পায়ে পায়ে শিমূলিয়া

 


দেশকাল আর পিপলস গ্রিন সোসাইটি আয়োজিত হেদুয়া এবং সন্নিহিত অঞ্চল পরিক্রমার পথে আজ আমি সামিল হয়েছিলাম সাতসকালেই। প্রায় ২৩/২৪ জনের একটি ছোট্ট দলে আমরা সকাল সাড়ে নটা থেকে শুরু করেছিলাম পথ চলা। সিমলা অঞ্চলের এই পায়ে চলে  ইতিহাস খুঁড়ে দেখা পর্বে আজ যা যা আমাদের দ্রষ্ট্রব্য ছিল তা হল :

১।      হেদুয়া পার্ক ও বটকৃষ্ণ পালের মূর্তি।

২।     ১৮ নং বেথুন রো অঞ্চলে নান পরিবারের বাড়ি ও তৎসংলগ্ন নান-দের কালিবাড়ি।

৩।     মহেন্দ্র গোস্বামী লেন এ গণিতজ্ঞ কালীপদ বসুর বাড়ি।

৪।     সিমলা স্ট্রিট এ মান্না দে-র পৈত্রিক ( কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে ) বাড়ি।

৫।     গিরিশ চন্দ্র ঘোষ ও নকুড় চন্দ্র নন্দী-র সন্দেশের দোকান। রামদুলাল সরকার স্ট্রিট।

৬।    ডি এল রায় স্ট্রিট এ দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের বাড়ি।

৭।     মদন মিত্র লেন এ দীনবন্ধু মিত্র-র বাড়ি।

৮।     তারক প্রামানিক রোড-এ তারক প্রামানিক-র বাড়ি।

৯।     সরকার লেন এ ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি।

১০।    সিমলা ব্যায়াম সমিতি।

 


আমাদের পথচলা শুরু হেদুয়া পার্ক-এর উত্তর-পশ্চিম কোণে শ্রী বটকৃষ্ণ পালের মর্ম্মর মূর্তিকে স্মরণ করে। ১৯২৭ সালের এই ২৭শে সেপ্টেম্বর এই মূর্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এখানে। এই মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেছিলেন রাজেন্দ্র লাল মুখার্জী এবং সেদিনের সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এবং শ্রী বিপিনচন্দ্র পাল। আজ ওনার বংশধরদের কয়েকজন এসেছিলেন আমাদের সাথী হতে।


            কে ছিলেন এই বটকৃষ্ণ পাল যার মূর্তি এতো বছর আগে স্থাপন করা হয়েছিল !  ৯২ নং শোভাবাজার স্ট্রিটের যে বাড়িটি আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে তা ছিল এই মহান ব্যবসায়ীর বাড়ি। অপূর্ব দর্শন এ বাড়ি দেখলে আজও মনে হয় কলকাতা আমাদের সত্যিই একদিন সিটি অফ প্যালেস ছিল। শোভাবাজার অঞ্চলের বি কে পাল এভিন্যু তাঁরই নামঙ্কিত। 

         বাঙালি সংস্থা হিসেবে বি কে পাল অ্যান্ড কোং ছিল উনবিংশ-বিংশ শতকের এক নামকরা ওষুধের কোম্পানি। ওই সময় কলকাতা শহরে কবিরাজি হোমিওপ্যাথির চল। এর মধ্যে দ্রুত এসে পড়ল অ্যালোাপ্যাথির ব্যবহার। এই অ্যালোপ্যাথি ওষুধ সরবরাহ আর বিক্রির জন্য খুলে ফেললেন আরেকখানা কোম্পানী বটকৃষ্ণ পাল অ্যান্ড কোম্পানি। তাঁর নিজস্ব ল্যাবোরেটরিতে তৈরি হল সে যুগের বিখ্যাত এডওয়ার্ড টনিক যা ম্যালেরিয়া নিবারণে প্রভূত সাহায্য করেছিল। এখনো এই ওষুধ বাজারে বর্তমান। 

         বটকৃষ্ণ পালের ডিস্পেনসারি সে সময় চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা থাকতো। কতো রকমের খদ্দেরদের আনাগোনার মাঝে কতো যে বিপ্লবী এই দোকান থেকে নাইট্রিক এ্যাসিড, পটাশ অর্থাৎ বোমা তৈরির মশলা নিয়ে গেছেন তার ইয়ত্তা নেই। ওষুধ ব্যবসার সাথে সাথেই ভারতবর্ষের পরাধীনতা তাঁকে মর্মে মর্মে বিঁধতো।

          আজও ওই অঞ্চলবাসীরা এক কথায় চেনেন বটকৃষ্ণ পালের প্রাসাদোপম বাড়িখানা।


         হেদুয়া পার্ক থেকে বেরিয়ে আমরা সদলবলে চার রাস্তার মোড় পেরোলাম। এন্ট্রি নিলাম পশ্চিম দিক বরাবর বেথুন কলেজ কম্পাউণ্ডের ডান পাশের রাস্তা বিডন স্ট্রিটে। আমাদের সাথে আগেই যোগ দিয়েছিলেন আমাদের আজকের হেরিটেজ হন্টনের প্রধান অতিথি বিখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী হরিপদ ভৌমিক মহাশয়। যিনি কলকাতা নিয়ে কাজ করে চলেছেন দীর্ঘদিন ধরেই।

        অল্প এগিয়ে মানে ডানদিকে বিডন স্ট্রিট সর্বজনীন দুর্গাপুজো চত্বর কে ডানদিকে রেখে বাঁদিকে বেথুন রো আর ডানদিকে হরি ঘোষ স্ট্রিট। আমাদের গন্তব্য বেথুন রো।

         কথায় কথায় হরিপদবাবুর থেকে যা শুনলাম তা যতখানি পারছি লিখে রাখছি। শোনার ভুলে হয়তো ভুলভ্রান্তি থাকতেই পারে। আশা করি আপনারা সেসব শুধরে দেবেন। প্রথম গোবিন্দপুরের পত্তন হয় ৮৯৯ খ্রীষ্টাব্দে। সেইসময় গোবিন্দ দত্ত নামে একজন রাজা গঙ্গাসাগরে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে তিনি বাঁদররসা গ্রামে আদি গোবিন্দপুরের পত্তন করেন। যদিও অনেকেই এটা মানতে চান না। সে সময় ক্রিক রো ছিল একটা অতি ব্যবহৃত খাল যা সল্ট লেক থেকে শুরু হয়ে শিয়ালদা - ওয়েলিঙটন ড্যালহাউসি হয়ে গঙ্গায় গিয়ে পড়েছিল। এই ক্রিক রোর খালটা খুবই প্রাচীন খাল এবং পর্তুগীজরা নবাবের থেকে পত্তনী নিয়ে গভীর করে এই খাল কেটে সে সময় টোল ট্যাক্স বসিয়েছিল,  যেহেতু এই খাল দিয়ে প্রচুর নৌযানবাহন যাতায়াত করতো। সেই টোল ট্যাক্সের স্মৃতি আজও রয়ে গেছে ব্যাঙ্কশাল নামের মধ্যে। ব্যাঙ্কশাল বা বাঙ্ক শাল মানে হচ্ছে নদীপারের ট্যাক্স আদায়ের জায়গা। এই খালের পশিম দিক বরাবর ছিল মিষ্টি জল গঙ্গার কারণে আর পূবে ছিল নোনা জল লবন হ্রদের কারণে। সেই পূব দিকে ছিল অজস্র হেঁতাল আর সুন্দরী গাছ। তার থেকে এ জায়গার নাম ছিল হেন্টালি (আজকের এন্টালি) যা হেঁতাল গাছ থেকে এসেছে। এই লবন হ্রদ অঞ্চলে অনেক কাল ধরে যে সুন্দরী গাছ ছিল তা ১৯৫৯ সালে মাটি খুঁড়ে জানা গেছে। এবং সে সুন্দরী গাছের মাটি পরীক্ষা করে জানা গেছে যে তা ছিল পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। ফলে এই অঞ্চল কিন্তু অনেক প্রাচীন। এর সাথে পাওয়া গেছে শিমূল গাছের বীজও।  এই যে বাঁদররসা নাম তার বাঁদর মানে শিমূল গাছ আর রসা মানে মাটি। যে অঞ্চলে এই শিমূল গাছের আধিক্য ছিল সেই গোটা অঞ্চলটিই ছিল শিমূলিয়া। সিমলার চারটি নাম সিমলা স্ট্রিট, সিমলা লেন, সিমলা বাই লেন এবং বাহির সিমলা। এই সিমলার গর্বের জায়গা যেটা সেটা হচ্ছে ১৭১৭ সালে ৩৮ খানা গ্রামের অধিকার পেলেও ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি কিন্তু এই সিমলার অধিকার কিন্তু পায় নি। যার জন্য ইংরেজরা নকল দুখানা দলিল করে এই সিমলা গ্রামের দখল নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাও সুবিধে করতে পারেন নি। তারপর প্রায় ৭০ বছর ধরে তারা চেষ্টা চালিয়ে গেছেন এই সিমলাকে অধিকারে আনতে। জনশ্রুতি এই যে মারাঠা ডিচ খোঁড়া হয়েছিল বর্গী-হাঙ্গামা ঠেকানোর জন্য কিন্তু এটা ভুল কথা। আসল কথা ছিল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি তিনটে গ্রাম নিলেও সিমলে আর বেলেঘাটাকে তারা পায়নি। সেই সময় সিমলের মানুষেরা যে লড়াই চালিয়েছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে তা নিয়ে হয়তো ভবিষ্যতে গবেষণা হতে পারে। এক্ষেত্রে শিমূলিয়ার একখানা স্যালুট পাওনা থেকেই যায়। এই কথা কোনো ঐতিহাসিকই বলেন নি। সে সময় সিমলা ছিল ডিহি যার মধ্যে ছিল দুটি গ্রাম। একটি সিমুলিয়া আরেকটি কাঁকুরগাছি। সুতরাং বোঝাই যায় এই বিরাট অঞ্চলটার জন্যে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির কতখানি আগ্রহ ছিল এবং এইটাকে ভাগ করার জন্য ইংরেজরা তৈরি করল মারাঠা ডিচ। যার ফলে সিমলা দুভাগ হয়ে গেল। মারাঠা ডিচের পূবদিকের নাম হয়ে গেল বাহির সিমলা। ইংরেজরা অন্য কোনো উপায় না পেয়ে জোর করে দুভাগ করে দিল সিমলাকে। এই জায়গাটা সেকালে স্বাধীনই ছিল বলা যায়। এই অঞ্চল মুর্শিদাবাদ নবাবের অধিকারেরও বাইরে ছিল। কলকাতার ইতিহাসে এটা এক অনন্য অধ্যায়। শিমূলিয়া আজও সেই গৌরব বহন করে চলেছে।

         প্রাণকৃষ্ণ দত্ত তাঁর বই কলিকাতার ইতিবৃত্ততেও বলছেন যে কবিরাম প্রণীত দিগ্বিজয় প্রকাশ মহারাজ প্রতাপাদিত্যের জীবিতকালে লিখিত। সম্ভবত যে সময় রাজা শালিখার নবনির্মিত দুর্গে বাস করিতেছিলেন। কবি বলিতেছেন, গোবিন্দ দত্ত নামক এক রাজা গঙ্গাসাগর তীর্থ হইতে ফিরিবার সময় কালী তাঁহাকে স্বপ্নে আহবান করিয়া বদির রসা নামক আপনার নিকটস্থ স্থানে বাস করিতে আদেশ করেন। গোবিন্দ দত্ত তথায় মৃত্তিকা মধ্যে বিপুল অর্থ প্রাপ্ত হইয়া গৃহাদি নির্মাণ করেন এবং অপরাপর কায়স্থ ব্রাহ্মণ নবশাখাদি সৰ্ব্ব জাতিকে আহ্বান করিয়া নিজ নামে গ্রামের নামকরণ করিয়াছিলেন। এই সমসামম্বিক ইতিহাসবেত্তার কথা আমরা কিরূপে অবিশ্বাস কৰিব ? সুতরাং আন্দুলের চতুর্থী রাজা টোডরমলের সহকারী গোবিন্দশরণ দত্তই যে গোবিন্দপুরের সংস্থাপক তাহা মানিয়া লইতে হইতেছে। গোবিন্দপুরের পূর্ব নাম বাদর রসা

         ১৭৫৪ সালের ৮ ডিসেম্বর (অর্থাৎ এই ৩৮ খানা গ্রাম কেনবার প্রায় ৩৭ বছর পরে) কলকাতার কাউন্সিল লণ্ডলে যে চিঠি লেখেন তাতে উল্লিখিত আছে গত ৮ই আগস্ট মিঃ হলওয়েল অতি কষ্টে ডিহি সিমলার স্বত্বাধিকারীর নিকট, ২২৮১ টাকায় উহা ক্রয় করিয়াছেন, উহা কলিকাতার একটি প্রধান অংশ, উহা খরিদ করায় বিশেষ উপকার হইয়াছে। আমরা যে মূল্য দিয়াছি, বর্ত্তমান তহসিলেই জমীর খাজনায় তাহা অপেক্ষা অনেক অধিক আয় হয়। যখন উহা আমাদের হস্তে বন্দোবস্ত হইবে, তখন আরও অনেক অধিক আয়ের সম্পত্তি হইবে তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু স্বত্বাধিকারের মধ্যে এখনও অনেক গোল আছে, তাহা আমরা এখনও নিষ্পত্তি করিতে পারি নাই, যখন পারিব, তখন আপনাদের জ্ঞাত করিব। অতএব বোঝাই যাচ্ছে যে সিমলা অধিকারে আনতে ইংরেজদের কতো ছলনা করতে হয়েছিল।

 


          আসলে মারাঠা ডিচ কাটার আগে (১৭২৪ খ্রীঃ) এই সিমলা পরগণা কলিকাতার উত্তরাংশ, সূতানুটির দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব্বাংশ মৃজাপুর (মীর্জাপুর) পর্য্যন্ত এবং পূর্ব্বে মাণিকতলার দক্ষিণ বর্ত্তমান গড়পার প্রভৃতি সমস্ত স্থান ডিহি সিমলার অন্তর্গত। মেছুয়াবাজার ষ্ট্রীটে রাজা দিগম্বর মিত্র মহাশয়ের বাটীয় সম্মুখে যে বাজারটিকে টিকটিকি বা পোড়াবাজার বলে, বহু পূর্ব্বে উহা সিমলা বাজার বলিয়া পরিচিত ছিল, ১৭৮৪ খ্রীঃ ম্যাপে উহাকে পুরাতন সিমলা বাজার এবং বর্তমান সিমলা বাজারকে নুতন সিমলা বাজার বলিয়া লিখিত আছে। এই সিমলায় বিস্তর তন্তুবায় অতি মূল্যবান ছিট বুনিত, তার জন্যই এ প্রদেশের সকল গ্রাম অপেক্ষা সিমলা গ্রামের আয় অনেক অধিক ছিল, এবং এই ছিটের জন্যই কোম্পানির এই গ্রামের প্রতি এত লোভ। তাঁহারা ইহা কৌশলে আয়ত্ত করিয়া তন্তুবায়দিগের প্রতি এমন অত্যাচার আরম্ভ করিয়াছিলেন যে,তাহারা বাবসা পরিত্যাগ করিয়া চারিদিকে পলাইতে বাধ্য হয়। কিন্তু বিলাতের অধ্যক্ষ সভা হইতে ১৭৫৫ খ্রীঃ ৩১ জানুয়ারির পত্রে ঐ তন্তুবায়দিগকে বিশেষরূপে সাহায্য করিয়া তাঁহাদের ব্যবসায়ের উন্নতি করিবার জন্য কলিকাতায় কাউন্সিলে অনুরোধ আসিয়াছিল। ক্রমে উহাদিগের প্রতি অত্যাচার এবং উহাদের পলায়ন হেতু কোম্পানির ক্ষতি যখন বোর্ডের নিকট বিবিধ সুত্রে পহুঁছিল, তখন ১৭৫৭ খ্রীঃ ২৫ মার্স্ট বোর্ড কলিকাতার কাউন্সিলে লিখিলেন, আমরা বারবার আগ্রহের সহিত তোমাদের অনুরোধ করিতেছি যে, তোমরা অধিবাসীদিগকে ব্যবসায়ের সুবিধা করিয়া দিবে এবং গরীবদিগকে অত্যাচার হইতে রক্ষা করিবে। ইহার জন্য আমরা তোমাদের বিশেষতঃ মিঃ হলওয়েলের উপর নির্ভর করিয়া আশা করিতেছি যে, সাবধানে স্বীয় স্বীয় কার্য করিয়া আমাদের সদভিপ্রায় সাধনে সাহায্য করিবে। তাহার পর ২৫শে মার্চ আবার লিখিয়াছেন, আমরা শুনিতেছি, কলিকাতার লোকসংখ্যা অত্যন্ত কমিয়া গিয়াছে, আমরা জানিয়ে চাহি, ইহা সত্য কি না? অতএব তোমরা এ বিষয় অনুসন্ধান করিবে। যদি সত্য হয়, তাহা হইলে ইহার প্রকৃত কারণ আমাদিগকে জানাইবে। ১৭৫৮ সালের ৩রা মার্চ তারিখে বোর্ড আবার কলিকাতার কাউন্সিলে পত্র লিখিয়া আদেশ করেন যে, ঢাকা, কাশীজোড়া ও শান্তিপুর প্রভৃতি স্থান হইতে তাঁতীদিগকে আনাইয়া দুর্গের নিকট সহরে এবং কোম্পানির আয়ত্তাধীন ৩৮ খানি গ্রামে বসাইয়া উপরোক্ত স্থানসকলের বস্ত্র বিশেষতঃ কলিকাতার নানা বর্ণের ছিট বুনিতে উৎসাহ প্রদান করিবে। সিমলার তাঁতীরা অনেকে ব্যবসায় পরিত্যাগ করিয়াছিল, অনেকে ফরাসীদিগের আশ্রয়ে চন্দননগরে গিয়া বাস করে। কোম্পানির লোকেরা যাহাদিগকে আনিয়া আবার সিমলায় বসাইলেন, তাহারা ছিট-বোনা তাঁতী নহে, অনেকে সূক্ষ্ম বস্ত্র বুনিতে পারিত। সেই সময় হইতে সিমলা ছিটের পরিবর্তে ধুতির জন্য বিখ্যাত হইল।"

        

         কোথা থেকে কোথায় গল্পের বিস্তার করে ফেললাম। যাচ্ছিলাম বেথুন রো ধরে নান-দের কালীবাড়ি দর্শনে। তার মধ্যে মাথায় কিলবিল করে উঠল এইসব গল্পগাছা। কি আর করি !

