ইয়ারকাড -

ইড্‌লি দোসা আর সাম্বারের কারীপাতা খেতে খেতে চেন্নাই এর আশপাশের ম্যাপের সব জায়গাগুলোয় যখন টিক্‌ পড়ে গেছে আর ফেরার দিন দুয়েক বাকি আছে,  ভাবছেন কাছে পিঠে দুদিন কোথাও ঘুরে এলে মন্দ হ’ত না – তেমন সময় ঘুরে আসতে পারেন কাছাকাছি এক পাহাড়ি শহরে।  হৈ হৈ ক’রে কেটে যাবে দুদিনের এই ছোট্ট সফর।

৫ ঘন্টার কুঝিক্‌ঝিক্‌ এ সালেম। আর সালেম থেকে বাস বা চারচাকা। এক ঘন্টায় ইয়ারকাড।

সকাল ছ’টা দশের কোভাই এক্সপ্রেস বা সাত’টা দশের শতাব্দী চাপলে বেলা বারোটায় শৈলশহর ইয়ারকাডে হাত মুখ ধুয়ে লাঞ্চ এ বসে পড়া যায়।

তামিল ভাষায় ‘ইয়ার’ মানে হ্রদ আর ‘কাড’ বা ‘কাডু’ মানে জঙ্গল। ইয়ারকাড পৌঁছেই আপনার মন কেড়ে নেবে ইয়ারকাড লেক এর নীল জল। পূর্বঘাট পর্বতমালার ‘শেভারয়’ পাহাড়ে উত্তর তামিলনাড়ুর একমাত্র শৈলশহর ইয়ারকাড। শান্ত, নিরিবিলি, নির্জন।

১৮২০ সনে সালেমের কালেক্টর, ডেভিড কুকবার্ন সম্ভবত এই ইয়ারকাডে আসেন। ওনাকে তাই ইয়ারকাড জনপদের জনক বলা হয়। ১৮২৭ খ্রীষ্টাব্দে এই স্থানের জরীপের কাজ শুরু হয়। প্রধানত কফি চাষের উপযুক্ত আবহাওয়ার কারনে এই ইয়ারকাড ক্রমশ: জনপ্রিয় হতে থাকে। এরপর ১৮৭২ সাল থেকে আরম্ভ হয় সড়ক নির্মানের কাজ। ১৯০৩ সালে শেষ হয় এই কর্মকান্ড। ১৯১৭ সালে ইংরেজদিগের দ্বারা তৈরী হয় ইয়ারকাডের প্রথম বিদ্যালয়। "মন্ট ফোর্ট স্কুল"।  প্রথম মোটর বাইক চলে এখানে ১৯১৮ য়। আর ১৯২০ তে  সালেম শহর থেকে ইয়ারকাডের প্রথম বাস যাত্রা শুরু হয়। ইয়ারকাড এ বিদ্যুত আসে ১৯৩০ সালে। ১৯২৯ এ মেটুর বাঁধ তৈরী হইবার পর।

সালেম থেকে ৩৪ কিমি রাস্তা। খান বিশেক হেয়ারপিন বেণ্ড। সমস্ত রাস্তাটাই উঁচু উঁচু গাছে ছাওয়া। নীল ঘননীল আকাশ মাথার ওপরে। আম কাঁঠাল নিম ছাড়াও অজস্র গাছে ঢাকা এই পাহাড়শ্রেণী। মুগ্ধ করবেই…
ইয়ারকাড এর মূল আকর্ষণ এই লেক। গাছপালায় ঘেরা লেকটির টলটলে নীল জলে রয়েছে বোটিং করার ব্যবস্থা। লেকটিকে ঘিরে থাকা পিচঢালা রাস্তায় অনায়াস হেঁটে চলা। স্থানীয় মানুষজনের ছোট্ট ছোট্ট দোকানঘরে চা কফির স্বাদ। কোদাইকানাল কিম্বা উটি’র ভীড় মুক্তি। ‘নির্বাক নীল নির্মম মহাকাশ’ মাথার ওপর। 

পশ্চিম পাড়ে সূর্যাস্তের ছটা ঢাকা পড়ে গাছের ডালে ডালে। নির্জন রাস্তা আরো নির্জন। পাতা খসার গান তেমন হ’লে। 

