ভালোপাহাড় এর তরুন প্রেমিক -

 


             প্রকৃতি তাঁর নিজের ভক্তদের যা দেন,তা অতি অমূল্য দান। অনেক দিন ধরিয়া প্রকৃতির সেবা না করিলে কিন্তু সে দান মেলে না। আর কি ঈর্ষার স্বভাব প্রকৃতিরাণীরপ্রকৃতিকে যখন চাহিব,তখন প্রকৃতিকে লইয়াই থাকিতে হইবে,অন্য কোনো দিকে মন দিয়াছি যদি,অভিমানিনী কিছুতেই তাঁর অবগুন্ঠন খুলিবেন না।

 

          কিন্তু অনন্যমনা হইয়া প্রকৃতিকে লইয়া ডুবিয়া থাকো,তাঁর সর্ববিধ আনন্দের বর,সৌন্দর্যের বর,অপূর্ব শান্তির বর তোমার উপর এত অজস্রধারে বর্ষিত হইবে,তুমি দেখিয়া দেখিয়া পাগল হইয়া উঠিবে,দিনরাত মোহিনী প্রকৃতিরাণী তোমাকে শতরূপে মুগ্ধ করিবেন,নূতন দৃষ্টি জাগ্রত করিয়া তুলিবেন,মনের আয়ু বাড়াইয়া দিবেন,অমরলোকের আভাসে অমরত্বের প্রান্তে উপনীত করাইবেন।

 

সেই ১৯৭২ সালেই মুখস্থ হয়ে গেছিল।


তবে প্রত্যক্ষ অনুভব করলাম ২০১৭ য়। শুধু প্রকৃতি নয়, তাঁর এক গুণী এবং অমূল্য ভক্তকে। তাঁর পুরো নাম শ্রী কমল চক্রবর্তী। পরিচিত নাম কমলদা। তাঁর শ্লোগান জয় বৃক্ষনাথ

 

......একদা হেমন্তে, একাকী ও লক্ষ লক্ষ স্বরচিত বৃক্ষের বনভূমিতে ভ্রমণরত, শুনিতে পাই, বৃক্ষনাথ, বৃক্ষনাথ আমি হাঁটু মুড়িয়া, ঐ নির্জন বনভূমিতে,  বৃক্ষনাথ, বৃক্ষনাথ উচ্চারণ করিশরীর সুস্থ ও শান্তিতূল্য হয়। এবং এই ঘটনা, গৃহে, প্রত্যাবর্তন করিলে, নির্লোভ, একান্ত স্বেচ্ছাসেবী, জয়তীকে বলি। তিনিও বিস্মিত হন !  এবং বলিতে থাকেনে এতদিনে তোমার সাধনা মূর্ত হইল। এতদিন বিমূর্ত ছিল। এখন তুমি ইহজন্ম, গতজন্ম সকল একত্রে অর্জন করিলে। এবং প্রারব্ধও যা ছিল তোমাতে প্রবেশ করিল। হে বৃক্ষনাথ !  নাথ হে !  হে বৃক্ষনাথ !!      - ( হে বৃক্ষনাথ কমল চক্রবর্তী )

  

এতোদিন জগন্নাথকেই জেনে এসেছি জগতের নাথ বলে। ভালোপাহাড় ঘুরে এসে মনে হল যে, দারুব্রহ্ম আর যাই হোন না কেন, বৃক্ষনাথ কখনোই নন !  যুক্তিটা এই, যে তাঁর মূর্তি এবং রথযাত্রায় যে পরিমাণ বৃক্ষ - পাখিগুলো হারায়, অলিকূলেরা হারায়, প্রজাপতি-মৌমাছিরা হারায় তা আর যাই হোক না কেন, টাটকা গজার রসে কখনোই পূর্ণ হয় না।  তা পূর্ণ হয় একমাত্র এই বৃক্ষনাথের হাত ধরেই ! তাই আমার কাছে কমলদা সেই দারুব্রহ্মেরই এক অংশমাত্র। জ্যান্ত, বাস্তব আর আবেগের জোয়ার ভাঁটায় সদাই উজ্জ্বল।  জয় হোক কমলদার ! জয় হোক বৃক্ষনাথের !

  

......অনেক ভেবে চিন্তে এই প্রভু, বৃক্ষনাথ !  আমরা সবাই গাছ লাগাবো। ফুল ফুটবে। ঝরা বকুল, গুলমোহর, অমলতাস, ছাতিম, হিমঝুরি, মাদার, রাধাচূড়া, কাঞ্চন, রুদ্রপলাশ, পলাশ, নিম, ঘোড়ানিম, মুচকুন্দ, চাঁপা অথবা যারা লাগাচ্ছি তারা জানি এই সব গাছ, দশ বারো পনের বছরে ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে। আমাদের ছেলেমেয়েরা ফুল ফুল রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবে। আর বলবে, কী ভালো !  কী সুন্দর !  তাদের মধ্যে দু-দশজন ফুল কুড়োবেদু-চারজন মালা গাঁথবে। দু-চারজন গাছ লাগাবে। দু-চারজন গাছকে জড়িয়ে ধরে, ওঁ বৃক্ষনাথ !  জয় বৃক্ষনাথ !  দু-চারজন আনন্দে কাঁদবে, দু-চারজন সমর্পিত হবে - ( হে বৃক্ষনাথ কমল চক্রবর্তী )

