মুম্বাই-গোয়া-হায়দ্রাবাদ দর্শন - ২
০৪-১২-২০১৫
গতকল্য রাত্রি পৌনে দশ ঘটিকায় মাডগাঁও পৌঁছাইয়াছিল মান্ডবী এক্সপ্রেস। খুব দ্রুত একটি ট্যাক্সি ধরিলাম। কোলভায় আমাদের রাত্রিবাস নির্দিষ্ট। কোলভা রেসিডেন্সিতে আমার থাকার ব্যবস্থা পূর্ব হইতেই সংরক্ষিত করিয়াছিলাম।
(কোলভা রেসিডেন্সী, কোলভা, গোয়া)
প্রায় আট কিলোমিটার পথ অতিক্রম করিয়া পৌঁছইলাম সৈকত শহর কোলভা'তে। আরব সাগরের সৈকতের পারেই এই ট্যুরিষ্ট লজটি। ভারী সুন্দর। রাত্রে বুঝিতে পারিলাম যে সম্মুখে সমুদ্র কিন্তু নিকষ অন্ধকারে ঠাহর হইল না।
আজ ঘুম ভাঙ্গিল যখন, তখন দেখিলাম, দোতলায় আমাদের ঘরের সম্মুখে প্রসস্ত বারান্দা হইতে নারিকেল বৃক্ষের ফাঁকফোকর দিয়া আরব সাগরের লোনা নীল জলরাশি। অগুন্তি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নৌকার উপস্থিতি চক্ষের সম্মুখে একখানি পটে আঁকা ছবি।
দিকচক্রবাল সম্মুখে প্রসারিত হইয়া শহুরে চক্ষুদুইটিকে স্নিগ্ধতায় ভরিয়া তুলিল। এইজন্যেই তো বারংবার প্রকৃতির কোলে আসা। মন ভরিয়া, প্রাণ ভরিয়া যতটুকু নির্যাস গ্রহণ করিয়া লইতে পারি। ততটুকুই প্রাণের আরাম। আত্মার শান্তি।
আজ আমাদের সফর-সূচী দক্ষিণ গোয়া। গোয়া ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট এর সাদা ছোট বাসযানটি ছাড়িল বেলা দশটায়।
কোলভা ছিল একটি সামুদ্রিক গ্রাম। কিন্তু কোলভার রূপালী সৈকতের খ্যাতির কারণে, এটি আজ একটি ব্যস্ততম সৈকত শহর। আশির দশকে আমি যখন প্রথম আসিয়াছিলাম, তাহার সাথে আজকের কোলভার তুলনাই চলে না। সেবার আসিয়াছিলাম ঝাঁকি দর্শনে। এবারে ত্রিরাত্রিবাস। তখন দেখেছিলাম এই সৈকতে বিদেশি ভ্রমণার্থীদের অবাধ বিচরণ। একেবারে জন্মদিনের পোষাকে রৌদ্রস্নানে মগ্ন হইয়া বালিয়ারিতে চিৎ হইয়া শুইয়া থাকিতে। পরে শুনিয়াছিলাম গোয়া প্রশাসন, ওই সমস্ত পর্যটক দের অন্য কোনো গোপন সৈকতে ব্যবস্থা করিয়াছে বিভিন্ন ঝামেলা হইতে মুক্ত থাকিবার জন্যে। এখন তাই মধ্যবিত্ত বিদেশী পর্যটকগন সেই সব স্বল্প পরিচিত সৈকতে আশ্রয় নেন। আর বিত্তবান পর্যটকদিগের জন্য তো বিভিন্ন পাঁচতারা রিসর্টের নিজস্ব সৈকত পূর্ব হইতেই রহিয়াছে।
(কোলভা সমুদ্র সৈকত)
প্রথম গন্তব্য প্রাচীন গোয়ার একটি গ্রাম।
(একটি পুরাতন পুর্তুগীজ ঘরানার বাড়ী)
Lqutolim. উচ্চারণটি নিজগুনে করিয়া লইবেন। এক সুদীর্ঘ সময় ধরিয়া পর্তুগীজ শাসন করিয়াছে এই গোয়া ভূখন্ড। সম্ভবত ১৯৬২ সালে গোয়ার ভারতভুক্তি ঘটে। গোয়া-দমন-দিউ পর্তুগীজ ঘোষিত হয় কেন্দ্রীয় শাসনাঞ্চল হিসাবে। পরে ১৯৮২ সালে গোয়া স্বাধীন রাজ্যের মর্যাদা পায়। রাজধানী হয় মান্ডবী নদীতীরের সুন্দর শহর পানাজি বা পানজিম।
শ্রী শান্তাদূর্গা মন্দির। কোভলিম এ। ১৭৩৮ সালের প্রাচীন মন্দির। এক হস্ত পরিমান উচ্চতাবিশিষ্ট ছোট পিতলের মূর্তি। রুদ্ররূপ মায়ের। এত দূর হইতে মূর্তি দর্শনের কারণে বুঝিতে পারিলাম না সত্যি মা রুদ্র নাকি অভয়া।
হাতঘড়িতে দ্বিপ্রহর একটা বাজিল। এবার মধ্যাহ্নভোজন এর বিরতি ঘটিল।
গোয়া ট্যুরিজিমের ফারমাগুড়া রেসিডেন্সীর রেস্তোরা "হিল টপে" গরম গরম সদ্য বানানো পাঁচমিশালী তরকারির সহিত মাখনে জড়ানো হাতে গড়া রুটিগুলি মন্দ লাগিল না।
এইবার মঙ্গেশ মন্দির। রৌদ্রের গনগনে আঁচ গায়ে লাগিতেছে বটে, তবে মসৃণ পিচমোড়া পথে যখন বাসযানটি ছুটিতেছে, দাবদাহ অতটা বোধ হইতেছে না।
( মঙ্গেশ মন্দির, গোয়া)
১৬শ শতাব্দীর এই মন্দির। ১৫৬০ সালে 'বাৎস', 'কৌন্ডিয়' এবং 'শিবলিঙ্গ' গোত্রের চব্বিশটি পরিবার দ্বারা নির্মিত এই মুঙ্গেশ মন্দির। পরবর্তী সময়ে ইংরেজ মিশনারিরা যখন গোয়ার হিন্দু মন্দিরসমূহ রূপান্তরকরন অথবা ধ্বংস করিতে ছিলেন সেই সময়ে এই শিবলিঙ্গটিকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করেন। পুনরায় ১৫৬১ সালের জানুআরি ফেব্রুয়ারি মাসে আবার নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে, ১৭৪৪, ১৮৯০ এবং ১৯৭৩ সালে এটির সংস্কার হয়। এখানে দেবতা শিব। খুব সুন্দর মন্দিরের গর্ভগৃহের সাজসজ্জা। দুখানি শিবমূর্তি দেখিলাম। স্বর্ণাভ রঙের।
এর পরের গন্তব্য মোমের মিউজিয়াম। এর গল্প না বলাই সমীচীন। রবিঠাকুর মহাশয়ের মোমমূর্তি দেখিয়া আতংকিত হইয়া পড়িলাম। স্বামীজির অবস্থাও তথৈবচ। ভারতবর্ষের যে কটি স্থানে মোমের মিউজিয়াম দেখিলাম সবই এরূপ। আশি টাকার দর্শনী জলেই যাইল। সবর্ত্রই শুনি মাদাম ত্যুসোর মিউজিয়মের মতো। কিন্তু ওই অবধিই। কলিকাতায় ও একটি হইয়াছে। যাই নাই, তবে গুরু'র আর সুচিত্রা সেনের মূর্তির ছবি দেখিয়া আর যাইবার সাহস হয় না।
এইবার দেখিলাম পুরাতন গোয়ার দুখানি চার্চ। ব্যসিলিকা বোম জিসাস আর ক্যাথিড্রাল। দুটি গীর্জাই অসাধারণ।
