ক্ষমা কোরো বাবা জগন্নাথো -
গেছিলাম
নীলাচলে। জন্মাষ্টমী’র
দিন জগন্নাথ আর সুভদ্রা অনেক দূর থেকে দর্শন হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে সংস্কারের
কাজ চলছে তাই মন্দির-অন্দরে প্রবেশের
নিষেধাজ্ঞা। প্রায় নাট-মন্দিরের চাতাল থেকে দেখতে পেলাম জগন্নাথ আর সুভদ্রা’কে। ঘরাঞ্চি, মই ইত্যাদিতে আড়ালেই রইলেন বলভদ্র। এবারের নতুন অভিজ্ঞতা হল
যে কিছু পুলিশ-পুঙ্গব মন্দিরের গর্ভগৃহ সামলাচ্ছেন এবং শুধু ঠেলা নয়,
সেই কাঠির ঝাড়ু দিয়ে
স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষের মস্তকে আঘাত করেই চলেছেন যা এতকাল একমাত্র মন্দিরের
পাণ্ডারাই নিষ্পন্ন করতেন। জয় বাবা জগন্নাথঃ ! তোমার লীলা বোঝা ভার !
সত্যি
সত্যিই দেখছি বাঙালী কাকে বলে ! স্বর্গদ্বারের সামনে যা ভীড়,
তা হাতীবাগানকেও লজ্জা
দেবে। বাঙালীদের বিচিত্র পোষাক দেখতে হলে আপনাদের অবশ্যই আসতে হবে পুরীতে। তিন
ধরণের ড্রেস কোড দেখছি—
নির্দিষ্ট হয়ে গেছে এখানে। অন্ততঃ আমি যে পাড়াটায় ছিলাম। এই স্বর্গদ্বার থেকে
শ্মশান ছাড়িয়ে দুটি রাস্তা চলে গেছে সেই হাওয়া-কল ছাড়িয়ে,
প্রায় মোহনা পর্যন্ত।
সমুদ্রের ধার ঘেঁষে একটা চওড়া রাস্তা যার একদিকে সমুদ্র আর অপর দিকে সব হোটেল-এর
সারি। আর একটি রাস্তা শ্মশানের সামনে দিয়ে দোকান বাজার পেরিয়ে চলে গেছে বহু দূর।
এই সরু রাস্তাটির দু-পাশেই রয়েছে অসংখ্য হলিডে-হোম। আর হলিডে হোম মানেই বাঙালীর
সুখের আস্তানা। সকাল সকাল কর্তা-গিন্নির এক রূপ। যাচ্ছেন বাজারে। কর্তাদের পরনে
বারমুডা, লুঙ্গী, রাতে
পরা পাজামা অব্দি আছে। আর গিন্নিরা বিভিন্ন ম্যাক্সি ধরনের রাত পোষাকে সুসজ্জিতা।
ঘুম ঘুম চোখে মনে হয় রাত জাগার ক্লান্তি ! সমুদ্রের আওয়াজ তো আর প্রায় শোনাই যায়
না, সমুদ্রের একদম কাছে না
গেলে। তবু কেন এত ক্লান্তি কেন কে জানে !
ওই ঘুম
ঘুম চোখ কিন্তু জ্বলে জ্বলে ওঠে স্থানীয় মাছের বাজারে গেলে। মনে হয় আজকাল আর
পশ্চিম বাংলায় মাছ বোধহয় নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। হামলে পড়ে কর্তা-গিন্নিগন মায় তাঁদের
বাচ্চা-কাচ্চা পর্যন্ত চীৎকার করে কতখানি মাছ আগেভাগে নিয়ে নিতে পারে তারই এক
বিচিত্র প্রতিযোগীতা। মাছের দাম কিন্তু কলকাতার চেয়ে মনে হয় বেশীই হবে এখানে !
