মুম্বাই-গোয়া-হায়দ্রাবাদ দর্শন
গতকল্য পৌছিয়াছি বাণিজ্য-নগরী মুম্বাই এ। স্পাইসজেটের উড়োজাহাজটি আমাদের প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় নষ্ট করিয়া দিল দুটি কারণে। প্রথমত: দমদমের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বিমানবন্দর হইতে প্রায় দশটি মিনিট নয়ছয় করিল রানওয়ে পরিত্যাগ করিতে। আর দ্বিতীয়ত মুম্বাইয়ের ছত্রপতি শিবাজি বিমানবন্দরে উপরে প্রায় অর্ধঘন্টা ধরিয়া পাক খাইল, নামিবার অনুমতি না পাইবার হেতু। অতএব বিমানের তেল'তো পুড়িলোই, উপরন্তু মুম্বাই নগরীতে আমাদের স্থায়িত্বও কমিয়া গেল। সুতরাং দ্রুত পৌঁছাইবার আনন্দের নৃত্যেও ব্যাঘাত ঘটিল।
অত:পর নির্দিষ্ট হোটেলে আগমন করিলাম। ক্লান্তিজনিত কারণে দ্বিপ্রহরের নিদ্রা যখন ভাঙিল, তখন পশ্চিম প্রান্তের এই নগরীর বুকে রাত নামিয়াছে। নিদ্রামগ্ন হইবার পূর্বে অভিসন্ধি করিয়াছিলাম, বৈকালে সাগর দেখিব। আরব সাগরের জল সত্যই লবনাক্ত কি না, তাহা পরীক্ষা করিব। কিন্তু বিধি বাম। অগত্যা গিন্নি সমীপে বাহির হইয়া দেখিলাম মুম্বাইএর প্রধান রেল ষ্টেশন ভিক্টোরিয়া টারমিনাসকে, অধুনা যাহা ছত্রপতি শিবাজি টারমিনাস বলিয়া পরিচিত। রাত্রির আকাশকে পশ্চাতে রাখিয়া অপূর্ব আলোকবর্ণে সজ্জিত এই সুন্দর স্থাপত্যের প্রাচীন নিদর্শনটি। আর দেখিলাম, কর্ম ফেরত মুম্বাইবাসীর গৃহে প্রর্ত্যাবর্তনের দ্রুতগামী চলাফেরা।
আজ বাহির হইলাম প্রাত: নয়
ঘটিকায়। লক্ষ্য স্থির, এলিফ্যান্টা গুহা দর্শন। এতবার
মুম্বাই আসিয়াছি তথাপি এই প্রাচীন গুহাটি আমার কাছে অদর্শিতই ছিল। ইহা একটি দ্বীপে
অবস্থিত। মুম্বাই এর প্রবেশদ্বার গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া হইতে জলপথে দশ কিলোমিটার। অতএব
যাইতে হইবে গেটওয়ে (মুম্বাইবাসীর আদরের নাম)।
প্রয়োজন ট্যাক্সির। কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখিলাম, মুম্বাই এর ঐতিহ্যের ট্যাক্সি প্রায় ধরিয়া ফেলিয়াছে কলিকাতার ট্যাক্সিচালকের কর্ম-সংস্কৃতি। গোটা ছয়েক ট্যাক্সির প্রত্যাখ্যানের পর একটি পুরানো "ফিয়াট" ট্যাক্সিতে চড়িবার সৌভাগ্য লাভ হইল। তবে অবাক হইলাম ট্যাক্সির মিটারে দৃষ্টি পড়াতে। শুরুতেই বাইশ টাকা। তিন টাকা লাভ হইয়া গেল কলিকাতার তুলনায় !
ড্রাইভার সাহেব মানুষটি মন্দ নহেন। জিজ্ঞাসা ছিল বিলীন হইয়া যাওয়া এই মোটর গাড়িটির যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় কিভাবে। জানিলাম, দুই একটি জায়গায় এখনো এই গাড়ির সব কিছু পাওয়া যায়। এককালে মুম্বাই নগরী দাপাইয়া বেড়াইত এই "ফিয়াট"। কলিকাতায় একটু স্বচ্ছল মানুষজন ব্যবহার করিতেন ফিয়াট। কোথায় হারাইয়া গেল সব ! "মারুতি" দখল করিয়া নিয়াছে মুম্বাইয়ের এই চারিচক্রের ট্রাডিশন। তবু এখনো কিছু ফিয়াট ট্যাক্সি রহিয়া গিয়াছে, "অযান্ত্রিক" এর এইসব ড্রাইভারকুলের নিকট। ভাবিয়া দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়িল বটে, তবে নি:শব্দ লজ্জায় !