ব্যাসিলিকা বোম জিসাস ১৬শ শতাব্দীর। সৌধটি সারাবিশ্বের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে খুবই পবিত্র। ১৫৯৪-১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে তৈরি এই গির্জা শিল্পনৈপুণ্যে অসাধারণ। চার্চের অভ্যন্তরে সোনার গিলটি করা কারুকার্য ঘুরে দেখতে দেখতে সেই সময়কে ছোঁয়া যায়। এখানেই রুপোর কফিনে শায়িত রয়েছেন সেন্ট জেভিয়ার। বিদেশে ধর্মপ্রচারে গিয়ে জাপান থেকে ফেরার পথে ফ্রান্সিস জেভিয়ার অসুস্থ হয়ে পড়েন চিনের সাঞ্চিয়ান দ্বীপে। ১৫৫২ সালের ৩রা ডিসেম্বর মাত্র ৪৬ বছর বয়সে তিনি মারা যান। ওখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। ১৫৫৪ সালে সেখান থেকে তাঁর মরদেহ মালাক্কা হয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়। দ্বিতীয় বার যখন কবর হইতে তুলিয়া গোয়ায় আনা হয় তাঁহার মৃতদেহ, তখন মৃতদেহের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হইয়াছিল। এবং পরীক্ষা সমাপান্তে ডাক্তারবৃন্দ রায় দিয়াছিলেন যে ইহা দৈব বা অলৌকিক ব্যাপার। এখন এই গীর্জার একটি উচ্চস্থানে রাখা আছে রূপার কফিনটি। কফিনের চারিদিকে কাঁচের মধ্য দিয়া দেখা যায়। তবে শুধুমাত্র মুখমন্ডলটাই দেখিতে পাওয়া যায়। প্রতি দশ বৎসর অন্তর সেন্ট জেভিয়ারের মৃত্যুর দিনে উক্ত কফিন নীচে নামাইয়া তাঁর দেহ ভক্তদের জন্য প্রদর্শিত হয়। এটি কার্নিভাল ফেস্টিভ্যাল নামেও পরিচিত।
আজিকার শেষ দর্শনীয় স্থান মিরামার সৈকত। নাম যদিও সৈকত, কিন্তু সমুদ্র অনেক দূর। পানাজী হইতে চার কিলোমিটার দূরত্বে এই স্থান মান্ডবী নদীর মোহনা। তাই হয়তো সৈকতের নামে পরিচিতি মিরামারের।
বিকালের সূর্য, মান্ডবী'র অপর পারে নিদ্রা যাইবার তোড়জোড়ে ব্যস্ত। তার কিরনে তাই কোমলতা আসিতেছে। বালিয়াড়ির ওপর দিয়া কিছুক্ষণ পদব্রজে ভ্রমণ করা গেল। ডাহিনে ঝাউবৃক্ষের সারি। মোহনার মৃদু বাতাসে আন্দোলিত।
এইবার কোলভা ফিরিবার পালা। দক্ষিণ গোয়া দর্শন সমাপ্ত। সবুজ সবুজে ছাওয়া রাজপথ দিয়া আমাদের বাসযান ছুটিয়া চলিল।
কিন্তু মনটা বিক্ষিপ্ত হইয়া রহিল কারণ "ডোনা পাওলা" তে যাওয়া হইল না।
০৫-১২-২০১৫
আজ বিশ্রামের দিন। আগামীকল্য উত্তর গোয়া দর্শন করিব।
সেইহেতু নিদ্রার জড়তা কাটিতে কাটিতা নয়টা বাজিল। বিনা মূল্যের প্রাতরাশ সমাপ্ত করিয়া, একপ্রস্থ কোলভা সৈকতে দুইজনে বিচরণ করত:, আরব সমুদ্রের লবনাক্ত জলে চরণদুটি ভিজাইলাম। রূপালী বালিয়াড়ির পশ্চাতে নারিকেলবিথীর সবুজ সারি। সম্মুখে দিগন্তব্যাপ্ত নীলাভ জলরাশি পারে আসিয়া ভাঙ্গিয়া পড়িতেছে। সফেন সেই শুভ্র তরঙ্গ বালিয়াড়িতে বারংবার ছুটিয়া আসিয়া আছড়াইয়া পড়িতেছে। আবার ফিরিয়া যাইবার তোড়জোড় করিতে না করিতেই নূতন এক তরঙ্গের আগমনে ফিরিয়া আসিতেছে। কত কাল, কত যুগ ধরিয়া চলিতেছে এই পৌনঃপুনিক প্রক্রিয়া তাহা কে জানে!
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ--
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে ॥ "
রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণেও গোয়ার উল্লেখ আছে। অতীতে গোয়ার খ্যাতি ছিল প্রাচ্যের রানি নামে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতকে মৌর্য রাজারা তারপর চালুক্যরাজা এবং কদম্বরাজারা এখানে রাজত্ব করেন। ১৩১২-তে মুসলিম হস্তগত হয় গোয়া। ১৩৭০-এ আবার মুসলিমদের পরাজিত করে বিজয়নগরের রাজা হরিহর দখল নেন গোয়ার। ১৪৭০-এ ফের বাহমনি সুলতানের করায়ত হয় গোয়া। এরপরে হাতঘুরে চলে আসে বিজাপুরের আদিল শাহি রাজবংশের দখলে। ১৫১০ সালে পর্তুগিজ নাবিক অ্যালফানসো ডে আলবুকার্ক বিজাপুরের রাজা আদিল শাহকে পরাজিত করে দখল নেন এই রাজ্যের। সেই থেকে আগমন হয় ব্যবসায়ীদের। সঙ্গে আসেন ধর্মযাজকেরা। এঁদের মধ্যে ১৫৪২ সালে আসেন বিশিষ্ট ধর্মযাজক সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার। ১৯৬১ সালে প্রায় ৪৫০ বছরের দীর্ঘ পর্তুগিজ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত হয় গোয়া। "
কৃতজ্ঞতা : আমাদেরছুটি ডট কম।
কোলভা'র সমুদ্রের বাম দিক বরাবর তটভূমি ধরিয়া হাঁটিলেই 'বেনোলিয়াম' সৈকতে পৌঁছানো যায়। কিন্তু বেলাভূমির উপর দিয়া দুই কিলোমিটার পদচারণা করিলে এই বঙ্গসন্তানের গ্রন্থিবাতের উজ্জ্বল উপস্থিতি এত গুণে বর্ধিত হইয়া পড়িবে যে, আগামীকল্যের উত্তর গোয়া দর্শন ত্যাগ করিতে হইবে। অতএব আর ভাবিবার প্রয়োজন নাই।