কিন্তু কে ভাবে আর ! নীলাচলের মাছের বোধহয় আলাদা কিছু স্বাদ আছে।
এর পরের
ড্রেস কোডের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়, দশ-সাড়ে দশ বাজলেই। কর্তারা বা ছেলেরা সব খালি গা। কাঁধে সবার
একখানা করে রঙীন গামছা আর পরনে কত রকমের যে হাফ-পেন্টুল তা বলাই বাহুল্য।
গিন্নিদের পরনে অপূর্ব সব পুরোনো ম্যাক্সির বাহার। নব বিবাহিতা গিন্নিরা অবশ্য
নতুন ম্যাক্সিতেই স্বচ্ছন্দ। সব গিন্নিদেরই গায়ে কিন্তু একখানা অবশ্য-গামছা।
টাওয়েল চোখে পড়ে না বললেই চলে। তেমনি শাড়ি বা শালোয়ার,
ধর্মঘটের দিন কলকাতার
রাস্তায় বাসের মতো। খুবই কম। আর হলিডে হোম থেকে সমুদ্রের দূরত্ব অনুযায়ী হাওয়াই বা
খালি পা। যদি হলিডে হোম সমুদ্রের কাছে হয় তাহলে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষের খালি পা।
দূরত্ব বেশী হলে দিদি’র
হাওয়াই। শিশুরাও তথৈবচ।
তৃতীয় বা
দিনের শেষ ড্রেস কোড একটু অন্যরকম। বিকেল হলেই সুসজ্জিত হওয়ার পালা। সমুদ্র
দর্শনের অভিলাষে আর সন্ধ্যে নেমে গেলে দোকানে দোকানে দরদাম আর জিনিষ কেনার পালা।
তখন কর্তারা প্যাণ্ট শার্ট বা পাজামা পাঞ্জাবী, জিনস আর পায়ে পাওয়ার। গিন্নিদের বেশীরভাগই শাড়ি। এছাড়া অল্পবয়সী
গিন্নিগনের শালোয়ার, জিনস্,
টপ ইত্যাদি আপ-টু-ডেট
পোষাক-আশাক। যত রাত বাড়ে দোকানে দোকানে
ভীড়ও বাড়ে তত !
সন্ধ্যেবেলায়
স্বর্গদ্বার থেকে আসতে আমাদের হলিডে হোমে আসার পথে চোখে পড়ল প্রচ্ছদে দেওয়া “মাতৃ ভবন” বাড়িটা। অনেক স্মৃতি ভীড় করে এল এই বাড়িটা নিয়ে। কিছু
দুষ্কর্ম করেছিলাম একবার। তাই বলে একটু হাল্কা হই আজ ! জয় বাবা জগন্নাথঃ !
ক্ষমাঘেন্না করে দিও বাবা !
*
ছোটোবেলায়
মা-বাবা, ঠাকুর্দা-ঠাকুমার
সাথে পুরী যে এসেছিলাম তা পুরোনো ফ্যামিলি এ্যালবামের পাতায় আছে। সে যুগের ভয়েগ্ল্যান্ডার
ক্যামেরায় তোলা। কিন্তু আমার প্রথম সজ্ঞানে পুরী আসা ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৩ এ গোয়েঙ্কা
কলেজে ঢুকেছি। বন্ধু-বান্ধব তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো বন্ধুদের সাথে একটা পারিবারিক
সম্পর্কও তৈরী হয়ে গেছে। এমন সময় আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু’র বাড়িতে বসে জানা গেল যে তাঁর বাবা মানে আমাদের
প্রিয় মেসোমশাইদে’র
অফিসে’র একটা নতুন হলিডে হোম
খোলা হয়েছে পুরীর স্বর্গদ্বারের কাছে। সেখানে গেলে মন্দ হয় না। মেসোমশাই মাসীমা
রাজি হলেন আমাদের তিন বন্ধুকে ওঁদের পুরো ফ্যামিলির সাথে নিয়ে যেতে। তার মানে
দাঁড়ালো, ওনারা
পাঁচ জন ছাড়া আমরা তিন বন্ধু মোট আটজন মিলেই পুরী যাওয়া হবে। সব খর-খরচা
মেসোমশাই-এর। শুধু আমাদের ট্রেন ভাড়াটা দিতে হবে।
১৯৭৩ সালে
পুরী আসার জন্যে এক পিঠের ট্রেন ভাড়া ছিল পঁচিশ টাকা। তার মানে যাতায়াতে পঞ্চাশ।
