বার্থডে কেক্‌ -

পূর্বে এমন দিন ছিল যখন ইংরেজি পাঠশালা হইতে আমাদের একেবারে ছুটি ছিল না বাড়ি আসিতাম,সেখানেও পাঠশালা পশ্চাৎ পশ্চাৎ চলিয়া আসিত বন্ধুকেও সম্ভাষণ করিতাম ইংরেজিতে, পিতাকেও পত্র লিখিতাম ইংরেজিতে, প্রাণের কথা বলিতাম ইংরেজি কাব্যে, দেশের লোককে সভায় আহ্বান করিতাম ইংরেজি বক্তৃতায় আজ যখন সেই পাঠশালা হইতে, একেবারে না হউক,ক্ষণে ক্ষণে ছুটি পাইয়া থাকি তখন সেই ছুটির সময়টাতে আনন্দ করিব কোথায়মাতার অন্তঃপুরে নহে কিদিনের পড়া তো শেষ হইল, তার পরে ক্রিকেট খেলাতেও নাহয় রণজিৎ হইয়া উঠিলাম তার পরে ? তার পরে গৃহবাতায়ন হইতে মাতার স্বহস্তজ্বালিত সন্ধ্যাদীপটি কি চোখে পড়িবে না ? যদি পড়ে, তবে কি অবজ্ঞা করিয়া বলিব "ওটা মাটির প্রদীপ ?” ঐ মাটির প্রদীপের পশ্চাতে কি মাতার গৌরব নাইযদি মাটির প্রদীপই হয় তো সে দোষ কার ? মাতার কক্ষে সোনার প্রদীপ গড়িয়া দিতে কে বাধা দিয়াছেযেমনই হউক না কেন, মাটিই হউক আর সোনাই হউক, যখন আনন্দের দিন আসিবে তখন ঐখানেই আমাদের উৎসব, আর যখন দুঃখের অন্ধকার ঘনাইয়া আসে তখন রাজপথে দাঁড়াইয়া চোখের জল ফেলা যায় না-- তখন ঐ গৃহ ছাড়া আর গতি নাই

- (ছাত্রদের প্রতি সম্ভাষণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

       হঠাৎ করে কেন জানি না এই আশ্বিনের শারদপ্রাতে মেঘের পানসী ভাসিয়ে মনটা চলে গেল সেই সত্তরের দশকে আমরা ছটফট করছি স্কুল থেকে চিরতরে ছুটি পাবার জন্যে সামনেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা বাঙলার সিলেবাস বেশ বড় তারপর রবীন্দ্রনাথের গদ্যের লাইনের পর লাইনের ব্যাখ্যা লিখতে লিখতে হিমশিম অবস্থা ছুটির দিনেও নিস্তার ছিল না সাধনদার হাত থেকে স্কুলের খোলা মাঠেই আমরা বসে পড়তাম বাঙলা বিষয়টাকে গুলে খাবার জন্য

       বয়স বেড়েছে ঢের আমাদের তাই চিন্তাও অস্থির ঝড়ের হাওয়া যেমন করে ওলোট পালোট করে দিয়ে যায় মাকড়সার জালগুলো, ঠিক তেমন করেই স্মৃতির ঝড়ে নৌকো টলোমলো স্কুলের বাঙলা পড়া থেকে মন চলে যায় কখনো দক্ষিণারঞ্জনে, আবার পর মুহূর্তেই হয়তো বা শরতের মিঠে হাওয়ায় বহে আসে প্রথম ফুল প্যান্ট কেনার স্মৃতি কত রকম যে খেলা চলে মাথার ভেতরে !

       এই প্রসঙ্গেই মনে এল একটা শোনা গপ্প গপ্পের মূল নায়ক আমাদের সেই অফিসের রমণীদার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুবর ষাটের দশকের শুরু কলকাতার বিখ্যাত গ্রেট ইষ্টার্ণ হোটেলের বেকারী ইউনিট তখনও পুরোমাত্রায় সজীব আমরাও ছোট বেলায় গ্রেট ইষ্টার্ণএর পাউরুটির স্বাদ পেয়েছি তা রমণীদার এই বন্ধুটি খুবই উচ্চশিক্ষিত ছিলেন এবং অনেকবারই শুধু হিল্লিদিল্লী নয়, ইউরোপমেরিকায় ও ঘুরে এসেছেন তাঁর কার্যকারণের সুবাদে