ট্যাক্সি পৌঁছাইল গেটওয়ে। সম্মুখে সেই ঐতিহাসিক স্থাপত্যের নিদর্শন সুবৃহত এই দরজা। মুম্বাই নগরীর সুস্বাগতমের প্রতিভূ হইয়া দন্ডায়মান সেই ইংরেজ রাজত্ব হইতে। পশ্চাতে টাটা নির্মিত ঐতিহ্যশালী পঞ্চতারকাবিশিষ্ঠ তাজমহল হোটেল। দুটি প্রাসাদে অবস্থিত। একটি প্রাচীন স্থাপত্যের অধিকারী, অন্যটি আধুনিক স্থপত্যবিদ্যার কুশলী প্রয়োগে গগনচুম্বী সমুজ্জল বিস্তার।
অত:পর টিকিট কাটিয়া তরণী আরোহন। আমাদের হাওড়া-বিবাদি বাগের
জলযাত্রায় ব্যবহৃত তরণী সদৃশ আয়তনের একটির ছাদে চড়িয়া উপবিষ্ট হইলাম,
বাড়তি
দশ-দশটি মুদ্রা গুনিয়া দিয়া ! ভারতবর্ষের
এই আধুনিক ট্রাডিশন সর্বত্রই বিরাজমান দেখিয়া আহ্লাদিত হইলাম। ওহো ! পাঞ্জাব সিন্ধু গুজরাট মারাঠা দ্রাবিড় উতকল
বঙ্গ !
বিশ্বকবির এই একটি পংক্তিতে
ভারতবর্ষ কতোই না সহিষ্ণু আজ। একটু বেপথে মুদ্রা আহরণের কোনো প্রকারেরই
"অসহিষ্ণুতা"ই গ্রাস করে নাই ভারতবাসীকে।
প্রমোদ তরণীর যাত্রা শুরু হইল।
দশ কিলোমিটারের জলযাত্রাপথ। ছাদে মৃদুমন্দ আরবসাগরী বাতাস। ক্রমে ক্রমে গেটওয়ের
সহিত আমাদের দূরত্ব বর্ধিত হইতে লাগিল। ডান পার্শ্বে নৌ-সেনাবাহিনীর অগুন্তি
ক্ষুদ্র-বৃহত রনতরীগুলি দেখিতে দেখিতে অগ্রসর হইতে লাগিলাম। কিছু পরে দেখা দিতে
শুরু করিল বোম্বে-হাই এর খনিজ তৈল উত্তোলনকারী রিগ মালা। আরব সাগরের বুক চিরে পাইপ
লাইনের দীর্ঘ পথ। ক্রমে দেখা দিল ওএনজিসি'র
তৈলাধার সমূহ। প্রকৌশলবিদ্যা আর যন্ত্রের বিভিন্ন ব্যবহারে বর্তমানে সমুদ্রের
তলদেশ হইতে উত্তোলিত হইতেছে খনিজ তৈল আর গ্যাস। যা অল্প হইলেও সাশ্রয় করিতেছে
আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার।
এক ঘন্টার এই জলযাত্রার
সমাপ্তির দিকে আমাদের দুই পার্শ্বে দেখা দিল অগুন্তি সীগালের ঝাঁক। খাদ্যের লোভে।
অপূর্ব সে শোভা। কিচির-মিচির ধ্বনিতে মুখরিত হইয়া উঠিল যাত্রা শেষাংষটি। অবশেষে
দ্বীপটির ঘাটে ভিড়িল আমাদের তরণী।
(আমাদের লঞ্চের সাথে
সী-গালেদের ওড়াউড়ি)
সমুদ্রের উপর দিয়া এক দীর্ঘ এক
সেতু চলিয়া গিয়াছে। প্রায় এক কিলোমিটার তো হইবেই। খেলনা রেলগাড়ীর ব্যবস্থা রহিয়াছে
দেখিলাম। কিন্তু আজ তাহা বন্ধ মনে হইল কারণ যাওয়া এবং আসার দুই পথেই চলিতে দেখিলাম
না। বয়স্ক মানুষদের পক্ষে বেশ অনেকটাই পথ। অগত্যা হাঁটিতেই হইল।
(এলিফ্যান্টার
প্রবেশ করার রাস্তা)
পৌঁছনো গেল এলিফ্যান্টা গুহার
প্রবেশ পথের প্রান্তে। দুই ধারের বিপণি সমূহের মধ্যেকার সোপান শ্রেণী উঠিয়া গিয়াছে
গুহার দিকে। বয়স্ক-বয়স্কা'দের জন্যে
দুই বাহক বাহিত ডাণ্ডির ব্যবস্থা রহিয়াছে। যেহেতু মনেপ্রাণে এখনো সক্ষম তাই
হাঁপাইতে হাঁপাইতে অতিক্রম করা গেল অনেকখানি উচ্চতা। সর্বদাই মনে হইতে লাগিল
"কত দূর, আর কত দূর, বলো
মা ! "
প্রবেশ পথে পুনরায়
প্রবেশমূল্যের বিজ্ঞপ্তি। নীচে একবার পাঁচ টাকা লইয়াছে। এ কথা জানাইতে কাউন্টার হইতে উত্তর আসিল - ওটা গ্রাম
