গোওওল -

        শুধু দেখলে হবে ? খরচা আছে !!!

বড়রাস্তা দিয়ে ছুটে চলা, লরী বা বাসের পেছনে এই ওপরের লেখাটা প্রায়ই চোখে পড়ে আমাদের নিত্যদিনের জীবনে কথাটা কিন্তু বেশ ভাবায় আমাদের অফিসে এক প্রাক্তন কলীগ্মাঝে মাঝেই হু-হুঙ্কার ছাড়তেন ! “বী এ ম্যান, নট এ ম্যান্হোল কথাটা কিন্তু খুব খাঁটি ছিল এই সব লরী বা বাসের গায়ে যাঁরা এই সব মহান বাণী লেখেন তাঁরা যে খুব শিক্ষিত বলা চলে না, কিন্তু জীবনের থেকে পাওয়া এদের এমন কিছু শিক্ষা, জীবনই শিখিয়েছে এঁদের - যা তাঁরা ফুটিয়ে তোলেন তাঁদের শিল্পকর্মে ; তাঁদের আঁকা চিত্রে আর এই এক বা দু-লাইনের ছোট্ট বাক্যে !

মহারানীর এই কলকাতা শহরে কয়েকখানি পাইকারি বাজার আছে বিভিন্ন জায়গায় এদের মধ্যে সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজারটির নামবড়বাজার এছাড়া আছে শেয়ালদাকোলে মার্কেট নতুন বাজারেআখ পট্টিইত্যাদি ইত্যাদি তা এই বড়বাজারে, আরশোলা থেকে হাতি, সব কিছুই নাকি পাইকারি রেটে পাওয়া যায় এর মধ্যেই আছে ফলপট্টি যেখানে সারা পূর্বাঞ্চলের জন্য ফল এসে জমা হয়,আর তারপর সেখান থেকে নীলাম হয়ে ছড়িয়ে যায় আমাদের সারা পূর্ব-ভারতে আনারস, কমলালেবু, তরমুজ, কলা এমন কিছু ফল লরী বোঝাই করে আসে আর দামী ফলেরা আসেন বাক্স বোঝাই হয়ে তা এই আনারস বা তরমুজের, এমন কি কমলালেবুও যখন লরী থেকে নীচে নামানো হয় (আনলোড্‌) সে এক দেখবার বস্তু আবার কিছুক্ষণ পরেই অন্য একটা লরীতে আবার এগুলোকেই তোলা হয় (যাকে বলে লোড্করা) বিভিন্ন জায়গায় পাঠানোর জন্য আপনি যদি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেনআনলোডএবংলোডতাহলে মনে হবে সিনেমার কিছু দৃশ্যকেই আপনি আবার রিভার্স প্রসেসে দেখছেন সে এক দারুণ ব্যাপার কিন্তু ! ধরুন লরী থেকে তরমুজ নামানো হচ্ছে, তখন লরীর ওপর থাকে দুজন আর নীচে দুই বা তিনজন একজন লরীর ওপরেই একেবারে ধারে থাকে প্রথম-জন তরমুজ একটা একটা করে নিয়ে ছুঁড়ে দেয় ঐ ধারে থাকা ব্যক্তিটির হাতে এবং সে প্রায় টাচ্করেই পাশ করে দেয় নীচের প্রথম জনকে তারপরে তার হাত থেকে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় জনের হাত ঘুরে তরমুজগুলো এক জায়গায় জড়ো হতে থাকে মানে যদি রিলে করে বলা হয় সেই কমলদার ভাষায়,তাহলে ব্যাপারটা খানিকটা হয়ত এমনই হবে

– “প্রথমজনে তরমুজ তুলেছেন এবং তুলেই বেশ জাপানী কায়দায় ছুঁড়ে দিলেন তরমুজ ওই এক্স্ট্রা কভারে দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় জনের হাতে তরমুজ ঘুরেই চলেছে, অবশ্য এটা গোল তরমুজ বলেলম্বা তরমুজ গুলো হলে একটু সামান্য পিচ ভাঙতোই হাওয়ায়, কি বলো অজয়? দ্বিতীয়-জনের হাত থেকে তরমুজ ঘুরে নীচে স্লীপে দাঁড়িয়ে থাকা তৃতীয়-জনের হাতে, তিনি পাশ করলেন চতুর্থ-জনকে আস্তে করে তরমুজ গড়িয়ে চলে গেল গালি অঞ্চলে যেখানে ডাঁই করে রাখা হচ্ছে সব তরমুজ 

এবারে আবার যখন লোড হচ্ছে নতুন এক লরিতে...তখন...

