ইয়ারকাড -
ইড্লি দোসা আর সাম্বারের কারীপাতা খেতে খেতে চেন্নাই এর আশপাশের ম্যাপের সব জায়গাগুলোয় যখন টিক্ পড়ে গেছে আর ফেরার দিন দুয়েক বাকি আছে, ভাবছেন কাছে পিঠে দুদিন কোথাও ঘুরে এলে মন্দ হ’ত না – তেমন সময় ঘুরে আসতে পারেন কাছাকাছি এক পাহাড়ি শহরে। হৈ হৈ ক’রে কেটে যাবে দুদিনের এই ছোট্ট সফর।
পশ্চিম পাড়ে সূর্যাস্তের ছটা ঢাকা পড়ে গাছের ডালে ডালে। নির্জন রাস্তা আরো নির্জন। পাতা খসার গান তেমন হ’লে।
জনমের মতো হায় হয়ে গেল হারা ॥”
রাত বাড়ে। পোকার ডাক আর হাওয়ার শব্দ।
কোদাই এর ভীড় আর উটি’র কোলাহলমুক্ত এই সবুজতার নাম ইয়ারকাড। স্বল্পপরিচিত এই শৈলশহর দু-তিন দিনের জন্য মন ভোলাবেই।
গুনগুনিয়ে গেয়েও উঠতে পারেন...
তারি তানে তানে মনে প্রাণে মিলিয়ে গলা গাও কি--
হায় আসরেতে বুঝি এলে না।
ডাক উঠেছে বারে বারে, তুমি সাড়া দাও কি !”
কণ্ডাকটেড্ ট্যুর এ একবেলায় ইয়ারকাডে দেখে নেওয়া - লেকের অদূরে সুসজ্জিত আন্না পার্ক, বিভিন্ন গোলাপ গাছের সমন্বয়ে রোজ গার্ডেন, ভিউ পয়েন্ট লেডিস সিট, জেন্টস সিট, কিল্লিয়ুর ফলস, হোলি ট্রিনিটি চার্চ, বিয়ারস কেভ, সিল্ক ফার্ম, হরটিকালচার হাউস, টেলিস্কোপ হাউস, দ্য রিট্রিট, অর্কিডোরিয়াম প্রভৃতি।
৫৩৭৬ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত "Servarayon" মন্দির। ইতিহাস অনুযায়ী প্রায় ২০০০ বতসরের প্রাচীন গুহা মন্দির। প্রভু সর্ব্বরায়ন এবং কাবেরী মাতা এখানে গুহার মধ্যে অবস্থিত। মন্দির প্রবেশকালে মাথা নীঁচু করে দেবদর্শন করতে হয়। বাঙলায় আমরা এই দেবতাটিকে কার্তিক বলে অভিহিত করে থাকি। সমগ্র দক্ষিন ভারতের খুব প্রিয় এই দেবতাটির বিখ্যাত মন্দিরটি রয়েছে এই তামিলনাড়ুর তিরুচেন্দুর শহরে।
মহা মেরু চক্র মন্দির। ইয়ারকাড হ’তে অনধিক ৮ কিলোমিটার।
ইয়ারকাডের বোটানিক্যাল গার্ডেন আকারে বড় না হলেও সারা ভারতে একটি বিশেষ স্থানের অধিকারী। এখানে আছে বিভিন্ন প্রজাতির দুর্লভ অর্কিড গাছের সমাহার। কিন্তু এই সব অর্কিডের ফুল ফোটে সাধারণত এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ হ’তে মে মাসের শেষ পর্যন্ত। এই উদ্যানে রয়েছে, মহিলা চপ্পল (Ladies Slippler) নামক এক প্রকার অর্কিড, যা পোকা-মাকড় খেয়েই বেঁচে থাকে।
লেডিজ সীট এর ভিউ পয়েন্ট থেকে নীচের সালেম শহর পুরো ৩৬০ডিগ্রী। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় কোনো এক ইংরেজ শ্বেতাঙ্গীনীর রোজকার বসবার জায়গা ছিল এটা। তার থেকেই এমন নাম। কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও সেই বিদেশিনী হয়তো এখনো প্রতি পূর্ণিমা রাতে এসে বসেন ইয়ারকাডের এই প্রমীলা আসনে...
পায়ে পায়ে জড়িয়ে তোমায় নিয়ে অনেক দূর
হঠাৎ ফাঁকায় ছেড়ে দিয়ে হারিয়ে যাবে নিজে।
পায়ে পায়ে তখন ফেরা, পায়ে পায়েই ভিজে
দেখবে বিষৎ ফাঁক তবুও ভরাতে আসবে না
নদীর নামে নাম যে-নারীর ভালবাসবে না।” – গীতা চট্টোপাধ্যায়।
আর কি রইল বাকি ? ঘুরেই আসুন ইয়ারকাড।
অলসভাবে ঘুরে বেড়ান লেকের চতুর্দিকে। শান্ত নীল সবুজ জলে চারদিকের তরুশ্রেণীর ছায়া দেখুন লেকের নীল জলে। স্কুল ছুটির শেষে মুক্ত মনে দেখুন ছাত্রছাত্রীদের ঘরে ফেরা। শুনুন নাম-না-জানা কতো না পাখীর ডাক। অনুভব করুন পাতা নড়ার শব্দ, হাওয়ার শব্দ।
আর তারপর ?
তালিকা মিলিয়ে নিতে হবে, এবার ভ্রমণকালে
প্রচুর সংগ্রহ হ’লো, মিনে-করা আগ্রার ফুলদানি।
জরির চপ্পল, দ্রুতগামী মেল ট্রেনে সচকিত
ভ্রূ-পল্লব, কী-কী ফেলে গেলে বাড়ি ফিরে দু:খ হবে?
যে আমগাছের ছায়া সঙ্গে নিয়ে আসা অসম্ভব
তা-ও বুঝি অজানিত হোল্ড-অলে বাঁধা হয়েছিলো,
আমগাছের ছায়ার ওজন জানা নেই, তাই করলে
বুকিং সম্ভব নয়, ভ্রূ-ভঙ্গির কুলি ভাড়া নেই।” - ভ্রমণ কাহিনী – তারাপদ রায়
#
©গৌতমদত্ত