পঞ্চায়েতে'র। হায় ! দ্বীপেও গ্রাম ! সত্য সেলুকাস ! কি বিচিত্র এই দেশ।
১৯৮৭ খ্রীষ্টাব্দে ইউনিসেফ এর পৃথিবীর ঐতিহ্যশালী তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এই পুরাতন গুহাটি। ইহা ছাড়া এটি ভারতীয় পুরাতাত্বিক সংস্থার অধীন বর্তমানে। তাই দশ টাকার প্রবেশমূল্য চোকাইতেই হইল। তবে সান্ত্বনা এই যে, আলোকচিত্র তুলিতে কোনো আলাদা মূল্যের প্রয়োজন নাই।
গাইড বা প্রদর্শক লইতেই হইল।
পুরাতত্ত্ব বিভাগের গাইড না পাওয়াতে স্থানীয় গাইড নিতে মন চাইল না। তাই একটি
পুস্তিকার ভরসায় শুরু করিলাম মূল মন্দিরটি দর্শন। কিন্তু ওপরওয়ালার ইচ্ছা
ব্যতিক্রমী। একজন সিকিউরিটি গার্ড পরিস্কার বাংলায় বলিলেন, স্যার,
আপনি
কি গাইড খুঁজিতেছেন ? বলিলাম,
হ্যাঁ,
তবে
পুরাতত্ত্ব বিভাগের।
-- পাইবেন না। বিদেশী
অতিথিদিগের জন্য ওরা নিবেদিতপ্রাণ। পাইবেন না।
-- তাহা হইলে প্রয়োজন নাই।
-- স্যার,
কিছু
যদি মনে না করেন, আমি আপনাদের প্রদর্শক হইতে পারি।
আমি বাংলায় বলিতেও পারিব। ঝাড়খন্ডের
মানুষ আমি। শ্বশুরালয় আসানসোলে।
অবশেষে দুই শত টাকায় রফা হইল
পাহারাদারের গাইডগিরি। সহিষ্ণু ভারত !
(এলিফ্যান্টা গুহায়
বিভিন্ন স্থাপত্য –
মূলতঃ শিব-পার্বতী’র)
এই গুহাগুলি খ্রীষ্টপূর্ব তিনশ বতসর পূর্বের। দুই শত টাকার গাইডের বর্ণনা শুরু, যদিও আমি বইতে পাচ্ছি সপ্তম শতাব্দীর একটি শিলালিপি অনুযায়ী দ্বিতীয় পুলকেশীর সময়কালে এই গুহাগুলির নির্মাণ হয়েছিল নাবিকদের আশ্রয় দিবার অভিলাষে। পরবর্তী কালে এই গুহাগুলি মন্দিরে পরিণত হয়। শিবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন নান্দনিক ভাস্কর্য এ পূর্ণ হতে থাকে মন্দির প্রাঙ্গন।
১৫৩৪ খ্রীষ্টাব্দে পর্তুগীজ এর
অধীনে যায় এই দ্বীপ। পুনরায় ১৬৮২ খ্রী: এ মারাঠা রাজত্বের অন্তর্গত হয়। এবং ইংরেজ
শাসনে যায় ১৭৭৪ সনে।
"""
প্রাচীন কালে এর নাম ছিল ‘ঘরাপুরিচি
লেনি’। এর অর্থ হল ‘গুহার
শহর’। পর্তুগিজ জমানায় ১৫৩৪ সালে অঞ্চলটি আবিষ্কৃত
হয়। প্রায় আড়াই কিলোমিটার ব্যাপ্ত দুটো পাহাড় নিয়ে ৫০০ ফুট উচ্চতার এলিফ্যান্টা
কেভ অনেকটা হাতির মাথার মতো। গুহাটি খুবই বিধ্বস্ত অবস্থায় ছিল। ১৯৭০ সালে গুহাটি
নতুন করে সংস্কার করা হয় এবং এখন এটি ইউনেসকো-র ‘বিশ্ব
বিরাসত্ স্থল’ অর্থাত্ ‘ওয়ার্ল্ড
হেরিটেজ’ তকমায় ভূষিত হয়েছে।
দেবাদিদেব মহাদেবকে উদ্দিষ্ট
করে পঞ্চম থেকে অষ্টম শতকে মোট সাতটি গুহা নির্মিত হয়েছিল। পুরো পাহাড়টাই পোক্ত
ব্যাসল্ট পাথরে নির্মিত। দুটি শাখা আছে এলিফ্যান্টা গুহার। প্রথম ৫টি হল হিন্দু
গুহা এবং বাকি দুটি বৌদ্ধ গুহা, যাকে বৌদ্ধ
মতে ‘স্তূপ’ বলা
হয়। আরবসাগরের দিকে মুখ ফেরানো প্রথম গুহাটি প্রায় ১.৬ কিমি প্রশস্ত। সারি সারি
থাম ও ছড়ানো দালান। দেওয়ালে নানা মূর্তি। এই মহামূর্তি প্যানেলে মহাদেবের ‘ত্রিমূর্তি’ খোদাই
করা। মহাদেবের এই ত্রিমূর্তি হল একাধারে ‘ভৈরব’ অর্থাত্