         এবারে আমাদের ডান দিকে ঘোরার পালা। ঢুকে পড়বো বেথুন রোতে।

 

         ১৮৭৩/৭৪ সালের এই সিমলে অঞ্চলের বর্ণনা পাই মহেন্দ্র লাল দত্তের বইতে। কলিকাতার সহর এখনকার হিসাবে দুই আনা বা ছয় পয়সার সহর ছিল। মহেন্দ্র গোঁসাই গলিটা ডোমপাড়া ছিল। মধু রায় গলি গয়লাপাড়া ছিল এবং দক্ষিণ দিকে প্রকাণ্ড একটা মাঠ ছিল তাহাতে মরা গরু, বাছুর ফেলিয়া দিত। সে একটা গো-ভাগাড় ছিল। দিনে শকুনীর উৎপাত, রাতে শেয়ালের উৎপাত। হাতীবাগান অরণ্য বীজবন ছিল। লোকজনের বাস ছিল না। প্রকাণ্ড মাঠ, মাঝে মাঝে ঝোপ, ডোবা ও কাটানটের ঝাড়, জনকতক হাড়ী বাস করত। রাস্তায় অন্ধকারে একলা যাইলে জিনিসপত্র কাড়িয়া লইত।

        ‘সিমলা হইতে জগন্নাথের উঁচু বাটি পর্যন্ত খুব উঁচু বাটি ছিল না। আমরা ছাতে উঠে দেখতাম জাহাজের মাস্তুলগুলোকে যেন একটা শুকনা জঙ্গল দেখাইত।

          বুঝুন তাহলে ব্যাপারটা। নরেন দত্তের বাড়ির ছাদ থেকে গঙ্গায় ভেসে থাকা সারি সারি জাহাজের মাস্তুল দেখা যেত !  আর এখন তো আকাশ আটকে যাচ্ছে বেপরোয়া উঠে যাওয়া সারি সারি বাড়ির দেয়ালে।

        বেথুন কলেজের পেছন দিকের রাস্তাটাই বেথুন রো। বেথুন রোতে ঢুকেই চোখ চলে গেল সুউচ্চ এক বিশাল বটবৃক্ষের দিকে। শয়ে শয়ে বাদুড়। সেই সময়কার প্রাচীন সিমলেতে ছোট্ট নরেন গুলতি দিয়ে হাতের টিপ ঠিক করতেন এই বাদুড় মেরেই।

        মহেন্দ্র লাল দত্ত লিখছেন এ বিষয়ে নরেন্দ্রনাথ বিশেষ দক্ষ ছিল। তাহার টিপ অতি নিশ্চিত ছিল। টিপ করিয়া ঠিক বাদুড় মারিত। বুড়িরা বলিত বাদুড় যেখানে বাস করে সেই জমির খাজনা সে নিত্য দেয়, অর্থাৎ ফল আনিয়া খায় আর আঁটি ফেলে। বুড়িরা আরও বলিত যে ওরা বলি রাজার প্রজা। রাজা পাতালে থাকে, সেইজন্য ওরা নিচের দিকে পা রাখে না, রাজার সম্মানের জন্য হেঁট মাথা করিয়া ঝোলে। বাদুড়রা বড় পুণ্যাত্মা।  

        অল্প একটু এগিয়েই বেথুন রো আবার দুভাগ হয়ে গেছে। ডান দিকে একটা রাস্তা নিস্তারিণী কালী মন্দিরের দিকে চলে গেছে আর সোজা রাস্তাটি গিয়ে পড়েছে রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে।

        বেথুন কলেজের কিছু অংশ ও বেথুন রো-এর অংশবিশেষ নিয়ে অবস্থিত ছিল সিমলা বলে। সিমলা বাজার সম্বন্ধে মহেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন—“আমাদের সময় যেটা সিমলা বাজার ছিল তা হল এখানকার বেথুন কলেজের বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ এবং খানিকটায় বেথুন কলেজের পশ্চিম  দিককার রাস্তা হইয়াছে। 

        ১৮৭৯ খ্রিঃ বেথুন স্কুলে কলেজ বিভাগ খোলা হয়। এর ভারপ্রাপ্ত হলেন অধ্যাপক শশীভূষণ দত্ত। সরকার বেথুন কলেজ সম্প্রসারণের জন্য সিমলা বাজারটা অধিগ্রহণ করেন, তার কিছু অংশ বেথুন রো প্রশস্ত করার জন্য ক্রয়মূল্যে কলিকাতা পুরসভাকে হস্তান্তরে প্রস্তাব দেন। এই প্রসঙ্গে কলিকাতা পুরসভাকে লেখা বাংলা সরকারের সেক্রেটারির পত্র থেকে জানা যায় যে সরকার ২ বিঘা ৮ কাঠা ৮ ছটাক জমি ৮৩,১২০ টাকায় অধিগ্রহণ করেন। প্রতি কাঠার মূল্য ১৭১৪ টাকা, রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য পুরসভার প্রয়োজন ৩ কাঠা ১২ বর্গফুট জমি। ওই জমি বিনামূল্যে সরকারের কাছ থেকে চাওয়া হয়েছিল। সরকার পুরসভার ওই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। অবশেষে পুরসভা তাঁদের ২৩শে মার্চ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের অধিবেশনে সরকারের প্রস্তাব গ্রহণ করেন। অর্থাৎ ১৭১৪ টাকা কাঠা দরে ৩ কাঠা ১২ বর্গফুট জমি সরকারের কাছ থেকে কেনার ব্যবস্থা হয়।

 


             উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিককার কথা। ১৮ বেথুন রো-র বাসিন্দা সিমুলিয়ার বর্ধিষ্ণু গৃহস্থ কৃষ্ণচন্দ্র নান তাঁর এম.এ. পরীক্ষার্থী পুত্র কার্তিকচন্দ্রের গৃহশিক্ষক হিসেবে পেলেন ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক তেজী শিক্ষককে। সে যুগের রীতি অনুসারে, গৃহশিক্ষক ভবানীচরণ ছাত্রের বাড়িতে থেকেই তাকে পড়াশোনা করাতেন। কিন্তু পড়াশোনা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ছিন্ন হয়নি ওই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। শুধু সেই ছাত্রই নয় তাঁর উত্তরপুরুষরা নিজেদের উদ্যোগে ব্রহ্মবান্ধবের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিকে স্মরণীয় করে রেখেছেন পাথরের ফলক বসিয়ে। ব্রহ্মবান্ধবের বিশাল কর্মকাণ্ডের অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই বাড়িটি।

        বেথুন রো আর এই ১৮ নং বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের অন্যতম সুসন্তান মহাত্মা ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়। তিনি ছিলেন একজন বাঙালি ধর্মপ্রচারক, তিনি বেশ কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশ ও পরিচালনা করেছিলেন । তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন। ব্রহ্মবান্ধবের পূর্বনাম ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

 


         হুগলী জেলার খন্যানের বাসিন্দা ভবাণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয় ১১ ফেব্রুয়ারি ১৮৬১ তে (১লা ফাল্গুন। ১২৬৭ বঙ্গাব্দ)। এঁদের আদি বাড়ি ছিল কৃষ্ণনগরের খানাকুল গাঁ-এ। ভবানীচরণের প্রপিতামহ মদনমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় একজন ধার্মিক ও সৎ ব্যক্তি হলেও কৌলিন্যপ্রথানুযায়ী পঞ্চাশখানা বিয়ে করেছিলেন। এখন ভাবলেই কেমন যেন গা শিরিশির করে ওঠে। পঞ্চাশবার বিয়ের পিঁড়েতে চাপা জাস্ট ইনকরিজেবল। ব্যানার্জী মশাই শেষ বিবাহখানি করেছিলেন মাত্র একটা সুপারী গ্রহণ করে। ভাবানীচরনের ঠাকুর্দা হরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মামার বাড়িতে মানুষ হচ্ছিলেন। কোন মাতুলালয় তা প্রশ্ন করবেন না। জবাব নেই আমার কাছে। খন্যান গ্রামের বসতবাড়ি ইনিই তৈরি কএন। কাজ করতেন ঠগি-বিভাগে, সুদূর জব্বলপুরে। হরচন্দ্রের তিন ছেলে। দেবীচরণ, কালীচরণ আর তারিণীচরণ। দেবীচরণের তিন ছেলের নাম হরিচরণ, পার্ব্বতীচরণ আর ভবানীচরণ।

ভবানীচরণের যখন মাত্র বছরখানেক বয়স তখনই তাঁর মা মারা যান। এই এক বছর ধরে ভবাণী বিভিন্ন চর্মরোগে ভুগতে ছিলেন। যার ফলে মা তাঁকে সুস্থ অবস্থায় দেখেই যেতে পারেননি। শিশু ভবানী ঠাকুমার কোলে পিঠেই বড় হতে থাকেন।

গ্রামের এক পাঠশালায় ভবানীচরণের লেখাপড়ার শুরু। এরপরে চুঁচুড়ার হিন্দু স্কুল। কিছুদিন পরেই হুগলীর ব্রাঞ্চ স্কুল। সে স্কুলের হেডমাস্টার তখনকার ইংরেজি সাহিত্যের এক দিকপাল যজ্ঞেশ্বর ঘোষ। আর প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন রবার্ট থোরেস। তীক্ষ্ণ মনোযোগী ভবানী সব সময়েই প্রথম হতেন।

হুগলী থেকে কলকাতা। ভর্তি হলেন জেনারেল এসেম্বলী স্কুলে। প্রিন্সিপ্যাল ডাক্তার জার্ডিন। আবার ফেরত গেলেন হুগলীতে বাবার চাকরীর বদলীর সূত্রে। হুগলী কালেজস্কুলে স্থান হল এবারে। ভবানীর উপনয়ন হল হুগলীতেই। তখন ভবানী তের বছরের। এর এক বছর পরেই মাছ মাংস ত্যাগ করে নিরামিষাশী হয়ে গেলেন বাকি জীবনটার জন্যে। অবশ্য এর মধ্যে মাত্র একবার আমিষ তাঁকে খেতেই হয়েছিল বাধ্যতায়।

এন্ট্রান্স পাশ পনেরো বছরে। সংস্কৃতে প্রচণ্ড আগ্রহ। ভাটপাড়া যেতে শুরু করলেন সংস্কৃত ব্যাকরণ আর সাহিত্যের অনুরাগে। এর সাথে ছিল শরীরচর্চা। ব্যায়াম, কুস্তী, লাঠি, জিমন্যাস্টিক, ক্রিকেট সবেতেই তুখোড়। ছোটখাটো এক নেতা হয়ে উঠলেন ভবানীচরণ।

এর মধ্যেই দুচারবার আর্মানীয় ছেলেদের সাথে মারপিট হয়ে গেল। তাদের অসভ্যতার বিরুদ্ধে। মাথায় ঢুকল আর্মানীদের উচিৎ শিক্ষা দিতে গেলে সৈনিক হতেই হবে। গোয়ালির যাত্রা করলেন সৈনিক হবেন বলে। বাড়ির লোক পিছু ধাওয়া করে পাণ্ডুয়া স্টেশন থেকে নামালেন এ ছেলেকে। বড় ভাই হরিচরণ তখন কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। ভাইকে নিয়ে এসে নিজের কাছে রেখে ভর্তি করালেন জেনারেল এসেম্বলী কলেজে (আজকের স্কটিশ চার্চ কলেজ)। 

আবার তিন বন্ধু জুটিয়ে চারজন চললেন গোয়ালিয়র। সঙ্গে মাত্র চার কি পাঁচ টাকা। অনেক কষ্টে গোয়ালিয়র পৌঁছলেন। এই তিন বন্ধুর মধ্যে একজনের বাবা ছিলেন পুলিশ বিভাগের উচ্চপদাধিকারী। গন্ধ শুঁকে ঠিক তিনি হাজির হলেন গোয়ালিয়রে। কলকাতায় এসে এবারে ভর্তি হলেন বিদ্যাসাগর কলেজে। মনের দুঃখে ধরলেন সিদ্ধির নেশা। কলেজেই একবার ধরা পড়ার পর আর কখনো ছুঁয়েও দেখেন নি তা !

আবার পালালেন। এবারে একা। আগ্রায় নেমে ধোলপুরের টিকিট কাটলেন। এবারে হাতে ছিল তেত্রিশ টাকার মতো। ধোলপুরে গিয়ে উঠলেন সর্দ্দার উমাচরণ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি। রাতে খেতে বসে দেখলেন বড় বাটি করে পাঁঠার মাংস। অথচ বলতে পারছেন না। তিনি সৈনিক হতে যাচ্ছেন আর মাংস খাবেন না তা কি করে হয়। পাঁচ বছর বাদে আবার খেলেন মাংস। ব্যস এই শেষ।

ধোলপুর থেকে উটের গাড়িতে গোয়ালিয়র। প্রথমে এক বাড়িতে ইংরেজি মাস্টারের কাজ পেলেন। তাঁর মধ্যেই এক জনের বদান্যতায় খুলে ফেললেন ইংরেজি শেখানোর স্কুল। এরই মধ্যে পরিচয় হল সিন্ধিয়া মহারাজের সেনাপতির সাথে। কিন্তু কিছুই সুবিধে না হওয়ায় কলকাতায় ফিরে মেমারিতে মাস্টারি করতে চলে গেলেন।  

এরপরে শরীর অসুস্থ হলে চলে যান জব্বলপুরে। সেখানে একটু সুস্থ হয়েই হিমালয় ভ্রমণে বেরিয়ে গেলেন। সে সব সাঙ্গ করে পুনরায় কলকাতা। যথারীতি মাস্টারী আবার।

জন্মসূত্রে হিন্দু ভবানীচরণের ধর্ম সম্পর্কে অসীম কৌতুহল ছিল। আর সে সময় কেশবচন্দ্র সেন নিজের বাগ্মিতায় দেশকে মাতিয়ে দিচ্ছেন। পড়াশোনার পাঠ শেষ হতে না হতে কেশবচন্দ্র সেনের প্রভাবে ভবানীচরণ নববিধান ব্রাহ্মসমাজের সভ্য হন। পরে একে একে প্রোটেস্ট্যান্ট ও রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মের এই দুই শাখাতেই দীক্ষিত হয়ে ধর্মপ্রচারের কাজে যুক্ত হন। নিজের দেওয়া নতুন ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় নামেই পরিচিত হন তখন থেকে। ঘুরে বেড়ান সিন্ধু প্রদেশ, হায়দ্রাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলে। এই সময়কালে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের সাথেও সাক্ষাৎ হয় তাঁর। কিছুদিনের মধ্যেই পিতৃবিয়োগ ঘটে। সে সময় কলতায় মহামারী প্লেগ রোগে অবসন্নপ্রায়। আহার নিদ্রা ত্যাগ করে দেশবাসীর সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন ভবানীচরণ।

এর মধ্যেই কনকর্ডক্লাব নামে একটা সমিতি তৈরি করলেন। আর সাথে বার করলেন একটা মাসিক পত্রিকা কন্‌কর্ড। ১৮৮৬ সালেই এই ১৮ নং বেথুন রোর বাড়িতেই এই ক্লাবের জন্ম। কুচবিহারের মহারাজের পৃষ্ঠপোষকতায় আর উইলিয়াম উইলসন হান্টারের সম্পাদকীয়তার গুণে নতুন বাড়ি নেওয়া হল সার্কুলার রোড-এ (এখন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড)। এখন সেই জায়গায় রাজাবাজার ট্রাম ডিপো। ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতির আলোচনা ছাড়াও বক্তৃতা, গানবাজনা, খেলাধুলা, ব্যায়াম ইত্যাদি নিয়েই কংকর্ড ক্লাব চলতে লাগল।

১৯০০-এ কলকাতায় ফিরে প্রাক্তন ছাত্র কার্তিকচন্দ্রের সহায়তায়, তাঁর ১৮ বেথুন রো-এর বাড়ি থেকে নতুন করে প্রকাশ করলেন ক্যাথলিকদের মুখপত্র 'সোফিয়া নামে এক মাসিক পত্রিকা। এই পত্রিকার একটি সংখ্যায় ব্রহ্মবান্ধব প্রথম রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি (World-Poet) আখ্যা দেন। তিনি বলেন যে রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র প্রেম আর প্রকৃতির পূজারি কবি নন, তিনি জগতের সব রূপ রস গন্ধের এক অনুভবী কবি। তিনি আরো বলেন যে যদি কোনোদিন বিদেশিরা বাংলাভাষা শিখতে আগ্রহ দেখান, তারা শিখতে চাইবে শুধুই রবীন্দ্রনাথকে। তাই তিনি সত্যিকারের এক বিশ্বকবি।

১৯০১ সালে ৩১ শে জানুয়ারি আরেকটি নতুন পত্রিকা The Twentieth Centuryর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রকাশক কার্তিকচন্দ্র নান, যুগ্ম সম্পাদকনগেন্দ্রনাথ গুপ্ত ও ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়। এই কাগজে ব্রহ্মবান্ধবের দর্শন বিষয়ের প্রবন্ধগুলি নরহরি দাস-এই ছদ্মনামে এবং অন্যান্য বিষয়ের উপর লেখা স্বনামে প্রকাশিত হয়। প্রকাশ করেন টুয়েনটিয়েথ সেঞ্চুরি নামে আরও একটি পত্রিকা। ওই বাড়িতেই স্থাপন করলেন আয়তন নামে এক গুরুকুল। ওই সময়েই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় রবীন্দ্রনাথের, পরে তা পরিণত হয় গভীর সখ্যে।

১৯০১-এ স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাবে আবার হিন্দুধর্মে ফিরে এসে ইউরোপে যান বেদান্তধর্ম প্রচার করতে। সেখান থেকে ফিরে, তিনি গেলেন শান্তিনিকেতনে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে, ব্রহ্মচর্য আশ্রম গঠনের কাজে যুক্ত হতে। শান্তিনিকেতনে গিয়ে তিনিই প্রথম রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব অভিধায় সম্বোধিত করেন। কিছুকাল সেখানে অধ্যাপনা করার পর আবার কলকাতায় ফিরে উঠলেন বেথুন রো-এর বাড়িতেই। সেই সময়ে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সারা বঙ্গদেশ উত্তাল। শিক্ষকতা ছেড়ে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করলেন ব্রহ্মবান্ধব।

এবারে একটু নাহয় গল্পের আশ্রয় নিই।

 

সাল ১৯০১। সিমলের নরেন বিশ্ববিজয় সেরে স্বামী বিবেকানন্দ। ব্যারিস্টার উমেশ চন্দ্র ব্যানার্জী সবে অবসর নিয়েছেন কলকাতার হাইকোর্ট থেকে। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করছেন। ওদিকে সুইডেনে নোবেল প্রাইজের খাতা খুলছে। কলকাতা তখন ভারতের রাজধানী।

