মোহনবাগানী -

এই গপ্পোটা কিন্তু আরো পুরোনো দিনের মানে বাচ্চুদার আগের জেনারেশনের আমি অবশ্য চাকরীতে জয়েন করে এই সব মহাদাদাদের পেয়েছিলাম তেমনই এক দাদা ছিলেন রমনীদা

ব্যানার্জী ব্রাহ্মণ বাচ্চুদাদের সিনিয়র তাঁর সমসাময়িক আরো বেশ কিছু সিনিয়র দাদারা অফিস আলো করে রাখতেন কি কাজে, কি আড্ডায় এবং অবশ্যই সত্যিকারের দাদা ছিলেন এঁরা আমার তা সেই রমনীদার মুখে শোনা এই ঘটনা

টিটাগড় পেপার মিলস্এর নাম একটু পুরোনো মানুষজনেরা নিশ্চয়ই জানেন সেই দুইদিকে দুই হাতীর শুঁড় তোলা সিম্বলটা তখনকার কাগজের জগতে একটা খুব পরিচিত একটা ট্রেডমার্ক ছিল এই টিটাগড় পেপার মিলস্ছিল তদানীন্তন বার্ড কোম্পানীর অধিনস্থ পরে এটি পার্ক ষ্ট্রীটে ঊঠে যায়

তা এই টিটাগড় পেপার মিলস্ভার্সেস বার্ড কোম্পানি একাদশের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ সম্ভবতঃ এটাই ছিল শেষ খেলা সাত্তারদার কথা আগেই বলেছি সাত্তারদার চেষ্টায় এই ম্যাচটা হবে মোহনবাগান মাঠে এক শনিবারের বিকেল বেলায়

সবাই প্রস্তুত হয়ে তৈরী মোহনবাগান মাঠে সবুজ ঘাসে মোড়া মাঠ চারদিকে কাঠের গ্যালারী সে এক অভূতপূর্ব উত্তেজনা সারা অফিস ঝেঁটিয়ে এসেছে লোক মোহনবাগানের মেম্বার গ্যালারী কল-কাকলীতে পূর্ণ

বার্ড একাদশের গোলকিপার আমাদের ইন্স্যুরেন্স ডিপার্টমেন্টের পঞ্চুদা ফিটের ওপর লম্বা মেদবিহীন শরীর দারুন মানিয়েছে পঞ্চুদাকে রমনীদা আর পঞ্চুদার চিরকালীন একটা মিষ্টি অথচ রেষারেষি সম্পর্ক অবশ্যই সেটা অফিসের কাজের ক্ষেত্রে তখনকার দিনে বড় সাহেবের বড় কাছাকাছি ছিলেন পঞ্চুদা সেই সুবাদেই রমনীদার একটু মনক্ষুন্নতা

রমনীদা রইলেন ঠিক গোলপোষ্টের পেছনে কারনটা নাকি, পঞ্চুদাকে উৎসাহিত করার জন্যে গোলপোষ্টের পেছন দিক ছাড়া সারা মাঠে আর জায়গা পান নি রমনীদা পায়ে বাটার কালো বুট ঢলঢলে ফুলপ্যান্ট পায়ের ওপরে কিছুটা গোটানো গায়ে একটা পুরোনো রঙীন গেঞ্জী মাঠে এসে পড়ে নিয়েছেন পঞ্চুদার পরণে সে যুগের ওভারসিয়রদের বাদামী হাফ প্যান্ট গায়ে পুরো হাতা সাদা গেঞ্জী আর পায়ে কেডস্ তিড়িং বিড়িং করে লাফালাফি করে গোলপোস্টের এমাথা ওমাথা করে চলেছেন আর পেছনে মাইনাস পনেরো পাওয়ারের চশমা পড়া, কেশবিহীন রমনীদার উৎসাহের জোয়ার বিকেল নামছে ধীরে খেলা শুরু হল বলে

বার্ডের অখ্যাত বিখ্যাত ফুটবল প্লেয়াররা মাঠে উপস্থিত সাত্তারদার প্রবল উৎসাহ তাঁরই অফিসের সব প্লেয়াররা একযোগে মাঠে উপস্থিত তাই তিনিই আজকের প্রধান উদ্যোক্তা বার্ড কোম্পানীর তরফে