প্রলয়, ‘তপ্তপুরুষ’ অর্থাত্
স্থিতি বা রক্ষাকারী এবং ‘বামদেব’ অর্থাত্
সৃষ্টির প্রতিভূ। সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়স্বরূপ শিবের পাষাণপ্রতিমা হিন্দুদের প্রার্থনাস্থল
ছিল এক সময়ে। পুরো অঞ্চল জুড়ে শিব-পার্বতীর নানা পৌরাণিক কাহিনি পাথরে খোদাই করা রয়েছে।
রয়েছে শিবের ‘অর্ধনারীশ্বর’ মূর্তি
ও ‘গঙ্গাধর’ মূর্তি।
এলিফ্যান্টা গুহার টিকিটঘরের কাছেই ছোট জাদুঘরে এই প্রাচীন গুহার ইতিকথা নথিবদ্ধ
করা আছে।
(অন্যান্য গুহা,
এলিফ্যান্টা)
বাকি গুহাগুলিও সামান্য এগিয়ে।
ডান পাশে বাঁক নিয়ে একে একে ২, ৩,
৪,
৫
নামাঙ্কিত গুহা সমুদয়। দ্রষ্টব্য অবশ্য তেমন কিছু নেই। প্রাচীনতার ছাপ এর রন্ধ্রে
রন্ধ্রে। এলিফ্যান্টা গুহা থেকে ফিরতিপথে জেটির দিকে না নেমে,
বাঁ-হাতি
পথে কিছুটা সময় হেঁটে গেলে দেখা যাবে ‘ক্যানন হিল’। পর্তুগিজ
জমানায় এখানে কামান বসানো ছিল। বছরের গোড়ায় ইতিহাসকে সাক্ষী রেখে এই গুহাভ্রমণ এনে
দেবে প্রাচীনতার আস্বাদ।
""'
কৃতজ্ঞতা - আনন্দবাজার পত্রিকা,
২-১২-২০১৫
(এলিফ্যান্টা গুহার
রাস্তায় বিভিন্ন দোকানের সামগ্রী)
গুহা দর্শন সমাপ্ত করিয়া
পুনরায় খর রৌদ্রের তপ্ত কিরনে স্নান করিতে করিতে উপস্থিত হইলাম জাহাজঘাটায়। ফিরতি
তরণী ধরিবার উদ্দেশ্যে। প্রায় ঘন্টাকাল জলভ্রমণের ইতি ঘটিল সেই গেটওয়ে অব
ইন্ডিয়াতেই।
(তারাপুরওয়ালা মৎস একোরিয়াম)
এরপর পুনরায় একটি ট্যাক্সিযান
ধরিয়া চলিলাম "তারাপুরওয়ালা মৎস একোরিয়াম" এর দিকে। দ্বিপ্রহরের খরতর
রৌদ্রের মধ্যেই বাম দিকে আরব সমুদ্র দেখা দিল। হু হু করিয়া 'মেরিন
ড্রাইভ রোড' এ ছুটিতে লাগিল ট্যাক্সি। কিছুটা যাইয়াই
ডান দিকে পড়িল মিউজিয়ামটি। নামিলাম।
এটি ভারতবর্ষের একটি প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণী গবেষণা কেন্দ্র। আমার অনেক কাল পূর্বেই দেখা ছিল। ভাবিয়াছিলাম এখন আরো আধুনিকিকরন ঘটিয়াছে নিশ্চয়ই। কিন্তু কিছু একোরিয়াম বা মতসাধারের আয়তন বৃদ্ধি ব্যতীত কিছুই ঘটে নাই। অধিকাংশই ফাঁকা অথবা দুচারিটি মতস রহিয়াছে। বিদেশী মতস তো নাই বলিলেই চলে, এমন কি দেশী মতসের ও আকাল লাগিয়াছে। অথচ প্রবেশ দক্ষিণা ষাট টাকা। মুঠোফোনে ছবি তুলিতে পাঁচশত, স্থির ক্যামেরায় পাঁচ হাজার এবং অস্থির ক্যামেরার জন্য দশটি হাজার টাকার প্রজ্ঞায়িত বিবরণী কাউন্টারের উপরে শোভিত। সৌভাগ্যবশত: মন নিশপিশ করিলেও, করুণাময় এর তাতক্ষনিক আশীর্বাদে পাঁচশত টাকার সাক্ষাত ক্ষতি হইতে বাঁচিয়া গেলাম, বলাই বাহুল্য।
মৎস দর্শন সমাপান্তে ফিরিলাম আমাদের হোটেলে। আজকের মতো মুম্বাই দর্শন সমাপ্ত করিলাম।
দ্বিতীয় পর্ব
০২-১২-২০১৫
আজ মুম্বাই দর্শনের দ্বিতীয় পর্ব।
হোটেলের বিনামূল্যের প্রাতরাশ
(যাহাকে যাবনিক ভাষায় "কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট") গলাধঃকরণ সাঙ্গ