– “ফিল্ডিং টা এমন ভাবে সাজানো হয়েছে যে মনে হচ্ছে একটা তরমুজ-ও বাইরে বেরিয়ে যাবে না অজয়, তুমি দেখেছো ; কি সুন্দর করে এরা জায়গা নিয়ে নিয়েছে স্লীপে তিনজন, আর কভারএক্স্ট্রা কভারে দু-জন দাঁড়িয়ে আছে লরির ওপরে প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় জনের হাত ঘুরে তরমুজ পৌঁছল ঐ কভারে দাঁড়িয়ে থাকা চতুর্থ-জনের হাতে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন নিচের তিন জনের দিকে তাকিয়ে তার পেছনে রয়েছে পঞ্চম-জন চতুর্থ-জন কোনো দিকে না তাকিয়েই তরমুজ ছুঁড়ে দিলেন পেছনে থাকা পঞ্চম-জনকে কি নিপুণ কায়দা ! না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না ! সামনে থেকে ছুটে আসা তরমুজকে দু-হাতে নিয়েই পেছনে ছুঁড়ে দেওয়া পঞ্চম-জনের হাতে এযে অবিশ্বাস্য ! অজয়, তুমি কি বলো ?”

– “হ্যাঁ কমলদা,আপনি ঠিকই বলেছেন এই সুন্দর সকালে এতো আবর্জনাপূর্ণ বড়বাজারের এই ফলপট্টিতে কি নিপুন কায়দায় থ্রো করছেন চতুর্থ-জন তা সত্যিই দেখার মতো এত ভালো ফিটনেস যা না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না কমলদা...”

– “আর ওই পঞ্চম-জনের কথাও তুমি বলো একটু সামনের ফিল্ডার তরমুজ পাস করে দিচ্ছেন পেছন দিকে না তাকিয়ে একেবারে ঠিক জায়গায়,আর ওই পঞ্চম-জন ঠিক সময় বুঝে তরমুজগুলো ধরে সাজিয়ে রাখছেন এ কি কম কথা !”

ব্যাপারটা এমনই দাঁড়াতো, যদি ধারাবিবরণী দেওয়া যেত এই ফলপট্টির তরমুজের আনলোডিং আর লোডিং

*

এই প্রসঙ্গে একটা শোনা ঘটনাও হঠাৎ করে মনে পড়ে গেলো লিখতে লিখতে

ঊনিশশো সাতাত্তর বা আটাত্তর সাল হবে সম্ভবতঃ কলকাতায় সন্তোষ ট্রফির ফাইনাল খেলা মোহনবাগান মাঠে সে এক দারুন পরিবেশ মোহনবাগান মাঠ-এর চারদিকে কতো রঙের রঙিন পতাকা পত্পত্করে উড়ছে খেলা শুরুর আগে সানাই এর সুর ভেসে বেড়াচ্ছে অনেকক্ষণ থেকেই বাঙলা ভার্সেস পাঞ্জাবের ফাইনাল ম্যাচ্বলে কথা আবেগে ভাসছে কলকাতা শহর পুলিশ, মাউন্টেড পুলিশেরা পজিশন নিতে শুরু করেছে দুপুরের অনেক আগে থেকেই একটা দারুন পরিবেশ তৈরী হয়েছে গোটা মোহনবাগান মাঠ সন্নিহিত অঞ্চলএ

হঠাৎ পাঞ্জাব দলের চার-পাঁচ জন কাঁচুমাচু মুখে এসে হাজির উদ্যোক্তাদের ঘরে ঘরে তখন বেশ ভীড় আই.এফ.র কর্মকর্তাদের খেলা শুরুর তখনও আড়াই ঘন্টা মতো দেরী আছে উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন এনাদের দেখেই এগিয়ে এলেন ব্যাপারটা জানার জন্য পাঞ্জাব দলের মধ্যেকার একজনের সাথে উদ্যোক্তাদের একজনের কানে কানে কি একটা কথা হ আর তারপরই দেখা গেল আই.এফ.র সেই ভদ্রলোকেরও হাসি-হাসি মুখখানা বেজায় গম্ভীর আকার ধারণ করলো

