সিন্নি -

        অফিস থেকে বেরিয়েই আজ পেয়ে গেছিলাম একটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস চাপলেই সরাসরি বাড়ি তাই আর সাত পাঁচ না ভেবেই উঠেই পড়লাম এই গ্রীষ্মের বিকেল বেলায় একটা সাইড সীটও জুটে গেল মাথার ওপর থেকে ঠান্ডা হাওয়া ফুরফুর করে বইতে লাগলো অবিরাম অফিস পাড়ার দোকানগুলো দেখতে দারুন লাগছিল বাসের ভেতর থেকে প্রাণান্তকর গরমে কলকাতার আরাম এখন এই বাসগুলো বেশ ফুরফুরে মেজাজে একটু তন্দ্রাও এসে গেল হঠাৎ একটা ঝাঁকানিতে তন্দ্রা গেল ভেঙে

একি ! এত দিনের আলো কেন ?

মুহূর্তে সম্বিত ফিরে এলো দেখি আমি বাসের সীটে বাড়ি ফিরছি আসলে এই সময়ে আমি কোনোদিনই বাড়ি ফিরি না আজ একটা নিমন্ত্রন আছে রাতে তাই আজ একটু আগে বেরিয়েছি বাড়ি ফিরে আবার বেরোতে হবে

উফফ্ কি জ্বালা ! এই দুঃসহ গরমে আমার রাতের বেলা নেমন্তন্ন কোনো মানে হয় ?

এমনিই কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না তার ওপর আবার... হঠাৎ মনে পড়ে গেল সেই গপ্পো

বাচ্চুদার সিন্নী খাওয়ার গপ্পো সরাসরি নয় একটু প্যাসিভ মানে পরোক্ষভাবে

খুলেই বলি এবারে 

বাচ্চুদার তখন খুব সম্ভবতঃ কালাশৌচ পর্ব চলছে ওনার মা মারা গেছেন কিছুদিন আগে সেই কারনে নেমন্তন্ন বাড়িতে খাওয়াদাওয়ার একটু বাধা তখন তা এরই মধ্যে বাচ্চুদার পাড়ায় আর একটি নিমন্ত্রনের আমন্ত্রন না গিয়েও উপায় নেই খুবই আন্তরিক সম্পর্কের কারণে যাই হোক অবশেষে সন্ধ্যেবেলায় বাচ্চুদা নেমন্তন্ন রক্ষা করতে পৌঁছলেন সেখানে

যেতেই দেখা হলো সে বাড়ির গিন্নিমার সাথে তিনি জানতেন যে বাচ্চুদা এই অবস্থায় আর সবায়ের সাথে একসাথে বসে খাবেন না তাই তিনি সামান্য কুশল বিনিময়ের পরে বাচ্চুদাকে একটু মিষ্টিমুখ করাতে নিয়ে গিয়ে বসালেন দোতলায় যাবার সিঁড়ির পাশেই পাশেই রান্নাঘর সামনেই একটা টেবিলে রান্নার সব জোগাড়ের জিনিষ একটু আধো অন্ধকারের মধ্যেই গিন্নিমা বলে গেলেন এক জনকে বাচ্চুদাকে একটা প্লেটে কিছু মিষ্টি দিতে গামছা পড়া সেই ব্যাক্তিটি একটা কাঁচের প্লেট জোগাড় করে ওই টেবিলের ওপরেই রাখা মিষ্টির থেকে বাচ্চুদাকে বেশ কিছু মিষ্টি সাজিয়ে দিয়েই চলে গেলেন অন্য কাজে

ওই আবছা অন্ধকারেই বাচ্চুদা শুরু করে দিলেন মিষ্টি খাওয়া অনেকগুলো মিষ্টি গোল, চৌকো, তিনকোনা কত রকম সাইজ তাদের কোনোটা রসে চোবানো, কোনোটা বা খটখটে শুকনো আবার কিছু অন্য ধরনের মিষ্টি এর মধ্যেই দু এক জন এসে বাচ্চুদার সাথে কথা বলে যাচ্ছেন সেই মুহূর্তে খাওয়া থামিয়ে একটু কথা তিনি অন্তর্হিত হলেই আবার একটা মিষ্টি এই ভাবেই চলছিল গোল বাধলো একদম শেষ মিষ্টিটায় !

বাচ্চুদার চোখে তখনছানিকাটাচশমা সেই আগেকার দিনের কাঁচের গ্লাসের তলা বাচ্চুদা সব দেখেন কিন্তু আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় কার দিকে তাকিয়ে আছেন জ্বালা কি কম !