ভ্রমণ করিতে আসিয়া বিশ্রাম করিতে মন চাহিতেছে। সকালেই এক মহিলা, ট্যুরিষ্ট লজের নীচেই জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, - স্যার, ট্যাক্সি লাগিবে কি না ? তখন না করিয়াছিলাম। এক্ষনে মনে হইল জিজ্ঞাসা করি। আমার মনে দুইটি সৈকত দেখিবার সাধ ছিল। বেনোলিয়াম এবং পালোলিম। দুইটিই কোলভার কাছাকাছি এবং খুব সুন্দর। জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম পালোলিম প্রায় ষাট কিলোমিটার। বেলা একটা নাগাদ বাহির হইলে পালোলিম, আগুন্দা, আগুদা দূর্গ এবং সূর্যাস্ত দেখিয়া ফেরা যাইতে পারে। বেশ অনেকখানি কাগুজে মুদ্রা চাহিয়া বসিল। কিন্তু দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা না দিয়া সংকল্প করিলাম যাওয়াই যাউক। মধ্যাহ্নভোজন সারিয়া লইয়া ওই ভদ্রমহিলার বাতানুকূল মোটরযান এ চাপিয়া বসিলাম। বেনোলিয়াম আর যাওয়া হইল না।
ড্রাইভার বা চালকের স্ত্রীলিঙ্গ কি হয় ? ড্রাইভারের তো হয়না মনে হয়, তবে চালিকা চলিতে পারে। সেই ভদ্রমহিলাই গাড়ীর চালিকা। বেশ অবাক হইয়া পড়িলাম। প্রসঙ্গত বলি, গোয়া পর্যটন বিভাগ গত বৎসর বারো জন মহিলা চালিকা নিয়োগ করিয়াছেন। তাঁহাদের "টয়েটা" গাড়ীর ব্যবস্থা করিয়াছেন মাসিক বেতনের বিনিময়ে। যদিও চাকুরী সাময়িক, তবুও পর্যটন বিভাগ চিন্তা করিতেছেন উহাদের প্রত্যেককে গাড়ী কিনিয়া দিবেন মাসিক পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে। গাড়ীর দাম শোধ হইয়া গেলে, গাড়ীগুলি চালিকাদিগের নিজস্ব হইয়া যাইবে। একটি বাস্তবমুখী প্রচেষ্টা।
(গোয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ নদী, জুয়ারি)
দুইধারে সবুজ গাছ-গাছালির মধ্য দিয়া অপূর্ব পীচমোড়া জাতীয় রাজপথ নং ১৭ ধরিলাম। এটি ম্যাঙ্গালোর অবধি বিস্তৃত। আমরা চলিয়াছি পালোলিম সমুদ্র সৈকত। মাডগাঁও আসিল।
মাডগাঁও থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে চৌরি গ্রাম ছাড়িয়ে তালগাছে ছাওয়া পাথুরে টিলাময় পালোলেম সাগরবেলা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। সাগর বেলার দুই দিকেই পাহাড়ের শোভা এই বেলাভূমিকে আরো অপরূপ করিয়া রাখিয়াছে। প্রসস্ত চেটাল বেলাভূমি। সমুদ্রস্নানের আদর্শ সৈকত। হয়তো তাই বিদেশী পর্যটকদের ছড়াছড়ি এইস্থানে। রৌদ্রস্নানে মগ্ন বহু বিদেশী। তবে এই স্থানে থাকিবার জন্যে বেসরকারি বহু কাঠের কটেজ রহিয়াছে। এবং তাহার দৈনিক বাস-মূল্য এক হইতে তিন হাজার টাকা, সুযোগসুবিধা অনুযায়ী।
পালোলেম সাগরবেলা হইতে আমাদের রেশমের মোটর যান লইয়া চলিল দক্ষিণ গোয়া’র আর একটি সমুদ্র সৈকত এগোন্ডা’য়। নির্জন এই সৈকত বেশ একটা বাঁক লইয়া, এই স্থানের সৌন্দর্য্য অপরূপ করিয়া তুলিয়াছে পিছনে পাহাড়ের আবছায়ায়। সৈকতের বাম দিকে বেশ কিছুটা পাথরের বিস্তৃতি। এই সৈকতও নির্জনতায় ভরপুর। মুগ্ধ করিয়া দিল আমাদের দেহ মনকে। অনেকক্ষন চুপ করিয়া বসিয়া রহিলাম।
(এগোন্ডা সৈকত, দক্ষিণ গোয়া)
এই সৈকত হইতে বাহির হইয়া পৌঁছাইলাম “ক্যাবো দি রামা” দূর্গে। যদিও আজ দূর্গে একটি চার্চ ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট নাই।
(ক্যাবো দ্য রামা দূর্গ, দক্ষিণ গোয়া)
দূর্গ দর্শন সমাপান্তে চলিলাম আরব সমুদ্রের বুকে সূর্যাস্তের শোভা নিরীক্ষণ করিতে। পৌঁছাইলাম একটি সুন্দর স্থানে। একপাশে নারিকেল বিথীর বিস্তার। আর নিম্নে “ক্যানাগুইনিম” বলিয়া একটি সমুদ্র সৈকত। একটি তিন কামরা বিশিষ্ঠ ব্যক্তিগত বাস করিবার ও স্থান রহিয়াছে। পাথরের খন্ডের উপর ঢেউগুলি বারংবার আসিয়া ভাঙ্গিয়া পড়িয়া শুভ্র ফেনরাশি ছড়াইয়া দিতেছে অবিশ্রান্ত।
(ক্যানাগুইনিম সমুদ্র সৈকত, দক্ষিণ গোয়া)
সূর্যাস্ত দেখিলাম এই স্থানে। ভারী সুন্দর সে দৃশ্য।
০৬-১২-২০১৫
এই কোলভা রেসিডেন্সী আজ ত্যাগ করিব। খুব আনন্দেই কাটাইলাম তিনটি রাত্রি। বিশাল প্রসস্ত ঘর। ঘরের সম্মুখে উন্মুক্ত প্রমাণাকার বারান্দা হইতে আরব সাগর সতত দৃশ্যমান। অপূর্ব সবকিছু। সকালবেলায় দরজা খুলিতেই তিনখানি ইংরাজী সংবাদপত্র প্রতি ঘরে। হেরাল্ড, টাইমস আর নবভারত টাইমস। তাহার পর সেই "কমপ্লিমেন্টরী" প্রাতরাশ। প্রতিদিন এক এক প্রকার পদের সমাহার। আজ জুটিল, ইডলি, বড়া। ইহার সাথে প্রতিদিনের মতো কলা, ডিমসেদ্ধ, পাঁউরুটি এবং চা বা কফি।
মনে হইতেছে দিনগুলি যদি আরো বড় হইত তাহা হইলে বড় ভাল হইত। আয়েস করিয়া সবগুলি সংবাদপত্র পড়া যাইত। ধীরে সুস্থে প্রাতরাশ সারা যাইত। সমুদ্রপারে আরো বহুক্ষণ কাটানো যাইত। সন্ধ্যাবেলায় প্রায় অর্ধেক মূল্যে বিভিন্ন প্রকার সুরা পান করা যাইত। ইত্যাদি ইত্যাদি, কত কিছু।
আজিকার ভ্রমণ সূচী উত্তর গোয়া। গোয়া পর্যটনের বাসযানে। আজ মূলত: উত্তর গোয়ার দুইখানি সৈকত আমরা দেখিব। কোকো আর কালাঙ্গুটে সমুদ্র সৈকত। কিন্তু আক্ষেপ রহিয়াই যাইবে "ডোনা পাওলা" কে, না দেখিবার জন্যে।
মহালসা মন্দির। প্রথম বিরতি। ইদানীং মন্দির দেখানোর চল দেখিতেছি বাড়িয়াছে। আমার কিঞ্চিত অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান পরিশেষে বলিব, ভবিষ্যতের গোয়ায় যাঁহারা আসিবেন গোয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময়তা অনুভব করিতে, তাহাদের। আর বাকি আপামরের জন্য এই সমস্ত দৈনিক ট্যুর তো রহিয়াছেই।
