টেলিফোন -
সেদিন এক বন্ধুর
বাড়ী গেছিলাম। আমার প্রথম বন্ধু। শ্যামবাজারে একটা বাড়ী করেছে প্রায় বছর দশেক হোলো। যেতে বলে অনেকবার কিন্তু হয়ে ওঠে না। যোগাযোগ হয় ফোনে তাও বছরে দুচারবার। একরাশ অভিমানের জ্বালা বুকে বয়ে বেড়াচ্ছিল অনেকদিন। সেদিন ওর বাড়ী গিয়ে মেটালাম সেটা।
ওকে যখন ডেকেছি
যে কোনো বিপদে-আপদে সঙ্গে সঙ্গে
হাজিরা দিয়ে গেছে। প্রথম বন্ধু
বলে কথা। তার ওপর ওর বাবা আর আমার বাবাও খুব বন্ধু ছিলেন। ওর বাবা আমার বাবার চেয়ে বড় ছিলেন, আর ও অনেক ছোটবেলায় ওর বাবাকে হারায়। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব এখনো হারায় নি। শুধু অভিমানে একটু কষ্ট পাচ্ছিল।
আমার ছোটবেলা
কেটেছে পুরোনো কলকাতায়। একদিকে স্বামী
বিবেকানন্দের সিমলে পাড়ার বাড়ী আর অন্য দিকে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। কলকাতা ছয়। আমাদের পৈত্রিক
বাড়ী ছিল ওখানেই। গায়ে গায়ে
দেয়াল। সে দেয়ালে কান পাতলে পাশের বাড়ীর স্বজনদের গলা শোনা
যেত। আর ছিল ছাদ। একটা ছাদে উঠতে পারলেই কত ছাদ যে হাতের নাগালে এসে যেত সে কথা
এখনো ভাবি। শুধু একটা পাচিঁলের বেড়া। ছাদে থাকত গঙ্গাজলের ট্যাঙ্ক। আমাদের বাড়ীটা দোতলা ছিল।
আমাদের বাড়ীর
উল্টোদিকেই ছিল ঐ বন্ধুর খোলার চালের বাড়ী। বস্তি যাকে
বলে। কিন্তু আমাদের মেলামেশায় কোনো আড়াল ছিল না। আমাদের বাবা মায়েরা কখনো বলে দেন নি, কাদের কাদের সাথে মিশতে হবে। কাদের সাথে বন্ধুত্ব পাতানো যাবে। আমাদের দুজনেরই দু-বাড়ীতে ছিল অবাধ গতি। আমার মাকে
ও কাকীমা বলতো। আমি ওর মাকে জেঠিমা। ওর বাবার নাম আর আমার বাবার নাম ছিল এক। আর আমাদের দুজনেরও এক নাম –
পদবীটা শুধু আলাদা। এইভাবেই তো
বড় হয়ে গেলাম আমরা।
সেদিন ওর বাড়ী
যেতে জেঠিমা আমার বৌ’কে কথায়
কথায় বললেন যে উনি আমার বাবার বিয়েতেও নেমন্তন্ন খেয়েছেন। অনেক পুরনো স্মৃতি এক ঝটকা মেরে চোখের সামনে ভাসতে শুরু করলো।
...............মনে আছে আমাদের ঐ পাড়ায় একটা ক্লাব ছিল। বাবা-কাকাদের। “পল্লী সঙ্ঘ”। একটা ক্লাব ছিল সারা পাড়ার প্রাণ। পুরোনো কলকাতায় এখনো এরকম অনেক ক্লাব আছে কিন্তু সেদিনের সেই
সংপৃক্ততা আজ আর তেমন ভাবে আছে বলে মনে হয় না। কত কি অনুষ্ঠান হোত সারা বছর জুড়ে। আমাদের কাছে খুব আনন্দের ছিল বচ্ছরকার স্পোর্টস। দেশবন্ধু পার্কের মাঠে সারাদিন ধরে চলত। গোটা পাড়া যেন হামলে পড়ত ওখানে। এছাড়া পিকনিক, সরস্বতী পূজো, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জন্ম-জয়ন্তী এসবে ভরে থাকতো আমাদের পাড়াটা। আর ছিল হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারবাবু,
‘শ্রী বিশ্বনাথ কুণ্ডু’। রোজ বসতেন সকাল-বিকেল। পাড়ার সবাই
বিনা পয়সায় ওষুধ পেতেন সঙ্গে ফ্রি ডাক্তার বাবুর উপদেশ।
রক্ বা রোয়াক
বলে একটা বস্তু ছিল তখন। বিভিন্ন বয়সের
বিভিন্ন রোয়াক। বিভিন্ন সময়। বিভিন্ন আলোচনা। মনে পড়ে ক্লাবের
রোয়াকে সকাল-বিকেল ডিউটি
দিতেন আমার মেজদাদু। সারা পাড়ার
ছেলে ছোকরারা ভয় করতো ওনাকে। আমি বাদ ছিলাম। আদরের নাতি বলেই বোধহয়। এক হুঙ্কারে বোঝা যেত যে গোটা পাড়াটাই যেন ওঁর সংসার।
আমাদের পাড়া
বিখ্যাত ছিল ‘ছানাপটি’
নামে। কত ছানার দোকান। বেশীর ভাগ বিক্রি হোতো বিকেলে। আমাদের বাড়ীতেও একটা দোকান ভাড়া দেওয়া ছিল। বিকেল হলেই বাঁকে করে আসত ছানা। বিশেষ করে উড়িষ্যার লোকজন এই বাঁক বইতো। গরম গরম ছানার যে কি টেস্ট সে এখনো ভুলতে পারি না।
পাড়ার যে কোনো
ছানার দোকানে বিকেলে হাত বাড়ালেই দোকানদার হাতে দিত একটু গরম ছানা। কি সুস্বাদু সে ছানা !