অত টাকা পাবো কোথায় তখন ! দু-বন্ধুর অবস্থা কিছুটা সচ্ছল থাকলেও,
আমি এবং আর এক বন্ধু বেশ
মুষড়েই পড়লাম। মাত্র অল্প পয়সার একটা পার্ট টাইম চাকরী শুরু করেছি তখন। মাস মাইনে
কুড়ি টাকা। সুতরাং পঞ্চাশ টাকা আমার কাছে বিশাল এক ব্যাপার ছিল সেই সময়। কিন্তু
একটা কিছু তো করতেই হবে। এক বন্ধুর মাথায় ঢুকল একটা আইডিয়া। সে শুনেছিল যে
স্টুডেন্ট কনশেসন পেলে এক পিঠের ভাড়াতেই দু-পিঠের যাতায়াত করা যায়। সুতরাং লাগাও
পাত্তা। কলেজের অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেল যে মিনিমাম চার জনের গ্রুপ হলে এবং কলেজ
অথরিটি স্যাংশান করলে সেটা সহজেই পাওয়া যায়।
এবারে
একটা ওই রেলের কনশেসন ফর্ম চাওয়া হল আমাদের কলেজের অফিসিয়াল স্টাফ রঞ্জন’দার কাছে। তিনি আলমারী খুঁজে বার করে দিলেন
একখানা ফর্ম। আমাদের চার বন্ধুর মধ্যে একজন আবার আমাদের কলেজের স্টুডেন্ট নয়। খুব
চিন্তাভাবনা করে আমাদের তিনজনের নাম লেখা হল ফর্মে আর লেখা হল আরেক কলেজ বন্ধুর
নাম যার প্রক্সি’তে
আমাদের ওই বন্ধুটি যাবে, যে
কিনা আমাদের কলেজের ছাত্র নয়। ফর্ম ফিল-আপ করে দেখানো হল রঞ্জন’দাকে। নাম ধাম মিলিয়ে দেখে রঞ্জন’দা জিজ্ঞেস করলেন যে কার পারমিশনে এই ট্যুর হচ্ছে
? এইবার আমাদের মুখ
চাওয়া-চায়ির পালা। কোনো প্রফেসরের নাম বললেই তো রঞ্জন’দা তাঁর কাছেই পাঠাবেন কাউন্টার সাইন করাতে এবং
তারপরে ফাইনালি রেকমেন্ড করবেন আমাদের প্রিন্সিপ্যাল। কি করা যায় ! বলা হল যে এখনো
ফাইনাল হয়নি যদিও, আমরা
একটু আগে ভাগেই কাজকর্ম গুছিয়ে রাখতে চাইছি আর কি ! কিন্তু ঘাঘু স্টাফ রঞ্জন’দা বললেন, যে আগে সব ঠিক হোক, তারপরে এ সব ফর্ম ফিলাপ করা যাবে। এই বলে ওই ফিল আপ করা
ফর্মটাই নিয়ে নিলেন আমাদের হাত থেকে।
তিনজনে
বিরস মুখে কলেজ ক্যান্টিনে গিয়ে ভাবতে বসলাম কি করা যায়। মনে হচ্ছে আমাদের আর পুরী
যাওয়াই হবে না। পঞ্চাশ টাকা জোগাড় করা একেবারে অসম্ভব আমার তখন।
অনেক মাথা
খাটিয়ে ঠিক করা হল যে একটু চালাকিই করতে হবে আমাদের। পুরী’র জগন্নাথের কাছে গিয়ে না হয় আমাদের অন্যায়
স্বীকার করে নেব ‘খন।
যেমন প্রতি সাপ্তাহিক পরীক্ষার দিন কলেজে আসার পথে ফিরিঙ্গী কালীবাড়ির দরজায় মাথা
ঠেকিয়ে বলে আসতাম – মা,
মাগো, আজকের
পরীক্ষাটা পাশ করে গেলে তোমায় দশ পয়সা দেব। সব পরীক্ষাই পাশ করলাম কিন্তু মা
ফিরিঙ্গী কালীর কাছে এখনো আমি দেনাদার হয়ে আছি। গড়ে যদি বছরে ৪০ টা পরীক্ষা হয়ে
থাকে তাহলে মা ফিরিঙ্গী কালী এখনো আমার থেকে ৪০ X৩ (বছর) X ১০ পয়সা = ১২ টাকা পায়। এবারে সেটা দিয়েই দিতে হবে বলে মনে
হচ্ছে। আপনারা ১০ পয়সা শুনে কিন্তু মুখ বেঁকাবেন না। ১৯৭৪ সালে আমাদের টবিন রোড
থেকে বৌবাজার অব্দি বাস ভাড়া ছিল ১৫ পয়সা। একটা চারমিনারের দাম ছিল ৪ পয়সা। এক
ভাঁড় চা, কলেজের
ক্যান্টিনে খুব সম্ভবত পাঁচ পয়সা !