চওড়া মসৃন রাজপথ ধরিয়া আমরা যাইতেছি। গন্তব্য কোকো সৈকত। বাম পার্শ্বে পানাজী শহরকে দেখিতে দেখিতে পার হইলাম গোয়ার সর্ববৃহৎ মান্ডবী নদী। চলিয়াছি উত্তুরে গোয়ায়।
(কোকো সৈকতে লঞ্চ ভ্রমণে আগুয়াদা ফোর্ট আর শেষে ডলফিন)
ফিরিয়া আসিয়া কালাঙ্গুটের ট্যুরিষ্ট লজে মাখন ছড়ানো নান আর শাহী মালাই পনির সহযোগে মধ্যাহ্নভোজন সারিলাম। শেষ পাতে একটু আইসক্রিম সহযোগে কুচোনো ফলের টুকরোগুলি মন্দ লাগিল না।
কালাঙ্গুটে সমুদ্র সৈকত, সোনালী সৈকত অথবা গোয়ার সৈকতরানি বলিয়া পরিচিত। পানাজী হইতে পনের কিলোমিটার দূরত্ব। পরিচিত সৈকত, তাই ভীড় উপছাইয়া পড়িয়াছে। সারা ভারতবর্ষের ক্ষুদ্র জনসমাগম দেখিলাম এখানে। আমার পূর্বে দেখা কালাঙ্গুটের সাথে কোনোরূপ মিল খুঁজিয়া পাইলাম না। কলিকাতার গড়িয়াহাট বাজারের মতো অজস্র দোকানপাট এই অঞ্চলটির সমগ্র মাধূর্য্য হরণ করিয়া এক জনাকীর্ণ শহরে পরিণত করিয়াছে। কি সুন্দরই না ছিল কালাঙ্গুটের নির্জন সোনালী বালুকাবেলা। ট্যুরিষ্ট লজটি শুধু ছিল, তাও একতলা। আর ছিল কিছু ঝুপড়ীজাতীয় হাতে গোনা দোকান। ছিল অসংখ্য বিদেশী পর্য্যটক। সেইবারে আমি দুইদিন আসিয়াছিলাম এর সৌন্দর্য্যের কারণে। আজ মনে হইতেছে, পালাইতে পারিলেই বাঁচি। অজস্র স্পিড বোট, প্যারাগ্লাইডিং ইত্যাদি নানা উপাচারে স্থানীয় অর্থনীতির হয়তো উন্নতি ঘটিয়াছে কিন্তু সৈকতরানী আর বলা চলে না কালাঙ্গুটেকে।
(সৈকত রানী ক্যালাঙ্গুটে, উত্তর গোয়া)
ইহার পরে আমাদের বাসযান আসিয়া থামিল আগুয়াদা দূর্গের সম্মুখে। কিছুক্ষণ পূর্বে মোটরচালিত নৌকা হইতে দেখিয়াছিলাম। এখন এইস্থান হইতে নীচের বোটগুলিও দেখা যাইবে। মাণ্ডবী নদীর মুখে ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে পর্তুগিজদের তৈরি আগুয়াদা দুর্গ। এই দুর্গই এখন সেন্ট্রাল জেল। পাশে লাইট হাউস। দুর্গে এখন টাটা'র হেরিটেজ হোটেল "ভেদান্ত"।
আজিকার ভ্রমণসূচীর সর্বশেষ আইটেম, "ক্রুজ" বা জলযানে নদীবিহার। গোয়ানীজ নৃত্যগীত সমৃদ্ধ একটি ঘন্টার অনুষ্ঠান জলের উপরে। আমি অত উৎসাহিত না হইয়া নামিয়া পড়িলাম পানাজী'র কদম্ব বাস গুমটিতে।
আজ এবং আগামীকল্য আমার রাত্রিবাস এই রাজধানী শহর পানাজী বা পানজিমে।
(পানাজীরে মান্ডবী নদী)
০৭-১২-২০১৫
নবতারা রেস্তোরাঁয় পুরি-সব্জি দিয়ে প্রাতরাশ সারা হইল। অত:পর একটি মোটরগাড়ি ভাড়া করা গেল।
পানাজি (Panaji বা Panjim) মাণ্ডবী নদীর তীরে গোয়ার রাজধানী। নদীর ওপারে বেতিম। এরই উত্তরে মাপুসা শহর। আর পশ্চিমে কালাঙ্গুটে সাগরবেলা। মাণ্ডবীর পাড়ে সবুজ পাহাড়ের কোলে ১৫৫১ সালে তৈরি রাইস মাগোস দুর্গ।
মাণ্ডবীর বুকে আদিল শাহর তৈরি গ্রীষ্মকালীন আবাস পরে পর্তুগিজ ভাইসরয়ের বাসভবনে রূপান্তরিত হয়। তাহার পরে ইহা গোয়ার বিধানসভায় পর্যবসিত হয়। অধুনা মান্ডবীর অপর পারে নূতন করিয়া বিধানসভা নির্মিত হইয়াছে।
(পুরাতন সেক্রেটারিয়েট, পানাজী, গোয়া)
পুরানো বিধানসভা বা সেক্রেটারিয়েট এর বিপরীতে আধুনিক হিপনোটিজমের জনক আবে ফারিয়ার মূর্তি। পাহাড়ের ঢালে জোড়া চূড়া নিয়ে তৈরি পানাজির প্রধান চার্চ - ‘চার্চ অফ আওয়ার লেডি অফ দ্য ইমাকুলেট কনসেপশন’। উরেম ক্রিক ও আলটিনো পাহাড়ের মাঝে ফন্টেনাস এলাকায় পর্তুগিজ আমলের প্রাচীন ঘরবাড়ি-পথঘাট আজও রহিয়াছে।
(সেক্রেটারিয়েটের সামনে আধুনিক হিপনোটিজমের জনক আবে ফারিয়ার মূর্তি)
আজ আমাদের প্রথম গন্তব্য উত্তর গোয়ার উত্তরের দিকের প্রান্তিক সমুদ্র সৈকত আরামবোল (Arambol Beach)। পানাজী হইতে প্রায় ৩২ কিলোমটার দূরত্বে এই সৈকতখানি বিদেশী, বিশেষত রাশান পর্যটকদিগের অতি প্রিয় স্থান। শুভ্র বালুকাময় বেলাভূমি নির্জনতায় ভরপুর। শেষপ্রান্তে অনুচ্চ একটি সবুজে ছাওয়া পাহাড়ের প্রান্তদেশ ঢালু হইয়া সমুদ্রে মিলিয়াছে। বালুকাবেলায় অগুন্তি রৌদ্রস্নানের বিছানা পাতা, রঙিন ছাতার তলে। শুইয়া শুইয়া সমুদ্র অবলোকন করাই যায়, উহাদিগের রেস্তোরাঁয় কিছু খাইবার বিনিময়ে। কোনোপ্রকার জোরজুলুম চক্ষে পড়িল না। তাই হয়তো প্রায় ৯৫% ই বিদেশী অতিথি।
(আরামবোল সমুদ্র সৈকত, উত্তর গোয়া)
আরামবোল ত্যাগ করিয়া আমরা পৌঁছাইলাম মোরজিম (Morjim Beach) সমুদ্র সৈকত এ। আসিবার পথেই পড়িল ছাপোরা (Chappora Beach) সৈকত। মোরজিম সৈকত ও খুব নির্জন এবং খুবই সুন্দর। সৈকতের এক প্রান্তে অল্প কিছু শিলাখন্ডে ঢেউগুলি আসিয়া ফাটিয়া পড়িতেছে। পিছনে নাম না জানা গাছের সমারোহ সারা সৈকত জুড়িয়াই। একটি কোনো অচেনা অতিথি মনে হইল শুইয়া আছেন একা। সারাক্ষণ সমুদ্রের তরঙ্গিত ফেনা তাঁহার সমাধিতে আসিয়া বোধকরি বলিয়া যাইতেছে, হে পথিক, আমরা আছি তোমার সাথে চিরটাকাল। তুমি শান্তিতে ঘুমাইয়া থাকো। চিন্তা করিও না আর।
(মোরজিম সমুদ্র সৈকত, উত্তর গোয়া)