তখনো মানিকতলা স্ট্রীট বলতে কাঁচা রাস্তাই। নতুন রাস্তা সেন্ট্রাল এভিনিউ তৈরিই হয় নি। চারদিকেই খাবলা খাবলা জংগল। পুকুর আর কাঁচা নর্দমার সুগন্ধ। যে পায়ে চলা শুঁড়ি পথে সেই যে গালিব যেতেন চীৎপুর অব্দি, সে রাস্তার জংগল কিছুটা সাফ হয়ে কিছু বাড়িঘর তৈরি হয়েছে সদ্য। মানিকতলা থেকে মানিকতলা স্ট্রীট শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ছাতুবাবুর মাঠে। বছর আট নয় হল, রোজ সকালে ছাতুবাবুর ফাঁকা মাঠে আজকাল জেলেরা আর তরকারীর ফোড়েরা বসছে সকালবেলায়। দুপুরের পর থেকে আবার নিঝুম সব।

যাদের বাড়িতে ঘোড়ার গাড়ি ছিল না, তাদের ছিল পাল্‌কি। বড়লোকেদের ঘোড়ার গাড়ি থাকলেও তাদের বাড়ির মেয়েরা কিন্তু ঘেরাটোপ দেওয়া পাল্কিতেই স্বচ্ছন্দ ছিল। বাবুরা পাল্‌কির গদীর বিছানায় শুয়ে শুয়ে অফিস যেত। সাধে কি বাঙালি আয়েসি !  পাল্‌কি যে বাড়িতে থাকত তার সাথে চারজন চাকর তো থাকতই। তারা জল তোলা, তামাক সেজে দেওয়া, কাঠ কাটা, বাড়ি পাহারা দেওয়া ইত্যাদি বাকি কাজকর্ম করত। অনেক বাড়িতেই পাতকুয়ো ছিল।

তখন কিন্তু হেদুয়া থেকেও চাকরেরা বাঁকে করে জল আনত। সে জল খাওয়াও হত। ওই জল নাকি উৎকৃষ্ট ছিল। সে সময় সিমলে পাড়ায় শীত পড়ত ভালোরকমই। খোলা মাঠ ঘাট জংগলের হাওয়ায় কাঁপুনি ধরত আলো পড়তেই। সবই প্রায় কাঁচা বাড়ি।

ওই সময়ে প্রায়ই বিকেল বেলা যুবক কবি জোড়াসাঁকো বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোম্পানী বাগানের আগের এক পায়ে চলা পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসতেন এই বেথুন রো-তে কার্তিকচন্দ্র নানের বাড়ি। যেদিন ঘোড়ার গাড়ি করে কবি আসতেন সেদিন অবশ্য বিডন স্ট্রীট ধরতেন বিডন স্ক্যোয়ার অব্দি চিৎপুর রোড ধরে এসে। বেশ ক বছর হল তৈরি হয়েছে বিডন স্ট্রীট। যেতে যেতে পথে পড়ে প্রথমে অমৃতলাল বসুর গ্রেট ন্যাশান্যাল থিয়েটার (মিনার্ভা)। আর একটু এগোলেই ৯ নং বিডন স্ট্রিট এর বেঙ্গল থিয়েটার বন্ধ হয়েছে। আর এই ১৯০১ সালেই মালিকানা পালটে নাম নিয়েছে অরোরা থিয়েটার। ক্ষিরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদের দক্ষিণা নাটক দিয়ে ১৭ আগস্ট শুরু হয়েছে। এই একটা নাট্যশালাই এখন চোখে পরে কবির আসা যাওয়ার রাস্তায়। গ্রেট ন্যাশানাল থিয়েটার বন্ধ হয়েছে গত শতাব্দীতেই। তা অনেকদিনই হল। আর ৬৮ নম্বর বিডন স্ট্রীটের স্টার থিয়েটারে তো সেই ১৮৮৭ তেই বন্ধ হয়েছে। রমণীরসিক গুর্মুখ রায় বিনোদিনীর নামের নাম রাখতে চেয়েছিলেন কিন্তু গিরীশবাবুর কথায় বিনোদিনী গুর্মুখ রায়কে রাজি করায় স্টার থিয়েটার নাম রাখতে। ১৮৮৩ সালের ২১ জুলাই গিরীশচন্দ্র নামালেন দক্ষযজ্ঞ নাটক। সেই শুরু। আর তার চার বছর বাদে ১৮৮৭ সালের ৩১ জুলাই বুদ্ধদেব-চরিত আর বেল্লিক বাজার নাটক অভিনয়ের পর বন্ধ হল বিনোদিনীর স্টার থিয়েটার। গিরীশ ঘোষের বিদায়ের পরে গোপাল শীল এই বাড়িতেই খুললেন এমারেল্ড থিয়েটার। কিন্তু চললো না। টিকিটঘর মাছি তাড়াতে লাগল। আবার কয়েকমাস পরে ফিরে এলেন গিরীশ। কতো যে নাটক এই রাস্তায় !  যুবক কবির মনে কি পড়ে না এসব ? নিশ্চই পড়ে। চার-পাঁচ বছর আগে এই বিডন স্ট্রিটে আলো ঝলমল করতো তিন-তিনখানা নাট্যশালায়।  এই স্টারেই শ্রীরামকৃষ্ণদেব স্বয়ং এসেছিলেন গিরীশেচৈতন্যমঙ্গল নাটক দেখতে। সেদিনই ঠাকুর বিনোদিনী দাসীর মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন। ঠাকুর বলতেন থ্যাটারে লোকশিক্ষে হয়।

কার্তিকচন্দ্র ব্রহ্মবান্ধবকে গুরুর জায়গায় বসিয়েছিলেন। ব্রহ্মবান্ধব যখন কবির ডাকে শান্তিনিকেতন যান তখন তিনি কার্তিকচন্দ্রকেও সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন চারুশিল্পের মাস্টারমশাই হিসেবে। কার্তিকচন্দ্র নিজের ছেলে সুধীরচন্দ্রকে শান্তিনিকেতনের আশ্রমে ভর্তি করিয়েছিলেন। কবি যে কয়েকজন ছাত্রকে তাঁর আশ্রম প্রতিষ্ঠার প্রথমদিকে পেয়েছিলেন তাদের মধ্যে এই সুধীরচন্দ্রও ছিলেন।

পরে ব্রহ্মবান্ধব কোনো কারণে আশ্রম ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে এলে তাঁর সাথেই কার্তিকচন্দ্র আর সুধীরচন্দ্রও ফেরত আসেন কলকাতায়। ১৯০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা পত্রিকার এক মামলা চলার সময়েই ব্রহ্মবান্ধব অসুস্থ হয়ে পড়েন। কার্তিকচন্দ্রের বাড়িতেই চিকিৎসা শুরু হয়। অসুস্থতা বাড়তে থাকায় ২১ অক্টোবর ক্যাম্বেল হাসপাতালে (নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ) ভর্তি হন। ২৭ অক্টোবর ব্রহ্মবান্ধব চলে যান তাঁর ঈশ্বরের কোলে।

রাজদ্রোহের বন্দী ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের সাথে এই ১৮ নম্বর বেথুন রোর স্মৃতি চিরটাকাল জড়িয়েই থাকবে। কার না পায়ের ধুলো পড়েছিল এই বাড়িখানায় ! বাল গঙ্গাধর তিলক,  সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও আরো কতো গণ্যমান্য মানুষের। এখন ও এই বাড়ির গায়ে রয়েছে

ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় স্মৃতিভবন
ধর্মবীর উপাধ্যায় ব্রহ্মবান্ধব।
খ্রিস্টাব্দ ১৮৬১-১৯০৭, সন ১২৬৮-১৩১৪

তাঁর প্রিয়তম ছাত্র কার্তিকচন্দ্র নান, মহাশয়ের এই বাসভবনে অবস্থানকালে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে নানারূপ ধর্ম্মালোচনাদি দ্বারা ও সন্ধ্যা স্বরাজ করালী প্রভৃতি বিখ্যাত লোকপ্রিয় পত্রিকা প্রচারের সাহায্যে স্বদেশবাসীকে সর্বদা ভগবৎ প্রেমে উদ্দীপ্ত ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে রাখতেন।

 



সিমলা বাজারের মধ্য দিয়ে সাধারণের চলাচলের একটি পথ ছিল। এই পথ দিয়ে মানিকতলা স্ট্রিট, বেথুন রো ও সিমলা স্ট্রিটে আসা যাওয়া করা হত। বেথুন কলেজের জন্য বাজারের জমি অধিগ্রহণ করায় এবং পরবর্তীকালে বেথুন কলেজ প্রাচীর দিয়ে ঘিরে দেওয়াতে সেই পথটি বন্ধ হয়ে যায়।

   

বেথুন রো-র সাথে আরেকটা পরিবারের নাম অঙ্গাঙ্গী ভাবেই জড়িয়ে আসে। সে হল নান-দের পরিবার। এনারাও কলকাতার প্রাচীন তন্তুবায়। হুগলীর রাজবলহাট গ্রাম থেকে অষ্টাদশ শতকে কলকাতায় চলে আসেন রামসুন্দর নানের বাবা। এবং এই সিমূলিয়া গ্রামে যেহেতু প্রচুর তাঁতী পরিবার বাস করতেন তাই সিমলে পাড়াতেই থাকতে শুরু করেন। ৮ নং কৃষ্ণ সিংহ লেনে (এখন বেথুন রো)   ছিল এদের আদি বাড়ি। এই রামসুন্দর নানের ছেলে ঈশ্বরচন্দ্র নান ছিলেন তদানীন্তন ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানীর স্টিভেডর। সেখান থেকেই ধাপে ধাপে উন্নতি। ব্যবসা দারুন চলতো সেসময় কারণ কলকাতা বন্দর তখন পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত বন্দর। দম ফেলার ফুরসত ছিল না তাঁর। মানিকতলা স্ট্রীট (যা এখন রামদুলাল সরকার স্ট্রীট) ও আজকের বেথুন রোর সংযোগস্থল থেকে পশ্চিমদিক অব্দি ছিল ঈশ্বরচন্দ্রের বর্দ্ধিত বসতবাড়ি। এখন বেথুন রো আর রামদুলাল সরকার স্ট্রীট (মানিকতলা স্ট্রীট) দুজায়গায় মিশেছে। মূল বেথুন রো ওই ১৩৩ নং বাড়ি থেকে শুরু যার পূবদিকেই ছিল সেই চলন্তিকা বোর্ডিং হাউস। আর একটা মুখ হল নানেদের কালীমন্দিরের সোজাসুজি।

ঈশ্বরচন্দ্র নান এই কালীবাড়ি যা পরিচিত নিস্তারিণী কালীবাড়ি বলে, তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১২৭২ বঙ্গাব্দের (ইংরেজি ১৮৬৫ সাল) শুভ রথযাত্রার দিন এই কালীমন্দিরের বিগ্রহ পূজো পেতে শুরু করেন। এর এখন ঠিকানা ২৫ নং বেথুন রো। ঈশ্বরচন্দ্র নানের এক প্রতিবেশী কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মায়ের অনুরূপ একটি কালীমূর্তি বানিয়ে আনেন সুদূর কাশী থেকে। প্রসঙ্গত বলা যায় যে ১৮৫৫ সালের ৩১ মে মা ভবতারিণীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল রানী রাসমনির হাতে। সে হিসেবে এই নিস্তারিণী মন্দির মাত্র দশ বছরের ছোট। যাই হোক সেই কৃষ্ণচন্দ্র সিংহ মশাই যে কোনো কারণেই হোক এই নিস্তারিণী কালীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করতে না পারায়, সেই বিগ্রহ তিনি ঈশ্বচন্দ্রের হাতে তুলে দেন। সেই থেকে মা পূজিত হয়ে আসছেন এই নানেদের কালী মন্দিরে। এই মন্দিরের মূল পূজানুষ্ঠান সেই কালীপুজোতেই। এছাড়া এই কালীমন্দির প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই নানেদের পরিবারে দুর্গাপুজোও হয় পালা করে। এখন সম্ভবত এই দুর্গাপুজো এই মন্দিরেই হয়ে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্র ৭ জানুয়ারি ১৮৭৪ সালেই এ মন্দিরের খরচ-খরচা পরিচালনার জন্য একটা অছি পরিষদ না ট্রাস্টী গঠন করেছিলেন। সেই ট্রাস্টীর কাজকর্ম এখনো বহমান।       


রথযাত্রার দিনে এ মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বলে প্রতি বছর ওই দিনে নিস্তারিণী মার জন্মতিথি পালিত হয়ে থাকে। এই মন্দিরের মধ্যে কালী ছাড়াও আছে শিবমন্দির, নারায়ণের ঘর আর দুর্গাদালান। যেহেতু তন্তবায় সম্প্রদায় বৈষ্ণব মতের অনুগামী তাই এ মন্দিরে বলি হয়ই না। প্রতিদিন নিত্যপুজো হয় নিয়ম করেই। প্রতি অমাবস্যায় মার লুচি মিস্টি ভোগ হয়। কলকাতার ওই অঞ্চলে ইদানীং প্রচুর অবাঙালি বাস করেন। এখন তাদের কাছে খুব প্রিয় এই কালী মন্দির। ইচ্ছেময়ী মা এখন তিনি।  


পুরান সিমলার বাজার - পাড়ার বুড়োদের কাছে শুনিতাম সিমলার বাজার প্রথমে এখন যেটা মহেন্দ্র গোস্বামীর গলি, তাহার কোন এক স্থানে ছিল। একটা বড় শিমুল গাছ ছিল তাহার নীচে বাজার বসিত। আমরা কিন্তু ঐ শিমুল গাছ দেখিনি এবং ঐ স্থানটিতে খোলার ঘর দেখিয়াছি। আমাদের সময় যেটা সিমলার বাজার ছিল সেটা হল এখনকার বেথুন কলেজের বাড়ীর দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ এবং খানিকটায় বেথুন কলেজের পশ্চিমদিককার রাস্তা হইয়াছে। ১৮৮২ খৃীঃ পূজার পর হইতে শীতকাল পর্যন্ত এই সময়ই ছাতুবাবুর ফাঁকা মাঠেতে জেলেরা ও তরকারীর ফোড়েরা বসিতে থাকে এবং সেখানে এক নতুন বাজার আরম্ভ হয়। পরে উভয় বাজারের মালিকের সহিত দাঙ্গা হাঙ্গামা হইয়া দুই বাজার চলিতে লাগিল। একটা হইল ছাতুবাবুর বাজার আর একটা হইল সিমলার বাজার। পরে বেথুন কলেজের কর্তৃপক্ষ জমিটা খরিদ করায় সিমলার বাজার একেবারে উঠিয়া গেল।

         নানেদের কালীবাড়ী দেখে আবার রামদুলাল স্ট্রিট। 


বাঁ দিকে নানেদের লক্ষীনারায়ণ মন্দির। আর তার পরেই ইতিহাসের সাক্ষী ১৩৩ নম্বর রামদুলাল সরকার স্ট্রীটের বাড়িটা কিন্তু ছিল। হয়তো অন্য ডিজাইনে। কিন্তু ছিল...

 প্রসঙ্গত বলি, ১৯৩৯ সালের ১৭ই নভেম্বরের কলকাতা পুরসভার এক অধিবেশনে জন্ম হয় রামদুলাল সরকার স্ট্রীটের। সম্পূর্ণ মানিকতলা স্ট্রীট ভেঙে তিনখানা। চিৎপুর থেকে সেন্ট্রাল এভিনিউ রমেশ দত্ত স্ট্রীট, সেন্ট্রাল এভিনিউ থেকে বিধান সরণী - রামদুলাল সরকার স্ট্রীট আর বিধান সরণী থেকে বিবেকানন্দ রোড শিশির ভাদুড়ি সরণী।

আমি শুধু আজ ফিরে যাবো ১৮২৮ এর ফেব্রুয়ারি থেকে ১৮২৯ এর অগষ্টের দিনগুলোয়। কলকাতা তখন ভারত রাজধানী। শীত ছিল তখনো কলকাতায়। ছিল উত্তরের গোল তালাও এর ভিজে হাওয়া। বেথুন স্কুল বা কলেজ তখনো স্বপ্নে দেখা দেয় নি। মধ্যবিত্ত পাড়ায় রোদ ছিল।

ফেব্রুয়ারির (১৮২৮) এক বিকেলে শায়রী সম্রাট মির্জা গালিব পা রাখলেন কলকাতায়। এসে উঠলেন ওই ১৩৩ নং, রামদুলাল সরকার স্ট্রীটের ভাড়া বাড়িতে। মহামান্য ইংরেজ সরকারের কাছে পরিবারের এক পেনশন সমস্যার সুরাহায়। গালিবের বয়স তখন একত্রিশ।

 Kalkatte ka jo zikr kiya tune hamnasheen
Ik teer mere seene mein mara ke haye haye
As you mentioned Kolkata my friend.
An arrow you shot at my heart ahh.

- মির্জা গালিব - Mirza Asadullah Baig Khan  আর আমার স্কুল কেশব একাডেমী ১৪৮ নং, রামদুলালে। মাঝে পনেরোটা বাড়ি। তখন কি জানতাম !!

এই কলকাতায় বসে লিখেছিলেন গুল-ইরানা। পারসী আর উর্দুতেই। অনেকদিন নিখোঁজ থাকলেও পরে পাওয়া গেছে তা।

একখানা সাধারন বাড়ি। সামনে অনেকখানি ফাঁকা। তার পরেই সেই গোলতালাও। কল্পনা করে নিন বন্ধুরা। এপাশে ওপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রচুর গাছপালা। শিমূল গাছ আর নেই। সিমলে স্ট্রীট তখন প্রধান রাস্তা। পূবের সূর্য হেদুয়ার জল মেখে এই ১৩৩ নং এর দেয়ালে। মির্জা গালিব প্রস্তুত হচ্ছেন লাটবাহাদুরের অফিস যাবার জন্যে। দিল্লী, কানপুর, বেনারস, লখ্‌নৌ ঘুরে ঘুরে তদ্বির করে করে হাঁপিয়ে গেছেন মীর্জা সামান্য পারিবারিক পেনশনের জন্য। অগত্যা রাজধানী কলকাতায়।

 সেন্ট্রাল এভিনিউ তখন সরু মেঠো পথ। রাস্তা বলতে একমাত্র চিৎপুর রোড। কর্নওয়ালিশ স্ট্রীট আরো কিছুদিন পরের। সুতরাং ওই রামদুলাল সরকার স্ট্রীটের মেঠো পথ ধরেই সেই নতুন বাজারের কাছাকাছি পৌঁছে হয়তো টাঙ্গা মিলতো...। তা চেপে বড়লাটের অফিস। গালীব হাঁটছেন দুবেলা...গাছের ছাওয়ায় ছাওয়ায়।

এই বাড়িতেই প্রায় দেড় খানা বছর কাটিয়েছিলেন মীর্জা গালিব। হয়তো কলকাতার প্রেমে। অথবা সেই সরকারী দপ্তরের ষোলো মাসে বছরের জন্য নাগরার শুকতলা খুইয়েই। গালীব কলকাতায়। আরো স্পষ্ট করে আমার সেই পৈত্রিক অঞ্চলে...।

তখনো এ অঞ্চলে নানদের কালীবাড়ি তৈরিই হয় নি। সুতরাং চারদিকই ফাঁকা। এই কালীবাড়ি তৈরি হয় ১৮৬৫ সালে। সেও আরেক ইতিহাস। নানদের বাড়িব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়রবীন্দ্রনাথকার না পদধূলি জড়িয়ে আছে এই রামদুলাল সরকার স্ট্রীটের আনাচ কানাচেসে গল্প পরে

হাজারোঁ খাহিশে এ্যয়সে কে হর খাহিশপে দম নিকলে
বহত নিকলে মেরে আরমাঁ লেকিন ফিরভি কম নিকলে গালিব
 
হাজারো বাসনা হৃদয়-গভীরে, যার প্রতিটিই প্রাণহরা
যদিও মিটেছে অনেক বাসনা, রয়ে গেছে কত অধরা।

১৮২৮ এ কলকাতায় এলেন গালিব। সিমলে পাড়ায় উঠলেন। বছর দেড়েক ছিলেন কলকাতায়। তারমানে ১৯৩০ ধরে নেওয়া যাক।

 “হাম থে মরনে কো খাড়ে, পাস না আয়া না সহি,
    আখির উস্ শোখকে তারকাশমে কোয়ি তীর ভি থা-?”