যাই হোক,
আমাদের অপারেশন নীলাচল্ কি
করে শুরু করবো ভাবতে ভাবতে একদিন সুযোগ এল আমাদের। কি যেন একটা কারণে আমিই মনে হয়,
কলেজ অফিসের ভেতরে ঢুকে
রঞ্জন’দার সাথে কি একটা কথা
বলছিলাম। বাকি দু-বন্ধু বাইরে দাঁড়িয়ে। অফিস সেদিন ফাঁকাই ছিল একেবারে। হঠাৎ
ভগবানের ডাক ! খোদ প্রিন্সিপ্যালের তলব রঞ্জন’দাকে। পাশেই প্রিন্সিপ্যালের ঘর। রঞ্জন’দা একবার আমার দিকে তাকিয়েই দ্রুত চলে গেলেন
প্রিন্সিপ্যাল সকাশে। আমি দেখলাম আলমারি খোলা। আর এক বন্ধুর দিকে চেয়েই ঝপাং করে
বার করে নিলাম ওই কনশেসন ফর্ম একখানা। আর সাথে সাথেই এদিক ওদিক তাকিয়ে
প্রিন্সিপ্যালের রাবার স্ট্যাম্প যা থাকত রঞ্জন’দার টেবিলে, তা নিয়েই ধাঁ করে একটা ছাপ দিয়ে দিলাম ফর্মের তলার দিকে,
যার পাশেই রেকমেন্ড করে সই
করবেন প্রিন্সিপ্যাল।
ফর্ম
হাত-ফেরতাই হয়ে চালান হয়ে গেল আরেক বন্ধুর হাতে। কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন রঞ্জন’দা শশব্যস্তে। আমায় বললেন আবার আগামীকাল দেখা
করতে কারণ প্রিন্সিপ্যালের কি একটা জরুরী কাজ এক্ষুনি করে দিতে হবে। হাতে চাঁদ
পেলাম আমি।
কলেজ
অঞ্চলে আমাদের ঠেক্ ছিল দুটো। পকেটে পয়সা থাকলে বৌবাজারের ‘জয়শ্রী’ মিষ্টির দোকান আর কচিৎ কদাচিৎ ‘বঙ্গলক্ষী রেস্ট্যুরেন্ট’
(যখন কোনো বড়লোক বন্ধু ফিশ
ফ্রাই খাওয়াতো, তখন)।
জয়শ্রী দোকানটায় তখন কচুরী পাওয়া যেত আর ছিল কয়েকটি খুপরী কেবিন-ঘর। এখন দোকানটা
থাকলেও সে খুপরী কেবিনগুলো আর নেই। খুব সম্ভবতঃ কচুরিও আর হয় না আজকাল। আর কলকাতার
এক বিখ্যাত ফিশ-ফ্রাই বানানো সেই বঙ্গলক্ষী রেস্ট্যুরেন্ট-ও আজ স্মৃতির অতলে।
ঠিক হল,
পরের দিন এই ফর্ম আমরা
তিনজনে মিলে জয়শ্রী দোকানের একটা খুপরীতে বসে ফিল-আপ করবো। কারন কলেজের ক্যান্টিনে
এসব কাজ করা যাবে না !
যথারীতি
পরের দিন একটা কি দুটো ক্লাস করেই যাওয়া হল জয়শ্রী। চার বন্ধুর নামই লেখা হল। এমন
কি ওই বন্ধুরও নাম যে কিনা আমাদের কলেজের ছাত্র নয়। ফর্ম ফিলাপ হবার পরে এক বন্ধু
খস্খস্ করে প্রিন্সিপ্যালের সই করার জায়গায় ওই রকম একখানা সই করেই দিল !
স্ট্যাম্প তো কাল মারাই ছিল ফর্মে !