করিয়া পুনরায় বাহির হইলাম। হোটেলের সম্মুখে ট্যাক্সি আমার গন্তব্য শ্রবনপূর্বক
যথারীতি যাইতে অপারগ। রাস্তার অপর পারে এক মুসলিম ড্রাইভার মহাশয় আমাকে ডাকিয়া
লইলেন। যাত্রা শুরু হইল। লক্ষ্য সিদ্ধি বিনায়ক মন্দির। অনেকটাই পথ। গুগুল ম্যাপে
দেখাইল প্রায় অর্ধঘন্টার যাত্রাসময়। কিন্তু ওই ম্যাপে তো আর যানজটের পরিভাষা থাকে
না। আর এইবারে দেখিতেছি মুম্বাইয়ের যান-চলাচল ব্যবস্থা, আমাদের
কলিকাতাকে প্রায় ধরিয়া ফেলিয়াছে। পাঁচ হস্ত অন্তর লাল-হলুদ-সবুজ আলোর রক্তচক্ষু
গোটা নগরীকে গ্রাস করিয়াছে।
অতএব অর্ধঘন্টা প্রায়
পূর্ণঘন্টায় পৌঁছাইল। মেরিন ড্রাইভ কে ডাহিনে রাখিয়া পথ ঘুরিল। দেখা গেল যশোলোক হাসপাতাল। কিয়ৎ পরে বাম দিকে
আচমকা চক্ষু পড়িল। দেখিলাম হাঁটু অবধি
ধুতি আর সাদা ফতুয়া পরিহিত এক বিখ্যাত বঙ্গসন্তানের দূরদৃষ্টির কি নিদারুণ পরিণতি
! ভগ্নপ্রায় কারখানা-শেড। কলিকাতা হইতে প্রায় ২২০০ কিলোমিটারের রেলপথের দূরত্বে,
বিজ্ঞান
সাধক প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সাধের "বেঙ্গল কেমিক্যালে'র"
সাইনবোর্ড। বাঙালীর ব্যবসাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন তদানীনকার বাণিজ্য নগরীতে ! একথা ক'জন
বাঙালি জানে ?
চোখদুটি অজান্তেই ঝাপসা হইল।
গান্ধী পরিবারের জন্মদিন পালনের মহোৎসবে কলিকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে অর্থের অভাব নাই
কিন্তু এই মনিষীর স্মরণ-মননে কি দুর্মর অনীহা ! খুব সম্ভবত,
অগোচরেই
বিগত হইল পি সি রায়ের শতেক বর্ষের জন্মদিনটি। হায় বাঙালী ! আমরা আবার বিচার করি বিভিন্ন জাতির
কার্য্যপ্রণালী। পাড়ায় পাড়ায় স্থাপন করি জাতীয় কংগ্রেসের বিখ্যাত সব নেতাদিগের
শুভ্র মূর্তি।
(হাজী আলী'র দরগাহ)
বাম দিকে অদূরেই দেখা দিল
বিখ্যাত হাজী আলী'র দরগাহ। সমুদ্রের উপরেই বলা যায়। আরো
কিছুক্ষণ চলিবার পর ট্যাক্সি থামিল সিদ্ধি বিনায়ক মন্দিরের অপর পারে।
( মুম্বাই এর দাদারে
- সিদ্ধি বিনায়ক মন্দির)
বিশাল মন্দির,
ততোধিক
এলাহি আয়োজন। মুম্বাই চলচিত্র জগতের প্রভূত নায়ক নায়িকাদিগের আদরনীয়,
এই
সিদ্ধিদাতা দূর্গাপুত্র। এঁদের নিজস্ব ওয়েব সাইট হইতে জানিতে পারিলাম কিছু তথ্য।
সুপ্রাচীন এই মন্দির। ১৮০১ সালে প্রতিষ্ঠিত। পরবর্তী সময়ে পাতিল পরিবারের কোনো এক
মহিলা, সন্তান কামনায় এই সিদ্ধিদাতাকে মানত
করিয়াছিলেন এবং তাহা ফলবান হওয়ায় উক্ত পাতিল পরিবার এই আধুনিক মন্দিরটি নবরূপে
রূপায়ন করেন। ব্যবস্থা অতীব নিঁখুত। মন্দির চত্বর পরিপাটি। পূজা দানের উত্তম
ব্যবস্থা। পূজার ডালির মূল্য বেশ দূর্মুল্য। দেড়শত টাকা হইতে শুরু। বাণিজ্য-নগরীর
দেবতা বলিয়া কথা !
অত:পর সিদ্ধিদাতার স্নেহের
ভগিনী লক্ষ্মী দেবীর মন্দিরের উদ্দেশ্যে পুনরায় ট্যাক্সি আবাহন। এই বারে এক ডাকেই
সিদ্ধিমাত ! সবে দেড়শত টাকার পুজা
চড়াইয়াছেন আমার গিন্নি। ফললাভ না হইয়া যাইবে কোথায় ?