 -আমি তো মরবার জন্যেই দাঁড়িয়ে ছিলাম; সে-ই তো কাছে এলো না। আচ্ছা, মারবার জন্য কোনো তীরই কি ছিল না আজ রূপময়ীর তূণে ?

 

সে সময় কোথায়ই বা বেথুন রো আর কোথায়ই বা রামদুলাল সরকার স্ত্রীট বা মানিকতলা স্ট্রীট ! ১৩৩ নম্বর বাড়ির চারদিকই বেশ ফাঁকা ফাঁকা। বেথুন স্কুল কলেজ তো সেদিনের ব্যাপার। তবে হ্যাঁ, রোজ সকালে উঠেই গালিব সাহেব দেখতেন তাঁর ভাড়া বাড়ির পূব দিকেই সিমলে বাজারের ব্যস্ততা। হৈ হৈ, হাঁক ডাক। আর এপাশে ওপাশে তখনো কিছু হোগলার বনবাদাড়। দু একটা শিমূল ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সন্ধ্যে হলেই নিরালা নিঃঝুম আশপাশ। হয়তো মাঝরাতে শেয়ালের ডাক।

ঐ মেঠো রাস্তা ধরেই কোনো কোনো বিকেলে বেরোতো সঙের মিছিল। এদিকে ওদিকে বেশ কয়েকটি পাঠশালা। আর সেই পাঠশালার ছাত্ররা আবার মাঝে মাঝে গান গাইতে গাইতে সকাল বেলায় চলে যেত গঙ্গাস্নানে।


হেদুয়া তালাও পেরিয়ে আরো কিছুটা পূব দিকে গেলে মানিক পীরের আস্তানা। সেখানে পীরের কবর আজও আছে মানিকতলায়। কলকাতার এক পুরোনো ম্যাপে যা কিনা আপজন সাহেব তৈরি করেছিলেন ১৭৪২ এ, সেখানে মানিকতলা স্ট্রীটের অস্তিত্ব থাকলেও কোনো নাম ছিল না। তবে ১৭৯২/৯৩ সালে ঐ সাহেবের তৈরি আরেকটা ম্যাপে মানিকতলা স্ট্রীট এর নাম পাওয়া যায়।


সে সময়ে গালিব সাহেবকে বড়লাটের অফিসে যেতে হত মেঠো রাস্তা দিয়ে চিৎপুর রোড পৌঁছে, সেখান থেকে টাঙা বা পদব্রজে। নামেই ছিল চিৎপুর রোড। আসলে ওই পুরনো রাস্তাটিও কাঁচা ছিল। চারদিকে ঝোপ ঝাড় আর পুকুরের আসপাশ দিয়ে চলে যাওয়া এই রাস্তাটির কথা আমরা সেই চণ্ডীমঙ্গলের যুগ থেকেই পাই। এটাই ছিল চিত্তেশ্বরী মন্দির থেকে কালীঘাট যাবার প্রধান রাস্তা।

আগেই বলেছি যে ১৩৩ নং বেথুন রোর বাড়িতেই প্রথমে এসে উঠেছিলেন গালিব। তাঁর চিঠিতে বারবার সিমলা বাজার, গোল তালাও, চিতপুর বাজারের নাম উঠে এসেছে। চিঠিতে আর আছে একটা কুয়োর কথা। সেই কুয়ো বোজানো হয়েছে ১৯৫৫ সালেই। গালিবের চিঠি থেকেই জানা যাচ্ছে, বাড়িওয়ালা মির্জা আলি সওদাগর আর বিলায়েত হুসেনের কাছে ৬ আর ১০ টাকা ভাড়া দিতেন তিনি। গালিব জানিয়েছেন, বাড়িটি বেশ বড়সড়। ১৮২৭/২৮ সালে এমন একটা আধাকাঁচা বাড়ির ভাড়া শুনলে কেমন যেন লাগে !

তখন মুঘল আমলের প্রায় শেষ বিকেল। বাদশা নিজেই তখন ব্রিটিশ সরকারের পেনশন ভোগী। শুধু তাই নয়, দিল্লি আর আশেপাশের নামমাত্র কয়েকটি জায়গা ছাড়া তাঁর শাসনের দৌড় সীমা বেশি বড় নয়। তাও বাদশা গুণীজনের কদর করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বাদশাকে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকেন ইংরেজরা। কিছু লোকজনের আনাগোনা তারা ভালো চোখে নিচ্ছেন না তখন। এমন কি দরবারের কবিকেও তারা সন্দেহ করতে শুরু করেন। ইংরেজ বিরোধী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গেই যেন এঁর বেশি প্রকার দহরম মহরম। হঠাৎ একদিন গালিব ফরমান পেলেন বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগের কারণে তাঁর পেনশন বন্ধ করে দেওয়া হল। স্বয়ং নবাবও কিছু করতে পারলেন না। দিল্লি থেকে কখনও পায়ে হেঁটে কখনও ঘোড়ায় চড়ে আবার খানিকটা বজরায় বা ডিঙি নৌকোয় তিনি পাড়ি দিলেন কলকাতার পথে। কারণ স্বয়ং বড়লাট যদি একটু সদয় হন তাহলেই একমাত্র তাঁর পেনশন মিলতে পারে।

কলকাতায় এসেছিলেন মির্জা গালিব। বেড়াতে নয়, অর্থের প্রয়োজনেই। কিন্তু বিফল হয়েছিলেন। অধিকন্তু, লাঞ্ছনার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁকে ফিরে যেতে হয়েছিল। লিখেছেন অতনু সিংহ। কলকাতার উর্দু কবি মহলের সঙ্গে কাব্য, ধর্ম ও সমাজসংক্রান্ত বিষয়ে চালিয়েছেন বাহাস। কবিতাও লিখেছেন এই শহরকে নিয়ে। ঘুরে বেড়িয়েছেন রাস্তায় রাস্তায়। কলকাতায় থাকার সময় মৌলালীর দরগা আর কাঠবাগান মসজিদে যেতেন। ক্যালকাটা মাদ্রাসা কলেজেও (আজকে যেটা আলিয়া মাদ্রাসা বা আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস) গিয়েছেন। কলকাতায় থাকার সময় কবির সঙ্গে দেখা হয় রাজা রামমোহন রায়ের। দুজনের নাকি বেশ আড্ডাও হয়েছে কয়েকবার। এমনকি রাধাকান্ত দেবের সঙ্গেও গালিবের মোলাকাত হয়েছে

 


কলকাতা থেকে গালিব পেনশন উদ্ধার করতে পারেননি। উপরন্তু তাঁর কপালে জুটেছিল লাঞ্ছনা! বিষাদগ্রস্ত গালিব ফিরে গিয়েছিলেন দিল্লিতে। যেভাবে গালিব উপমহাদেশের এক শহর থেকে অন্য শহরে এসেছিলেন আর্থিক প্রয়োজনে, পরে ওই শহরকেই আপন করে নিয়েছিলেন, ওই শহরের মানুষের সঙ্গে, শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে, দিনযাপনের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন, গলাধাক্কা খেয়েছেন। আজ গালিবকে নিয়ে আমরা কতই না মাতামাতি করি, গালিবের নামে কলকাতার রাস্তার নাম জ্বলজ্বল করে। একদার ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের নাম বদলে মির্জা গালিবের নামে করা হয়েছে। আজকের এই মির্জা গালিব স্ট্রিটের অদূরেই তালতলায় একদিন গালিবের মুন্ডুপাত করতে চেয়েছিল নির্বোধের দল। আমাদের গৌরবের কলকাতা !

 

         দিল্লী ফিরে গেলেন গালিব।

 

একটা কথা বলা যেতেই পারে যে গালিব সাহেব সম্ভবত কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট তৈরির শেষ পর্বটা দেখেছিলেন। ১৮২৬ সালের ৯ জুন এর লটারি কমিটির এক রিপোর্টে আছে Cornwallis Street has been open to the public sometime and little remain to complete it. কর্ণওয়ালিশ স্ট্রীট তৈরি হওয়ার পর থেকেই এই চত্বরের গ্রাম্য চেহারা পালটাতে শুরু করে। তখনো চিত্তরঞ্জন এ্যাভেনিউ তো দূরের স্বপ্ন।

এই সিমলে চত্বর আরো কতো ঘটনার সাক্ষী।

পায়ে পায়ে হাঁটতে হাঁটতে থাকি। পরের গন্তব্য মহেন্দ্র গোস্বামী লেনের ১১ নং বাড়ি কে পি বসুজ লজ বা কালীপদ নিকেতন। 


এখন যেটা সিমলাতে মহেন্দ্র গোস্বামীর গলি, ওটা পূর্বে একটা পগার ছিল। মাঝে মাঝে সাঁকো ছিল। যে যার বাটী সেইভাবে যাইত। লম্বা টানা রাস্তা সেরূপ ছিল না। সাঁ কোটা পাকা ছিল, আশেপাশের পগারের জল এই বড় পগার দিয়ে চলে যেত এবং খানিকট। যাইয়া দক্ষিণদিকে প্রকাণ্ড একটা পুকুর ছিল এবং পুকুরের পাড়ে গয়লাদের বসতি ছিল ! পুকুরের দক্ষিণদিকে একটা বাঁধান ঘাট ছিল। ইহাকে আমরা গয়লা পুকুর বলিতাম। এখন পুকুর ভরাট হইয়া মাঠ হইয়াছে, তাহাতে বাড়ী হইয়াছে। পূর্বের কোন স্মৃতি পর্যন্ত নেই। রামতনু বসুর গলি ইত্যাদি স্থানকে সাধারণতঃ আমরা গয়লা পাড়া বলিতাম। মধু রায়ের গলি দিয়া যাইয়া ডান ধারে খোলা যায়গায় বাঁদিকে গয়লাদের একটা বিখ্যাত হদ্‌দো ছিল। গরুর চোনা ও গোবর সেই হদ্‌দোতে পড়িত, চলাচলের জন্য ওর উপর দুখানা কাঠ ছিল।

 


এই ১১ নং বাড়ির কালীপদ বসু বা কে. পি. বসু সম্বন্ধে গুগুল খুঁজতে গিয়ে বাংলাআমারপ্রাণ ডট ইন-এর পাতায় অভীক মণ্ডল-এর বীজগণিতকে ইউরোপীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের জন্যে সহজবোধ্য করে তুলেছিলেন কে.পি.বসু প্রবন্ধটি আমি এখানে তুলে দিলাম। 

 

১৮৮২ সাল। ব্রিটিশ শাসন তখন মধ্যগগনে। হান্টার কমিশনের সুপারিশক্রমে বীজগণিত (এ্যালজাবরা) ভারতীয় শিক্ষাসূচীর অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু বীজগণিতে ইউরোপীয় প্রভাব তখন অত্যন্ত বেশি ছিল। ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছে ছিল অত্যন্ত দুর্বোধ্য। সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এলেন এক বাঙালি গণিতজ্ঞ। নাম কালীপদ বসু সংক্ষেপে কে, পি, বসু। দীর্ঘদিনের শ্রমসাধ্য গবেষণায় তিনি বীজগণিতের বহু বিচিত্র ও জটিল নিয়মকে সহজ প্রণালীতে পরিণত করেন। বর্তমানে প্রচলিত বহু সূত্র কে. পি. বসুর উদ্ভাবিত। শুধু সূত্র আবিষ্কারই নয় অসংখ্য নতুন অংক উদ্ভাবন করে তিনি গণিত শাস্ত্রের কলেবর বৃদ্ধি ও উৎকর্ষ সাধন করেছেন। কে.পি. বসুর বীজগণিতের বই আজও যথেষ্ট জনপ্রিয়।


কে, পি. বসু ১৮৬০ সালের ২৪ নভেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার হরিশংকরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর পিতার নাম মহিমাচরণ বসু। কে, পি, বসুর দুই ভাই ছিলেন। প্রসন্ন কুমার বসু ও রাধিকা প্রসাদ বসু। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিলেন কে, পি, বসু । গ্রাম্য পাঠশালার নছীম মন্ডলের কাছে কে, পি, বসুর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় । নছীম মন্ডল তাঁর এই প্রিয় শিষ্যকে অংক শাস্ত্রের জ্ঞান উজাড় করে দিয়েছিলেন । কে. পি. বসু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীনও এই শিক্ষকের সাথে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। নব উদ্ভাবিত অঙ্কের আনন্দ তাঁর প্রিয় ছাত্রের সাথে ভাগ করে নেওয়ার জন্যে নাম মণ্ডল প্রায়ই কলকাতা যেতেন। একবার নছীম মণ্ডল কলকাতা এসেছেন। সাথে এনেছেন এক বিশাল অংক। উদ্দেশ্য তাঁর ছাত্রের জ্ঞান পরীক্ষা । কে, পি, বসুর কলকাতার বাড়িতেএসে যখন পোঁছলেন, কে. পি. বসু তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলেন নছীম মন্ডল কিন্তু কে. পি. বসু এলেন না । উপায় না দেখে নছীম মন্ডল কয়লা দিয়ে বাড়ির দেওয়ালে এঁকে রাখলেন অঙ্কের আলপনা। বাড়ি ফিরে কে. পি. বসুর দৃষ্টি নিবদ্ধ হল অঙ্কের দিকে। শুরু করলেন সমাধান । ইতিমধ্যে আবা্র সেই বাড়িতে এসেছেন নছীম মন্ডল । কিছুটা অলক্ষ্যে থেকে তিনি লক্ষ্য করতে লাগলেন শিষ্যের সযত্ন প্রয়াস । এক সময় অন্ধ মিলে গেল। বিজয়ীর হাসি হাসলেন কে, পি. বসু। তারপর পিছনে ফিরে তাকালেন। গুরু শিষ্যের চোখাচোখি হল । সে এক অদ্ভুদ দৃশ্য । উভয়েই নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন পরস্পরের দিকে। কে. পি. বসু প্রণাম করলেন তাঁর শিক্ষককে। গর্বে ভরে উঠল শিক্ষকের সুক। আবেগ রুদ্ধ ভাষায় তিনি তাঁর শিষ্যকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করলেন।

১৮৯২ সালে ঢাকা কলেজে গণিতের শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন কে. পি. বসু এবং আমৃত্যু উক্ত পদেই অধিষ্ঠিত ছিলেন । অল্পদিনের মধ্যেই তাঁর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে । অধ্যাপনার সাথে সাথে তিনি বীজগণিত ও জ্যামিতি শাস্ত্রের উপর গবেষণা চালিয়ে যান। তাঁর ঐকান্তিক সাধনায় এ্যালজাবরা মেড ইজি, মডার্ন জিওমেট্রি ইন্টারমিডিয়েট সলিড জিওমেট্রি প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণীত হয়। গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি প্রকাশনা শিল্পের প্রতিও তাঁর মনোযোগ আকৃষ্ট হয়। সেই আমলে মুদ্রণ শিল্প তেমন উন্নত ছিল না । এই অভাব পূরণে তিনি কলকাতায় কে, পি, বসু পাবলিশিং কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন । কলকাতায় এখনও রয়েছে এই পাবলিশিং কোম্পানী।।

কে, পি. বসু মেঘমালা ঘোষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন । ব্যক্তিগত জীবনে কে, পি. বসু ছিলেন অত্যন্ত উদার । নিজেম গ্রামের উন্নতি ও সংস্কারসাধনে উদ্যোগী ছিলেন । গ্রামের দরিদ্র জনসাধারণকে অন্নবস্ত্র ও অর্থ বিতরণ করতেন ।


এই বাড়িটিতে সুভাষচন্দ্র বোস, লোকনাথ বল, বীণা দাস, এম, এন, রায় প্রভৃতি বিপ্লবীরা আসতেন। মেঘমালা দেবী মুক্ত হতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহায্য করতেন । যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর মেঘমালা দেবী বাঘা যতীনের বিধবা ও সন্তানদের আশ্রয় দিয়েছিলেন। বাঘা যতীনের আত্মীয় ললিত চট্টোপাধ্যায় তাঁর বউমাকে এখানে কৃষ্ণনগর থেকে দেখতে আসতেন। ঘটনাচক্রে এই ললিত চট্টোপাধ্যায় অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যয়ের দাদু । মেঘমালা দেবী ভাইয়েরাও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী । তাঁর ভাই অতুলকৃষ্ণ ঘোষ, অমরকৃষ্ণ ঘোষ এই। বাড়িতেই দীর্ঘকাল থেকেছেন ।

১৯১৪ সালে ভয়ংকর পানিসাস ম্যালেরিয়া জ্বরে মাত্র তিন দিনের রোগ শয্যায় কে.পি. বসু-র জীবনাবসান হয় । শোনা যায়, কে.পি. বসুর মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হবার সাথে সাথে দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য মানুষের সমাবেশ ঘটে তাঁর শেষযাত্রায় । কলকাতার নিমতলা শ্মশানে তাঁর শেষ কৃত্য সম্পন্ন হয় । ঝিনাইদহ শহরে তাঁর নামে একটি সড়কের নাম 'কে, পি. বসু সড়ক' নামকরণ করা হয়েছে । কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আমরা ভুলেই গিয়েছি মহান গণিতজত কে.পি. বসু-র কথা।

মহেন্দ্র গোস্বামীর গলি থেকে সিমলা স্ট্রিট। ডানদিকে বিবেকানন্দ রোড। বাঁদিকে রামদুলাল সরকার স্ট্রিট। সিমলা স্ট্রীট এ পড়েই বাঁদিকে গোবিন্দ চন্দ্র দের (প্রাক্তন কলকাতার মেয়র) বাড়িটিকে বাঁপাশে রেখে এগিয়ে গেলাম রামদুলাল সরকার স্ট্রিটের দিকে।

 


 

         সে সময়ের এই সিমলেকে খুঁজতে গেলে চোখ বোলাতেই হবে মহেন্দ্র লাল দত্তকলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা গ্রন্থখানির পাতায় পাতায়। 

বাড়িতে তিনটি পাতকূয়ারান্নাঘরের নিকট একটা, ভিতরের উঠানে একটা এবং সদরবাড়িতে একটা পাতকূয়া ছিল। ভিতরকার পাতকূয়াতে একটা কচ্ছপ ছিল। কচ্ছপ থাকিলে তাহারা পোকা খাইয়া ফেলে এবং জল পরিষ্কার রাখে। নিত্য জল তোলা হইত বলিয়া জল ভাল ছিল এবং খাইবার জন্য চাকরেরা হেদুয়া হইতে বাঁকে করিয়া জল আনিত। তখনকার দিনে হেদুয়ার জল ছিল উৎকৃষ্ট। ভাবুন একবার !