মোরজিমের পর ভ্যাগাটোর (Vagator Beach) সৈকতে পৌঁছিয়া গাড়ী হইতে নামিলাম। এই সৈকতে অসংখ্য পাথর। যাহার জন্য স্নান করিবার জায়গা একেবারে দড়ি দিয়া চিহ্নিত করা আছে। মোটরচালিত নৌকাগুলি পর্যটকদের লইয়া সমুদ্র ভ্রমণ করাইতেছে। ছোট ছোট স্পীডবোট বা দ্রুতচলমান নৌকাও রহিয়াছে। সমুদ্রের জল কাটাইয়া অতি দ্রুত বেগে ছুটিতেছে দুই পাশে সাদা ফেনিল স্রোত তুলিয়া। ডান পার্শ্বে পাহাড়ের শীর্ষদেশে একটি সুদীর্ঘ পুরাতন প্রাচীর দেখিলাম। হয়তো কোনো সময়ে কোনো দূর্গ ছিল। কিন্তু কেহই কিছু বলিতে পারিল না।
(ভেগাটোর সৈকত, উত্তর গোয়া)
পরের গন্তব্য আঞ্জুনা (Anjuna Beach)। পাহাড় আর ঝুঁকিয়া পড়া নারিকেল বৃক্ষে এই সমুদ্র সৈকতটি একদা হিপি দিগের খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু আজ সেই সৌন্দর্যও আর নাই, সেই পরিবেশও আজ বিলীন। সমুদ্রপারে হোটেল নির্মাণ হইয়াছে। আর সমুদ্রের পার বড় বড় পাথর ফেলিয়া রাস্তা নির্মিত হইয়াছে। আধুনিক ভারতের আধুনিক চিন্তাধারা।
(আঞ্জুনা সৈকত, উত্তর গোয়া)
আজ মন প্রফুল্ল হইয়াছে। অবশেষে ডোনা পাওলা যাইব। সেই ডোনা পাওলা, যাহা না দেখিলে মনে আক্ষেপ থাকিতই।
গল্পটি শোনাই তাহলে।
পানাজী শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে ডোনাপাওলা বিচ (Donapaola Beach) বায়ে জুয়ারি নদী, ডাইনে মাণ্ডবী। দুই নদীর মাঝে ডোনাপাওলা উপসাগর। পর্তুগিজ ভাইসরয়ের মেয়ে সুন্দরী ডোনা স্থানীয় জেলের ছেলে পাওলাকে ভালোবাসিয়া তাহার জীবন সঙ্গী হইতে চাহিয়াছিলয। কিন্তু তা কিছুতেই সম্ভব হইবার নয়। ভাইসরয় এর কন্যা কিনা পানিগ্রহন করিবে একজন স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের এক যুবককে ! ইহা অসম্ভব ভাইসরয় এর পক্ষে মানিয়া লওয়া। শিক্ষিত ছিলেন কিনা সেই ভভাইসরয় সেকথা ইতিহাস বলে নাই। অগত্যা দুইজন জোয়ান প্রেমিক টিলার উপর থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন করিয়া নিজেদের জেদ বজায় রাখিয়াছিলেন। প্রেমকে মহান করেছিলেন কিনা বলিতে পারিব না, তবে সমুদ্রের বুকে জেগে থাকা টিলার উপর ডোনাপাওলার মূর্তি তাঁদের স্মরণ করায় প্রতিটি পর্যটককে।
(ডোনা পাওলা’র মূর্তি)
কিন্তু হায় !
প্রথমত তো ভাঙাচোরা পথ দিয়া আজকের চালক শেখ শাহিদ কোনোক্রমে পৌঁছাইয়া দিল। তাহার পর যা দেখিলাম, তাহাতে আমার সাধের স্মৃতি, ডোনা পাওলার অমর প্রেম কাহিনী, সমস্ত কিছুই অন্তর্হিত হইল। বিশাল জায়গা জুড়িয়া চওড়া সেতু হইয়াছে। চতুর্দিকে দোকানপাটের ছড়াছড়ি। ডোনা পাওলার মূর্তি একধারে কোনোক্রমে দন্ডায়মান, তাও আবার লোহার জালের বেষ্টনীর মধ্যে। এমন কি ওইস্থানে ওই মূর্তির উচ্চতার উপরে একটি চারিচৌকা চাতাল বানানো হইয়াছে। দূরে অগুন্তি বাড়ীঘর। ভারতীয় সামুদ্রিক গবেষনা কেন্দ্রটি প্রায় চাপা পড়িয়া যাইতেছে। শুধুমাত্র গোলকটি দেখিয়া চিনিতে পারিলাম। সন্ধ্যার পর এই স্থান এখন আলোয় আলোকিত হইয়া নিশ্চয়ই একটি পন্যবাজার হইয়া ওঠে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই রহিল না।
(ডোনা পাওলা থেকে)
এই আমাদের দেশ। কন্যাকুমারিকায়, যেখানে ভারতের শেষ বিন্দুটি পরিষ্কার দেখা যাইত, সেখানে আজি হকার মার্কেট হইয়াছে। বিবেকানন্দ রক এর পাশেই এক তামিল কবির বিশাল মূর্তি স্থাপিত হইয়া, বিবেকানন্দ রক এর অপরূপ সৌন্দর্যময়তাকে গ্রাস করিয়াছে। বাঙালী কেন একা থাকিবে, অতএব তামিল কবির মূর্তি বসাইতে কোনো সাম্প্রদায়িক সংহতি তো নষ্ট হইবে না। সুতরাং, অতীত চুলোয় যাক, আগে তো ভোটবাক্স ভরুক। দুই পকেটে আমদানির বন্দোবস্ত তো হইল, তাহাই বা কম কি।
এরপর মধ্যাহ্নভোজন করিলাম রুটি আর গোয়ানীজ পদের কাঁকড়া'র চচ্চড়ির সহিত। আজই আমাদের পানজিমে শেষ রাত্রি। কাল উড়িয়া যাইব হায়দ্রাবাদ।
(সন্ধ্যার পানজীম)
০৮-১২-২০১৫
সকাল উঠিয়া মনে মনে কহিলাম -
পুনর্বার যেন আসিতে পারি, ঘন সবুজ নারকেল গাছে ছাওয়া সোনালি সৈকত, নীল সমুদ্র, পশ্চিমঘাট ও সহ্যাদ্রি পর্বত থেকে নেমে আসা মাকড়সার জালের মতো নদীপথ আর লাল পাহাড় এর দেশ এই গোয়া'য়। কাজু, আম, তাল,পাম, দারুচিনি ছাওয়া স্বপ্নময় এই রাজ্যে।
(ডাবলিন এয়ারপোর্ট, গোয়া)
পানাজীর বিমানবন্দরের নাম "ডাবলিন"। এখনো নেতাদিগের মনে হয় খেয়াল হয় নাই। হইলে নি:সন্দেহে "কাঁকড়াবিছা" জাতীয় নামকরণ এর প্রস্তর শিলাখন্ডটি "অমুকের দ্বারা নামাঙ্কিত' হইয়া, এত দিনে শোভা পাইত এই বিমানবন্দরের প্রবেশপথে। এই বিমানবন্দরটি পুরাতন ছোট বিমানবন্দরেরই লাগোয়া। দেশী এবং আন্তর্জাতিক বিমান এর জন্য আলাদা ব্যবস্থা। ভারী সুন্দর অভ্যন্তরের বিন্যাস। অনেক বিদেশী দোকান। রেস্তরাঁও রহিয়াছে।