“আর কি কখনো কবে     এমন সন্ধ্যা হবে--
     জনমের মতো হায় হয়ে গেল হারা ॥” 
রাত বাড়ে। পোকার ডাক আর হাওয়ার শব্দ।

*
পাণ্ডিয়া, চোলা, পল্লভ আর হোয়সালা রাজত্বের শাসনে থাকা এই সালেম এর নাম পাওয়া যায় ১৪শ শতাব্দীতেই। এর পরের ৫৫ বছর বিজয়নগরের অধীনে। হায়দার আলীর অধিকারে আসে সালেম দুর্গ। টিপু সুলতানের পতনের পর ১৭৭২ থেকে ইংরেজদের হাতে। 

জনশ্রুতি বলে সেই সময়ে এই জঙ্গলে প্রচুর হাতি ছিল। ১৮৩৬ এ এক জার্মান নিবাসী মৎস্যজীবী সালেম এর জমিদারের থেকে ২৫ হাজার একর জায়গা কেনেন। কফি চাষের জন্য ক্রমশ বিখ্যাত হ’তে থাকে ইয়ারকাড। পণ্ডিচেরী থেকে ফরাসী আর খ্রীষ্টান ব্যবসায়ীরা জমি কিনতে থাকেন। এখনো তাই ইয়ারকাড খ্রীষ্টান অধ্যুষিত।

ইয়ারকাডের রাস্তায় চলতে চলতে বাঙালির মননে ফুটবেই বিভুতিভূষণ। বেগনে ফুলের ঝরা থাকা পথে চলতে গিয়ে অকস্মাৎ মনে আসতেই পারে...

“......প্রকৃতি তাঁর নিজের ভক্তদের যা দেন, তা অতি অমূল্য দান। অনেক দিন ধরিয়া প্রকৃতির সেবা না করিলে কিন্তু সে দান মেলে না। আর কি ঈর্ষার স্বভাব প্রকৃতিরাণীর -- প্রকৃতিকে যখন চাহিব, তখন প্রকৃতিকে লইয়াই থকিতে হইবে, অন্য কোনো দিকে মন দিয়াছি যদি, অভিমানিনী কিছুতেই  তাঁর অবগুন্ঠন খুলিবেন না।
 
         কিন্তু অনন্যমনা হইয়া প্রকৃতিকে লইয়া ডুবিয়া থাকো, তাঁর সর্ব্ববিধ আনন্দের বর, সৌন্দর্যের বর, অপূর্ব শান্তির বর তোমার উপর অজস্রধারে এত বর্ষিত হইবে, তুমি দেখিয়া পাগল হইয়া উঠিবে, দিনরাত মোহিনী প্রকৃতিরাণী তোমাকে শতরূপে মুগ্ধ করিবেন, নূতন দৃষ্টি জাগ্রত করিয়া তুলিবেন, মনের আয়ু বাড়াইয়া দিবেন, অমরলোকের আভাসে অমরত্বের প্রান্তে উপনীত করাইবেন। ............”

কোদাই এর ভীড় আর উটি’র কোলাহলমুক্ত এই সবুজতার নাম ইয়ারকাড। স্বল্পপরিচিত এই শৈলশহর দু-তিন দিনের জন্য মন ভোলাবেই। 

গুনগুনিয়ে গেয়েও উঠতে পারেন...

 “আমি    সেতারেতে তার বেঁধেছি,    আমি     সুরলোকের সুর সেধেছি,
    তারি    তানে তানে মনে প্রাণে মিলিয়ে গলা গাও কি--
          হায় আসরেতে বুঝি এলে না।
     ডাক উঠেছে বারে বারে, তুমি সাড়া দাও কি !”