সিমলাতে অনেক জায়গায় বড় বড় তেঁতুল, অশ্বত্থ ও নারিকেল ইত্যাদি অনেক প্রকারের গাছ ছিল

তখন এত খাবারের দোকান ছিল না। সিমলা বাজারে একখানি দোকান ও বলরাম দে স্ট্রীটে একখানি। জিভেগজা, ছাতুর শুট্‌কে গজা, কুচো গজা, চৌকো গজা, গুট্‌কে কচুরী ও জিলাপি ছিল তখন খাবার। এখন সেসব জিনিস নিতান্ত প্রাচীন বলিয়া লোকে অবজ্ঞা করে। আমরা যখন বড় হইয়াছি তখন খাবারের ছয় আনা সের। পরে একজন সাধু সিমলা বাজারে আসে, বেশ স্থুলকায় ব্যক্তিগেরুয়া পরা। তিনি কাঁসারীপাড়া এবং আরও দু-এক জায়গায় খাবারের দোকান করেন। তিনি হিন্দুস্থানী ভাবে নানা খাবার তৈরী করিতেন এবং অপরকে বিক্রয় করিতে দিয়া রাস্তার ফুটপাথে মৃগচর্ম পাতিয়া একতারা লইয়া ভজন করিতেন। এইজন্যে সকলে তাঁহার দোকানকে পরমহংসের দোকান বলিত। তিনি সিমলাতে নানা প্রকার মিষ্টান্নের প্রচলন করিলেন। এখন অসংখ্য খাবারের দোকান এবং রকমও অসংখ্য।  

শৈশবে আমরা কর্তাদের কাছে শুনিতাম যে সিমুলিয়া গ্রামে আট ঘর বোস বাস করিত। আমরা বাল্যকালে দেখিয়াছি সিমলেতে বড় মাতালের উৎপাত ছিল। এইজন্য সহরে এক প্রবাদ ছিল, সিমলার মাতাল আর বাগবাজারের গেঁজেল 

আমাদের এবারের গন্তব্য গিরীশ চন্দ্র দে আর নকুড় চন্দ্র নন্দীর সেই বিখ্যাত মিষ্টির দোকান। ১৮৪৪ সালে মানিকতলা স্ট্রীটের ধারেই খোলার চালের এক বাড়িতে সন্দেশের দোকান খোলেন হুগলীর থেকে আসা গিরীশচন্দ্র দে।  তখন শুধুই গিরীশ ময়রার সন্দেশ। পরবর্তীকালে গিরীশচন্দ্রের একমাত্র মেয়েকে বিয়ে করেন নকুড় নন্দী। শ্বশুড়ের কাছে হাতখড়ি হয় নকুল নন্দীর। পরে ওই জায়গা কিনে নিয়ে নতুন পাকা দোকান করেন নকুড়চন্দ্র। সেই থেকে দোকানের নামে জুড়ে যায় নকুড় নন্দীর নাম। গিরীশচন্দ্র দে / নকুড়চন্দ্র নন্দীর মিস্টির সুবাসে ভেসে যায় সিমলে পাড়া।

১।      সন্দেশের গন্ধে বুঝি দৌড়ে এল মাছি? কেন ভন্ ভন্ হাড় জ্বালাতন ছেড়ে দেওনা বাঁচি!- সন্দেশ, সুকুমার রায়)।

২।     কখনো কখনো আমাদের উৎসাহ দেখার জন্যে ফি পয়ার পিছু একটি করে সন্দেশ প্রাইজ দিতেন- হুতোম প্যাঁচার নকশা, কালীপ্রসন্ন সিংহ;

৩।     মাইরি বলচি, আমি তা হলে ভাত খাব না, কাল রাত্তির একটা পর্যন্ত জেগে সন্দেশ তৈরি করেচি- বিরাজবউ, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়;

৪।     এই বলিয়া সাগর কতকগুলা সন্দেশ আনিয়া প্রফুল্লের মুখে গুঁজিয়া দিতে লাগিল- দেবী চৌধুরাণী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়;

৫।     আমসত্ত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে হাপুস হুপুস শব্দ চারিদিক নিস্তব্ধ, পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে- জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর;

 


সন্দেশ মানে খবর বা সংবাদ। আর যাঁরা এই খবর প্রেরণ করেন সেই দূতদের বলা হয় সন্দেশবহ অথবা সন্দেশহর। তবে এখন সন্দেশ মানে এক বিশেষ ছানার মিষ্টি। একোটা সময় ছিল যখন আত্মীয়স্বজনদের সংবাদ নেওয়ার জন্য লোক পাঠানো হত। আর অবশ্যই তারা খালি হাতে যেতেন না। হাতে করে নিয়ে যেতেন সন্দেশের বাক্স। কথিত আছে, চৈতন্যদেব নাকি দইয়ের সঙ্গে সন্দেশ পেলে খুবই তৃপ্ত হতেন। শিষ্যরা নৈবেদ্য হিসাবে এই সন্দেশ উপহার দিলে তিনি যারপরনাই খুশি হতেন।

তো যাই হোক সেই নকুড় নন্দীর নবতম প্রজন্ম আমাদের হাতে দিলেন বিখ্যাত রাতাবী সন্দেশ আর গোলাপী প্যাড়া (যা কাঁচাগোল্লার মতো গোলাপের গন্ধে ভরপুর)।

 

হঠাৎ চোখের সামনে বহু পুরনো এক দৃশ্য ফুটে ওঠে। দেখি, আমাদের কলকাতার বাড়ির ছাদে আমরা চার ভাই এক বোন গোল হয়ে ঘিরে বসে আছি আমাদের মাকে। গ্রীষ্মের রাতে দক্ষিণের হাওয়া, সারা দিনের সব ক্লান্তি মুছে দিয়ে গল্প শোনার একাগ্রতা বাড়িয়ে দেয়। মা নানা রকম গল্প বলেন। কোনও দিন ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী, আবার কোনও দিন ভূতের গল্প। ভূতের গল্পের সময় আমরা মায়ের কোল ঘেঁষে বসতাম। কোনও দিন আবার মা বলতেন, আমার দাদু শিবচন্দ্র দের গল্প। উনি কীভাবে নানা রকম ব্যবসা করে এই বাড়িটা করেছিলেন তার L গল্প শুনি। এক-এক দিন মা বলতেন সমসাময়িক ঘটনার কথা।

সেই সময় মদন ঘোষ লেনের এই বাড়িতে আমরা ছিলাম একান্নবর্তী পরিবার। আমার বাবা কাকারাও জন্মেছেন এই বাড়িতে, বড়ও হয়েছেন এই বাড়িতে। আমার দাদু শিবচন্দ্র উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই বাড়ি তৈরি করান। দাদু শিবচন্দ্রের তিন ছেলে। বড় আমার বাবা পূর্ণচন্দ্র, মেজো হেমচন্দ্র এবং ছোট কৃষ্ণচন্দ্র। আমার ঠাকুমা রত্নমালাদেবী ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী এবং বিদুষী মহিলা ওঁর দূরদৃষ্টি ছিল অসীম। কিন্তু তার ভাগ্য সেই তুলনায় ভাল ছিল না। আমার বাবার যখন মাত্র ছ'বছর বয়স সেইসময় হঠাৎই একদিন আমার দাদু মারা যান। ঠাকুমা তখন স্বাভাবিক ভাবেই ভীষণ রকমের বিপদে পড়ে গেলেন। শশাকের প্রাথমিক ধাপটা কাটার পরেই চোখের সামনে দেখতে পেলেন শুধুমাত্র অন্ধকার। ছ'বছর, চার বছর এবং দেড় বছরের তিন শিশু আছে ওঁর দিকে তাকিয়ে। কোনও রোজগার বা উপায়-অর্জন নেই। কীভাবে সংসার চলবে কোনও ঠিক নেই। আজ বাদে কাল কী রান্না হবে তা-ও জানা নেই।

 আমরা চলে এসেছি আবার সিমলা স্ট্রিটের দিক থেকে বিবেকানন্দ রোডের দিকে যেতে প্রথম বাঁদিকের গলিতে। মান্না দের বাড়ি- ৯নং মদন ঘোষ লেনে।


সব সফল মানুষের পেছনে থাকে এক লড়াই এই ইতিহাস। মান্না দের লেখাতেই ফিরি কথায় আছে, বিপদ কোনও দিন একা আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে তার দলবল, সঙ্গীসাথীদের। দাদু মারা যাওয়ার পরপরই দাদুর অন্যান্য আত্মীয়রা সহায় সম্বলহীন আমার বিধবা ঠাকুমাকে ঠকিয়ে আত্মসাৎ করে নিলেন তাঁর সমস্ত সম্পত্তি। অসহায় সেই তিন শিশুর মা, অকাল বৈধব্য জর্জরিত এই মহিলার কোনও ক্ষমতা ছিল না, তাদের সঙ্গে লড়াই করে তার সম্পত্তি রক্ষা করার। তাই সবই চলে গেল, শুধু থেকে গেল আমাদের বসতবাড়ি, এই ৯ নং মদন ঘোষ লেনের বাড়িটা। ঠাকুমা উপায়ান্তর না দেখে, সেই বাড়িরই কিছু অংশ ভাড়া দিলেন এক জনকে। সেই ভাড়ার টাকায় চলতে লাগল ঠাকুমার সংসার। তিন শিশুপুত্র সহ এক বিধবার সংসার। চলতে লাগল জীবনের আপন গতিতে। অবশ্য সেই সময় আমার বাবার মামারা যদি ঠাকুমার পাশে না দাঁড়াতেন, আমাদের জীবন কাহিনী হয়তো তা হলে সম্পূর্ণ অন্য দিকে বইত।


ঠাকুমার ছোটছেলে, মানে আমাদের ছোটকাকা বা বাবুকাকা কৃষ্ণচন্দ্রছোট থেকে পড়াশোনায় খুব ভাল ছিলেন। তিনি তখন অন্ধ ছিলেন না। ওঁর যখন মাত্র তেরো বছর বয়স, এক দিন বিকেলবেলায় ছাদ থেকে ঘুড়ি উড়িয়ে নীচে নেমে মাকে বললেন, দেখো তো মা, চোখটা কীরকম জ্বালা জ্বালা করছে। কেমন যেন সব অন্ধকার দেখছি, তোমাদের ভাল মতো দেখতে পাচ্ছি না। মা দেখলেন, ডাক্তার দেখানো হল, নানা রকম চিকিৎসাও শুরু হল। কিন্তু তার দৃষ্টিশক্তি আস্তে আস্তে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যেতে লাগল। শেষ পর্যন্ত কলকাত মেডিকেল কলেজের এক জন বড় সার্জনকে চোখ দেখানো হল। উনি দেখে খুব একটা আশার কথা শোনালেন না। বললেন, চোখের যা অবস্থা তাতে অন্ধ হয়ে যাওয়াটাই একমাত্র সম্ভাব্য পরিণতি। তবু, তিনি একটা চোখের ড্রপ দিলে বললেন, রাতে শোওয়ার আগে চোখে দিতে। আর বললেন, যদি একটুও ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকে এতেই ভাল হবে, না হলে একেবারে অন্ধ হয়ে যাবে। যা হওয়ার তাই হল।রাতে শোওয়ার আগে চোখে সেই ড্রপ দেওয়ার পরেই কাকা আর চোখে দেখতে পেলেন না। হয়ে গেলেন পুরোপুরি অন্ধ।

এর পরে মান্না দের ঠাকুমা পড়লেন অগাধ জলে। তের বছরের এই শিশুটিকে নিয়ে কি যে করবেন ! হঠাৎ তিনি লক্ষ করলেন যে বাড়িতে গান গেয়ে ভিক্ষে করতে আসা লোকজনের গলার গান কৃষ্ণ শুনে শুনে অবিকল গাইছে। খোঁজ খবর নিয়ে জানলেন জোড়াসাঁকোর হরেন্দ্রনাথ শীলের নাম। তিনি সুরবাহার বাজাতেন আর সেই কারণে তাঁর বাড়িতে সারাদিনই গাইয়ে বাজিয়েদের ভীড় লেগেই থাকতো। ছেলে কৃষ্ণচন্দ্রকে নিয়ম করে সকালে ও বাড়িতে বসিয়ে রেখে আসতেন আবার পরে গিয়ে একসময় নিয়েও আসতেন। এই ভাবে কৃষ্ণচন্দ্র দের সঙ্গীত জীবনের শুরু হল। মান্না দে বলছেন যে সেই ছিল আমার ছোটকাকার গান শেখার শুরু আর তার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের পরিবারেরও গানবাজনা চর্চার শুরু। মাঝে মাঝে তাই ভাবি যে, কাকা যদি ওইভাবে গান শেখা শুরু না করতেন বা আমার ঠাকুমা যদি বাবুকাকাকে ওইভাবে হাত ধরে সংগীতের জগতে না নিয়ে আসতেন তা হলে কি ভারতবর্ষ ওইরকম এক জন সংগীতশিল্পী পেত? আর আমিও কি আজকের এই মান্না দে হয়ে উঠতে পারতাম ?


মান্না দের বাড়ির বর্তমান প্রজন্মের সাথে কথা হল, হল সেলফি তোলাও। পাশের ১০ নং বাড়িটায় থাকতেন আরেক কিংবদন্তী শিল্পী ছায়া দেবী।


২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ এর বেলা সাড়ে এগারোটার চড়া রোদ জানান দিচ্ছিল যে কলকাতায় দখিন হাওয়া এলো বলে !  স্বামীজির পৈত্রিক বাড়ির (৩ নং গৌরমোহন মুখোপাধ্যায় স্ট্রিট) গলি বেয়ে আমরা গিয়ে উঠলাম প্রাক্তন কর্ণওয়ালিশ স্ট্রিটে (বিধান সরণি)।

          

এরপরে বিধান সরণি পেরিয়ে কিশোরী মুখার্জি লেন মদন মিত্র লেন ধরে এসে পড়া গেল বিবেকানন্দ রোডে।

 

তারপরেই বিবেকানন্দ রোড পার হয়ে ঢুকে পড়া গেল ডি. এল. রায় স্ট্রিটে। 

 

গন্তব্য ৪বি-নং ডি.এল. রায় ষ্ট্রীটে 'সুরধাম' নামের বাড়ি। বাড়িটি মনে হয় একটি স্থানীয় ক্লাবের অধীনে। এবং চিলড্রেন সুইট হোম নামে একটি স্কুলও আছে। 

১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দের বাংলা নববর্ষের দিনে দ্বিজেন্দ্রলাল এই গৃহে প্রবেশ করেছিলেন।

 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নামে আমাদের প্রথমেই মনে পড়ে ধনধান্য পুষ্পভরা আমাদের এই বসুন্ধরা / তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা; কিংবা মলয় আসিয়া কয়ে গেছে কানে, প্রিয়তম তুমি আসিবে। / মম তৃষিত অন্তর ব্যথা সযতনে তুমি নাশিবে। এছাড়া বঙ্গ আমার জননী আমার…”

মৃত্যুর আগে পুত্রের কাছে নিজের সৃষ্ট সংগীত সম্পর্কে প্রত্যক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায়। পুত্র দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, না রে না, আমাকে কি রবিবাবুকে ভুলে যাবে না। আর কেন যাবে না জানিস? এই জন্যে যে আমরা রেখে যাচ্ছি যা বাঙালির প্রাণের জিনিস সুরে বাঁধা গান। আমি যে কী সব গান বেঁধে গেলাম সেদিন তুইও বুঝবিই বুঝবি। নিজের গান সম্পর্কে পুত্রের কাছে যে-আকাঙ্ক্ষার কথা তিনি বলেছিলেন, তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়নি। বেঁচে থাকতেই, বলা যায়, বিস্মৃত হয়েছিলেন তিনি। হারিয়ে গিয়েছিল তাঁর অসাধারণ সংগীত। এভাবে বিস্মৃত হওয়ার পেছনে কারণও ছিল। তাঁর বিলিতি ধরনের হাসির গান এবং টপ খেয়াল আর যৎ তালে নিবদ্ধ বিস্তারধর্মী গান গাওয়া কোনো মাঝারি মাপের শিল্পীর জন্য ছিল খুবই কঠিন। তাঁর গান স্বরলিপিবদ্ধ হয়ে সংরক্ষিত হয়নি কিংবা পরম্পরাবাহিত হয়ে প্রচারের আলোয় আসতে পারেনি। তিনি বেঁচে থাকতে, তাঁর মৃত্যুর পরেও, এই দায়িত্ব নিতে কেউ এগিয়ে আসেননি 

গান ছাড়াও ডি. এল. রায় আমাদের মত প্রবীণ লোকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল আরেকটি কারণে। তা হল বাংলা নাটক। কলকাতার বিভিন্ন মঞ্চে এসব নাটকে অভিনয় করেছেন বিখ্যাত সব নাট্যব্যক্তিত্ব থেকে পাড়ার ক্লাবের ছেলেপুলেরাও। এমনকি আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্রের নাটক বিভাগের প্রযোজনায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নাটকগুলো আজও ভাস্বর। আমাদের কানে বাজে সাজাহানের চরিত্রে ছবি বিশ্বাস-এর সেই অসাধারণ অভিনয় - 

"

সাজাহান।      সূর্য উঠেছে। যেমন সেই প্রথম দিন উঠেছিল, সেই রকম উজ্জল, রক্তবর্ণ! আকাশ তেমনি নীল ; ঐ যমুনা তেমনি ক্রীড়ামন্ত্রী করা ; যমুনার পরপারে বৃক্ষরাজি তেমনি পশ্যাম, পুষ্পেজ্জল ; যেমন আমি আশৈশব দেখে এসেছি। সবই সেই। কেবল আমিই বলিছি-গাঢ়স্বরে) আমি আজ আমার পুত্রের হস্তে বন্দী-নারীর মত অসহায়, শিশুর মত দুর্বল। মাঝে মাঝে ক্রোধে অর্জন কয়ে' উঠি, কিন্তু সে শরতের মেঘের গর্জনএকটা নিস্ফল হাহাকার মাত্র। আমার নির্বিষ আস্ফালনে আমি নিজেই ক্ষয় হয়ে যাই। উঃ! ভারত-সম্রাট শাজাহানের আজ-এ কি অবস্থা! (একটি স্তম্ভের উপর বাই রাখিয়া দূরে যমুনার দিকে চাহিয়া রহিলেনওকি শব্দ! ঐ। আবার! আবার! এই যে জাহানারা !

