নাগরা -
ঘটনাটা আমার এক দাদা’র।
আমার প্রথম অফিস
যেটা ছিল,সেটা বার্ড কোম্পানীর প্রাক্তন ইন্স্যুরেন্স সেকশন। ড্যালহাউসি এলাকার একটি
প্রাচীন স্থাপত্যের বাড়ি,নাম "চার্টাড ব্যাঙ্ক বিল্ডিং"। এই বাড়িতেই প্রথম
চাকরী শুরু করেছিলেন এখনকার এক কিংবদন্তী অভিনেতা শ্রী অমিতাভ বচ্চন। সুপ্রাচীন এই
বার্ড কোম্পানীর ছিল অনেক রকম ব্যবসা। তাই এ বাড়িতে তাদের অজস্র অফিস আমি দেখেছি তখন।
গমগমে একটা রেশ ছিল। আমি দেখেছি,এ বাড়িতে বিখ্যাত ফুটবলার ধনরাজ’দাকে। সাত্তার’দার সাথে তো পরিচয় হয়েইছিল আমাদের
ডিপার্টমেন্টে ওনার শালার কাছে রোজ আসার সূত্রে। আমার টেবিলের পেছনেই ছিল খান’দার সিট। রোজ অন্তত এক ঘন্টা
গল্প করে যেতেনই ওই মুখচোরা ভয়ংকর ফুটবলারটি। আর বার্ড কোম্পানীর ক্যান্টিনে অনেক দিনই
দেখেছি ভেঙ্কটেশ'দাকে চুপচাপ বসে থাকতে। ক্রমশ: পতনোন্মুখ,এই বার্ড কোম্পনীর শেষ দিনগুলোর
কথা এখনো চোখের ওপর ভাসে আমার। এককালের রমরমার দিন গুলোর গপ্পো শুনেছি আমাদের অগ্রজ
কলীগদের কাছে। সে সময় বার্ড,রেশন অব্দি সাপ্লাই দিত সব কর্মচারীদের। শুনেছি বিগত দিনের
সেই সুঘ্রানী ঘি এর কথা।
আমি চাকরীতে ঢুকেছিলাম
১৯৭৮ এ। তার আগেই ন্যাশানাল ইন্স্যুরেন্স জাতীয়করন হয়েছিল ১৯৭২ এর ২২শে নভেম্বর। তবু
তখনো দুবেলা বিনিপয়সার চা আসতো বার্ড কোম্পানির থেকে ‘তপনে’র
কেটলি’তে। তাই “ঘি” এর গন্ধ না পেলেও “চা”
এর গন্ধ পেয়েছি আমি।
তা, আমার সেই দাদাটি’রও বার্ডে প্রবেশ ঘটেছিল ফুটবলার
হবার সূত্রেই। অত্যন্ত আড্ডাবাজ এই সব দাদারা আমাদের চাকরীর প্রথম জীবন ভরিয়ে দিয়েছেন
অকৃপন সাহচর্যে। এখনো মাঝেসাঝে ফোনালাপে ঝালিয়ে নিই তাঁদের সেই সব বিখ্যাত স্মৃতিগুলি।
কি ভালই যে লাগে এখনো। মনে হয় টাইম মেসিনে করে পৌঁছে গেছি সেই ১৯৭৮ এ। সারাদিনের প্রচন্ড
কাজের চাপের মধ্যে এঁরা ছিলেন আমার মরুভুমির তৃষ্ণার জল। টিভি সিরিয়ালের এ্যাড ব্রেকের
মত আমার প্রাণের রিলিফ!