 

এঁরা কি অনেক গাছ চিনতেন !  ওঁরা ভালবাসতেন তরু।
ওঁদের ছোঁয়ায় সবুজ। ওঁরা কি লাগিয়েছেন কিছু, দু চার হাজার
বা লক্ষ !  ওঁরা কি সসেজ ট্রি, বুদ্ধনারকেল বা বৃক্ষদণ্ডীর
তলায় কোনোদিন বসেছিলেন। অথবা সীতাহার, করঞ্জ, পাঞ্জন।
আজ এতো দিন পরে মনে হচ্ছে ওরা গাছ ভালবাসতেন
নিশ্চয় গাছের সঙ্গে কথা বা আদর ছিল। কিন্তু গাছের
যৌনতা, চুম্বন, যুবক যুবতী গাছ, মিলনের রীতি ও শৃঙ্খলা,
কি স্যার জগদীশ !  গাছ ও লতার দৃশ্য, মেঘ বৃষ্টি
কুয়াশা, পাতা ও ফুলের শান্ত নীরব অভিমান, কত দিন
অভিমানী বট ঝরেছে একাকী !  বিকার ও টেস্ট টিউব কিছু
জানে, কিছু এলোমেলো ভ্রমণ-বিভূতি !  কিন্তু যে গাছ
রাত্রে কুঠারে কুঠারে গাছ-ভূত ! 


শেষ জীবনে নারী পরিত্যক্ত হয়ে বনে যাই। কিছু
গাছ ও লতার সঙ্গে বিয়ে। ক্রমে ক্রমে বিশাল হারেম। কত
গাছ জন্ম নিল, ছেলেপুলে নাতি। লাল নীল মেরুন
শিশুরা ভোরে দ্বিপ্রহরে, কত যে আবদার। দু পকেট ভরা
সার, সরষের খোল।

 

গাছেদের সঙ্গে আমি বিবাহ করেছি প্রতিদিন, প্রতিদিন
বরসাজ, বিবাহ বাসর, কনেবৌ লজ্জা লজ্জা শয্যা-সহচরী।
বিয়ে পাগলা বুড়ো নই, তবে কোন মধ্যরাতে গোপন চুম্বনে,
আম বা বাতাবী মুকুলে শিহরণ !
নিজেকে সত্যি আজ
বৃক্ষ প্রেমিকই মনে হয়। 

- (কে বেশী বৃক্ষ প্রেমিক, জগদীশ, বিভূতি, কমল ? একশো কমল কাব্যগ্রন্থ কমল চক্রবর্তী)

 

একেবারে সহজ সরল স্বীকারোক্তি কমলদার।  

 

কিছুদিন আগে আমি কমলদাকে প্রথম দেখে আর তাঁর ভাষণ শুনে আবেগে থরোথরো হয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম।

 

আধুনিক এই জলজ্যান্ত এক যুগলপ্রসাদ হলেন শ্রী কমল চক্রবর্তী মহাশয়। সতেজ, ঋজু, আত্মবিশ্বাসে ভরপুর সত্তোরোর্ধ এক যুবক। যিনি টিসকোর মত বিখ্যাত কোম্পানীর চাকরী অবহেলায় ছেড়ে দিয়ে গড়ে তুললেন এক অরণ্য শুষ্ক পুরুলিয়ার টাঁড় প্রান্তরেআমার যুগলপ্রসাদ তো শুধুমাত্র জঙ্গলে ফুল ফোটাতো। আর এই আধুনিক যুগলপ্রসাদ জঙ্গল বানিয়ে ফোটালেন ফুলআনলেন হাজার হাজার পাখি, প্রজাপতি, মৌমাছি, পোকামাকড় আর জন্তুজানোয়ারদের। এই গড়ে ওঠা অরণ্যের নাম রাখলেন ভালোপাহাড় সেখানকার আদিবাসীদের চেনালেন বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথকে। হিমালয়ের পাহাড়ে ব্রহ্মকমল ফোটে জানি, দেখি নি এখনো। কিন্তু আমি স্বর্ণকমলকে দেখলাম সেদিন কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে।

 

* ( আগ্রহী পাঠকেরা এ লেখাটি এই লিঙ্কে পড়তে পারেন :  https://www.facebook.com/duttgoutam/posts/1317944441588722  )

 

পুরো মানুষটাকে পেলাম হাতের নাগালে। বুকে বুক ছোঁয়ালাম। ১৩ই অগাষ্ট, ২০১৭র বেলা সাড়ে দশটায়। পরনে একটা অবিন্যস্ত ধুতি, গায়ে নিমো। কি অসম্ভব যত্নে এক মুহূর্তেই কাছের হয়ে গেলাম। মনে হল একখানা শরতের মেঘ। ভালোপাহাড়এর সবুজ আকাশে ছটফট করে উড়ে বেড়াচ্ছেন। আমাদের চা-জলখাবারের ব্যবস্থা করছেন, খাওয়া সাঙ্গ হলে নিজের হাতে ঝাড়ন নিয়ে মুছে দিচ্ছেন খাবার টেবিল। লজ্জার আর শেষ নেই যেন !

