খিদিরপুর ভার্সেস মোহনবাগান -
শ্যামবাজারের
মোড়ে আজ হঠাৎ ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি’র শব্দ আমার মনের হার্ড ডিস্কে পৌঁছে সার্চ করতে লাগলো বনবন করে। কতদিন পরে যে এই মামা’র বাঁশির ডাক শুনলাম তা বোধহয় বলতে পারবো না। তবে, সার্চ ইঞ্জিন জানান দিল একটা পুরোনো স্মৃতি’র। আপন মনেই আবার হেসে উঠলাম স্মৃতি’র দরজা ধরে। সেই রমনী’দার মুখে শোনা গল্প-কাম্-সত্যি
ঘটনাটা আস্তে আস্তে সিল্যুয়েট থেকে রঙিন হতে হতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো মনের রেটিনায়।
মনে আছে তো
সেই মোহনবাগান মাঠে গোলপোষ্টের পেছনে থাকা অথবা সিন্নি গল্পের সেই রমনী’দাকে ? বিশাল এক যৌথ পরিবারের অনেক গল্প
অনেক কথা ! মাঝে মাঝেই উঁকি দিয়ে চলে যায় মনের আয়নায়। অনেকগুলো ভাই বোন আর তাঁদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনী মিলিয়ে সে এক হৈ হৈ করা সংসার। জমজমাট রমণীদা’দের বিশাল পুরোনো বাড়ি। আর তার মধ্যেই
অহরহ ঘটে চলতো কত গল্পের বীজ। এমন সব ঘটনা
শুনে হেসে গড়িয়ে পড়তাম ঘটনার ঘনঘটায় আর রমনী’দার মুখনিঃসৃত বাক্যের ফোয়ারায়। সে এক দিন গেছে !
আর সেই বাড়ি ছিল মোহনবাগানের এক আড়ৎ বলা চলে। সবাই মোহনবাগান ভক্ত। চার পাঁচটা মেম্বারশিপ কার্ডের ছড়াছড়ি সে বাড়ির আনাচে কানাচে। আর প্রায় কেউ না কেউ রোজই হাজির থাকতো মোহনবাগান মাঠে।
সত্তরের দশকের
ঘটনা। সেই পরিচিত মোহনবাগান মাঠ। প্রথম ডিভিশনের এক কঠিন ম্যাচ। মোহনবাগান ভার্সের খিদিরপুর। তখন খিদিরপুরের বেশ নামডাক। খুব ভাল টিম। সেদিনের সেই
খেলাটা তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল খিদিরপুরের কাছে। খিদিরপুরে খেলছেন উত্তম দাশ, গোলকিপার তরুন বোস এবং আরো সব ফুটবলার। মোহনবাগান সেদিন মরিয়া খিদিরপুরকে হারাতে।
হাফটাইম হতে
মিনিট দশেক বাকি। কেউই কোনো
গোল করতে পারে নি। ঘন সবুজ মোহনবাগান
মাঠ দর্শকে পরিপূর্ণ। খিদিরপুরের
সাপোর্টারও অনেক। খুব টানাপোড়েন
চলছে খেলায়। যে কেউ জিততে পারে এমন অবস্থা সেদিন।
একটা সুন্দর
পাস পেয়ে মোহনবাগানের এক ফরোয়ার্ড এগিয়ে আসছে খিদিরপুরের গোলের দিকে। মাঝ মাঠ অতিক্রম করে একাই এগিয়ে চলেছে সে। হঠাৎ অফসাইডের বাঁশি। সেই ফরোয়ার্ড
বল ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল বাঁশির শব্দে। এরই মাঝে খিদিরপুরের
উত্তম দাশ বল কেড়ে নিয়ে দ্রুতগতিতে মোহনবাগান গোলপোষ্টের দিকে ছুটে চললেন। সবাই নিশ্চল। পাগল হয়ে গেল
নাকি উত্তম ! এবং প্রায়
বিনাবাধায় গোলপোষ্টের জালে জড়িয়ে গেল উত্তমের শট করা বল। বেজে উঠল রেফারির হুইসল। গোওওল্।
হতচকিত মোহনবাগানের
ফুটবলাররা ঘিরে ধরলেন রেফারী’কে। রেফারী অবলীলায়
জানালেন যে তিনি তো অফসাইডের বাঁশি বাজান নি, তবে কেন মোহনবাগানীরা খেলা থামিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন ! তার
মানে ? সবাই স্পষ্ট শুনেছে
সেই অফসাইডের হুইসিলের আওয়াজ। লেগে গেল তুমুল
তর্কাতর্কি। গোলদাতা উত্তম ওই জটলার মাঝে গিয়ে জানালেন যে সত্যিই
তো রেফারী ঐ বাঁশি বাজান নি আর তাইতো সে বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে গোলটা করে দিয়েছে।
হৈ হৈ রৈ রৈ
কান্ড। এমন সময়ে ঘটনাটা আবিস্কার করলেন মেম্বারশীপ গ্যলারীর
কিছু মোহনবাগানী সাপোর্টার। তারা ততক্ষনে
ঘিরে ধরেছেন এক অল্পবয়সী যুবককে। তারপরে তো
মার শুরু হল বলে। এক কর্মকর্তা
সেই ছেলেটিকে বগলদাবা করে নিয়ে চললেন প্যাভিলিয়নের দিকে। পেছনে পেছনে গালাগাল-বর্ষিত সাপোর্টাররা। সেই কর্মকর্তার
আকস্মিক বুদ্ধি বাঁচিয়ে দিল সেদিন সেই ছেলেটিকে মারের হাত থেকে। তাও তারই মাঝে বেশ কিছু কিল থাপ্পড় হজম করে ফেলেছে ছেলেটি।
মারধোর থেকে
বাঁচিয়ে, সেই ছেলেটিকে
নিয়ে পড়লেন সেই ঘাঘু কর্মকর্তা। চা জল খাইয়ে
একটু ধাতস্থ হতেই দেখতে চাইলেন মেম্বারশীপ কার্ড। জামার পকেট থেকে মেম্বারশীপ কার্ডের সাথে বেরোলো একখানা হুইশিল্। ধমকের চোটে
সেই কর্মকর্তা জানতে পারলেন যে কোথা থেকে সেদিন এই হুইশিলখানা সেই ছেলেটির হাতে এসেছিল
এবং খেলার মাঝে তার কেন জানি না ইচ্ছে হয়েছিল সেই বাঁশিখানা বাজিয়ে পরীক্ষা করার।
বাচ্চা ছেলের
অহেতুক খাম্খেয়াল আর কি
!
এর মধ্যে আবার
শুরু হলো খেলা। এখন আর আমার মনে নেই যে সেই খেলার কি ফলাফল হয়েছিল। তবে খুব সম্ভবতঃ ড্র হয়েছিল ১-১ এ।
পরের দিন আমরা অফিসে গিয়ে জানলাম
যে, মুর্তিমান সেই ছেলেটি রমনী’দার এক ভাইপো।
##
১৭ই মে, ২০১৬