তেমনই এক স্মৃতি
ঝালালাম গতকাল। “দাদার স্মৃতি”টা আমার বচনেই বলছি।
সময়টা ১৯৭০ এর আশেপাশে।
শ্যামবাজার এত ভাড়া বাড়ি থেকে খাওয়াদাওয়া সেরে বেরিয়েই শ্যামবাজার ট্রাম ডিপো। ছ নম্বর
ট্রাম দাঁড়িয়েই থাকতো তখন। গন্তব্য ড্যালহাউসির "চার্টাড ব্যাঙ্ক বিল্ডিং"।
প্রায়ই দশটা বেজে যেত ট্রাম ধরতে। অফিস পৌঁছেই রোজকার বড়বাবুর খোঁচাটা সহ্য হয়েই গেছিল।
সাড়ে দশ থেকে পৌনে এগারোটায় পা পড়ত অফিসের সেই সেগুনী গেটে। তারপর সেই রোজের রুটিন।
এক পেট ভাত খেয়ে
ট্রামে বসতাম ফার্স্ট ক্লাসের ডান দিকের জানলার ধারে। মাথার ওপর সেই বড় পাখার হাওয়ায়,অচিরেই
তন্দ্রা এসে,জড়াতো দুচোখে। ঘট ঘট চাকার আওয়াজ, ট্যাং ট্যাং ট্রামের হর্ণ এসব ছিল তন্দ্রা'র
চাট্ যেন। শুরু হোতো ঢুলুনি’র
আমেজ। পাশের লোকের মাথায় মাথাও যেতো ঠেকে আচম্বিতে। এভাবেই আমাদের দৈনন্দিন সংগ্রাম
চলছিলো। জোট বেঁধে তৈরি হচ্ছিলাম মুক্তির আশায়।
তন্দ্রা’র সাময়িক মুক্তি ঘটত কলেজ স্ট্রীট
“বাটা”’র একটু আগে থেকেই। এই ধরুন,লাহা
বাড়ির কাছ থেকে। “বাটা”'র সামনের রাস্তাটা চিরটাকালই
ব্যস্ত থাকত ঠেলা,রিক্সার দাপটে। আর আমাদের ট্রামের ড্রাইভার সাহেবের,সকালের গিন্নির
কাছে খাওয়া গঞ্জনার শোধ উপচে পড়ত ওই ট্যাং ট্যাং ঘন্টির পায়ের সুইচে। ওই বিরামহীন ঘন্টাধ্বনিতে
রোজই একবার সোজা হয়ে বসে আধবোঁজা চোখে দেখতে চেস্টা করতাম উল্টোদিকে,কলেজ স্ট্রীট মার্কেটের
দোকানগুলোকে। আর শালা,ওই ট্রামের জানলার কাঁচের ফ্রেমের মাঝে,কাঠের বিটখানা ওপরে বা
নীচে চোখ সেট করতে করতেই,অপরিস্কার কাঁচের মধ্যে দিয়ে দেখতাম "নাগরা" আর
কোলাপুরি জুতোর একমাত্র দোকান "ভবী চরণ দাস এ্যান্ড সন্স"।
এমন করে রোজই দেখতে
দেখতে একদিন আবিস্কার করে ফেললাম নিউটনের মত আমার চতুর্থ সূত্র। ট্রামের জানলা দিয়ে
ভবী চরণ দাসের সেই দোকানের ভেতর মস্ত হাঁড়িওয়ালা ডিসি ফ্যানটার দিকে কেন জানি না চোখ
পড়ে গেল। প্রথম দেখাতেই মনে হয়েছিল যে পাখাটা উল্টোদিকে ঘুরছে। তারপরের দিন থেকে আমায়
নেশার মতো টানতে লাগল ওই পাখাটা। অন্তত: দিন পনেরো ধরে দেখার পর,আমি নিশ্চিন্ত হলাম
যে,সত্যি সত্যিই ডিসি পাখাটা উলটো দিকেই ঘুরে চলেছে।
তারপর ভুলেই গেছিলাম
!!!
হঠাৎ শখ হলো নাগরা
জুতো কেনার। অফিস ফেরতা সোজা ভবী চরণ দাস। ভাল করে পছন্দ করে একটু দামটা কমাতে বললাম
মালিকটিকে। কমাবে না কিছুতেই। এক দরের নাকি দোকানদার !
অবশেষে ব্রম্ভ্রাস্ত্র
ছাড়তেই হল। যদি কিছু ছাড় পাওয়া যায় ! বললাম,দাদা জানেন আপনি, কতদিন ধরে আপনার দোকানটাকে
দুবেলা দেখি। এত নামী দোকান আপনার ! কিন্তু,চিঁড়ে আর ভেজেই না। আর থাকতে না পেরে বলেই
দিলাম !
- জানেন আপনি ?আপনার মাথার ওপরে যে পাখাটার হাওয়া সর্বক্ষণ খাচ্ছেন সেটা
উল্টোদিকে ঘুরছে ?
চমকে গেলেন যেন।
বললেন,সে আবার কি করে হয় ?এত বছর হাওয়া খাচ্ছি,কিছুই তো হয় নি।
- তা হয় নি। কিন্তু হতে কতক্ষণ !
- “মধু”, “মধু”
এই “হতভাগা মধু”। কোথায় তুই ?
একটা বাচ্চা ছুটেই
এলো। আশপাশেই ছিল মনে হয়।
- এই দেখতো, আমাদের পাখাটা নাকি উল্টোদিকে ঘুরছে।
বুদ্ধিমান চেলা
! মনে হল পাশের দোকানগুলোয় সার্ভে করতে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে পাখাটার দিকে একদৃষ্টিতে
তাকিয়ে থেকেই বলে উঠলো –
- হ্যাঁগো দাদাবাবু, এ যে উল্টোদিকেই ঘুরতেছে
গো !
- এ্যাঁ। বলিস কি !
- দেখলেন। ঠিক বলেছি কিনা। কত লক্ষ্য রাখি বলুন
আপনার দোকানের, আর
আপনি একটুও আমায় দেখছেন না। একটু কমান না দামটা....
- আচ্ছা বেশ বেশ, এক
টাকা কমই দিন না হয়।
আনন্দে উল্লাসে, নাগরার
বাক্স বগল দাবা করেই আবার পাঁচ নম্বর ট্রামে।
#
©গৌতমদত্ত
২৩শে মার্চ,২০১৬
দোলপূর্ণিমা