আমাদের এই উড়ানপথের স্থায়িত্বকাল, এক ঘন্টা পনের মিনিট। স্পাইসজেটের এই উড়ান প্রায় পাঁচ মিনিট পূর্বেই পানাজীর ভূমি ত্যাগ করিল। ছোট বিমান, ৮০ আসনের। বেলা আড়াইটায় হায়দ্রাবাদের রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামিলাম। মোটামুটি সারা ভারতবর্ষের শতকরা ৮০ ভাগ স্থানের নাম এই পরিবারের দখলেই রহিয়াছে।
(রাজীব গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হায়দ্রাবাদ)
সুন্দর বিমানবন্দর। ততোধিক সুন্দর হায়দ্রাবাদ শহরে আসিতে বিমানবন্দরের ৩৭ কিলোমিটার পথ। চক্ষু জুড়ায়। অনেকটাই ব্যাঙ্গালোরের বিমানবন্দর হইতে ব্যাঙ্গালোর শহরে আসিবার পথের কাছাকাছি। তবে উক্ত ৪৫ কিমি রাস্তা আরো মনোরম। হায়দ্রাবাদে অবশ্য আমার ভ্রমন সূচী কিছুই নাই। শুধুমাত্র নিজাম মিউজিয়ামটি দেখিবার বাসনা রহিয়াছে। যদি সময় পাই।
তাই এই ভ্রমণ কাহিনীর নাম যদিও "মুম্বাই-গোয়া-হায়দ্রাবাদ" দিয়াছিলাম, এক্ষণে মনে হইতেছে হায়দ্রাবাদটি বাদ দেওয়া উচিত ছিল। যাহাই হউক, পাঠকেরা নিজগুণে এইটুকু ক্ষমা করিবেন।
এইবার শেষ করিতে হয় আমার এই বিরক্তিকর দীর্ঘ ভ্রমণ কাহিনী। আমি কিঞ্চিত সুলুকসন্ধান দিইবার চেষ্টা করিয়াছি যাহারা বেড়াইতে আসিবেন তাদের সুবিধার জন্য। আর যাঁহারা ভ্রমণ কাহিনী পছন্দ করেন, তাঁহাদের জন্যে।
এইবার, যাঁহারা এই স্থানে, বিশেষত গোয়া'য় বেড়াইতে আসিবেন শুধুমাত্র প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে মনে প্রাণে অনুভব করিতে, তাঁহাদের উদ্দেশ্যে কিছু অভিজ্ঞতা বিনিময় করি।
(১) যাঁহারা একটু আয়েস করিয়া গোয়া বেড়াইতে চাহেন, তাঁহাদের বলি, কমপক্ষে সাতটি দিন রাখুন গোয়ার জন্য। দিন দশেক হইলে আরো ভাল হয়।
(২) থাকিবার স্থানসমূহ অনেকগুলি জায়গায় ছড়াইয়া দিন। শুধুমাত্র পানাজীতে থাকিবেন না।
(৩) যদি মুম্বাই হইতে রেলপথে মাডগাও আসেন তাহা হইলে মাডগাও হইতে দক্ষিণ গোয়া ভ্রমণ শুরু করুন। মাডগাও হইতে স্থানীয় বাসে করে ঘুরুন। খরচও কম হইবে।
(৪) মাডগাও হইতে প্রথমেই যান, "পালোলিম" (Palolim Beach)। থাকুন এইখানে। স্ফুর্তিতে সমুদ্র স্নান করুন। এত ভাল স্নান করিবার সৈকত আর আমি দেখি নাই। এইখানে কোনোরূপ মোটরবোটে ভ্রমণ করিবার প্রয়োজনই নাই। অযথা অর্থব্যায়। অন্ততপক্ষে একটি রাত্রি কাটান। প্রচুর প্রাইভেট কটেজ রহিয়াছে সৈকতের উপরেই। দরদাম করিয়া বিদেশী পর্যটকদিগের সাথেই থাকিয়া যান।
(৫) যদি পারেন এইখান হইতে একটি যানবাহন ব্যবস্থা করিয়া, "তালপোনা" আর "গালগিবাগা" (Talpona Beach & Galgibaga Beach) সৈকতদুটি বেড়িয়ে নিয়ে পৌঁছে যান "এগোন্ডা"য়(Agonda Beach)। রাত্রিবাস করুন এগোন্ডায়। গাড়ী ছেড়ে দিন। আর যদি ওই তালপোনা আর গালগিবাগা না দেখতে চান তাহলে বাসেই চলে আসুন এগোন্ডায়। সূর্যাস্ত দেখুন এগোন্ডায়।
(৬) এরপরে এগোন্ডা থেকে চলে আসুন "কোলভা"য় (Colva Beach)। রাত্রিবাস করুন। যদি এগোন্ডা থেকে সরাসরি কোলভার বাস না পান তাহা হইলে মাডগাও এর বাস তো পাবেনই। মাডগাও পৌঁছে আবার কোলভায় চলে আসুন। কোলভায় অবশ্যই রাত্রিবাস করবেন।
(৭) পুনরায় কোলভা থেকে মাডগাও আসুন (৬ কিমি)। মাডগাও থেকে পানাজীর বাস ধরে নিয়ে পানাজী পৌঁছান। পানাজীতে থাকুন। মিরামার আর ডোনা পাওলা দেখে নিন। বাস তো দশ মিনিটে পৌঁছে দেবে মিরামারে। আর ডোনা পাওলার রাস্তা বন্ধ থাকায় অটো বা গাড়ীই ভরসা। ইচ্ছে থাকলে সন্ধ্যের "ক্রুজে" খানিকক্ষন নৃত্যগীত করে নিতে পারেন।
পানাজী বা পানজিমে থাকার জন্যে চলে আসুন পৌর-বাজার বা মিউনিসিপ্যাল মার্কেট চত্বরে। এখানে বেশ সস্তায়ই হোটেল পাবেন অথচ মূল পানজিমের কাছেই। খাইবার জন্যে তো পূর্বেই বলিয়াছি "নবতারা" এবং "মুলটি"রেস্তোরাঁ যথেষ্টই ভাল এবং খাবারের মূল্যও নাগালের মধ্যেই।
(৮) ইহার পর পানাজীর কদম্ব বাস আড্ডা হইতে "আরামবোল" (Arambol Beach) এর বাস ধরুন। অবশ্যই এইখানে থাকিবেন, অন্তত একটি রাত্রি।
(৯) ইহার পরে বাসেও আসিতে পারেন "মোরজিম" (Morjim Beach) এ। পছন্দ হইলে রাত্রিবাসও করিতে পারেন।
(১০) বাকি থাকল "ভেগাটোর" (Vegator Beach)। দিনে দিনে ঘুরে নিন বাসে করে।
(১১) আঞ্জুনা আর ক্যলাঙ্গুটে আমার তো মোটেই আর ভাল লাগে নাই। যদি মনে করেন আপনার ভ্রমণ-ম্যাপে টিক মারিবার প্রয়োজন আছে, তা হইলে যাইতেও পারেন। তবে রাত্রিবাস নৈব নৈব চ।
ব্যস। গোয়া ভ্রমণ সমাপ্ত। এইবার নিজেই হিসেব করিয়া দিনের সংখ্যার অংক মাথায় রাখিয়া ফিরৎ চলুন মুম্বাই। অথবা সরাসরি কলকাতা "অমরাবতী এক্সপ্রেসে" প্রায় ৩৮ ঘন্টা পার করে। আবার সরাসরি "ইন্ডিগো"র উড়োজাহাজেও ফিরিতে পারেন কলকাতা। আড়াই ঘন্টার সরাসরি উড়ানে। একটু দেখিয়া শুনিয়া টিকিট কাটিলে এসি টু শ্রেণীর কাছাকাছি ভাড়াতেই পেয়ে যাবেন গোয়া-কলকাতা সরাসরি উড়ান টিকিট। তাহা হইলে এবার বেরিয়েই পড়ুন মুম্বাই গোয়া দর্শনে।
অনেক বচন করেছি রচন,
যা পাই নি তারি লইয়া সাধনা
যাব কি সাগরপার?