ফর্ম তো
হল। এবার কি করনীয় আমাদের ! খবর নিয়ে জানা গেল যে পুরী’র ট্রেন - কন্ট্রোল করে সাউথ ইষ্টার্ণ রেল আর তার
অফিস হচ্ছে কয়লাঘাটে। আগে যেতে হবে ওই অফিসে। সেখানে কার কাছে যেন গিয়ে
প্রিন্সিপ্যালের সই ভেরিফিকেশন করিয়ে নিলে তবেই কাটা যাবে সেই প্রতীক্ষিত ‘এক ভাড়ায় দু-পিঠ জার্নি’-র টিকিট।
তিনজনেই
গেলাম। কিন্তু ওই ভেরিফিকেশনের ঘরে কে ঢুকবে। যদি ভেরিফাই করতে গিয়ে দেখা যায় যে
সইটাই প্রিন্সিপ্যালের নয় আর তখন যদি সব কটাকেই ধরে পুলিশে চালান করে দেয় তাহলে কি
হবে ! অনেকক্ষণ চিন্তা ভাবনা করার পর আমাদের এক বন্ধুর সাহস যেন হঠাৎই বেড়ে গেল।
তার বাবাই আবার আমাদের পুরী যাত্রার স্পনসর। বুক ফুলিয়ে সে বলে উঠল,
ঠিক হ্যায়,
হাম্ইই জায়গা। যো হোগা ও
দেখা যায়গা ! বোঝো কান্ড !
ঢুকে গেল সে ওই আলিবাবা’র গুহায়। বেরোতে পারবে কিনা জানিনা ! আমরা
দু-বন্ধু বাইরে দাঁড়িয়ে তখন ঘামছি। দু-মিনিট, চার-মিনিট, ছ-মিনিট হয়ে গেল, এখনো তার পাত্তা নেই। কিন্তু কলেজে ভর্তির সময় সেই ‘ভাল্লুকের কানে কানে কি বলিল’
কথাটা মন থেকে মুছে পালাতেও
ইচ্ছে করছে না। দু-জনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি যে ওদের কাছে প্রিন্সিপ্যালের যে সই
এর কপি রাখা আছে সেটা কি পাচ্ছে না, না কি সেই সই এর সাথে আমাদের ফর্মের সই-এর চুলচেরা
ভেরিফিকেশন পর্ব চলছে। অবশেষে প্রায় সাত মিনিটের মাথায় তিনি হাসি হাসি মুখে
বেরোলেন আলিবাবার গুহা থেকে। জিজ্ঞাসান্তে
জানা গেল যে, ভীড়
ছিল ভেতরে আর ওই সব মেলানো ফেলানোর কোনো ব্যাপারই ছিল না। যদি থাকত তাহলে সে
নিশ্চিত রুপেই পালিয়ে আসত। কিন্তু ভেতরে ঢুকে সে দেখে যে এক অফিসার ভদ্রলোক ফর্ম
গুলো হাতে নিয়ে একবার চোখ বুলিয়েই একটা সই করে একটা স্ট্যাম্প মেরে দিচ্ছেন। ব্যস্,
এই দেখেই আর ভয় করেনি আমার সেই বন্ধুরত্নটির।
তারপর
যথারীতি সেই টিকেট কাটা হল। হৈ হৈ করে আসা হল পুরী। আমার যৌবনের দ্বিতীয়
রেলভ্রমণ-এ। ওই “মাতৃ
ভবনে”ই তিনখানা ঘর নেওয়া ছিল। এক ঘরে মাসীমা,
মেসোমশাই,
অন্য ঘরে বন্ধুর দাদা-বৌদি
আর একটা বড় ঘরে আমরা চার বন্ধু।
সেই আমার
জ্ঞানতঃ প্রথম পুরী ভ্রমণ।
*
কি অপূর্ব
সুন্দর ছিল সেদিনের পুরী’র সমুদ্র সৈকত। শ্মশানের এদিকটায় খুব-ই কম লোকজন। আমাদের এই
মাতৃ ভবনের সামনেই বসতো সকালের বাজার। আর তারপর সেই
হাওয়া-কল অব্দি ফাঁকা ধূ ধূ বালিয়াড়ি।
আর আজ !