 

অথবা চন্দ্রগুপ্ত নাটকে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মুখে চাণক্যের সেই সব সংলাপ

চাণক্য       কাঁদো অভাগিনী নারী ! এই তোমার পুত্র ! মা চিনে না ! জানে না যে জগতের যত                     পবিত্র  জিনিষ আছে, মায়ের কাছে কেউ নয় ! 

চন্দ্রগুপ্ত।        তা জানি গুরুদেব।

চাণক্য।         না, জানো না ! নইলে মায়ের অপমানের প্রতিশোধ নিতে সন্তান দ্বিধা করে ?—”

এর পরেই চাণক্যের সেই বিখ্যাত সংলাপ যা পড়লে কেমন যেন ঘোর লাগে এখনো…… 

মাযার সঙ্গে একদিন এক অঙ্গ ছিলেএক প্রাণ, এক মন, এক নিশ্বাস, এক আত্মা--যেমন সৃষ্টি একদিন বিষ্ণুর যোগনিদ্রায় অভিভূত ছিল, তারপর পৃথক হয়ে এলেঅগ্নির স্ফুলিঙ্গের মত, সঙ্গীতের মূর্চ্ছনার মত, চিরন্তন প্রহেলিকার প্রশ্নের মত ! মা--যে তার দেহের রক্ত নিংড়ে, নিভৃতে বক্ষের কটাহে চড়িয়ে স্নেহের উত্তাপে জল দিয়ে সুধা তৈরী করে তোমায় পান করিয়েছিল--যে, তোমার অধরে হাস্য দিয়েছিল, রসনার ভাষা দিয়েছিল, ললাটে আশিস-চুম্বন দিয়ে সংসারে পাঠিয়েছিল ; মা--রোগে, শোকে, দৈন্যে, দুর্দ্দিনে তোমার দুঃখ যে নিজের বক্ষ পেতে নিতে পারে, তোমার ম্লান মূখখানি উজ্জ্বল দেখবার জন্য যে প্রাণ দিতে পারে, যার স্বচ্ছ স্নেহমন্দাকিনী এই শুষ্ক তপ্ত মরুভূমিতে শতধারায় উচ্ছ্বসিত হয়ে যাচ্ছে। মা--যার অপার শুভ্র করুণা মানবজীবনে প্রভাত-সূর্য্যের মত কিরণ দেয়--বিতরণে কার্পণ্য করে না, বিচার করে না, প্রতিদান চায় না--উম্মুক্ত, উদার কম্পিত আগ্রহে দুহাতে আপনাকে বিলাতে চায় !এ সেই মা !

মাকে নিয়ে এই কটা শব্দের মধ্যে যে ঝংকার, যা ডি. এল. রায় লিখেছিলেন সেইই ১৯১১ সালে, তা আজো কতো বাঙ্ময়, কতোই না জীবন্ত !


 

উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্ম অধুনা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে। তাঁর পিতা কার্তিকেয়চন্দ্র রায় (১৮২০-৮৫) ছিলেন কৃষ্ণনগর রাজবংশের দেওয়ান। সে বাড়িতে বহু গুণীজনের সমাবেশ হত। কার্তিকেয়চন্দ্র নিজেও ছিলেন একজন বিশিষ্ট খেয়াল গায়ক ও সাহিত্যিক। এই বিদগ্ধ পরিবেশ বালক দ্বিজেন্দ্রলালের প্রতিভার বিকাশে বিশেষ সহায়ক হয়। তাঁর মা প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন অদ্বৈত আচার্যের বংশধর। দ্বিজেন্দ্রলালের দুই দাদা রাজেন্দ্রলাল ও হরেন্দ্রলাল এবং এক বৌদি মোহিনী দেবীও ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যস্রষ্টা।

 

দ্বিজেন্দ্রলাল ১৮৭৮-এ প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। এফ. এ. পাস করেন কৃষ্ণনগর গভঃ কলেজ থেকে। পরে হুগলি কলেজ থেকে বি.এ. এবং ১৮৮৪ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে এম.এ. পাস করেন। এরপর কিছুদিন ছাপরার রেভেলগঞ্জ মুখার্জ্জি সেমিনারিতে শিক্ষকতা করার পর সরকারি বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডে যান কৃষিবিদ্যা শিক্ষা করার জন্য। রয়্যাল এগ্রিকালচারাল কলেজ ও এগ্রিকালচারাল সোসাইটি হতে কৃষিবিদ্যায় FRAS এবং MRAC ও MRAS ডিগ্রি অর্জন করেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ Lyrics of Ind। এই বছরই দেশে প্রত্যাবর্তন করে সরকারি কর্মে নিযুক্ত হন দ্বিজেন্দ্রলাল। কিন্তু তিন বছর বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে প্রায়শ্চিত্ত করতে অসম্মত হলে তাকে নানা সামাজিক উৎপীড়ন সহ্য করতে হয় সংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজ দ্বারা।

ভারতবর্ষে ফিরে তিনি জরিপ ও কর মূল্যায়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং মধ্যপ্রদেশে সরকারি দপ্তরে যোগ দেন। পরে তিনি দিনাজপুরে সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ পান। তিনি প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক আন্দুলিয়া নিবাসী প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের কন্যা সুরবালা দেবীকে বিবাহ করেন ১৮৮৭ সালে। ১৮৯০ সালে বর্ধমান এস্টেটের সুজামুতা পরগনায় সেটেলমেন্ট অফিসার হিসাবে কর্মরত অবস্থায় কৃষকদের অধিকার বিষয়ে তাঁর সাথে বাংলার ইংরেজ গভর্নরের বিবাদ ঘটে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি ১৯১৩ সালে সরকারি চাকরি হতে অবসর নেন।

১৭ই মে, ১৯১৩ সালে  এপোলেক্সি রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ওঁনার এই বাড়িতেই মৃত্যু হয়।

ডি.এল. রায় মহাশয় এর পুত্র প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী দিলীপ কুমার রায় (১৮৯৭-১৯৮০)।

দ্বিজেন্দ্রলাল রায় মহাশয় এর স্মরণে ওঁনার বাড়ির সামনের বাস্তার নাম নন্দকুমার চৌধুরীর দ্বিতীয় লেনের নাম পরিবর্তন করে ৮ মার্চ, ১৯৩৩ সালে ডি.এল. রায় ষ্ট্রীট রাখা হয়।

সূর্য ক্রমশঃ মাথার ওপর। রোদের উত্তাপ সহন-মাত্রা ছাড়াচ্ছে। আমরা ঘুরছি পুরোনো সূতানুটির শিমূলিয়ার অলিগলিতে।

 


ডি. এল. রায় স্ট্রিটের এই গলিতেই নাকি শ্যুটিং হয়েছিল জয়বাবা ফেলুনাথের কোনো গলিপথের। তারপরে সে ছবি মিশে গেছে কাশীর গলির সাথে। আমরা এই গলিপথে (দুজনে পাশাপাশি যাওয়া দুষ্কর) শর্টকার্ট মেরে এসে পড়লাম মদন মিত্র লেনে।

 

আজ্ঞে না, এ আমাদের ভবানীপুরের মদন মিত্রর নামে লেন নয়। এ অঞ্চলের অনেক প্রাচীন রাস্তা এই মদন মিত্তিরের লেন যা কলকাতা কর্পোরেশনের খাতায় আজকের মদন মিত্র লেন। এই মদন মিত্তির ছিলেন এ্যাডভোকেট। আর এই অঞ্চলে তাঁদের যে দুশ বছরের প্রাচীন বাড়ি তা তৈরি করেছিলেন মদন মিত্রর ঠাকুর্দা পূর্ণ চন্দ্র মিত্র।

 

গুগুল ঘেঁটে এই বইখানার ছবি পেলাম। শ্রী গোপাল চন্দ্র সেনগুপ্ত কর্তৃক অনুবাদিত ও সংগৃহীত এই আয়ুর্বেদ সারসংগ্রহ বইখানা ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে (বঙ্গাব্দ ১২৭৮) এর ২২শে শ্রাবণ প্রকাশিত হয়েছিল। এবং এ বই প্রকাশ করতে যাঁরা সাহায্য করেছিলেন তাঁদের দু জনের নামের পাশে লেখা আছে মদন মিত্রের লেন। সুতরাং বোঝাই যায় যে আজ থেকে ১৫০ বছর আগে এ রাস্তার অস্তিত্ব ছিল। 

তিথি অনুসারে দোল পূর্ণিমার দিন অর্থাৎ ১৯০২ সালের মার্চ মাসে দোল পূর্ণিমার দিনে বাংলার ১০ই চৈত্র (২৪শে মার্চ) কলকাতার ১২ নং মদন মিত্র লেনে অনুশীলন সমিতি স্থাপিত হয়। এই সমিতির আর একজন প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন সতীশচন্দ্র বসু। এই সময় চিত্তরঞ্জন দাস সহসভাপতি এবং অরবিন্দ ঘোষ অনুশীলন সমিতির কোষাধ্যক্ষ ছিলেন । বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে উল্লিখিত সন্তান দলের অনুশীলন সমিতির নাম থেকেই এই বিখ্যাত গুপ্ত সমিতির নামকরণ হয় । এই সমিতির বিপ্লবী তরুণদের স্বামিজীর আদর্শে শরীরচর্চা, যোগব্যায়াম, সাঁতার, অশ্বারোহণ, অসিচালনা, মুষ্টিযুদ্ধ ও লাঠি চালনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হত । স্বামিজীর 'রাজযোগ', হিন্দু গ্রন্থ 'গীতা' ইত্যাদি বিপ্লবীদের প্রেরণা দিয়েছিল । প্রথম দিকে ব্যায়াম সমিতি হিসাবেই অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় । ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে তা এক গোপন বিপ্লবী সংস্থায় পরিণত হয় । এই সমিতির লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালিয়ে ব্রিটিশ শাসনযন্ত্রকে অচল করে দেওয়া এবং ব্রিটিশ শাসকবর্গের মনে ভীতি ও সন্ত্রাসের আবহ সঞ্চার করা। অনুশীলন সমিতির সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোগযোগ ছিল তিনি বেশ কয়েকবার সমিতির কার্যালয়ে যান সমিতির যুবকদের সাথে মিলিত হন এবং তাঁর নব রচিত কয়েকটি বাউল গান গেয়ে শোনান।

         এই সমিতির ২২ খানা নিয়মাবলীর মধ্যে কয়েকটি এইপ্রকার

১।      প্রত্যেক সদস্যকে অর্থ ও মূল্যবান দ্রব্য সংগ্রহ করে পার্টি তহবিলে জমা দিতে হবে।
৩।     পার্টি সংগঠনকে সামরিক সংগঠনের মতোই মেনে চলতে হবে। কোনো নিয়ম অমান্য করলে             অপরাধ অনুসারে শাস্তি পেতে হবে।
৪।     পার্টি সদস্যদের সর্বদাই ন্যায় প্রতিষ্ঠার আদর্শে অবিচল থাকতে হবে।
২।    পার্টির সংগঠনের ব্যাপারে কোনো চিঠি পাঠাতে গেলে সেই চিঠি পরিচালকের কাছে জমা দিতে             হবে।

অনুশীলন সমিতির কার্যাবলী অনুশীলন সমিতির নেতৃত্বে নিস্ক্রিয় প্রতিরোধ ও সশস্ত্র আন্দোলন এই দুই পদ্ধতিতে বিপ্লবী আন্দোলন পরিচালিত হত। অর্থ সংগ্রহের জন্য সদস্যরা রাজনৈতিক ডাকাতিতেও লিপ্ত হতে পিছপা হত না। বিপ্লবীরা গোপনে দেশে বা বিদেশে অস্ত্র সংগ্রহ বা বোমা তৈরির কৌশল শিখত। 

সমিতির সভ্যরা বিশেষ পরোপকারী ছিলেন বিপন্ন মানুষদের বিভিন্ন রকম সাহায্য করতেন। দুঃস্থ মধ্যবিত্ত পরিবারদের সাহায্যের জন্য প্রতি রবিবার বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল সংগ্রহ করতেন। সভ্যরা কেউ অসুস্থ হলে সেবা করবার বন্দোবস্ত হতো । সেই সময় কোন সৎকার সমিতির অস্তিত্ব ছিলনা । সমিতির সভ্যরা খবর পেলেই দ্বিধাহীন ভাবে অসহায় মৃতের সৎকারের কাজও করতেন ।

         তাহলেই বুঝতে পারছেন এই মদন মিত্র লেন কিন্তু অনেক ইতিহাসের সাক্ষী।


এসে পড়লাম দীনবন্ধু মিত্রের বাড়ি- দীন ধাম-এ। এ গৃহের বর্তমান ঠিকানা ২০নং মদন মিত্র লেন। পুরোন ঠিকানা- ২৯/১, নং মদন মিত্র লেন। তারও আগের ঠিকানা- ৩০/৪, নং মদন মিত্র লেন।

 


দীনবন্ধু মিত্র রায়বাহাদুর (১৮৩০-১৮৭৩) নাট্যকার। পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার চৌবেড়িয়া গ্রামে এক গরিব পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতৃদত্ত নাম গন্ধর্বনারায়ণ। গ্রাম্য পাঠশালায় পড়ার পরে পিতার চেষ্টায় স্থানীয় জমিদারের সেরেস্তায় মাসিক আট টাকা বেতনে তিনি চাকরি শুরু করেন (১৮৪০)। কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল উচ্চশিক্ষা লাভের তীব্র বাসনা। তাই পাঁচ বছর চাকরি করার পর পিতার অমতেই গোপনে তিনি চলে যান  কলকাতা। সেখানে পিতৃব্য নীলমণি মিত্রের আশ্রয়ে শুরু হয় তাঁর উচ্চশিক্ষা লাভের প্রাণান্তকর সংগ্রাম।

 


কলকাতায় পড়াশুনার খরচ জোগাতে দীনবন্ধুকে করতে হয়েছে গৃহভৃত্যের কাজ। প্রথমে তিনি  রেভারেন্ড জেমস লংএর অবৈতনিক স্কুলে ভর্তি হন এবং এ সময়েই তিনি দীনবন্ধু নাম গ্রহণ করেন। পরে তিনি ভর্তি হন কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুলে (বর্তমান হেয়ার স্কুল)। সেখান থেকে জুনিয়র স্কলারশিপ (১৮৫০) পরীক্ষায় পাস করে তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। কলেজের সকল পরীক্ষায় তিনি বৃত্তি লাভ করেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনি বরাবর সর্বোচ্চ নম্বর লাভ করেন।

 

১৮৫৫ সালে দীনবন্ধু পাটনায় পোস্টমাস্টার পদে যোগদান করেন। এ বিভাগে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পদে চাকরি করার পর তিনি সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেল হন। ১৮৭১ সালে লুসাই যুদ্ধের সময় দীনবন্ধু কাছাড়ে সফলভাবে ডাক বিভাগ পরিচালনা করেন, যার জন্য সরকার তাঁকে রায়বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু কোনোও এক কারণে ডাক বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল হগের অপ্রীতিভাজন হওয়ায় সহকারী পোস্টমাস্টার জেনারেলের পদ থেকে তাঁকে অপসারণ করা হয়। পরে ১৮৭২ সালে তিনি ইন্ডিয়ান রেলওয়ের ইন্সপেক্টর পদ লাভ করেন।

দীনবন্ধু কলেজে পড়ার সময়ই ঈশ্বর গুপ্তের সংস্পর্শে গিয়ে  সংবাদ প্রভাকর, সাধুরঞ্জন প্রভৃতি পত্রিকায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। তবে নাটক ও  প্রহসন লিখেই তিনি সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন। নীলদর্পণ (১৮৬০) তাঁর শ্রেষ্ঠ নাটক এবং শ্রেষ্ঠ রচনাও। সমকালের নীলচাষ ও  নীলকর সাহেবদের প্রজাপীড়ন এবং শাসকশ্রেণীর পক্ষপাতমূলক আচরণ নাটকটির বিষয়বস্ত্ত। নাটকটি তৎকালীন সমাজে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং কৃষকদের নীলবিদ্রোহে ইন্ধন জোগায়।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করেন এবং পাদ্রি জেমস লং তা প্রকাশ করে আদালত কর্তৃক অর্থদন্ডে দন্ডিত হন।  বঙ্কিমচন্দ্র নীলদর্পণকে আঙ্কল টমস কেবিন-এর সঙ্গে তুলনা করেন। নাটকটি রচনাকাল থেকে আজ পর্যন্ত জাতীয় চেতনার পথিকৃৎ হয়ে আছে। এটিই বিদেশী ভাষায় অনূদিত প্রথম বাংলা নাটক। ১৮৬০ সালে কস্যচিৎ পথিকস্য ছদ্মনামে নাটকটি প্রথম  ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় এবং ১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর এটি দিয়েই শুরু হয় সাধারণ রঙ্গালয়ের অভিনয়।


এই প্রসঙ্গে শ্রী আশুতোষ ভট্টাচার্য প্রণীত  বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস ১ম খণ্ড (১৭৯৫-১৯০০) থেকে অল্প কিছু উদ্ধৃতি দেবার লোভ সামলানো গেল না -

“‘নীল-দর্পণ' প্রকাশিত হইবার এক বৎসরের মধ্যেই ইহা ইংরেজিতে অনূদিত হয়। কথিত আছে যে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত অত্যন্ত দক্ষতার সহিত ইহার অনুবাদের কার্য সম্পন্ন করেন। নীল-দর্পণের ইংরেজি অনুবাদের মুদ্রাকর ও প্রকাশক ছিলেন রেভারেণ্ড জেমস্ লঙ্‌ সাহেব। রেভারেণ্ড সঙ, ইতিপূর্বেই এতদেশীয় বহু জনহিতকর অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকিয়া সমাজের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিয়াছিলেন। নীলকর-অত্যাচারের প্রকৃত স্বরূপ এই গ্রন্থের ভিতর দিয়া প্রকাশিত হইয়াছে বিবেচনা করিয়া, তিনি ইহা এতদ্দেশে ও ইংলণ্ডের শাসন-কর্তৃপক্ষের গোচরীভূত করিবার মানসে এই গ্রন্থ প্রকাশের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের স্বয়ে গ্রহণ করেন। নীলকরদিগের ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ব্রিটিশ ভারতীয় জমিদার ও ব্যবসায় সমিতি (Landholders and commercial Association of British India)। নীলদর্পণের ইংরেজি অনুবাদ এই দেশে ও বিলাতের শাসনকর্তৃপক্ষের নিকট অচিরেই উপস্থাপিত করা হইল এবং সঙ্গে সঙ্গেই উক্ত জমিদার ও ব্যবসায় সমিতির পক্ষ হইতে কলিকাতার প্রধানতম বিচারালয়ে ( Supreme Court ) ইহার ইংরেজি অনুবাদের মুদ্রাকর ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে মানহানির মোকদ্দমা দায়ের করা হইল। বিচারপতি স্যার এম, এল, ওয়েলস্ এক বিশেষ জুরি সহায়তায় এই মোকদ্দমার বিচার করিয়া রেভারেণ্ড্‌ লঙ্‌কে মানহানির অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করিলেন। ১৮৬১ খ্রীষ্টাব্দের ২৪শে জুলাই তারিখে এই মোকদ্দমার নিস্পত্তি হইল। আসামী রেভারেণ্ড্‌ লঙ্‌ সাহেবের প্রতি এক মাসের জন্য কারাবাস ও এক হাজার টাকা অর্থদণ্ডের আদেশ হইল। পরম বিদ্যোৎসাহী কালীপ্রসন্ন সিংহ বিচারালয়ে উপস্থিত ছিলেন। এক সহস্র টাকা তিনি তৎক্ষণাৎ লঙ্‌ সাহেবের হন্তে অৰ্পণ করিলেন। লঙ্‌ সাহেব তাহার প্রদত্ত অর্থে অর্থদণ্ড পরিশোধ করিয়া একমাসের জন্য কারাবরণ করিলেন।