 

চৈতালির সুবাদেই আমার কমলদাকে কাছে পাওয়া। তিনদিন তিনরাত। বহুব্যাধিজর্জরিত এই দিদিমনি না থাকলে আমি কমলদাকে এতো কাছে, এতো নিবিড় করে কবে যে পেতাম !  দিদিমনির সাথে আলাপ ফেসবুক সূত্রেতার পরে যোগাযোগ, পরিচয় গ্রুপটাকে চেনা, নিবিড় এক বন্ধনে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে যাওয়া এঁদের সকলের সাথে। ১২ই অগাষ্ট চৈতালিকে (চৈতালি ব্রহ্ম) যখন হ্যালো করি তখন ও কলেজে ক্লাস নিচ্ছে তবে গলার স্বরে বুঝেই গেলাম এ মেয়ে যাবেই। দিন তিনেক আগেও গলা দিয়ে স্বর ভেতরে চলে যাচ্ছিল যাঁর, যাঁকে বারণ করলাম যে থাক্‌ না, ক্যান্‌সেল করে দাও ভালোপাহাড় ভ্রমণ - তাঁর গলা শুনেই বোঝা গেল যে এ মেয়ে অপ্রতিরোধ্য ! অগত্যা ১৩ই অযাত্রা পথে যাত্রী যাহারা চলে নিস্ফল আয়োজনে সঙ্গী হলাম আরো সাতজন। তেরোর গেরো যে এতো মধুর এতো স্বপ্নময় হয়ে উঠবে কে জানতো !

 

ভালোপাহাড় এ কমলদার আশ্রম প্রকৃত অর্থেই ছায়া সুনিবিড় প্রকৃতির নীড়থাকার ব্যবস্থা খুবই সাধারন কিন্তু মোটেই অসুবিধেজনক নয়। চব্বিশ ঘন্টা জল, বিদ্যুৎ, চেয়ার, টেবিল, খাট আর কি লাগে ! ঘরের সামনে পেছনে গাছ আর গাছ। কতো ফুল, কতো ফল। প্রকৃতির মাঝে এ এক অনন্য অনুভবআশ্রমের উল্টোদিকে মানে পীচঢালা সড়কের ওপারে আশ্রমের গোয়াল, ক্ষেত আর তার বাঁদিকে বৃক্ষনাথের অরণ্যপুরুলিয়ার বন্ধ্যা টাঁড় মাটিতে। একটা একটা করে গাছ লাগাতে লাগাতে আজ তা লক্ষ লক্ষে আকাশছোঁয়া। আশ্রমের পাশেই স্কুল। আদিবাসী ছেলেমেয়েদের কলরবে মুখরিতএকখানা ছোট্ট হাসপাতাল নির্মিয়মান। দু-জন ডাক্তার রয়েছেন সর্বদা। সব কিছুই সাধারনের সাহায্যে চলছে। কমলদার যা কিছু সব এখানেই নিয়োজিত। এমন কি বিভিন্ন পুরষ্কারের পাওয়া অর্থমূল্য অব্দি !

 

 হারিয়ে যাওয়া কতো রকম ধান আজ কমলদার ছোঁয়ায় লক্‌লকিয়ে ক্ষেতে দোলে। এবছর প্রায় চব্বিশ প্রজাতির দিশি ধান রোওয়া হয়েছে। কাঠের আগুনেই রান্না হয়। কয়লার বালাই-ই নেই ! রোজই রান্নার ঠাকুর সকাল থেকেই ব্যস্ত। কতো রকম রান্না, কতো জনের।


        কমলদার নজর সর্বত্রগল্পের শেশ নেই চুয়াত্তর বছরের এই তরুন মানুষটিরকমল-দা, এটা কি ফুল ?  কি গাছ ? মার্কা অবিরাম প্রশ্নের উত্তরে অবিরল জবাব। এটা মালয়েশিয়ার এক ধরণের মনসা কিংবা এটা হল স্যালাড্‌ লেবু গাছগাছড়ার এক চলমান জ্ঞানকোষ !

 

রান্না হচ্ছে তো হচ্ছেই। ১৩ই অগাষ্ট থেকে ১৬ই অগাষ্টের ভোর অব্দি কতো অতিথি !  সব্বাইয়ের দিকে তীক্ষ্ণ নজর !  রাত সাড়ে এগারোটায় ও এক অতিথির একখানা মাথার বালিশের জন্য ছট্‌ফটানি। সাথে কাঞ্চনদা। যিনি অবিশ্রান্ত গেয়ে যেতে পারেন মান্না দের একটার পর একটা গান। গানেগল্পেকবিতায়আড্ডায়  তিন্‌ তিন্‌টে দিন যে কোথা দিয়ে পেরিয়ে গেল কে জানে !

