টিফিনে দুধ -
অনেক দিন আগেকার
কথা। ১৯৬০ সাল। স্মৃতি হাতড়ালে
অনেক কথাই মনে পড়ে যায়.........।
উত্তর কলকাতায়
আমাদের পৈত্রিক বাড়ী। ভরা সংসার
আমাদের। যৌথ পরিবার। একটু বেশীই আদরের ছিলাম আমি। ঠাকুর্দারা তিন ভাই তখন আলাদা কিন্তু এক বাড়িতেই আলাদা আলাদা
পার্টিশন। সুতরাং সবার ঘরেই আমার অবাধ গতি। তিন ঠাকুর্দা,তিন ঠাকুমা। কত লোকজন। আমার ঠাকুর্দা বড়। সেহেতু আমার
ঠাকুমা ছিলেন কারোর মা,কারোর জেঠিমা। সবাইকে নিয়ে গমগমে থাকতো আমাদের বাড়ীটা। কত খেলার সাথী। এছাড়াও ছিল
পাড়ার সবাই। গোটা পাড়াটাই যেন এক যৌথ পরিবার। এ কালের ছেলেমেয়েদের জন্য খুব কষ্ট হয়। বেচারিরা বুঝতেই পারলো না আদর কাকে বলে !
বাড়ীর অনতিদূরেই
স্কুল। বাবা-কাকাদের ঐ স্কুলেই পড়াশোনা। অনেক প্রাচীন
স্কুল। “কেশব একাডেমী”। তখনো ইংরেজী
মিডিয়ামের রমরমা তো দূরস্থান ওসব কথা কেউ ভাবতো বলে মনে পড়ে না। ওটা ছিল ব্রাম্ভ সমাজের স্কুল। যার জন্য সরস্বতী পূজো হোতো পাশের একটা মন্দিরে। স্কুলের টিফিনে রোজ খেতে দেবার ব্যাবস্থা ছিল। পুরী-তরকারীই থাকতো বেশীর ভাগ দিন। টিফিনের ঘন্টা পড়ার একটু আগে দুজন এসে আমাদের ডান হাতে দিত একটা
পুরী আর তার ওপর তরকারী। গরম গরম। খাওয়ার পরে টিফিনের ঘন্টা পড়তো আর এক ছুটে চলে যেতাম কলের কাছে
হাত ধুতে। তারপর শুরু হোতো স্কুলের উঠোনে “লেম ম্যান” খেলা। এক পা ভাঁজ করে লাফিয়ে লাফিয়ে কাকেও ছঁতে হবে। দুটো দল থাকতো। পরে আর কোথাও
এই খেলাটা দেখতে পাই নি।
তো যা বলছিলাম। চার বছর বয়সে বাবা ভর্তি করে স্কুলের ক্লাশে বসিয়ে দিয়ে এলেন
একদিন। মর্ণিং স্কুল। কি কস্টই না হোতো ভোরবেলা রেডী হতে। শীতকাল হলে তো আর কথাই নেই। এই কস্টটা তখন যত না বুঝেছিলাম,তার চেয়ে বেশী বুঝেছিলাম যখন নিজের ছেলেকে ভোরবেলায়
ঘুম থেকে তুলে স্কুল দিয়ে আসতে হোতো। ওর করুন চাহনি
যেন আমার ছোটবেলার কথা স্মরণ করাতো প্রতি পদে পদে।
সকালে কি খেয়ে
স্কুলে যেতাম সে আর মনে পড়ে না। বাবা কাঁধে
চাপিয়ে নিয়ে যেতেন এটুকু ঝাপসা স্মৃতিতে খেলা করে। আর মনে ভাসে, পাইপ দিয়ে রাস্তা ধোওয়া। আমাদের বাড়ী
ছিল একটা গলির মধ্যে। সেটা ধোওয়া
হোতো না। কিন্তু স্কুলের রাস্তা “রামদুলাল সরকার স্ট্রীট”কে রোজ ধুতে দেখতাম। বড় বড় হোস
পাইপে করে জল ছিটিয়ে রাস্তা ধোওয়া। কখনো সখনো
সেই মোটা জলের ধারার তলা দিয়ে যাওয়া!
কোথায় হারিয়ে
গেল সেই স্বচ্ছ অভিযান !!
আমাদের বাড়ীতে
এক ভৃত্য ছিল,নাম ছিল গদা। খুব সম্ভবত উড়িষ্যার ছেলে। তখন তার বয়স বোধহয় ১৫/১৬ হবে। আদরের নাতির
স্বাস্থ্য উদ্ধারের ঠাকুর্দা-ঠাকুমার ছিল তীক্ষ্ণ নজর। তাই রোজই গদা
টিফিনের সময় স্কুলে যেত দুটো বিস্কুট আর এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে। সময় কোথায় তখন এই নাতির ?খেলা শুরু হয়ে যাবে যে। তাই কোনোরকমে
বিস্কুট দুটো ওর হাত থেকে নিয়ে নিতাম আর দুধটা বলতাম ওকে খেয়ে নিতে।
এইভাবে বোধহয়
মাস ছয়েক চলেছিল। হঠাৎ একদিন
স্কুল থেকে ফিরতেই মায়ের জেরা।
তোকে যে দুধ
পাঠানো হয় সেটা কি খাস না ?
কি বলি ?পাশে গদা দাঁড়িয়ে। আনত দৃষ্টি। ঠাকুমা সামনে
এসে দাঁড়ালেন আমায় উদ্ধার করতে।
দাদুভাই ! তুমি এতদিন কিছু বলনি কেন ?
কি বলব তখন। দুধ খেতে যে ভাল লাগে না। তার ওপর টিফিনের আগে ?সময় কোথায় ? চুপ করে রইলাম।
পরে ঠাকুমাকে
একলা পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমি যে দুধ
খাই না তা মা জানলো কি করে ?
তাতে যা শুনলাম
আমি তো অবাক। তখন কি মনে হয়েছিলো জানি না তবে এখন মনে হয় মা বেশ
ভালই গোয়েন্দাগিরি করেছিলেন সেদিন। কারণ তখন আমার
চার বছর বয়সে গোয়েন্দা শব্দটাই শুনিনি।
স্কুল থেকে
ফেরার পর গদা সেদিন মায়ের সামনা সামনি পড়ে গেছিল। মা’র চোখ পড়েছিল গদার দুই ঠোঁটে। ঠোটের ওপরে আর নিচে সাদা একটা দাগ। ওকে জিজ্ঞেস করতেই হাত দিয়ে মোছে গদা দাগদুটো। মার সন্দেহ আরো বাড়ে তাতে। চেপে ধরে গদা’কে।
তারপর আর কি ! সেদিন গদা দুধটা খেয়ে ঠোঁট দুটো মুছতে ভুলে
গেছিল !!
##
০৪-১২-২০১৪