       এমন এক শরতের সকালবেলায় তিনি এলেন রমণীদার সাথে আমাদের অফিসেই সেই চার্টাড ব্যাঙ্ক বিল্ডিং তখনও আমাদের অফিস বার্ড কোম্পানীর ইন্স্যুরেন্স ডিপার্টমেন্ট জাতীয়করণ হয়েছে এই ঘটনার অনেক পরেই অফিসে এসেই রমণীদা যথারীতি এটেন্ডেন্স খাতায় সই করলেন তারপরে ডিপার্টমেন্টের বড়বাবুকে বলে কয়ে ওই বন্ধুরত্নটিকে নিয়ে বেরোলেন গ্রেট ইষ্টার্ণ হোটেলের উদ্দেশ্যে বন্ধুটির সেদিন একটা কেক কেনার দরকার আর সেই সময়টায়, কলকাতার শরতকালে সব জায়গায় কেক পাওয়া দুস্কর ছিল

       গ্রেট ইষ্টার্ণ হোটেলে তখনও ব্রিটিশ আদবকায়দা চালু ইংরেজদের জায়গায় কলকাতার এঙ্লো ইন্ডিয়ানদের জয়জয়কার তখনও তারা বাঙলা বলা তো দুরস্ত্বাঙলা বোঝেও না সে এক অবাক কলকাতা !

       এমন এক পরিস্থিতিতে রমণীদা আর তার বন্ধু গিয়ে হাজির শশব্যস্তে ছুটে আসে সেলসম্যান ছেলেটি

—  ইয়েস্‌ ইয়েস্‌ ... হাউ ডু উই ক্যান হেল্প য়ু !
কেক্‌ , একটা কেক্‌। — রমণীদার বন্ধুর নীচুস্বর।
হোয়াট স্যার ?  কেক্‌ ?
হ্যাঁ, বলছিলাম কি একটা জন্মদিনের কেক লাগবে আমার।
সে বেচারি নিরুপায় !  রমণীদাও তথৈবচ ! বিড়বিড় করে রমণীদা বলতে যায়...

আরে শালা, ইংরেজিতে বল্‌। এ শালারা বাংলা বোঝে না।
বললেই হোলো। শালাদের বুঝিয়েই ছাড়বো আজ।
আরে এ তো মহা মুস্কিল হল।  রমণীদা হাল ছেড়ে দেন।
বললেই হোলো। শালাদের বুঝিয়েই ছাড়বো আজ।
আরে এ তো মহা মুস্কিল হল।  রমণীদা হাল ছেড়ে দেন।

       ছুটে আসে আরও দু-তিনজন এই বাঙালি শার্ট-প্যান্ট পরা দুটি জীবকে অবলোকন করে মর্মার্থ উদ্ধারকল্পে রমণীদার বন্ধুটি নির্বিকার বলেই চলেছেন নীচু স্বরে

—     একটা খুব সুন্দর বড় দেখে জন্মদিনের কেক চাই ওপরে নাম লিখে দিলে আরও ভাল হয়

—     ইয়েস স্যার্‌, কেকউই হ্যাভ সো মেনি কেক্

       কে শোনে কার কথাতিনি বোঝাতেই থাকেন যে সাধারণ কেক নয় জন্মদিনের কেক্ রমণীদার এবার ছটফটানি শুরু হয় সই করেই পালিয়ে এসেছেন বড়বাবুকে বলে, কিন্তু এ শালা যা নাটক শুরু করেছে তাতে কতক্ষন লাগবে তার একটা আন্দাজ নেবার মরীয়া চেষ্টা করেন রমণীদা

শালা, কি ব্যাপারটা বলতো দেখি ! তুই কি সত্যিই কেক কিনবি তো ?
তো ! না হলে হাওড়া থেকে এতদূরে কি করতে এলাম রে রমনী !
তাহলে এমন করছিস কেন ? এরা তো বাঙলা বোঝে না রে ! শুধু শুধু দেরী হচ্ছে।
শালারা বুঝবেনা কেন বল দিকিনি ! জাপানে জিনিস কিনেছি জাপানি দোভাষী নিয়ে। জার্মানীতে            কেক কিনতে চাইলে জার্মানীতেই বলতে হবে। প্যারিসে সেন্ট কিনতে গিয়ে সে কি যাচ্ছেতাই অবস্থা         আমার ! এমনকি দিল্লিতেও শালা হিন্দী বলতে হয় কিছু কিনতে গেলে। তো এই শালারা কলকাতায়         বসে ব্যবসা করবে আর শালা আমি বাঙালি হয়ে শালাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলবো ! কভি            নেহী ! দরকার পড়লে এই শালাদের দোভাষী নিয়ে আসতেই হবে আজ। আমি আজ এর শেষ             দেখেই ছাড়ব।
তাহলে তুই থাক আমি যাই বাপু। তোর কারবারের ঠ্যালায় আমার চাকরীটা যাবে বুঝতে পারছি।
আরে দাঁড়া না, আর একটু। ওই দ্যাখ না, টাই ঠিক করতে করতে বোধহয় ম্যানেজার আসছে এদিক পানেই।