 

এরই মাঝে ঘোরা হল বুরুডি লেক। ঘাটশীলায় সন্ধ্যে নামা সুবর্ণরেখা। টটকো ড্যাম আর বান্দোয়ান।

 

দেখা হল কমলদার অরণ্যক্ষেতগোয়ালপুকুর। শাল না সেগুন গাছও চেনা হল। সোনাঝুরির মাথা তোলা গাছে হাল্কা হাল্কা ফুলের স্পর্শ। জারুলপিয়ালপলাশশালসেগুনের সবুজ পাতায় শেষ বিকেলের আলো। আলপথ ধরে হাঁটা। নেমে আসা সন্ধ্যায় এক আদিবাসী দোকানের খাটিয়ায় বসে দু-টাকা করে লাল চা খাওয়া। মধুপুরের দিকে যাওয়া রাস্তায় বনফুল এর গন্ধ। দূরে দলমা পাহাড়শ্রেণীর প্যানোরমিক নিসর্গ। অনির্বানের মোবাইলে উড়ে আসা ছোট্ট পালকের অপূর্ব প্রতিরূপ। তপনদার নিকনে হঠাৎ হঠাৎ শাটারের নিক্কণসারি দিয়ে দাঁড়ানো কিংবা অযাচিত হুঙ্কার। আলপথে শরীর সামলানো !  সন্ধ্যের পরে জোনাকীর দপ্‌দপে সবুজাভ। চতুর্দিকে ঝিঁঝিঁ আর দাদুরের সঘন ডাক। ঘরে ঢুকে আসা সোনা ব্যাঙ এর অকারন লম্ফন।

 

একি   প্রাণভরা অনুরাগে   আজি   বিশ্বজগতজন জাগে,
আজি   নিখিল নীলগগনে   সুখ-   পরশ কোথা হতে লাগে।
সুখে   শিহরে সকল বনরাজি,   উঠে   মোহনবাঁশরি বাজি,
          হেরো   পূর্ণবিকশিত আজি   মম   অন্তর সুন্দর স্বপনে॥

 

কবিতা না লিখে থাকতে পারলাম না

 

ভালোপাহাড় –’

 

চতুর্দিকে সবুজের ষাঁড়াষাঁড়ি বান।
ভালোপাহাড় এর বুকে মাটির জলছোপ। আর
হৃদয়ে হৃদয়ে হৃৎ-কমল।
তার ছোঁয়ায় গাছে পাতা ফোটে।
করমচা ফুলের হাওয়ায় ভাসে
কামরাঙার নিপুন শরীর।
নিষিদ্ধ ইস্তেহার ছড়ায় পায়ে পায়-
সবুজ সবু আর সবুজের
জয় বৃক্ষনাথে।


টাঁড় মাটি ভরে ওঠে ক্ষেতে
অরণ্যে।
বিশাল বিস্তার আর কাঠের আগুনে
প্রাচীন ভারতবর্ষ আর ওম কন্ঠের
সান্ধ্য আদিবাসী পাড়া জাগে, ওঠে, নাচে।
সেই নাচ, সেই গান শিলালিপি হয়ে যায়
আকণ্ঠ প্রাণে।           সোনাঝুরি ফুল ঝরে
অগনন,   হাওয়ার ছন্দে।
রাতে নামে ঘুম নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে।

 

টুকরো আরণ্যক জেগে ওঠে
আম জাম লিচু সবেদায়।
আর জাগে গান
কমলঋষভে ধৈবতে গান্ধারে।
পঞ্চম বাতাসে জাগে প্রাণ
আমার তোমার আর
অজস্র স্বপ্নের।      -   ( ©গৌতম দত্ত )

 

কমলদা, ভালোপাহাড় আর বৃক্ষনাথ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রশিক্ষাকেন্দ্রকৃষি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রলাইব্রেরীমৎস চাষপশুপালন কেন্দ্রবনসৃজন। কমলদার স্বপ্নআশাবেঁচে থাকা।

 

পৃথ্বীর গভীর মৌন দূর শৈলে ফেলে নীল ছায়া,
মধ্যাহ্নমরীচিকায় দিগন্তে খোঁজে সে স্বপ্নমায়া।
         যে মৌন নিজেরে চায়
         সমুদ্রের নীলিমায়,
অন্তহীন সেই মৌন উচ্ছ্বসিল নীলগুচ্ছ ফুলে,
দুর্গম রহস্য তার উঠিল সহজ ছন্দে দুলে।

.........

.........