ছিঁড়িবে বীণার তার ?" - রবীন্দ্রনাথ
না। শেষ হইয়াও হইল না শেষ !
কাজের ফাঁকে কিছুটা সময় পাইয়া গেলাম। আর তার সদব্যবহার করিয়া ফেলিলাম হায়দ্রাবাদের এক অপরিচিত মিউজিয়াম দেখিয়া লইয়া।
বলিয়াই ফেলি, কিছু গল্প যা ঐতিহাসিক ভাবে সত্য।
১৮৬৬ হইতে ১৯১১। নবাব মীর মাহ্বুব আলি খাঁন বাহাদুর, হায়দ্রাবাদ রাজ্যের ষষ্ঠ নিজাম, ছিলেন এক জনদরদী (আজিকালকার নেতাদের মতো নহে) শাসনকর্তা। তাঁহার সময়কালে হায়দ্রাবাদের অর্থনৈতিক উন্নতিরর কারণে প্রজারা নিজামের উপর যথেষ্ট সন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি নিয়মিত চা-চক্রে সাধারন মানুষের দু:খদুর্দশার কথা নিবিষ্ট মনে শুনিয়া প্রতিকারে সচেষ্ট থাকিতেন।
এরপর ১৯১১ সাল হইতে একটানা ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সপ্তম নিজাম ছিলেন, নবার মীর ওসমান আলি খাঁন বাহাদুর। ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দের ১১ই অগষ্ট, তিনি শাসনভার গ্রহণ করেন। তখন তাঁর ২৫ বৎসর বয়স। তাঁহার প্রধান ফরমান্ ছিল, যে প্রতিদিন তিনি তাঁর প্রজাদিগের যথসম্ভব ভাল রাখিবার চেষ্টা করিবেন এবং সত্যই সে ফরমান তিনি রক্ষা করেছিলেন। তিনিই প্রথম মৃত্যুদন্ডাদেশ তুলিয়া দিয়াছিলেন। তিনি বলিতেন যে হিন্দু এবং ম্যসলিম তাঁহার দই চক্ষের দুটি মনিস্বরূপ। প্রায় চৌদ্দ হাজার একর ভূমি তিনি আচার্য বিনোবা ভাবেজীর ভূদান আন্দোলনে দান করিয়াছিলেন ভূমিহীনদিগের জন্য।
তাঁর মৃত্যুতে হায়দ্রাবাদ শহর স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। শোকযাত্রায় প্রায় দশ লক্ষ মানুষ জড় হয়েছিলেন প্রিয় নিজামকে দেখিবার জন্যে।
(নিজাম মিউজিয়াম, পুরানা হাভেলি, হায়দ্রাবাদ)
১৯৩৭ সালে, তাঁর রাজ্যাভিষেকের রজত জয়ন্তী উৎসবে সাধারন মানুষ থেকে বিভিন্ন প্রদেশের রাজা, মহারাজারা যে সমস্ত উপহার প্রদান করিয়াছিলেন, সমস্তই আজ দেখিতে পাওয়া যায়, নিজাম মিউজিয়ামে যাইলে।
হায়দ্রাবাদ শহরের পুরানা হাভেলি অঞ্চলে এই মিউজিয়ামটি খুঁজিয়া বাহির করিতে আমার কালঘাম ছুটিয়া গেল। সবাই আমাকে সালারজঙ্গ যাইতে বলেন। অবশেষে নিজামের প্যালেসে পৌঁছাই। এবং সেইস্থান হইতে একটি অটোচালক আমায় পৌঁছে দেন এই মিউজিয়ামে। আমি যাহা দেখিলাম সেথায়, তার সামগ্রিক মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকার চেয়ে অনেকই বেশী হইবে মূল্যমানেত ভিত্তিতে। আর শৈল্পিক মূল্য আমার অননুমেয়। উপহার পাওয়া সামগ্রীগুলি হয় রূপার নয়তো স্বর্ণনির্মিত এবং প্রায় প্রতিটির ওজন এক কিলোগ্রামের কম নহে। সে চায়ের পেয়ালা অথবা তলোয়ার, যাহাই হউক না কেন। তার সহিত হীরা, মুক্তা, পোখরাজ, চুণী, পান্নার অপূর্ব কারুকলা। সোনার তালা চাবি আমি রূপকথার গল্পে পড়িয়াছিলাম। আজ স্বচক্ষে দেখিলাম। আরো আশ্চর্য হইলাম, তেমন কোনো নিরাপত্তাবেষ্টনী না দেখিয়া।
নিজামদিগের গহনাসমূহ আজ ব্যাঙ্কের লকারে বন্দী। তার মূল্যও শুনিলাম কয়েক হাজার কোটি হইবে। কিছু ছবি দেখিলাম শুধুমাত্র। এছাড়া প্রাচীন হায়দ্রাবাদের বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক স্থান হইতে বেশ কিছু মৃন্ময় পাত্র দেখিলাম, যেগুলির আনুমানিক বয়স সাড়ে তিন হাজার বৎসর।
সোনার পাথরবাটি দেখি নাই বটে, কিন্তু এই মিউজিয়ামে স্বর্ণনির্মিত পেয়ালা, পানপাত্র, জলের গ্লাস, রেকাবি, সিগারেট-দিয়াশলাই রাখার বাক্স, গন্ধ বা সেন্ট রাখার অপূর্ব কৌটা, হুঁকা, আরো কত কিছু। দেখিলাম সোনার তরবারি, ছোরা, বইয়ের এলবাম, কোরান পড়িবার ছোট আসবাব, স্বর্ণনির্মিত প্রায় দুই ফুট দীর্ঘ, দেড় ফুট প্রশস্ত কোরানের পাতাসকল ইত্যাদি ইত্যাদি কত কিছু। আর রৌপ্যনির্মিত কত কিছুরই "মডেল" বা ছাঁচ যাহাদের ওজন কোনোটারই তিন-চার কিলোর কম নহে। বৃদ্ধ বয়সের যে কত ষষ্ঠি বা লাঠি, যাহাদের হাতলের মাথা সকল সোনা, মুক্তা, হিরে, চুনিপান্নার নকশায় শোভিত। এমনি কত কিছু। এই পুরানা হাভেলি চত্বরে নিজামের দশখানি বাড়ীর মধ্যে, এই একটি বাড়ীই এখন মিউজিয়াম এ পরিনত।
আমরা তো সবাই হায়দ্রাবাদের মিউজিয়াম বলিতে সালারজঙ্গ কেই জানি। কিন্তু এক বন্ধুর কথায় জানিতে পারিয়া এই মিউজিয়ামটিকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া, আমার চর্মচক্ষু যাহা দেখিল তাহা কোনোদিনই ভুলিব না। এই প্রাসাদটিই পূর্বে নিজামদের বাসগৃহ ছিল। দোতলায় এখন এই মিউজিয়ামটি।
১৭৬ ফিটের একটি টানা কক্ষের দুই পার্শ্বে ষষ্ঠ নিজামের "ওয়ার্ডরোব" বা পোষাকের আলমারী দেখিয়া আমি তো বাকরুদ্ধ। নিজাম নাকি কোনো পোষাক-আশাক দ্বিতীয়বার ব্যবহার করেন নাই। জামা, পাজামা, জুতা সমস্ত কিছুই রাখা থাকিত এই টানা আলমারির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভিন্ন অংশে। ১৭৬ ফিটের দোতলা আলমারীর মধ্যেই রয়েছে পোষাক পরিবর্তনের ঘর যাহাকে এখন আমরা "Trial Room" বলিয়া থাকি। এবং এই আশ্চর্য টানা আলমারখানি পুরোটাই বার্মা সেগুনকাঠের তৈয়ারী। গিনেস বইতে এই বিশাল পোষাকের আলমারীখানি বিশ্বের দর্শনীয় সর্ববৃহৎ আলমারী বলিয়া অধুনা পরিচিত।
মিউজিয়াম দেখিয়া আসিলাম সেই বিখ্যাত "চারমিনার" দর্শনে। এই নামে এক সময় একটি বিখ্যাত কড়া সিগারেট যে কত টানিয়াছি তাহা স্মরণে আসিল। বাঙালীর প্রিয় ফেলু মিত্তিরের ও একমাত্র পছন্দের সিগারেট এটি। ফিল্টারবিহীন। জানিনা "ভার্জিনিয়া টোব্যাকো" কোম্পানিটি এখন আর এই সিগারেট প্রস্তুত করেন কি না !