       ম্যানেজার আবির্ভূত রঙ্গস্থলে কিন্তু সে আর কি করে ! বাঙালির গোঁ বলে কথা ! নীচুস্বরে সে বলেই যাচ্ছে একটা জন্মদিনের কেক কিনব তার উপায় নেই কি যে করি !

       হঠাৎ রমণীদা দেখেন যে সেই টাই বাঁধা ম্যানেজার অকুস্থলে পৌঁছতেই ওই ছেলেগুলো ছিটকে গিয়ে ঘিরে ধরল তাঁকে ভাবখানা যেন, পায়ে পড়ি দাদাবাঁচান আমাদের এই দিশি সাহেবের হাত থেকে গ্রেট ইষ্টার্ণ হোটেলের ম্যানেজার বলে কথা শুনলেন সবকিছু তাকালেন রমণীদার বন্ধুর দিকে তিনি কিন্তু নীচুস্বরে কেক্কেক্‌--জন্মদিনের কেক্করেই যাচ্ছেন অগত্যা সেই এঙ্লো ম্যানেজারটি মেন গেট দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন বাইরে

       রমণীদা তাঁর বন্ধুরত্নটিকে বললেনপালাই চল্‌ ; লোকজন ডাকতে গেল ম্যানেজার এবারে এসে আমাদের দুটোকেই উত্তম মধ্যম দেবে কিন্তু কে শোনে কার কথা ! সে বলেই যাচ্ছেশালারা ব্যবসা করবে কলকাতায় আর কথা কইবে
ইংরেজিতে ! আজ ইংরেজ-গুষ্টির একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়ব !

       ভয়ে জড়সড় হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে রমণীদা দেখলেন যে সেই ম্যানেজারটি আবার আসছেন আর তার পেছনে পেছনে আসছেন ধুতি শার্ট পরা এক বাঙালিবাবু যাক্বাবা ! রমণীদা খানিকটা হাঁফ ছাড়লেন ! দলবল নেই ম্যানেজারের সাথে

       ম্যানেজার এবার সটান এসেই রমণীদার বন্ধুর সামনে পাশে সেই বাঙালিবাবু তিনিই রমণীদার বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন

মহায়ের কি লাগবে বলুন তো শুনি !
 
বাঙলা ভাষার মধুর ছন্দে ভরে উঠল গ্রেট ইষ্টার্ণ হোটেলের বেকারি ডিপার্টমেন্ট। 

আমি আসলে চাইছিলাম একখানা বেশ বড় সাইজের জন্মদিনের কেক্‌। ওপরে নাম লিখে দিতে             হবে। 
এই ব্যাপার !  
হেসে ফেলেন বাঙালিবাবুটি। খাঁটি ব্রিটিশ একসেন্টে ম্যানেজারকে তর্জমা করতে থাকেন। 

রমণীদার বন্ধুর মুখে তখন মিটিমিটি হাসি অতঃপর ভেতর থেকে সাজানো বাক্সে বেরিয়ে আসে একটা বড় সুন্দর কেক এরপর বাঙালিবাবুটি ওদের বলেন কেকের ওপর নাম লিখে দিতে হবে এক টুকরো কাগজ আর পেন বাড়িয়ে দেন ক্রেতার দিকে

       দাম মেটানো হলে টা টা করে বেরিয়ে যান বাঙালিবাবু

       রমণীদা নিশ্চিন্ত এবার তাড়াতাড়ি অফিস পৌঁছতে হবে হঠাৎ শোনে তাঁর বন্ধুটি এবার খাঁটি ব্রিটিশ একসেন্টে ম্যনেজারকে বলছে

--     thanks a lot my dear Manager Sir, I really sorry for my conversation which I told to your boys for purchasing a Birthday Cake. I really sorry for the situation. Please don’t mind….  আরো কত কিছু খাঁটি চোস্ত্‌ ইংরিজিতে !


       ম্যানেজারের চোখদুটো তখন নাকি ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল ! কিন্তু রমণীদা বন্ধুটিকে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসায়, তার পরের ঘটনা জানা যায় নি !

##

©গৌতমদত্ত
২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