এই অভাবনীয় ঘটনায় নীল-দর্পণের নাম অল্পকালমধ্যেই অপ্রকাশিতরূপে প্রচার লাভ করিল। বিশেষতঃ ইহার পূর্ব হইতেই এদেশে নীলকরের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধারণ জনমত অতান্ত বিক্ষুব্ধ হইয়াছিল। একদিকে এই সমসাময়িক বিষয়-বস্তুকে অবলম্বন করিয়া নাটকখানি রচিত হওয়ার ফলে ইহার দিকে প্রত্যেকেরই দৃষ্টি যেমন আকৃষ্ট হইয়াছিল, তেমনিই সুপ্রীম কোর্টে ইহার সম্বন্ধীয় এই মানহানি মোকদ্দমার উত্তেজনামূলক পরিণতিতে ইহার বিষয়ে দেশের শিক্ষিত ও অশিক্ষিত জনসাধারণ বিশেষ কৌতুহলী হইয়া উঠিল। এমন কি, এই ঘটনা অবলম্বন করিয়া কবি ও পাঁচালীর দলে গান রচিত হইয়া লোকের মুখে মুখে প্রচারিত হইতে লাগিল। সমসাময়িক বিষয়বস্তু ও গ্রন্থ প্রকাশের অব্যবহিত পরেই কতকগুলি বিশেষ ঘটনার সংঘটনই যে এই নাটকখানির ব্যাপক লোকপ্রচারের সহায়ক হইয়াছিল, তাহা নহেএই সকল ঘটনার কিছুদিন পর বঙ্গদেশে নাট্যসাহিত্য প্রচারের সহায়ক আর একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটিল। তাহা কলিকাতায় ন্যাশানেল থিয়েটার নামক সাধারণ রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠা। অর্ধেন্দুশেখর মুস্তফী প্রমুখ প্রতিভাবান্‌ কয়েকজন নাটাশিল্পী এই কার্যে ব্রতী হইয়া ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় ন্যাশানেল থিয়েটারের রঙ্গমঞ্চে সাধারণ টিকিট বিক্রয় করিয়া সর্বপ্রথম যে নাটকের অভিনয় করেন, তাহা দীনবন্ধু মিত্র প্রণীত এই নীল-দর্পণ নাটক। ইহার পূর্বে কলিকাতা ও কদাচিৎ মফঃস্বলে যে সকল নাটকের অভিনয় হইত, তাহাতে সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না, একমাত্র ধনাঢ্য ব্যক্তি ও উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারিগণই নিয়ন্ত্রিত হইয়া যোগদান করিতে পারিতেন। কিন্তু নীল-দর্পণের অভিনয়ে প্রথম হইতেই জনসাধারণের প্রবেশাধিকার জন্মিয়াছিল, অতএব সাধারণ রঙ্গমঞ্চে অভিনয়ের সাহায্যে ও ইহার প্রচারের সহায়তা হইয়াছিল। সমসাময়িক একটি অতান্ত উত্তেজনামূলক বিষয়বস্তুকে অতিনাটকীয় কাহিনীর মধা দিয়া প্রকাশ করিবার ফলে রঙ্গমঞ্চের সাধারণ দর্শকদিগের মধ্যে অচিরেই ইহা অতান্ত জনপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছিল।

এই সকল অনুকূল অবস্থার সহায়তায় অল্পদিনের মধ্যেই নীল-দর্পণের ব্যাপক প্রচার সম্ভব হইয়াছিল স্বীকার করিয়া লইলেও, ইহাতে যে শিল্প-সম্মত নাট্যগুণ কিছুই ছিল না, তাহা বলিবার উপায় নাই। এই নাটকের সাফলা সম্বন্ধে মনীষী বঙ্কিমচন্দ্র যাহা বলিয়াছেন, তাহা বিশেষ ভাবেই প্রণিধানযোগ্য :

নীলদর্পণে গ্রন্থকারের অভিজ্ঞতা এবং সহানুভূতি পূর্ণমাত্রায় যোগ দিয়াছিল বলিয়া, নীলদর্পণ তাঁহার প্রণীত সকল নাটকের অপেক্ষা শক্তিশালী। অন্য নাটকের অন্য গুণ থাকিতে পারে, কিন্তু নীলদর্পণের মত শক্তি আর কিছুতেই নাই। তাঁর আর কোন নাটকেই পাঠককে বা দর্শককে তাদৃশ বশীভূত করিতে পারে না।”…

দীনবন্ধু সমকালীন হিন্দুসমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে প্রহসন রচনা করেও খ্যাতি অর্জন করেন। সমাজের সাধারণ মানুষ সম্বন্ধে বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিই তাঁর রচনার প্রধান প্রেরণা। চাকরিসূত্রে দেশ-বিদেশ ঘুরে বহুলোকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর নাটকের চরিত্র সৃষ্টিতে তাঁকে বিশেষভাবে সাহায্য করে। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য নাটক ও প্রহসন হলো: নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩), বিয়ে পাগলা বুড়ো (১৮৬৬), সধবার একাদশী (১৮৬৬), লীলাবতী (১৮৬৭), জামাই বারিক (১৮৭২), কমলে কামিনী (১৮৭৩) প্রভৃতি। সধবার একাদশী ও লীলাবতী উচ্চাঙ্গের সামাজিক নাটক। বিয়ে পাগলা বুড়ো ও জামাই বারিক দুটি প্রহসন।

দীনবন্ধুর দুখানি কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে দ্বাদশ কবিতা (১৮৭২) ও সুরধুনী কাব্য (২ ভাগ ১৮৭১, ১৮৭৬)। সুরধুনী কাব্য হিমালয় থেকে গঙ্গাদেবীর সাগরসঙ্গমে যাত্রার ছন্দোবদ্ধ বর্ণনা। এতে উত্তর ভারতের বিভিন্ন জনপদ এবং বঙ্গদেশ ও সমকালীন কলকাতার বিশিষ্ট স্থান ও স্মরণীয় ব্যক্তিদের চমৎকার বর্ণনা রয়েছে।

দীনবন্ধু ছিলেন সমাজকল্যাণনিষ্ঠ শিল্পী। তিনি ছিলেন কৃত্রিমতার বিরোধী এবং সত্যের অনুসারী। জীবন সম্বন্ধে গভীর বাস্তব অভিজ্ঞতার দ্বারা তিনি কল্পনাশক্তির ন্যূনতাকে পূরণ করেছিলেন। তীক্ষ্ণ সমাজদৃষ্টি, জীবন্ত চরিত্রসৃষ্টি এবং মানবিক সহানুভূতি তাঁর সৃষ্টিকে অমর করে রেখেছে। ১৮৭৩ সালের ১ নভেম্বর তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে।

 

দীনবন্ধু মিত্রর বাড়িকে পেছনে ফেলে আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে চললাম কৈলাশ বসু স্ট্রিটের দিকে।


কৈলাশ বসু স্ট্রিট যেখানে বিধান সরণীতে মিশেছে ঠিক বাঁদিকে ১ নং কৈলাস বসু স্ট্রিটে বাস করতেন ডাঃ কৈলাশচন্দ্র বসু। এই রাস্তার আদি নাম ছিল সুকিয়া স্ট্রিট। সেই অনুযায়ী সেসময় এ বাড়ির ঠিকানা ছিল ১, সুকিয়া স্ট্রিট। কলকাতা পুরসভা ২০শে জুন ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দের মিটিং-এ সুকিয়া স্ট্রিটের কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট (বিধান সরণী) এর মুখ থেকে আমহার্স্ট স্ট্রিট (রাজা রামমোহন রায় সরণি) অব্দি নাম পালটে এই চিকিৎসকের নামে কৈলাস বসু স্ট্রিট নামকরণ করেন। 

কৈলাশচন্দ্রের জন্ম কলকাতার সিমলার বসুপরিবারে। বাবু মধুসূদন বসুর দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি। ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে পড়াশোনা শেষ করে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হতে ডাক্তারি পাশ করে ক্যাম্পবেল হাসপাতালে রেসিডেন্ট মেডিক্যাল অফিসার হন।

কিন্তু ভাইয়ের পরামর্শে সরকারি চাকরি পরিত্যাগ করে প্রাইভেট প্র্যাকটিশ শুরু করেন এবং এমন সুনাম অর্জন করেন যে, বাংলায় অগ্রণী চিকিৎসক হিসাবে বিশেষ করে অবস্থাপন্ন মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের মাঝে অল্প দিনেই স্থান করে নেন। চিকিৎসাক্ষেত্রে নিজের চেষ্টায় প্রভূত উন্নতি সাধনও করেছেন। বহু জনহিতকর কাজে এগিয়ে এসে নিজ উপার্জিত অর্থ ব্যয় করেন। প্রধানত তাঁরই প্রচেষ্টায় বাংলায় পশুচিকিৎসা কলেজ ও হাসপাতাল এবং ট্রপিক্যাল মেডিসিন স্কুলের জন্য অর্থ সংগৃহীত হয়েছিল। এছাড়া কলকাতা মেডিক্যাল স্কুল, সোদপুর, পিঞ্জরাপোল, কুষ্ঠনিবাস প্রভৃতির তিনি অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। কলকাতা মেডিক্যাল সোস্যাইটি, ভারতীয় মেডিক্যাল কংগ্রেসের সহ-সভাপতি, কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার এবং অবৈতনিক প্রেসিডেন্সী ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন।


অবিভক্ত বাংলায় চিকিৎসাক্ষেত্রে তাঁর অসামান্য কাজের স্বীকৃতিতে বহু সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন কৈলাসচন্দ্র বসু। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি রায়বাহাদুর খেতাব পান। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে সি.আই.ই সম্মানে ভূষিত হন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো হন। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে জনসেবার স্বীকৃতি স্বরূপ 'কাইজার-ই-হিন্দ' স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় ডাক্তারদের মধ্যে তিনিই প্রথম 'স্যার' উপাধি দ্বারা সম্মানিত হন।

কৈলাশচন্দ্র বসু ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ১৯ শে জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

বিধান সরণিতে ট্রামলাইন পেরোতে গিয়ে চোখ চলে যায় নতুন ভাবে তৈরি হওয়া এক বাড়ির নিচের একটা দোকানে।

 

কপিলা আশ্রম। কলকাতার শরবৎ তৈরির ইতিহাসে আরেক স্মরণীয় দোকানের নাম। ভারতের স্বাধীনতারও আগে, ১৯০৭ সালে এই কপিল আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হৃষিকেশ শ্রীমানি। শোনা যায়, সেখানে প্রায়ই যেতেন মহানায়ক উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন। কখনও কখনও সেখানে উপস্থিত থাকতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দের মতো বিশিষ্ট শিল্পীরা। বিরতির সময় কিংবা বাড়ি ফেরার সময় কখনই এই সরবতের স্বাদ নিতে ভুলতেন না ওঁরা।

 

হৃষীকেশ বাবুর এই সরবতের নাম এক সময় গোটা কলকাতা চত্বরে ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি এই সরবত তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ নিজের হাতে তৈরি করতেন। ওই উপকরণের জোগাড় হৃষীকেশ বাবু পশ্চিমবঙ্গের বাইরের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আনাতেন। তারপর সেগুলি দিয়ে এবং নিজের হাতের জাদু মিশিয়ে সুস্বাদু সরবত তৈরি করতেন। সে সময়েও তিনি বিভিন্ন স্বাদের সরবত প্রস্তুত করতেন। তাঁর তৈরি সরবতের মধ্যে গোলাপ, ভ্যানিলা, জাফরান, এলাচ ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের ফ্লেভার উল্লেখযোগ্য ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে সুস্বাদু ও বিখ্যাত ছিল হৃষীকেশ বাবুর নিজের তৈরি আবার খাই সরবত।

এই পুরোনো বাড়িতেই ছিল উইমেন্স কলেজ যা বর্তমানে বাগবাজারে স্থানান্তরিত হয়েছে।

ট্রামলাইন পেরিয়ে উল্টোপারেই তারক প্রামাণিক রোড। প্রাচীন নাম বারাণসী ঘোষ ষ্ট্রীট। পশ্চিমদিকে চিত্তরঞ্জন এ্যাভিন্যু থেকে শুরু হয়ে যা শেষ হয়েছে এই বিধান সরণিতে। আমরা একটু এগোতেই বাঁদিকে পড়লো তারক চন্দ্র প্রামাণিকের সেই প্রাচীন কোঠাবাড়ি। যার এসময়ের ঠিকানা  ১৫৪ নং তারক প্রামাণিক রোড। ১৯৩৭ সালের আগের এ বাড়ির ঠিকানা- ৮৬ ও ৮৭ নং বারাণসী ঘোষ ষ্ট্রীট।

 

দানশীল তারকনাথ প্রামাণিকের (১২২৩-১২৯১ বঙ্গাব্দ) জন্ম কলিকাতায়। গ্রামের পাঠশালায় শিক্ষালাভ করে ১২ বছর বয়সে পিতা গুরুচরণের সহকারীরূপে ব্যবসায়ে প্রবেশ করেন। গুরুচরণ এদেশে প্রথম জাহাজ মেরামতির কারখানা স্থাপন করেছিলেন। তারকনাথের পরিচালনায় ওই কারখানার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। তারকনাথের কাঁসা পেতলের ব্যবসা ছিল বহু বিস্তৃত। কলিকাতার বড়বাজার ও চাঁদনীতে তাঁদের প্রকাণ্ড আড়ত ছিল।

শোনা যায় একসময় পর্তুগীজ জলদস্যুরা নদীর নিচে বড় বড় চুম্বক (Magnet) ফেলে রাখতো যাতে যে কোনো জাহাজ সেই চৌম্বকের টানে আটকে যায়। তারপরে চলতো লুঠপাট। এই তারকনাথই এগিয়ে আসেন ইংরেজদের সাহায্য করতে। তিনি জাহাজের তলার লোহার অংশের ওপরে পেতলের পাত দিয়ে মুড়ে দেন। এর পরে ইংরেজদের জাহাজ চলাচলে আস্থা ফিরে আসে। উপস্থিত বুদ্ধিতে তারকনাতের ব্যবসা আরো স্ফীত হয়ে ওঠে।


জাহাজের তলদেশে ব্যবহারের জন্য পেতল ও তামার চাদর এই আড়ত থেকে বিদেশে রপ্তানি হত। দাতা হিসেবেও তারকনাথ সমধিক প্রসিদ্ধ ছিলেন। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকেই মুক্ত হস্তে দান করতেন। বিবিধ ধর্মানুষ্ঠানে ও পূজা। পার্বণাদি প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। মহারানী ভিক্টোরিয়া ভারতসম্রাজ্ঞী উপাধি ধারণ উপলক্ষে ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দের ১লা ফেব্রুয়ারিতে কলিকাতায় অনুষ্ঠিত দরবারে তারকনাথকে তাঁর দানধ্যানের জন্য। সার্টিফিকেট অফ অনার দ্বারা সম্মানিত করা হয়। আজও এ বাড়িতে সাড়ম্বরে দুর্গাপুজো হয়ে থাকে।

তারকনাথ প্রামাণিকের বাড়ি ছেড়ে ঐ তারক প্রামাণিক রোড ধরে পশ্চিম দিকে এগোতে থাকি। মধ্যাহ্নের সূর্য সরাসরি মাথার ওপরে খরতর। বেশ কিছুটা এগোলেই বাঁদিকেই শুরু হয়েছে সরকার লেন।

বেশ কিছুটা এগোলেই রাস্তার বাঁদিকে পড়ে একটা মন্দির। এই সরকার লেনের ঠিক মন্দিরের আগের বাড়িটাই একটা সময়ে বাংলার তথা ভারতবর্ষের সংগীত জগতের এক দিকপাল ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। বাংলা রাগসংগীতের এক সংগীতশিল্পী হিসেবেই আমরা তাঁকে চিনি। বাড়ির ঠিকানা ৩০ নং সরকার বাই লেন, কলকাতা ৭০০০০৭।



ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় ১৯০৯-১৯৭৭

বাঙালিদের মধ্যে যাঁরা হিন্দুস্তানি খেয়াল গায়ক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিভাধর ছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়। বালক ভীষ্মদেবের গান শুনে খলিফা বদল খাঁ চমৎকৃত হন এবং তাঁকে শেখাতে সম্মত হন। বদল খাঁ সাহেবের অধীনেই সংগীতাভ্যাস গড়ে ওঠে। মাত্র পনেরো বছর বয়সে প্রথম গানের রেকর্ড করেন। কাজী নজরুল ইসলামের কল্যাণে ভীষ্মদেব তেইশ বছর বয়সেই মেগাফোন কোম্পানির সংগীত নির্দেশক হিসেবে নিযুক্ত হন। গায়ক ও সুরস্রষ্টারূপে যখন খ্যাতির তুঙ্গে ঠিক সেই সময় ১৯৪০ সালে পণ্ডিচেরিতে অরবিন্দ আশ্রমে চলে যান। গ্রামোফোন রেকর্ডে তাঁর প্রতিভার পরিচয় বাণীবদ্ধ আছে। ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় এসেছিলেন মুক্তাগাছার জমিদারের কাছে এবং জীবেন্দ্রকিশোর ভীষ্মদেবের ভৈরবী বাংলা খেয়ালের সুর সংশোধন করে দিয়েছিলেন। ভীষ্মদেবের এই গান বাংলা খেয়ালের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম শচীন দেববর্মন, ঊমা বসু, কাননবালা, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, যূথিকা রায় ও আখতারি বাই।