খেলা শুর হলো টিটাগড়ের প্লেয়াররা একেবারে প্রথম থেকেই আক্রমনে মিনিট দশেকের মধ্যেই তাদের প্রথম গোল পঞ্চুদা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন কি করে যেন, বলটা গোলপোষ্টের জালে আটকে গেল এর প্রায় পাঁচ মিনিট পরেই আবার গোল বলটা ধরতে পারলেন না পঞ্চুদা হাত ফস্কে ঢুকে গেল বল পেছনে রমনীদার চরম উৎসাহদান পঞ্চুদার মুখে বিরক্তির চিহ্ন

হাফ-টাইমের দশ মিনিট আগেই পাঁচ গোল খেল বার্ড একাদশ রমনীদা প্রায় হাঁফিয়ে গিয়ে এক কোনে দাঁড়িয়ে পঞ্চুদার লম্ফঝম্প থামে না কিছুতেই

দশ মিনিট বিরতির পর শুরু হলো দ্বিতীয়ার্দ্ধ এবারে পঞ্চুদা মেম্বার গ্যালারীর মানে ফোর্ট উইলিয়মের দিকের গোলপোষ্টে রমনীদা বসে পড়েছেন আর পারছেন না উৎসাহ যোগাতে

দুমিনিটের মাথায় আবার গোল দেওয়া শুরু টিটাগড় পেপার মিলের

 

এমন সময়ে হঠাৎ সবার চোখ গেল মেম্বার গ্যালারীর দিকে ততক্ষনে আট গোল খেয়ে গেছেন পঞ্চুদা সবার নজর তখন,  সাদা ট্রাউজার আর সাথে সাদা টিশার্ট পরিহিত এক প্রৌড় ভদ্রলোকের দিকে এক হাতে ওয়াকিং স্টীক আর এক হাতে সিগার নিয়ে খুব উত্তেজিত হয়ে কি যেন বলছেন তিনি খুব উত্তেজিত কিন্তু,  হৈ চৈ এর মাঝে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না কি হচ্ছে সেখানে আর কেনই বা অতো উত্তেজিত
তিনি !

ওনার ঐ রনচন্ডী মূর্তি দেখে পলকের জন্যে মোহনবাগান মাঠ নিস্তব্ধ তখন শোনা গেল উনি স্টীক দেখিয়ে উত্তেজিত অবস্থায় বলেই চলেছেন যে, গোলকিপার পঞ্চুদাকে মাঠের বাইরে বার  করে দিতে হবে কি ব্যাপার !

তারপরে বোঝা গেল মানুষটিকে তখনকার দিনে সিনেমা জগতের প্রসিদ্ধ অভিনেতা জহর গাঙ্গুলী মশাই

উনি মোহনবাগান ক্লাবের লাইফ মেম্বার শুধু নয় প্রায় নিয়ম করে প্রতিদিন চলে আসতেন মোহনবাগান মাঠে ভালবাসতেন ফুটবল আর খুব প্রিয় ছিল এই মোহনবাগান মাঠ সেদিন ক্লাবের কোনো খেলাই ছিল না, তবুও অভ্যাসবশতঃ চলে এসেছিলেন মাঠে আর তারপরেই এই সব কান্ড প্রায় ফেন্সিং ডিঙিয়ে স্টিক দিয়ে পঞ্চুদাকে মারতে যান আর কি !

মোহনবাগান মাঠে এক গোলকিপার এরি মধ্যে আট গোল খাচ্ছে, সেটা একেবারেই সহ্য হয় নি গাঙ্গুলীমশাই এর মেজাজী মানুষ কি জীবনে, কি সিনেমায় ! তাই এত উত্তেজনা !

অবশেষে বাকি সবাই বোঝাতে উনি একটু ঠান্ডা হলেন পঞ্চুদাকে শ্যেন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ফিরে চললেন ক্লাব হাউসে 

##


©গৌতম দত্ত
১০ই এপ্রিল, ২০১৬