ্রমর, ডঃ সান্যাল, কিরীটি রায়। সেই রেঙ্গুন, মান্দালয় আরও কত কি ! বর্তমান প্রজন্ম জানেই না এই কিরীটি
রায়, দস্যু মোহন, দীপক চ্যাটার্জিদের। ইদানীং কিছু সিনেমার জন্য তারা জানতে পারছে এদের নাম - যারা ছিল আমাদের যৌবনের হিরো। শরদিন্দু চিরকালই একটু ভারী। তাই ব্যোমকেশ-অজিত—এর চেয়ে ওরাই ছিল আমাদের খুব কাছের। এখন তো ফেলুদা একাই রাজত্ব করে যাচ্ছে একুশ নম্বর রজনী সেন রোড
থেকে !
কিন্তু কিরীটি
রায়—এর স্রষ্টা-বাপের
ঠাঁটবাট ছিল সাহেবদের মতো পাক্কা। ফাঁকা চেম্বার
কিন্তু তাও সুড়ুৎ করে ঢুকে পড়ার যো ছিল না। চেম্বারের
বাইরে একটা টুল পেতে বসে থাকত ডাক্তারবাবুর দারোয়ান কাম এটেন্ডেন্ট একজন লোক। স্লিপ লিখে তার হাতে দিতে হত। তারপরে সে চলে যেত ভেতরে। আরও কিছুক্ষণ পরে ভেতর থেকে শোনা যেত সেই টেবিল-বেল্ এর ট্রাং...ট্রাং শব্দ। তবেই মিলত
ছাড়পত্র ডাক্তারবাবুর চেম্বারে প্রবেশের। সেই বেলগুলোও
হারিয়ে গেল কলকাতার সব অফিস থেকে !
ডাঃ নীহার
রঞ্জন গুপ্তের তেমন পসার ছিল না তাই তো আমরা পেয়েছি কিরীটি রায়কে - ওই ধর্মতলা স্ট্রীটের একটা বাড়ির আলো আঁধারি
চেম্বার থেকে।
দুঃখের শেষ
করা যাবে না কলকাতা নিয়ে। কত স্মৃতির
আঁতুড়ঘর ধর্মতলা স্ট্রীটের সেই বিখ্যাত কমলালয় স্টোর্স ভেঙে তৈরি হয়ে গেল আরেক বাণিজ্যিক
বস্তি। কলকাতায় আর পুরোনো স্মৃতির কথা মনে উস্কে দেবার বাড়িঘর
হারিয়েই যাবে আধুনিক প্রোমোটারদের হাতেই।
গবেষক শ্রী
অজিতকুমার বসু’র ‘কলিকাতার রাজপথ সমাজ ও সংস্কৃতিতে’ নামক বইটি থেকে জানতে পারছি “১৭৫৭ খৃস্টাব্দে এই অঞ্চলটি বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। পলাশীর যুদ্ধের পর এই এলাকার জঙ্গল পরিস্কার করা হয়। সম্ভবত ১৭৬২ খ্রিঃ ধর্মতলা স্ট্রীট তৈরি হয়ে থাকবে। মার্ক ঊডের মানচিত্রে এটি দেখানো আছে। ডিঙ্গাভাঙ্গা অঞ্চলের জানবাজার রোড—সেকালের এক বিখ্যাত রাস্তা। এটিও ১৭৬২ খৃস্টাব্দে তৈরি হয়। এ রাস্তাটিও আজ আর ওই নামে পরিচিত হয়। এর নতুন নাম সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি রোড।” ধর্মতলা স্ট্রীট বা লেনিন সরণী আর সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী রোড প্রায় পাশাপাশি
এসে চৌরঙ্গী রোডে পড়েছে। সুরেন্দ্রনাথ
রোডেই অবস্থিত ‘এলিট’
সিনেমা হলটি। আর রয়েছে কলকাতার
পুরোনো মোগলাই পরোটার সেই বিখ্যাত ‘অনাদি কেবিন’।
এই সুরেন্দ্রনাথ
রোডেই ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার স্যামুয়েল বর্ন ও চার্লস শেফার্ডের স্থাপন করা
ফটোগ্রাফি স্টুডিও বর্ন অ্যান্ড শেফার্ড—এর বাড়ি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে কলকাতার পুরোনো ছবির ইতিহাসকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে
আরও অনেক আগেই।
একমাত্র এসপ্ল্যানেড রো (ইস্ট) আর ধর্মতলা স্ট্রিটের সংযোগস্থলে টিপু সুলতানের অষ্টম পুত্র গোলাম মহম্মদের স্থাপন করা একটি মসজিদ এখনো ধরে রেখেছে ওই অঞ্চলের পুরোনো ঐতিহ্য।
ইভিনিং-ইন-প্যারিসের গন্ধ—
হে শহর হে ধূসর শহর !
কালিঘাট ব্রিজের উপরে কখনো কি শুনতে পাও
লম্পটের পদধ্বনি
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও
হে শহর হে ধূসর শহর ! ......” (__স্বর্গ হতে বিদায় – সমর সেন।)।
©গৌতমদত্ত
৪ঠা
অক্টোবর, ২০১৬