বালতি -
আবার মনে পড়ল সেই রমণী’দার কথা !
যদিও গপ্পোটা
রমণী’দার মুখ থেকে শোনা কিন্তু গপ্পের নায়ক
রমণী’দার বড় দাদা। সময় টা ছিল ১৯৭৫ বা ১৯৭৬ এর আশেপাশে।
হাওড়ার যৌথ
সংসারের বড় দাদা ছিলেন খুবই পণ্ডিত মানুষ। সারা কলকাতার
লোক যাঁরা একটু পূজো-আচ্চা বা
জ্যোতিষবিদ্যা নিয়ে চর্চা করেন তারা সবাই চিনতেন এই বড় দাদাটিকে। আর হাওড়ার প্রাচীন পরিবার হওয়ার কারণে সবাই বেশ সমীহ ও করে চলতো
এই রাশভারী মানুষটিকে।
তা, সেই বড় দাদা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে বাড়ির চৌহদ্দি’র দেয়াল রং করিয়েছেন। রাস্তার ওপর
বেশ বড় দেয়ালটা ছিল আমাদের বিভিন্ন পার্টির মুখপত্রের মতো। তাই রঙ করানো হয়ে গেলে বড় দাদা রোজ খেয়াল রাখছেন ওই নতুন চূনকামিত
দেয়ালে। কেউ এসে কিছু লিখে দিয়ে গেলেই তো বারোটা বেজে যাবে
দেয়ালখানার ! অনেক খরচা
আর পরিশ্রম করে করা এই দেওয়াল এখন বড়দাদার নয়নমনি।
একদিন রাতে
খেতে বসে হঠাত বড়দা’র মনে হল
যে পাশেই যেন দুচার ছোঁড়ার গলা শোনা যাচ্ছে। খাওয়া রইল মাথায়। দ্রুত সদর
দরজা খুলে বাইরের রাস্তায় এসে দেখেন যে তিনটি ছেলে সবে রেডি হচ্ছে কাগজের পোষ্টার এই
নতুন দেয়ালে লাগাবে বলে। মইটা হেলান
দিয়ে রাখা আছে দেওয়ালে।
এই দেখেই চিল
চিৎকার। ‘এই ভজাআআআ---’ । বাকি দুটো
ছুটে পালালেও ভজা নামের ছেলেটি দৌড়তে পারেনি আঠার বালতি হাতে। খপাং করে ভজা’র হাতের বালতি’র হ্যান্ডেলখানা ধরে এক টান দিলেন বড়দা। আর মুখে চলছে প্রবল গালাগাল। ‘তোদের বারণ করেছি না যে আমার এই নতুন
দেয়ালে কিছু লিখবি না, কিছু মারবি না’। ভজা তখন পালাতে পারলে বাঁচে। সে তখন এক বাম-পার্টির পোষ্টার বয়। কি আর করে
বেচারী...। কোনক্রমে বালতির হ্যান্ডেল বড়দা’র হাতে ছেড়ে দিয়েই দে দৌড় !
বড়দা আঠার
বালতি হাতে গজ্গজ্
করতে করতে বাড়ির ভেতর ঢুকে সদর বন্ধ করলেন। আঠার বালতিখানা সামনের উঠোনটায় রেখে দিলেন। তারপর বাকি খাওয়া শেষ করে আবার একবার সদর খুলে বাইরে এসে উঁকি
মেরে দেখেন যে এবারে মইটাও হাওয়া। উফফ্, কি শয়তান সব, বলতে বলতে
আবার সদর বন্ধ করে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
পরের দিন সকালে
বৈঠকখানা ঘরে এসে বসেছেন। হাতে খবরের
কাগজ। এমন সময় বাইরে থেকে একটি ছেলের গলা শোনা গেল। ‘ও বড়দা, ও বড়দাআআ’
বলতে বলতে জগা’র প্রবেশ বড়দার বৈঠকখানায়।
— কি ব্যাপার
রে জগা ? সাত সকালে তুই ?
— বড়দা,
তুমি নাকি কাল ভজার হাত থেকে আঠার বালতি নিয়ে রেখে
দিয়েছো ?
— রেখেছি
তো ! শালা আমার নতুন রং করা দেয়ালে পোষ্টার মারতে এসেছিল। পইপই করে বারণ করেছি তোদের সবাইকেই। তবু শুনিস্ না তোরা। কি ভাবিস তোরা ? আমার পয়সা কি সস্তা ?
— সে ঠিক
আছে বড়দা। এবার ওই আঠার
বালতিটা আমায় দিয়ে দাও তুমি।
— মানে
? তুই তো গরু-বাছুরের চ্যালা ! তুই ওদের ওই আঠার বালতি নিয়ে কি করবি ? ও ভজাকেই আসতে বলিস। উত্তম মধ্যম দিয়ে তার পরে ওকে ফেরৎ দেব কি না দেব তা ভেবে দেখব।
— উফফ,
বড়দা ! তুমিও পারো। বয়স হচ্ছে তো না কি !
এই মাথা গরম করলে চলে ? বলো ? দাও, তুমি আমায় ওই বালতিটা ফেরৎ দাও !
— লালেদের বালতি তোকে ফেরৎ দেবো কেন
রে ?
— আঃ বড়দা। আঠার বালতিটা কমন গো !
ওটা সবারই, যার যখন লাগে গো।
##