স্বর্গদ্বারে সন্ধ্যের ভীড় দেখে কাল মনে হচ্ছিল যে আমাদের হাতীবাগান হয়তো এর চেয়ে
বেশ ফাঁকা।
পুরী
স্টেশন থেকে যখন এরাস্তা ওরাস্তা ঘুরে রিক্সা বা অটো হঠাৎ করেই একটা শেষ বাঁক নেয়
ডানদিকে ঠিক তখনই সবার মনটাই দিলতর্ হয়ে যায় বাঁদিকে সেই অতল জলরাশির মাথায় সাদা
সাদা ফেনা আর ঢেউ দেখে। ওই বাঁক নেবার জায়গাটা থেকে স্বর্গদার অব্দিই সেই পরিচিত
পুরী। রাস্তার একদিকে প্রাচীন এবং কিছু নব্য হোটেলের সারি আর অপরদিকে পুরীর সমদ্র।
আগেকার দিন হলে বলতাম, দিগন্তবিস্তৃত
নীল জলরাশি কিন্তু এখন আর তা বলা যাবে না। এখন দূর মানে ওই রাস্তার ধার থেকে
দিগন্তবিস্তৃত ছাতা আর প্লাস্টিক চেয়ারের সারি আটকে দিয়েছে উন্মুক্ত সমুদ্রকে। আর
রাস্তার পাঁচিলে যেখানে পর্য্যটকরা সন্ধ্যে হলেই একটু বসে সমুদ্র দর্শন করতেন
সেখানে নতুন হকার ভাইয়েরা পশরা সাজিয়ে বাজার করে ছেড়েছে।
স্বর্গদ্বার
থেকে বাঁদিকে যে নতুন মেরিন ড্রাইভ রোড বেরিয়েছে তা আগে কি সুন্দরই না ছিল। এখন
সেই রাস্তা থেকে সমুদ্র আটকে গেছে নীল-প্ল্যাস্টিক-শোভিত দোকানগুলোর চালায় ! চারদিকে
শুধু নীল জল নয়, শুধু
দোকানের নীল মাথার সাম্রাজ্য। এও বাহ্য, সন্ধ্যে হলেই আর হাঁটা যাচ্ছে না স্বর্গদ্বার থেকে শ্মশান
ছাড়িয়ে অনেকটা দূর পর্যন্ত। কারণ মাছ ভাজার দোকানের উৎকট গন্ধে পুরীর সন্ধ্যে আজ
বিপন্ন।
স্বর্গদ্বার
থেকে মন্দির যাবার সেই পুরোনো রাস্তাটি এখনো একই রকম আছে। তবে দুধারে আরও অজস্র
দোকান তৈরী হয়েছে। তবে এই রাস্তাটি যেখানে গিয়ে মন্দিরের সামনে মিশেছে সেখানটা আজ
অনেক পরিচ্ছন্ন, চওড়া।
অনেক পুরোনো বাড়ি এবং দোকানপাট ভেঙে নতুন করে তৈরী করা হচ্ছে ঐ স্থান। তবে হকার
ভাইরা আবার ভ্যান রিক্সায় পশরা সাজিয়ে শুরু করে দিয়েছে ঐ জায়গায় বসতে।
অদ্ভুত
লাগে আমার পরিচিত জায়গায় যখন যাই। শুধু দোকান, দোকান আর দোকান। হকার, হকার আর হকার। এখন শুনতে পাই যে কন্যাকুমারীর শেষ ভূখণ্ড
সেই জায়গাটায় শুধুমাত্র কন্যাকুমারীদেবীর মন্দিরটি ছাড়া আর কিছুই ছিল না –
উঁচু থেকে বেশ বোঝা যেত
ভারতের ম্যাপখানা – সেখানে
আজ গড়ে উঠেছে বাজার। হকার্স মার্কেট। আজ আর কন্যাকুমারী গিয়ে ভারতের সেই শেষ অংশটা
আর কেউ অনুভব করতে পারবেন না। অবশ্য অনেক কিছু কিনতে পারবেন ওই মার্কেটে আর
নিশ্চিত ভাবে শুনতে পাবেন সভ্যতার এক কলঙ্ক, মাইকের যথেচ্ছ আওয়াজ দোকানে দোকানে। কোথায় যে হারিয়ে গেল
পারে বসে সেই সূর্যাস্ত দেখা আরবসাগরে কিংবা বঙ্গোপসাগরে সূর্যোদয়। তিন সাগরের সেই
অপূর্ব জলকল্লোল আজ মাইকের কাছে পঙ্গু !
মাত্র চার
দিনের ঝটিকা সফর শেষে মুক্তির স্বাদ পেলাম যেন জগন্নাথ এক্সপ্রেসের কামরায় উঠে।
বাবা জগন্নাথের মহাপ্রসাদ আর নৃসিংহ সুইটস্ এর খাজা নিয়ে ফিরে এলাম আপন আলয়ে।