শচীন দেব বর্মণ ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের গাণ্ডা বাঁধা শিষ্য ছিলেন। শুধু শিষ্য না। ভীষ্মদেব যখন প্রথম মিউজিক ডিরেকশন দেন তখন তাঁর সহকারী ছিলেন শচীন দেব বর্মণ। ওয়েষ্টার্ন মিউজিক আর ইণ্ডিয়ান মিউজিককে পাঞ্চ করে রিক্তা ছায়াছবিতে সুর দেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়। সে যুগের প্রথম আধুনিক বাংলা গান আরো একটু সরে বসতে পারো / আরো একটু কাছে। ১৯৩৮/৩৯ এ এই ভাষায় লেখা। এ গান যিনি গেয়েছিলেন তিনিও একজন ইহুদী রমণী। নাম র‍্যাচেল। কিন্তু রমলা নাম দিয়ে এই গান করেন। ছায়া দেবীর চলচিত্রে এসেছিলেন ভীষ্মদেবের জন্যেই। উনি রিজেক্টেড শিল্পী ছিলেন এ কথা উনি নিজেই বলতেন। রাইচাঁদ বড়াল ওকে রিজেক্ট করেছিলেন ছায়ার গলায় সুর নেই বলে। ভীষ্মদেবের কথামত গান গাইলেন ছায়া দেবী এবং এই রিক্তা চলচিত্রে তিনি চারখানা গান গেয়েছিলেন। কল্লোল যুগের লেখক কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রথম সিনেমার গান লিখেছিলেন এই রিক্তা সিনেমায়। আকাশরূপী হে মহাকাল নমো নমো / তুমি আলো তুমি আঁধার নিবিড়তম।

হারমোনিয়াম বাজানোতে ভীষ্মদেব এক নতুন স্টাইল তৈরি করেছিলেন। সেসময় বাংলা গান হয় খেয়াল অঙ্গের নয়তো ঠুমরী অঙ্গের। ভীষ্মদেব এটা ভাঙলেন। এমন খেয়াল তৈরি করলেন যাতে কেউ যেন তান না জুড়তে পারে। এটাই ভীষ্মদেবের স্বকীয়তা।


জাগো আলোক লগনে, নবারুণ রাগে তুমি সাথী গো বা যদি মনে পড়ে সেদিনের কথা প্রভৃতি চিরস্মরণীয় গান গেয়ে যিনি একদা বাংলাভাষী শ্রোতার মন জয় করেছিলেন, এমনকি তাঁর অসামান্য হারমোনিয়াম বাদনের জাদুতে তিনি সঙ্গীতরসিকদের মাতিয়ে দিয়েছিলেন।

সঙ্গীত সমালোচক ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেছেন যে আমার আন্তরিক বিশ্বাস যে জ্ঞানেন্দ্র গোঁসাই ও ভীষ্মদেব ভিন্ন দিক থেকে ভারতের জীবিত শ্রেষ্ঠ খেয়ালিদের মধ্যে অন্যতম।


শ্রদ্ধেয় জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ তাঁর বই তহজিব-এ-মৌসিকী-তে লিখেছেন ভীষ্মবাবুর গানের evolution-এর মধ্যে অনেক স্তর দেখা যায়। বেশি না বলে এইটুকু বলা চলতে পারে যে, প্রথম যুগের স্তরের মধ্যে যেটা বেশি লক্ষ্য করা যায় সেটা হচ্ছে চঞ্চলতা, চমক লাগানোর চেষ্টা ইত্যাদির মধ্যে আত্মপ্রসাদ খোঁজা কিন্তু শেষের দিকে অর্থাৎ ফৈয়াজ খাঁ, নাসিরুদ্দিন খাঁ প্রভৃতি সাধক গুণীদের সংস্পর্শে বা সান্নিধ্যে এসে দেখা গেল ভীষ্মবাবুর গানের মধ্যে একটা উচ্চস্তরের নান্দনিক সৌন্দর্য যেন প্রকাশ পাচ্ছে। এই চঞ্চলতার রাস্তা ত্যাগ করে সুরের সুষমার মধ্যে প্রবেশ করার যে পথ ওঁকে আকৃষ্ট করল তারও একটা বিশ্লেষণ এই হতে পারে যে, তিনি অনুসরণ করতে ওস্তাদ বাদল খাঁকে। বাদল খাঁ অবশ্য কণ্ঠসঙ্গীতের দ্বারাই তালিম দিতেন গানের ব্যাপারে কিন্তু তিনি নিজে ছিলেন একজন সারেঙ্গীবাদকযেটা বাদল খাঁর জীবনে হাড়মাসের সঙ্গে মিশে ছিল। যারা বিশ্লেষক এটা তারা মনে করতেই পারেন যে , সারেঙ্গী যা তাঁত, ছড় ও অনেকগুলি অঙ্গুলি সঞ্চালনে ও সঞ্চরণে সঙ্গীত সৃষ্টি করে তা শুধু কষ্ঠের সাহায্যে প্রস্তুত সঙ্গীজ্ঞে সঙ্গে পৃথক হতেই পারে।

ভীষ্মবাবুর গাওয়া গান নানারকম ধরন ধারণের জন্য যেমন আকৃষ্ট করত তেমন তাঁর প্রত্যেক সৃষ্টির মধ্যে একটা নতুনত্বের ছোঁয়া থাকত। সেই রকমই নতুন আঙ্গিকের সৃষ্টির আভাস পাওয়া যেত তাঁর হারমোনিয়ামে।


বাঙালীর গৌরব ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের অনেক গুণের কথা আমাদের দেশবাসী তথা বাংলাদেশের বাইরেও অনেক বিদগ্ধ সঙ্গীতানুরাগীদের শোনা এবং জানা আছে। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা শুধু হিন্দুস্থানী রাগসঙ্গীত এবং রাগধমী লঘুসঙ্গীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না হয়তো এটাও আলোচনা করেছি যে ভীষ্মবাবু যখন ফিলিস্তানে যোগ দিলেন তখন চিত্রপটে এমন চমৎকার ঘর সংযযাজনা তিনি করলেন যা চিরদিন মনে রাখবারনতুন পথের সন্ধানের জন্য। সঙ্গে সঙ্গে ভীষ্মবাবু নিছক আনন্দ পাওয়া এবং শ্রোতাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য তাঁর নিজের এবং শ্রোতাদের মেজাজের ওপর নির্ভর করে হারমোনিয়াম যন্ত্র কোলে টেনে নিয়ে নানা রাগ, ধুন, তাল, ছন্দ নিয়ে এমন বিচিত্র সঙ্গীত সৃষ্টি করতে যার জন্য মনেই হত না যে হারমোনিয়াম একটা টেমপারড্‌ স্কেলের বিদেশী সংস্কৃতি-উদ্ভুত বাদ্যযন্ত্র যেখানে মীড়, গমক, লহক, আশ ইত্যাদির কোনও স্থান বা সম্ভাবনা নেই।

আমরা ভীষ্মবাবুকেই দেখতাম একমাত্র কলাকার যিনি হারমোনিয়ামে অনুলি সঞ্চালনের এমন এক ধারার প্রবর্তন করলেন যা কণ্ঠসঙ্গীতের রাগানুভূতি তথা ঠুংরি, ধুন ইত্যাদির সূক্ষ্ম মাধুর্য। ফুটিয়ে তুলতে পারে।

দেশকাল আর পিপলস্‌ গ্রীন সোসাইটি আয়োজিত এই ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০২১ এর পার্ক হেরিটেজ পর্বে শিমূলিয়া ঘোরা প্রায় শেষ। এর পরেরটুকুর জন্যে আমরা সদলবলে এসে পৌঁছলাম সেই বিখ্যাত সিমলা ব্যায়া্ম সমিতি প্রাঙ্গনে।

সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রতিষ্ঠাকারী বিপ্লবী অতীন্দ্র নাথ বসু ভেবেছিলেন যে "মা দুর্গা" যদি সবার হন এবং দুর্গাপূজার আয়োজন যদি সমাজের কল্যাণে হয় তবে সমস্ত জাত, বর্ণ ও ধর্মের লোকদের উপস্থিত থাকার অধিকার থাকতে হবে এই পুজোয়। এই চিন্তার ফলস্বরূপ, ১৯২৬ সালে অতীন্দ্র নাথ বসু সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রাঙ্গণে বাংলার সর্বাগ্রে 'সর্বজনীন দুর্গোৎসব' প্রবর্তন করেন।

সিমলা ব্যায়াম সমিতি প্রতিষ্ঠার আগে  অতীন্দ্র নাথ বসু বিভিন্ন বিপ্লবী ও সমাজকল্যাণ সংস্থায় পুরোপুরি যুক্ত ছিলেন। তিনি যতীন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায় (বাঘা যতিন) এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং বিপ্লবী হিসাবে অরবিন্দ ঘোষ (ঋষি অরবিন্দ] এর সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং প্রথম সারির বিপ্লবী নেতাদের সহকারী হিসাবে কাজ করেছিলেন। অতীন্দ্র নাথ বসু তার বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য কয়েকবার কারাবরণও করেছিলেন।

সে সময় অতীন্দ্র নাথ বসু ভেবেছিলেন যে বাঙালী যুবকদের যদি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী না করা যায় তবে তাদের পক্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করা খুব কঠিন হবে। সেই লক্ষ্যে ১৯২৬ সালের ২রা এপ্রিল তিনি সিমলা ব্যায়াম সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন যাতে যুবসমাজ সুস্বাস্থ্য অর্জন করতে পারে। সিমলা ব্যায়াম সমিতি মূলত দেহ-চর্চা কেন্দ্র হিসাবে গড়ে ওঠে। সিমলা ব্যায়াম সমিতির শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত কুস্তি ও লাঠি লড়াই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সুনাম অর্জন করেছিল। তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সভাগুলির কুস্তি এবং লাঠি লড়াইয়ের প্রদর্শনীতে নিয়মিত অংশ নিতো।

সিমলা ব্যায়াম সমিতি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল সুস্থ ও নৈতিকভাবে সাহসী বাঙালি যুবকদের গড়ে তোলা, যাতে তারা যে কোনও সময় মাতৃভূমির স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে যেতে পারে এবং দুর্বল ও হতভাগা মানুষের জন্য তাদের সহায়তা বাড়াতে পারে। মূল উদ্দেশ্য ছিল সিমলা ব্যায়াম সমিতিকে শারীরিক বিকাশের একটি আদর্শ ইনস্টিটিউট হিসাবে গড়ে তোলা। অতীন্দ্র নাথ বসুও এই সমিতির মাধ্যমে তৎকালীন তাঁর রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন শুরু করেছিলেন। অতীন্দ্র নাথ বসু দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এবং কংগ্রেসের আহ্বানে, সিমলা ব্যায়াম সমিতির অনেক সদস্য অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং কারাবাস গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে তাঁর নিজের ছেলেরাও বিভিন্ন স্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং বহুবার কারাবরণ করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও, সিমলা ব্যায়াম সমিতির সদস্যরা উভয় পক্ষের লোকদের সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছিল এবং শান্তি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। বন্যা, খরা ইত্যাদির মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সমিতির সদস্যরা ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের যত্ন নেওয়ার জন্য নিজেদের নিযুক্ত করেছিলেন।

সেই সময়কালে যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু, সুরেশ চন্দ্র মজুমদার, মাখন লাল সেন, ডাঃ ভূপেন্দ্র দত্ত, বঙ্কিম মুখোপাধ্যায়, রাজেন দেব, হেমন্ত বসু, রাধা রমন মিত্র, ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, কিরণ শঙ্কর রায়, প্রভু দয়াল হিম্মতসিংকা, মদন মোহন বর্মণ এবং আরও অনেকে নিয়মিত সিমলা ব্যায়াম সমিতিতে আসতেন এবং সমিতির বিভিন্ন কাজেও জড়য়ে থাকতেন।

তদানীন্তন ডালহৌসি স্ক্যোয়ার বোমা মামলার প্রধান নেতা হিসাবে সমিতির সদস্য ডঃ নারায়ণ চন্দ্র রায়কে ব্রিটিশ আদালতে দোষী হিসাবে আন্দামান জেলে রাখা হয়েছিল। সমিতির মহিলা সদস্যরা স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম সারিতে ছিলেন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য উর্মিলা দেবী, মোহিনী দেবী, জ্যোতির্ময় গাঙ্গুলি, ইলা সেন, শান্তি দাস, আশালতা দাস, ইন্দিরা দেবী, বীনা দাস, কল্পনা দত্ত (যোশি) এবং আরও অনেকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩২ সালের ৪ঠা জানুয়ারি সিমলা ব্যায়াম সমিতিকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং সমিতিটিকে বন্ধ করে দিয়ে খেলাধুলার সরঞ্জামাদি সহ সমস্ত আসবাব বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল। সেই সময়ে সমিতিটি 'ব্যায়াম সমিতি' নামে পরিচালিত হত। ১৯৩৪ সালের ৭ই অক্টোবর, যখন ব্রিটিশ সরকার আদেশটি প্রত্যাহার করে নিলে আবার 'সিমলা ব্যায়াম সমিতি'র নামে কাজ শুরু হয়।

১৯২৬ সালে সিমলা ব্যায়াম সমিতির প্রথম দুর্গোৎসবে প্রথম পুরোহিত ছিলেন প্রয়াত ডাঃ চপলা কান্ত ভট্টাচার্য। প্রথম বছর শ্রী নিতাই চন্দ্র পাল ছিলেন প্রতিমার শিল্পী। প্রথমদিকে যেমন রীতি ছিল, প্রতিমাটি একটি ক্যানভাসে তৈরি করা হয়েছিল এবং পূজা মণ্ডপের ছাদ তৈরি হয়েছিল জংলি ঘাস দিয়ে। ১৯৩৯ সালে একই বেদীতে পাঁচটি পৃথক ক্যানভ্যাস প্রস্তুত করা হয়েছিল এবং প্রতিমার ক্যানভাসগুলো আলাদা আলাদা করে বসানো হয়েছিল। স্বামী বিবেকানন্দের দ্বিতীয় ভাই শ্রী মহেন্দ্র নাথ দত্ত যিনি অতীন্দ্র নাথ বসুর প্রতিবেশী ছিলেন, বিভিন্ন সংস্কৃত শ্লোকের উদ্ধৃতি উল্লেখ করে শ্রী অতীন্দ্র নাথ বসুর এই কাজকে সমর্থন করেছিলেন। প্রতিমা তৈরির সময় তিনি সমিতির প্রাঙ্গণে নিয়মিত আসেন এবং সংস্কৃত শ্লোকগুলি উদ্ধৃত করে প্রতিমা কাঠামো, রঙ, পোশাক, অস্ত্র স্থাপন এবং অন্যান্য বিষয়ে নির্মান কাজের দেখভাল করেছিলেন। এইভাবে প্রতিমা স্থাপন করায় কলকাতায় আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল কারণ পৃথকভাবে 'মা দুর্গার' প্রতিমা নির্মাণের ক্ষেত্রে সিমলা ব্যায়াম সমিতি নজির তৈরি করেছিল। এ সময় অতীনবাবুর প্রয়াসে শিল্পীর বৃত্ত থেকে স্বাগত জানানো হয়। ঠাকুর পরিবারের অনেক সদস্য এই প্রতিমাটি পরিদর্শন করেছিলেন এবং প্রশংসা করেছিলেন। একই বছরে শ্রী সুভাষ চন্দ্র বোস মূর্তিটি উন্মোচন করেছিলেন। দুর্গাপূজায় একটি বিশাল "অন্নকূট" আয়োজন করা হয়েছিল। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎচন্দ্র বসু এবং অন্যান্য নেতারা সাধারণ দর্শকদের নিয়ে এই "অন্নকূট"-তে অংশ নিয়ে প্রসাদ গ্রহণ করেছিলেন।

এখনো প্রতি বছর দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন বীরাষ্টমী পুজো পালন করা হয় পুজোপ্রাঙ্গনে। আর এর সাথে লাঠিখেলা, ছুরিখেলা, কুস্তি এবং যোগ ব্যায়ামের অনুষ্ঠানও হয়ে থাকে।

আমাদের আজকের (২৭/০২/২০২১) এর হেরিটেজ ভ্রমণের অন্তিম লগ্নে মাননীয় শ্রী হরিপদ ভৌমিক মহাশয়কে এবং আরো কয়েকজনকে কিছু উপহার প্রদানের পরে সমাপ্তি হয় এ বারের পর্বের।

 


(সমাপ্ত)

 

কৃতজ্ঞতা -

বই -

১।      কলিকাতার পুরাতন কাহিনী ও প্রথা – মহেন্দ্র লাল দত্ত
২।     কলিকাতার কাহিনী – সুকুমার সেন।
৩।     কলকাতার ইতিবৃত্ত – প্রাণকৃষ্ণ দত্ত।
৪।     কলিকাতা সেকালের ও একালের – হরিসাধন মুখোপাধ্যায়।
৫।     জীবনের জলসাঘরে – মান্না দে
৬।     সাজাহান ও চন্দ্রগুপ্ত নাটক - দ্বিজেন্দ্রলাল রায়।
৭।     বাংলা নাট্যসাহিত্যের ইতিহাস ১ম খণ্ড (১৭৯৫-১৯০০) – আশুতোষ ভট্টাচার্য। 
৮।     কথা ও সুর – ধুর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
৯।     তহজিব-এ-মৌসিকী - জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ
১০।    কলিকাতার রাজপথ সমাজ ও সংস্কৃতিতে – অজিতকুমার বসু।

ওয়েবপেজ ও সাইট ;-

উইকিপিডিয়া।
বাংলাপিডিয়া।
প্রহর ডট ইন।
বাংলাআমারপ্রাণ ডটইন।
মিস্টান্নের মিস্টি ইতিকথা  - সন্দীপ কুমার চক্রবর্তী – কলকাতার পুরাকথা ফেসবুক পেজ।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের গান - দীপা বন্দ্যোপাধ্যায় – কালিওকলম ডটকম।
আজবিকেল ডটকম।
কলকাতায় মির্জা গালিব - আশিস ঘোষ – ক্যালকাটানিউজ ডট টিভি।
সিমলাব্যায়ামসমিতি ডটকম। 
এছাড়া আমার অশেষ ঋণ গুগুল এর প্রতি এবং যাঁদের ছবি আমি ব্যবহার করেছি।

#

**

যাঁরা ফেসবুকে প্রকাশিত ধারাবাহিক পর্বগুলি পড়ে মতামত দিয়েছেন উৎসাহ জুগিয়েছেন তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অপরিসীম। তাঁদের জানাই যে, শিমূলিয়া আমার নস্টালজিয়া। আমার জন্মস্থান। আমার পাড়া। আমার শৈশবের প্রথম দেখা কলকাতা। এই গোটা রচনায় গোটা শিমূলিয়ার শুধুমাত্র একটা অংশ স্থান পেয়েছে। আসলে সিমলে পাড়ার প্রতি বাড়িতে বাড়িতে ইতিহাস। ইচ্ছে আছে আরো কিছু লেখার। আপনাদের মতামত পেলে উৎসাহিত হবো আরো। সকলকে প্রণাম / নমস্কার / শ্রদ্ধা /  ভালবাসা / আদর। ভাল থাকুন। ভাল রাখুন।

গৌতমদত্ত।