বিভিন্ন রকমের ছানা আসতো।
পাড়ায় তখন
টেলিফোন বলতে একটাই ফোন। ঐ পল্লী সঙ্ঘে। গোটা পাড়ায় ঐ একটাই নাম্বার। আমার এখনো মনে আছে । ৫৫-১৫৬০। কেউ না কেউ কারোর ফোন এলে ডেকে দিত তাকে। তখন তো আর এই সময়ের বিধিনিষেধ ছিল না। যতক্ষন ইচ্ছে কথা বলা যেত ঐ একবারের ডায়ালে। মানে একটাই কলের পয়সা দিতে হোত।
আমার এখনো
চোখে ভাসে ঐ কালো রঙের ঢাউস টেলিফোনটা। সবাই ফোনে
কথা বলতো। কিন্তু আমাকে কেউ আর ফোন করে ডাকে না। খুব দুঃখ ছিল। প্রথম ফোন
করেছিলাম যখন আমি ক্লাস টু তে পড়ি, এক স্কুলের বন্ধুকে। ওদের বাড়ী
তখন ফোন ছিল। বাবা ডায়াল করে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। কি উত্তেজনা আমার সেদিন !
সবচেয়ে আশ্চর্যের
জিনিষ ছিল যেটা, সেটা ভাবলেই
মনটা কেমন হয়ে যায় এখন।
আর ছিল কুপন। একেকটা কুপন বইতে বোধহয় ২৫ বা ৫০ টা কুপন থাকত। যাদের ফোন বেশী হোতো তারা আগেই ঐ কুপন কিনে রাখতেন। ফোন করার পর একটা করে কুপন ঐ গর্তে ফেলে দিত ঠিক। অন্যথা হয় নি কখনো। আর ফোন এলে
যে কেউ সামনে থাকতো সেই ডেকে দিত যার ফোন তাকে...।
আমার বাবা
ছিলেন পল্লী সঙ্ঘের ট্রেজারার। মাসের শেষে
ঐ টেলিফোনের টেবিল খুলে বার করে আনতেন পয়সা আর কুপনগুলো। তারপর আলাদা করতেন পয়সা আর কুপনগুলো। তারপর সবকিছু গুণে তুলে রাখতেন । কিন্তু আমি কখনো শুনিনি যে টেলিফোনের বিলের সাথে অনেক তফাত হয়েছে
ঐ পয়সা আর কুপনগুলোর যোগফল।
কোথায় হারিয়ে
গেল সেই সব দিনগুলো। আমার জ্ঞান
হওয়ার পর থেকে মানে ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এটাই দেখে এসেছি।
তারপর আমরা
ওপাড়া ছেড়ে বরানগরে চলে আসি। কিন্তু টেলিফোনটা
চালু ছিল।
তারপর এল নকশাল
যুগ। তখন আমার ক্লাস নাইন। পূরোনো পাড়ায় যাতায়াত ছিলই আমার। দেখলাম ক্লাবের দুর্দশা। আমার মনে হয় মনের অবক্ষয় শুরু হোলো তার পর থেকে। টেলিফোনের বিল আসে কিন্তু পয়সা আর পরে না। কেউ কেউ কুপন দেয়, অনেকেই দেয় না। নকশালী ছেলেপুলেরা
ওটাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে আরম্ভ করলো। তারপর বাকী
সবাই।
হারিয়ে গেল
পাড়ার টেলিফোন। বন্ধ হোলো শেষ পর্য্যন্ত..................৫৫-১৫৬০.........।
(প্রকাশিত)
##
১-১২-২০১৪