চারমিনার বর্গাকৃতির। প্রতি দিক প্রায় ৬৬ ফুট দীর্ঘ। চারখানি মিনার বা স্তম্ভের উচ্চতা ১৮৪ ফুট। উপরে উঠিবার জন্যে ১৪৯ টি সিঁড়ি রহিয়াছে।
(চারমিনারের আশেপাশে, হায়দ্রাবাদ)
মিউজিয়াম দেখিয়া মদিনা চত্বরে হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানির স্বাদে মধ্যাহ্নভোজন সারিলাম মদিনা চত্বরে "সাদাব" এ। সাথে মুরগীর টিক্কা কাবাব। একটি পিতলের হাড়ি ভর্তি করিয়া পরিবেশিত হইল। সাথে বিভিন্ন প্রকারের রায়তা। কাবাবের রায়তার রঙ সবুজ। বিরিয়ানির সাদা। সুন্দর সোয়াদ তাহাদের। আরো এক প্রকার ঝাল রায়তা দিয়া বিরিয়ানি অনেকটা পরিমানেই খাইয়া ফেলিলাম।
(গেষ্ট হাউস, ন্যাশানাল ইন্স্যুরেন্স, জুবিলি হিলস্, হ্যদ্রাবাদ)
অত:পর ফিরিলাম আমার সাময়িক বাসস্থান, আমাদের কোম্পানীর অতিথি ভবনে। হায়দ্রাবাদের জুবিলি হিলস্ নামক একটি উচ্চবিত্ত মহল্লায়।
এই সালার জঙ্গের নিজস্ব সংগ্রহের প্রায় অর্ধেক সংগ্রহ তাঁর কর্মচারীগনে চুরি করিয়া পাচার করিয়া দিয়াছেন, তাহা না হইলে এই মিউজিয়ামখানির প্রদর্শিত বস্তু সংখ্যার মানদন্ডে, ইহা ভারতবর্ষের এক নম্বরেই স্থান গ্রহণ করিত।
প্রদর্শিত সংগ্রহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হইল, শিল্পী রবি বর্মার চিত্র, ঔরংজেবের তরবারী, সম্রাট শাজাহানের এবং নূরজাহানের, জেড পাথরের শৈল্পিক হাতল শোভিত ছুরিকা, টিপু সুলতানের আলমারি, নেপোলিয়নের ব্যবহৃত ফার্নিচার ইত্যাদি। এইখানে ৩৭ খানি গ্যালারী বা প্রদর্শিত কক্ষ রহিয়াছে।
(ভেলড্ রেবেকা, সালারজঙ্গ মিউসিয়াম, হায়দ্রাবাদ)
আরো একটি অবাক করা সংগ্রহ একটি কেক কুলভির তৈরী বৃহৎ ঘড়ি। ঘড়িটির উপরাংশে প্রতি ঘন্টায় একটি ক্ষুদ্র নারীমূর্তি দরোজা খুলিয়া বাহির হইয়া একটি ড্রামে হাতুড়ির আঘাত করিতে থাকে, আর ঘন্টার শব্দ শোনা যায়। দ্বিপ্রহর বারোটায় যেইহেতু বারো বার ঘন্টাটি বাজায়, তাহা দেখিবার জন্য ঘড়িটি একটি বৃহৎ অঙ্গনে বসানো রহিয়াছে। সম্মুখে অসংখ্য চেয়ার। বসিয়া দেখিবার জন্য। এই বারোটায় এই অঙ্গন ভরিয়া ওঠে স্তব্ধ একরাশ মানুষ। ঘন্টাধ্বনি যাহাতে সবাই শুনিতে পায় তাহার জন্য আধুনিক যন্ত্রের সাহায্য লওয়া হইয়াছে। এই ঘড়িটি ব্যতীত ইউরোপের প্রায় সমস্ত দেশের ঘড়ির সংগ্রহ দেখিবার মতো। প্রায় দুইশত বৎসর পূর্বের তৈরী একটি ডিজিটাল ঘড়িও আছে এই সংগ্রহে।
হস্তীদন্তের কারুকার্যখচিত নানান প্রকার বস্তুর অসাধারণ সম্ভার দেখিয়া দুই চক্ষু জুড়াইয়া গেল। বিভিন্ন পাত্র, অস্ত্র ইত্যবিধ নানান বস্তুর উপর সোনা, রূপা, মনিমানিক্য, হীরা জহরতের বিভিন্ন প্রকার কারুকাজ, শুধু যে শিল্পীর কুশলতার সাক্ষ্য বহন কর তাহাই নহে। যাঁহারা এই সবপ্রকার বস্ত ব্যবহার করিতেন তাঁহাদের রুচিবোধ ভাবিয়াও অবাক হইয়া যাই।
দ্বিতীয় বার আমি সালার জঙ্গ মিউজিয়াম দেখিলাম। প্রথমবারে ভেলড রেবেকা দেখিতে পাই নাই কারন কোনো এক উচ্চ ভি আই পির জন্যে উহা বন্ধ রাখা ছিল। এইবারে প্রাণ ভরিয়া দেখিয়া নিলাম।
আপাতত: আমার ভ্রমণ সমাপ্তপ্রায়। আরো দুই রাত্রি হায়দ্রাবাদের বাইরে ঘাটকেশরের সিঙ্গাপুর টাউনশিপে কাটিবে পুত্রের আস্তানায়। উনি এক্ষনে ইনফোসিসে কর্মরত। তাহার পর ১২ তারিখের রাত্রি নয় ঘটিকায় ইন্ডিগোর উড়োজাহাজে কলকাতা.....































































































































































