ব্যাপারটা কি ? গোপন সূত্রে জানা গেল যে, পাঞ্জাবের সেই সাড়ে-ছ ফুট রোগা, লম্বা গোলকীপার-টিকে পাওয়া যাচ্ছে না সকাল থেকে এবারের সন্তোষ ট্রফির সেই বিখ্যাত ঝলমন্সিং তাদের একেবারে ডুবিয়ে কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে ! পাঞ্জাব দলের উদ্যোক্তারা সকাল থেকে সারা শহর চষে খুঁজেছেন ঝল্মন্সিং-কে কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে না সেবারের সন্তোষ ট্রফিতে ঝল্মন্সিং প্রায় একাই টেনে তুলে ছিল পাঞ্জাব দলকে ফাইনালে তার ওই লম্বা চেহারায়, প্রায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বার-পোস্ট অব্দি হাত পৌঁছনো সেই ঝল্মন্সিং বেপাত্তা ! ভাবা যায় ! 

কর্মকর্তাদের মুখে সবটা শুনলেন আই.এফ.র লিয়াঁজো ম্যানেজার কি করা যায় ! আবার তিন চারটে দলে ভাগ হয়ে ঝল্মন্সিং-কে খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল বেশ কটা এ্যাম্বাস্যাডার হঠাৎ একটা দলের একজন দেখতে পেলেন কোলে মার্কেটের কাছে একটা লরীতে সেই তরমুজ লোড হচ্ছে আর আমার বলা সেই চতুর্থ-জন, একজন রোগা, লম্বা পাঞ্জাবী, যিনি লরির ধারে দাঁড়িয়ে তরমুজগুলো একটা একটা করে গ্রিপ্করে পেছন দিকে দিয়ে দিচ্ছেন গ্রিপ্করছেন আর পেছন দিকে দিয়ে দিচ্ছেন তখন আই.এফ.-এর কর্মকর্তারা ঠিক করে নিলেন যে এই লোকটিকেই ধরতে হবে ঝল্মন্সিং-এর প্রক্সি দেওয়ার জন্যে এবারে গিয়ে তাকে লরি থেকে নামিয়ে বলা হল যে চলুন এক্ষুনি আমাদের সাথে তিনি বললেন, যে কোথায় যাবো ? আমার লোডিং প্রায় শেষ হয়ে এসেছে এবার লরি বেরোবে তা কে শোনে কার কথা জোর করে তাকে ধরে আনা হোলো মোহনবাগান মাঠে তারপরে পাঞ্জাবের ক্যাম্পে এনে তাঁকে বোঝানো হল ব্যাপারটা আর বলে দেওয়া হলে তাঁর কি কি করণীয় চারদিকে এতো কর্মকর্তাদের দেখে সে বেচারা আর কি করে !

*

গ্যালারী আস্তে আস্তে ভরে উঠতে লাগলো সে এক দারুন অপার্থিব দৃশ্য মনোরম আবহাওয়া মিঠে সানাই-এ বাজছে বিস্মিল্লাহ্খানের ফুঁ-এর যাদু, সারা মাঠ জুড়ে তখনও ইডেন গার্ডেন্স-এর ঐ উঁচু গ্যালারি তৈরিই হয় নি মোহনবাগানের দর্শক গ্যালারি তখনও কাঠের ! সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ সূর্য আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে গঙ্গার দিকে খেলা শুরু হ পাঞ্জাবের গোলকিপার সেই প্রক্সি তরমুজ থ্রোয়িং-এর চতুর্থ
জন !

বেতারে ধারাবিবরণী শুরু করেছেন অজয় বসু চলছে ধারাবিবরণী সাথে পুস্পেন সরকারের স্টাটিস্টিকস অজয় বসু কিছুক্ষণ পরেই আবার বলতে শুরু করলেন...

সুরজিৎ বল ধরেছেন বল ধরে রাইট আউট দিয়ে এগোচ্ছেন ঢুকছেন ভেতরে কাট করে দিয়েছেন গোলে মারলেন -অপূর্ব গোল ! কিন্তু এ-কি !!! অপূর্ব বল ধরেছেন ঝল্মন্সিং কিন্তু না ! বলটা ধরে ঝল্মন্সিং নিজের গোলের ভেতরে দিয়ে দিয়েছেন...!!!