আধো আঁধারে ভেবেছিলেন নরম পাকের গোল সন্দেশ একটু যেন লালচে ভাব হয়তো নলেন গুড়ের রসে তৈরী বেশ আয়েশ করে অত বড় গোল সন্দেশে কামড় দিলেন বাচ্চুদা আদ্ধেক মুখে আর বাকি আদ্ধেক হাতেই ধরা বেশ নরম তো ! আরে কেমন যেন নোনতা নোনতা স্বাদ সন্দেশটার !! আর মুখেও কেমন যেন জড়িয়ে যাচ্ছে আধখানা সন্দেশটা !!!

এটা কি নতুন ধরনের কোনো নোন্তা সন্দেশ ? বাচ্চুদার মনে আঁকিবুঁকি গলা দিয়ে যেন নামতে চাইছেই না সন্দেশ বাকি আদ্ধেক আবার হাতে ধরা

ঠিক এই ব্রাম্ভমুহূর্তেই গিন্নিমার আবির্ভাব আবির্ভাব তো নয়, যেন বাচ্চুদার মনের ইচ্ছাপূরণের উদ্ধারকর্ত্রী

আরে দিদি, আমাদের এখানে কি এখন নোন্তা সন্ধেশ তৈরী হচ্ছে নাকি ? কোন মিষ্টির দোকানের একটু বলবেন ?

নোন্তা সন্দেশ ?  সে আবার কি ?? কই দেখি !

বাচ্চুদার ডান হাতের সন্দেশ তখন গিন্নিমার চোখের কাছে আর একটু হলেই ঠেকে যায় আর কি, গিন্নিমার নাকে

আরে, একি !!! এটা খেয়ে ফেলেছেন আদ্ধেকটা ???

কেন দিদি ?

আরে এটা তো কচুরীর লেচি উফফ্‌, সব জিনিস এক জায়গায় রেখে কি অবস্থা করেছে যে এরা সরি দাদা, এটা ফেলে দিন এক্ষুনি কি যে করি !!!

বাকি আদ্ধেক সন্দেশ তখন বাচ্চুদার হাত গলে নিচে অগত্যা মিষ্টি মিষ্টি হাসিমুখে গিন্নিমাকে বিদায় জানিয়ে রাস্তায় কিন্তু মনের মধ্যে তুমুল খচ্খচানির ঝড় ওই অত বড় আদ্ধেক লেচি পেটে গিয়ে কি যে করবে এই ভাবনাতে তখন বাচ্চুদার মনে তুমুল তোলপাড় তখন মোবাইল ও আসে নি কি করা যায় !  বাড়ি ফিরে বৌকে বললে, বকুনি খাবার চূড়ান্ত সম্ভাবনা প্রায় সব আশা ছেড়ে অবশেষে বাড়ি পৌঁছলেন বাচ্চুদা

বাড়িতে ঢুকেও মন উশ্খুশ্ কি যে হবে ? মনে হলো তলপেটটা কেমন যেন করছে মুখ চোখ থমথমে কি করা যায় ?  তখন মনে পড়লো রমনীদার কথা সব বিপদের রক্ষাকর্তা সেই যিনি আগের গল্পের গোলপোষ্টের পেছন থেকে পঞ্চুদাকে সাপোর্ট করছিলেন সারা খেলা জুড়ে আমাদের অফিসের একজন বিচক্ষণ মানুষ

হ্যালো ! রমনীদা

কি হলো রে বাচ্চু এখন ফোন ? কি ব্যাপার কি ?

আরে রমনীদা, একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে

উফফ, আবার কি করেছিস ?

জানেন দাদা ! একটা নেমন্তন্ন বাড়ি গিয়ে না, মিষ্টির সাথে একটা কচুরীর লেচি খেয়ে ফেলেছি কি করা যায় বলুন না আমার না খুব অস্বস্তি হচ্ছে ............ কি হল কি ? বলুন না...

……এই ব্যাপার কিচ্ছু চিন্তা করিস না এক গেলাস জল খেয়ে নে জল পেটে গেলেই ওই লেচি দেখবি সিন্নি হয়ে যাবে যা তাড়াতাড়ি জল খা এক গেলাস্

বাচ্চুদা ঢক্ধক্করে এক নয়, দু দু-গ্লাস জল খেয়ে নেয় দ্রুত বৌদি একটু সন্দেহের চোখে তাকিয়ে দেখে বাচ্চুদাকে...


##


©গৌতমদত্ত
২০শে এপ্রিল, ২০১৬