কণ্ডাকটেড্‌ ট্যুর এ একবেলায় ইয়ারকাডে দেখে নেওয়া - লেকের অদূরে সুসজ্জিত আন্না পার্ক, বিভিন্ন গোলাপ গাছের সমন্বয়ে রোজ গার্ডেন, ভিউ পয়েন্ট লেডিস সিট, জেন্টস সিট, কিল্লিয়ুর ফলস, হোলি ট্রিনিটি চার্চ, বিয়ারস কেভ, সিল্ক ফার্ম, হরটিকালচার হাউস, টেলিস্কোপ হাউস, দ্য রিট্রিট, অর্কিডোরিয়াম প্রভৃতি। 

৫৩৭৬ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত "Servarayon" মন্দির। ইতিহাস অনুযায়ী প্রায় ২০০০ বতসরের প্রাচীন গুহা মন্দির। প্রভু সর্ব্বরায়ন এবং কাবেরী মাতা এখানে গুহার মধ্যে অবস্থিত।  মন্দির প্রবেশকালে মাথা নীঁচু করে দেবদর্শন করতে হয়। বাঙলায় আমরা এই দেবতাটিকে কার্তিক বলে অভিহিত করে থাকি।  সমগ্র দক্ষিন ভারতের খুব প্রিয় এই দেবতাটির বিখ্যাত মন্দিরটি রয়েছে এই তামিলনাড়ুর তিরুচেন্দুর শহরে।

মহা মেরু চক্র মন্দির। ইয়ারকাড হ’তে অনধিক ৮ কিলোমিটার। 

ইয়ারকাডের বোটানিক্যাল গার্ডেন আকারে বড় না হলেও সারা ভারতে একটি বিশেষ স্থানের অধিকারী। এখানে আছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ অর্কিড গাছের সমাহার। কিন্তু এই সব অর্কিডের ফুল ফোটে সাধারণত এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ হ’তে মে মাসের শেষ পর্যন্ত। এই উদ্যানে রয়েছে, মহিলা চপ্পল (Ladies Slippler) নামক এক প্রকার অর্কিড, যা পোকা-মাকড় খেয়েই বেঁচে থাকে। 

লেডিজ সীট এর ভিউ পয়েন্ট থেকে নীচের সালেম শহর পুরো ৩৬০ডিগ্রী। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় কোনো এক ইংরেজ শ্বেতাঙ্গীনীর রোজকার বসবার জায়গা ছিল এটা। তার থেকেই এমন নাম। কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও সেই বিদেশিনী হয়তো এখনো প্রতি পূর্ণিমা রাতে এসে বসেন ইয়ারকাডের এই প্রমীলা আসনে...

“নদীর নামে নাম যে-নারীর, ভালবাসবে না
পায়ে পায়ে জড়িয়ে তোমায় নিয়ে অনেক দূর
হঠাৎ ফাঁকায় ছেড়ে দিয়ে হারিয়ে যাবে নিজে।
পায়ে পায়ে তখন ফেরা, পায়ে পায়েই ভিজে
দেখবে বিষৎ ফাঁক তবুও ভরাতে আসবে না
নদীর নামে নাম যে-নারীর ভালবাসবে না।” – গীতা চট্টোপাধ্যায়।  

আর কি রইল বাকি ?  ঘুরেই আসুন ইয়ারকাড। 

অলসভাবে ঘুরে বেড়ান লেকের চতুর্দিকে। শান্ত নীল সবুজ জলে চারদিকের তরুশ্রেণীর ছায়া দেখুন লেকের নীল জলে। স্কুল ছুটির শেষে মুক্ত মনে দেখুন ছাত্রছাত্রীদের ঘরে ফেরা। শুনুন নাম-না-জানা কতো না পাখীর ডাক। অনুভব করুন পাতা নড়ার শব্দ, হাওয়ার শব্দ। 

আর তারপর ? 

“শেষবার নামার আগে সমস্ত জিনিস পত্রগুলি
তালিকা মিলিয়ে নিতে হবে, এবার ভ্রমণকালে
প্রচুর সংগ্রহ হ’লো, মিনে-করা আগ্রার ফুলদানি।
জরির চপ্পল, দ্রুতগামী মেল ট্রেনে সচকিত
ভ্রূ-পল্লব, কী-কী ফেলে গেলে বাড়ি ফিরে দু:খ হবে?
যে আমগাছের ছায়া সঙ্গে নিয়ে আসা অসম্ভব
তা-ও বুঝি অজানিত হোল্ড-অলে বাঁধা হয়েছিলো,
আমগাছের ছায়ার ওজন জানা নেই, তাই করলে
বুকিং সম্ভব নয়, ভ্রূ-ভঙ্গির কুলি ভাড়া নেই।”  -   ভ্রমণ কাহিনী – তারাপদ রায়


#

©গৌতমদত্ত