অভ্যাসের সীমা-টানা চৈতন্যের সংকীর্ণ সংকোচে
ঔদাস্যের ধুলা ওড়ে, আঁখির বিস্ময়রস ঘোচে।
           মন জড়তায় ঠেকে,
           নিখিলেরে জীর্ণ দেখে,
হেনকালে হে নবীন, তুমি এসে কী বলিলে কানে;
বিশ্বপানে চাহিলাম, কহিলাম, "কেন এ কে জানে।'
  (নীলমণিলতা বনবাণী রবীন্দ্রনাথ)

 

চারখানি পাশাপাশি ঘর আমাদের জন্যে নির্দিষ্ট হল। সীমানার শেষ প্রান্তে। সামনে চওড়া দাওয়া আর সবুজ গাছের হাতছানিপাশে দীর্ঘ ছাতিমের তলা গোলবৃত্তে বাঁধানো। কামিনী, জবা, পেয়ারা, আরো আরো গাছগাছালীতে যেন কোনো ঋষির আশ্রম। ছুটে এলেন কমলদা !  আমাদের তদারকিতে। এরই মাঝে হারলে ডেভিডসন কোম্পানীর এক বিশাল মটোর বাইকে চেপে হাজির বালীর ডাক্তার কুমার কৌস্তভ রায়। কমলদা বলে ওঠেন তোর থাকার আর জায়গাই নেই। ডাক্তারবাবুর জবাব স্কুল বাসের দরজাটা খুলে দাও, ওখানেই শুয়ে পড়বো। আর তাও যদি না খুলে দাও তাহলে যেখানে হোক টেন্ট খাটিয়ে নিচ্ছি আমি !  কথার কথা নয়। অতবড় বাইকের পেছনেই সব মজুদ। স্লিপিং ব্যাগ, টেন্ট, চাল, ডাল, আলু মায় স্টোভ অব্দি। বুঝলাম সাতচল্লিশ বছরের তরুন ডাক্তারের সাথে কমলদার মিলমিশ প্রগাঢ়।

 

প্রথমদিনের সন্ধ্যে থেকে রাত অব্দি জমে গেলাম এই ডাক্তারবাবুর সাথেই। তিনি পেশায় মনোবিদ। মানে সাইক্রিয়াটিষ্ট। অজস্র গল্পের বর্ণময় ঝুলি। আর আমাদের ও অগুন্তি প্রশ্নের ফুলঝুরি। ডাক্তারি পেশা হলেও নেশা টইটই এর। সারা পৃথিবীর অনেকখানিই ঘুরে নিয়েছেন এই বাইক চেপেই। দক্ষিণ আমেরিকা, কিছুটা ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া আর ভারত তো জলভাত ! সিকিমেই ডাবল সেঞ্চুরী করে ফেলেছেন। বাইক তাঁর নেশা। কমলদার শরীর সেদিন একটু বিশ্রাম চাইছিল, তাই নিজের ঘরেই ছিলেন সে রাত্রি। খাবার সময়ে আবার যথারীতি !

 

         বারে একটু আলোকিত হবার চেষ্টা করি কবি, লেখক, সম্পাদক কমল চক্রবর্তীকে নিয়ে...

 

শংকর লাহিড়ী,১৮ ডিসেম্বর ২০১৬ তে https://kaurabarchives.wordpress.com/about/ এই ব্লগে লিখছেন :

 

গত শতাব্দীর আশির দশকে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ লিটিল ম্যাগাজিন পুরস্কার পেয়েছিল কৌরব। সেই ছিল তার স্বর্ণযুগ। দেশ পত্রিকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সখেদে লিখেছিলেন,বাংলাভাষার শ্রেষ্ঠ ছোট পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় বাংলার বাইরে থেকে। সেকালে কৌরবের প্রত্যেক সংখ্যায় আমাদের সঙ্কল্প ছিল,আগের সংখ্যার মুগ্ধতাকে ছাপিয়ে যাওয়া। এইভাবে বাংলাভাষায় পরীক্ষাসাহিত্যের এরিনায় কৌরব নিজেই একটা উন্মুক্ত প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিল ; কৌরবের প্রাণপুরুষ কমল চক্রবর্তী তার নিজস্ব কারিশমায় সাহিত্যের অবিশ্বাস্য সব টেবিল থেকে কৌরবের জন্য লেখা নিয়ে আসতো। বাংলা ভাষায় সম্ভবতঃ আর কোনও কাগজ তখন ছিলো না যেখানে শক্তি,সুনীল,সন্দীপন,অমিয়ভূষণ,কমলকুমার,শঙ্খ ঘোষ,উদয়ন ঘোষ, সন্তোষ ঘোষ, অসীম রায়,বুদ্ধদেব,পূর্ণেন্দু,উৎপলকুমার,আলোক সরকার,বিনয় মজুমদার,স্বদেশ সেন,তুষার,রণজিৎ,অমিতাভ, বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিতপ্রকাশ-যোগেন-রবীন-পৃথ্বীশ,জগন্নাথ,মলয়,দেবীরায়,কৃষ্ণগোপাল এক সাথে সাহিত্য ও শিল্পকর্ম করেছেন। দায়সারা নয়,-সিরিয়াস,শ্রদ্ধেয় নির্মাণ । গল্প,প্রবন্ধ,কবিতা,পেন্টিং, ,ইলাস্ট্রেশান,ফটোগ্রাফি। সেই ছিলো আশির শক,-কৌরবের স্বর্ণযুগ। সেসব এখন ইতিহাস,যা আজকের প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা।

 

জামশেদপুর থেকে প্রকাশিত হত কৌরব। কমলদা তখন টাটা মোটরস্‌-এ কর্মরত। কবিতাগল্পউপন্যাস লিখছেন কমলদা। কমলকুমার মজুমদার লিখছেন কৌরবে প্রচ্ছদ এঁকে দিচ্ছেন। ১৯৮২ সালের এক সংখ্যার লেখকসূচী দেখুন...