তবে এক্ষণে একটি কথার অবতারণা
করা খুবই আবশ্যক। কলিকাতার ট্যাক্সি-চালকের সর্বগুণসকল এই মুম্বাই
ট্যাক্সি-চালকেরা এখনো অর্জন করিতে শিখে নাই। তাহাই বলি। ধরুন,
আপনার
গন্তব্যে পৌঁছাইয়া দেখিলেন যে মিটারে ২৮ টাকা জ্বলজ্বল করিতেছে লোহিত বর্ণে। আপনি
স্বাভাবিক ভাবেই তিনটি দশটি টাকা দিবেন। এবং কলিকাতা হইলে ফেরৎ চাহিয়া লজ্জায়
পড়িবেন না। মুম্বাইতে কিন্তু ফেরৎ পাইবেন। একান্ত যদি দুই টাকার স্থানে একটাকা
চালকের নিকট থাকে, তাহা হইলে, অন্তত
একবার দু:খপ্রকাশের কথা শুনিবেন। তফাৎ ইহাই।
পৌঁছাইয়া গেলাম মহালক্ষী
মন্দিরপ্রান্তে। এই স্থানে হয়তো ভগিনী বলিয়াই, পূজার
ডালি কিঞ্চিৎ সস্তা পড়িল। একখানি আস্ত টাকা। মানে একশত টাকার একখানি নোট।
স্টিলের কাঁসি'তে
আধখানি নারিকেল, অল্প একটু নকুলদানা,
একটি
সুন্দর মালা আর অপূর্ব একটি শালুক ফুল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিবার পর দ্বার খুলিল
গর্ভগৃহের। স্বর্ণকায় তিনখানি মুখমন্ডল। মহাকালী, মহালক্ষী
আর সরস্বতীর। অপুর্ব মুর্তিত্রিষ্টয়। চক্ষু জুড়াইয়া গেল দর্শন করিয়া।
(মহালক্ষী মন্দিরের
দোকানগুলি)
দুইটি মন্দিরগৃহেই আলোকচিত্রের
নিষেধাজ্ঞা বলবৎ। সিদ্ধিবিনায়কে ক্যামেরা রাখিতে হইয়াছিল নগদ কুড়িটি টাকা দিয়া
মন্দিরের লকার ঘরে, এপিক কার্ড প্রদর্শন পূর্বক। বলিতে হইয়াছিল,
মুঠোফনের
পরিচিতিজ্ঞাপক দশটি সংখ্যা। মন্দিরের খাতায় আমার বিবরনের পার্শ্বে একটি স্বাক্ষর
করিবার পর একটি চাবি পাইয়াছিলাম অযাচিতরূপেই। আর এই মহালক্ষী মন্দিরে আমার
পিঠব্যাগ অনুসন্ধানের পরে সিকিউরিটির একজন ছাড়িয়া দিলেন একটি শর্তসাপেক্ষে। বলিলেন,
ভিতরে
কিন্তু ভুল করিয়াও ক্যামেরার বোতাম টিপিবেন না।
(হোটেল নিউ বেঙ্গল,
মুম্বাই, ভি টি)
ফিরিলাম হোটেল নিউ বেঙ্গলে।
মুম্বাই ভি টি ষ্টেশনের পাশেই এই হোটেলটি। আশির দশকে একবার ত্রিরাত্রি
কাটাইয়াছিলাম নিদ্রাহীন অবস্থায়। ছারপোকা সান্নিধ্যে। সুতরাং যখন অন লাইনে,
মানে
ওয়েব সাইটের মাধ্যমে ঘর-সংরক্ষণ করিয়াছিলাম তখনো সন্দেহ ছিল অর্ধাঙ্গিনীর নিকট ঝাড়
খাইবার। কিন্তু দেখিলাম হোটেলটি নতুন করিয়া সাজিয়াছে। গত দুটি রাত্রি নিশ্চিন্ত
এবং নিরুপদ্রবে নিদ্রা গিয়াছি। সুতরাং মাভৈ !
বৈকালে পুনরায় মুম্বাইকে আরো
একবার দেখিবার ঔৎসুক্য জাগিল। আগামীকাল প্রাতেই বিদায় নিতে হইবে এই সদাব্যস্ত
বাণিজ্য নগরী হইতে। তাই আবার যাইলাম গেটওয়েতে। কিন্তু আজ এই স্থানে ভারতীয়
নৌবাহিনী'র কোনো অনুষ্ঠান চলিতেছিল তাই
অনেকাংশই সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। অগত্যা চলিলাম চৌপট্টি। মুম্বাই নগরীর একটি
দিক প্রায় অর্ধচন্দ্রাকারে আরব সমুদ্রের পাড় বরাবর বিস্তৃত। পাশ দিয়ে চওড়া পায়ে চলা
পথ। বসিবার জায়গা। আর তার পাশে পাশে যে রাজপথটি চলিয়াছে, ইংরেজগণ
তাহার নাম রাখিয়াছিল "মেরিন ড্রাইভ রোড"। ইহার এক প্রান্তে
"নরিম্যান পয়েন্ট"। অপর প্রান্তে
"মালাবার হিল"। এই নরিম্যান পয়েন্টকে নগরীর অফিস পাড়া বলা হয়।
সুউচ্চ বহুতল অফিসগৃহগুলি নি:সন্দেহে আরব সাগরের পারের শোভা,
যাহা
দূর হইতে নয়নাভিরাম। আর এক দিকে অভিজাত
মুম্বাইবাসীর বিত্তশালী পাড়া, মালাবার হিল।
সাঁঝের বাতিগুলি যখন সমগ্র মেরিন ড্রাইভ বরাবর আলোকিত হয়ে ওঠে,
তখন