 



        বিনয় মজুমদারে
র কবিতা বেরোচ্ছে কৌরব’—এর পাতায়।

 



        মন এক লোভনীয় চাকরী ছাড়লেন প্রায় ছ বছর বাকি থাকতে। ১৯৯৬ থেকে পাকাপাকি থাকতে শুরু করলেন ভালোপাহাড়ে। কৌরব কে তুলে দিলেন জুনিয়রদের দের হাতে। ততদিনে তাঁর ধ্যান জ্ঞান ভালোপাহাড়।

 

কমলদার প্রকাশিত গ্রন্থ :

       উপন্যাস আমার পাপ, স্যার যদুনাথের আদি ভারতবর্ষের ইতিহাস, বৃক্ষু, ব্রাহ্মণনবাব, ব্রহ্মভার্গব     পুরাণ, মারাদোনা, ধান, কুকুর, কলকাতা, রুটির ওপিঠ, অলীক গস্‌পেল, ভিক্টর কুজুর, ছুটন্ত চৌকো বোতাম।

গল্প প্রচ্ছদ কাহিনী, শামু জোনকো, হাজার কুসুম, বন্দুকবিজয়, ভা;ওবাসার গান।

কবিতা চার নম্বর ফার্নেস চার্জড, জল, মিথ্যে কথা, আস্তে চলো গার্ল ফ্রেণ্ড, স্বপ্ন, সরলরেখা, জিতেন্দ্র, মদের দোকানে সেই ছেলেটি, একশো কমল, ভালপাহাড়, ছায়ানৌকো

অমনিবাস কমল ১

নাটক সোনার নাও পবনের বৈঠা।

অন্যান্য পূরবী তোমার মুখ।

 

যত মাটি খুঁড়ছি তত সোনা বেরোচ্ছে অনর্গল। ভাবনার, চিন্তার অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি আমি। টেবিলের ওপারে বসে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছি তাঁকে। আর ঝুড়ি ঝুড়ি মুক্তো উঠে আসছে মানুষটার গহন থেকে। আবেগে কণ্ঠ বুঁজে আসছে মাঝে মাঝে। চোখের কোনে চিক্‌চিকে হীরের ছটা !  তারই মধ্যে সমস্ত অতিথিদের জন্য ব্যাকুল চিন্তার প্রতিচ্ছবি সারা মুখে। এ কি মানুষ ! না কি মাটির দেবতা !

 

কথায় কথায় লালাদার (বুদ্ধদেব গুহ) স্মৃতি জানতে চাইজিজ্ঞেস করি তিনি এখানে এসে থেকেছেন কি না ! কমলদা বলেন না, সারাদিন থেকে ফিরে গেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখলেন মহাজীবন কমলদাকে নিয়ে। মিঠুন চক্রবর্তী একটা সিনেমা করতে এসে বেশ অনেকদিন থেকে গেছেন কমলদার আশ্রমে। নিজের হাতে রান্না করে খাইয়েছেন কমলদাকে। কমলদা জিজ্ঞেস করলে বলেছেন, আরে দাদা, আমি রান্না করি আমার হোটেলে। চৈতালি খাওয়ার তাগাদা দিলে কমলদা বলে ওঠেন চুপ্‌ কর্‌ না ! আজ সারারাত আড্ডা হবে। একটা চুয়াত্তরের চির তরুন !

 

এতো প্রশ্ন আমাদের ! কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবেন। আটষট্টি সালে চাকরীতে ঢুকেছেন। তখন শুধু কবিতা লিখছেন। আর ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন গোটা বাঙলাদেশ এপার ওপার। বরিশালের গইলায় গিয়ে কবি বিজয় গুপ্তের বাড়ি দেখছেন। যিনি মনসা-মঙ্গল লিখেছিলেন। লালনের সমাধিতে বসে কেঁদেছেন। জোর গলায় বলে চলেছেন, তিনি প্রায় সব কবির জন্মস্থানের মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখেছেন এক সময়তপনদার লেখা কবিতা শুনে আত্মহারা হয়ে বলে উঠছেন, আমায় বাঁচতে হবে আরো মনে হচ্ছে।

 

মতি নন্দী সাহিত্য পুরষ্কার পেলেন কমলদা দু হাজার তিনে। তাঁর ব্রাহ্মণ নবাব উপন্যাসটির জন্যেকমলদা বলে চলেছেন ব্রাহ্মণের চার রকম প্রকার। এক কুলীন ব্রাহ্মণের একশ তিনটে বিয়ে নিয়েই এই উপন্যাস। বলে চলেছেন ভরার মেয়ে কাদের বলে। কোন ঘরের মেয়েদের সাথে কুলীনদের বিয়ে হয়। কুলীন সর্বস্ব বাঙলার এক অরাজক পরিস্থিতির কথা। চলচিত্র পরিচালক গৌতম ঘোষ এই বইটা থেকে ছবি করবেনই। তাঁর শত ব্যস্ততার মধ্যেও কমলদাকে আশ্বস্ত করছেন বারংবাররাত যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে আসছে এই তরুনের কথায় কথায় !  কমলদা তন্ময়

 

কাঞ্চনদা গান শুরু করছেন তারই মধ্যে যদি কাগজে লেখো নাম... তারই মধ্যে ঠাকুরকে নির্দেশ দিচ্ছেন কটা মাছ রান্না হবে রাতে। কথা শেষে আবার কাঞ্চনদা গাইছেন...হৃদয়ে লেখো নাম, সে নাম রয়ে যাবে... খাওয়ার ঘরের বাইরে রাত নেমেছে তখন। আড্ডা একদম চূড়ান্ত ওভারে। কাঞ্চনদা গান ধরেছেন বারে বারে শুধু আঘাত করিয়া যাও, ধরা দেবে বলে আশা করে রই, তবু ধরা নাহি দাও। কৃষ্ণপক্ষের রাতে জোনাকিময় হয়ে আছে দূরের আবছায়া। পাঁচিলের বাইরে অস্পষ্ট রুয়ামের সিল্যুয়েট।

 

স্বপ্নের পাহাড় ভালোপাহাড় নামক এক লেখায় শ্রী বারীন ঘোষাল লিখছেন :

 

১৯৬৮ সালে জামশেদপুরে এক বর্ষায় আমরা ৫ জন একত্র হয়েছিলাম আড্ডা, কবিতা, গল্প, নাটক, পাঠচক্র, গান, ভ্রমণ, প্রেম, পত্রিকা, বিখ্যাত সাহিত্যিকদের নিয়ে অনুষ্ঠান ইত্যাদি করার জন্য। সবাই তখন বেকার। আমি,কমল চক্রবর্তী,সুভাষ ভট্টাচার্য,অরুণ আইন,শক্তিপদ হালদার আমাদের এই পাঁচজনকে বলা হত পঞ্চপান্ডব। কমলের লেখা একটা নাটক করতে গিয়ে দলের নাম দেবার কথা উঠলে কমলই নাম দিলো পঞ্চপান্ডবের উল্টো, কৌরব। দেবজ্যোতি দত্ত জয়েন করল। বাংলার পুরুলিয়া থেকে বনগাঁ,ডায়মন্ডহারবার থেকে দার্জিলিং চষে বেড়াতাম কবিসঙ্গ করতে,প্রকৃতির কোলে গড়াগড়ি খেতে। শান্তিনিকেতন আর পান্নালাল দাশগুপ্তর টেগোর সোসাইটি আমাদের মন কেড়েছিল। ১৯৭১-এ কৌরব পত্রিকা বেরলো,সেই থেকে আজও চলছে। পাহাড় জঙ্গল সমুদ্রতীরে গিয়ে কৌরবের কবিতার ক্যাম্পে সবাই দু-তিনদিন সংসার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন,কেবল কবিরা মিলে একসাথে সহযাপন করতাম। ক্রমে বহিরাগত কবিরাও যোগ দিতো ক্যাম্পে। সে থেকে একটু একটু করে জমা হতে থাকল স্বপ্নেরা আর সেই স্বপ্নপূরণের ইচ্ছেরা। জমে জমে তা পাহাড় হয়ে গেছে। ভাবতাম পরিবেশ,জলবায়ু,অর্থনীতি,রাজনীতি প্রভৃতির দূষণমুক্ত কোন অমল স্বর্গে আমরা থাকব। অনেক জায়গা চষে বেড়ালাম তার খোঁজে। ধীরে ধীরে হৃদয়ঙ্গম হল যে আমাদের চারপাশের পৃথিবীতে দূষণমুক্ত জায়গা পাওয়া অসম্ভব। ফলে স্থির করা হল একটা নতুন জায়গা তৈরি করে নিতে হবে,নতুন পৃথিবী। যা আগে কেউ দ্যাখেনি,ভাবেনি। যেমন আমরা কৌরব পত্রিকা করেছিলাম যার কোন উদাহরণ ছিল না,আজও নেইজামশেদপুরে কোন পত্রিকাই ছিল না। আমরা শুরু করেছিলাম স্ক্র্যাচ থেকে,করে তুলেছিলাম বাংলার শ্রেষ্ঠ। তেমনি আবার আমরা শুরু করব শূন্য থেকে। সেজন্য আমাদের চাই টাঁড় জমি,একলপ্তে অনেকটা,যেখানে গাছ দূরের কথা, এক চিলতে ঘাসও চাই না,গরু ছাগল চরে না,সাপ খোপ নেই,পাখি নেইসব আমরাই গড়ে তুলব। অবশেষে আমাদের স্বপ্নের পাহাড় একদিন প্রাণ পেলো। নতুন স্বপ্নের জন্ম হল। একটাই স্বপ্ন এতজন দ্যাখে কী করে,পোষে কী করে জানি না। তবে একদিন তা অবয়ব পেতে শুরু করল।