এই মালাবার পাহাড়ের ঝুলন্ত উদ্যান থেকে মনে হয় বিশাল এক রূপালী নেকলেস। ব্রিটিশরা
আদর করিয়া বলিত "কুইনস নেকলেস"।
বেশ অনেকক্ষন বসিয়াছিলাম মেরিন
ড্রাইভের বাঁধানো পারে। হকার বর্জিত প্রায় ৮ কিলোমিটার চওড়া পায়ে চলা পথ সত্যই এক
বিরল ধারণার জন্ম দেয় মনে। ইচ্ছা থাকিলে এতখানি একটি স্থানকে হকারমুক্ত রাখা যায়।
বস্তুত: মুম্বাই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ যে সমস্ত জায়গা হকারদের ব্যবসা চলে তাহা
সমস্তই চক্রযুক্ত একটি বাহনের উপর। রাতের ফুটপাথ একেবারে শুনশান পরেরদিনের সকাল
অবধি। আর মূল রাজপথের দুধারে, রাত্রে
কোনোপ্রকার যানবাহনের গ্যারাজ করিবার জায়গা যে নহে, তাহা
অনুভব করিলাম ভারতের পূর্বপ্রান্ত হইতে এই পশ্চিমা নগরীতে আসিয়া।
(সন্ধ্যা নামছে মুম্বাই এর মেরিন ড্রাইভে)
আরো একটি কথা বলি। মুম্বাই
নগরীর সরকারী পরিবহন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা "Best" নামক
একটি সরকারী সংস্থার অধিগত। এখানে এবারেও চোখে পড়িল সেই কোন দূর যুগের "ডাবল
ডেকার" বাসগুলি। হু হু করিয়া ছুটিতেছে। আর আছে একতলা সেই লেল্যান্ডের বাস।
এখানকার আঞ্চলিক সরকার এই নগরীতে "ঝুনুর মা"র (JNNRUM) বাস
কিনিবার কেন্দ্রীয় সরকারী চাপ অক্লেশে দূরে ঠেলে দিয়েছেন তাহা বুঝিতে খুব বেশী
বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন পড়ে না। লাল রঙের সেই পুরাতন বাসগুলি এখনো মুম্বাইএর সেই পুরানো
দিনগুলি ধরিয়া রাখিয়াছে। বিশেষত দোতলা বাসগুলি।
তৃতীয় পর্ব
০৩-১২-২০১৫
মুঠোফোনের বাজনার সংকেত জানান
দিল উঠিয়া পরিতে হইবে। ভোর সাড়ে চারটে। আজ ছাড়িয়া যাইব মুম্বাই। সকাল সাত ঘটিকায় ছত্রপতি শিবাজি ষ্টেশন হইতে
ছাড়িবে মান্ডবী এক্সপ্রেস। যাইব সমুদ্র সুন্দরী গোয়া'য়।
গত তিনটি দিন মুম্বাই আমাকে
আশ্রয় দিল। মহারাষ্ট্রের রাজধানী এই বাণিজ্য নগরী পরিভ্রমন সমাপান্তে এই কথাই মনে
হইল যে, কিছু পরিমান দোষ বাদ দিলে দিনে দিনে
আরো আধুনিকা হয়ে উঠছে এ শহর। আর আমরা, কলকাতাবাসী
ডুবছি অতল নোংরামির অন্ধকারে।
প্রথম দিন এয়ারপোর্টে নামিয়া আমাকে শুনিতে হয়নি দালালরাজের গলাগুলি। বিভিন্ন প্রকারের ট্যাক্সিযান এর সুসংহত পরিকাঠামোর মধ্যে কোনোরূপ জবরদস্তির মূল্য চোকাতে হয় নি। বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞাসা করিয়া অবশেষে প্রিপেড ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়াইয়াছি কিঞ্চিৎ সস্তা হইবে বলিয়া। হলুদ-কালো ট্যাক্সির মাথায় মাল রাখার বন্দোবস্ত, কারণ সবই ছোট গাড়ী। আমাদের দুটি বাক্সপ্যাঁটরা ওই ওপরে তোলার পর, ড্রাইভারের আসন গ্রহণ করিতে দেখিয়া, চমকাইয়া উঠিয়া বলিয়াছিলাম, এগুলি দড়ি দিয়ে বাঁধিবেন না? পড়িয়া যাইতে পারে তো ? আরো একটি আশংকা নিজের মনে বাহিত হইতেছিল, কেহ যদি তুলিয়া লয় ! কিন্তু চালকের সন্তুষ্টি জনক মুখমন্ডল অবলোকন করিয়া "মুরগী" হইবার সাধ ত্যাগ করিলাম। ঝাঁ চকচকে রাজপথে ট্যাক্সি দৌড়াইতে শুরু করিল।
পূর্বেই বলিয়াছি,
অধুনা
যানবাহনের সংখ্যা এবং ঘন ঘন ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে যানজট প্রভূত পরিমানে বৃদ্ধি
পাইয়াছে। এক একটি জটে গাড়ী দাঁড়াইয়া পড়িতেছে, আর
আমি তেরছা নয়নে দেখিবার চেষ্টা করিতেছি বারবার, আমার
বাক্সপ্যাঁটরাগুলি আছে কি না ?