  শচীন দত্ত, আমাদের পরিচিত এক গ্রামীন কবি,গাড়িগ্রামের,জামশেদপুর থেকে ৬০ কিমি দূরে  বান্দোয়ানের কাছে তার ৪০ বিঘা অনাবাদী জমি বিক্রি করতে চায়। আমরা খুঁজছি শুনে খবর দিলো। এসে দেখি ডাঙরজুরি গ্রামের কাছে বড় রাস্তার ধারে এই ঢালু জমি,নিচে একটা তিরতিরে নদী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য,যেখানে গাছ নেই,ঘাস নেই,জল নেই,যেন কোনকালে চাষ হয়নি। কমলকে বললাম,কোন কথা হবে না,আগে কিনে ফ্যাল। আমার বাড়িতে সাতজন একত্র বসে আলোচনা করে আমাদের ব্যক্তিগত টাকা জড়ো করে দাদন দেয়া হল জমির। তখন ১৯৯৬ সাল, এপ্রিল। কাছের টেগোর সোসাইটিকে গিয়ে বললাম --- গাছ লাগাবো,চারা দিন। তারা ৫০টা চারা দিলেন আর চারা পিছু পোঁতার খরচ ৫০ পয়সা। সেই শালের চারা লাগানো হল মাঠে লাইন করে,নিচের নদী থেকে জল টেনে। তখন আমরা অফিস করি। রবিবার আর ছুটির দিন আসা যেত। পরের সপ্তাহে গিয়ে দেখি অর্ধেক ছাগল খেয়েছে,অর্ধেক জলাভাবে শুকিয়ে। এখান থেকে ৫ কিমি দূরে দুয়ারসিনিতে হেঁটে যেতাম লাঞ্চ করতে, ডাল আর মুড়ি। তাই পাওয়া যেত তখন। পরের বার ৫০০ চারা সংগ্রহ করলাম। কাছের গ্রাম থেকে দুজন লোক রাখা হল গাছ লাগানো আর রোজ দিনের বেলা জল আর পাহারা দেবার জন্য। গরু-ছাগলরা সময় বদলালো। সন্ধের মুখে তারা আর রাতের বেলা গাছচোর। মাঠ পরিষ্কার প্রায়। বর্ষাকাল আগত। জল জমাবার জন্য পুকুর খোঁড়া হল। সেই মাটি দিয়ে ঘর বানিয়ে ছাউনি দিয়ে আমাদের লোকেরা সেখানে দিনরাত। আমরা গেলে খিচুড়ি রেঁধে দিতো। গাছ লাগানো আর তাকে বাঁচিয়ে রাখাও শেখার ব্যাপার। সেই প্রথম আমাদের ঘর হল।এখন সেটি নেই। পুকুরটা আছে। প্রথম বাগান শিশু, শাল,সেগুন,মেহগনি,সোনাঝুরির। ক্রমে গাছের সংখ্যা বেড়ে হল প্রায় দু-লক্ষ। জমি ৭০ একর। বাড়ি গাড়ি সব হল। লেগে থাকলাম সমানে। ভালোপাহাড়ে সময় দেবার জন্য চাকরি ছেড়ে দিলাম আমি, কমল আর দেবজ্যোতি। ২০০০ সাল।

 - (সূত্র : http://www.aihik.in/aihik/Article/466/ ) ঐহিক ওয়েব ম্যাগাজিন।

 

আর কি !  যাবার সময় হল আমাদের। তিনদিনের সঙ্গসুখের যবনিকা। ভোর পৌনে পাঁচটায় সবে আলো ফুটি ফুটি করছে আমি আর চৈতালি কমলদার দুয়ারে করাঘাতে জাগাতে চাইছি গতকালের রাত বারোটায় শুতে যাওয়া মানুষটিকেভেতর থেকে এক ধ্বনি তোরা রেডি ?  অল্প নিস্তব্ধ ইন্টারলিউড। কপাট খুলে বেরিয়ে এলেন। প্রণামের পালা সাঙ্গ করে গাড়িতে ওঠা। আশ্রম গেট থেকে ধুতি-নিমো পরিহিত সুকোমল মূর্তি আস্তে আস্তে ছোটো হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বনাথ গাড়ির এ্যাক্‌সিলেটারে চাপ বাড়াচ্ছে। বাঁক ঘুরতেই সবুজ সবুজ আর সবুজের ভীড়ে লুকিয়ে গেলেন কমলদা !

 

......হালফিলে হরিণেরা অরণ্যে থাকেনা
কেউ কেউ বোতাম কারখানায়
কারও তৈরী যশুরে চিরুনী
নরম জুতোর মধ্যে পা গলিয়ে মেয়েটি বলল
                  হরিণের মত লাগছে, বড় ছটফটে
         আমাকে জড়িয়ে ধরো
         ছুটে চলে যাবো অরণ্য গভীরে  ( গভীর অরণ্য  কমল চক্রবর্তী)

 

#

©গৌতম দত্ত
১৯শে অগাস্ট, ২০১৭
কলকাতা