অবশেষে হোটেলের সম্মুখে যখন গাড়ী হইতে নামিলাম তখন
ট্যাক্সির ছাদে ওই দুটিকে যথাস্থানে দেখিতে পাইয়া আনন্দে পরিপ্লুত হইলাম। কলিকাতায়
একবার, হাওড়ায় ট্রেন ধরিবার জন্য যাইতেছিলাম।
ট্যাক্সির পিছনের লাগেজ ক্যারিয়ারের ঢাকনা খুলিয়া মালপত্তর বার করিতে উদ্যত হইবার
সময়ই চোখে পড়িয়াছিল। তাই সে যাত্রা রক্ষা পাইয়াছিলাম।
কিন্তু,
তাহার
মানে এই নয় যে, মুম্বাই তস্কর বিহীন। আজ প্রাতে যখন
আমরা যখন ষ্টেশনে বসিয়া ছিলাম ট্রেনের অপেক্ষায়, অনেক
মানুষজনকেই দেখিয়াছিলাম ঘুমে মগ্ন থাকিতে। আমাদের সম্মুখেই একটি যুবক ঘুম হইতে
উঠিয়া পড়িয়া আতিপাতি করিয়া কিছু খুঁজিতে লাগিল। পরে জানিলাম,
নিদ্রারত
অবস্থার মধ্যেই, ওর জিনসের প্যান্টের পকেট হইতে
টাকাপয়সা হাওয়া হইয়া গিয়াছে। ওর ওই করুন মুখের দিকে তাকাইয়া নিশ্চিন্ত হইলাম এই
কথা মনে করিয়া, যে বর্তমান ভারতবর্ষ মরে নাই !!!
মুম্বাই এর পানীয়জল আমরা
অকাতরে খাইলাম। সাথে বোতল বন্দি খণিজ-জল ও। কোনোরূপ অসুস্থতা হয় নাই। খাইলাম,
মুম্বাই
এর অবিনশ্বর "পাও ভাজি"। খাওয়া হইল না "বড়া পাও" এ বারের
দর্শনে। তবে এক পেয়ালা চা, দশ টাকার কমে
পাওয়া দুস্কর এ নগরীতে। আর এই শহরে খাবারদাবারের মূল্যও বেশ চড়া কলিকাতার তুলনায়।
সাধারন মুম্বাইবাসী সদাব্যস্ত।
হয়তো জীবন জীবিকার প্রয়োজনে। তবে অসহিষ্ণু অথবা উদভ্রান্ত মানুষজন কম। দুই দিনে আর কতখানি অনুভব করা যায় !
সাতটা দশে ট্রেন ছাড়িল।
মান্ডবী এক্সপ্রেস। ৭৬৫ কিলোমিটার দূরের মাডগাও আমাদের গন্তব্য।
বহুতল অট্টালিকাসমূহ ট্রেনের
জানালার কালো কাঁচে ধীরে ধীরে পশ্চাতে যাইতে লাগিল। ক্রমে ক্রমে শহর,
শহরতলী
ছাড়াইয়া দুই দিকের জানালায় সবুজ বনানী, দূরে একটির
পরে আরো একটি সুউচ্চ টিলা, নিম্নে
আচম্বিতে একটি নদী আর উপরে নীল আকাশের উদার সৌন্দর্য্য দেখাইতে দেখাইতে ছুটিতে
লাগিল মান্ডবী এক্সপ্রেস।
সকাল হইতে দুপুর,
দুপুর
হইতে বিকাল এবং তাহারও পরে সন্ধ্যা আসিল চলমান ট্রেনের জানালার কালো কাঁচে। কিন্তু
এই সুদীর্ঘ রেলপথটি এক বা সিংগল লাইন হওয়ার কারণে ক্রমশ: নির্দিষ্ট সময়সারণী হইতে
পিছাইয়া পড়িতে লাগিল।
মাডগাঁওতে আমাদের পৌঁছিবার কথা সন্ধ্যা ছটা পঁয়তাল্লিশ এ। পৌঁছাইলাম রাত্রি দশটায়। ধন্য ভারতীয় রেল ! উন্নতি হইয়াছে বটেক। কিছুক্ষন পূর্বে রেলের তরফ হইতে একটি ফোন আসিয়াছিল আমার মুঠোফোনে। আমাদের এই বাতানুকূল বগিটিতে বিছানাপত্তর যাহা দেওয়া হইয়াছে তাহাতে আমি কি ১) সন্তুষ্ট নহে, ২) সন্তুষ্ট, ৩) অতি সন্তুষ্ট ; কি না ? এমত অবস্থায় সত্যই হাসি পাইল। সময়ের কোনো প্রকার মাত্রাজ্ঞান নাই, অথচ বিছানাপত্তর লইয়া কি অসম্ভব দুশ্চিন্তা মাননীয় রেল কোম্পানীর!!!
সত্য সেলুকাস ! আবার বলি চমৎকার !!!
(বাকিটা পরের পর্বে)















































